Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৭১

খান সাহেব পর্ব ৭১

খান সাহেব পর্ব ৭১
সুমাইয়া জাহান

অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে এল রুমা বেগমের কণ্ঠস্বর—কণ্ঠটা অস্থির, কাঁপা, আর্তচিৎকারের মতো,
“শেরাজ বাবা! পিয়াস… পিয়াস নিজেকে শেষ করার চেষ্টা করছে। রক্তে ভেসে গেছে। আমরা হাসপাতালে আছি। ডাক্তাররা চেষ্টা করছে। অবস্থা খুবই খারাপ।”
এক মুহূর্তে রুমটার নিস্তব্ধতা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সুমু বুক ফেটে কান্না চেপে রাখতে না পেরে শেরাজের শার্ট আঁকড়ে ধরল।
শেরাজ চোখ বন্ধ করল,
“কোন হাসপাতালে?”
রুমা বেগম তাড়াহুড়া করে নাম বলল। শেরাজ শুনেই ফোন কেটে দিল। সে দু’হাত দিয়ে সুমুর কাঁধ চেপে ধরল,
“সুইটহার্ট, কান্না বন্ধ করো। আমরা এখনই যাচ্ছি।”

বিছানা থেকে নিজের ফোনটা নিয়ে পকেট থেকে গাড়ির চাবি বের করল। তারপর স‍্যান্ডিকে টেক্সট করল,
“স্যান্ডি! গাড়ি প্রস্তুত করো, এক সেকেন্ডও দেরি করবে না। আমরা এক্ষুনি হসপিটালের উদ্দেশ্যে বের হবো। আর গাড়ি বের করার আগে, সবাইকে লিভিংরুমে আসতে বলো।”
টেক্সট সেন্ড করে ফোনটা পকেটে রাখল। সুমু হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“খান সাহেব, ওনার যদি, যদি…”
শেরাজ মুখের এক পাশে চোয়াল শক্ত করে দাঁত চেপে বলল,
“কোনো যদি না। ও বাঁচবে, আমি কথা দিলাম।”
সে সুমুকে জড়িয়ে ধরে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে গেল। করিডর দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে সুমুর চোখে জল গড়িয়ে পড়ছে। শেরাজ এক মুহূর্তও নষ্ট করল না—সোজা লিভিং রুমে এসে সবাইকে বলল,
“পিয়াস! সুইসাইড অ্যাটেম্পট করেছে। ও এখন হাসপাতালে।”

এক মুহূর্তে পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হতবাক। নাজমিন হু হু করে কেঁদে উঠল। সামিয়া দাঁড়িয়ে ছিল রাহিনের পাশে। খবরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে রক্তশূন্যতা নেমে এলো। ঠোঁট শুকিয়ে গেল, চোখ বড় বড় করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল—ঠিক যেন পাথর হয়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ড কিছু বলতেই পারল না। তারপর হঠাৎ ফিসফিস করে বলল,
“আমার দোষ, সব আমার দোষ। যদি আমি ওনাকে এভাবে কষ্ট না দিতাম, যদি আমি…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই সামিয়া হু হু করে কেঁদে উঠল। রাহিন তাড়াতাড়ি তার কাঁধে হাত রাখল,
“না, সামু! এভাবে ভাবিস না। এটা তোর দোষ নয়। তুই দায়ী না।”
সামিয়া মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
“না, রাহিন ভাই! আমি জানি, সব আমার জন‍্য হয়েছে। আচ্ছা, উনি বেঁচে আছে তো?”
সে ভেঙে পড়তে যাচ্ছিল। রাহিন তাকে বুকের দিকে টেনে নিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল,
“শোন, এখন ভেঙে পড়লে হবে না। তোকে শক্ত থাকতে হবে।”
সামিয়া উন্মাদের মতো কাঁদছে, আর রাহিন একহাতে তার চোখের জল মুছে দিল। শেরাজ তখন গম্ভীর চোখে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমরা এখনই হসপিটালে যাচ্ছি। স্যান্ডি, গাড়িগুলো বের করো।”
বাড়ির ভেতর হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেল। শেরাজ সারবাজদের বাড়িতেই থাকতে বলল। সে রাহিন, আইয়ুব, নাজমিন, সামিয়া, স‍্যান্ডি আর সুমুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
বাইরে তখন অন্ধকারে হেডলাইটের ঝলক, গাড়ি স্টার্ট হয়েছে। শেরাজ সুমুকে আগলে গাড়িতে তুলল। নিজেই ড্রাইভিং সিটে বসল। একে একে সকলে উঠে বসল। গাড়ি ঝড়ের বেগে ছুটল হাসপাতালে দিকে।
সুমুর কান্না থামছে না, হাত কাঁপছে তার। শেরাজ এক হাত স্টিয়ারিংয়ে, আরেক হাত দিয়ে সুমুর হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে, যেন শুধু শব্দে নয়, স্পর্শেও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে,
“আমি আছি, সুইটহার্ট। আমি থাকতে তোমার ভাইয়ের কিছু হবে না।”
গাড়িগুলো হাইওয়ে ধরে উড়ে গেল। রাতের অন্ধকারে কাঁটা বাতাস, সড়কের আলো ঝলমল করে ছুটে চলছে গাড়ি। এখন সবার মনে একটাই কথা, “দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে হবে।”

হাসপাতালের করিডরে গুমোট নীরবতা। সাদা লাইটের তীব্র আলোয় সবার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আছে। দূরে কোথাও মনিটরের বিপ বিপ শব্দ, নার্সদের দ্রুত চলাফেরা—সব মিলিয়ে যেন একটা অস্থির পরিবেশ। লোহার বেঞ্চে মাথায় হাত দিয়ে চুপচাপ বসে আছেন মুস্তাক সিকদার। শক্ত পুরুষ, অথচ আজকে ভেঙে পড়েছেন। ভেতরে ভয়, অপরাধবোধ, কিন্তু মুখে কড়া ভাবটা চাপা পড়েনি। একটু দূরে বসে আছেন সুমি বেগম। অশ্রুতে ভিজে গেছে ওড়না, চোখ ফুলে লাল হয়ে গেছে। বুক চাপড়াতে চাপড়াতে কাঁদছেন,
“আমার ছেলেটা মরে গেলে আমি বাঁচব কীভাবে আল্লাহ।”
ফারিন হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাঁধ জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে,
“আম্মু, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো। কিছু হবে না ভাইয়ার। কিছু হবে না।”
কিন্তু তার নিজের কণ্ঠই কাঁপছে, চোখে জলের ধারা থামছেই না। একপাশে পিয়াসের বন্ধুরা দাঁড়িয়ে আছে। কারো চোখে আতঙ্ক, কারো চোখে অপরাধবোধ—কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। কেবল সবার দৃষ্টি আইসিইউর লাল বাতির দিকে। মাঝে মধ্যে ভেতর থেকে নার্সরা তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে আসছে, আবার ঢুকে যাচ্ছে। প্রত্যেকবার দরজা খোলার সাথে সাথে সবার বুক কেঁপে উঠছে।
হঠাৎ করেই করিডরে ডাক্তার এলেন। মুখে গম্ভীর ছাপ। সবাই তার দিকে ছুটে গেল। সুমি বেগম কাঁদতে কাঁদতে ডাক্তারকে বললেল,

“ডাক্তার সাহেব, আমার ছেলেটাকে বাঁচান। প্লিজ বাঁচান।”
ডাক্তার গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন,
“ওর অবস্থা খুবই সংকটজনক। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। আমরা রক্ত দিচ্ছি, কিন্তু অবস্থা এখনও স্টেবল না। এখন সময়টাই ক্রিটিকাল। আপনারা প্রার্থনা করুন।”
কথাটা শোনার পর সবাই চুপ হয়ে গেল। করিডরে কেবল কান্নার শব্দ আর মনিটরের মেশিনের শব্দ ভেসে আসছে। হঠাৎ হসপিটালে ছুটে এলো শেখবাড়ির সকলে। ফারিয়া কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এলো। তাকে দেখে মুস্তাক সিকদার কড়া গলায় বললেন,
“তুমি এখানে কেন এসেছ? তোমার শশুর বাড়ির লোকদের নিয়ে চলে যাও এখান থেকে।”
ফারিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আব্বু! আব্বু আমি…”
“থামো! ডোন্ট কল মি আব্বু। আমি তোমার আব্বু নই।”
এমন অবস্থা দেখে ফারিন রেগে গেল। সে উঠে গিয়ে ফারিয়ার সামনে গিয়ে বলল,
“তুই এখানে কেন এসেছি? তোর না বিয়ে হয়েছে? এখন তো তোর বাসর ঘরে থাকার কথা। এখানে কি নাটক দেখতে এসেছি? যা এখান থেকে। তোদের কাছে অনুরোধ করছি, এখানে অন্তত কোনো ঝামেলা করিস না।”
ফারিয়া বোনের কথায় আকাশ থেকে পড়ল। সে চোখের পানি মুছে বলল,

“বোন, তুই আমাকে এভাবে বলছিস কেন? ভাইয়ার এই অবস্থা আর আমি…”
“কে তোর ভাই? তোর কোনো ভাই নেই। দয়া করে এখান থেকে চলে যা। তোর কাছে তো তোর শশুর বাড়ির সবাই, তোর স্বামী, তোর ভালোবাসা সবার আগে। আমরা তো তোর কেউ নই। আজ তুই কতো সহজে আমাদের ছেড়ে নিজের শশুরবাড়ির সবাইকে বেছে নিলি, আপু। আমি সত্যি তখন খুব অবাক হয়েছিলাম। সত্যি এতো সহজে মানুষ তার মা-বাবা, বোন-ভাইকে ভুলে যেতে পারে?”
ফারিয়া শক্ত কন্ঠে বলল,
“কোনোদিনও কাউকে ভালোবাসলে আজ আমার পরিস্থিতিটা তুই বুঝতি। তুই তো এখনো কাউকে…”
ফারিন একহাত উঁচু করে ফারিয়াকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“থাক! আর বড় বড় ডায়লগ দিসনা। আর শোন! আল্লাহর কাছে দু’বেলা নামাজে পড়ে কেঁদে এই প্রার্থনায় করব যে, এমন ভালোবাসা আমার জীবনে না আসুক, যে ভালোবাসা আমাকে আমার পরিবারের থেকে দূরে নিয়ে যাবার ক্ষমতা রাখবে।”
ফারিনের কড়া কথাগুলো ফারিয়ার হৃদয় ছিন্নভিন্ন করে দিল। শাহরুখ এসে ফারিয়াকে সরিয়ে নিয়ে গেল। মুহূর্তে করিডরের অস্থিরতা আরও বেড়ে গেল। মুস্তাক সিকদার কণ্ঠ উচ্চ করে বললেন,

“তোমরা সবাই চলে যাও। আমি এখানে কোন রকমের নাটক সহ্য করব না।”
শামীম সাহেব ঠাণ্ডা কন্ঠে বললেন,
“ভাই, এভাবে বলো না। আমরা সবাই পিয়াসের জন‍্য এখানে এসেছি। মানছি আজ সব আমাদের জন‍্য হয়েছে, কিন্তু এমন হবে আমরা কেউ তো ভাবতে পারিনি।”
মুস্তাক সিকদার কিছু বলার চেষ্টা করল, কিন্তু রুমা বেগম এগিয়ে এসে মাঝখানে দাঁড়ালেন। সে কণ্ঠে করুণ টান নিয়ে বললেন,
“এখানে ঝগড়া করে লাভ নেই। ভাই, আমরা সকলে পিয়াসের জন‍্য এসেছি। আপনি দয়া করে শান্ত হন।”
ফারিয়ার হাত জোড় করে বলল,
“দয়া করে আমাদের এখানে থাকতে দাও, আব্বু।”
সাখাওয়াত সাহেব মুস্তাক সিকদারের পাশে বসে বললেন,
“আমি তোমার অবস্থা বুঝতে পারছি, মুস্তাক। আমরা তো সবাই পিয়াসের ভালো চাই। আজ যা হয়েছে, সেটাতে তো আমাদের হাতে ছিল না। আর এখন এসব নিয়ে ভাববার সময়ও না। তুমি দয়া করে শান্ত হও।”
এরমধ্যেই সুমুরা এসে ঢুকল। সামিয়াকে দেখে যেন হসপিটাল করিডরে একটা ব্লাস্ট হলো। মুহুর্তের সকলে রেগে গেল। সুমি বেগম চিৎকার করে উঠলেন,
“এই মেয়ে এখানে কেন এসেছে? ও বুঝতে পেরেছি, এই মেয়ের তো আবার দেখতে হবে আমাদের এই দুর্দিন। মজা নিতে হবে তো। এই মেয়ে, তুই চলে যা এখান থেকে, না হলে আমি নিজে তোকে এখান থেকে বের করে দিব।”
ফারিনও ফুঁসে উঠল,

“তোকে দেখে আজ আমার আরও রাগ হচ্ছে, সামু। তোর জন্যই আজ ভাইয়ার এই অবস্থায়।”
সবাই একসঙ্গে তেড়ে এলো সামিয়ার দিকে। সামিয়া একটাও কথা বলল না। তার বুক ধড়ফড় করছে, চোখে পানি জমে আছে, তবু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। রাহিন হঠাৎ এগিয়ে এসে সামিয়ার হাত ধরে তাকে নিজের পিছনে টেনে আগলে নিয়ে বলল,
“এনাফ! অনেক হয়েছে, আর না। ওকে কিছু বলবেন না আপনারা। সামুর কোনো দোষ নেই। আজ যা হয়েছে, সেটা কারো হাতে ছিল না। দয়া করে এই মুহূর্তে অকারণে আরেকটা নাটক শুরু করবেন না।”
মুস্তাক সিকদার গর্জে উঠলেন,
“তুমি কে? তুমি এখানে বড় জ্ঞান দিচ্ছো। তোমাদের জন‍্যই আজ এসব হয়েছে। আমার ছেলের এই অবস্থার জন‍্য তোমরাই দায়ী।”
রাহিন শান্ত অথচ শক্ত স্বরে উত্তর দিল,
“আঙ্কেল, আপনি যা ভাবছেন সেটা ভুল। আমি জানি এই সময় রাগ করার অধিকার আপনাদের আছে। কিন্তু ওকে দোষারোপ করে লাভ নেই। এখন একটাই দরকার—পিয়াসের জন্য সবাই এক হয়ে দোয়া করা।”
সামিয়ার চোখ ভিজে গিয়েছে। সে রাহিনের হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“আমার জন‍্যই এসব হয়েছে। আমার হয়তো এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। আমি থাকলে সবার কষ্ট আরও বাড়বে।”
রাহিন এক ঝলক তাকাল সামিয়ার দিকে গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

“না, এখন তুই কোথাও যাবি না।”
ওদের কথার মধ্যেই হঠাৎ ডাক্তাররা পিয়াসকে নিয়ে এলো। শরীর রক্তাক্ত, হাত-পায়ের কাটায় ব‍্যান্ডেজ, ঘাড়ে গর্তের কিছু চিহ্ন। আইভ লাইন বসানো হয়েছে, ব্লাড গ্রুপিং করা হয়েছে, কাঁটা দাগে সাটার দিয়ে রক্ত থামানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সুমি বেগম, মুস্তাক সিকদার, সাখাওয়াত সাহেবরা সবাই একসাথে ডাক্তারের চারপাশে জড়ো হয়ে পড়ল। পাখির হৃৎস্পন্দনের মতো মনেও তাল-গতি দ্রুত বেড়ে গেল সকলের। একজন সিনিয়র চিকিৎসক ধীর কণ্ঠে বলল,
“প্লিজ, সকলে দূরে থাকুন। আপনাদের থেকে ওনার ইনফেকশন হতে পারে। ওনাকে এখন স্ট্যাবিলাইজ করা হচ্ছে। হেমরেজি আছে, আমরা কয়েকটি স্টপার করব। রক্তের মাত্রা নিচে নামছে—কমপক্ষে আরও দুই ইউনিট ব্লাড লাগবে। এনটিবায়োটিক, ফ্লুইড, আর জরুরি সিউচার লাগবে। ওর অবস্থা কোমায় নেমে যেতে পারে—সতর্কতা হিসেবে ইন্টুবেশন করা হতে পারে।”
সামিয়ার চোখে যেন পৃথিবী ঘুরে গেল। তার ভেতর থেকে একটাই শব্দ বেজে উঠল,
“তোর দোষ, তোর দোষ সব।”
রাহিন ত্বরিতভাবে সামিয়া ধরে ধীর কণ্ঠে বলল,
“শক্ত থাক সামু।”
সামিয়ার কানে কোনো কথা গেল না। শেরাজ ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করল,
“আর কত সময় লাগবে?”
“প্রাথমিক অস্ত্রোপচারের মতো কাজ চলছে—রক্ত থামানো, অভ্যন্তরীণ জখম দেখা। আমরা ওকে ওয়ার্ডে নেব—ভেন্টিলেশন বা আবারও আইসিইউ প্রয়োজন হলে জানাব। রাতটা কঠিন হবে, আপাতত ওনাকে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে।”
সুমি বেগমের চোখ পিয়াসের দিকে। তিনি হাসপাতালের লাইটে ছেলের মুখটা দেখছে। কাঁটা-চিহ্ন, রক্ত—সব মিলিয়ে এক বিধ্বস্ত পিয়াস। করিডরটা যেন হঠাৎ জমাট বাঁধা বাতাসে ভারি হয়ে উঠল। সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে। সুমি বেগম হঠাৎ পিয়াসের স্ট্রেচারের পাশে হাঁটুমুড়ে বসলেন। হাত বাড়িয়ে ছেলের মুখ ছুঁতে চাইতেই ডাক্তার নার্সরা তাকে থামিয়ে দিল,

“প্লিজ, এখন কাছে আসবেন না। ইনফেকশনের ঝুঁকি আছে।”
সুমি বেগম ছেলেকে স্পর্শ করতে না পেরে ফুঁপিয়ে কাঁদলেন,
“আল্লাহ! আমার ছেলেটা…”
মুস্তাক সিকদারের বুক ফেটে যাচ্ছে তবুও নিজেকে শক্ত করে রাখলেন। সবার সামনে তিনি দুর্বল হতে চান না। কিন্তু চোখে লুকানো পানিটা গড়িয়ে পড়ল। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
“আমার ছেলের এই অবস্থায় জন‍্য আমি কাউকে ছেড়ে দিবনা। সবার আগে কেস করব ওই মেয়েটার নামে।”
এই এক কথায় করিডরে আবার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। ফারিন ফুঁসে উঠল, চোখ ঘুরে গেল সামিয়ার দিকে। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“সবই ওই মেয়ের জন্য হয়েছে। ভাইয়া ভালোবাসল যাকে, সেই ভালোবাসাই আজ ওকে শেষ করে দিচ্ছে।”
সামিয়া কেঁপে উঠল, বুকের ভেতর আগুনে পোড়ার মতো পোড়া অনুভূতি হচ্ছে তার। ঠোঁট কাঁপছে, কিছু বলতে পারল না। শুধু চোখ থেকে টুপটাপ পানি ঝরছে। রাহিন ঝট করে সামনে এসে দাঁড়াল,
“এনাফ, ফারিন, একটাও বাজে কথা বলবে না। এখানে সবাই কষ্ট পাচ্ছে, সব দোষ সামুর ওপর চাপিয়ে দিলে কারও উপকার হবে না।”
ফারিন চিৎকার করে বলল,

“আপনি চুপ করুন। আপনি কি অন্ধ নাকি? আপনারা এসবের জন‍্য দায়ী। আর এখন এখানে এসেছেন বউয়ের হয়ে বড় বড় সাফাই গাইতে।”
রাহিন কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে উত্তর দিল,
“না, আমি শুধু সত্যিটাই বলছি। পিয়াসের যন্ত্রণার জন্য সামিয়া একা দায়ী না। জীবন-মরণ আল্লাহর হাতে। সামু তো পিয়াসকে বলেনি, এসব করতে। আর তোমাদের তো এখন ওর জন‍্য দোয়া করা উচিত। তা না করে, তোমরা দোষ দিতে ব‍্যস্ত আছো।”
ফারিন চুপ হয়ে গেল। সুমি বেগমের কান্নার শব্দ গমগম করছে করিডরে। শেরাজ হঠাৎ সবার দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“সবাই চুপ করুন। ডাক্তাররা তাদের কাজ করছে। এখন আমাদের করণীয় একটাই—ওর জন্য দোয়া করা। এখানে ঝগড়ার কোনো মানে নেই।”
সুমু আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে ফারিয়ার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“কেঁদোনা। ভাইয়া সুস্থ হয়ে যাবে।”

নার্সরা পিয়াসকে ওয়ার্ডে নিয়ে যেতে শুরু করল। সবাই একসাথে চোখ মেলে তাকাল—অবুঝ, অচেতন, যন্ত্রণায় ভাঙা পিয়াস যেন মৃত্যুর সাথে লড়ছে। সকলের এক দীর্ঘ নিশ্বাসের পর নার্সরা চুপচাপ স্ট্রেচারটিকে টেনে নিয়ে চলে গেল। হলের দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে করিডরের নিস্তবতা যেন আরো গভীর হলো।
ডাক্তারের একজন এসে সকলের উদ্দেশ্যে ধীর কণ্ঠে বললেন,
“ওনার অবস্থা ক্রিটিক্যাল। সেলাই, ব্লাড, ইনট্রাভেনাস ফ্লুইড চালানো হচ্ছে। আপাতত ওনাকে ওয়ার্ডে নেয়ার পর রেকর্ডিং ও মনিটরিং শুরু হবে। আপনাদের সবাইকে খুব বেশি ভিড় করতে দেবো না — রুমে সীমিত লোকেই ঢুকতে পারবেন। আর হ‍্যাঁ, এইটা হসপিটাল। এখানে আরও অনেক পেশেন্ট আছে। আপনাদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ, আপনাদের পার্সোনাল ম‍্যাটার নিয়ে এখানে আর কোন সিন ক্রিয়েট করবেন না।”
কথাগুলো বলে ডাক্তার চলে গেল। সুমি বেগম মেঝেতে বসে কাঁদছে। মুস্তাক সিকদার মাথা নিচু করে নিজের হাত ঘষছে। ফারিন কাঁদছে, ফারিয়ার চোখ লাল কিন্তু অপ্রতিরোধ্য। সামিয়া নাজমিনের কাঁধে মাথা রেখে নীরবে বসে আছে। হঠাৎ সুমি বেগম উঠে বললেন,

“এই মেয়ে, আমি কোনো ঝামেলা চাইনা। তুমি আর একমিনিটও এখানে থাকবে না। উঠো, বেরিয়ে যাও এখান থেকে। আমার ছেলে সুস্থ হবার পর, তোমাকে দেখলে আবারও অসুস্থ হয়ে পড়বে। আমি তোমার কাছে হাত জোর করছি, দয়া করে চলে যাও।”
শামীম সাহেব এগিয়ে এসে বললেন,
“তোমার এখানে আসার তো কোনো প্রয়োজন ছিল না। তুমি চলে যাও তোমার স্বামীকে নিয়ে।”
হাসি বেগম স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,
“সুমি আপা না হয় ছেলের শোকে এসব বলছে। কিন্তু তুমি? তুমি কেনো আমার মেয়েটার সাথে এমন করছো?”
পেছন থেকে সাখাওয়াত সাহেব বললেন,
“শামীম ভুলটা কি বলেছে? তোমার মেয়েকে চলে যেতে বলো।”
শেরাজ ধীর দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“ডক্টরের নির্দেশ মেনে চলুন। অপ্রয়োজনীয় কথা বাড়াবেন না।”
সুমু, শেরাজের কাছে গিয়ে বলল,
“রাহিন ভাইয়াকে বলুন, সামুকে নিয়ে বাসায় ফিরে যেতে।”
শেরাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাহিনকে বলল, ‘সামুকে নিয়ে চলে যেতে।’ রাহিন সামিয়ার কাছে গিয়ে ধীরে ধীরে তার হাত ধরল। সামিয়ার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু ঝরে পড়ছে। সে বলল,
“আমি যাবো না, রাহিন ভাই। এসব আমার জন‍্য হয়েছে। আমি ওনার জন্য দোয়া করতে চাই, ওনার পাশে থাকতে চাই।”
রাহিন গভীর নিঃশ্বাস ফেলে সামিয়ার দুই কাঁধে হাত রেখে বলল,

“সামু, শোন! পাশে থাকা মানে, সবসময় সামনে বসে থাকা না। ওর পাশে থাকার আসল মানে হলো, ওর জন্য দোয়া করা, ভরসা রাখা। এখানে থাকলে শুধু অশান্তি বাড়বে, আর সেটা পিয়াসের জন‍্য ভালো হবে না। তুই তো দেখেছিস, সবাই কেমন করে তোর দিকে আঙুল তুলছে। আমি চাই না, তোর দিকে আর কেউ আঙুল তুলে বাজে কথা বলুক।”
সামিয়া চোখ মুছে বলল,
“কিন্তু, যদি ওনার কিছু হয়ে যায়?”
রাহিন নরম স্বরে উত্তর দিল,
“আল্লাহর হাতে সবকিছু, সামু। তুই বিশ্বাস রাখ। আর তুই একা না—আমি আছি তোর সাথে। তুই কাঁদবি না, তুই দুর্বল হবি না। এখন আমার সাথে চল।”

খান সাহেব পর্ব ৭০

সামিয়ার বুক ভারি হয়ে এলো। তার চোখে অসহায়ের মতো শূন্যতা, তবুও রাহিনের দৃঢ়তা তাকে কিছুটা শান্ত করল। সে ধীরে মাথা নুইয়ে নীরবে সম্মতি দিল। রাহিন তার হাত শক্ত করে ধরে করিডর থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল। আইয়ুব তাদের একটু এগিয়ে দিয়ে আসতে গেল। করিডরের আলো পিছনে ফেলে তারা বেরিয়ে গেল, আর ভেতরে থেকে ভেসে এলো সুমি বেগমের কান্নার শব্দ আর মেশিনের টিকটিক শব্দ।

খান সাহেব পর্ব ৭১ (২)