চন্দ্রাস্ত পর্ব ৬
ফারহানা কবীর মানাল
হাবিব মাথা নিচু করে রেখেছে। মিলির দিকে তাকাচ্ছে না। এমন উগ্র সাজের মেয়ে মানুষ নিয়ে এক টেবিলে বসতে তার বেশ দ্বিধা কাজ করছে। আশেপাশের দু-একজন ইতিমধ্যে তাদের দিকে তাকানো শুরু করেছে। তারা কি ভাবছে কে জানে! মিলি বলল, “আমাকে এখানে দেখে অবাক হয়েছেন নিশ্চয়ই?”
“সেটাই কি স্বাভাবিক নয়?”
“জানতে চান আমি এখানে কেন এসেছি? কিভাবে এসেছি?”
“প্রয়োজন মনে করছি না। আমায় কিছু বলতে চাইলে বলো। না হয় এখান থেকে যাও। একটু ব্যস্ত আছি।”
মিলি হাবিবের চোখের দিকে তাকাল। তরল গলায় বলল, “আমি এখানে আপনার জন্য এসেছি। আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল তাই এসেছি। এখানে আসতে অনেক কাঠখড় পো’ড়া’তে হয়েছে। আপনার অফিসে গিয়ে খোঁজ করেছিলাম৷ প্রথমে বলতে চায়নি, পরে অফিসের পিয়নটাকে নাস্তা পানির জন্য কিছু দেবার পর বলল। বলল- সাতদিন পরে ফিরবেন। অপেক্ষা করতে পারিনি। চলে এসেছি।”
“এসব কথার মানে কি? কি বলতে চাইছ তুমি?”
মিলি জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে শুকনো গলায় বলল, “সবটা বুুঝিয়ে বলার জন্য আমার একটু সময় প্রয়োজন। তাছাড়া এখানে বলাও সম্ভব না।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“তোমার সাথে আমার এমন কোন কথাই নেই যার জন্য আলাদা জায়গায় প্রয়োজন হবে। অন্য রকম পরিবেশ লাগবে। যা বলার বলো, না হয় এখান থেকে যাও। আমরা কলিগরা আসবে।”
“আপনি এমন করে কথা বলছেন কেন? আমি কি খুব বড় কোন অন্যায় করে ফেলেছি?”
“তোমার কথার সুর অন্যরকম শোনাচ্ছে। একজন বিবাহিত ছেলেকে দেখতে এতদূর ছুটে এসেছ। খুব বড় অন্যায় হিসাবে এটাই যথেষ্ট।”
মিলি ভেজা চোখে তাকাল। নরম গলায় বলল, “আপনার জন্য এসেছি এটা আমার অন্যায়? অপরাধ? কেউ কি তার মনের ওপর জোর খাটাতে পারে? পারে না।”
সে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল, “হাবিব ভাই, আমি আপনাকে পছন্দ করি। ভালোবাসি। ভাইয়ার বিয়েতে যেদিন প্রথম দেখেছি সেদিন থেকেই ভালোবাসতে শুরু করেছি। নিজের ওপর আমার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রতিনিয়ত বিরহ যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছি। আমাকে এই কষ্ট থেকে মুক্তি দেন। উদ্ধার করুন।”
হাবিব অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ। মিলি বলল, ‘আপনি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন না?”
“উত্তর দেবার প্রয়োজন মনে করছি না। এমন বিকৃত মানসিকতার কোন উত্তর হয় না।”
“কাউকে ভালোবাসা কি অপরাধ?”
“কখনো কখনো তার শুধু অপরাধ নয়, মারাত্মক রকমের অপরাধ। আমি বিবাহিত, আমার জীবনে নববী আছে। সে-ই আমার সব। তার বাইরে আর কাউকে নিয়ে এ ধরনের কিছু ভাবতে আমার রুচিতে বাঁধে।”
“নববী! সে আপনাকে কতদিন চেনে? কতদিন ভালোবাসে? ওর অনেক আগে থেকে আমি আপনাকে পছন্দ করি। ভালোবাসি।”
“নববী কবে থেকে আমায় ভালোবাসে তাতে কিছুই আসে যায় না। আমি কোন কালেই তোমার সাথে এমন কোন আচরণ করিনি যাতে এ ধরনের কিছু ছিল। আমাদের মাঝে কখনো কিছুই ছিল না। সামান্য বন্ধুত্বও না, আত্মীয়তার সম্পর্কে খুচরো আলাপও না।”
মিলি নিস্তেজ গলায় বলল, “আপনি কি আমাকে ফিরিয়ে দিতে চাইছেন? গ্রহণ করবেন না বলছেন?”
“হ্যাঁ, ঠিক বুঝেছ। আমি কখনও এমন কিছু মেনে নেব না। আশাও রাখবে না।”
“কখনোই মানবেন না?”
“না মানবো না, আমার কাছে নববীই সব। সবকিছু।”
“কি আছে নববীর যা আমার নেই?”
হাবিব হাসল। সরল গলায় বলল, “নববীর কোন কিছুই তোমার মধ্যে নেই। ওর সরলতা নেই, শালীনতা নেই, মুগ্ধতা নেই, নিষ্পাপ হৃদয় নেই। কিছুই না। সব থেকে বড় ব্যাপার হচ্ছে-ওর সাথে আমার বৈধ সম্পর্ক রয়েছে।”
“এটাই কি আপনার শেষ কথা? এ কথার কোন পরিবর্তন হবে না?”
“আমার জীবন দশায় সেই সম্ভাবনা নেই। একটা উপদেশ দিই মিলি- ভালো মানের একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাও। তুমি অসুস্থ মেয়ের মতো কথা বলছ। এসব কোন সুস্থ মেয়ের কথা না। এসব হলো বিকারগস্ত মেয়ের কথা। বিকৃত মানসিকতার পরিচয়।”
মিলি বলল, “আপনি আমায় এভাবে ফিরিয়ে দিয়ে ঠিক করলেন না।”
“তোমার এই কথার সাথে আমি সহমত পোষন করছি। এভাবে ফিরিয়ে দিয়ে ঠিক করলাম না। মুখের ওপর কয়েকটা জুতোর বা’ড়ি মা’র’লে ঠিক করতাম।”
মিলি আর কিছু বলল না। রাগে কাঁপতে কাঁপতে উঠে চলে গেল। তখনও তার চোখের কোণায় পানি লেগে আছে। হাবিব দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। নতুন অশান্তি সহ্য করা যাচ্ছে না। এই মেয়ের ভাবগতিক সুবিধার ঠেকছে না। আর আগেও নববীর ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে। সে ভেবেছিল- বাড়ি ফিরে গিয়ে সোজা মা’ম’লা করে দেবে। নববীর ব্যাপারে কোন ঝুঁকি নেবে না। কিন্তু এখন যা হলো! এরপর মিলি আর কি কি করবে সে কথা সে ভাবতে পারল না।
মিলি বেরিয়ে যাবার পরপরই ওরা দু’জন ঢুকল। সজীব ঠাট্টার সুরে বলল, “কে হয় ভাই? দেখতে মন্দ না।”
হাবিব ভ্রু কুঁচকে ফেলল। কঠিন মুখে বলল, “বিশেষ কেউ নয়।”
তাদের মধ্যে খুব বেশি কথা হলো না। সারাদিন কাজের পর সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। বাদশা এক কোনায় সরে বউয়ের সাথে কথা বলছে আর খাচ্ছে। ভদ্রমহিলা খুব জোরে জোরে হাসছে।
নববী রাতের খাওয়া শেষ করে সবে মাত্র বিছানায় এসেছে। তার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। মাথার মধ্যে সূক্ষ্ণ যন্ত্রণা হচ্ছে। যন্ত্রণা ক্রমশ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। সে একটা নাপা টেবলেট খেলো। মোবাইল হাতে নিয়ে হাবিবকে কল দিয়ে বলল, “তুমি ঠিক আছ? আমার কেমন অদ্ভুত লাগছে। শান্ত থাকতে পারছি না।”
হাবিব বলল, “আমি ঠিক আছি। দুশ্চিন্তা করতে হবে না। একদম সুস্থ আছি।”
“রাতে খেয়েছ? সারাদিন কেমন কাটল?”
“খেয়েছি, তুমি খেয়েছ? বেশ ব্যস্ততার মধ্যে দিন পার করেছি। তবে তোমার কন্ঠ শোনার পর সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। আর একটু শান্তি অনুভব করতাম যদি কাছে পেতাম।”
নববী একটু হাসল। তার হাসিতে লজ্জা মেশানো।
সময় কারোর জন্য অপেক্ষা করে না। কিভাবে যেন ছয়টা দিন পার হয়ে গেল। আজ হাবিব বাড়ি ফিরে আসছে। মিলিও এসেছে রোহানকে ফেরত নিয়ে যেতে। মহিউদ্দিন সাহেব বলেছেন, “তোমাার মত নির্লজ্জ মেয়ে আমার জীবনে দু’টো দেখিনি। এক্ষুনি আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে।”
মিলি সংকোচ ছাড়াই জবাব দিয়েছে। বলেছে- রোহানকে তৈরি করে দিন। ওকে নিয়েই ফিরে যাব। ততক্ষণ না হয় আপনার বাড়ির মাটি অপবিত্র করলাম।”
মহিউদ্দিন সাহেব জবাব দেননি। বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। নববী টেবিলে খাবার সাজিয়ে বসে আছে। ছয়দিনের সফর শেষে হাবিব আজ ঘরে ফিরবে। সে চোখে কাজল পরেছে, ঠোঁটে হালকা রঙের লিপস্টিক। নতুন ভাঁজ ভাঙা একখানা শাড়ি পরেছে। মিলি বেশ তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “এতো সাজগোজের প্রয়োজন কী? নাকি এভাবেই বরকে নিজের জ্বালে ফাঁসিয়ে রেখেছ?”
নববী অল্প হাসল। বলল, “তাতে তোমার কি? আমার বর, তাকে ফাঁসাব নাকি ছেড়ে রাখত সেটাও আমিই বুঝব।”
“মনে নিও না। একটা সত্যি কথা বলি, তোমার চেয়ে তোমার বরকেই বেশি সুন্দর দেখায়। প্রথম দেখায় কেউ বুঝতেই পারবে না তার ঘরে বউ আছে।”
“কি বলতে চাইছ তুমি?”
“এমন বরকে বাইরে ছেড়ে রেখেছ? বন্ধুদের সাথে ট্যুর দিচ্ছে। যদি অন্য মেয়েতে আসক্ত হয়ে যায়।”
নববী বিশ্বাসের সাথে বলল, “সে কখনো এমন করবে না। তার চরিত্রে সমস্যা নেই।”
“মানুষকে এত বিশ্বাস করতে নেই নববী। মানুষ বদলায়।”
“ঠিক বলেছ। হাবিব বদলে যাবে কি-না তা আমার জানা নেই। এমনও হতে পারে আমি নিজেই বদলে গেলাম। তবে দোয়া করি, আমরা যেন কখনও না বদলাই। আমাদের ভালোবাসার বন্ধন অটুট থাকো।”
মিলি ঠোঁট চেপে হাসল। তার চোখের মনি জ্বলজ্বল করছে। ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে তাকে একটা ছবি দেখাল। বলল, “এই রুম, এই হোটেল চিনতে পারছ না? ভিডিও কলে বেশ কয়েকবার দেখেছ নিশ্চয়ই?”
নববী বলল, “তুমি ওখানে কি করছিলে? কেন গিয়েছিলে?”
“বেড়াতে গিয়েছিলাম। তোমার বরের সাথে সময় কাটতে গিয়েছিলাম।”
নববী শব্দ করে হাসল। দৃঢ় গলায় বলল, “হাবিব আমার স্বামী, আমি তাকে বিশ্বাস করি। সে কখনো এমন কিছু করবে না।”
“নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছ না নববী? চোখ মেলে তাকাও- দেখো তোমার বরের সাথে একই টেবিলে বসে আছি। এরপরও তুমি বিশ্বাস করতে চাইছ না?”
“না চাইছি না। এক বিছানায় শুয়ে থাকলেও বিশ্বাস করতাম না। তুমি যাও মিলি। খারাপ কিছু ঘটে যাবার আগে এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও।”
মিলি ঠোঁট চেপে হাসল। ততক্ষণে রোহান চলে এসেছে। শরিফা বেগম নাতির হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি নিচু হয়ে নাতির কপালে চুমু দিলেন। ভেজা গলায় বললেন, “আবার এসো নানা ভাই। গিয়ে তোমাকে নিয়ে আসব।”
রোহান কিছু বলল না। তার মুখ দেখে মনে হলো না সে দুঃখিত হয়েছে। মিলি রোহানের হাত ধরে বেরিয়ে গেল। শরিফা বেগম বললেন, “নববী, কি হয়েছে? তোমার চেহারা এমন দেখাচ্ছে কেন?”
চন্দ্রাস্ত পর্ব ৫
নববী দু’হাতে মুখ চেপে ধরল। মাথা নেড়ে বলল, “কিছু হয়নি মা। কিছু হয়নি। শরীরটা একটু খারাপ লাগছে।”
“শরীর খারাপ লাগলে এখানে বসে থেকো না। ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নাও।”
নববী ঘরে চলে গেল। হাবিব ফিরল রাতে। বাড়ির পরিবেশ ঠিকঠাক। নববীও স্বাভাবিক ব্যবহার করছে। পরের দু’দিন বেশ ভালো কাটল। তৃতীয় দিন মানিক মিয়া কল দিয়ে বললেন, “মিলিকে খু’ন করা হয়েছে। ঘরের মধ্যে তার লা’শ পড়ে আছে।”
