খান সাহেব পর্ব ৭৬
সুমাইয়া জাহান
গাড়ির কাচের ভেতর দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে সুমু। ওমানের রাস্তায় আলো জ্বলে আছে। লম্বা হাইওয়ের দুপাশে ডেট পাম গাছের সারি যেন ঝিকমিক করছে বাতির আলোয়। চারপাশের বাতাসে আছে শুষ্কতার গন্ধ, তবুও সুমুর মনে হচ্ছে—এই শুষ্কতার মাঝেই লুকিয়ে আছে এক নতুন জীবনের শুরু। গাড়িগুলো যখন শহরের ভেতর থেকে বের হয়ে খান ম্যানশনের রাস্তায় ঢুকল, তখন তার মনের মধ্যে অন্যরকম ভালো লাগা জেগে উঠল।
দূর থেকে খান ম্যানশনের বিশাল গেট চোখে পড়তেই সুমুর বুক কেঁপে উঠল। গেটের উপর সোনালি ইংরেজি হরফে বড় বড় করে লেখা “খান ম্যানশন”। বাড়ির ভেতরের আলোর ঝলকানিতে চারপাশটা আরও জাঁকজমকপূর্ণ দেখাচ্ছে। গেট খুলতেই ভেতর থেকে নিরাপত্তারক্ষীরা একসাথে স্যালুট দিল। গাড়িগুলো ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকতে লাগল। প্রশস্ত ড্রাইভওয়ের দু’পাশে সাজানো ফুলের টব আর খেজুরগাছ যেন এক রাজকীয় পরিবেশ তৈরি করেছে।
সুমু জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল—সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন অনন্যা খাতুন, সাহাবাজ খান, আফিয়া খাতুন আর শেহেজাদ খান। সকলের চোখে যেন আনন্দ আর স্বস্তি। তাদের দেখেই মনে হচ্ছে, তারা যেন এই মুহূর্তটার জন্যই তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন।
গাড়ি থামতেই শেরাজ আগে দরজা খুলে নেমে এলো। সে হাত বাড়িয়ে সুমুকে নামাল। সুমুর পায়ে মাটির সাথে লাগতেই এক অদ্ভুত কাঁপুনি যেন উঠল শরীরে। খান ম্যানশনের বাড়ির মাটিতে পা রেখে তার আজ আবারও মনে হচ্ছিল—এখানেই তার নতুন জীবন, নতুন পথচলা।
সাহাবাজ খান হাসিমুখে এগিয়ে এসে শেরাজকে জড়িয়ে ধরলেন। তার চোখে যেন স্বস্তি ভরা জল চিকচিক করছে। তিনি বললেন,
“বেটা আমার, আলহামদুলিল্লাহ! অবশেষে তোমরা সবাই নিরাপদে পৌঁছেছো।”
তারপর তিনি সুমুর দিকে তাকালেন। সুমু নিচু হয়ে সালাম করতেই তিনি মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“স্বাগতম মামনি। এটাই তোমার ঘর। তুমি এখানে না থাকলে, কেমন যেন সব শূণ্য লাগে”
অনন্যা খাতুন তখন এগিয়ে এসে সুমুকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি চোখের পানি মুছে বললেন,
“আমার মেয়েটা এলো অবশেষে।”
পাশ থেকে আফিয়া খাতুন এগিয়ে এলেন। তিনি সুমুর মাথায় আলতো হাত রেখে বললেন,
“ক্লান্ত তো? ভেতরে এসো।”
সুমুর চোখ ভিজে, কিন্তু ঠোঁটে লাজুক হাসি। এই উষ্ণ অভ্যর্থনা যেন তার সমস্ত ক্লান্তি মুছে দিল।
ওদিকে, একে একে নাজমিন, সামিয়া, রাহিন, আইয়ুব, আর অন্য সবাইকে স্বাগত জানানো হলো। বড়রা ছোটদের জড়িয়ে ধরলেন, ছোটরা বড়দের সালাম করল। সাহাবাজ সাহেবরা সবাইকে নিয়ে ভেতরে ঢুকল। খান ম্যানশনের ড্রয়িংরুম ভরে উঠল হাসি-আনন্দ আর কোলাহলে।
ড্রয়িংরুমে আসতেই সুমু অনন্যা খাতুন আর আফিয়া খাতুনকে চুপিসারে এক পাশে টেনে নিল। সে নরম গলায় বলল,
“আমার দেখাশোনা পরে করবেন। আগে বাড়ির নতুন বউকে ঘরে তুলুন। ইনায়া অনেক নার্ভাস হয়ে আছে। আমি আর ইশিতা আসার সময় ওকে অনেক বুঝিয়েছি। এখন আপনাদের পালা।”
অনন্যা খাতুন হেসে সুমুর কাঁধে হাত রাখলেন।
“অবশ্যই! নতুন তিন বউকেই বরণ করে ঘরে তুলব। শুধু কি সারবাজ আমাদের ছেলে নাকি? আইয়ুব আর রাহিনও এই বাড়ির ছেলে। তাদের বউ সামিয়া আর নাজমিনকেও তো বরণ করে নিতে হবে।”
কথাটা শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আফিয়া খাতুন গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললেন,
“ঠিকই বলেছেন, ভাবি। আজ আমাদের খান ম্যানশনের জন্য তিন তিনটা নতুন আলো এসেছে। এই আলোগুলোকে আমরা যত্নে, ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখব।”
এদিকে ড্রয়িংরুমে কোলাহল জমে উঠেছে। সারবাজ, আইয়ুব আর রাহিন—তিনজনই নিজেদের বউয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সামিয়া চোখ নামিয়ে রেখেছে লাজুক ভঙ্গিতে। সে একটুও কথা বলছে না। নাজমিনের গাল লাল হয়ে উঠেছে। সবাই মাঝে মাঝে খুনসুটি করলে, সে মুচকি হেসে উত্তর দিচ্ছে। আর ইনায়ার চোখে ভরপুর ভয়। সে কখনো চারপাশ তাকাচ্ছে, আবার কখনো পালাতে চাইছে।
শেরাজ দূর থেকে সবটা লক্ষ করছিল। তার তীক্ষ্ণ চোখ বারবার গিয়ে থামছিল সুমুর উপর। সুমু যেন এই মুহূর্তে পুরো বাড়ির মধ্যমনি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ যদি থমকে যায়, সে ঠেলে এগিয়ে দিচ্ছে। কেউ যদি ভয়ে গুটিয়ে নেয়, সে সাহস জোগাচ্ছে।
অতঃপর অনন্যা খাতুন আর আফিয়া খাতুন একসাথে এগিয়ে গেলেন। আফিয়া খাতুন আলতো হেসে বললেন,
“চলো মামনিরা, তোমাদের একটু মিষ্টিমুখ করাই।”
অনন্যা খাতুন সুমুর উদ্দেশ্যে বললেন,
“আপনি এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে, রেস্ট নিন। আপনি কিন্তু এখন একা নন। এই শেরাজ, সুমুকে রুমে নিয়ে যা।”
সুমু নরমস্বরে বলল,
“একটু থাকিনা, আম্মু?”
“না! তুমি যাও।”
সুমু মন খারাপ করে চলে যাবার জন্য পা বাড়াতেই অনন্যা খাতুন বললেন,
“থাকো। তবে বেশিক্ষণ না।”
সুমু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। নাতাশা গিয়ে সুমুকে ধরে সোফায় বসিয়ে দিল।
শেহজাদ খান একটু গম্ভীর গলায় বললেন,
“তোদের বাকি বন্ধুরা কোথায়?”
শাহরুখ বলল,
“অমিত, স্যান্ডি ব্রোরা! স্যান্ডি ব্রোর বাড়িতে চলে গেছে।
আইয়ুব আর রাহিন সোফায় বসে শেরাজকে বলল,
“নিহালরা তো ফিরে গেছে। আমরাও ওদের সাথে চলে যেতাম।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর গলায় জবাব দিল,
“আঙ্কেল, আন্টি এখানে থাকেনা। আজ তোরা বউ নিয়ে ওই বাড়িতে গেলে কিছুই ঠিকমতো ম্যানেজ করতে পারতিস না। তোরা দুজন আজ এখানেই থাকবি। কাল ওই বাড়িতে তোদের বাসরের ব্যবস্থা করা হবে। সকালবেলা চলে যাস। আমি আর সুইটহার্টও সাথে যাব।”
কথাটা শুনে সামিয়া আর নাজমিন দুজনেই একসাথে মাথা নামিয়ে ফেলল। হঠাৎ করে সবার সামনে বাসরের প্রসঙ্গ উঠতেই তাদের গাল লাল হয়ে উঠল। পাশে দাঁড়িয়ে সুমু আলতো করে হাসল। সে এগিয়ে এসে মৃদু গলায় বলল,
“খান সাহেব ঠিকই বলেছেন। আজকে ওরা এখানেই থাকবে।”
আফিয়া খাতুন সুমুর কথায় সায় দিয়ে বললেন,
“তুমি ঠিকই বলেছো, মামনি। মেয়ে মানে তো একদিনেই পুরো নতুন পরিবেশে গাঢ় সম্পর্ক গড়ে ফেলে না। এখানে থাকলে একটু নির্ভার হবে।”
শেরাজ ফোনে স্ক্রল করতে করতে বলল,
“এই বাড়ি শুধু আমাদের নয়, তোদেরও। এখানে থাকার জন্য তোদের এতো সমস্যা হচ্ছে কেন? মনে হচ্ছে, আজ নতুন এলি এখানে।”
আইয়ুব মুচকি হেসে বলল,
“বাহ! আজ তো দেখছি, আমাদের রাগী ভাইয়া বড় দায়িত্বরত স্বামী আর অভিভাবকের মতো কথা বলছে। অন্য সময় তো আমাদের তাড়াতে উঠে পরে লাগিস।”
তাদের কথার মাঝেই অনন্যা খাতুনরা হাসিমুখে তিন বউকে একসাথে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে বসালেন। টেবিলের উপর আগে থেকেই সাজানো ছিল রঙিন কাচের বাটিতে মিষ্টি, খেজুর আর শুকনো ফল। ইশিতা সেগুলো এগিয়ে এসে দিল।
আফিয়া খাতুন প্রথমে একটা গোলাপজাম তুলে সামিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
“নাও মামনি! নতুন দেশ, নতুন ঘরে আসার প্রথম দিন, মিষ্টি মুখ দিয়ে শুরু হোক।”
সামিয়া লাজুক ভঙ্গিতে অল্প একটু মিষ্টি মুখে নিল। এরপর অনন্যা খাতুন নিজের হাতে নাজমিনকে রসগোল্লা খাইয়ে দিলেন। নাজমিন মাথা নিচু করে মিষ্টি মুখে নিল। আইয়ুব পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বন্ধুদের চোখ এড়িয়ে এক ঝলক তাকাল, আর তাতে নাজমিন আরও বেশি অস্থির হয়ে পড়ল।
শেষে ইনায়ার পালা এলো। সে যেন একেবারেই বুঝে উঠতে পারছিল না, কীভাবে এই নতুন পরিবেশে নিজেকে সামলাবে। অনন্যা খাতুন আলতো করে তার থুতনিতে হাত দিয়ে মুখটা উঁচু করলেন।
“লজ্জা কিসের মামনি? আজ থেকে তুমিও এই ঘরের আপনজন।”
কথাটা শুনে ইনায়ার চোখ ভিজে উঠল। সে মাথা নিচু করে চুপচাপ মিষ্টি মুখ করল। এমন দৃশ্য দেখে সুমুর বুক ভরে গেল। সে মনে করতে লাগল, তার এই বাড়িতে প্রথম দিনের কথা।
মিষ্টি মুখ শেষ হতেই অনন্যা খাতুনরা তাদের তিনজনকে উপহার দিলেন। সব কাজ শেষ হতেই অনন্যা খাতুন কোমল গলায় বললেন,
“আচ্ছা, সকলে অনেকটা জার্নি করে এসেছো। এখন আর বসে থাকা ঠিক নয়। প্রত্যেকে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। দুপুরের রান্না হচ্ছে। সকলে ফ্রেশ হয়ে তারপর খেতে এসো।”
আফিয়া খাতুন হেসে বললেন,
“হ্যাঁ, কনেদের মুখে তো ক্লান্তি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। চলো, রুমে গিয়ে কাপড়-চোপড় পাল্টে নাও। সকলের জন্য ঘর সাজানোই আছে।”
সামিয়া লাজুক হেসে নাজমিনের হাত ধরল, নাজমিন আবার ইনায়ার হাত টেনে পাশে নিল। যেন তিনজন একসাথে থাকলেই একটু সাহস পাচ্ছে তারা। সারবাজ, আইয়ুব আর রাহিন তাদের বউদের সামনে এগিয়ে দিল।
ইশিতা আর নাতাশা এগিয়ে এসে বলল,
“চলো, আমরা তোমাদের রুম পর্যন্ত নিয়ে যাই।”
সামিয়ারা একে একে সবাই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। মুহুর্তে ড্রয়িংরুম ফাঁকা হয়ে গেল। শেরাজও সুমুকে নিয়ে চলে গেল ফ্রেশ হতে।
সুমু রুমে ঢুকে চারপাশে তাকাচ্ছে। সে আলমারি, জানালার পাশে ফুলদানিগুলো, সাজানো বেড, পর্দা সবকিছুই নতুন করে চোখে বুলাচ্ছে। তবুও তার দৃষ্টি যেন কিছু একটা খুঁজছে।
শেরাজ বুকের ওপর হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে ছিল। সে ভ্রু কুঁচকে মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কিছু খুঁজছো, সুইটহার্ট?”
সুমু ধীরে ঘুরে তাকিয়ে বলল,
“ফিরোজা আর রিয়াজ কোথায়? আমরা এলাম এতক্ষণ হলো, ওরা তো নিচে গেল না।”
শেরাজ ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে সুমুর কাছে এগিয়ে গেল।
“ওরা চৌধুরী ম্যানশনে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে।”
সুমুর চোখ একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল। হঠাৎই সে আবার নরম গলায় প্রশ্ন করল,
“আচ্ছা! আর আমার কিটি?”
শেরাজ দু’ভ্র উঁচু করে গম্ভীর ভঙ্গিতে তাকিয়ে থেকে বলল,
“এসেই ওই বেটা বিড়ালটার খোঁজ করছো তুমি? আমাকে ফেলে আগে কিটি?”
সুমু হেসে ফেলল। শেরাজ গলায় দুষ্টু ভঙ্গি এনে বলল,
“দেখো গিয়ে, কোন বেডি বিড়ালকে নিয়ে পালিয়ে গেছে। বিডিতে থাকতে ফিরোজা বলেছিল, ও নাকি কোন বেডি বিড়ালের সাথে প্রেম করে।”
সুমু একটু রাগিস্বরে বলল,
“একদম আমার কিটির নামে মিথ্যা অপবাদ দিবেন না। কি প্রমাণ আছে আপনার কাছে? যতসব বাজে কথা।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আমি প্রমাণ করে দিব।”
“তো করেন।”
“হুম! সময় হোক, করব। তার আগে চলো ফ্রেশ হবে।”
সুমু মাথা নেড়ে সুটকেস থেকে চেঞ্জ বের করল। তারপর দুজনে ফ্রেশ হতে একসাথে ওয়াশরুমে চলে গেল।
দুপুরের খাবার টেবিলে আজ যেন একেবারে এলাহি আয়োজন। অনন্যা খাতুন আর আফিয়া খাতুন আজ বাংলাদেশী আর আফগানি দুই দেশের খাবারই রান্না করেছেন। সোনালি কারুকাজ করা লম্বা ডাইনিং টেবিল জুড়ে সারি সারি থালা সাজানো। বিরিয়ানির সুগন্ধে চারদিক ভরে গেছে। সে সাথে কাবাব, মটন কোর্মা, চিকেন রোস্ট, ফিশ ফ্রাই, স্যালাড, কাবুলি পোলাও, মান্তু, আশাক, চাপলি কাবাব, কোর্মা-এ-গোশত, বোলানি, কাবাব-এ-মুরগ, আফগান নান আর ঠান্ডা পানীয়ের লম্বা লিস্ট। টেবিলের একপাশে রাখা হয়েছে মান্তু আর আশাক, ওপরে দই আর মশলার টপিংয়ে সাজ। পাশেই সাজানো চাপলি কাবাব আর কোর্মা-এ-গোশত, ঘন সস আর ঘ্রাণে ভরে গেছে। পাতলা বোলানি আর কাবাব-এ-মুরগ রোস্টের পাশে সাজানো। ডেজার্টে শির খুরমা, ফিরনি আর জালেবি আলাদা আলাদা থালায় রাখা। ড্রিঙ্কসের মধ্যে রয়েছে গোলাপ জল মেশানো দুধ, আফগানি সবুজ চা আর ঠান্ডা লাসসি।
সকলে একে একে টেবিলের কাছে এসে হাজির হলো। অনন্যা খাতুন হাসিমুখে বললেন,
“চলো, সবাই বসো। আজ আমাদের নতুন তিন বউয়ের এই বাড়িতে প্রথম দুপুর, তাদের জন্য এতো আয়োজন।”
সামিয়া, নাজমিন আর ইনায়া একসাথে লাজুক ভঙ্গিতে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সুমু এগিয়ে গিয়ে ওদের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“চলো, বসে যাও। আজকে তোমাদেরই দিন।”
শেরাজ পাশে বসতে বসতে হেসে বলল,
“আমার শালিকারা বসে যাও। আর ইনায়া তুমিও বসো।”
নাজমিন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল, সামিয়া চুপচাপ মুখ নামিয়ে রাখল, আর ইনায়া অস্বস্তি নিয়ে চারপাশ দেখতে লাগল।
আফিয়া খাতুন নরম গলায় বললেন,
“মেয়েরা, লজ্জা পেলে হবে না। এখন থেকে এটাও তোমাদের ঘর।”
সবাই একে একে টেবিলে বসল। সার্ভেন্টরা গরম গরম খাবার পরিবেশন করতে লাগল। বিরিয়ানির সুগন্ধে সবার পেট যেন গুঞ্জন তুলতে লাগল।
এরমধ্যেই বাড়িতে এলো ফিরোজা আর রিয়াজ। ফিরোজা শেরাজকে দেখে দৌড়ে এসে শেরাজের কোলে উঠে পড়ল। ফিরোজার সাথে সাথে কিটিও দৌড়ে এসে সুমুর কোলে উঠল। শেরাজ ফিরোজাকে জড়িয়ে ধরে আদরে আদরে ভরিয়ে দিল।
শেহেজাদ খান ভ্রু কুঁচকে রিয়াজকে বললেন,
“কে দিয়ে গেল তোমাদের?”
রিয়াজ এসেই সুমুর কাছে গেল। সে সুমুর পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“কেউ না। আমি এখন বড় হয়ে গেছি, ছোটআব্বু। আমি একাই আসতে পারি। তবে, আদনান মামু! গাড়িতে করে পাঠিয়ে দিয়েছেন।”
পাশ থেকে সুমু বলল,
“ঠিক! আমার পার্টনার এখন বড় হয়ে গেছে।”
অনন্যা খাতুন বললেন,
“এখন বেশি কথা না বলে, ফ্রেশ হয়ে আয়। সকলের সাথে একসাথে খেয়েনে।”
রিয়াজ ফ্রেশ হতে চলে গেল। এদিকে, শেরাজ নিজের সাথে সাথে ফিরোজাকেও খাইয়ে দিতে লাগল। সুমু খাবার ফাঁকে ফাঁকে কিটির সাথে খুনশুটি করতে লাগল। মুহুর্ত ডাইনিং টেবিল হাসি-আনন্দে ভরে উঠল।
মাঝরাত। খান ম্যানশনের ঘরগুলো এখন গভীর নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। প্রতিটি জানালা দিয়ে বাইর থেকে চাঁদের আলো আসছে। সুমু ঘুম থেকে হঠাৎ উঠে বসল। সে ধীরে ধীরে বেডরুমের বাইরে যাচ্ছিল।
শেরাজ হঠাৎ তার পেছন থেকে বলল,
“কোথায় যাচ্ছো?”
সুমু একটু লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে বলল,
“আমার ক্ষুদা লেগেছে।”
শেরাজ কপাল কুঁচকে তার দিকে এগিয়ে এল।
“মধ্যরাতে? তুমি কি একা যেতে চাও? আমাকে বলা যায় না?”
সুমু তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি তো ঘুমাচ্ছিলেন, তাই আর আপনাকে ডাকিনি।”
শেরাজ ধীরে এগিয়ে এসে সুমুর হাত ধরে বলল,
“এসব আমার দায়িত্ব, সুইটহার্ট। চলো, বলো কি খাবে তুমি? আমি নিজে তোমাকে রান্না করে খাওয়াব।”
সুমু অল্প হেসে মাথা নাড়ল। তারা ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকে এগোল।
রান্নাঘরের মৃদু আলোয় চাঁদের আলো মিশে আছে। সুমু আর শেরাজ ধীরে ধীরে কিচেনে এলো। তার চোখে একটু ক্লান্তি, কিন্তু মুখে হাসি। সে জানে, তার খান সাহেব তার জন্য বিশেষ কিছু বানাতে চলেছে।
শেরাজ তার দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
“সুইটহার্ট, কী খেতে চাও?”
সুমু হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“যা আপনি ভালোবেসে বানাবেন।”
শেরাজ তার ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে বলল,
“ঠিক আছে। আজ তোমার জন্য বানাচ্ছি মুরগির কাবাব।”
“ওকে!”
শেরাজ সুমুকে বসিয়ে দিয়ে দ্রুত রান্না শুরু করল। সুমু বসে বসে শেরাজের কাজ দেখছে। শেরাজ মুরগির কাবাবগুলোও আলাদা গ্রিল প্যানে হালকা করে সোনালি রঙ নিল। ঘর জুড়ে সুগন্ধি ভেসে গেল।
সুমু উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমি হেল্প করব?”
“না, বসো।”
শেরাজ ধীরে ধীরে প্লেট সাজাল। সে মুরগির কাবাব সুন্দরভাবে সাজালো। তারপর প্লেট হাতে নিয়ে সুমুর কাছে এগিয়ে এলো।
সুমু বসে খেতে শুরু করল। প্রতিটি কামড়ে তার চোখে প্রশান্তি। শেরাজ তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। সুমু শেরাজের দিকে এগিয়ে বলল,
“আপনিও নিন।”
“না! তুমি খাও।”
সুমু ধীরে ধীরে সব শেষ করল। খাবারের পরে, সে ফ্রিজের দিকে এগোল। সে ফ্রিজ থেকে তার প্রিয় ভ্যানিলা আইসক্রিম বের করল। আর হাতে বড় চামচ নিল।
শেরাজ পাশে এসে বলল,
“মাঝরাতেও তুমি আইসক্রিম খাচ্ছো?”
সুমু হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, আজ একটু বেশি খেতে ইচ্ছে করছে।”
শেরাজ আলতো করে হেসে বলল,
“ঠিক আছে, তুমি খাও।”
সুমু আলতো হেসে খাওয়াতে মন দিল। সে খেতে খেতে মাথা শেরাজের কাঁধে হেলিয়ে দিল। শেরাজ একহাতে সুমুকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল।
পরেরদিন সকালে সূর্য নরম রোদ ছড়িয়ে দিচ্ছে। সুমু এখনও গভীর তলিয়ে আছে। শেরাজ নীরবে ঘরে ঢুকল। তার ঠোঁটে মৃদু হাসি। আজ সে পুরো বাড়িটাকে সুমুর জন্য আরামদায়ক ও সুন্দর করে সাজানোর পরিকল্পনা করেছে। সে প্রথমে বেডের পাশে কর্নারে একটি হোম মল বানালো। সে যেখানে একটা ফ্রিজ রাখল নানারকম আইসক্রিম। এরপর কেবিনেটে রাখল আচার, স্ন্যাকস, চকলেট, এবং হালকা স্বাস্থ্যসম্মত খাবার। এরপর সে আইয়ুবদের নিয়ে একে একে ঘরের প্রতিটি কর্ণায় ঘুরে ঘুরে নরম উলের কার্পেট বিছাতে লাগল। লিভিং রুম, ড্রয়িংরুম, কিচেন, প্রতিটি জায়গাতে কার্পেটের বিছানো হলো, যাতে সুমুর হাঁটাহাঁটি করতে অসুবিধা নেই। সবকিছু সাজানোর পর শেরাজ একবার পুরো বাড়ি ঘুরে দেখল। আইয়ুবরা সকলে ক্লান্ত শরীর নিয়ে সোফার গিয়ে বসল। শেরাজ দাঁড়িয়ে না থেকে ওপরে চলে গেল।
সকাল নয়টার দিকে সুমুর ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে তার নজর পড়ে সাজানো হোম মলের দিকে। সে ধীরে ধীরে মাথা উঁচু করল। চোখে অবাকির ছাপ। নরম উলের কার্পেট, কোণে রাখা ফ্রিজ ভর্তি আইসক্রিম, তার পাশে কেবিনেট ভর্তি আচার, চকলেট, স্ন্যাকস। সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
শেরাজ নীরবে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
“গুড মনিং, সুইটহার্ট!”
সুমু ধীরে মাথা নেড়ে উত্তর দিল,
“মনিং! কিন্তু এসব কি?”
“তোমার জন্য।”
“কিন্তু এতসব…”
“মাঝরাতে খাবে।”
“আপনি সত্যি পাগল।”
“সেটা তো তোমাকে প্রথম দেখাতেই হয়েছি। আপাতত উঠো। আজকের কথা মনে আছে তো?”
সুমু আলতো হেসে মাথা নাড়ল। শেরাজ সুমুকে ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে গেল। সে তাকে ফ্রেশ করে এনে নিচে নিয়ে চলল, ব্রেকফাস্ট করার জন্য।
সকালে সূর্যের নরম আলোয় ঘরটা ভরে গেছে। সকলে ব্রেকফাস্ট টেবিলে আড্ডা জমিয়েছে। শেরাজ ব্রেকফাস্ট করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আইয়ুব! তোরা তাড়াতাড়ি কর। নিহাল আমাদের জন্য ওয়েট করছে।
অনন্যা খাতুন এসে বললেন,
“আজকের দিনটা ওরা থাকত। কাল না হয় চলে যেত।”
শেরাজ ফোনে স্ক্রল করতে করতে বলল,
“মম! জরুরী দরকার আছে। তাছাড়া আজ সারবাজ আর ইনায়াও ওখানে থাকছেনা। শুধু আমরা ওদের ওই বাড়িতে দিয়ে ফিরে আসব।”
অনন্যা খাতুন আর কিছু বললেন না। রাহিনরা ব্রেকফাস্ট করে রেডি হয়ে নিল। তাদের সবার ব্যাগ গাড়িতে ওঠানো হলো। শেরাজ, সুমু, ইনায়া, ইশিতা, নাতাশা, সামিয়া, নাজমিন ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠে বসল। রাহিন, আইয়ুব, সারবাজ আর আরবাজ পেছনের গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ি ধীরে ধীরে বাড়ির আঙিনা থেকে বের হলো।
গাড়ি ধীরে ধীরে “সুমুরাজ মহল”–এর বিশাল গেটের সামনে এসে থামল। চারপাশে সূর্যের নরম আলো ছড়িয়ে পড়ছে। সুমু এবং শেরাজ ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল।
শেরাজের বাকি ফ্রেন্ডরা আগে থেকেই এখানে উপস্থিত। তারা গেটের পাশে দাঁড়িয়ে। সুমুর চোখ আনন্দে চকচক করছে। সে ধীরে শেরাজের দিকে তাকিয়ে চাপাস্বরে বলল,
“আজ এখানেই আইয়ুব-নাজমিন, সামিয়া-রাহিন আর সারবাজ-ইনায়ার বাসর ঘর সব সাজানো হবে।”
শেরাজ আলতো হাসল। সুমু ধীরে হাত বাড়িয়ে শেরাজের হাত ধরে বলল,
“যাওয়া যাক?”
শেরাজ মাথা নাড়ল। সকলে মিলে একসাথে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। ভেতরে আসতেই সকলে যার যার কাজে লেগে পড়ল।
সারাদিন, সকাল আর বিকাল আড্ডা, মজা-আনন্দ করে সকলের সন্ধ্যায় বাসর ঘর সাজানোর কাজ শেষ হলো। রুমের ভেতর বাতি হালকা জ্বলছে, ফ্লোরে ছড়িয়ে আছে ফুলের পাপড়ি।
সুমু ধীরে ধীরে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াল। শেরাজ তার পাশে। নাজমিন, সামিয়া, আর ইনায়কে সাজানো হচ্ছে। সবাই ড্রয়িংরুমে অপেক্ষা করছে। আইয়ুবদের আটকে রাখা হয়েছে। নিহাল তাদের টাকা ছাড়া বাসর ঘরে যেতে দেবেনা বলেছে।
হঠাৎ নিচে নেমে এলো ইশিতা আর নাতাশা। ইশিতা আরবাজের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“ওরা তিনজন রেডি। ওদের যারা যারা রুমে রেখে এসেছি।”
কথাটা শুনে আইয়ুবরা উঠে রুমের দিকে যেতে নিলেই, নিহালারা তাদের আটকে দিল। রাহিন হতাশ হয়ে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ যেন দেখেও দেখল না, সে চুপ করে বসে ফোনে স্ক্রল করতে লাগল।
রিসান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এস.কের দিকে তাকিয়ে কি হবে? রিয়াল দে, তারপর চুপচাপ রুমে যা।”
নিহাল আলতো হেসে বলল,
“হ্যাঁ ভাই! তাড়াতাড়ি দে। আমরাও তো ফিরব। আমাদের দেরি হচ্ছে।”
আইয়ুব কপাল কুঁচকে বলল,
“বন্ধুদের কাছে রিয়াল চাইতে লজ্জা করেনা তোদের?”
অমিত ঘাড় নেড়ে বলল,
“কিসের লজ্জা? লজ্জা খায় নাকি মাথায় দেয়? অন্যের বেলায় তো ঠিকি নিজেরা রিয়াল তুলিস। তাহলে এখন নিজেদের বেলায় লজ্জার কথা আসছে কেন? বেশি কথা না বলে, মানি ফেল ভাই।”
রিয়াদ এগিয়ে এসে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“দেখ, টাইম নষ্ট করিস না। যত তাড়াতাড়ি হিসাব মিটাস, তত তাড়াতাড়ি পথ ছাড়ব।”
আইয়ুব হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“তোদের এই জোরজবরদস্তির মাশুল একদিন দিতে হবে। সময় একদিন আমাদেরও আসবে।”
সাইফ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে মাথা নেড়ে বলল
“হুম, ভবিষ্যতের হিসাব তো ভবিষ্যতেই হবে। এখন যা আছে তাই মিটিয়ে দে। পরে যেটা হবে, সেটা তখন দেখা যাবে।”
“ঠিক তাই! আজকের রাত আজকেই শেষ কর, ভাই।”
কিছুক্ষণ নীরবতা। রাহিন অবশেষে পকেট থেকে রিয়াল বের করে দিয়ে বলল,
“এই নে। এবার আমাকে যেতে দে। বউ অপেক্ষা করছে, ভাই।”
রিসান টাকাটা গুনে নিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল। রাহিনের সাথে সাথে আইয়ুব আর সারবাজও রিয়াল দিল। ফাহিম হাত উঁচু করে ইশারা করল। নিহালরা তাদের পথ ছেড়ে দিল। আইয়ুবরা আর দাঁড়িয়ে না থেকে ওপরে চলে গেল। ওরা যেতেই ইশিতারা হেসে উঠল।
শেরাজ নিহালদের উদ্দেশ্যে বলল,
“তোরা সানের সাথে বাড়িতে ফিরে যা। আমি, সুমু, আরবাজ, নাতাশা আর ইশিতাও বাড়িতে ফিরে যাচ্ছি। কাল সারবাজ আর ইনায়াও ফিরে যাবে। এই বাড়িতে এখন থেকে আইয়ুব-নাজমিন আর সামিয়া-রাহিন ওদের নতুন জীবন শুরু করবে।”
নিহাল আর অন্যরা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। সকলে ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠে চলে গেল। শেরাজরাও বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। বাইরে গাড়ির হালকা ইঞ্জিনের গর্জন আর চাকার শব্দ মিলিয়ে রাতের নিস্তব্ধতায় মিশে গেল।
রাতের নরম চাঁদের আলো ধীরে জানালা দিয়ে বাসর ঘরে ঢুকছে। চারপাশটা ফুলের গন্ধ আর স্নিগ্ধ মোমবাতির আলো ভরা। সামিয়া ঘোমটা দিয়ে বসে আছে। রাহিন ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সামিয়া পাশে বসে তার হাতে হাত রেখে ধীরে বলল,
“সামু, আজ আমরা একসাথে নতুন জীবন শুরু করছি। শুধু আমরা দু’জন। আজকের এই মুহূর্ত আমাদের। এখন আর কোনো চিন্তা নেই। এবার শুধু আমাদের খুশি থাকার পালা।”
সামিয়া তার হাতে হাত রেখে চোখে পানি নিয়ে বলল,
“আজ আমি সত্যি পূর্ণতা পেলাম। আমি কখনও ভাবিনি তোমাকে পাব।”
“ভালোবাসি, পিচ্চি বউ!”
“আমিও ভালোবাসি!”
রাহিন, সামিয়ার ঘোমটা তুলল। সামিয়া লাজুক হেসে মাথা নামিয়ে ফেলল। রাহিন সামিয়ার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“আমি সবসময় তোর পাশে থাকব, সামু। শুধু আজ নয়, সারাজীবন।”
দু’জন ধীরে একে অপরের চোখে চোখ রেখে এক নিঃশ্বাসে স্মৃতির মতো মুহূর্তগুলো মনে ধরে রাখল। ফুলের গন্ধ, নরম আলো আর একে অপরের উপস্থিতি ঘরটা যেন একটি ছোট স্বর্গে পরিণত করল।
সামিয়া মৃদু হাসি দিয়ে বলল,
“এই বাড়িটাকে আমরা আমাদের প্রেম আর ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে তুলব।”
রাহিন মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। তারপর দু’জন একে অপরের পাশে বসে নরম আলো আর একান্ত মুহূর্তে নিজেদের হারিয়ে দিল।
রাতের নরম চাঁদের আলো নাজমিন-আইয়ুবের জন্য সাজানো বাসর ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘরের প্রতিটি কোণ ফুলের মালা, ঝলমলে লাইটিং দিয়ে ভরা। নাজমিন চুপ করে বসে আছে। আইয়ুব তার পাশে বসে আছে। হঠাৎ আইয়ুব বলল,
“আজ আমাদের রাত, ব্রাউন গার্ল। শুধু আমাদের দু’জনের।”
নাজমিন মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত আজ।”
আইয়ুব নাজমিনের থুতনি তুলে মুখটা দেখল। দু’জন একে অপরের চোখে চোখ রেখে নরম আলোয় ঘরের প্রতিটি জিনিসকে তাদের সুখের সাক্ষী হিসেবে উপভোগ করল।
আইয়ুব আলতো হেসে বলল,
“ভালোবাসি, ব্রাউন গার্ল।”
নাজমিন আলতো হেসে বলল,
“আমিও ভালোবাসি।”
আইয়ুব মুচকি হেসে নাজমিনকে বেড থেকে নামল। দুজনে জানালার কাছে এসে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশে থালার মতো বড় একটা চাঁদ উঠেছে আজ। এমন মনমুগ্ধকর সময়ে রুমের মধ্যে থাকা দুজন ভালোবাসার মানুষ একে অপরর জন্য আলাদা দুনিয়া তৈরি করে নিল।
ঘর ভর্তি ফুল আর মৃদু আলোয় আলোকিত। সিল্কের পর্দা নরম হাওয়ায় দুলছে। ইনায়া বিছানার একপাশে বসে আছে। সে মাথা নিচু, আঙুল দিয়ে ওড়নার কোণা মুচড়াচ্ছে। তার মুখে লালচে আভা, বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে।
হঠাৎ দরজা হালকা শব্দে খুলল। সারবাজ ঢুকল। গম্ভীর মুখে ধীরে ধীরে ভেতরে এলো। ঘরটার চারপাশে দেখে নিয়ে সে হালকা গলায় বলল,
“ঘরটা তো সিনেমার সেটের মতো লাগছে।”
ইনায়া মাথা না তুলে বলল,
“সিনেমার নায়িকা কে?”
সারবাজ এগিয়ে এসে বিছানার পাশে দাঁড়াল। সে একটু ঝুঁকে উত্তর দিল,
“নায়িকা তো সে, যার জন্য আমি সারাজীবন অপেক্ষা করেছি। সেই মেয়েটি, যে অফিসে প্রথমদিন এসেই আমার সাথে ঝগড়া করেছিল।”
ইনায়া লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল। কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর হঠাৎ সারবাজ মজা করে বলল,
“তবে একটা ব্যাপার বলো তো, তুমি এখনো এত চুপচাপ বসে আছো কেন? আমি তো ভেবেছিলাম, আজ প্রথম রাতে আবারও তোমার রাগ দেখব।”
ইনায়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“রাগ? আমি আবার রাগ দেখাব?”
সারবাজ হেসে উঠে বলল,
“হ্যাঁ! তোমার সেই বিখ্যাত রাগ, সেটাই আমি দেখতে চাই।”
ইনায়া লজ্জা ভাঙিয়ে এবার সত্যি সত্যি ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তোমার কি কোনো কাজ নেই নাকি? বাসর রাতেও টিজ করছো?”
সারবাজ তার হাত ধরে বলল,
“না, আমার কাজ আছে। আমার কাজ হলো তোমার সব রাগ, সব লজ্জা, সব ভয় নিজের কাছে নিয়ে নেওয়া।”
ইনায়ার বুকটা কেঁপে উঠল। সে ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে ফেলল, আর সারবাজের হাত শক্ত করে চেপে ধরল। ঘরের নিস্তব্ধতায় শুধু ফুলের গন্ধ আর তাদের দুজনের নিঃশ্বাস মিশে রইল।
কেটে গেল সাত মাস। আজ আমার প্রেগন্যান্সির নয় মাস পূর্ণ হলো। আজ আমার বেবি শাওয়ারের দিন। হ্যাঁ, এই যে সেদিনের কথা আমার এখনো মনে আছে—আমরা সকলে বিডি থেকে ওমানে ফিরে এলাম। কত দ্রুত সবকিছু পাল্টে গেল! সময় যেন থমকে দাঁড়ায়নি, বরং চোখের পলকে কেটে গেল এই সাতটা মাস।
এই সাত মাসে আলহামদুলিল্লাহ, কোনো খারাপ কিছু হয়নি। বরং চারপাশটা কেমন শান্ত হয়ে গেছে। আমার ছোট দু’টো বোনের সংসার এখন একেবারে মিষ্টি আর পরিপূর্ণ। তাদের সুখে আমার বুক ভরে যায়। দু’মাস আগে ইশিতাকেও ওর মা-বাবা মেনে নিয়েছে। দু’পরিবারের মধ্যে এখন খুব সুন্দর একটা সম্পর্ক। শুনলাম, আমার মাইশা আপুর ছেলে নাহিয়ান আস্তে আস্তে বড় হয়ে যাচ্ছে। ইফতিয়া নাকি আগের থেকে অনেক শান্তশিষ্ট হয়ে গেছে। ফারিন, রাইশা, তিশা আর রাইফ মন দিয়ে পড়াশোনা করে এখন। ফারিয়া আর শাহরুখ ভাইয়াও খুব ভালো আছে। পিয়াস ভাইয়া এখন নিজেকে সামলে নিয়েছে। ইনায়া এই বাড়ির সকলের মন জয় করে নিয়েছে। নাতাশা আর সান ভাইয়ার সম্পর্ক এখনো আগেই মতোই আছে। ওদের একে অপরের সাথে দেখা হলেই, ওদের মধ্যে লঙ্কাকাণ্ড বেধে যায়। অপরদিকে, আলিশাও তার একতরফা ভালোবাসা নিয়ে ভালো আছে। বলতে গেলে, এই সাতমাসে সবকিছু ভালো হয়েছে। দেখা হয়নি আর তাদের সাথে, যাতেই সাথে দেখা হলেই জীবনে ঝড় নেমে আসে। খারাপ মানুষগুলোও কেমন যেন হঠাৎ করে হারিয়ে গেছে। তারা চুপ করে গেছে, যেন কেউ আমাদের জন্য দোয়া করছিল। কিন্তু তবুও কোথাও একটা গিয়ে আমার মনের ভেতর ভয় কাজ করছে। জানিনা এই সুন্দর মুহুর্তগুলো কতক্ষণ স্থায়ী হবে। সব কি ঠিক থাকবে, নাকি আবারও কোনো ঝড় সবটা এলোমেলো করে দিবে।
এই সাতমাসে আমার খান সাহেব আমাকে তার চোখের সামনে থেকে দূরে সরায়নি। প্রতিরাতে আমার নানানরকম আবদার সে রেখেছে। প্রতি সেকেন্ড আমাকে চোখে চোখে রেখেছে। আমি কিছু চাওয়ার আগেই চোখের সামনে এনে সব হাজির করেছে। আমাকে খাওয়ানো, গোসল করানো, ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, আমার চুল বেঁধে দেওয়া, সব তিনি একাহাতে সামলেছেন। আমার পা থেকে মাথা পযর্ন্ত যাবতীয় কাজ সে করেছেন। আমি এখন দেখতে অনেকটা গলুমলু হয়ে গেছি। আমার শশুর-শাশুড়ি আর বাড়ির লোকের কাছে আমি যেন এক রাণীর মতো। তারা আমাকে রাণীর মতো রেখেছে। ফিরোজা আর রিয়াজ আমার সাথে অনেক গল্প করেছে। আমার শাশুড়ি আর ছোটআম্মু, রোজ আমাকে কোরআন পাঠ করে শুনিয়েছেন। ইশিতা, নাতাশা আর ইনায়া আমার সাথে সুযোগ পেলেই সময় কাটিয়েছে। সামিয়া আর নাজমিনও মাঝে মাঝে এসে আমার সাথে থেকে গেছে। খান সাহেবের বন্ধুরা তো দুদিন পর পর আমার জন্য এটা ওটা নিয়ে আসে। এই সাতমাসে বলতে গেলে আমি আলাদা করে থাকার সময় পায়নি। আজ বাড়ি ভর্তি মানুষের আনাগোনা শুরু হয়েছে। এখন সবাই ব্যস্ত। এই সুযোগে আজ এতদিন পর আমার ডায়েরিটা আবার হাতে নিলাম। কাগজের গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে মনে হলো, আমি যেন আবার নিজের কাছে ফিরে এলাম। আমার চলমান “খান সাহেব” গল্পটা আজ আবারও লিখতে বসেছি। জানি না কবে শেষ করতে পারব এই কাহিনি। হয়তো কোনোদিনও শেষ করতে পারব না।
হয়তো কিছু জিনিসের সমাপ্তি লিখতে নেই। কিছু গল্পের শেষ হওয়াটা ভালো না, কারণ সেগুলো শেষ হয়ে গেলে যেন তার প্রাণটাই চলে যায়। আমিও তাই ঠিক করেছি—এই গল্পের সমাপ্তি লিখব না। হয়তো এই গল্পটা আমার জীবনের সঙ্গে, আমার সন্তান আর খান সাহেবের সঙ্গে, ধীরে ধীরে বেঁচে থাকবে। এই ডায়েরির পাতায় শেষ লাইনে শুধু একটা কথাই লিখব,
“আমাদের ভালোবাসার গল্প কখনোই শেষ হবে না।”
হঠাৎ পেছন থেকে শক্ত পদক্ষেপের শব্দ এলো। সুমু কলম থামিয়ে পেছন ঘুরে তাকাল। শেরাজ দাঁড়িয়ে আছে। সুমু ডায়েরিটা লুকিয়ে ফেলতেই শেরাজ বলল,
“তুমি এই অবস্থায় ডায়েরি নিয়ে বসেছো?”
সুমু ধীরে উঠে দাঁড়াতে চাইল। শেরাজ এগিয়ে এসে তাকে ধরল। সুমু আলতো হেসে বলল,
“এমনি একটু লিখছিলাম।”
শেরাজ হালকা রাগ দেখিয়ে বলল,
খান সাহেব পর্ব ৭৫ (২)
“হ্যাঁ! এসবই করো তুমি। নিজের প্রতি একটু যত্ন নেই তোমার।”
সুমু মুখে হাসি নিয়ে তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। শেরাজ একটু চুপ থেকে বলল,
“সকলে চলে এসেছে। চলো, তোমাকে রেডি করে দেই।”
সুমু ধীরে মাথা নাড়ল। শেরাজ তাকে বসিয়ে রেখে ক্যাবার্ড থেকে ড্রেস এনে সুমুকে রেডি করে দিতে লাগল।
