খান সাহেব পর্ব ৩৭
সুমাইয়া জাহান
বারে ব্ল্যাক সুট পরিহিত একজন মানব বসে আছে। হাতে অ্যালকোহলের বোতল। হয়তো কারো অপেক্ষায়। আজ আর গ্লাসে করে ছোট ছোট পেগ মারছেনা সে। আজ পুরো তিন চারটা বোতল সামনে নিয়ে বসেছে। সুঠাম দেহের অধিকারী মানবটি। মানবটির হেয়ারস্টাইল ‘কুইফ’ কাটের আধুনিক রূপ। সামনের দিকের চুলগুলো উঁচু করে পিছনের দিকে ব্রাশ করে রাখা। ঘন চুলগুলোতে ভলিউম এবং লেয়ারিং দেওয়া। সামনের কিছু চুলে হালকা প্ল্যাটিনাম ব্লন্ড হাইলাইট করা, সাইডের চুলগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও পুরোপুরি ফেইড করা না। তবুও কিছু চুল এলোমেলো হয়ে চোখের ওপর পড়ে আছে। তার চোখ দুটি গাঢ় বাদামী, আকৃতিতে তুলনামূলকভাবে ছোট, এবং সামান্য নিচের দিকে টানা। ভ্রু’গুলো ঘন এবং ছিমছাম।
ছোট, উজ্জ্বল, টানা চোখগুলো সবসময় নেশালো আর হিংস্র দেখতে লাগে। বাজ পাখির চোখের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার। এই চোখের চাহনিতে যেকোনো মেয়ে বশীভূত হতে বাধ্য। নাক সোজা এবং মাঝারী আকৃতির। ঠোঁটজোড়া পাতলা, যার ওপরের প্রান্তে একটি সূক্ষ্ম বাঁক রয়েছে। সিগারেট ছোঁয়া পাতলা ঠোঁট জোড়া ক্রীমের দ্বারা এখনো গোলাপি বর্ণ ধারণ করে আছে। চোয়াল শার্প এবং ডিফাইনড। হালকা গোঁফ ও দাড়ির আছে– সব মিলিয়ে ক্লাসিক হ্যান্ডসাম লুক। তার স্কিন টোন ফর্সা এবং একেবারে পরিষ্কার। কোনো দাগছোপ নেই। নিঃসন্দেহে, তাকে এক কথায় সুদর্শন বলা চলে। মানবটি উজ্জ্বল তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া বারের দরজার দিকে আটকে আছে। হয়তো কোনো শিকারীর অপেক্ষায় বা কোনো বন্ধুর।
বারের ভেতরে ঢুকে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত মানব। মুখে তার মাস্ক। গিয়ে বসলো কর্নারের একটি টেবিলে। একজন ওয়েটারকে ডাক দিয়ে কিছু একটা বলে দিল। ওয়েটারটি সম্মতি জানিয়ে চলে গেলে সেই ওয়াইনের বোতল হাতে নিয়ে বসে থাকা মানবটির কাছে। ওয়েটারটি আঙুল দিয়ে দূরে কর্নারে বসে থাকা মানবটিকে দেখাল। ওয়াইন হাতে নিয়ে বসে থাকা মানবটি তাকাল সেদিকে। এগিয়ে গেল কাঙ্ক্ষিত টেবিলটির কাছে। চেয়ার টেনে নিজের আসনে বসল। নিজের সামনে বসে থাকা মাস্ক পরিহিত মানবটিকে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। কিছুক্ষণ মানবটিকে পরখ করে গা দুলিয়ে হেসে ফেলল। মাস্ক পরিহিত মানবটি বিরক্তসূচক শব্দ করল। মানবটি কোনমতে হাসি থামিয়ে মাস্কটি টেনে খুলে ফেলল। আরিয়ানের নাকের অবস্থা দেখে দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
“এই কি অবস্থা তোর, অরিয়ান? নাকের এই অবস্থা কেনো?”
“একটা মেয়ের জন্য।”
“হোয়াট? মেয়ের জন্য মানে?”
“হুম! তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। তোর থেকে কিছু লুকানোর নেই। একটা মেয়ে আমাকে বড্ড ডিস্টার্ব করে দিয়েছে।”
রায়য়ান আবারও হেসে বলল,
“তোকে ডিস্টার্ব করেছে? তবুও কোনো মেয়ে? তা, কে সেই দূর্সাহসী গার্ল?”
আরিয়ান চুপ করে রইল। একজন ওয়েটার এসে ড্রিঙ্কস সার্ভ করে দিয়ে গেল। কিছুক্ষণ ভেবে তারপর বলল,
“মিসেস শেরাজ খান। খান ম্যানশনের মেজো বউ। আমাদের নতুন খান সাহেবা।”
“ওহ হ্যাঁ! শুনলাম এস.কে নাকি বিয়ে করেছে। কিন্তু ভাই, মেয়েটার মধ্যে এমন কি আছে বলতো? যে এস.কের মতো ছেলে বিয়ে করে ফেলল আর তোর মতো মেয়েবাজ ছেলে ডিস্টার্ব হয়ে গেল?”
“জানিনা। তবে কিছুতো একটা আছে। আর তার থেকেও বড় কথা, ও এস.কের ওয়াইফ। এস.কে নাকি মেয়েটাকে অসম্ভব ভালোবাসে। আর তুই তো জানিস, এস.কের সব জিনিসের প্রতি আমার পবিত্র নজর আছে।”
“তোর নজর পবিত্র?”
“অবশ্যই! বিশ্বাস কর ভাই। কাল ওই মেয়েকে দেখার পর এখন পযর্ন্ত আমি আমার কোনো গার্লফ্রেন্ডের সাথে কন্ট্রাক্ট করিনি। কোনো মেয়ের সাথে বেড শেয়ার করিনি। ভালো করে দেখ রায়য়ান। আজ আমার পাশে কোনো মেয়ে নেই।”
“হুম! খুবই অবিশ্বাসযোগ্য একটা ব্যাপার এইটা। তবুও বিশ্বাস করলাম। তাহলে তোর নাকের এই অবস্থা দেখানোর জন্য এই সন্ধ্যায় আমার সব কাজ বাদ দিয়ে আমাকে এখানে আসতে বললি? তো বল আমাকে ভাবিজির সাথে কবে মিট করাবি? আমি ও দেখতে চাই, কে সেই অসাধ্য সাধনকারী রমণী, যার জন্য এক মেয়েবাজ, আরেক মেয়ে হেটার্স এতটা ডিস্টার্ব হয়ে গেল যে, এক জন্য অলরেডি বিয়ে করে ফেলেছে, আর অন্যজন মেয়েবাজি ছেড়ে দিতে চাইছে।”
“তুই কি মজা নিচ্ছিস, রায়য়ান?”
“অবশ্যই না! শুধু সেই রমণীর সাথে মিট করতে চাইছি। কবে করাবি বল?”
“ড্যাড ওদের জন্য পার্টি থ্রো করবে বলেছে। সেদিন দেখে নিস সেই মেয়েকে।”
“কিন্তু, এতটা ডিস্টার্ব হয়ে কি লাভ? ওই মেয়ে এস.কের আন্ডারে আছে। তুই তো চোখ তুলে তাকাতে পযর্ন্ত পারবি না ওই মেয়ের দিকে। আর সেখানে বেড পার্টনার বানাতে চাইছিস। বিষয়টা ভীষণ হাস্যকর।”
মুহুর্তেই আরিয়ান রেগে গেল। হাতের মধ্যে থাকা ওয়াইনের বোতলটাকে ছুঁড়ে মারল। বারে ড্যান্স করতে থাকা সকলে দাঁড়িয়ে পড়ল। মিউজিক অফ হয়ে গেল। সকলে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। আরিয়ান উঠে দাঁড়াল। সে রাগি লুক নিয়ে তাকাতেই আবারও মিউজিক অন করা হলো। সকলে আবারও ড্যান্সের দিকে মন দিল। আরিয়ান চাপাস্বরে হালকা গর্জন করে বলল,
“বেড পার্টনার নয়। লাইফ পার্টনার বানাতে চাই। ওই জিনিস আমার পার্মানেন্টলি লাগবে।”
রায়য়ান তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বোতলে চুমুক দিল। কিছুটা ওয়াইন পান করে বোতলটা শব্দ করে টেবিলের ওপর রেখে বলল,
“এস.কের থেকে কীভাবে কেড়ে নিবি? এস.কে তোকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। তুই খুব ভালো করে জানিস, ও কি জিনিস। আমাদের মার্ডার করার পদ্ধতি আর এস.কের মার্ডার করার পদ্ধতি এক না। ও কাউকে মার্ডার করলে তার একটা চুল পযর্ন্ত অক্ষত ছাড়েনা।”
আরিয়ান হাসল। রায়য়ানের কাছে গিয়ে তার কাঁধের ওপর হাত রেখে বলল,
“আমি মনে হয় একটু বেশি মজা করি। আর তাই কেউ আমাকে সিরিয়াস নেয়না।”
“কি করতে চাস তুই?”
“ঠান্ডা মাথায় খেলতে চাই।”
“মানে?”
“মানে, কেড়ে নিব।”
কথাগুলো বলে চলে গেল আরিয়ান। রায়য়ান বাঁকা হেসে তাকিয়ে রইল আরিয়ানের যাওয়ার দিকে। চেয়ারের সাথে গা হেলিয়ে দিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“শত্রুর শত্রু বন্ধু। আপাতত তুই আমার বন্ধু, আরিয়ান। ওই মেয়ে যদি এস.কের সত্যি ভালোবাসা হয়, তাহলে আমি নিজে তোকে হেল্প করব এস,কের থেকে ওই মেয়েকে কেড়ে নিতে।
শাহরুখ ড্রয়িংরুমে বসে টেলিভিশনে খবর দেখছে। ফারিয়া আর ফারিন এলো নাজমিনদের কাছে। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই ফারিয়া দাঁড়িয়ে পড়ল। ফারিনকে সামিয়ার রুমে যেতে বলে নিজের এগিয়ে গেল শাহরুখের কাছে। শাহরুখের পেছন দিয়ে গিয়ে দুহাত দিয়ে শাহরুখের চোখ আটকে ধরল। নিউজ দেখায় বাধা হওয়াতে রেগে গেলো শাহরুখ। চট করে উঠে দাঁড়াল সে। পেছন ফিরে ফারিয়াকে দেখে রাগ বেড়ে গেল তার। ফারিয়ার কান টেনে ধরে সামনে এনে দাঁড় করাল। ব্যথায় ফারিয়া “আহ” করে শব্দ করল। শাহরুখ চোখ রাঙিয়ে বলল,
“এইসব কি ধরনের অসভ্যতা? পড়াশোনা নেই তোর? আর তোকে না বলেছি আমার সামনে আসবি না। তুলে এক আছাড় মারব।”
“আহ! ছাইয়া ছাড়ো।”
শাহরুখ ভ্রু কুঁচকালো।
“কি বললি?”
“কই? কিছুনা তো।”
“কিছুনা তাইনা? ওই ছাইয়া কি, হ্যাঁ? ভাইয়া হই তোর।”
“আরে, ভুল করে বলে ফেলেছি।”
“তাই? তাহলে, আমি তোকে এখন ভুল করে একটা আছাড় মারি।”
ফারিয়া কেঁদে ফেলল। জোরে চিৎকার করে মামি বলে ডাক দিল। শাহরুখ ছেড়ে দিল ফারিয়ার কান। ফারিয়া দৌড়ে সিঁড়ির ওপর গিয়ে দাঁড়িয়ে মুখ ভেঙিয়ে বলল,
“ছাইয়া, ছাইয়া, ছাইয়া। তুমি আমার ভাইয়া না ছাইয়া, বুঝছ? তোমাকে ভাইয়া থেকে ছাইয়া বানানোর গল্পটা খুব সুন্দর হবে, দেখে নিও।”
শাহরুখ এগিয়ে আসতেই ফারিয়া দৌড়ে সামিয়াদের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। শাহরুখ মুচকি হেসে আবারও নিউজ দেখাতে মন দিল।
সুমু বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ তার সমুদ্রের অশান্ত পানির দিকে। শেরাজের আজকে বাসায় ফিরতে একটু লেট হবে বলে গেছে। সুমুর হাজার ভাবনায় বিভোর। তার ভাবনার মাঝে হঠাৎ দরজায় নক পড়ার শব্দ কানে এলো। সে বেলকনি থেকে রুমে এল। দরজার ওপারে মুখে এক টুকরো মিষ্টি হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইশিতা। সুমু ইশিতাকে ভেতরে আসতে বলে বেডের ওপর পা ঝুলিয়ে বসল। ইশিতা এসে সুমুর পাশে বসল। সুমু আলতো হেসে বলল,
“এতোক্ষণে আসার সময় হলো তোমার?”
ইশিতা অপরাধীরন্যায় বলল,
“সরি সুমু! একটু কাজ ছিল।”
“হুম বুঝলাম। তা তোমার আর আরবাজ…”
রুমের মধ্যে ঢুকে এলো রোজা। পরনে হট প্যান্ট আর লেডিস টি-শার্ট । রিবন্ডিং করা ব্রাউন কালারের কাঁধ পযর্ন্ত চুলগুলো খোলা রাখা। মুখে স্পষ্ট রাগ আর ঘৃণা। মডেলদের মতো করে হেঁটে এগিয়ে এলো সুমুদের দিকে। সুমুর দিকে চোখ রেখে ইশিতার উদ্দেশ্যে বলল,
“তুমি একটু রুম থেকে যাও”
ইশিতা মাথা নিচু করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। ইশিতা রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই রোজা বলল,
“আমার এস.কে’কে কীভাবে ফাঁসিয়েছো তুমি?”
সুমু উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না। বেড সাইড টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে ব্যস্ত হলো সে। কিন্তু রোজা কেড়ে নিল সুমুর ফোনটা। বেডের ওপর ফোনটা ছুঁড়ে মেরে সুমুর দিকে আঙুল তুলে চোখ রাঙিয়ে বলল,
“তোমার সাহস কি হয় আমাকে ইগনোর করার? আমি তোমাকে কিছু জিঙ্গাসা করেছি, আর তুমি মুড নিচ্ছ। বড্ড বেশি সাহস তোমার তাইনা?”
সুমু প্রচন্ড বিরক্ত হলো। এই নির্লজ্জ ধরনের মেয়ের সাথে কথা বলার মতো কোনো ইচ্ছে জাগছেনা তার মধ্যে। বিরক্ত হয়ে উঠে বেলকনির দিকে চলে যেতে নিল সে, কিন্তু রোজা এসে সুমুর সামনে দাঁড়িয়ে পথ আঁটকাল।
ভ্রু কুঁচকালো সুমু।
“কি চাই?”
“কি চাই মানে? তোমাকে আমি কিছু জিঙ্গাসা করেছি? উত্তর দিচ্ছ না কেনো?”
“প্রয়োজন মনে করছিনা।”
রোজা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
“সামান্য একটা ভিলেজ গার্লের এতো অ্যাটিটিউড, যে সে রোজা চৌধুরীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনা? ইন্টারেস্টিং, এই মেয়ে তুমি জানো আমি কে? আমার কতো পাওয়ার আছে, সেই বিষয়ে তোমার কোনো আইডিয়া আছে?”
“নাহ! আমি জানিনা আপনি কে। আমার কোনো আইডিয়া ও নেই আপনার পাওয়ার সম্পর্কে। আর জানতে চাইওনা আপনি কে। আর না আপনার পাওয়ার সম্পর্কে কোনো আইডিয়া রাখতে চাই। আপনি এইবার আসতে পারেন।”
“তোমার এতো বড় সাহস? তুমি আমাকে এই রুম থেকে বেরিয়ে যেতে বলছ?”
“হুম বলছি! তার কারণ, আপনি একটা নিউ ম্যারিড কাপালের বেডরুমে বিনা পারমিশনে ঢুকে এসেছেন।”
রোজা এসে সুমুর ডানহাতটা মুচড়ে ধরল। তার হাতের প্রতিটা নখ সুমুর হাত ক্ষত বিক্ষত করে রক্ত বের করে আনলো। রোজা কটমট করে বলল,
“ইাউ ডেয়ার ইউ, তোমার মতো একটা ভিলেজ গার্লের এতো বড় সাহস কি করে হয়? আমাকে এস.কের রুম থেকে বেরিয়ে যেতে বলো তুমি? তুমি কি ভাবছো, এস.কে’কে আমার থেকে কেড়ে নিয়ে তুমি শান্তিতে সংসার করতে পারবে? কখনোই না। খুন করে ফেলব তোমাকে। তোমার থেকে এস.কে’কে কেড়ে নিব আমি। এইটা আমার ফুফুমনির বাসা। আর এই রুমটা আমার এস…”
কথাটা শেষ করতে পারল না রোজা। নিজের হাত ছাড়িয়ে বেড সাইড টেবিলের ওপর রাখা ফলের ঝুড়ি থেকে ধারাল ছুরিটা হাতে তুলে নিল সুমু। রোজাকে টান দিয়ে বেডের ওপর ফেলে একটু ঝুঁকে রোজার গলায় ছুরি চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“এক কথা একবার বললে কানে যায় না আপনার? আমার খান সাহেবের দিকে নজর দেওয়া, তার দিকে হাত বাড়ানো, তাকে নিজের বলে দাবী করা– এইসব ভুলগুলো আমার সামনে অন্তত করবেন না। আমি ওতোটা ভালো মেয়ে নই। আমাকে টিভি সিরিয়াল বা সিনেমার মতো অত্যাচারিত, অসহায় মেয়ে হিসাবে ভাবলে ভুল করবেন। আমি অসহায় মেয়ে নই। কালকে সকালে আপনার ভাইয়ের সাথে হওয়া ঘটনার কথা আপনি হয়তো ভুলে গেছেন। এখন আমাকে দেখে আরও একবার কালকের ঘটনা স্মরণ করে নিন। আমার খান সাহেবের ফিমেল ভার্সন আমি। আমার খান সাহেবের দিকে চোখ তুলে তাকালে, সেই চোখ তুলে কোরোসিন দিয়ে পুড়িয়ে ছাঁইটুকু পযর্ন্ত নর্দমায় ফেলে দিয়ে আসব। আমাকে ওতোটা সহজভাবে নিবেন না। বলেছিলাম না, আমার শক্ত হাতের শক্ত মিষ্টি আপনার নরম শরীরে সহ্য হবেনা।”
ছুরি জোরে চেপে ধরার কারণে রোজার গলার চামড়া হালকা কেটে রক্ত বেরিয়ে এসেছে। ভয়ে চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে রেখেছে মেয়েটা। সুমু ছুরিটা সরিয়ে সরে আনলো। ছুরিটা জায়গা মতো রেখে দরজার দিকে আঙুল তাক করে বলল,
“আউট!”
গলায় হাত রেখে উঠে বসল রোজা। হাত চোখের সামনে এনে হাতের ওপর রক্ত দেখে চোখ কপালে উঠল তার। সুমু দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে বলল,
“তোমার এই কর্মের মাশুল খুব তোমাকে খুব বাজেভাবে চোকাতে হবে। জাস্ট ওয়েট এন্ড সি। দেখতে থাকো সুমু, আমি এইবার কি কি করি।”
কথাগুলো বলে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে। সুমু দুহাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে বেডে গিয়ে বসল। সে খুব ভালো করে বুঝতে পারছে, এই ঘটনা নিয়ে আজ এই বাড়িতে কোনো একটা বাজে ঝামেলা হবে, এবং এইটাও বুঝল, এই বাড়িতে তার সংসার জীবনের জার্নি খুব একটা সহজ হবেনা। এমন সময় নিচ থেকে অনন্যা খাতুনের চিৎকারের আওয়াজ আর রোজার কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো সুমুর কানে। ইশিতা, ফিরোজা আর রিয়াজ দৌড়ে এলো সুমুর কাছে।
ইশিতা সুমুর কাছে এসে বলল,
“কিছু কি হয়েছে, সুমু? বড়মামনি তো অনেক রেগে গেছে। রোজা আপু কাঁদছে। কি হয়েছে এই রুমে?”
সুমু মাথা থেকে হাত নামিয়ে ইশিতার দিকে তাকাল। ইশিতার নজরে এলো সুমুর হাত। ইশিতা বিচলিত হয়ে সুমুর হাত ধরে বলল,
“এই কি হয়েছে তোমার হাতে? আমাকে বলো সুমু। রোজা আপু কিছু করেছে?”
ইশিতার কথাগুলো বলতে বলতে রিয়াজ রুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে শেরাজকে কল করল। ফিরোজা তাকিয়ে আছে সুমুর দিকে। ইশিতা আবারও প্রশ্ন করতেই নিচ থেকে সুমুর ডাক পড়ল। সুমু আর বসে রইল না। উঠে দাঁড়িয়ে ড্রয়িংরুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল।
ড্রয়িংরুমের মাঝে দাঁড়িয়ে অনন্যা খাতুন চিৎকার করছেন। রোজা, অনন্যা খাতুনের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। সাহাবাজ সাহেব দুহাত পেছনে বেঁধে অনন্যা বেগমের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন। শেহেজাদ সাহেব আর আফিয়া খাতুন সোফার ওপর বসে আছেন। আরিয়ান সাহেবী ভঙ্গিমায় সোফার ওপর একহাত ছড়িয়ে দিয়ে বসে আছে।
সুমু সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। তার একপাশে রিয়াজ অন্যপাশে ফিরোজা। দুজনেই সুমুর দু’হাত ধরে রেখেছে। ইশিতা সুমুর পেছন পেছন নামছে। সুমুকে নামতে দেখে সকলে তাকিয়ে রইল সুমুর দিকে। আরিয়ান একটু নড়েচড়ে ঘাড় কাত করে সুমুর দিকে তাকিয়ে রইল। অনন্যা খাতুন সুমুকে দেখে বললেন,
“কি বউ এনেছে আমার ছেলে। এইটা বউ নাকি লেডি মাফিয়া। দিনে দুপুরে মানুষ মার্ডার করে ফেলবে এই মেয়ে। আজ রোজাকে মারতে গিয়েছিল, কাল আমাকে মারতে যাবে।”
সুমু সিঁড়ি থেকে দু’পা সামনে এগিয়ে এসে দাঁড়াল। অনন্যা খাতুন রাগিলুক নিয়ে এগিয়ে এলো সুমুর কাছে। সুমুর দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙিয়ে বলল,
“তুমি রোজার গায়ে হাত দিয়েছ কোন সাহসে? তোমরা হাজব্যান্ড আর ওয়াইফ পেয়েছটাকি? তোমার হাজব্যান্ড আমার ভাইয়ের ছেলেকে মারছে। তুমি আমার ভাইয়ের মেয়েকে মারছ। আমার ছেলের কথা না হয়, বাদ দিলাম। কিন্তু তুমি? তুমি এতো বড় সাহস পেলে কোথায়?”
সুমু চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। পাশ থেকে রিয়াজ বলল,
“মম! তুমি শুধু ভাবিজিকে বকছ কেনো? রোজা আপুওতো…”
“একদম চুপ বেয়াদব ছেলে। বড়দের মুখে মুখে শুধু কথা বলো। কে শেখাচ্ছে তোমাকে এইসব বেয়াদবি? এই মেয়েটা? শেখাবেইতো। এই মেয়ে তো এসেছে আমার সাজানো পরিবারটাকে ভেঙে দিতে। দল করে বেড়াচ্ছে। নিজের দলে সবাইকে টেনে নিয়েছে অলরেডি। আমার ছেলেটাকে ব্ল্যাক ম্যাজিক করেছে। এই বাড়ির সবাইকে বশ করে নিয়েছে। গ্রাম থেকে উঠে এসেছে তো। অনেক রকমের বশীকরণ করতে জানে এরা।”
সাহাবাজ সাহেব বিরক্তি হয়ে বললেন,
“আহ বেগম! মেয়েটাকে এইভাবে বলছ কেনো? আগে সবটা জেনে নাও।”
অনন্যা খাতুন স্বামীর দিকে তাকালেন।
“কি জানব আর? রোজা আমাকে সবটা বলেছে। আর কিছু জানার নেই আমার। তোমাকে এখনো বলছি, তোমার ছেলেকে বুঝিয়ে এই মেয়েকে আমার বাড়ি থেকে দূর করো।”
“তুমি বারবার ভুলে যাচ্ছ অনন্যা, সুমু মামনি তোমার ছেলের বউ। ওকে এইভাবে বাহিরের লোকের সামনে অপমান করোনা।”
“বাহিরের লোক? কে বাহিরের লোক? আমার ভাইয়ের ছেলেমেয়ে বাহিরের লোক?”
“শুধু ওরা নয়। বাড়ি ভর্তি অনেক সার্ভেন্টরা আছে। তুমি তো এই বাড়ির মধ্যে কতো রুলস তৈরি করেছ। তাহলে আজ কেনো ভুলে যাচ্ছ, সুমু তোমার ছেলের বউ। আর এই বাড়ির কোনো বউকে ছোট করে বা অপমান করে কথা বলা যায় না।”
“আমি ভুলিনি আমার তৈরি করা নিয়ম। তুমি যেই নিয়মগুলোর কথা বলছ, সেগুলো শুধু এই বাড়ির বউদের জন্য। আর এই মেয়েটাকে আমি আমার ছেলে বউ তো অনেক দূরে থাক, এই বাড়ির সাধারণ একজন সার্ভেন্ট হিসাবেও মেনে নিব না।”
গর্জে উঠলেন সাহাবাজ সাহেব। অনন্যা খাতুনকে ধমকে মেরে বললেন,
“তুমি কিন্তু এইবার বাড়াবাড়ি করছ?”
“আমি কোনো বাড়াবাড়ি করছিনা। বাড়াবাড়ি তো আজ এই মেয়েটা করেছে। দু’দিন আসতে না আসতেই একেরপর এক ঝামেলা লেগেই চলেছে এই মেয়েটার জন্য। ইশিতাও তো এই বাড়ির বউ হয়ে এসেছে। কই ওর জন্য তো এখন পযর্ন্ত এমন কিছুই হয়নি।”
খান সাহেব পর্ব ৩৬
কথাগুলো বলে অনন্যা খাতুন রোজাকে নিজের কাছে ডাকলেন। রোজা এসে দাঁড়াল অনন্যা খাতুনের পাশে। সুমুর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকা করে হাসল সে। অনন্যা খাতুন রাগিসুরে সুমুর উদ্দেশ্যে বলল,
“এই মেয়ে, সে সরি!”
“শেরাজ খানের বউ কাউকে সরি বলেনা মম। শেরাজ খানের বউ সরি বলায়।”
