Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪
মারিয়াম ফুল

একতলায় যখন এই আলোচনা চলছে, দোতলায় দাদির ঘরে তখন ডক্টর ইমতিয়াজ সাথে কথা চলছে। ডক্টর ইমতিয়াজ আহমেদ শুধু একজন চিকিৎসক নন, চৌধুরী পরিবারের যেকোনো বিপদে-আপদে তিনি বড় ভাই বা অভিভাবকের মতো পাশে থাকেন। সুলতানা চৌধুরীর বিয়ের তাড়ানি শুনে ডক্টর ইমতিয়াজ ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ নীরব থেকে গম্ভীর স্বরে বললেন, সায়েদ ইমরানের ছোট মেয়ে মেহের। কিন্তু খালাম্মা, মেয়েটা তো রুদ্রর ঠিক উল্টো মেরুর! ভীষণ চঞ্চল, একদম টর্নেডোর মতো। আপনি কি ওকে চিনতে পারছেন? ওই যে আমার মেজো মেয়ে আহিয়ার বিয়েতে যে মেয়েটা পুরো বাড়ি মাতিয়ে রেখেছিল!
সুলতানা চৌধুরী প্রথমে একটু ভাবলেন, তাঁর চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠিক করে নিয়ে স্মৃতির পাতায় ডুব দিলেন। ডক্টর ইমতিয়াজ এর মেজো মেয়ে আহিয়ার সাথে সায়েদ ফ্যামিলির ঘনিষ্ঠতার সুবাদে বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে তাদের। হঠাৎ একটা বিশেষ মুহূর্ত মনে পড়তেই সুলতানা চৌধুরীর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি উৎসাহিত হয়ে বললেন,

ইমতিয়াজ ! ওই মেয়েটা না? আহিয়ার বিয়ের রাতে আমার সুগার যখন হুট করে ফল করল, সবাই যখন প্যানিক করছিল তখন ওইটুকু একটা মেয়ে কোত্থেকে যেন দৌড়ে এসে আমার মুখে একটা চকলেট গুঁজে দিল!
বিকেলের ম্লান আলোয় তাঁর মুখে এক চিলতে বিজয়ের হাসি। তিনি মনে মনে বললেন, “রুদ্র, তুই ভেবেছিস ১০ দিনে মেয়ে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব? তোর দাদি যে তোর চেয়েও জিদে কম না, সেটা তুই ভুলে গেছিস। তুই যেমন ডানপিটে, আমি কি তার চেয়ে কম নাকি?”
তিনি আবার ফোনটা তুলে ডক্টর ইমতিয়াজ বললেন, “শোনো ইমতিয়াজ , তুমি আজই ওর মা-বাবার সাথে কথা বলো। মেহেরকে আমার ভীষণ পছন্দ। দেরি করা যাবে না।”
ডক্টর ইমতিয়াজ আশ্বস্ত করলেন, “ঠিক আছে খালাম্মা। আমি আজই ইমরানের সাথে কথা বলছি।”
সিলেটের সায়েদ ভিলা…

মেহের নিজের রুমে জানালার গ্রিল ধরে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিমানে সেই ‘স্টুপিড’ লোকটার সাথে বিশ্রী ধাক্কাধাক্কির স্মৃতিটা মনে পড়তেই তার শরীর ঘিনঘিন করে উঠল। হঠাৎ পাকস্থলী উল্টে এক তীব্র বমিভাব এল তার। মেহের সামলাতে পারল না, এক দৌড়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
বেশ কয়েকদিন ধরেই তার এই অবস্থা ঘনঘন বমি, অসহ্য মাথা ঘোরা আর সারাক্ষণ ক্লান্তিবোধ। মেঘলা তখন রুমে ঢুকল। গত কয়েকদিন ধরে সে মেহেরকে খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করছে। মেহেরের এই আকস্মিক ‘মুড সুইং’ আর শারীরিক পরিবর্তন মেঘলার মনে এক ভয়ংকর আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
মেহের মুখ ধুয়ে বেরিয়ে আসতেই মেঘলা তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিচু কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বরে প্রশ্ন করল,
“মেহের, তুই কি অন্তু ভাইয়ের কোনো খবর পেয়েছিস? লোকটা কি তোকে কোনোভাবে ঠকাচ্ছে?
মেহের যেন বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে মেঘলার কথায় বাধা দিল। ধমকে উঠে বলল, “মেঘলা… তুই কী বলতে চাস? অন্তু আমাকে কেন ধোঁকা দেবে?”

মেহের এর এরকম দমকে উঠাতে মেঘলা ভয় পেয়ে উঠলো আকস্মিক। অন্তু আর মেহেরের পরিচয় কলেজ ক্যাম্পাসে। অন্তু মেহেরের এক বছরের সিনিয়র ছিল । অন্তুর পৈত্রিক নির্বাস ছিল চট্টগ্রামে। সে তার নানার বাড়িতে থেকে অর্থাৎ সিলেটে পড়াশোনা করত। সায়েদ পরিবারের জৌলুসের তুলনায় অন্তুরা কিছুই ছিল না, কিন্তু আবেগপ্রবণ মেহের তখন কোনো বৈষম্য বোঝেনি।
মেহের খুব কট্টর ধার্মিক ছিল না। সে ছিল লিবারেল মুসলিম। তবু তার ভেতরে হারাম হালালের সীমারেখা মানার এক নীরব চেষ্টা সবসময়ই ছিল। সেই বিশ্বাস থেকেই একদিন হঠাৎ তার মনে হয়েছিল এই সম্পর্ককে আর এভাবে টেনে নেওয়া ঠিক নয়। অনেক দ্বিধা আর অদ্ভুত এক কষ্ট বুকে নিয়েই সে অন্তুকে বলেছিল,
অন্তু, এই সম্পর্কটা এভাবে এগিয়ে নেওয়া আমার পক্ষে আর সম্ভব না।
মেহেরের সেই কথাটা যেন অন্তুর ভেতরের পৃথিবীটাকেই কাঁপিয়ে দিয়েছিল। অন্তুরও বয়স কম ছিল। আবেগের বশে মেহেরকে বিয়ে করার কথাটাই তার মাথায় তখন প্রথম আসে। প্রায় উন্মাদের মতো করেই সে মেহেরকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মেহেরও তখন ভেবেছিল বিয়ে করলে অন্তত তাদের সম্পর্কটা হালাল হবে। পরিবারের অমতে হলেও অন্তত তারা কোনো পাপের পথে হাঁটছে না।

আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে। বয়স কম থাকার কারণে ঠিক ভুলের হিসাব কিংবা দুনিয়াদারির জটিলতা সম্পর্কে মেহের তখনও ভীষণ অজ্ঞ। ভালোবাসা আর বিশ্বাসের সরল ভরসায়, মেঘলাকে সাক্ষী রেখে তারা গোপনে বিয়ে করেছিল। সিদ্ধান্ত ছিল দুজনেই আগে নিজেদের মতো করে প্রতিষ্ঠিত হবে, তারপর একদিন সাহস করে সবকিছু জানাবে পরিবারকে।

কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে অন্তু যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। তার ফোন বন্ধগতকাল অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই মেহের ছুটে গিয়েছিল চট্টগ্রামে, অন্তুর খোঁজে। অথচ সেখানে গিয়ে সে যেন এক অদ্ভুত শূন্যতার মুখোমুখি হয়েছে।
মেঘলার সন্দেহভরা কথাগুলো শুনে মেহেরের বুকটা কেঁপে উঠেছিল। তবু সে নিজের মনকে বারবার বোঝাচ্ছে অন্তু তাকে ধোঁকা দিতে পারে না। এক বছরের যত্নে গড়া বিশ্বাস, ভালোবাসা আর স্বপ্নের ছোট্ট সংসার কি সত্যিই স্রেফ একটা অভিনয় ছিল?

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩

মেহেরের চোখে নোনা জল টলমল করছে। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা জমে আছে, সে জানে না তার অজান্তেই তার ভেতরে নীরবে বেড়ে উঠছে আরেকটি প্রাণ।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here