খান সাহেব পর্ব ৭
সুমাইয়া জাহান
বাড়ি ভর্তি মানুষের আনাগোনা। আজ অনেক আত্মীয়রা এসেছে। শেরাজরা দশটার মধ্যে বাড়ি ফিরে এসেছে। সকলে চলে গেছে ফ্রেশ হতে।
শেরাজ রুমে এসে শাওয়ার নিতে ঢুকল। যতোই শীত পড়ুক বাহির থেকে এসে সে শাওয়ার নিবেই। বিশ মিনিটের মাথায় শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এলো চুল মুছতে- মুছতে। ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকালো। ওয়ারড্রোব থেকে নিজের এস.কে ব্র্যান্ডের টি-শার্ট, হুডি আর ট্রাউজার বের করলো। চেঞ্জ করে চলে গেলো ড্রেসিংটেবিলের সামনে। হালকা জেল আর স্প্রে করে চুলগুলো সেট করে নিল। ডান হাতে কালো ব্রেসলেট আর বাম হাতে রোলিক্স ব্র্যান্ডের ঘড়িটা পরে নিল। বাম হাতের বুড়ো আর অনামিকা আঙুলে দুইটা কালো রিং পড়ে নিল। ড্রেসিংটেবিলের ওপর রাখা তার পার্সোলান “ডার্ক সাইড” আর “দি ম্যান” পারফিউম দু’টোর মধ্যে “দি ম্যান” পারফিউমটা ইউজ করল। ডার্ক সাইড পারফিউমটা সে কিছু বিশেষ সময় ছাড়া ব্যবহার করে না। আর সেই বিশেষ সময় গুলোর কথা তার বন্ধুগুলো আর তার পি.এ ছাড়া কেউ জানেনা। আ্যাপেল কোম্পানির ফোনটা হাতে নিয়ে এয়ারপডস কানে গুজলো। মনে-মনে ভাবল, এমন সময় মুড ফ্রেশ করার জন্য এককাপ চা হলে ভালো হতো।
ফোনটা হাতে নিয়ে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ইনস্টাগ্রামে ঢুকে দেখল ইনবক্সে এগারো ঘন্টা আগে “খান সাহেব” লিখে শেরাজ পঁচিশ আর সুমাইয়া উনিশ একটা আইডি থেকে টেক্সট এসেছে। লেখাটা পড়েই নিংশব্দে হাসল শেরাজ। বিড়বিড়িয়ে বলল,
“এইটাই তাহলে ম্যাডামের অন্য আইডি।”
মনের মধ্যে একটা দুষ্টু বুদ্ধি আসলো তার। ঠোঁটে বাঁকা হাসি রেখে টেক্সট করল সুমুকে।
ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ঘুরে-ঘুরে দেখছিল সুমু। পরনে কালো আনারকলি, চোখে কালো কাজলের ছোঁয়া, ঠোঁটে হালকা গোলাপী লিপস্টিক, হাতে কালো চুড়ি, কানে কালো ঝুমকা, চুলগুলো খুলে রাখা। এতেই তাকে দুর্দান্ত সুন্দর লাগছে। ফর্সা শরীরের ওপর কালো আনারকলি যেন তার সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সুমু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কখনও মডেলদের মতো হেঁটে দেখছিল, কখনও কেঁদে, তো কখনো হেসে। রাইশা, রাইফ, নাজমিন, সামিয়ারা নিরব দর্শকের মতো দেখছিল আর কমেন্ট করছিল।
হঠাৎ ফোনে টেক্সট এলো সুমুর। সে ফোনটা হাতে নিয়ে পাওয়ার বাটনে চাপ দিতেই দেখতে পেল লক স্ক্রিনের ওপর ভেসে আছে কাঙ্ক্ষিত মানুষটির নাম। ঝটপট ফোনটা আনলক করে ইনবক্সে ঢুকলো সুমু।
সর পরা দুধ দিয়ে, পরিমাণ মতো চিনি দিয়ে, সুন্দর করে এককাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসো আমার রুমে।
মেসেজটা পরে একমিনিটও দাঁড়াল না সুমু। হন্তদন্ত হয়ে ছুটল রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে। কাজিনরা সকলে ডাকল তাকে। কিন্তু তাদের কোনো কথা কান পযর্ন্ত পৌঁছাল না তার। সুমু দৌড়াতে-দৌড়াতে এসে পৌঁছাল রান্নাঘরে।
রান্নাঘরে হাসি বেগম, খুশি বেগম, মিনা বেগম সকলের জন্য নাস্তা বানাচ্ছেন। সুমুকে ওইভাবে দৌড়ে আসতে দেখে মিনা বেগম বললেন,
“কি হয়েছে সুমু? ওইভাবে দৌড়াচ্ছিস কেনো?”
“কিছু না মামি। আমার খুব চা খেতে হচ্ছে করছে। তাই চা বানাতে এসেছি।”
“তুই চা খাবি? এইতো আমরা বানিয়েছি। নিয়ে যা।”
“না,না মামি। আমি তোমাদের বানানো চা খাব না আজ। ভেবেছি আজ আমি নিজেই নিজের জন্য চা বানাব। কিছুদিন পরে তো আমারও বিয়ে হবে। তখন সবাইকে বানিয়ে খাওয়াতে হবে। তখন যদি ভালো করে চা বানাতে না পারি। তাহলে আমার শশুর বাড়ির সবাই বলবে, আমার মা-বাবা আমাকে কিছু শেখায়নি।”
হাসি বেগম মেয়ের কথা শুনে বললেন,
“বেশি পেকেছিস তুই। আর এখন বিয়ে বাড়ি অনেক কাজ। বিরক্ত করিস না। তোর মামি চা বানিয়েছে ওইখান থেকে এককাপ নিয়ে যা।”
মিনা বেগম বললেন,
“আহ্ আপা, এমন করছেন কেনো? বাচ্চা মেয়ে বানাতে চাইছে, বানাক না। এই সুমু তুই চা বানা।”
সুমু খুশি হয়ে মনে-মনে তার মামির প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। সে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“যাক, এদের মায়ের সামনে দেখানো ভালোবাসাটা একটুতো কাজে লাগল।”
সুমু চুলায় গরম পানি বসাল। গরম পানিতে পরিমাণ মতো চা-পাতা, চিনি, বেশি করে খাঁটি গরুর দুধ দিয়ে চারকাপ চা বানিয়ে নিল। মা, মামি,আর আন্টির জন্য তিনকাপ রেখে আর এককাপ হাতে নিল সে। মিনা বেগম, হাসি বেগম আর খুশি বেগম চা খেয়ে বেশ প্রশংসা করল সুমুর।
হাসি বেগম বললেন,
“আমার মেয়ে এতো ভালো চা বানাতে পারে, আর আমি জানিনা।”
মিনা বেগম বললেন,
“তাইলে, সুমু তোর বিয়েটাও খুব তাড়াতাড়ি দিয়ে দিই। কি বলেন আপা?”
মিনা বেগমের কথা শুনে সকলে হাসতে লাগল। সুমু লজ্জায় আর একমিনিটও দাঁড়াল না। চায়ের কাপ নিয়ে রান্নাঘর ছেড়ে চললো কাঙ্ক্ষিত রুমটার সামনে।
রুমটির সামনে এসে নিজেকে সামলে দরজায় নক করল। ভেতর থেকে আওয়াজ এলো,
“কাম ইন।”
দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল সুমু। শেরাজ জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ফোনে স্ক্রল করতে ব্যস্ত। ভিডিও ক্লিপগুলো নিজের বড় ভাই সারবাজকে দিয়েছিল সে, এডিট করার জন্য— সেগুলোই দেখছে সে। সারবাজ তার একবছরের বড়। পড়াশোনা একসাথে করেছে তারা। বড়ভাই কম, বন্ধুর মতো থাকে তারা।
সুমু চা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শেরাজ ফোনটা পকেটে রেখে সুমুর কাছে গিয়ে চায়ের কাপটা হাতে নিল। শেরাজ এখনো লক্ষ্য করেনি সুমুর দিকে। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুমুক বসাতে গিয়ে চোখ পড়ল সুমুর ওপর।
আজ চোখে কাজল পড়েছে মেয়েটা। গোলাপি পাতলা ওষ্ঠ জোড়াকে লিপস্টিক দিয়ে রাঙিয়েছে। শেরাজকে আজ আবারও টানছে ওই ওষ্ঠদ্বয়।
“আজ এতো সুন্দর লাগছে কেনো মেয়েটাকে?”
নিজের মনকে প্রশ্ন করল শেরাজ।
“আচ্ছা, ওকে কি আজকেই প্রথম সুন্দর লাগল নাকি আগেও সুন্দর লেগেছিল? না, ওকে রোজ নতুন-নতুন ভাবে সুন্দর লাগে। তবে আজ বাকি দিনগুলোর তুলনায় একটু বেশি সুন্দর লাগছে।”
শেরাজের ইচ্ছে করল দুষ্টু ছোঁয়া দিয়ে পুরো সাজ নষ্ট করে দিতে। একদম এলোমেলো করে দিতে ইচ্ছা করল মেয়েটাকে।
“উফ! এই মেয়েটাতো অলরেডি আমাকে আহত করে ফেলেছে। এইবার কি একদম মেরে ফেলার প্লান করেছে নাকি?”
শেরাজকে এইভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে লজ্জা পেয়ে গেল সুমু। সুমুর লজ্জা পাওয়া মুখটা দেখে মুচকি হাসল শেরাজ। কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ টিকলো না তার মুখে। হঠাৎ মস্তিষ্কের মধ্যে রাগ হানা দিল তার। মুহুর্তের মধ্যে মুখ থেকে হাসিটা সরে রাগ চলে আসলো পুরো মুখমন্ডল জুড়ে। মুহুর্তেই সে রাগিসুরে বলল,
“এই মেয়ে! এইভাবে সেজে-গুজে আমার রুমে এসেছো কেনো?”
শেরাজের এমন রাগি কন্ঠস্বর শুনে সুমু কেঁপে উঠল। ভয়ের চোটে কথা বলতে পারছেনা সে।
শেরাজ আবারও বলল,
“এইভাবে সেজে-গুজে আমাকে সিডিউস করতে চাও তাই না? তুমি ভাবলে কি করে, তুমি এসব করলে, আমি তোমার প্রেমে পড়ে যাব? এভাবে আমাকে আকৃষ্ট করতে পারবে তুমি? দুদিন ভালো করে কথা বলেছি বলে, এতোদূর চলে গেছো?”
সুমু ছলছল নয়নে তাকাল শেরাজের দিকে। সে ধীরে বলল,
“আপনি এইসব কি বলছেন খান সাহেব? আমি আপনাকে সিডিউস করতে চাইছি মানে? আজ মেহেন্দির অনুষ্ঠান আছে, তাই আমি একটু সেজেছি।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“বিয়েটা কি তোমার, যে তুমি সেজেছো? তোমার এই সবকিছু আমাকে সিডিউস করার চেষ্টা। শোনো মেয়ে, এই বাড়িতে আমি যতদিন আছি, তোমাকে জেনো এইভাবে সেজে-গুজে আমার সামনে আসতে না দেখি। নাও, গেট আউট অফ মাই রুম।”
সুমু আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। চোখে টইটুম্বর পানি নিয়ে ছুটটে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
নিজের রুমে এসে দরজা লাগিয়ে দিল সে। হাত থেকে চুড়ি, কানের দুল সব খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিলো সে। বিছানায় পড়ে বালিশে মুখ গুঁজে কান্না করতে লাগল।
অপরদিকে, শেরাজ সুমুর যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। একটু সময় নিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“সরি সুইটহার্ট! আই এম ভেরি ভেরি সরি— তোমাকে কাঁদালাম। মাফ করে দিও আমাকে, প্লিজ। তোমাকে যেইদিন কাগজে-কলমে সারাজীবনের জন্য আমার করে নিব— সেইদিন তোমার কান্না, হাসি সব আমার নামে হবে। তুমি কাঁদবেও আমার জন্য, হাসবেও আমার জন্য। সমাজের নিয়ম না হলে, শেরাজ খান কোনো কাগজ-কলমের পরোয়া করত না। কিন্তু, আজ তোমাকে এইভাবে না বললে যে, তুমি এইভাবে সেজেই পুরো বাড়ি ঘুরে বেড়াতে। বাড়ি ভর্তি এখন অনেক ছেলেরা। কাল হলুদেও অনেক মানুষ আসবে। বিয়েতে আসবে। তখন যদি তুমি এইভাবে এতো সেজে-গুজে তাদের সামনে দিয়ে ঘুরো। তখন কেউ যদি তোমার দিকে নজর দেয়। ওইটাতো আমার সহ্য হবে না সুইটহার্ট। আমার জিনিসের দিকে কারো নজর তো আমি সহ্য করব না। আমি শেরাজ খান যা চাই— তা পাই। আর যা পাইনা— তা আমি নিজ হাতে ধ্বংস করে দেই। তোমাকে যখন আমার মনে ধরেছে— তখন তো তোমাকে আমার লাগবেই। আমার জিনিসের দিকে কোনো শকুনের নজর আমি মেনে নিব না। এই ফুলের একটাই মৌমাছি। যদি অন্য কোনো মৌমাছির নজর পড়ে— তখনতো আবার আমাকে তোমার জন্য…..”
কথা শেষ করল না শেরাজ। মুখে বাঁকা হাসি নিয়ে ড্রেসিংটেবিলের সামনে গিয়ে “ডার্ক সাইড” পারফিউমটা হাতে তুলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। ঠোঁটে লেগে আছে তার বাঁকা হাসি।
রুমের বাহির থেকে সবটাই শুনলো আইয়ুব। শেরাজকে ডাকতে এসেছিল সে। কথাগুলো শুনে আর একদন্ডও দাঁড়াল না সে। ছুটল বন্ধুমহলে কথাগুলো লিক করতে।
আইয়ুব দৌড়ে এসে পৌঁছাল সব ফ্রেন্ডদের কাছে। আইয়ুবকে এইভাবে দৌড়ে আসতে দেখে সকলে ওর কাছে ছুটে আসলো।
রাহিন বলল,
“কিরে? এইভাবে ছুটছিস কেনো? কুকুরে তাড়া করেছে নাকি তোকে?”
আইয়ুব দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,
“আরে জাম্পেশ একটা খবর আছে। তোরা শুনলে কেউ বিশ্বাস করতে পারবি না।”
সাইফ বলল,
“ব্রো, বিশ্বাস যখন করতেই পারব না। তাইলে আর বলিস না।”
সারবাজ বলল,
“তুই না শেরাজকে ডাকতে গিয়েছিলি? শেরাজ কোথায়?”
ফাহিম বলল,
“আমি শিওর, ও আবারও ওই নাজমিন নামের মেয়েটার সাথে ঝগড়া করে এসেছে।”
আইয়ুব ভ্রু কুঁচকে তাকাল ফাহিমের দিকে। রাগিস্বরে বলল,
“শা*লা তোদের কি মনে হয়? আমি শুধু ঝগড়াই করি। শোন, ওই মেয়েটা আমার সাথে আগে-আগে ঝগড়া করে। তারপর বাধ্য হয়ে আমিও করি।”
অমিত বলল,
“কি করিস তুই বাধ্য হয়ে? ঝগড়া? তাই তো?”
অমিতের কথা শুনে বন্ধুমহলে হাসির বন্যা বয়ে গেল। সকলের উদ্দেশ্যে রিয়াদ বলল,
“এই তোরা থাম তো। এই আইয়ুব! তুই বলতো কি খবর এনেছিস?”
আইয়ুব একটু দম নিয়ে সবটা খুলে বলল সবাইকে। আইয়ুবের কথা শুনে সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ়। একে অপরের দিকে তাকিয়ে সকলে একসঙ্গে বলে উঠল,
“ইম্পসিবল!”
রাহিন বলল,
“ভাই! তোর কি শরবত খেয়ে নেশা হয়ে গেল? কিন্তু আমাদের বাড়িতে তো অ্যালকোহল এলাউ না। তাহলে তোর শরবতে অ্যালকোহল মেশালো কে? কিসব বলছিস তুই?”
আইয়ুব সবাইকে সবটা বুঝিয়ে বলল। তবে কেউ যেন আইয়ুবের বলা কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারল না। কিন্তু একেবারে অবিশ্বাসের খাতায়ও ফেলল না। সকলে মিলে ঠিক করল— সকলে নজর রাখবে দুজনের ওপর।
রাহিন বলল,
“শোন সবাই! সুমুর ওপর নজর রাখার জন্য সামিয়া আর সামিয়ার কাজিন নাজমিনের ওপর দায়িত্ব দিলে কেমন হয়? ওরা দুজন আমাদের সুমুর সব আপডেট দিতে পারবে।”
আইয়ুব বলল,
“না,না! ওই ঝগড়াটে মেয়েটা সবাইকে বলে দিবে।”
রাহিন বলল,
“আরে বলবে না। আমি ওদের দুজনকে খুব ভালো করেই চিনে।”
অমিত বলল,
“হ্যাঁ, আর সামিয়াকে একটু বেশি ভালো করে চিনিস।”
রাহিনের কথায় সকলে রাজি হলো। আইয়ুব, সারবাজ আর অমিত, রাহিনের সাথে সামিয়াকে নিয়ে মজাও করল।
আইয়ুব বলল,
“ওদের দুজনের ব্যবহারের যদি সত্যি সকলের মনে হয়— ওরা ওকে অপরের প্রতি অবসেসড, তাহলে ফুল বন্ধুমহল ওদের দুজনের পাশে থাকব।”
আরবাজ বলল,
“হ্যাঁ, শেরাজ ব্রো ফাইনালি কোনো মেয়েকে পছন্দ করল।”
সারবাজ আরবাজের মাথায় গাট্টা মেরে বলল,
“পছন্দ করেছে কিনা এখনো আমরা শিওর না। তুই ছোটো, ছোটোর মতো থাক। নয়তো ড্যাডকে কল করে বলছি তোর একটা ব্যবস্থা করতে।”
আরবাজ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
“আমি এখন আর ছোট নাই। দেখোনা তোমাদের সাথে ঘুরি। আর তার থেকেও বড় কথা, আমি ম্যারিড।”
সারবাজ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমাদের থেকে তো ছোট তাই না?”
রিসান বলল,
“চল শেরাজের কাছে যাই।”
সকলে মিলে চলে গেল শেরাজকে ডাকতে।
ঘড়িতে সময় রাত দশটা। পার্লার থেকে লোক আনা হয়েছে মেহেদি পড়ানোর জন্য। মাইশা আগেই বলেছে, পার্লারের লোক বাকি সবাইকে মেহেদি পড়াবে, আর মাইশা সুমুর থেকে মেহেদি পড়বে। সুমু মেয়েটা যেমন রুপবতী, মায়াবতী তেমন গুণবতী। নাচ, গান, আর্ট— সব পারে সে, এবং যেকোন জিনিস একবার দেখলে ওইটা বানিয়ে ফেলতে পারে। ও খুব ভালো মেহেদি পড়াতে জানে। কিন্তু চারপাশে কোথায়ও সুমুকে দেখতে পেল না সে।
মাইশা সামিয়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“এই সামিয়া! সুমু কই রে? ও আমাকে মেহেদি পড়াবেনা? যা গিয়ে ওকে ডেকে নিয়ে আয়।”
সামিয়া আর নাজমিন চলে গেল সুমুকে ডাকতে।
রুমের দরজার সামনে এসে দরজায় নক করে ডাকতে লাগল ওরা সুমুকে।
সামিয়া বলল,
“এই আপু, তুই কি করিস দরজা দিয়ে? দরজা খোল। বাহিরে তোকে মাইশা আপু ডাকছে।”
ভেতর থেকে সুমু উত্তর দিল,
“তোরা যা। আমাকে বিরক্ত করিস না। আমার মাথা ব্যথা করছে। একটু ঘুমাব আমি।”
নাজমিন বলল,
“মাথা কি অনেক ব্যথা করছে আপু? কাকিমনিকে ডাকি?”
“এই না, কাউকে ডাকতে হবে না। আমি পেইন কিলার নিয়েছি। ঠিক হয়ে যাবে।”
সামিয়া বলল,
“তাহলে মাইশা আপুকে গিয়ে বলি, পার্লারের লোক দিয়ে মেহেদি পড়তে।”
কথাটা বলে চলে যাচ্ছিল ওরা। সামিয়ার কথা শোনা মাত্রই বালিশ থেকে মুখ তুলে তাকাল সুমু। চোখের পানি মুছে উঠে বসল সে। সামিয়া আর নাজমিনের উদ্দেশ্যে বলল,
“তোরা যা। মাইশা আপুকে গিয়ে বল আমি আসছি।”
নাজমিন বলল,
“কিন্তু তুমি না বললে মাথা ব্যথা করছে?”
“হ্যাঁ, করছে। তবে মাইশা আপুকে আমি কথা দিয়েছি। আর আমার কথা আমি রাখব। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আসছি।”
সামিয়ারা চলে গেল। সুমু বিছানা ছেড়ে উঠে জামা-কাপড় নিয়ে চলে গেল ফ্রেশ হতে। পাঁচ মিনিটের মাথায় ফ্রেশ হয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কান্নার ফলে চোখ, মুখ ফুলে গেছে তার। চুলটা কোনো রকমে হাত ক্লিপ দিয়ে আটকে চলে গেল ড্রয়িংরুমের উদ্দেশ্যে।
ড্রয়িংরুমের মেঝেতে সকলে গোল হয়ে বসে আছে। মেঝেতে বসার জন্য খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। আর আত্মীয়দের বসার জন্য চেয়ার পেতে দেওয়া হয়েছে। মোটা নরম তোশক ফেলে চাদর পেতে দেওয়া হয়েছে মেঝেতে বসার জন্য। মাইশাকে মাঝে বসিয়ে সকলে ওর চারপাশে বসে আছে। মাইশার সামনে বড় পিতলের থালায় করে গোলাপের পাপড়ির ওপর মেহেদি গোল করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সুমু এসে বসল মাইশার পাশে।
মাইশা সুমুকে দেখে বলল,
“তোর নাকি মাথা ব্যথা করছিল? তাহলে তুই রেস্ট নিতি। উঠে আসতে গেলি কেন বলতো? কান্না করে তো চোখ-মুখ ফুলিয়ে ফেলেছিস।”
“এখন অনেকটা কম আপু। আমার কোনো সমস্যা হবে না। তাছাড়া তোমাকে মেহেদি পড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমি নিয়েছিলাম। আমার দায়িত্ব’তো আমাকে পালন করতে হবে।”
মাইশা সুমুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ওরে আমার পাকনি বুড়ি রে। দায়িত্ব পালন করা শিখে গেছে বুড়িটা।”
মাইশার কথা শুনে সকলে উচ্চস্বরে হেসে উঠল।
সামিয়া সুমুর উদ্দেশ্যে বলল,
“আপু তুমি চেঞ্জ কেনো করেছ? তোমাকে তো কতোটা সুন্দর লাগছিল।”
সুমু মনের সব কষ্টকে বুকের মধ্যে চাপা দিয়ে বলল,
“এমনি। ঘুমাব বলে চেঞ্জ করেছিলাম।”
মাইশা বলল,
“থাক না। ও এমনিতেও অনেক মিষ্টি। ওকে না সাজলেও অনেক মিষ্টি লাগে।”
দুর থেকে দাঁড়িয়ে সবটা দেখল শেরাজ। সে মনে-মনে বলল,
“কিছু শকুনের নজর থেকে তোমাকে সরানোর জন্য যদি, তোমার চোখ থেকে পানি ফেলতে হয়। তাহলে এমন পানি আমি তোমার চোখ থেকে বার বার ফেলতে রাজি আছি।”
শুরু হলো মেহেদির অনুষ্ঠান। সুমু মাইশার হাতে মেহেদি পড়িয়ে দিচ্ছে। সব মেয়েরা মিলে গ্রুপে “মেহেন্দি হে রাচনেওয়ালি” গানে ডান্স করার সিদ্ধান্ত নিল। ইফতিয়া, সামিয়া, রাইশা, মাহি, তিশা, নাজমিন, রাইশার বেস্টফ্রেন্ড প্রিয়া— সকলে মিলে নাচবে। সুমুকে অনেকবার ডাকল সবাই। মাথা ব্যথার বাহানা দিয়ে বসে রইলো সে।
আনোয়ার সাহেব, শামীম সাহেব, ইফতিয়াক সাহেব, রিসাত সাহেব— একসাথে বসে খোশগল্পে মেতেছে। মিনা বেগম, হাসি বেগম, খুশি বেগম সকলকে শরবত, পকোড়া দিচ্ছেন। শেরাজ ও তার সব ফ্রেন্ডরা একসাথে চেয়ারে বসে আছে।
শুরু হলো নাচ। সকলে নাচ দেখতে ব্যস্ত হলেও শেরাজের চোখ তার প্রেয়সীতে আটকে আছে। যে এখন প্রচন্ড অভিমান নিয়ে বসে আছে। এতোটাই অভিমান করেছে যে, একবার তাকায়নি পযর্ন্ত তার দিকে।
পাশ থেকে শেরাজের বন্ধুরা ঠোঁট টিপে হাসছে। শেরাজ ব্যাপারটা বুঝতে পেরে পকেট থেকে ফোনটা বের করে সোশ্যাল মিডিয়াতে স্ক্রল করতে লাগল। ইনস্টাগ্রামে ঢুকে বাইক রাইডের ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশন লিখল,
“নিউ কান্ট্রি,
নিউ সিটি,
নিউ মেমোরিজ,
নিউ ভাইবস,
নিউ পিপল,
উইথ আ নিউ স্ট্রেঞ্জ ফিলিং।
আই রিয়ালি ডোন্ট নো হোয়াট দিস স্ট্রেঞ্জ ফিলিং ইজ কল্ড… (নতুন দেশ, নতুন শহর, নতুন স্মৃতি, নতুন ভাইব, নতুন মানুষ, সাথে একটা নতুন অদ্ভুত অনুভূতি আমি সত্যি জানিনা এই অদ্ভুত অনুভূতির নাম কি…)”
পোস্ট করার সাথে সাথে কমেন্ট আর রিয়াক্টের ঢল পড়ে গেল। শেরাজ কমেন্টগুলোকে ইগনোর করল। কারো কমেন্টের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না সে।
নাচ শেষ হবার সাথে-সাথে সকলে একসাথে হাততালি দিল। শেরাজের বন্ধুরা শেরাজকে গান গাওয়ার জন্য বলল। কিন্তু কেউ রাজি করাতে পারল না তাকে।
হঠাৎ মাইশা বলল,
“একটা গান প্লিজ, ভাইয়া।”
মাইশার কথাশুনে শেরাজ বলল,
“সরি সিস। আজ না। কাল হলুদের অনুষ্ঠানে তোমার কথা আমি রাখব।”
সুমু শুধু কান খাড়া করে শুনলো কথাগুলো। কিন্তু শেরাজের দিকে একবারও মাথা তুলে তাকাল না সে। বড্ড বেশি কষ্ট পেয়েছে সে। একরাশ অভিমান বুকের মধ্যে জমা বেঁধে আছে তার। মনে-মনে পণ করেছে আর কথা বলবে না ওই মানুষটার সাথে। আর না! চা, কফি দিতে যাবে। গোল্লায় যাক ডায়েরি। যতদিন এই বাড়িতে আছে, পড়বেনা ওই মানুষটার সামনে। পারলে বিয়ের পরের দিনই চলে যাবে এই বাড়ি থেকে। মা-বাবা না গেলে, সে একাই চলে যাবে।
আবারও সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিল ড্যান্স করবে। তবে এইবার কাপাল ড্যান্স হবে। সকলকে যার যার পার্টনার বেছে নিতে বলা হল। এইবার উঠল শেরাজের ফ্রেন্ডরা। সামিয়ার সাথে নাচবে রাহিন।
আইয়ুব নাজমিনের কাছে গিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“হেই প্রিটি গার্ল, ড্যান্স উইথ মি?”
নাজমিন মুখ ভেঙিয়ে বলল,
“প্রয়োজনে কলাগাছের সাথে ড্যান্স করব। কলাগাছও আপনার থেকে বেটার। তবুও আপনার মতো ঝগড়াটে পুরুষের সাথে ড্যান্স করব না।”
আইয়ুব বলল,
“তুমি আমার সাথে কলাগাছের তুলনা করছো মেয়ে? তুমি জানো, কতো মেয়েরা আমার সাথে একটা পিক তোলার জন্য পাগল। আর সেইখানে তুমি ড্যান্স করার সুযোগ পাচ্ছো। তোমার তো খুশিতে পয়জন খেয়ে সেলিব্রেট করা উচিত। আর সেইখানে তুমি রিজেক্ট করছো। ভেবে দেখো, এই সুযোগ সীমিত সময়ের জন্য। রাজি থাকলে হ্যাঁ বলো। রাজি না থাকলেও হ্যাঁ বলো।”
নাজমিন উঠে চলে যাচ্ছিল। পেছন থেকে মাইশা বলল,
“যাওনা নাজমিন। ভাইয়া এতো করে যখন বলছে।”
“কিন্তু আপু…”
“আহ্! যাওতো। বড়দের কথা শুনতে হয়। যাও।”
নাজমিন আইয়ুবের দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আইয়ুবের হাতে হাত রাখল। আইয়ুব ভীষণ খুশি হলো। প্রথম দিনের ধাক্কাতেই এই শ্যামকন্যা তার মনে জায়গা করে নিয়েছিল। তার এখন মনে হয়, রাহিন ঠিকই বলেছিল— সত্যি বাংলাদেশের মেয়েগুলো মায়াবতী। তার মনের সাথে-সাথে, তার ওই অনুভুতিহীন বন্ধুটার মনেও জায়গা করে নিল এক নারী।
সকলে যার যার পার্টনার বেছে নিল। ইফতিয়া উঠে চললো শেরাজের দিকে। ইফতিয়াকে আসতে দেখে শেরাজ ফোনে কথা বলার ভান করে চেয়ার ছেড়ে উঠে বাহিরে চলে গেল।
ইফতিয়া আর রাইশা নামের মেয়েটাকে প্রথম দিন থেকে ভালো লাগেনা শেরাজের। হ্যাবলার মতো তাকিয়ে হাসতে থাকে। আর এই ইফতিয়া মেয়েটাতো বড্ড গায়ে পড়া। ব্যাচেলর পার্টির রাতে সেলফি তুলতে এসে কিভাবে গায়ের ওপর পড়েছিল তার। একেতো বিয়ে বাড়ি, তার ওপর রাহিনের আপন আর ফুফাতো বোন বলে কিছু বলেনি সে। কিন্তু নেক্সট টাইম এমন কিছু করতে আসলে চড়িয়ে সোজা করে দিবে সে। তখন আর কোনো ফ্রেন্ডের বোন মানবে না সে। সেদিনই চড় মেরে উচিত শিক্ষা দিয়ে দিতো। শেরাজ খান এমনিতেই কারো পরোয়া করেনা। শুধু রাহিনের জন্য সেদিন কিছু বলেনি।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বাহিরে চলে গেল শেরাজ। শেরাজের বন্ধুগুলো সব হেসে ফেলল। আইয়ুব, সারবাজের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“এইভাবে কাউকে ইগনোর আর ইনসাল্ট করা এস.কের পক্ষেই সম্ভব।”
সুমুও আর মুখ ভার করে রাখতে পারল না। এমন কান্ড দেখে সেও নিঃশব্দে হেসে ফেলল। অপমানে আর সকলের হাসি দেখে গা জ্বলে উঠলো ইফতিয়ার। রাগে বিড়বিড় করতে-করতে চলে এলো সে। মনে মনে বলল,
“এই অপমানের বদলা আমি নিবোই শেরাজ। তোমাকে আমি আমার করেই ছাড়ব।”
সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমাকে অপদস্ত হতে দেখে তোর খুব হাসি পাচ্ছে তাই না সুমু? তোর এই হাসির মাশুল, তোর চোখের পানি দিয়ে তুলব আমি। দেখ শুধু তুই, তোর সাথে আমি কি কি করি।”
কাপাল ড্যান্স শুরু হলো। সকলে মিলে ড্যান্স উপভোগ করল।
ড্যান্স শেষে বাকিরাও মেহেদি পরে নিল— শুধু সুমু ছাড়া। নাচ-গানের ফলে মাথা ব্যথা বেড়েছে বলে ওপরে চলে গেল সে।
খান সাহেব পর্ব ৬
রাত একটায় অনুষ্ঠান শেষ হলো। সকলে রাতের খাবার খেয়ে নিল। শুধু খেলো না সুমু। সে ঘুমের ভান ধরে রুমে পড়ে রইল। খাওয়া-দাওয়া শেষে আইয়ুব সোশ্যাল মিডিয়াতে ঢুকে শেরাজের পোস্টটা দেখে বন্ধুমহলের সবাইকে দেখাল। সকলের বুঝতে পারল আইয়ুবের তখনের বলা কথাগুলো সব সত্যি।
রাহিন, সামিয়া আর নাজমিনকে সাইডে নিয়ে গিয়ে সবটা বুঝিয়ে বলল। ভালো করে নজর রাখতে বলল সুমুর ওপর। যা আপডেট পাবে সাথে- সাথে ওদের জানাতে বলল। হাতের কাছে না পেলে, ফোনে টেক্সট করে জানাতে বলল। আর পইপই করে বলে দিল, কেউ যাতে বুঝতে না পারে বিষয়টা। কাল থেকে ওদের মিশন প্রেম শুরু হবে।
