Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ২৮

খান সাহেব পর্ব ২৮

খান সাহেব পর্ব ২৮
সুমাইয়া জাহান

কেবিনের বেডে শেরাজ চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। রাহিন আর আইয়ুব পাশে বসে আছে। ডাক্তার বলেছেন, পেশেন্টকে দিয়ে বেশি কথা না বলাতে। আইয়ুব আর রাহিন হিংস্র দৃষ্টিতে শেরাজের শুকিয়ে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে আছে। অসুস্থ না হলে হয়তো এখনই ওর দুজন তাকে কাঁচা তেল, মশলা ছাড়াই গিলে ফেলত। ডাক্তারের বারণ অমান্য করে রাহিন আর আইয়ুব এতক্ষণে শেরাজকে হাজারটা প্রশ্ন করে ফেলেছে। কিন্তু, শেরাজ না ওদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, আর না ওদের দিকে একবারের বেশি চোখ মেলে তাকিয়ে দেখেছে।
আইয়ুব এতক্ষণ চুপ করে থেকে মুখ খুলে আবারও বলল,

“সকাল থেকে আঙ্কেল অনেক বার ফোন করেছে। তোর সাথে কথা বলতে চেয়েছে। আমরা অনেক কিছু বলে ম‍্যানেঞ্জ করে রেখেছি। আচ্ছা, তুই বল তো এস.কে! আঙ্কেল যদি শুনত, যে তার বড় ছেলে শেরাজ খান বাহাদুরখেল একটা মেয়ের ওপর রাগ করে কার এক্সিডেন্ট করে হসপিটালের বেডে পড়ে আছে, এমন নিউজ কি আঙ্কেল কোনোদিনও বিশ্বাস করত?”
শেরাজ চোখ খুলে আইয়ুবের দিকে তাকাল। সে গলার স্বর আস্তে করে বলল,
“মেয়ে নয়” বউ বল। ও আমার বউ। আর আমি যার তার ওপর রাগ করিনি। আমি আমার পার্সোনাল প্রপার্টি, আমার বউয়ের ওপর রাগ করেছি।”
রাহিন রেগে বলল,
“সব বুঝলাম তোর কথা। তুই আমাকে আগে এইটা বল, আমাকে পানি আনতে বলে তুই কেনো গাড়ি নিয়ে চলে গেলি?”
“তুই আমাকে অনেক বিরক্ত করছিলি। তাই পানি আনার কথা বলে তোকে সরাতে হয়েছে।”
রাহিন গর্জে উঠে বলল,
“শা*লা তোকে এক্সিডেন্টের হাত থেকে বাঁচানোর জন‍্য বিরক্ত করছিলাম, যাতে তুই এক্সিডেন্ট করে মরতে না পারিস।”
আইয়ুব তেঁতে উঠে বলল,

“তোর যখন এতোই মরার শখ, তাহলে আমাদের বলতি। আমরা পার্টি থ্র করে তোকে খুব সুন্দর মৃত্যু দিতাম। শুধু শুধু এতো কষ্ট কেনো করতে গেলি?”
আইয়ুবের কথাশুনে শেরাজ আলতো হেসে বলল,
“আমার পাগলীটা কই রে? এখনো আসেনি নাকি?”
শেরাজের কথার মধ্যে কেবিনে ঢুকলো সারবাজরা। সারবাজ কেবিনে ঢুকেই তেড়ে এলো শেরাজের দিকে। সে শেরাজের গলা আলতো করে চেপে ধরে বলল,
“কুত্তার বাচ্চা, মরার অনেক শখ তোমার তাইনা? দুনিয়া থেকে মন ভরে গেছে, তাইনা? বেশি বড় হয়ে গেছো তুমি? এই কাজটা করার আগে একটা বার আমাদের কথা ভাবিসনি, তাইনা?”
স‍্যান্ডি দৌড়ে এসে বলল,
“আরে, আরে কি করছেন? আমার স‍্যার তো মরে যাবে। সারবাজ স‍্যার! ছেড়ে দিন আমার স‍্যারকে।”
শেরাজ হেসে বলল,
“ওর এই ছোঁয়ায় আমি কেনো, সামান্য একটা পিঁপড়াও মরবেনা, সান। সারবাজ ধরেছিস যখন একটু জরেই টিপে ধর। একটু মৃত্যুর স্বাদ বুঝে আসি। বিলিভ মি, তখন সেন্সলেস ছিলাম বলে, একটুও বুঝতে পারিনি মৃত্যুর স্বাদ কি।”
সারবাজ কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললো। সে ছেড়ে দিলো শেরাজের গলা। শেরাজ বারবার কেবিনের দরজার দিকে তাকাচ্ছে। অমিত সারবাজের কাছে এসে বলল,

“ভাবিজি! বাহিরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা এখন বাহিরে যায়। ওদের এখন একটু প্রাইভেসি দরকার।”
অমিতের কথায় সম্মতি জানিয়ে সারবাজ সবাইকে নিয়ে বাহিরে চলে গেল। সকলে বের হবার পাঁচ মিনিট পর সুমু নিঃশব্দে কেবিনে ঢুকলো। শেরাজ মাথার ওপর বা’হাত তুলে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। সুমু গিয়ে শেরাজের পাশে বসল। তার উপস্থিতি টের পাওয়ানোর জন‍্য দুবার গলা খাঁকি দিয়ে আওয়াজ করল। তবুও শেরাজ কোনো রেসপন্স করল না। ওভাবেই চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। সুমু শেরাজের বুকের ওপর হাত রেখে দুবার “খান সাহেব” বলে ডাক দিল। শেরাজ তবুও চোখ মেলে তাকাল না। সুমু হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। হঠাৎ সুমুর চোখ গেল খাবারের প‍্যাকেটটার দিকে। প‍্যাকেট থেকে টিফিন বক্স বের করে সে টাসটুস শব্দ করে রাখল। এতেও শেরাজের মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা গেল না। সুমু বাধ‍্য হয়ে শেরাজের অধর কামড়ে ধরল। সুমুর কান্ডে শেরাজ চোখ বড় বড় করে তাকাল। তবে সুমুকে সরাল না। শেরাজ রেসপন্স করছে না বলে, সে আরও জোরে কামড় ধরল শেরাজের অধর। অধর কেটে ব্লাড বেরিয়ে এলো। হঠাৎ কেবিনের দরজা খোলার শব্দ পেয়ে শেরাজ সুমুকে টেনে সরাল। সুমু পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখল নার্স এসেছে। হাতে মেডিসিনের ট্রে। নার্সকে দেখে সুমু শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজের ঠোঁটে ওপর ব্লাড দেখে আঁতকে উঠল সে। শেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে সুমুর দিকে। নার্সের চোখ থেকে আড়াল করার জন‍্য সে শেরাজের ঠোঁটের ওপর আলতো করে হাত রাখল। ঢেকে রাখল কেটে যাওয়া জায়গাটা। নার্স মেডিসিনের ট্রে’টা টেবিলের ওপর রাখল। সুমুর দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যেতেই, শেরাজের ঠোঁটের ওপর সুমুর হাত দেখে জ্বলে উঠল নার্স। সে দাঁতে-দাঁত চেঁপে বলল,

“ম‍্যাম! স‍্যারের মেডিসিনগুলো। ডাক্তার আমাকে বলেছেন, আপনাকে সব বুঝিয়ে দিতে।”
নার্সের কথার ধরণ শুনে সুমু অবাক হয়ে নার্সের দিকে তাকাল। নার্সটি যেন কেমন নির্লজ্জ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শেরাজের দিকে। শেরাজ চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। সুমু, শেরাজের ঠোঁটের ওপর থেকে হাত সরিয়ে টেবিলের ওপর রাখা ফলের প্লেট থেকে ছুরি হাতে তুলে নিয়ে দাঁড়াল। ছুরিটা নার্সের চোখের সামনে নিয়ে ভালো করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল। তারপর হাতে একটি আপেল তুলে নিয়ে ছুরিটা আপেলের মধ্যে গেঁথে দিয়ে বলল,
“আচ্ছা সিস্টার! আমি যদি ঠিক এইভাবে কারো পেটের মধ্যে এই ছুরিটা গেঁথে দেই, তাহলে তার বেঁচে থাকার সম্ভবনা কতো পার্সেন্ট থাকবে?
নার্সটি ভয়ে ঢোক গিলে বলল,

“আ…আসলে ম‍্যাম! আমি…”
“আপনার এইখানে কাজটা কি?”
“আপনাকে মেডিসিনগুলো বুঝিয়ে দেওয়া।”
“গুড! তাহলে এদিক ওদিক চোখ না দিয়ে, যেটা করতে এসেছেন সেটা করেন। আর নিজের নির্লজ্জ চোখ দুটোকে একটু সামলে রাখার চেষ্টা করেন। আসলে কি বলুন তো, আমার এই হাত দু টো খুব কন্ট্রোললেস। কখন, কাকে, কীভাবে, কি দিয়ে আঘাত করে বসে, তা আমি নিজেও বলতে পারিনা।”
সিস্টার ভয়ে কোনোমতে মেডিসিনগুলো বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেল। সিস্টার যেতেই সুমু আবারও শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ তখন চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। সুমুর মেজাজ আবারও গরম হলো। সে আবারও একই কাজ করতে গেলে শেরাজ সুমুকে আটকালো। সে চোখ মেলে সুমুর দিকে তাকিয়ে রইলো। সুমু রেগে বলল,
“আপনি কি বোবা হয়ে গেছেন? কথা বলছেন না কেনো? আপনার জন‍্য খাবার এনেছি। খেয়ে মেডিসিন খেতে হবে আপনাকে।”
শেরাজ হাতের ব‍্যথা নিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে বলল,

“ডাক্তার বলেছে, আমার সাথে বেশি কথা না বলতে। পেশেন্টের সামনে বেশি কথা বলা যাবেনা।”
“ঠিক আছে! কথা বলব না। চলুন উঠুন, খেয়ে নিবেন।”
“আমি তোমার হাতে খাব না।”
সুমু অবাক হলো ভীষন। সে কপাল কুঁচকে বলল,
“কেন? আমার হাত কি পচে গেছে? আমার হাতে খাবেন না, তো কার হাতে খাবেন?”
শেরাজ ফিরে তাকাল সুমুর দিকে। নরমস্বরে বলল,
“এই হসপিটালে সব থেকে সুন্দরী নার্সকে খুঁজে নিয়ে এসো। আমি তার হাতেই খাব।”
সুমু আবারও ছুরিটা হাতে নিয়ে এগিয়ে গেল শেরাজের কাছে। শেরাজ সুমুর হাতে ছুরি দেখে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ছুরি দিয়ে কি হবে?”
“আপনার ঠোঁট জোড়া কাটব। আপনার সাহস কি করে হয় অন‍্য মেয়ের কথা বলার?”
“ভুল কি বলেছি? তুমি তো আমার ভালোবাসার দিক আঙুল তুলেছো।”
দাঁড়িয়ে পড়ল সুমু। হাত থেকে ছুরিটা ফেলে দিয়ে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেল। শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হাসতে লাগল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে কেবিনে একজন নার্স এলো। সে শেরাজের দিকে না তাকিয়ে বলল,
“স‍্যার! আমাকে ম‍্যাম পাঠিয়েছে। আপনি একটু উঠে বসুন। আমি খাইয়ে দিচ্ছি আপনাকে।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে নার্সটির দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনি আমার ওয়াইকে পাঠান। আমি আপনার হাতে কেনো খাব বউ থাকতে? আপনি আমার ওয়াইফকে গিয়ে বলুন, এই হসপিটালের নিয়ম যাদের বউ আছে, তাদের বউদেরই তাদের স্বামীকে খাইয়ে দিতে হয়।”
নার্সটি মাথা তুলে শেরাজের দিকে তাকাতে গিয়েও তাকাল না। সে গলায় হাত রেখে নিজের গলা কেটে পড়ে যাবার ভয়ে আবারও মাথা নামিয়ে বলল,
“এইরকম কোনো রুলস তো নেই, স‍্যার।”
“আগে ছিল না। আজ এই মুহুর্ত থেকে হয়েছে। এখন আপনি তাড়াতাড়ি গিয়ে আমার বউকে পাঠান। টানা আট মিনিট তেত্রিশ সেকেন্ড ধরে আমার বউকে দেখিনা আমি।”
নার্সটি চলে গেল কেবিন ছেড়ে। বাহিরে করিডরে দাঁড়িয়ে আছে সে। নার্সটি সুমুর পিছনে এসে দাঁড়িয়ে বলল;
“ম‍্যাম! আমাদের হসপিটালের একটা রুলস আছে।”
সুমু চোখ মুছে নার্সটির দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল,

“কেমন রুলস?”
“আসলে, এই হসপিটালে যত ম‍্যারিড পুরুষ এডমিট হয়, তাদের ওয়াইফদেরকেই তাদের খাইয়ে দিতে হয়। এইটাই এই হসপিটালের নিয়ম।”
সুমু হেসে ফেললো নার্সটির কথায়। নার্সটি মুগ্ধ হয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে রইল। কাল যে মেয়েটি পাগলের মতো কেঁদেছে, পাগলামি করেছে, কিছুক্ষণ আগে তাকে, স‍্যারের দিকে কু-দৃষ্টিতে তাকালে ভিলেনদের মতো গলা কেটে দেবার হুমকি দিয়েছে। সেই মেয়ে এতো সুন্দর করে হাসতেও পারে নার্সটির বিশ্বাস হলো না। সুমু হাসতে হাসতে বলল,
“এইটা কেমন রুলস? কই আগে তো এমন রুলসের কথা শুনিনি?”
“এইটাই রুলস, ম‍্যাম। আপনি তো স‍্যারের ওয়াইফ। আপনি থাকতে আমি কেনো খাইয়ে দিব?
সুমু আর কিছু না বলে ফোনের দিকে তাকাল। কেবিন থেকে বেরিয়ে সে আইয়ুবদের খুঁজেছিল। রাহিনরা থাকলে এই নার্সকে তার খান সাহেবের কেবিনে পাঠাত না সে। রাহিনদের কল করল, রাহিন কল রিসিভ করে বলল, “ওরা একটু দূরে আছে। হসপিটালে পৌঁছাতে একটু লেট হবে ওদের।” সুমু হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে টাইম চেক করল। সে বিড়বিড়িয়ে বলল,

“ খান সাহেবের খাবার খেয়ে মেডিসিন খাবার টাইম হয়ে গেছে।”
বাধ‍্য হয়ে সুমু কেবিনের দিকে যেতেই নার্সটি সুমুকে পিছন থেকে ডেকে বলল,
“ম‍্যাম! আপনার হাসিটা খুব সুন্দর।”
সুমু নার্সের কথায় আলতো হেসে নার্সকে “ধন্যবাদ” জানিয়ে কেবিনে চলে গেল।
সে কেবিনে ঢুকে কোনো কথা না বলে শেরাজকে তুলে বসাল। টেবিলের ওপর থেকে খাবার নিয়ে অল্প অল্প করে তাকে খাইয়ে দিল। শেরাজও আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ খাবারটা খেয়ে নিল। প্রচুর ঘাড়ত‍্যাড়া বউ জুটেছে তার কপালে। এখন কিছু বললে হয়তো হসপিটাল থেকেই বেরিয়ে যাবে, তাই সেও আর কথা বাড়াল না। ভালো ছেলের মতো খাবার খেয়ে মেডিসিন খেয়ে নিল।

রাত এগারোটা দিকে রাহিনরা আবারও হসপিটালে ফিরে এলো। শেরাজের কেবিনে ঢুকে সকলে যার যার মতো ফোনে ব‍্যস্ত হলো। শেরাজ সকলের দিকে একবার তাকিয়ে বলল,
“একটা পেশেন্টের কেবিনে তোরা সকলে বসে ফোন ইউজ করছিস?”
রাহিনরা কেউ তার কথা পাত্তা না দিয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। সুমু শেরাজের পাশে বসে আছে। খাবার খাওয়ানোর পর থেকে দুজনের কেউ কারো সাথে কথা বলেনি।
শেরাজ পিঠের নিচ থেকে বা’হাত দিয়ে বালিশটা বের করে ছুড়ে মারল আইয়ুবের মুখে। আইয়ুব বালিশটা কোলের ওপর রেখে ফোনে স্ক্রল করতে করতে বলল,
“তুই না সিক, এস.কে? এখনো জেগে আছিস কেনো? ঘুমা। আজ ভাবিজি আর আমরা সকলে মিলে রাত জাগব ভেবেছি।”
স‍্যান্ডি, আইয়ুবের থেকে বালিশটা কেঁড়ে নিয়ে আবারও শেরাজের পিঠের নিচে যত্ন করে বালিশটা রাখল। আইয়ুব বেকুবের মতো তাকিয়ে রইল স‍্যান্ডির দিকে। স‍্যান্ডি দাঁত কেলিয়ে হেসে আইয়ুবের দিকে তাকিয়ে রইল।
শেরাজ কপালের মধ্যে কয়েকটা ভাঁজ ফেলে বলল,

“তোরা কেবিন থেকে বেরিয়ে রাত জাগ। আমার ঘুম পাচ্ছে। আমি ঘুমাব।”
কথাগুলো বলে চোখ বন্ধ করল সে। আইয়ুব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“বয়েস! চলো সকলে। ভাবিজি? আপনিও চলেন।”
চোখ মেলে তাকাল শেরাজ। গম্ভীরস্বরে বলল,
“সুমু কেনো যাবে?”
“তুই না বললি, ঘুমাবি?”
“হুম, তো?”
“তাই তো ভাবিজিকেও বলছি, আমাদের সাথে যেতে।”
আইয়ুবদের কথার মাঝে সুমু উঠে ওয়াশরুমে গেল। শেরাজ আইয়ুবকে বলল,
“কাল সকালেই আমার ডিসচার্জের ব‍্যবস্থা কর, আইয়ুব। আমার বউটার এখানে থাকতে কষ্ট হচ্ছে।”
“কিন্তু, তোকে তো ডাক্তার কিছুদিন এখানে থাকতে বলেছে।”
“ফাস্ট অফ অল, এখানে থাকলে আমার বউয়ের কষ্ট হবে। সেকেন্ড অফ অল, এখানে আর একদিন থাকলে এই হসপিটালে যেকোনো সময় যেকোনো একটা নার্সের মার্ডার হয়ে যেতে পারে। এখন, কেনো মার্ডার হতে পারে? কে মার্ডার করতে পারে? কার জন‍্য মার্ডার হতে পারে? কিসের জন‍্য মার্ডার হতে পারে? এসব প্রশ্ন তোরা আমাকে করিস না। শুধু যেটা বলেছি সেইটা কর।”
সাইফ হাসতে হাসতে ফাহিমের পিঠে মেরে বলল,

“আরে বুঝিস না? নার্সরা এস.কের ওপর ক্রাশড। আর কিলার হলো আমাদের ভাবিজি।”
রিয়াদ, শেরাজের কাছে এগিয়ে গেল। সে শেরাজের পাশে বসে শেরাজ হাতটা ভালো করে দেখে বলল,
“হাতের ব‍্যথা এখন কেমন অনুভব করছিস?”
শেরাজ কোনো কথা বলল না। পিঠের নিচে বালিশ রেখে আবারও উঠে বসল। শেরাজের কপালে ব‍্যান্ডেজ করা, হাতে পাউচ আর্ম সিলিং বাঁধা। রিয়াদ শেরাজের উত্তরের অপেক্ষা না করে তাকে জড়িয়ে ধরল। একে একে রাহিন, সারবাজ, আমিত, সাইফ, রিসান, নিহাল, আরবাজ, ফাহিম এসে জড়িয়ে ধরল তাকে। সকলের চোখে পানি। নিহাল কান্নামাখা কন্ঠে বলল,
“আর কখনো এমন করিস না। তোর কোনো ধারনা নেই আমাদের কি অবস্থা হয়েছিল। তোর কিছু হয়ে গেলে আমাদের কি হতো বল তো?”
স‍্যান্ডি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার স‍্যারের প্রতি স‍্যারের বন্ধুদের ভালোবাসা দেখছে, আর চোখের পানি ফেলছে। সুমু ওয়াশরুমে থেকে বেরিয়ে এসে বন্ধুত্বের এমন সুন্দর মুহুর্ত দেখে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সে স‍্যান্ডির দিকে তাকিয়ে বলল,

“সান ভাইয়া! আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? আপনিও যান।”
“কিন্তু, ম‍্যাম…”
রাহিন স‍্যান্ডির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আরে সানামানা! এসো।”
স‍্যান্ডি আর দাঁড়িয়ে না থেকে এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল। সুমু এই সুযোগে সকলকে ক‍্যামেরা বন্দি করল। মিনিট পাঁচেক বাদে শেরাজ বলল,
“তখন মরিনি। তবে তোদের এই চাপাচাপিতে এখন ঠিকই মরব।”
সকলে মিলে সরে দাঁড়াল। সুমু এগিয়ে এলো শেরাজের কাছে।
শেরাজ সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
“তোরা এখন বাহিরে যা। আমি ঘুমাব।”
আইয়ুব দুষ্টু হেসে শেরাজের দিকে তাকিয়ে রইল। শেহেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“কি সমস্যা? আমার মুখে কি জোকার লেখা আছে? হাসচ্ছিস কেনো তুই?”
আইয়ুব হেসে বলল,
“না আসলে কিছু একটা কামড়ালো আমাকে। সেখানে লাল হয়ে গেছে। ওই লাল জায়গাটা দেখেই হাসছি।”
রাহিন ব‍্যাকুল হয়ে আইয়ুবকে ভালো করে পরখ করে বলল,
“কই? কোথায় কামড়েছে দেখি। আর কিসে কামড় দিলো? কখন কামড়ালো? আমাদের আগে বললি না কেন?”
আইয়ুব রাহিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“এই কামড় সেই কামড় না রাহিন। তোকে পরে বলব। এখন আমাকে ছাড়।”
রাহিন সরে দাঁড়াল। আইয়ুব শেরাজের কাছে এগিয়ে গেল। সে একটু ঝুঁকে শেরাজের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
“এখন সময় তো তোর, এস.কে। একদিন আমাদেরও আসবে সময়। তবে একটা কথা বলি, রোমান্সের জন‍্য হসপিটালের কেবিনটাকে অন্তত বাদ দিতে পারতি।”
শেরাজ ফলের ঝুড়ি থেকে ছুরি হাতে নিতেই আইয়ুব উচ্চস্বরে হেসে সবাইকে নিয়ে কেবিন ছাড়ল। সুমুর লজ্জায় মরি মরি অবস্থা। সে বুঝতে পেরেছে আইয়ুবের কথার মানে। শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে আলতো হাসল। সুমু দেখার আগেই হাসিটা ঠোঁট থেকে গায়েব করে রাগি লুক নিয়ে বলল,
“তোমার এসব উল্টাপাল্টা কাজের জন‍্য আমাকে ওদের সামনে লজ্জায় পরতে হলো। এইসব আর কোনোদিন করবেনা আমার সাথে। যার ভালোবাসার ওপর আঙুল তুলো, তার কাছে আসো কেনো? আসবেনা তুমি আমার কাছে।”
সুমু ছলছল নয়নে তাকাল শেরাজের দিকে। সে মুখ ফুটে কিছু বলতে নিলে শেরাজ সুমুকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“এখন আমি তোমার ইমোশনাল ড্রামবাজ মার্কা কথা শুনতে চাইনা। ওইসব ফিল্মের ইমোশনাল ডায়লগ ফিল্মের মধ্যেই শুনতে ভালো লাগে, বাস্তবে না। দয়া করে কেবিনের দরজাটা লাগিয়ে লাইটটা অফ করো। আমি ঘুমাব।”
সুমু চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। সে রুমের লাইট অফ করে শেরাজের পাশে এসে বসল। জানালা দিয়ে আসা সোডিয়ামের আবছা আলোতে শেরাজের মুখটা স্পষ্ট। সুমু মায়া ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার খান সাহেবের দিকে।

সকালের সূর্য উঠে গেছে। সুমুর চোখের ওপর সূর্যের আলো পড়তেই চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেললো সে। পাশ ফিরে শুতে গিয়ে পাশে কারো উপস্থিত টের পেয়ে চোখ মেলে তাকাল। নিজেকে কেবিনের বেডের ওপর দেখে উঠে বসল। কেবিনের একটা বেডের সাথে আরও একটা বেড জয়েন করা হয়েছে। সুমু জানে, এইসব তার খান সাহেবের কাজ। কেবিনের দরজায় নক পড়তেই সে বেড ছেড়ে নেমে কেবিনের দরজা খুলে দিল। আইয়ুবরা সকলে হাসি মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সকলের হাতে ফুলের বুকে। সকলে একসাথে বলল,
“গুড মনিং, ভাবিজি!”
সুমু হাসি মুখে সবাইকে “গুড মনিং” জানালো। আইয়ুবদের চেচাঁমেচিতে শেরাজের ঘুমের বারোটা বাজল। সে পাশে থাকা বালিশাটা দিয়ে কান চেপে আবারও ঘুমানো প্রস্তুতি নিল। সুমু দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়াতেই সকলে একসাথে কেবিনে ঢুকল। আইয়ুব শেরাজের কানের ওপর হাত দিয়ে চেপে রাখা বালিশটা টেনে সরিয়ে বলল,
“গুড মনিং, এস.কে!”
শেরাজ চোখ বন্ধ রাখা অবস্থায় রাগিস্বরে বলল,

“ব‍্যাড মনিং, ডাফারের দল। সকাল সকাল এসে তোদের আমার ঘুমটা না ভাঙালে চলছিল না, তাইনা?”
সারবাজ কপালের মাঝে কয়েকটা ভাঁজ ফেলে বলল,
“সকাল দশটা বাজে। বিয়ের পর রাত আর শেষ হয়না তোমার, তাইনা?”
সারবাজের খেয়াল নেই কেবিনে সুমুও আছে। আরবাজ, সারবাজকে খোঁচা মেরে বলল,
“ব্রো! ভাবিজি আছে?”
সারবাজ দাঁত দিয়ে জিভ কামড়ে ধরে বলল,
“সরি, মনে ছিল না।”
সুমু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কথা কাটানোর জন‍্য সারবাজ আবারও বলল,
“এই সব ফুলের বুকেগুলো তোর জন‍্য। আর শোন! খাবার এনেছি। খেয়ে রেডি হয়েনে তাড়াতাড়ি। তোর ডিসচার্জের সব ব‍্যবস্থা করে ফেলেছি আমরা। এখন আমরা বাহিরে যাই। তোরা ফ্রেশ হয়ে, খেয়েনে।”
কথাগুলো বলে সবাই ফুলের বুকেগুলো রেখে বাহিরে চলে গেল। সুমু, শেরাজকে তুলতে গেলে শেরাজ তার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,

“আমার তেমন কিছুই হয়নি। আমাকে এতো ধরে ধরে সব কাজ করাতে হবে না। আমার কাজ আমি একাই করতে পারব।”
সুমু তেঁতে উঠল। সে একটু উচ্চস্বরে বলল,
“হ‍্যাঁ, জানি আমি। আপনি তো মানুষ না, রোবট। আপনার আবার কি হবে? ভুলটা আমারই। আমি একটা রোবটকে হেল্প করতে এসেছি। তবে, এসেই যেহেতু গিয়েছি, তখন হেল্প করেই ছাড়ব। বেশি কথা না বলে আমার সাথে আসুন।”
সে শেরাজকে তুলে দিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। শেরাজও গেল তার পিছু পিছু। ব্রাশে টুথপেস্ট লাগিয়ে সুমু দাঁড়িয়ে আছে। শেরাজ সুমুর দিকে তাঁকিয়ে বলল,
“এখন, আমারটা আমি নিজেই করে নিতে পারব, কাউকে আর হেল্প করতে হবেনা।”
সুমু কেবিন থেকে টুলটা এনে ওয়াশরুমের মিররের সামনে রাখল। শেরাজের বা’হাত ধরে টেনে তাকে টুলের ওপর বসাল। শেরাজ কিছু বলার জন‍্য মুখ খুলতে নিলেই সে শেরাজের মুখের মধ্যে ব্রাশ ঢুকিয়ে দিয়ে বলল,
“চুপ, একদম চুপ! অনেক বেশি কথা বলেন আপনি, খান সাহেব। আর একটা কথা বললে কিন্তু, আপনার হাত-পা বেধে বাকি কাজগুলো করব।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে সুমুর দিকে। ওপরে ওপরে রাগ দেখালেও ভেতর ভেতর তার প্রেয়সীর এই যত্ন, অধিকারবোধ দেখানোগুলো মনের মধ্যে অন‍্যরকম শান্তি দিচ্ছে তার।
সুমু আলতো হাতে শেরাজকে ব্রাশ করিয়ে দিতে দিতে বলল,
“আমাকে দেখা হয়ে গেলে বলবেন। মুখটা ধুইয়ে দেব আপনার।”
শেরাজ চোখ সরিয়ে নিল। সুমু তা দেখে হেসে বলল,
“বউটা তো আপনারই। যেভাবে দেখছেন মনে হয়, কতো জনম দেখেন না।”
শেরাজ মেঝের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলল,

“যতক্ষণ সেন্সলেস ছিলাম, ততক্ষণ তোমাকে দেখিনি, সুইটহার্ট। কালরাতে তুমি আমার বুকের ওপর ঘুমিয়ে যাওয়ার পর তোমাকে আমার পাশে শুইয়ে একটুখানি দেখেছিলাম। মেডিসিনের ডোজ এতোই বেশি ছিল যে, সে ডোজ তোমাকে ভালো করে দেখতে দেয়নি। আর তুমি বলছো, কতো জনম দেখিনা। তোমাকে দু’চোখ ভরে দেখার তৃষ্ণা কোনোদিনও মিটবেনা আমার, সুইটহার্ট। এই একটা মুখ। যে মুখটার দিকে জনম জনম তাকিয়ে থাকলেও হয়তো আমার মধ্যে কখনো বিরক্তি কাজ করবেনা।”
সুমু শেরাজকে ফ্রেশ করে নিজে ফ্রেশ হয়ে নিল। কেবিনে এনে খাবার খাইয়ে রেডি করে দিল তাকে। তারপর নিজে রেডি হয়ে সবকিছু গুঁছিয়ে নিয়ে রাহিনদের কল করল। রাহিনরা কেবিনে এসে সবকিছু নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। সুমু হসপিটাল থেকে বেরোনোর আগে তার ডাক্তার আঙ্কেলের সাথে দেখা করে এলো। শেরাজরা গাড়িতে ওঠার আগে ডাক্তার এসে শেরাজের সাথেও দেখা করল। ডাক্তার চলে যেতেই শেরাজ গাড়িতে উঠল। নার্সরা সকলে তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। ওদের দেখে মনে হচ্ছে, ওদের স্বামী ওদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সুমু গাড়িতে ওঠার আগে নার্সগুলোর দিকে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে মুখ ভেঙাল। তারপর আঙুল দিয়ে ইশারা করে নার্সগুলোকে পেছন ঘুরে তাকাতে বলল।

দুটো বাজলো সুমুদের সিকদার বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে। সকলে ওদেরই অপেক্ষায়। ড্রয়িংরুমে আসতেই আনোয়ার সাহেব বললেন,
“শেরাজকে নিয়ে রুমে যাও, সুমু। ও অনেক টায়ার্ড। আমরা সকলে সন্ধ্যায় গিয়ে দেখা করে আসব।”
সুমু একমিনিটও না দাঁড়িয়ে শেরাজকে নিয়ে রুমে চলে এলো। শেরাজের মেডিসিনের টাইম হয়ে গেছে বলে, নিজে কোনোমতে ফ্রেশ হয়ে নিচে গেল খাবার আনতে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে খাবার এনে শেরাজকে খাইয়ে মেডিসিন খাইয়ে দিল। তারপর খাবারের এঁটো প্লেট নিচে রেখে এসে শাওয়ার নিতে ঢুকতে যেতেই, শেরাজ তাকে বলল,
“আমি শাওয়ার নিব।”
সুমু কোনো কথা না বলে তাকে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল। কোমরে পাক্কা গিন্নিদের মতো করে ওড়না বেঁধে খুব যত্ন করে শেরাজকে গোসল করিয়ে দিল। মাথায় আলাদাভাবে পানি ঢেলে দিল, যাতে ব‍্যান্ডেজ না ভিজে। গোসল শেষ করে শেরাজরের কোমরে টাওয়েল জড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আমি রাহিন ভাইয়াকে ডাকছি। উনি এসে চেঞ্জ করিয়ে দিবে।”
সুমু এক’পা বাড়াতেই শেরাজ তাকে আটকে বলল,

“তুমি থাকতে রাহিন কেনো চেঞ্জ করাবে। সবকিছু যখন তুমি করছো, তাহলে চেঞ্জটাও তুমি করাবে।”
সুমু আর কোনো কথা বলল না। চোখ বন্ধ করে শেরাজের ভেজা প‍্যান্ট চেঞ্জ করে দিল। অন‍্যদিন হলে আজ এই ব‍্যাপারটা নিয়ে শেরাজ সুমুকে লজ্জায় ফেলত। তবে, আজ সুমুর ওপর মিথ্যা রাগ দেখিয়ে সে চুপ করে রইল।
ওয়াশরুম থেকে এনে বেডে বসিয়ে সুমু তাকে শার্ট পরিয়ে দিল। তারপর আর্ম সিলিংটা পরিয়ে দিয়ে বলল,
“আপনি একটু ঘুমানোর চেষ্টা করুন। আমি শাওয়ার নিয়ে আসছি।”
মিনিট বিশেকের মধ্যে টাওয়েল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে সুমু দেখল, শেরাজ না ঘুমিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিডিও বানাচ্ছে। রাগে সুমু টাওয়েল বেডের ওপর ছুঁড়ে ফেলে শেরাজের কাছে গিয়ে ফোনটা কেঁড়ে নিয়ে বলল,
“আপনাকে আমি ঘুমাতে বলে গেছি, আর আপনি ভিডিও মেক করতে বসেছেন? এইসব করার জন‍্য হসপিটাল থেকে তাড়াতাড়ি ডিসর্চাজ নিয়ে বাড়িতে এসেছেন?”
শেরাজ কিছুক্ষণ সুমুর দিকে তাকিয়ে থেকে বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ল। শেরাজের বাচ্চামি দেখে সুমু মুচকি হেসে খাবার খাওয়ার জন‍্য নিচে চলে গেল।

রাত আটটায় শেরাজের ঘুম ভাঙল। সকলে একসাথে এসে তাকে দেখে গেল। শেরাজ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সাহাবাজ খানের সাথে কথা বলছে। সুমু রুমে এসে শেরাজের পেছনে এসে দাঁড়াল। শেরাজের ফোনের কথা বলা শেষ হতেই সুমু বলল,
“খাবার এনেছি। খেয়ে মেডিসিন খাবেন, চলেন।”
শেরাজ সুমুকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। সুমু রেগে গেলেও, কিছু বলল না। শেরাজ এসে বেডের ওপর দু’পা ঝুলিয়ে বসল। সুমু এসে টেবিল থেকে খাবার নিয়ে তাকে খাওয়াল। হাত বাড়িয়ে মেডিসিন দিতেই, শেরাজ বেছে বেছে কিছু মেডিসিন খেলো।
সুমু কপাল কুঁচকে বলল,

“এগুলো কি দোষ করল? এগুলো খান।”
শেরাজ পানি খেয়ে বলল,
“আমি গুগল করে দেখেছি। ওগুলো খেলে ঘুম হয়। আমি ওগুলো খাব না।”
“এগুলো তো আর ডাক্তার এমনি এমনি দেয়নি, আপনার ভালোর জন‍্যই দিয়েছে। আর ঘুম হওয়া তো ভালো। আপনার এমনিতেও এখন ঘুমের দরকার। নিন, খেয়ে নিন।”
সুমু জোর করে শেরাজকে মেডিসিনগুলো খাওয়াতে গেলে, শেরাজের হাত লেগে মেডিসিন গুলো নিচে পড়ে গেল। সুমু আর সহ‍্য করতে পারল না। সে রেগে বলল,
“আপনি কি চাইছেন, আমি মরে যায়? সেদিনের ভুলের জন‍্য আর কতো শাস্তি দিবেন আপনি আমাকে?”
শেরাজ সুমুর কথায় কান না দিয়ে ফোনে স্ক্রল করতে করতে বেলকনিতে চলে এলো আবারও। ঘড়ির কাটায় সময় তখন রাত নয়টা ছুঁই ছুঁই। সুমু এসে দাঁড়াল শেরাজের পেছনে। সে শেরাজকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,
“কি হলো? কথা বলেছেন না কেনো? আমাকে একটু বলবেন, আর কতোটুকু ব‍্যথা সহ‍্য করার পর আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন?”
শেরাজ কোনো কথা না বলে সুমুর হাত ধরল। সে টানতে টানতে পেছনের দরজা দিয়ে সুমুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সিকদার বাড়ি থেকে। সুমু আবাক হয়ে তাকিয়ে রইল শুধু। যখনই শেরাজ সুমুকে গাড়িতে জোর করে তুলতে নিল, তখনই সুমু বলল,

“আপনি কি করছেন এইটা? গাড়ি নিয়ে এই অবস্থায় কোথায় যাবেন আপনি?”
রাহিনদের তিনটা গাড়ির মধ্যে একটা গাড়ির চাবি শেরাজের কাছে থাকে। আর এক্সিডেন্ট করা গাড়িটা এখন গ‍্যারেজে। জ্ঞান ফেরার পর শেরাজ গাড়ির সমস্ত বিল দিতে চাইলে, রাহিনের মানবতার কথা শুনে শেরাজের টাকা দেওয়া তো দূরে থাক, তার ইচ্ছে করেছিল রাহিনের থেকে এক দুই কোটি টাকা নিতে।
সুমুর প্রশ্নের সে কোনো উত্তর না দিয়ে একহাত দিয়ে গাড়ি স্টার্ট করল। সুমু শেরাজের কান্ডে কেঁদে ফেললো। সে হাত জোর করে বলল,
“আমি আপনার কাছে হাত জোর করছি, খান সাহেব। প্লিজ, গাড়ি থামান। আমি আর কোনোদিন আপনাকে কোনো বিষয়ে নিয়ে কিছু বলব না। আমাকে ক্ষমা করতেও বলব না। আপনারা যখন ইচ্ছা হবে আমার সাথে কথা বলবেন। তবুও দয়া করে গাড়ি থামান।”
রাহিন রুমের বেলকনি থেকে বাড়ি থেকে গাড়ি বেরোতে দেখে শেরাজের ফোনে কল করল। কল রিসিভ করে এয়ারপডস কানেক্ট করল সে। শেরাজ কল রিসিভ করতেই রাহিন সুমুর কান্না জড়ানো মিনতি শুনতে পেয়ে রেগে বলল,

খান সাহেব পর্ব ২৭

“এই অবস্থা কোথায় যাচ্ছিস তুই? তুই কি চাস এস.কে? কেনো এইসব করছিস? তোর শরীরের কি অবস্থা একবার দেখিছিস? গাড়ি নিয়ে ব‍্যাক কর এস.কে।”
শেরাজ একহাতে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে বলল,
“চিন্তা করিস না, কিছু হবেনা। আমি তিনদিনের জন‍্য একটা জায়গাতে যাচ্ছি। সেদিন ড্রাঙ্ক ছিলাম বলে, এক্সিডেন্ট করেছিলাম। আজ আর তেমন কিছুই হবেনা।”
কথাগুলো বলে রাহিনের কথা শোনার অপেক্ষায় না থেকে কল কেটে দিল সে। শুনশান রাস্তা দিয়ে একহাতে গাড়ি ড্রাইভ করে এগিয়ে চললো তার গন্তব্যে। পাশে বসে থাকা প্রেয়সীর কান্না, মিনতি কোনোটাই কানের গেল না তার।

খান সাহেব পর্ব ২৮ (২)