খান সাহেব পর্ব ৩১ (২)
সুমাইয়া জাহান
রাতের আকাশে থালার মতো এক অদ্ভুত সুন্দর চাঁদ উঠেছে। চারপাশ দিয়ে কোটি কোটি তারা চাঁদটিকে পাহারা দিচ্ছে, যেন এইটাই তাদের একমাত্র কাজ। কেউ কারো জায়গা থেকে এক চুল অব্দি নড়ছে না। ধরনীর বুকে ঠান্ডা আবহাওয়া কেটে গিয়ে হালকা গরম আবহাওয়া অনুভব করা যাচ্ছে। এইতো শীত বিদায় নেওয়ার প্রথম লক্ষণ। দূর থেকে নেড়ি কুকুর আর ঝিঁঝিপোকার ডাক ভেসে আসছে। সোডিয়ামের আলোয় সিকদার বাড়ির ছাদ পুরো আলোকিত হয়ে আছে। ছাদের মাঝখানে মাদুর বিছিয়ে সকলে আজ আবারও আড্ডায় মেতেছে। সন্ধ্যার পর থেকেই সুমুর মন খারাপ। সুমুর মন ভালো করার জন্যই শেরাজ রাত নয়টার সময় সকলকে হাজির করেছে ছাদে আড্ডা দেওয়ার জন্য। দিনে ভ্যাপসা গরম পড়লেও রাতে ঠান্ডা পড়ে। ঘড়ির কাটায় সময় এখন রাত এগারোটা। প্রিয় মানুষটির মন খারাপ থাকলে হয়তো দুনিয়ার সব সুখ অসহ্য লাগে। সুমু এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে ছাদে বিছানো মাদুরের দিকে। সুমুর এমন উদাস মন দেখে শেরাজের ও অস্থির লাগছে। প্রেয়সীর উদাসীন ভাব বড্ড পোড়াচ্ছে তাকে। আইয়ুবরা গ্রাম ঘুরে দেখতে পাবে বলে অনেক এক্সসাইটেড। মাইশারা সুমুদের বাড়িতে গিয়ে কি করবে, কি পড়বে, সাথে কি কি নিয়ে যাচ্ছে, কি কি প্যাক করেছে সেই আলোচনায় মেতে আছে। সকলের আড্ডার মাঝে শেরাজ হঠাৎ করে বলল,
“গাইস! আই ওয়ান্ট প্রাইভেসি।”
সকলে থেমে গেলে। একপলক শেরাজের মুখের দিকে তাকিয়ে সকলে মুহুর্তের মধ্যেই ছাদ ত্যাগ করল। সুমুর কোনোদিকে খেয়াল নেই। সে মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে আছে। শেরাজ সুমুকে কিছু বলতে নিতেই তার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ওপর “ড্যাড” নামটা ভেসে উঠল। বা’হাতে ফোনটা রেখে ডানহাত দিয়ে কানের এয়ারপডসটা ফোনের সাথে কানেক্ট করে বলল,
“হা ড্যাড!”
“শেরাজ! ক্যাছা হে বেটা?”
এয়ারপডসের ওপর থেকে ডান হাতটা সরিয়ে চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে ছাদের শেষ প্রান্তে গিয়ে রেলিং সাথে দাঁড়িয়ে ডানহাতটা পকেটে গুঁজে বলল,
“ফাইন ড্যাড! আপ বাতাও?”
“মে ঠিক হু বেটা। তো বাতাও, সাব কুছ ক্যাছা চাল রাহা হে?”
“অল গুড ড্যাড। ইনফেক্ট, বহাত যাদা গুড।”
শেরাজ একটু থামল। আবারও বলল,
“আফটার লং টাইম।”
কথাগুলো বলে পকেট থেকে হাতটা বের করে আবারও এয়ারপডসের ওপর হাত রেখে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো সে।
“হেই, বেটা ডাল মে কুচ কালা নেহি, পুরা ডাল হি কালা লাগ রাহি হে মুজে ? ইতনা বেহেতার কিউ? জালদি বাতাও মুজে। মুজে তো লাগতা হে…হেই শেরাজ বেটা, আর ইউ ইন লাভ? তুম কিছিছে পেয়ার কিয়া হে? কন হে ও লারকি?”
সাহাবাজ খানের কথাশুনে হাসল শেরাজ। ওয়ারপডসের ওপর থেকে ডানহাতটা নামিয়ে বামহাত থেকে ফোনটা ডানহাতে নিয়ে বামহাত দিয়ে সামনে পড়ে থাকা চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলে দিল। আবারও ফোনটা বামহাতে নিয়ে ডান হাত পকেটে গুঁজে বলল,
“ওহ ড্যাড! কিতনা সাওয়াল পুচতিহো আপ।”
“বাতাও বেটা।”
“ইয়েস ড্যাড! আই এম ইন লাভ। বাট, হাউ ডু ইউ নো?”
“মেনে ভি কিয়া থা পেয়ার। তুমহারি মম কে সাথ। উছছে ভি বারি বাত ইয়ে হে কি, তুমহারি বাপ হু মে। তুমে, তুমছে ভি যাদা আছছি তারহা ছে ম্যা জানতি হু বেটা।”
শেরাজ আবারও হেসে তাকাল সুমুর দিকে। সুমু আকাশের দিকে তাকিয়ে রাতের অদ্ভূত সুন্দর চাঁদটাকে পরখ করতে ব্যস্ত। শেরাজ কিছুক্ষণ সুমুর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“ড্যাড!”
“ইয়েস, বেটা!”
“আপ সাবিকে লিয়ে এক সারপ্রাইজ আছে।”
“ক্যাছা সারপ্রাইজ বেটা?”
“ইয়ে সারপ্রাইজ হে ড্যাড। আগার আভি বাতা দুংগী, তো সারপ্রাইজ, সারপ্রাইজ নেহি র্যাহেগী, ড্যাড।”
“ওকে বেটা! জালদি জালদি লট আজাও।”
“ওকে, ড্যাড!”
কথা বলা শেষ করে শেরাজ দূরে দাঁড়িয়ে রইল। এগিয়ে এলো না সুমুর কাছে। সুমু বিষণ্ন মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে নোনা পানি। হঠাৎ গিটারের টুং টাং আওয়াজে শেরাজের দিকে তাকাল সুমু।
“তোর মন খারাপের দেশে
যাবো প্রেমের খেয়ায় ভেসে
তোর মনটা ভালো করে
দেবো অনেক ভালোবেসে
ডাকলে কাছে আসিস
পারলে একটু হাসিস
বুকটা রাখিস পেতে
ভালোবাসা নিতে
সব অভিমান,
ভেঙে দেব,
তোর কাছে এসে
তোর মন খারাপের দেশে
যাবো প্রেমের খেয়ায় ভেসে
তোর মনটা ভালো করে
দেব অনেক ভালোবেসে”
গিটারের টুং টাং শব্দ করতে করতে শেরাজ গিয়ে সুমুর পিঠের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসল।
“মনগড়া অভিযোগ
জানি ভুলে যাবি তুই
কাছে এসে আলতো করে
যদি তোর হাতটা ছুঁই
সব অভিমান
ভেঙে দেব
তোর কাছে এসে
ও তোর মন খারাপের দেশে
যাব প্রেমের খেয়ায় ভেসে
তোর মনটা ভালো করে
দেব অনেক ভালোবাসে”
আবারও উঠে দাঁড়াল শেরাজ। এগিয়ে গেল ছাদের শেষ প্রান্তে। ছাদের রেলিং সাথে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের চাঁদের দিকে তাকাল।
“তোর মনের পথ ধরে
শুধু আমার চলাচল
কতো ভালোবাসি তোরে
তুই কবে বুঝবি বল
সব অভিমান,
ভেঙ্গে দেব,
তোর কাছে এসে
হুম, তোর মন খারাপের দেশে
যাব প্রেমের খেয়ায় ভেসে
তোর মনটা ভালো করে
দেব অনেক ভালোবেসে”
গান শেষ করে সুমুর দিকে ঘুরে দাঁড়াল শেরাজ। সুমু অপলক দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। গিটিরটা রেলিংয়ের সাথে হেলিয়ে রেখে দু’হাত দু’দিকে মেলে দিয়ে দাঁড়াল শেহেরাজ। আলতো হেসে বলল,
“আমার রাজ্যের মহারানিকে আমার রাজ্যে স্বাগত জানাই।”
সুমু আর বসে রইল না। চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। আলতো হেসে দৌড়ে গিয়ে শেরাজের প্রশস্ত বুকের মধ্যে ঝাপ দিয়ে পড়ল। শেরাজ পরম আবেশে চোখ জোড়া বুজে নিল। শক্ত করে দু’হাত দিয়ে প্রেয়সীকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিল সে। সুমু কান্না মিশ্রিত গলায় বলল,
“আমার খুব কষ্ট হবে সবাইকে ছাড়া থাকতে, খান সাহেব। মা-বাবা, বোন ওদের ছাড়া আমি কখনও কোথাও থাকিনি, খান সাহেব।”
শেরাজ সুমুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আলতো করে কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“আমি তোমার কষ্টটা বুঝতে পারছি, সুইটহার্ট। কিন্তু, তোমাকে তো যেতেই হবে, সুইটহার্ট। নাকি আমি তোমাকে রেখে যাবে। কোনটা বলো?”
সুমু আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার খান সাহেবকে। শেরাজ আলতো হেসে বলল,
“তাহলে, কাঁদছো কেনো, সুইটহার্ট? আমি তোমাকে প্রমিজ করছি, যখনই সময় পাব তোমাকে নিয়ে বিডিতে এসে ঘুরে যাব।”
সুমু আর কোনো কথা বলল না। দিনে ভ্যাপসা গরম পড়লেও রাতের দিকে ঠান্ডা ঠিকই পড়ে। ঠান্ডায় সুমু হালকা কাঁপছে। শেরাজ সুমুকে নিজের থেকে সরাল। সে সুমুকে রেখেই চলে যেতে নিলেই সুমু তার হাত টেনে ধরে বলল,
“কোথায় যাচ্ছেন?”
শেরাজ ঘুরে তাকাল সুমুর দিকে। বা’হাত দিয়ে সুমুর গালের ওপর হাত রেখে বলল,
“ওয়েট করো, আসছি।”
শেরাজ ছাদ ত্যাগ করল। সুমু গিয়ে দাঁড়াল ছাদের শেষ প্রান্তে। তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে। মিনিট পাঁচেকে মধ্যে শেরাজ আবারও ফিরে এলো। সুমু পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল তার খান সাহেবের হাতে একটা বালিশ, কিছু শুকনো কাঠের টুকরো, কেরোসিনের ছোট বোতল আর একটা ব্লাঙ্কেট। সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। এতোগুলো জিনিস একসাথে কীভাবে এনেছে এই লোক, বুঝল না সে। শেরাজ কাঠের টুকরোগুলো ঘরের চালের মতো সেপ দিয়ে মেঝের ওপর সাজালো। বালিশটা মাদুরের ওপর রেখে কাঠের টুকরোগুলোতে হালকা কেরোসিন দিয়ে আগুন জ্বালাল। সুমু শুধু দেখছে তার খান সাহেবের কান্ড। শেরাজ গিয়ে ছাদের দরজা লাগিয়ে দিল। তারপর সুমুর কাছে এসে তাকে নিয়ে মাদুরের কাছে গেল। নিজে মাদুরের ওপর বসে সুমুকে কোলের ওপর বসিয়ে ব্লাঙ্কেট দিয়ে নিজের সাথে সাথে সুমুকেও জড়িয়ে নিল। সুমু অপলক তাকিয়ে আছে জলন্ত আগুনের শিখার দিকে।
“সুইটহার্ট!”
“হুম!”
“ভালোবাসি।”
“আমিও ভালোবাসি, খান সাহেব।”
“তাহলে কেঁদোনা, প্লিজ!”
সুমু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“কাঁদতে চাইছিনা, খান সাহেব। তবুও কান্নারা বুক ঠেলে বেরিয়ে আসছে। আমার অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে, খান সাহেব।”
“এই জোসনা রাত, ঠান্ডা আবহাওয়া, সামনে জ্বলতে থাকা আগুনের জ্বলন্ত শিখা, ছাদের টবে থাকা সদ্য ফোটা নানান রকমের ফুলের মিষ্টি সুভাস, খোলা আকাশ–এই সবকিছুকে স্বাক্ষী রেখে আমাকে শুষে নিতে দিবে তোমার সব কষ্টগুলোকে?”
সুমু ঘাড় কাত করে তাকাল তার খান সাহেবের দিকে। শেরাজ সুমুকে কিছু বুঝে ওঠার সময় না দিয়েই তাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘুরে দাঁড়িয়ে মাদুরের ওপর শুইয়ে দিল সুমুকে। সুমুর ওপর ঝুঁকে ব্লাঙ্কেটটা দিয়ে মাথা পযর্ন্ত ডেকে নিল দুজনের অবাধ্য শরীর দু’টো। সে সুমুর কপালে আলতো ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“আজ তোমার কষ্টগুলোকে এমনভাবে শুষে নেব যাতে, এই জোসনা রাত, আকাশের চাঁদ, তারা, সদ্য ফোটা নানান রকমের ফুল, ফুলের সুভাব, এই ঠান্ডা আবহাওয়া, জ্বলতে থাকা আগুনের জ্বলন্ত শিখা– সবাই আমাদের মিলন দেখে লজ্জা পেয়ে যায়। আজ রাতে আমার পাগলামি ওরা দেখতে না পারুক, তবে অনুভব করতে পারবে। আমার ছোঁয়াতে আজ আমার পাগলিটার সাথে সাথে কুঁকড়ে যাবে প্রকৃতির এই প্রতিটা রোমাঞ্চকর সৃষ্টি। তারা আজ লজ্জা পেয়ে মুখ লুকানোর জন্য তাদের সাথীকে খুঁজবে। আবার কেউ কেউ আমার মতো করে তার সাথীকে কাছে পেতে চাইবে। এই খোলা আকাশ আজ আমাদের মিলনের স্বাক্ষী হয়ে থাকবে।”
কথাগুলো বলে শেরাজ সুমুর গলায় মুখ গুঁজলো। এই ছোঁয়ায় হয়তো প্রেয়সীর কষ্ট শুষে নেবার চেষ্টা। আজ দুজন ভালোবাসার মানুষের কাছে আসার দৃশ্যের স্বাক্ষী রইল এই প্রকৃতির প্রতিটা রোমাঞ্চকর জিনিস। স্বাক্ষী রইল এই খোলা আকাশ।
ওমান, বুরাইমি শহর
অফিসের কেবিন রুমে সাহেবি গেটআপে বসে আছে এক সুদর্শন পুরুষ। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ফর্মাল ড্রেসে এক সুন্দরী রমণী। যুবক পেছনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে। চেয়ারটাকে হালকা ডানে বামে ঘোরাচ্ছে। যুবকটির হাতের মধ্যে কালো কালারের একটি পেন। পেনটিকে সে দুই আঙ্গুলের মাঝে আপন মনে ঘুরিয়ে চলেছে। হঠাৎ তার পাশে থাকা রমণীটি নরমস্বরে বলল,
“রায়য়ান স্যার!”
“শাট আপ!”
ঘুরে বসল যুবকটি। হাতে থাকা পেনটি ছুঁড়ে মারল দূরে। সাদা রঙের টাইলসের ওপর শব্দ করে পেনটি দূরে গিয়ে পড়ল। কেঁপে উঠল রমণীটি। আমতা আমতা করে বলল,
“স…সরি, স্যার!”
“হোয়াট সরি? আপনার সাহস কি করে হয় আমার নাম ধরে ডাকার? এতোগুলো বছর হয়ে গেল এই অফিসে কাজ করছেন, তবুও আজ পযর্ন্ত এই অফিসের রুলসগুলো মনে রাখতে পারলেন না। আপনার মতো অসভ্য এমপ্লয়ি আমার চাইনা। আউট।”
“কিন্ত, স্যার…”
“আই সেইড, আউট।”
আবারও কেঁপে উঠল মেয়েটি। আর একমিনিটও দেরি না করে কেবিন ত্যাগ করল সে। তখনই রায়য়ান চৌধুরীর ফোনটা বেজে উঠল। কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বলল,
খান সাহেব পর্ব ৩১
“কাজ হয়ে গেছে, বস।”
কলটা কেটে দিল রায়য়ান চৌধুরী। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি রেখেই উঠে দাঁড়াল। কেবিন থেকে বেরতেই অফিসের সকল গার্লস এমপ্লয়িরা আড়ে আড়ে তাকাল তার দিকে। রায়য়ান চৌধুরী কোনোদিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করল না। অফিস থেকে বেরিয়ে নিজের ব্ল্যাক রঙের বিএমডাবলুটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল নিজ গন্তব্যে।
