খান সাহেব পর্ব ৮৬
সুমাইয়া জাহান
বেলকনির এক কোণে আলিশা গুটিসুটি মেরে বসে আছে। চারদিকের অন্ধকার এতটাই গাঢ় যে নিজের অস্তিত্বকেও আজ তার পরজাত মনে হচ্ছে। বাইরে বৃষ্টির শব্দের কোনো বিরাম নেই। গাছের পাতায় বৃষ্টির আছড়ে পড়ার শব্দটা এখন তার কানে এক অন্তহীন শেষকৃত্যের সুরের মতো বাজছে।
তার সেই উজ্জ্বল লাল শাড়িটা লোনা জল আর কাদার ছাপে বিবর্ণ। শাড়ির আঁচলটা বৃষ্টির ঝাপটায় ভিজে ভারী হয়ে মেঝের ধুলো মেখে পড়ে আছে। আলিশার চুলগুলো অবিন্যস্তভাবে তার মুখ আর কাঁধের ওপর লেপ্টে আছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
সে শূন্য দৃষ্টিতে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। বেলকনির গ্রিলটা ধরে সে যেই তার মাথাটা রাখল, তার মনে হলো গ্রিলের ঠাণ্ডা লোহাটাও হয়তো তার হৃদয়ের চেয়ে বেশি উষ্ণ।
“তুমি বলেছিলে আজ সব ঠিক হয়ে যাবে, আর.সি। আজ নাকি সব ঝামেলার শেষ হবে। তুমি কি এইভাবেই সব শেষ করতে চেয়েছিলে? আমি তোমার কথামতো তোমার দেওয়া লাল শাড়ি পরেছিলাম, কারণ তুমি লাল রঙ পছন্দ করতে। কিন্তু আজ এই রঙটা আমার কাছে রক্তের মতো তপ্ত লাগছে। কেন আমাকে একা ফেলে গেলে? কেন আমায় জ্যান্ত পুড়িয়ে মারতে তুমি নিজে পুড়ে ছাই হয়ে গেলে?”
হঠাৎ বাতাসের এক ঝাপটায় আলিশার শরীরের ভেতরে এক হিমেল কাঁপুনি বয়ে গেল। সে কাঁপছে, কিন্তু সেই কম্পন ঠাণ্ডার জন্য নয়, বরং এক আদিম নিঃসঙ্গতার জন্য। রায়য়ান চৌধুরী ছিল এক ভয়ংকর মরুভূমি, আর আলিশা ছিল সেই মরুভূমির একমাত্র তৃষ্ণার্ত পথিক। আজ সেই মরুভূমিটুকুও তার নেই।
আলিশা চিৎকার করে কাঁদতে চাইল, কিন্তু তার কণ্ঠনালি যেন কেউ পাথর দিয়ে চেপে ধরেছে। কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। শুধু তার চোখ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ে ঠোঁটের কোণে ঠেকছে। সে জানে, এই রাতের পর থেকে তার প্রতিটি সকাল হবে রায়য়ানের ছাইমাখা স্মৃতির সাথে।
আলিশা এই বেলকনিতেই অনন্তকাল বসে থাকতে চায়। যে বৃষ্টি রায়য়ানের শরীরের আগুন নেভাতে পারেনি, সেই বৃষ্টি আলিশার মনের ভেতরের দহনকেও আরও উসকে দিচ্ছে। সে ফিসফিস করে অন্ধকারের উদ্দেশে বলল,
“তুমি যেখানেই থাকো না কেন, আর.সি, জেনে রাখো— এই লাল শাড়িটা আমি কোনোদিন খুলব না। তুমি আমায় বিয়েটা করলে না ঠিকই, কিন্তু তোমার দেওয়া এই কাফনেই আমি নিজেকে জড়িয়ে রাখব।”
বাইরে বিদ্যুতের চমকানি মাঝে মাঝে আলিশার ফ্যাকাশে মুখটা আলোকিত করে তুলছে, আর সেই আলোতে দেখা যাচ্ছে তার স্থির, প্রাণহীন চোখের মণি— যেখানে আর কোনো স্বপ্নের অস্তিত্ব নেই। বেলকনির ঘুটঘুটে অন্ধকারে বৃষ্টির শব্দটা হঠাৎ তার কানে অন্যরকম শোনাতে লাগল। তার মনে হলো, বৃষ্টির এই একটানা শব্দের আড়ালে কেউ একজন খুব পরিচিত ছন্দে শ্বাস নিচ্ছে। সে অনুভব করল, তার ভিজে যাওয়া কাঁধের ওপর খুব চেনা একটা হাতের স্পর্শ।
আলিশা চমকে মুখ তুলল। বিদ্যুতের এক মুহূর্তের ঝলকানিতে সে দেখল—গ্রিলের সাথে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে রায়য়ান চৌধুরী। তার সেই কালো জ্যাকেট, চোখে সেই চেনা উদ্ধত চাহনি, কিন্তু আজ সেখানে কোনো ঘৃণা নেই।
আলিশা দুহাত বাড়িয়ে শূন্যে জড়িয়ে ধরতে চাইল। তার দুচোখ দিয়ে প্লাবনের মতো অশ্রু নামল। সে হেসে উঠল, যে হাসিতে মিশে আছে চরম উন্মাদনা।
“আর.সি! তুমি এসেছো? আমি জানতাম… আমি জানতাম তুমি আসবে। তুমি না এলে আমি ঠিক তোমার কাছে চলে যেতাম। দেখো, আমি তোমার দেওয়া লাল শাড়িটাই পরে আছি।”
রায়য়ান যেন তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। তার অবয়ব থেকে এক শীতল ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আলিশা তার কাল্পনিক রায়য়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের দীর্ঘদিনের জমানো অভিযোগগুলো ঢেলে দিল। তাদের মধ্যে শুরু হলো এক অলৌকিক আর বিষাদময় কথোপকথন।
“আমার আপনিটা বড্ড বেশি অশান্ত আর চঞ্চলতার কাছে যেন নির্বাসিত এক মন। নয়তো কীভাবে এত দ্রুত আমার উপস্থিতিকে পাশ কাটিয়ে আপনার মন অন্য কারও দিকে চলে যেতে পারে? আমি কি তবে আপনার অন্তঃপুরে ক্ষণিকের অতিথি—যার নামটুকু মনে থাকে, কিন্তু অস্তিত্বের কোনো ভার থাকে না? আপনি জানেন, আমার অভিমান উচ্চস্বরে কথা বলে না, সে নীরবে জমে আর গভীরে ক্ষত তৈরি করে। আর সেই ক্ষতের ভেতর দাঁড়িয়েই আজ আমি প্রশ্ন করি—আপনার এই অস্থির মন কি কখনো আমার কাছেই স্থির হতে পারত না?”
রায়য়ান মৃদুস্বরে বলল,
“আপনি? যাক বেশ! তুমি যাকে চঞ্চলতা বলছ, সে আসলে অস্থিরতা আর নিজের সঙ্গেই যুদ্ধরত এক মন। সেটা অন্য কারও দিকে ছুটে যাওয়া নয়। বিশ্বাস করো, সেটা ছিল দিশাহীনতার ভুল পদক্ষেপ। আমি কখনো তোমাকে হীন ভাবিনি বরং তোমার স্থির উপস্থিতির সামনে দাঁড়িয়েই নিজের অযোগ্যতা টের পেয়েছি। তাই পালিয়েছি—কারণ স্থিরতার মুখোমুখি হওয়ার সাহস আমার ছিল না। তোমার অভিযোগ আমাকে দোষী করে না, আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আর সেই আয়নায় আজ আমি স্পষ্ট দেখি—যে শান্তির খোঁজে আমি অন্যদিকে তাকিয়েছিলাম, তার সমস্তটুকুই ছিল তোমার মধ্যেই।”
সে থেমে খুব বেশি ক্ষীণ কণ্ঠে বলল,
“তবু জানো, এই উপলব্ধি খুব দেরিতে আসে। যখন আসে, তখন সম্পর্কের শরীর জুড়ে ইতিমধ্যেই ফাটল ধরে যায়। আমি তোমার কাছে প্রতিশ্রুতি চাইতে আসিনি—কারণ ভাঙা প্রতিশ্রুতির ভার বইবার শক্তি আমার নেই। আমি শুধু জানতে চাই, আজ যে বোধ তোমার চোখে ঝরে পড়ছে, সেটুকু কি কালও বেঁচে থাকবে? নাকি সময়ের স্রোতে সেটাও চঞ্চল হয়ে হারিয়ে যাবে?”
আলিশা ব্যথাতুর হাসল,
“আমি এখন আর টান ধরে রাখছি না। যদি তুমি থাকতে চাও, তবে স্থির পায়ে এগিয়ে এসো। আর যদি যেতে হয়—তবে এবার আর আমার নামটা ব্যবহার করে নিজেকে দোষারোপ কোরো না।”
রায়য়ান দীর্ঘশ্বাস গিলে নিয়ে বলল,
“তোমার এই নীরব দৃঢ়তাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভয় দেখায়। কারণ এখানে আর অনুরোধ নেই, অভিযোগ নেই—আছে শুধু সিদ্ধান্তের শীতলতা। আমি জানি, দেরিতে আসা উপলব্ধির কোনো ক্ষমা হয় না। তবু সত্যিটা এড়াতে পারি না—আজ আমি পালাতে চাই না। স্থিরতা আমি শিখিনি, কিন্তু তোমাকে হারানোর আশঙ্কা আমাকে প্রথমবার নিজের পা দুটো শক্ত করে মাটিতে রাখিয়েছে। যদি আমি এগিয়ে আসি, সেটা অভ্যাসের টানে নয়—দায়বদ্ধতার ভার নিয়েই আসব। আর যদি কখনো আবার চঞ্চল হতে শিখি, তবে তোমার নাম নয়, নিজের দুর্বলতাকেই দোষী করব। তুমি অপেক্ষা করো—এই কথা বলার সাহস আমার নেই। আমি শুধু এইটুকু বলব, যদি তুমি দরজা পুরোপুরি বন্ধ না করো, আমি আজ প্রথমবার সত্যিই থামতে চাই।”
আলিশা শান্ত স্বরে বলল,
“থামতে চাও বললেই থামা যায় না। থামার প্রমাণ দিতে হয়—সময়ের ভেতর দিয়ে, আচরণের ধারাবাহিকতায়। আমি আর ভরসার খোঁজে নিজেকে খরচ করতে পারছি না। আমার দরজাটা পুরোপুরি বন্ধও নয়, আবার খোলাও নেই—সে এখন আমার সীমানা। যদি সত্যিই স্থির হতে পারো, তবে সেটা আমাকে বোঝাতে হবে না। আমি নিজেই অনুভব করতে পারব। তোমার প্রতিদিনের উপস্থিতিই বলে দেবে। আর যদি না পারো—তাহলে অন্তত এতটুকু সততা রেখো, যেন আবার ফিরে এসে আমার শান্তিকে চঞ্চল করে তুলতে না পারো।”
“তোমার সীমানাকে আমি অজুহাত বানাতে চাই না, সম্মান করতে চাই। কারণ আজ বুঝেছি— ভালোবাসা দখল নয়, দায়িত্ব। আমি প্রমাণের কথা বলব না। প্রমাণ সময় নিজেই তৈরি করবে, যদি আমি টিকে থাকতে পারি। আমি আর কখনও তোমার শান্তি আর নষ্ট হবার সুযোগ দিব না। আর যদি কোনো দিন তোমার সামনে দাঁড়াই—তবে প্রশ্ন নিয়ে নয়, স্থির হয়ে দাঁড়াব। না পারলে, এই দূরত্বটুকুকেই শেষ সম্মান হিসেবে মেনে নেব।”
আলিশা কেঁদে উঠে বলল,
“আমাকে কেন ভালোবাসতে পারলে না, আর.সি? আমাকে ভালোবাসলে আজ সবটা অন্যরকম হতো। আমাদের খুব সুন্দর একটা সংসার হতো। আজ যে আমার গল্পের শেষ পৃষ্ঠা লিখে গেছে নিয়তি, আর তাতে শুধু তোমার অনুপস্থিতি। আমি তো কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না এসব।”
রায়য়ান চুপ করে রইল। আলিশা তার ভিজে যাওয়া হাত দুটো বুকের ওপর চেপে ধরল। সে অনুভব করল, তার ভেতরের একতরফা ভালোবাসার প্রতিটি ক্ষত আজ আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছে। সে অস্ফুট স্বরে রায়য়ানের শূন্য জায়গাটার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,
“আমার আপনিটা বড্ড বেশি অবুঝ। সে বোঝে না— একতরফা ভালোবাসা মানে কেবল ভালোবাসা না, এটা প্রতিদিন নিজের ভেতর একটু একটু করে ভেঙে পড়া। আমি তাকে জোর করে চাইনি। শুধু চেয়েছিলাম— একদিন সে নিজে বুঝুক, নীরবতায় লুকিয়ে থাকা এই অপেক্ষাটার ওজন কতটা ভারী। সে হাসত, কথা বলত, অন্য সবার মতো স্বাভাবিক থাকত। আর আমি? আমি তার প্রতিটা শব্দে অপ্রয়োজনীয় হয়ে ছিলাম। আমার আপনিটা বোঝে না— আমি তাকে কখনো দোষ দিইনি। কারণ একতরফা ভালোবাসার সবচেয়ে বড় শর্তই হলো কিছু না চেয়েও ভালোবেসে যাওয়া। তবু রাতে ঘুম আসত না। কারণ জানি, সে আমার অপেক্ষায় নেই। অথচ আমি— আজও শুধুই তারই অপেক্ষায়।”
“অবুঝ আমি চিরকালই ছিলাম, আলিশা। তবে সেই অবুঝপনা আসলে ছিল এক ধরণের স্বার্থপরতা। আমি তোমার নীরবতার ওজন বুঝতাম না তা নয়, বরং সেই ভার বইবার মতো প্রশস্ত বুক আমার ছিল না। আমি পালাতাম— অপ্রয়োজনীয় ভেবে নয়, বরং তোমার এই পবিত্র ভালোবাসার সামনে নিজেকে বড্ড বেশি অপরাধী মনে হতো বলে। আমি জানতাম আমি তোমার অপেক্ষায় নেই, কিন্তু আমি এটাও জানতাম যে পৃথিবীর সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও তোমার এই একতরফা ভালোবাসার দুয়ার আমার জন্য আজীবন খোলা থাকবে। আর আমি তোমার সেই আস্থার অসম্মান করেছি।”
আলিশা ম্লান হাসল,
“অসম্মান তো তখনই হয়, যখন অধিকার থাকে। আমার তো তোমার ওপর কোনো অধিকারই ছিল না। তুমি তো আমাকে কোনোদিন সেই সীমানায় ঢুকতেই দাওনি। আমি শুধু দূর থেকে তোমার বিষাদ দেখেছি, তোমার অস্থিরতা দেখেছি—আর চেয়েছি ওই বিষাদের এক কণা যেন আমার ভাগেও পড়ে। একতরফা ভালোবাসার মানুষেরা খুব অদ্ভুত হয়, জানো? তারা প্রিয় মানুষের ঘৃণাটুকু পেলেও সেটাকে ভালোবাসে মনে করে আগলে রাখে। আমি তো তোমার সেই অবহেলাটুকুও হারিয়ে ফেললাম আজ।”
“অবহেলা নয় আলিশা, ওটা ছিল আমার নিজের অন্ধকারের দেয়াল। আমি ভেবেছিলাম তোমাকে দূরে রাখলে তুমি বেঁচে যাবে। কিন্তু আজ এই আগুনের ওপার থেকে দাঁড়িয়ে দেখছি— আমি তোমাকে দূরে ঠেলে দিয়ে আসলে তিল তিল করে পুড়িয়েছি। তুমি আজও আমারই রয়ে গেলে, আর আমি? আমি আজ একমুঠো ছাই হয়েও তোমার এই অবুঝ মনের কাছে হেরে গেলাম।”
“হেরে তো আমি গেছি আর.সি। কারণ তুমি তো মুক্তি পেয়ে গেলে। কিন্তু আমাকে ফেলে গেলে এক অন্তহীন অপেক্ষার কারাগারে। যে মানুষটা আমার অপেক্ষায় নেই, তাকে নিয়ে সারাজীবন অপেক্ষা করে যাওয়ার চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে? তুমি অবুঝ ছিলে, আর আমি হলাম এক অভিশপ্ত অপেক্ষার নাম।”
কথাটা শেষ হতেই বিদ্যুতের এক তীব্র চমকানি হলো। আলিশা চোখ বুজে ফেলল। কয়েক সেকেন্ড পর চোখ মেলতেই দেখল—সামনে কেউ নেই। শুধু বেলকনির গ্রিল বেয়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে। তার হ্যালুসিনেশনের সেই রায়য়ান মিলিয়ে গেছে। আলিশা দুই হাত বাড়িয়ে শূন্যতা খামচে ধরল। সে বুঝতে পারল, এই কথাগুলো রায়য়ান কোনোদিন তাকে বলেনি, আর কোনোদিন বলবেও না। এগুলো ছিল তার নিজের মনের ভেতরে পুষে রাখা এক অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষা।
“আর.সি! আর.সি, যেও না। আমি আরও কথা বলতে চাই!” সে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল। কিন্তু উত্তরের বদলে কেবল পাশের গাছগুলোর পাতায় বৃষ্টির আছড়ে পড়ার শব্দ ফিরে এলো। সে বেলকনির গ্রিল ধরে চিৎকার করতে লাগল, তার বুকফাটা আর্তনাদ বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেল। কেউ নেই। কেউ কোথাও নেই। ওই লেলিহান শিখা যাকে কেড়ে নিয়েছে, সে কোনোদিন হ্যালুসিনেশন হয়েও আর ধরা দেবে না। সে আবার বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে একা একা বিড়বিড় করে উঠল,
“স্থির তো তুমি হলে আর.সি… এক নিমেষে আগুনের ভেতর চিরস্থায়ী স্থির হয়ে গেলে। আর আমাকে দিয়ে গেলে এক আমৃত্যু অস্থিরতা।”
আলিশা হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। তার চোখের মণি স্থির। সে দ্রুত পা ফেলে অন্ধকার রুমের ভেতর ঢুকে পড়ল। হাতড়াতে হাতড়াতে পড়ার টেবিলের ল্যাম্পটা জ্বালাল। ডায়েরিটা টেনে নিয়ে কলম ধরল। তার হাত কাঁপছে, কিন্তু মনের ভেতরে এক প্রলয়ংকরী ঝড় বইছে। আজ সব কথা তাকে লিখে রাখতে হবে, না হলে বুকের এই আগ্নেয়গিরি তাকে ভস্মীভূত করে দেবে।
ডায়েরির পাতায় দ্রুত, অগোছালো কলমের আঁচড় পড়তে শুরু করল।
‘আমার দাফনহীন আত্মার খুনি”
“আমাদের আর কখনও সাক্ষাৎ হবে না—তাই না? তোমার সিগারেট-পোড়া ঠোঁটজোড়া থেকে আর আমাকে প্রত্যাখ্যান করার সেই কর্কশ শব্দগুলো শোনা হবে না—তাই না? তোমার শরীর থেকে উঠে আসা সেই বিশ্রী মদের তীব্র গন্ধটা আর এসে আমার শ্বাসে অস্বস্তি ঢেলে দেবে না—তাই না?
তবুও কেন মনে হচ্ছে, সব শেষ হয়েও কিছুই শেষ হয়নি? কেন এই না-হওয়ার ভেতরেও তোমার উপস্থিতি এমন করে গেঁথে আছে? কেন এখনো তোমার মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে? কেন হঠাৎ থমকে যাচ্ছি, মনে হচ্ছে—এই বুঝি তুমি সামনে এসে দাঁড়ালে? তুমি নেই, অথচ তোমার অনুপস্থিতি এমনভাবে রয়ে গেছে যেন তুমি আছো—আরও নিষ্ঠুর হয়ে আছো। তোমার বলা শেষ কথাগুলো এখনো আমার কানে বাজছে। এই শেষ বিদায়ের অজুহাতের আড়ালে তুমি কত সহজে আমাকে ফেলে চলে গেলে, সেটা বুঝে নেওয়ার ভার শুধু আমার একারই।
হয়তো আর কখনও দেখা হবে না। হয়তো আর কখনও তোমার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করা হবে না—আমি কি সত্যিই এতটাই অপ্রয়োজনীয় ছিলাম? সত্যি কি আমাকে এত সহজে ফেলে চলে যাওয়া যায়? সত্যি কি আমার মায়ায় ‘তুমি’ নামক নষ্ট পুরুষটির পড়া বারণ ছিল? হয়তো তাই! কিন্তু জানো, কিছু মানুষ চলে গেলেও তাদের রেখে যাওয়া ক্ষতগুলো যায় না। তারা আর ফেরে না— শুধু স্মৃতি হয়ে থেকে যায়, আর প্রতিদিন একটু একটু করে আরও নিঃশব্দে মেরে ফেলে।
তুমি নামক একটা সিগারেটে ঠোঁট পোড়া নষ্ট পুরুষকে ভালোবেসে আজ আমার এই সর্বনাশ। আমি জানতাম তুমি ঠিক মানুষ না। তোমার চোখে স্থিরতা ছিল না, কথায় দায় ছিল না, আর অভ্যাসে ছিল শুধু ধ্বংসের গন্ধ। তবু আমি থামিনি। কারণ মেয়েরা অনেক সময় ভুল মানুষকেই নিজের শেষ বিশ্বাস বানিয়ে ফেলে। আমি ভেবেছিলাম, ভালোবাসা মানুষকে বদলায়। ভেবেছিলাম, আমার ভালো থাকা, আমার যত্ন একদিন তোমার হাত থেকে সিগারেটটা নামিয়ে দেবে, তোমাকে পাপের জগতে থেকে ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছিলাম—কিছু মানুষ আগুন পছন্দ করে, তারা আলো নয়।
তুমি প্রতিটা টানে নিজেকে একটু একটু করে শেষ করতে, আর আমি প্রতিটা টানে নিজেকে তোমার সাথে আরও গভীরে হারাতাম। তুমি জানতে আমি কষ্ট পাচ্ছি—তবুও থামোনি। কারণ নষ্ট মানুষদের থামার কারণ লাগে না। আজ আমার ঠোঁট পোড়েনি আর.সি, কিন্তু বুকটা পুড়ে ছাই। তোমার সিগারেটের দাগ তোমার ঠোঁটেই ছিল, আর তোমার নষ্ট স্বভাবের দাগ আজ আমার পুরো জীবনে। সবচেয়ে কষ্টের কথা জানো কী? তুমি আমাকে নষ্ট করোনি। আমি নিজেই ভুল মানুষকে ভালোবেসে নিজের সর্বনাশ ডেকে নিলাম।
লোকে বলে—মায়া থাকলে জেতা যায়, রূপ থাকলে ধরা পড়ে, আর গুণ থাকলে টিকে থাকা যায়। তাহলে আমি কোথায় হেরে গেলাম বলো? আমার চোখে মায়া ছিল, তবু তুমি তাকিয়ে থামোনি। আমার মুখে রূপ ছিল, তবু তুমি দেখে থেকে যেতে চাওনি। আমার ভেতরে গুণ ছিল—সহ্য করার, ভালোবাসার, নিজেরটা বিলিয়ে দেওয়ার—তবু তার কোনো দাম তোমার কাছে পড়ল না। কারণ আমি ভাগ্যবতী ছিলাম না।
যার মধ্যে কোনো মায়া নেই, তার দিকে মানুষ দৌড়ে যায়—কারণ ভাগ্য তার পক্ষে। যার মধ্যে কোনো গভীরতা নেই, সে প্রিয় হয়ে ওঠে—কারণ ভাগ্য তাকে তুলে ধরে। আর আমি? আমি সবকিছু নিয়েই দাঁড়িয়ে ছিলাম, শুধু ভাগ্য ছাড়া। আমি রাজকীয় কিছু চাইনি। চেয়েছিলাম শুধু একটা তুমি, যে তার সব পাপ ছেড়ে দিয়ে শুধু আমাকে ভালোবাসবে। কিন্তু ভাগ্যবতী এসে সব সহজ করে নিয়ে গেল। তার না ছিল তোমার জন্য অপেক্ষা, না ছিল কোনো লড়াইয়ের প্রমাণ— তবুও সে জিতে গেল।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট কোথায় জানো? এটা ভেবে না যে আমি কম ছিলাম, বরং এটা ভেবে—আমি যথেষ্ট ছিলাম, তবুও অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেলাম। আজ বুঝি, মায়াবতী হওয়া যায়, রূপবতী হওয়া যায়, গুণবতী হওয়া যায়—কিন্তু ভাগ্যবতী হওয়া যায় না। সেটা শুধু কপালে লেখা থাকে। আর আমার কপালে… হেরে যাওয়াটাই লেখা ছিল।
আর.সি, তুমি আজ মুক্তি পেয়ে গেছো, কিন্তু আমাকে এই পৃথিবীর নরকে একা ফেলে গেলে। এতোটা পাষাণ তুমি? কীভাবে পারলে একটা হাস্যজ্বল মেয়েকে জীবন্ত দাফন করতে? তোমার একটু মায়া হলো না, তাইনা? তুমি কোনোদিন বুঝতে চাওনি যে, একতরফা ভালোবাসার মানুষদের কোনো এক্সিট ডোর থাকে না। আমরা শুধু ভেতরে ঢুকতে জানি, বের হওয়ার পথ আমাদের জানা নেই। আজ হাজারো ভিড়ে তোমার উপস্থিতি নেই—এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে ট্র্যাজিক অধ্যায়।
তুমি ছিলে এক অবুঝ জাদুকর। তুমি জানলে না, তোমার প্রতিটি উপেক্ষা আমার হৃদয়ে একেকটি নীলচে দাগ হয়ে বসে গিয়েছিল। অথচ আমি সেই দাগগুলোকেই আলপনা ভেবে সারাজীবন সাজিয়েছি। আমি জানতাম তুমি কোনোদিন আমার হবে না, তবুও প্রতিটি প্রার্থনায় আমি শুধু তোমার নামটাই নিতাম। মানুষ বলে একতরফা ভালোবাসা নাকি পবিত্র, কিন্তু আমি বলি এটা এক বিষাক্ত নেশা। যে নেশা মানুষকে তিলে তিলে মারে, অথচ মরতে দেয় না।
আজ তুমি নেই। তোমার সেই রুক্ষ মেজাজ, সেই অবহেলা—সব এখন ইতিহাসের ছাই। আমি আজ এই লাল শাড়িটা পরে বসে আছি, যেটা তুমি আমার জন্য নিজের হাতে পছন্দ করেছিলে। তুমি কি জানতে আর.সি, এটা আমার খুশির শাড়ি নয়, এটা আমার সারাজীবন কষ্টের দগ্ধ চিহ্ন হয়ে যাবে?
আমার ডায়েরির প্রতিটি পাতা আজ তোমার নামে সাক্ষী দিচ্ছে। তুমি কোনোদিন আমায় অধিকার দাওনি, কিন্তু আমি আজ তোমাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিলাম আমার এই একাকী মনের নির্জন কুঠুরিতে। তুমি সেখানে থাকবে, আমার সব অভিমান আর অভিযোগের কেন্দ্রে।
বিদায় আর.সি। তুমি যেখানেই থাকো, মনে রেখো—তুমি আমায় ভালোবাসা না দিলেও, আমার ঘৃণাটুকু পাওয়ার যোগ্যতাও তুমি হারিয়ে ফেলেছো। আমি তোমাকে ভালোবেসেই যাব, কারণ এর চেয়ে বড় শাস্তি তোমাকে দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।”
“কোনো এক অভাগী”
কলমটা হাত থেকে খসে পড়ল। সে জানে এই চিঠি আর কোনোদিনও কাঙ্ক্ষিত মানুষটির কাছে পৌঁছাবে না। আলিশার ডায়েরির পাতাগুলো চোখের জলে ভিজে ঝাপসা হয়ে গেছে। সে তার কাদা মাখা লাল শাড়ির আঁচলটা মুখে চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। যে রায়য়ান চৌধুরী তার জন্য শেষ উপহার রেখে গেছে, সেই উপহারের চেয়েও বড় উপহার ছিল এই যন্ত্রণা—যা আলিশাকে তিলে তিলে পাথর বানিয়ে দিচ্ছে। সে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি তো চলেই গেলে আর.সি। কিন্তু আমার ভেতরে তোমার ওই অবুঝ রূপটাকে আমি সারাজীবন বাঁচিয়ে রাখব। তুমি নেই তাতে কী? আমার একতরফা ভালোবাসা তো কোনোদিন মরবে না।”
তার চোখের দৃষ্টি এখন স্থির, সেখানে কোনো ভয় নেই, বরং আছে এক ভয়ঙ্কর শান্তি। সে ডায়েরিটা বন্ধ করে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত ম্লান হাসি। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“আমি আসছি তোমার কাছে আর.সি। তোমার আগুনে পুড়ে মরতে অনেক কষ্ট হয়েছে, তাই না? আমি জানি, তুমি বড় একা বোধ করছো ওখানে। আমি আসছি… তোমার সেই সবটুকু কষ্ট আমি ভাগ করে নেব। আমাদের মধ্যে আর কোনো দূরত্ব থাকবে না।”
সে যন্ত্রচালিত মানুষের মতো রান্নাঘরে গেল। শেলফ থেকে কেরোসিনের বোতলটা বের করল, আর ড্রয়ার থেকে এক প্যাকেট দেশলাই। বৃষ্টির শব্দ তাকে আর বাধা দিচ্ছে না, বরং মনে হচ্ছে আকাশ তাকে ডাকছে। সে টলমল পায়ে সিঁড়ি বেয়ে রুফটপে উঠে গেল।
ছাদের ওপর বৃষ্টির ঝাপটা এখন নেই বললেই চলে। ফোটা ফোটা বৃষ্টি পড়ছে এখন। আলিশা রেলিংয়ের কাছে গিয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলল। বৃষ্টির জল তার মুখ ধুয়ে দিলেও তার হৃদয়ের আগুন নেভাতে পারছে না। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল,
“আল্লাহ! তুমি তো জানো আমি কতটা ভালোবেসেছিলাম তাকে। কতবার তোমাকে বললাম, যাকে ভাগ্যে লিখো নি তাকে মন থেকেও তুলে দাও। কিন্তু তুমি দিলে না। লোকে বলে আত্মহত্যা মহাপাপ, জাহান্নামের আগুনে পুড়তে হয়। কিন্তু আমি তো এই পৃথিবীতেই এখন জাহান্নামের আগুনে পুড়ছি। যাকে ছাড়া আমার এক মুহূর্ত চলে না, সে যখন ছাই হয়ে বাতাসে মিশে গেছে, তখন আমার আত্মাকে এই রক্ত-মাংসের খাঁচায় আটকে থেকে কী লাভ? আমি আজ বাধ্য আল্লাহ, আমি এই অসহ্য যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি চাই। যদি পাপ হয়, তবে সেই পাপের ভাগীদারও আমি একাই হব।”
সে কেরোসিনের বোতলের ছিপিটা খুলল। ঝাঁঝালো গন্ধটা নাকে আসতেই তার একবার রায়য়ানের কথা মনে পড়ল। রায়য়ান তো গন্ধ ঘৃণা করত না, সে নিজেও তো নষ্ট অভ্যাসের মাঝে ডুবে থাকত। আলিশা বোতলটা উপুড় করে নিজের মাথার ওপর ধরল। নীলচে তরলটা তার চুলে, তার সেই প্রিয় লাল শাড়িতে আর সারা শরীরে ভিজে লেপ্টে গেল।
কেরোসিন আর বৃষ্টির জল মিশে এক বিভীষিকাময় রূপ নিল। আলিশা কাঁপতে কাঁপতে দেশলাই বের করল। একটা কাঠি বের করে বাক্সের গায়ে ঘষল। প্রথমবার কাঠিটা ভিজে থাকায় জ্বলল না। দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার, চেষ্টা করতেই হঠাৎ এক ঝলক আগুন জ্বলে উঠল। আগুনের সেই ছোট্ট শিখাটা আলিশার চোখে ধরা দিল এক মুক্তির পথ হিসেবে। সে শেষবারের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
খান সাহেব পর্ব ৮৫
“আর.সি, আমি আসছি। এবার আর আমায় ফিরিয়ে দিও না।”
কাঠিটা সে নিজের শাড়ির আঁচলে ছোঁয়াল। মুহূর্তের মধ্যে লকলকে আগুনের শিখা তার পুরো শরীরকে গ্রাস করে নিল। বৃষ্টি আজ কমে গিয়ে কেরোসিনের আগুনের কাছে হেরে গেল। অন্ধকারের বুক চিরে এক তীব্র হলুদ আলো রুফটপকে আলোকিত করে তুলল। আলিশার কণ্ঠ থেকে কোনো চিৎকার বেরোলো না, কেবল আগুনের দাউদাউ শব্দ আর বৃষ্টির কান্নার মাঝে এক নিঃশব্দ বিদায়ের সাক্ষী হয়ে রইল রাতের আকাশ। সেই লাল শাড়িটা সত্যিই কাফন হয়ে গেল, আর আলিশা তার প্রিয় নষ্ট পুরুষটার খোঁজে আগুনের পথেই পা বাড়াল।
