Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৫৬

খান সাহেব পর্ব ৫৬

খান সাহেব পর্ব ৫৬
সুমাইয়া জাহান

সুমুর হৃদস্পন্দন তীব্র হয়ে উঠল। বাতাসের ঠাণ্ডা স্পর্শ যেন কোন নিঃশব্দ আহ্বানে তাকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছিল অন্ধকারের গভীরে। শিহরিত হয়ে সে এক পা নিচের দিকে নামাল। ধুলো জড়ানো সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে তার পা মৃদু শব্দ করল। অন্ধকার আরও ঘন হয়ে আসছে, কিন্তু সেই দূরবর্তী নরম আলো যেন তাকে টানছে। ধীরে ধীরে নিচে নেমে চলল সে। মনের মধ্যে হাজারো প্রশ্ন ঘুরছে, কিন্তু তার সাহস ছিল অবিচল। প্রতিটি ধাপ যেন তার জীবনের একটি গোপন অধ্যায়ের দরজা খুলে দিচ্ছে। সুমুর মনে হলো, নিচের অন্ধকার থেকে কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকছে। তার গা কাঁপতে লাগল, কিন্তু সে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবল না। তার ভেতরের কৌতূহল এবং সাহস তাকে আরও নিচে নামতে বাধ্য করল।
সিঁড়ির শেষ ধাপে পা রাখতেই সে চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস নিল। সামনে যেন কিছু একটা অপেক্ষা করছে তার জন‍্য। সুমু তার ফোনের ফ্ল্যাশ ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে নিল। সিঁড়ি থেকে নেমে সে হলরুমের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। চারপাশে অদ্ভুত এক পঁচা গন্ধ ভাসছে বাতাসে। সেই গন্ধ নাকে এসে লাগল তার। ওড়নাটা মুখের সামনে ভালো করে জড়িয়ে নিল সে। হাতের ফোনের ফ্ল‍্যাশ সামনে ধরতে সামনে ধরা দিল তিনটি বন্ধ দরজা। হলরুমের অন্ধকারের মাঝে সেই দরজাগুলো যেন আরও গা ছমছমে লাগছে।

প্রথম দরজার হাতল ধীরে টেনে খুলল সে। ভেতরে আধুনিক সাজের একটা বেডরুম। ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটের চমৎকার কম্বিনেশন। দেয়ালের কিনারা জুড়ে লালচে এলইডি লাইট জ্বলছে। রক্তের মতো লাল আলোয় মনে হচ্ছে পুরো রুমটাই যেন রক্তে ডুবে আছে। সেই দৃশ্য দেখে বুকের ভেতরটা ঠাণ্ডা হয়ে এলো তার। পুরো রুমটা খান ম‍্যানশনের মতো ডেকোরেট করা। ভয়টাকে শক্ত করে চেপে ধরে সে দ্রুত বেরিয়ে এলো। দ্বিতীয় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফুস করে শ্বাস ফেলল। ভেতরে উঁকি দিতেই দেখতে পেল স্বাভাবিক একটা কিচেন রুম। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দরজাটা আবার বন্ধ করে দিল। তৃতীয় দরজা খুলল ধীরে। একটা ফাঁকা হলরুম আরেকবার চোখের সামনে ফুটে উঠল। সেই হলরুমের সামনে আরও তিনটি বন্ধ দরজা। সুমু গলা শুকিয়ে এলো। সে শ্বাস টেনে প্রথম দরজার কাছে গিয়ে হাত রাখল। খুলতেই দেখা গেল আরেকটা কিচেন রুম। সে ভেতরে ঢুকল। হঠাৎ তার অস্বস্তি হলো। এখানের গন্ধটা বেশি পচা আর অস্বস্তিকর লাগল তার কাছে। অজানা ভয় আর গন্ধের তীব্রতায় সে আর দাঁড়াতে পারল না, দ্রুত বেরিয়ে এলো রুম থেকে। সে ধীরে গিয়ে দাঁড়াল দ্বিতীয় রুমটার সামনে।

দ্বিতীয় দরজা খুলতেই গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল তার। ফ্ল‍্যাশের আলোয় দেখতে পেল পুরো একটা অস্ত্রের কারখানা। দেয়ালে সাজানো ধারালো ছুরি, লোহার রড, ভেতরে একটা বিশাল লোহা গলানোর চুল্লী পর্যন্ত রাখা। গলা আবারও শুকিয়ে এলো তার। তবুও কৌতূহল তাকে তাড়া করল। সে সাহস করে ধীরে পায়ে ভেতরে ঢুকল। একটা ছুরি হাতে তুলে নিয়ে আঙুলের ডগায় স্পর্শ করল। তারপর গলানো লোহার চুল্লীর সামনে গিয়ে ফ্ল‍্যাশ ধরতেই চুল্লীর ধার ঘেঁষে জমে থাকা লালচে তরল নজরে পড়ল। শরীরের ভেতর হঠাৎ গুলিয়ে উঠল সবকিছু। আঙুলের ডগায় তরলটা ছুঁয়ে নাকের কাছে আনতেই বুঝতে পারল এটা পঁচা রক্ত। রক্তের গন্ধে তার গা গুলিয়ে উঠল। হঠাৎ পেটেও ব‍্যথা শুরু হলো। পেট চেপে ধরে দৌড়ে বেরিয়ে এলো সে। তৃতীয় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাত তুলল। কিন্তু হাতটা থেমে গেল। কেমন অস্বস্তিকর ঠাণ্ডা বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে, মনে হলো দরজার ওপারেই কেউ দাঁড়িয়ে আছে। ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই, হঠাৎ ভেতর থেকে ভেসে এলো অস্পষ্ট এক চিৎকার। সে আর ফিরে গেল না। ধীরে পায়ে দরজার কাছে গিয়ে হাত রাখল দরজার গায়ে। হাত রাখতেই সে বুঝতে পারল দরজাটা খোলা। নিঃশব্দে দরজার ঠেলা দিয়ে সে এক চোখে দিয়ে দেখার চেষ্টা করল ভেতরটা।

আরেকটা বিশাল হলরুম। ভেতরে চোখ রাখতেই সুমুর শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল। রুমজুড়ে গুমোট অন্ধকার। শুধু মাঝখানের এক ঝুলন্ত বাতি অল্প আলো ছড়াচ্ছে। পুরো রুমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দশ-বারো জন লোক কালো পোশাকে দাঁড়িয়ে আছে। সকলে রোবটের মতো একদম নিশ্চল। তার মনে হলো, এরা যেন মানুষ না, কোনো নিস্তব্ধ মূর্তি। তবু তাদের নিঃশ্বাসের ভারী আওয়াজ বোঝা যাচ্ছিল। হলরুমের একদম মাঝখানে রাখা আছে সাহেবী নকশার একটা রাজকীয় চেয়ার। চেয়ারটাতে একজন লোক বসে আছে। মুখটা অন্ধকারের কারণে ঠিকঠাক দেখা যাচ্ছে না। সে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। চেয়ারের ঠিক পাশেই আরেকজন লোক দাঁড়িয়ে আছে একদম বোরটের মতো স্থির হয়ে। আর সেই দুজনের সামনে মেঝেতে পড়ে আছে এক মধ্যবয়সী লোক। লোকটির হাত-পা শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা। মুখটা রক্তে আর ধুলোয় লেপ্টে আছে। ব্যথায় লোকটা ককিয়ে উঠছে কখনো কখনো।
সুমুর নিঃশ্বাস কেমন ভারী হয়ে এলো। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ধুকপুকানি শুরু হলো। চেয়ারে বসা লোকটার ছায়ামূর্তি চেনা লাগছে তার। সে চোখ কুঁচকে আরেকটু ভালো করে দেখার চেষ্টা করল। হঠাৎ লোকটি তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকে ঘাড় কাত করে তাকাল। সুমুর চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। সাহেবী চেয়ারে গা হেলিয়ে বসে থাকা ছায়ামূর্তিটা অন্ধকার ভেদ করে যেন হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে উঠল। চওড়া কাঁধ, শক্ত গলা, অদ্ভুত ঠাণ্ডা চোখের মানুষটা তার খান সাহেব। হ‍্যাঁ, তারই খান সাহেব। যার কণ্ঠে সুমু শুনেছে কত অনুচ্চারিত ভালোবাসার ডাক। সেই মানুষটাকেই এখন দেখছে এক অদ্ভুত, অচেনা রূপে। সুমুর বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। ভেতরে পা ফেলতে গিয়েও সে থমকে গেল। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে যেন তার। ঠোঁটে একপ্রকার কাঁপুনি উঠল।

চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কালো পোশাকের প্রহরীরা মাথা নুইয়ে আছে তাকিয়ে আছে শেরাজের দিকে, যেন তার এক ইশারাতেই এই জায়গাটা এখন মৃত্যুপুরীর রূপ নেবে। চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা খানিকটা ঝুঁকে কিছু বলল। মেঝেতে শুয়ে থাকা বয়স্ক লোকটা যন্ত্রণায় গরগর করে উঠল। কঠিন অন্ধকারে সুমু যেন তার খান সাহেবের চোখে এক অজানা ঝলক দেখতে পেল। এই চোখজোড়া এখন নির্দয়। কোনো মায়া নেই, নেই কোনো ভালোবাসা। এই চোখের পেছনের মানুষটাকে সে কতবার ছুঁয়ে দেখেছে। কি কোমল, মায়াবী মুখ তার খান সাহেবের। কি নরম হাসি তার ঠোঁটে। কিন্তু এখন? সুমুর কাছে এখন এই মানুষটিই যেন এক অচেনা, অবিশ্বাস্য, ভয়ংকর মানুষ। সে অপেক্ষায় রইল ভেতরে কি হচ্ছে, সেটা দেখার জন‍্য।

চেয়ারের হাতালে হাত রেখে ধীরে উঠে দাঁড়াল শেরাজ। মাথা নিচু গার্ডরা এক ঝটকায় আরও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। একজন গার্ড বিনা শব্দে এগিয়ে এসে শেরাজের হাতে একটা ধাতব কালো হ্যান্ডগান আর একটা সাইলেন্সার এগিয়ে দিল। পাশে রেখে গেল একটা বড় বক্স। শেরাজ চোখ নামিয়ে সাইলেন্সার হাতে নিয়ে সেটার ওজন একবার হাতে মেপে নিল। মেঝেতে পড়ে থাকা মধ্যবয়সী লোকটা ক্ষীণ গলায় কেঁপে উঠে ফিসফিস করে কিছু বলার চেষ্টা করল। শেরাজ কোনো শব্দ করল না। এক পা এগিয়ে লোকটার ঠিক সামনে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো দয়া নেই, কোনো দ্বিধা নেই। গা-ছমছমে নীরবতার মধ্যে শোনা যাচ্ছে কেবল আহত লোকটার গলা থেকে বের হওয়া ক্ষীণ গোঁ গোঁ শব্দ আর দূরে থাকা কোনো পুরনো দেয়ালঘড়ির টিকটিকি শব্দ।
দুজন লোক এসে লোকটাকে ধরল। তার হাত-পা চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিল যেন নড়াচড়া করার উপায় না থাকে। লোকটার শরীরে একটুও বস্ত্র নেই। শেরাজের ঠোঁটের কোণে ক্ষুদ্র অথচ শীতল হাসি ফুটে উঠল। সে পাশে রাখা বক্স থেকে একটা ধারালো ছুরি বের করে ধীরে এগিয়ে গেল লোকটার কাছে। চোখে চোখ পড়তেই লোকটা শ্বাসকষ্টের মতো করে কাঁপতে কাঁপতে প্রাণভিক্ষা চাইতে শুরু করল। কিন্তু শেরাজের চোখে কোনো করুণা নেই। সে হঠাৎ ভয়ংকরভাবে হেসে উঠল। এক হাত দিয়ে মৃতপ্রায় লোকটার ক্ষতবিক্ষত বুকের ওপর চেপে ধরল, আরেক হাতে ছুরিটা খুব সযত্নে বসিয়ে দিল লোকটির ত্বকের ওপর। প্রথমে আলতো করে টান দিতেই, চামড়ার নিচের লালচে মাংস ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হতে লাগল।

লোকটার গগন ফাটিয়ে চিৎকার করতে লাগল। শেরাজের হাত একদম স্থির। ক্ষুরধার ছুরিটা দিয়ে সে যেন কোনো শিল্পীর মতো নিখুঁতভাবে চামড়া আলাদা করছে। রক্ত গড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে টুপটাপ শব্দ করে। শেরাজ সেই শব্দে আর লোকটার চিৎকারে অদ্ভুত শান্তি খুঁজে পাচ্ছে। কাটা চামড়ার খন্ডগুলো একে একে খুলে নিয়ে সে মাটিতে ফেলে দিল। লোকটার পুরো শরীরের চামড়া ছাড়িয়ে সে ক্ষান্ত হলো। তার ঠোঁটে এখনো সেই অমানবিক হাসি। সে একবার তাকাল স‍্যান্ডির দিকে। তার চোখের সেই ঠাণ্ডা ইশারাতেই স‍্যান্ডি মরিচ আর লবণের কৌটা এগিয়ে দিল। শেরাজ ধীরে ধীরে লোকটার ক্ষতবিক্ষত রক্তে ভেজা শরীরের উপর ঝুঁকে গিয়ে সে লোকটার শরীরের ওপর লবণ আর মরিচের গুড়ো একসাথে মাখিয়ে দিল। লবণ মরিচের তীব্র ঝাঁজে, খোলা মাংসের গহ্বরে লবণ আর মরিচ গলে গিয়ে হাড় পর্যন্ত পোড়াতে লাগল লোকটার।
লোকটা প্রথমে গরগর শব্দ তুলল। তারপর গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করতে করতে গগন বিদীর্ণ করে চিৎকার ছড়িয়ে দিল ঘরের চারপাশে।

ঘরের বাতাসে রক্তের লবণাক্ত গন্ধ আর মরিচের ঝাঁজ মিলেমিশে এক বিভীষিকাময় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। এতোও যেন শেরাজের তৃপ্তি মিললো না। স‍্যান্ডি এসে শেরাজের হাতে পানি ঢেলে দিল। শেরাজ ভালো করে হাত ধুয়ে নিল। তারপর বক্সের ভেতরে থাকা ছোটো ড্রিল মেশিনটার দিকে হাত বাড়াল। মেশিনের সুইচ চাপ দিতেই মেশিনের ঘূর্ণির শব্দ জেগে উঠল। মেশিনটা একবার বাতাসে ঘুরিয়ে নিয়ে শেরাজ এক নিঃশ্বাসে লোকটার মুখের সামনে ঝুঁকে পড়ল। লোকটা প্রাণপণে মাথা নাড়াতে চাইল, হাত-পা ছুঁড়তে চাইল, কিন্তু শক্ত দড়ির বাঁধনে ফলে সে পারল না নড়তে।
শেরাজ কোনো কথা বলল না। একটুখানি হেসে লোকটার ডান চোখে ড্রিলটা চেপে ধরল। প্রথম চোখটার ভেতরের লালচে তরল ছিটকে পড়তেই লোকটার আর্তচিৎকার যেন রুমটা কাঁপিয়ে দিল। ড্রিলের তীক্ষ্ণ শব্দ আর মাংস ছিদ্র করার গন্ধ মিলেমিশে চারপাশে আবারও এক অবর্ণনীয় বিভীষিকা ছড়িয়ে দিল। এক চোখ শেষ হতেই শেরাজ দম নিল। তারপর ঠাণ্ডা ভঙ্গিতে ড্রিলটা তুলে আনলো লোকটার আরেক চোখের পাতাতে।

লোকটার শরীর ছটফট করতে করতে একসময় ঢলে পড়তে চাইল। কিন্তু শেরাজ শক্ত হাতে তার চুলের মুঠি চেপে ধরে রাখল। সে আবারও ড্রিলটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল লোকটার বুকের কাছে। এক হাত দিয়ে লোকটার বুকের বা’পাশে ড্রিলটা চেপে ধরল, আরেক হাত দিয়ে মেশিনের সুইচ টিপে দিল। ঘূর্ণির শব্দে চারদিক কেঁপে উঠল। ঘূর্ণির সেই শব্দের আর্তনাদ ছাপিয়ে বেরিয়ে এলো রক্তের ঝাপটা। লোকটার বুকের বাম পাশে ড্রিল মেশিন আস্তে আস্তে গেঁথে যেতে লাগল। হাড় ভাঙার ভাঙচুর শব্দে ঘরটা যেন রক্তে আর মৃত্যুর গন্ধে ভরে উঠল। লোকটার গলা দিয়ে বেরিয়ে এলো একরাশ বেসামাল চিৎকার। শেরাজের চোখে তখনো কোনো দয়া নেই। ড্রিল মেশিন থামিয়ে ধীরে ধীরে সে নিজের হাতটা লোকটার ক্ষতস্থানে ঢুকিয়ে দিল। তার রক্তে ভেজা আঙুলগুলো বুকের খাঁচার ভেতর গিয়ে এক ঝটকায় ছিঁড়ে আনলো লালচে, উষ্ণ কলিজাটা। লোকটার চোখ স্থির হয়ে গেল। তীব্র আর্তনাদ থেমে গেল তার। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে মাথাটা ডানপাশে কাত হয়ে পড়ে গেল। শেরাজ রক্তমাখা হাত উঁচিয়ে ধরা সেই ছিন্ন কলিজার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে সেই একই শীতল, ভয়ঙ্কর হাসি ফুটিয়ে তুললো। কলিজাটা হাতের মুঠোয় ধরে সে এক উন্মাদের মতো হাসল। মরা লোকটার মুখের কাছে কলিজাটা দোলাতে দোলাতে বলল,

“এই দেখ, তোর ছোট্ট কলিজা। এইটুকু, ছ‍্যাহ! কি হলো? দেখ।”
ঘরের বাতাস যেন আরও ভারি হয়ে এলো। স‍্যান্ডি ভয়ে কাঁপা গলায় বলল,
“স্যার, ও মারা গেছে।”
শেরাজের হাসি থেমে গেল। সে ভালো করে তাকাল মৃতদেহটার দিকে। লোকটার ক্ষতবিক্ষত বুক, ফাঁকা চোখের কোটর আর ছিন্নবিচ্ছিন্ন মাংসের গন্ধে সারা ঘরটা যেন একটা বদ্ধ জবাইখানার মতো লাগছে। শেরাজ ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপের রেখা ফুটিয়ে বলল,
“ছ‍্যাহ! এতো তাড়াতাড়ি মারা গেল। এই আজরাইল বাবাজিও না, কি যে করে। আমার থেকেও কম ধৈর্য্য তার। আর একটু পরে জানটা নিলে কি এমন হতো? বেচারা, নিজের কলিজাও দেখতে পারল না।”
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাসে শেরাজ যেন রুমের দম বন্ধ গন্ধটা বুক ভরে টেনে নিল। হাতের ছিন্ন কলিজাটার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল,

“ইশ! আমারই খারাপ লাগছে রে। বেচারার সাথে আর একটু খেলা করা যেত।”
স্যান্ডির কণ্ঠ তখন থরথর করে কাঁপছে। সে কথা বলার সাহস জুগিয়ে নিচু গলায় বলল,
“স্যার, বাঁচলেও দেখতে পেতনা। কারণ, আপনি তো ওর চোখ দুটোই আগে নষ্ট করে ফেলেছেন।”
শেরাজ স‍্যান্ডির কথায় হাসল। সে হাতে থাকা ছিন্নভিন্ন কলিজাটাকে ঠোঁটের কাছে তুলে একবার শুঁকে নিয়ে মুখটা বিকৃত করে বলল,
“ছ‍্যাহ! টু মাচ বাজে স্মেল।”

সে নিস্তেজ দেহটার বুকের কাছে ফেলে দিল ছিঁড়ে আনা জীবনের শেষ চিহ্নটুকু। বক্সের পাশে থাকা গ্রাইন্ডিং মেশিনটা এক ঝটকায় তুলে নিল হাতে। মেশিনটার ভারি গোঁ গোঁ শব্দ যেন মুহূর্তে গোটা ঘরটাকে আরও আতঙ্কে ভরিয়ে ফেলল। স্যান্ডি শেরাজের চোখের দিকে তাকাল। শেরাজ যেন এখন কোনো মানুষ নয়, একেবারে শিকারি জন্তুর চেয়েও ভয়ঙ্কর। সে ধীরে ধীরে পা টেনে মৃত লোকটার মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। হাতের গ্রাইন্ডিং মেশিনটা লোকটার চুলের ভেতর দিয়ে কপালের মাঝ বরাবর চেপে ধরল। আর ঠিক তখনই ঘূর্ণি ব্লেডটা এক অমোঘ মৃত্যুদূতের মতো ছুটে চলল মাথার ভেতর। এক ভয়াবহ শব্দে চামড়া, হাড়, মগজ সব ছিঁড়ে ভেতরের দিক থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল। রক্তের তপ্ত ধারা ছিটকে এসে শেরাজের গায়ের শার্টের ওপর ছোপ ছোপ লাল দাগ এঁকে দিল। ধীরে ধীরে মাথাটা দুইভাগে ভাগ হতে শুরু হলো। খুলির ফাঁকা গলে মগজের পিচ্ছিল অংশ ছিটকে পড়ল টেবিলের লোহার ধারে। শেরাজ তারপরও থামল না। মেশিনটা বুকের খাঁচা, পেটের ভেতর দিয়েও নামিয়ে আনলো নিখুঁত অভ্যস্ত হাতের জোরে। সবশেষে তলপেটের শেষ সীমানায় এসে গ্রাইন্ডিং মেশিনটা হঠাৎ থামিয়ে দিল। এক মুহূর্তের জন্য ঘরে নেমে এলো হাড় কাঁপানো নিস্তব্ধতা।
স্যান্ডির চোখ তখন বিস্ফারিত। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে এই গন্ধে, এই দৃশ্যে। সে একবার রুমটায় চোখ বুলালো। পুরো রুম জুড়ে ছিন্নভিন্ন দেহের অংশ পড়ে আছে। মাথার অর্ধেক দু’দিকে ছড়িয়ে, পেটের ভেতরটা উন্মুক্ত আর মাংসের টুকরোর সাথে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে নিচে। শেরাজের ঠোঁটের কোণে আবারও এক ধরনের বাঁকা অমানুষিক হাসি ফুটে উঠল। সে নিচু স্বরে বলল,

“ওর ডিক আলাদা কাঁটব।”
স্যান্ডি ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে রইল। কিছু বলার সাহসই হলো না তার। শেরাজ ধীরে ধীরে গিয়ে ধারালো ভারী এক চাপাতি তুলে আনলো। এক হাতে লোকটার ক্ষতবিক্ষত শরীরটাকে শক্ত করে চেপে ধরে, আরেক হাতে সেই চাপাতি তুলে লোকটা যৌনাঙ্গে কোপ বসাল। এক কোপে পুরো যৌনাঙ্গ ছিন্ন হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। শেরাজ বক্স থেকে এক টুকরো টিস্যু বের করে আনলো। ছিন্ন অঙ্গটাকে টিস্যুতে মুড়ে হাতে তুলে নিয়ে সে তাকাল সেই রক্তাক্ত মাংসপিণ্ডের দিকে। সে গলা ছেড়ে হেসে উঠল, যেন এই নিষ্ঠুরতায়ই তার তৃপ্তি। হাসতে হাসতে বলল,
“এটা কুত্তাকে খাওয়াব, ডিক স্টু বানিয়ে।”
শেরাজ মাংসপিন্ডটা পাশে সরিয়ে রাখল। গ্রাইন্ডিং মেশিনটা হাতে নিয়ে লোকটার তলপেটের শেষ অংশ থেকে শুরু করল কাজ। মেশিনের ঘূর্ণির আওয়াজ আবারও ঘরটাকে কাঁপিয়ে তুললো। মেশিনের ধার আগ্রাসী হয়ে লোকটার শরীরের মাংসের গাঁটগুলো ছিঁড়ে ফেলতে শুরু করল। শেরাজ যেন একটা নির্মম শিল্পীর মতো একে একে শরীরের শেষ প্রান্ত থেকে শুরু করে দেহটাকে দুই ভাগে ভাগ করে দিলো। লোকটার শরীর একদম দু’ভাগ হয়ে গেল। কিন্তু শেরাজ থামল না। তার হাতে ধরা গ্রাইন্ডিং মেশিন যেন এক পশুর হুঙ্কার। ক্রমাগত শব্দ করে লোকটার মাংস কুঁচি কুঁচি করে কাটতে লাগল সে। রক্তের ঝাপটা ছড়িয়ে পড়ল রুমটাতে।

সুমু এতক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মুখ চেপে ধরে সব কিছু দেখেছে। তার গা গুলিয়ে উঠেছে অনেকবার। চোখ ভরে উঠেছে অশ্রুতে। সুমু নিজের শরীরে কাঁটা বসার মতো এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করছিল। এমন শিহরণ যা শরীর চমকে দেয়, রক্ত জমাট বাঁধিয়ে দেয়। তবুও, নিজের মনকে জোর করে সামলে নিয়েছে সে, যেন নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা শক্তি নিয়ে যুদ্ধ করছে। অপারেশনের জায়গাটায় এখন এক বেদনাদায়ক অবস্থা। জায়গাটায় স্পর্শ করলেই যেন আগুনের শিখা ছুঁয়ে যাচ্ছে তার সারা শরীর। সে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না, যে এত কাছ থেকে, এত ভয়াবহ দৃশ্য সে নিজের চোখে দেখেছে, তাও তার নিজের সবথেকে বেশি ভালোবাসার মানুষটার থেকে। সুমুর পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা আর সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু, তার পা যেন জমাট বাঁধা। হাঁটার জন্য এক মুহূর্তের জন্যও সাড়া দিচ্ছেনা পা জোড়া। কষ্ট আর ব্যথা উপেক্ষা করে, ধীরে ধীরে সে পা এগিয়ে নিয়ে সিঁড়ির কাছে এলো। সিঁড়ির এক একটি ধাপ তার মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত ভার তার উপর এসে পড়ছে। তার শরীর অবশ হয়ে আসছে, কিন্তু সে থেমে থাকল না। অনেক কষ্টে নিজেকে টেনে সে উপরে উঠে এলো।

রুমে ঢুকে সুমু নিজেকে সামলানোর চেষ্টা শুরু করল। গলা শুকিয়ে গেছে তার। কাঁপা হাতে তিন গ্লাস ঠাণ্ডা পানি একটানা শেষ করল সে। তার চোখ স্বাভাবিক হওয়ার আগেই চোখ গেল আলমারির দিকে। সেখানে তাকিয়ে তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। পেটের ওপর দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে উঠে দাঁড়াল সে। ধীরে পায়ে হেঁটে গিয়ে দরজা লাগাল। আলমারিটা যতটা সম্ভব সরিয়ে পূনরায় জায়গায় রাখল। ধীরে ধীরে সাবধান হাতে আলমারির সব জিনিসগুলো একেকটা করে বেডের ওপর থেকে তুলে নিয়ে যত্নের সাথে গুছিয়ে রাখল। নিজেকে সামলানোর জন‍্য ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। ঠাণ্ডা পানি দিয়ে চোখ-মুখ ধুয়ে নিল। টাওয়েল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে। এসির তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে গা হেলিয়ে দিল বেডে।

শেরাজ নিজের কাজ সেরে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। তৃতীয় হলরুম থেকে বের হয়ে দ্বিতীয় হলরুমে ঢুকতেই সে চেনা কোনো অনুভূতি পেয়ে থেমে গেল। এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে মনোযোগ দিল। কয়েক সেকেন্ডে পর সে চোখ খুলে বাঁকা হাসল। ধীরে প্রথম হলরুমের দিকে এগিয়ে গিয়ে নিজের বেডরুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। শাওয়ারের ঠাণ্ডা পানির নিচে গিয়ে শরীরের ক্লান্তি ধুয়ে ফেলার জন‍্য ওয়াশরুমের দরজাটা বন্ধ করে লম্বা একটা শাওয়ার নিল। মাথা মুছতে মুছতে বেরিয়ে এসে মিররের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল শুকিয়ে, জামা-কাপড় সঠিকভাবে ঠিক করে নিজেকে পরিপাটি করে নিল। রুম থেকে বেরিয়ে হাতে থাকা ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে হলরুমের একদম শেষ প্রান্তে পৌঁছাল। সেখানে ছোট এক বোতাম চাপতেই একটি সুরঙ্গ খুলে গেল। শেরাজ ধীরে সেই সুরঙ্গ পেরিয়ে গেল। প্রায় বিশ মিনিট পথ হাঁটার পর, শেষে এক বড় সিঁড়ির সামনে এসে দাঁড়াল সে। ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে জঙ্গল পেরিয়ে নির্মল রাস্তার উপর এসে দাঁড়াল। নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গাড়ির দরজার তালা খুলে গাড়িতে উঠে বসল। ইঞ্জিন স্টার্ট করতে খান ম্যানশনের উদ্দেশ্যে গাড়িটি ছুটল।

খান সাহেব পর্ব ৫৫

রুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল শেরাজ। বেডের দিকে তাকিয়ে দেখল, সুমু ঘুমে বিভোর। শেরাজ ওয়াশরুমে গিয়ে চেঞ্জ করে এলো। চোখে মুখে আবারও হালকা পানি দিয়ে টাওয়েল উন্মুক্ত বুকের ওপর ঝুলিয়ে মিররের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভেজা টাওয়েলটা ডিভানের ওপর রেখে শুতে চলে গেল।
বেডের ওপর এসে একবার সুমুর দিকে তাকাল। সুমু অন‍্যদিকে পাশ ফিরে শুয়ে আছে। শেরাজ আলতো করে সুমুকে কোলে তুলে নিজের দিকে ঘোরালো। ব্লাঙ্কেটের নিচে গিয়ে সুমুর বুকের ভেতর মাথা রেখে ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো। কিছুটা সময় ব‍্যয় হতেই চোখ মেলে তাকাল সুমু।

খান সাহেব পর্ব ৫৭