Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৪

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৪

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৪
মারিয়াম ফুল

“আমার রূপ আছে, তাই ঢোল পেটাচ্ছি! তোমার ইচ্ছে হলে তুমি ঢোলের সাথে ড্যারামও পেটাতে পারো… ”
রুদ্রর কথা শুনে মেহের সঙ্গে সঙ্গে নিজের গাল দুটো ফুলিয়ে ফেলল, “আপনার সাথে কথা বলাই বৃথা! কী মেয়েদের মতো শুধু ঝগড়া করছেন… দিন তো, এবার আমার ছেলেকে আমার কাছে দিন”
রুদ্র এবার অবশ্য আর মেহেরের কথায় আপত্তি করল না। তোয়ালে পেঁচানো বাচ্চাটার দিকে তাকাতেই দেখল—তার ছোট্ট দুটো চোখের পাতা ঘুমে ভারী হয়ে আসছে, শরীরের ছোট্ট নড়াচড়া থেমে আসছে। তাছাড়া অনেকক্ষণ হয়ে গেছে, ওকে এখন ফিড করানোও জরুরি।

রুদ্র ধীরপায়ে দু-এক পা এগিয়ে এসে মেহেরের বেডের একদম কাছে এসে দাঁড়াল।
মেহের আগে থেকেই নিজের দুর্বল, কাঁপাকাঁপা দু-হাত বাড়িয়ে ব্যগ্র হয়ে প্রস্তুত হয়ে বসে ছিল। তার নিজের শরীরের অংশ, তার অন্তুর অংশ—তাদের দুজনের ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ, অস্তিত্বকে নিজের বুকের মাঝে সযতনে জড়িয়ে নেওয়ার জন্য মেহেরের ভেতরটা কেমন যেন আকুল-আকুপাঁকু করে উঠল। নিজের আবেগ আর ধরে রাখতে পারল না সে, না চাইতেও মেহেরের দু-চোখের কোণ বেয়ে হালকা নোনা জল গড়িয়ে এল।
রুদ্র কোনো তাড়াহুড়ো করল না। পরম যত্ন আর আলতো স্পর্শে নরম তোয়ালে জড়ানো তুলতুলে পুটলিটাকে ধীরে ধীরে মেহেরের কোলে সঁপে দিল।

মেহের কোল পাওয়ার সাথে সাথেই প্রথমে নিজের বাচ্চার মুখের দিকে সরাসরি তাকাতেই পারল না। এক অদ্ভুত আর তীব্র আবেগে চোখের পাতা দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। বুকের ভেতরটা একদম জুড়িয়ে গেল, যেন শীতল এক আনন্দধারা বয়ে গেল গোটা শরীরে। এত খুশি, সে কোথায় রাখবে? তার জন্য, শুধুমাত্র তার জন্য কেউ একজন আজ এই বিশাল দুনিয়াতে নতুন আলো হয়ে এসেছে!
কিছুক্ষণ পর আস্তে আস্তে কাঁপাকাঁপা চোখের পাতা খুলল মেহের। নিচে তাকাতেই দেখে, নিষ্পাপ প্রাণটার কী অপূর্ব সুন্দর দুটো চোখ! ঘন চোখের পাপড়ি জোড়ার মৃদু কম্পন বারবার মেহেরের নজর কাড়ছে। মেহের মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল, কী বলবে —তা যেন ভেবেই পাচ্ছে না।

কেবিনে বেডের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্র একদৃষ্টে মেহেরের দিকে তাকিয়ে খেয়াল করল,মেহেরের চোখ-মুখে প্রশান্তির এক অপার্থিব আভা ফুটে উঠেছে।মেহেরকে এত প্রাণখুলে হাসতে এর আগে কোনোদিন দেখেনি সে।
ঘরের নিস্তব্ধতাটুকু ভেঙে রুদ্র বলে উঠল, “একদম তোমার মতো হয়েছে, তাই না?”
মেহের এবার নিজের কোলজুড়ে থাকা নিজের ছেলেকে নিখুঁতভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। তারপর বুকের আরও কাছে আলতো করে টেনে নিল ওকে। মায়ের শরীরের ওম পেয়ে মেহেরের দিকে নিষ্পাপ প্রাণটা এবার সামান্য একটু চোখ মেলে তাকাল। দেখতে অবিকল মেহেরের মতো হলেও, মেহের যেন সেই ছোট্ট চোখের চাউনিতে বারবার অন্তুকেই দেখতে পাচ্ছে। সাধারণত ছোট বাচ্চাদের গায়ে একটা আলাদা মিষ্টি গন্ধ থাকে। কিন্তু বাচ্চাটাকে কোলে নিতেই মেহেরের মনে হলো, গন্ধটা যেন খুব চেনা। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, অন্তু যেন ঠিক তার পাশেই আছে।

ঠিক তখনই বাচ্চাটা ছোট্ট মুখটা নড়িয়ে, ‘ইম… আহ..পপ….’ করে আস্তে একটা শব্দ করল। হাত-পা নাড়িয়ে ছটফট করতে দেখে বোঝাই যাচ্ছিল, ওর বেশ খিদে পেয়েছে।
মেহের কিছু একটা বলতে গিয়ে রুদ্রর দিকে তাকাল। কিন্তু কথা আর বলা হলো না। ততক্ষণে রুদ্র ধীর পায়ে কেবিনের দরজার দিকে এগিয়ে গেছে। দরজার ধাতব নবটা হাতে ধরে সামান্য ঘুরিয়ে রুদ্র একদম স্বাভাবিক গলায় বলল, “আমি বাইরে আছি, মিস অ্যারোফোবিয়া। ওর খিদে পেয়েছে…” কথাটা বলেই রুদ্র আর কেবিনের ভেতরে এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, সোজা দরজার ওপাশে বেরিয়ে গেল।
রুদ্র কেবিন ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মেহের নিজের ছেলেকে আরেকটু বুকের কাছে টেনে নিল। বাচ্চার গালে নিজের মুখটা ঠেকিয়ে ভেজা গলায় ফিসফিস করে বলল, “হ্যালো লিটল….লিটল চ্যাম্প…”
মায়ের গলার স্বর কান পর্যন্ত পৌঁছাতেই ছেলেটা আবারও নড়ে চড়ে উঠল। মেহের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল, “মাম্মাকে মিস করেছো? মাম্মা তোমাকে অনেক অনেক মিস করেছে সোনা। দেখো, তুমি এখন একদম আমার কোলে! তুমি না দেখতে একদম তোমার মাম্মার মতো হয়েছ, বুঝলে?”
ছেলে যেন মায়ের মুখের কথাগুলো সত্যি সত্যিই বুঝতে পেরেছে…এমন ভঙ্গিতে নিজের ছোট্ট আধো-ফোটা হাতটা মুখের কাছে টেনে চুষতে চেষ্টা করল। মেহের আর নিজেকে সামলাতে না পেরে তার সেই একরত্তি ছোট্ট আঙুলের অগ্রভাগে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। তারপর নিজের হাত দিয়ে পরম যত্নে ছেলের মুখ থেকে আঙুলটা সরিয়ে ওকে ফিড করাতে শুরু করল। ফিড করাতে করাতে মেহের মৃদুস্বরে বলল, “তুমি না দেখতে আমার মতো হলেও, তোমাকে কেমন যেন তোমার বাবার মতোই লাগে…”

কথাটা মুখ থেকে বের হতেই মেহের একটু থমকে গেল। জানালার ওপাশে তাকিয়ে দেখল ধূসর, মেঘলা আকাশটা। বুকের ভেতর থেকে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। ভাঙা, বুজে আসা গলায় জানালার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “দেখো অন্তু, চেয়ে দেখো তোমার ছেলে… আমাদের ছেলে অন্তু! খুব সরি অন্তু, সত্যিই খুব সরি… আজকে তুমি যদি আমাদের পাশে থাকতে, তবে কতই না সুন্দর হতো তাই না? ”
বলতে বলতে মেহের আলতো হাতে নিজের চোখের কোণে জমে ওঠা নোনা জলটুকু মুছে নিল।
অন্যদিকে, কেবিনের ভেতর থেকে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে রুদ্র সোজা হাঁটতে হাঁটতে হাসপাতালের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। চারপাশের ঠান্ডা বাতাসের মাঝেও তার নিজের ভেতরটা কেমন যেন ওলটপালট আর এলোমেলো লাগছে।

ওই পুঁচকে বাচ্চাটার কাছে গেলে তার শক্ত মনটা এত নরম ওঠে কেন? কেন বারবার অবচেতন মনে সে ওকে নিজের ছেলে বলে সম্বোধন করছে? আর কেনই বা মেহেরের জীবনের সব জটিলতা নিয়ে তার মনের ভেতর এত অহেতুক দুশ্চিন্তা ঘুরে বেড়ায়? বুকের ভেতর অজানা কারণে তীব্র অসহায়ত্ব ফুটে উঠছে।
রুদ্র জোর করে দুটো চোখ বন্ধ করে নিজের ভেতরের অবাধ্য অনুভূতিগুলোকে শাসন করল
—’রুদ্র কন্ট্রোল! নিজেকে সামলা, কন্ট্রোল রাখ। মায়াতে জড়াবি না রুদ্র, একদম না। ওরা তো আর সারাজীবন তোর সাথে থাকবে না, কিছুদিন পরই এই দেশ ছেড়ে দূরে চলে যাবে। তখন তোর রাস্তা আলাদা, আর ওদেরও…’
নিজের মনের সঙ্গে চলা অদৃশ্য লড়াইটা লড়তে লড়তেই হঠাৎ রুদ্রর পকেটে থাকা ফোনটা সশব্দে বেজে উঠল।পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে তাকাল সে। ‘বাবা’ লেখাটা ভেসে উঠতে দেখে রুদ্রর প্রথমে ইচ্ছা হলো কলটা কেটে দেবে । কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল, হয়তো জরুরি কোনো প্রয়োজন হতে পারে।
কলটা রিসিভ করে কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে হামজা চৌধুরী ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠলেন, “কী খবর রুদ্র? মেহেরের কী অবস্থা ? ও কেমন আছে?” মেহেরকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে কথাটা শোনার পর থেকেই একটা সুসংবাদের অপেক্ষায় ছটফট করে প্রহর গুনছেন তিনি।
কিন্তু হামজা চৌধুরী কথা শেষ করার আগেই তার হাত থেকে প্রায় ছাঁ মেরে ফোনটা কেড়ে নিলেন রেহানা চৌধুরী। ছেলের অস্থিরতা টের পেয়ে তিনি নিজেই কথা বলতে শুরু করলাম , “কী রে রুদ্র, কথা বলছিস না কেন? কিছু বল ?”

ফোনটা কানে ধরে নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল রুদ্র। ওপাশের প্রতিটি শব্দ যেন তাকে আরও বেশি অসহায় করে তুলছিল।
মা-বাবাকে সে এখন এই মুহূর্তে কী জবাব দেবে? কীভাবে সামলাবে? এই নিষ্পাপ বাচ্চার সাথে যদি এখন থেকে ওনাদের যদি অ্যাটাচমেন্ট তৈরি হয়ে যায়? কিছুদিন পর উনারা যদি আসল সত্যিটা জানতে পারেন… যে এই বাচ্চা আসলে রুদ্রর সন্তান নয়?
তবে তাঁদের ওপর রাগ করার বা দোষ দেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। আনাবিয়াকে হারানোর পর থেকে উনারা সব সময় মনে মনে চেয়ে এসেছেন, চৌধুরী বাড়িতে আবার নতুন কোনো এক বাচ্চার হাসি-কান্না আর দুষ্টুমি ফিরে আসুক।
ওপাশ থেকে রুদ্রর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে, এবার সুলতানা চৌধুরী নিজে ফোনটা হাতে তুলে নিলেন রেহানা চৌধুরীর কাছ থেকে। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “দাদুভাই… মেহের ঠিক আছে তো রে?”
সবার উৎকণ্ঠা যেন মুহূর্তেই আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। রুদ্র এভাবে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেন? বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা কাঁটার মতো বিঁধে উঠল সবার। তবে কি মেহেরের কিছু হয়েছে? নাকি বাচ্চার ? কোনো অপ্রত্যাশিত বিপদ… কিংবা এমন কোনো দুঃসংবাদ, যা বলার ভাষাটুকুও রুদ্র হারিয়ে ফেলেছে?
একসঙ্গে সবার এত প্রশ্নের মুখে পড়ে রুদ্র আর কোনো অজুহাত খুঁজে পেল না। গলা ভারী হয়ে এলো তার, খুব আস্তে করে বলল,

— ছেলে… ছেলে হয়েছে, দাদি।
কথাটা বলেই রুদ্র চুপ করে গেল। যেন ওই কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করতেই তার সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে গেছে। ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। এরপর আর একটি শব্দও তার মুখ দিয়ে বের হলো না।
অন্যদিকে ফোনের ওপাশে মুহূর্তেই যেন সবকিছু বদলে গেল। এতক্ষণের ভয় আর দুশ্চিন্তা নিমেষেই মিলিয়ে গিয়ে চারপাশ ভরে উঠল বাঁধভাঙা আনন্দে। সবাই একসঙ্গে কথা বলতে শুরু করায় কে কী বলছে, তা-ই বোঝা দায়।
এরই মধ্যে হামজা চৌধুরী মায়ের হাত থেকে ফোনটা আলতো করে নিয়ে বলে উঠলেন,

— কিরে, কার মতো দেখতে হয়েছে? আমার মতোই হয়েছে আমার নাতিটা?
রেহানা চৌধুরী পাশে দাঁড়িয়ে এ কথা শুনেই হেসে উঠলেন, “তোমার মতো কেন হতে যাবে?” বলেই ফোনটা নিজের কানের কাছে টেনে নিলেন, “আমার মতো হয়েছে আমার নাতি! তাই না রে রুদ্র?”
রুদ্র ফোনের ওপাশ থেকে পরিবারের মানুষগুলোর আনন্দে ভরা কথাগুলো চুপচাপ শুনছিল। নিচের ঠোঁটটা শক্ত করে কামড়ে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলল সে। কী বলবে, বুঝে উঠতে পারছিল না।
ওপাশ থেকে দাদি আবার হাসতে হাসতেই বলে উঠলেন,
— শোন রুদ্র, আমরা আর ঘরে বসে থাকতে পারছি না। আমরা কাল সকালেই আসব… বুঝলি?
রুদ্র শুধু একটা শুকনো, “হুম” বলল। তারপর আর কিছু না বলে কলটা কেটে দিল।
ফোনটা পকেটে রেখে ধীরে ধীরে নিজের গাড়ির দিকে হাঁটল। গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে কিছুক্ষণ হাত দুটো স্টিয়ারিংয়ে রেখেই চুপ করে বসে থাকল। তারপর ইঞ্জিন স্টার্ট দিল।

মেঘলা এতক্ষণ পর একটু ফ্রি হয়ে বিছানার ওপর পড়ে থাকা ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিন অন করতেই তার চোখ ছানাবড়া! কয়েক ঘণ্টা আগে মেহের তাকে বেশ কয়েকবার কল দিয়েছে।
এতগুলো মিসড কল দেখে মেঘলার মনে খটকা লাগল। মেহের তো এতবার কল দেয় না ! কোনো বিপদে পড়ল নাকি?
ভয়ে মেঘলার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। ঠোঁটে কামড় দিয়ে তাড়াহুড়ো করে সে মেহেরের নম্বরে কল ব্যাক করল। বেশ কয়েকবার রিং হলো, কিন্তু ওপাশ থেকে মেহের ফোনটা ধরল না। এবার মেঘলার মনের ভয়টা আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। চিন্তায় কপালের চামড়ায় ভাঁজ পড়ে গেল তার।
ঠিক তখনই মেহেক পাশ দিয়ে চিপসের প্যাকেট হাতে নিয়ে চিপস চাবাতে চাবাতে হেঁটে যাচ্ছিল। মেঘলার অস্থির মুখ-চোখ দেখে সে দাঁড়িয়ে গেল। একটু বাঁকা হেসে রসিকতা করে বলল, “কী রে আপু, কী হয়েছে? ভাইয়া বকা দিয়েছে নাকি, হুম?”

মেঘলা মেহেকের কথা শুনে প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে ঝেঁঝে উঠল, “একদম পাকা পাকা কথা বলবি না! মেহের কতগুলো কল দিয়েছিল দেখ। আর এখন কল করছি তো ধরছেই না, কল কেটে দিচ্ছে ”
কথাটা শেষ হতে না হতেই মেঘলার হাতে থাকা ফোনটা সশব্দে বেজে উঠল। স্ক্রিনে মেহেরের নাম।
মেহের এতক্ষণ ইচ্ছে করে মেঘলার কল কাটছিল, কারণ তার কোলজুড়ে থাকা তার ছেলেটা মাত্রই ঘুমে কাদা হয়েছে। এক হাতে ছেলেকে ধরে রেখে অন্য হাতে ফোন রিসিভ করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না।
মেঘলা এক মুহূর্ত দেরি না করে তড়িঘড়ি করে ফোনটা কানে তুলল। অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, “কী রে মেহু, কল ধরছিস না কেন? কী হয়েছে তোর?”
মেহের ওপাশ থেকে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “আপনি খালা হয়ে গেছেন।”
মেহেরের কথাটা মেঘলা ঠিকমতো বুঝে ওঠার আগেই পাশ থেকে মেহেক চিৎকার করে উঠল, “কী! মেহের আপুর বেবি হয়েছে? ইয়াহ্!”
মেঘলা মেহেকের বাহুতে আলতো করে একটা চাপড় মেরে থামিয়ে দিল। তারপর ফোনের দিকে মুখ এনে ব্যাকুল হয়ে বলল, “ঠিক করে বল মেহের, কী বলছিস এসব?”
মেহের ওপাশ থেকে হালকা হেসে বলল, “আপু, আপনি খালামণি হয়েছেন আর আমি মা!”
মেঘলা যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। স্তম্ভিত হয়ে শুধাল, “তুই সত্যি বলছিস?”

— “হুম…”
মেঘলা এবার আনন্দে প্রায় চিৎকার করে উঠল, “কখন? কীভাবে হলো?”
“কয়েক ঘণ্টা আগে…”
“ছেলে না মেয়ে?”
“ছেলে…”
মেঘলা যেন আর নিজেকে সামলাতে পারল না, “কার মতো দেখতে হয়েছে রে?”
—– “সামনাসামনি দেখে বলবি কার মতো হয়েছে,আমি এভাবে বলবো না !”
মেঘলা অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, “তাড়াতাড়ি ছবি দিবি কিন্তু! ইস… আমি খালামণি হয়ে গেছি! কত যে খুশি লাগছে আমার!”
মেহের হেসে উঠলো মেঘলার কথা শুনে , “জি না! আপনি মামি হয়েছেন…”
“আমি ওসব জানি না, আমি খালামণিই হয়েছি!”
ঠিক তখনই ঘুম ভেঙে গিয়ে মেহেরের ছেলে কান্না জুড়ে দিল। বাচ্চার তীব্র কান্না কানে আসতেই মেহের তাড়াহুড়ো করে বলল, “তুই… না,শুন, পরে কল দিচ্ছি। ছেলে উঠে গেছে…”

—–“এই, ছবি পাঠাবি কিন্তু…”
“আচ্ছা, রাখ রাখ…” বলেই মেহের দ্রুত কলটা কেটে দিল।
মেহেরের দিক থেকে ফোনটা কেটে যাওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ ঘরের পরিবেশ একদম নিস্তব্ধ হয়ে রইল। মেঘলা আর মেহেক স্তব্ধ হয়ে হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের দুজনেরই যেন মস্তিষ্কে তথ্যটা পৌঁছাতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল!
পরমুহূর্তেই ঘরের নীরবতা ভেঙে দুজন একসঙ্গে আনন্দে চিৎকার করে উঠল, “ইয়েই… খালা হয়ে গেছি! আমরা খালা হয়ে গেছি!”

তাদের বাঁধভাঙা চিৎকারে মুহূর্তেই পুরো বাড়ি মাথায় উঠে গেল। ড্রয়িংরুম আর হলঘরে থাকা সবাই চমকে উঠে যে যার কাজ ফেলে প্রায় দৌড়ে চলে এলো। হঠাৎ এমন কী হলো, যে দুই মেয়ে এভাবে চিৎকার করছে?
সায়দ কামিনী করিডোর ধরে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে বেশ চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে? তোরা এভাবে চিল্লাচ্ছিস কেন? কী হয়েছে মেঘলা?”
মেহেক ততক্ষণে আনন্দে আত্মহারা। নিজের ভেতরের উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে না পেরে চিৎকার দিয়ে বলল, “মেহের আপু মা হয়ে গেছে বড় মা ”
কথাটা শুনে সায়দ কামিনী যেন কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলেন। বিশ্বাসই হচ্ছিল না। কয়েক সেকেন্ড কোনো কথাই বলতে পারলেন না। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সায়দ ইমরানের মুখেও ধীরে ধীরে স্বস্তির একটা হাসি ফুটে উঠল।
নিজেকে সামলে নিয়ে সায়দ কামিনী তাড়াতাড়ি মেঘলার কাছে এগিয়ে এলেন।

— কবে হলো? কখন?
মেঘলা একবার ওনার দিকে তাকাল। তারপর আবার চোখ সরিয়ে নিল,” এই তো… একটু আগে।”
সায়দ কামিনীর সাথে আর কোনো কথা বাড়ানো ইচ্ছা ছিল না মেঘলার। সে আর কিছু না বলে সোজা নিজের রুমের দিকে হাঁটা দিল।
মেঘলার অনাগ্রহটা সায়েদ কামিনীর চোখ এড়াল না। তবে তিনি সেদিকে বিশেষ পাত্তা দিলেন না। তাঁর ধারণা, এই সন্তান রুদ্র আর মেহেরেরই।
তিনি ঘুরে সায়েদ ইমরান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
— শুনছো? মেহেরের শ্বশুরবাড়িতে এখনই মিষ্টি পাঠাতে হবে। দাঁড়াও, আগে বাড়ির সবাইকে সুখবরটা জানিয়ে আসি।
কথা শেষ করেই তিনি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। তাড়াতাড়ি বাড়ির অন্যদের খবরটা জানাতে চলে গেলেন।

সায়েদ ইমরান চৌধুরী অবশ্য স্ত্রীর কথার কোনো জবাব দিলেন না। শুধু চুপচাপ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। সত্যিটা একমাত্র তিনিই জানেন, এই সন্তান রুদ্রর নয়, অন্তুর।
তবু একজন বাবার মন তো যুক্তির হিসাব মানে না। নিজের মেয়ের কোল আলো করে একটা নতুন প্রাণ এসেছে…এই ভাবনাটুকুই তাঁর মুখে একটুকরো হাসি এনে দিল। মনে মনে ঠিক করলেন, একটু পর মেহেরকে ফোন করবেন। মেয়েটার শরীরের খবর নেবেন…..আবার মনে শঙ্কা জাগল—মেহের যদি ফোন না তোলে?
অন্য দিকে,
রুদ্রর গাড়ি এসে থামল ‘শান্তি নীড়’–এর সামনে। মনের ভেতর যখনই তোলপাড় শুরু হয়, তখনই সে এই জায়গাটাতে ছুটে আসে।
ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত আটটা বাজতে চলল। গাড়ি থেকে নেমে রুদ্র সোজা হেঁটে চলে গেল মাদার ডি’সুজার অফিস রুমের দিকে।
মাদার ডিসুজা ওনার অফিসে বসে কিছু দরকারি ফাইল গোছাচ্ছিলেন। এমন সময় রুদ্র দরজায় এসে দাঁড়াল। রুদ্রের দিকে তাকাতেই মাদার খেয়াল করলেন—রুদ্রকে বেশ বিধ্বস্ত লাগছে, হাঁটার মধ্যেও কেমন যেন দিকবিদিক শূন্য ঢলে পড়ার ভঙ্গি।

মাদার ডিসুজা নিজের ফাইলগুলো টেবিলে রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন, “হ্যালো বার্থডে বয়! ভাবছিলাম প্রতি বছর তো আসো, এবার কেন এলে না…”
রুদ্র একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। নিজের জন্মদিনের কথা সে নিজেই ভুলে গিয়েছিল! আজ ২৯শে নভেম্বর—তার জন্মদিন। ভাগ্যের কী অদ্ভুত পরিহাস! আজকেই আবার তার জীবনে নতুন খুদে মেহমানের এলো ।
রুদ্র টেবিলের সামনের চেয়ারটিতে কিছুটা ভারাক্রান্ত মনে ধপ করে বসে পড়ল। “আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম মাদার, আজ যে আমার জন্মদিন…”
মাদার ডিসুজা ধীরপায়ে রুদ্রর কাছাকাছি এগিয়ে এলেন। রুদ্রর চেহারা আর চোখের মানসিক ক্লান্তি দেখে চিন্তিত গলায় বললেন, “কী হয়েছে রুদ্র? কোনো কিছু নিয়ে খুব ভাবছ মনে হচ্ছে?”
রুদ্র বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বুকের মধ্যে চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাসটা কোনোমতে সামলে নিয়ে বলল,

“মেহেরের ছেলে হয়েছে…”
মাদার ডিসুজা কথাটা শুনে একমুহূর্ত থমকে দাঁড়ালেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, “খুব ভালো খবর! মাই বয়, তুমি তাহলে বাবা হয়ে গেলে! কিন্তু ‘মেহেরের ছেলে’ বলছ কেন, তোমার ছেলে বলবে না?”
রুদ্র নিজের মাথাটা ওপর-নিচ করল। মেহের আর তার বৈবাহিক সম্পর্কের পেছনের জটিল সত্যটুকু সে কারো কাছে এভাবে বলতে চায় না সে। শুধু একটা অস্পষ্ট শব্দ উচ্চারণ করল,
“হুম…”
মাদার ডিসুজা পাশে থাকা আরেকটা চেয়ার টেনে এনে রুদ্রর কাছে বসলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “কোনদিন ?”

—–“আজকে…”
—-“২৯শে নভেম্বর! আজ তো তোমারও জন্মদিন, তাই না?”
রুদ্র নিঃশব্দে মাথা নাড়ল।
মাদার একটু হালকা হেসে বললেন, “বাহ্! বাবা আর ছেলের একদম একই দিনে জন্ম? ভালো হলো, টাকা বাঁচবে—একটা কেক কিনলেই দুজনের হয়ে যাবে!”
কথাটা শুনে রুদ্রর ঠোঁটের কোণে সামান্য একটু ফিকে হাসি ফুটে উঠে আবার মিলিয়ে গেল।
মাদার ডিসুজা নিজের হাতটি রুদ্রের মাথায় রাখলেন। “কিসের এত দ্বিধা রুদ্র? এত দুশ্চিন্তা কিসের?”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৩ (২)

রুদ্র বুকভরা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অসহায় কণ্ঠে বলল, “মাদার, আমি আসলে কী করব কিছু বুঝতে পারছি না। আমার কাছে চারপাশের সবকিছু এলোমেলো লাগছে… আচ্ছা, নিজের একটু খুশি চাওয়া কি খুব ভুল?”
মাদার ডিসুজা ধীরভাবে মাথা নাড়লেন, “না, ভুল কেন হতে যাবে? নিজের জন্য একটু সুখ চাওয়া কোনো ভুল কাজ নয়।”
রুদ্র নিজের ঠোঁটে কামড় দিয়ে চুপ করে রইল।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৫