Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৫

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৫

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৫
মারিয়াম ফুল

মেহেরের হাতের মুঠোয় ধরা ছোট্ট একটি প্লাস্টিকের স্ট্রিপ। সাদা রঙের সেই তুচ্ছ বস্তুটি যেন এই মুহূর্তে মেহেরের সাজানো পৃথিবীর ভারসাম্য ওলটপালট করে দিচ্ছে। এটি একটি প্রেগন্যান্সি কিট।
একজন নারী তার শরীরের প্রতিটি সূক্ষ্ম পরিবর্তন সবার আগে নিজেই টের পায়। গত কয়েকদিন ধরে মেহেরের কাছে সবকিছুই অন্যরকম লাগছিল। অকারণে মাথা ঘোরা, গন্ধে অস্বস্তি আর পাকস্থলী উল্টে আসা সেই অসহ্য বমিভাব ভেতরের সংশয়টা আজ এক ভয়াবহ বাস্তবতায় রূপ নিল। ঝাপসা চোখে কিটটার দিকে তাকাল সে। দুটি লাল রেখা স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে।
মেহের স্তব্ধ হয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। এই মুহূর্তে তার আনন্দিত হওয়ার কথা ছিল, যদি পাশে অন্তু থাকত। কিন্তু এখন এই ভ্রূণ তার কাছে এক বিশাল দায়ভার। মেহেরের সারা শরীর হিম হয়ে আসছে। ঠিক তখনই দরজায় সজোরে করাঘাত হলো। মেহের চমকে উঠে তড়িঘড়ি করে কিটটা ওড়নার নিচে লুকিয়ে ফেলল। দরজার ওপাশে তার মা সায়েদ কামিনী দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে সবসময়ই এক ধরণের শাসন আর কাঠিন্য লেগে থাকে। তিনি তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকলেন

“মেহের! ভেতরে কী করছিস এতক্ষণ? নিচে আয়। তোর বাবা ডাকছে তোকে। ড. ইমতিয়াজ এসেছেন… তাড়াতাড়ি আয় তো,”
বলে সায়েদ কামিনী চলে গেলেন। মেহেরের গলায় কথা আটকে গেল। মেহের তড়িঘড়ি করে প্রেগন্যান্সি কিটটা সরিয়ে রাখল, যাতে কেউ সেটা না পায়। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে যন্ত্রের মতো মায়ের পিছু পিছু নিচে নামল সে।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই মেহের দেখল পুরো ড্রয়িং রুম যেন কোনো উৎসবের সাজে সেজেছে। মেহের ভেবেছিল ডক্টর ইমতিয়াজকে হয়তো দেখতে পাবে, কিন্তু ড্রয়িং রুমে উঁকি দিয়ে দেখল তিনি ততক্ষণে চলে গেছেন। রয়ে গেছে শুধু একরাশ খুশির গুঞ্জন।
সিলেটের অন্যতম ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী পরিবার হিসেবে সায়েদ ভিলার প্রতিটি আসবাবপত্রে আভিজাত্যের ছাপ। বড় ভাই সায়েদ মির্জা গম্ভীর মুখে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। মেহের নিচে আসতেই তার চাচাতো বোন মিনহা খুশিতে প্রায় আধখানা হয়ে দৌড়ে এল। মেহেরের মুখে জোর করে মিষ্টি গুঁজে দিয়ে চিৎকার করে বলল,

“মেহের আপু, কংগ্রাচুলেশনস…তোমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে! তাও কার সাথে জানো? সেই হিরো ক্যাপ্টেন রুদ্রর সাথে ”
মেহেরের কানে যেন কেউ তপ্ত সীসা ঢেলে দিল। সে বিস্ময়ে স্থবির হয়ে গেল। তার বড় বড় চোখ জোড়া অবিশ্বাসে স্থির।
“বিয়ে? আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে মানে কী?”
মেহেরের অবাক হওয়া দেখে ড্রয়িং রুমে হাসির রোল পড়ল। তার ভাবি নূর এগিয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরল। মেহের আর নূরের সম্পর্কটা বন্ধুর মতোই। নূর ফিসফিস করে বলল, “অবাক হওয়ারই কথা রে! এমন রাজপুত্রের মতো বর কি আর সবার কপালে জোটে?”
মেহের ভাবির চোখের দিকে তাকাতে পারল না। তার মাথা ঝিমঝিম করছে। সায়েদ ইমরান সাহেব আদুরে মেয়ের মাথায় হাত রেখে খুব নরম গলায় বললেন, রুদ্র যেমন সাহসী, তেমনই প্রতিষ্ঠিত।
আমি চাই তুই সুখে থাকিস।বাবার এই পরম মমতা মেহেরের সহ্য হলো না। সে বাবার বুকে আছড়ে পড়ে আর্তনাদ করে উঠল, “বাবা… আমি এই বিয়ে করতে পারব না। ”

ইমরান সাহেব হাসলেন। তিনি ভাবলেন মেয়ে হয়তো হুট করে বিয়ের খবর শুনে ঘাবড়ে গেছে। কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সায়েদ কামিনীর তীক্ষ্ণ চোখ মেহেরের অস্থিরতা ধরে ফেলল। তিনি এক পা এগিয়ে এসে কড়া গলায় বললেন, “নাটক বন্ধ কর মেহের। কেন করবি না শুনি? কী সমস্যা তোর?”
মেহের এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। মেহের বাবার বুক থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ালো… সবার দিকে কাঁপা কাঁপা দৃষ্টিতে তাকালো। চোখ বুজে হাতের মুঠো শক্ত করে বলে উঠল…

“বাবা… আমি বিবাহিত।”
পুরো ড্রয়িং রুমে যেন মুহূর্তের মধ্যে উত্তর মেরুর শীতলতা নেমে এল। মিনহার হাতের মিষ্টির প্লেটটা কার্পেটে পড়ে গেল। সায়েদ কামিনী এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। তিনি সজোরে মেহেরের গালে একটি চড় বসিয়ে দিলেন। থপ করে একটা শব্দ হলো। মেহের ছিটকে সোফার ওপর পড়ে গেল।
কামিনী বেগমের গলার স্বর রাগে কাঁপছে, “হারামজাদী…. কার কথা বলছিস তুই? কার জন্য আমাদের মুখ পুড়িয়েছিস?”

মেহের মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে উঠে বলল, “আমি অন্তুকে বিয়ে করেছি। এক বছর আগে।”
বড় ভাই সায়েদ মির্জা চুপ ছিলেন, কোনো কথা বলল না, শুধু তার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে উঠল। তার চোখের দৃষ্টিতে বোনকে বাঁচানোর আকুতি নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত শীতল ঘৃণা। মির্জার এই মৌনতা মেহেরকে চড়ের চেয়েও বেশি ভয় পাইয়ে দিল।
সায়েদ ইমরান সাহেব ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন। তাঁর দীর্ঘদিনের কামানো সম্মান যেন ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। তিনি দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর খুব ভারী গলায় বললেন,

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪

“সেই ছেলেটাকে বলো, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যেন আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। যদি সে না আসে… তবে মনে রেখো মেহের, তোমার এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত তোমাকে আমাদের মতেই করতে হবে। চৌধুরী পরিবারকে ‘না’ বলার ক্ষমতা আমার নেই।”
নূর ভাবি মেহেরের পাশে এসে বসল ঠিকই, কিন্তু তাঁর ছোঁয়াতে আগের মতো সেই উষ্ণতা ছিল না। মেহের ডুকরে কেঁদে উঠল। অন্তুর ফোন বন্ধ, আর তার ভেতরে বাড়ছে সেই ‘প্রাণ’, যা তাকে প্রতি মুহূর্তে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here