চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৯
ইশরাত জাহান জেরিন
তখন বিকেল। হাসপাতাল থেকে বেরোতে না বেরোতেই আকাশের রঙ ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে। বিকেলের আলো নরম হয়ে এসেছে, দিনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সময়। ফারাজ স্টিয়ারিং ধরে বলল ধীর স্বরে,
“বিবিজান, বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে না। চলো তিনজন মিলে আরো বেশি বেশি একান্ত মুহূর্ত কাটাই।”
“তিনজন?”
ফারাজ চিত্রার পেটের দিকে ইশারা করল, “একটু আশ্রমে যাই? লতা মণি অনেকদিন ধরে অসুস্থ। গতকাল ফোনে শুনলাম খুব দুর্বল হয়ে পড়েছেন।”
চিত্রা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। “চল। উনি তো তোমাকে সবসময় নিজের নাতির মতোই স্নেহ করেন।”
গাড়ি শহরের কোলাহল পেরিয়ে এক শান্ত নির্জন পথে ঢুকে গেল। আশ্রমটি খুব বেশি বড় নয়। চারদিকে শিউলি গাছ, আর বারান্দা জুড়ে বসে থাকা কয়েকজন বৃদ্ধ মানুষ। তারা ঢুকতেই এক বৃদ্ধা বললেন, “আহা, ফারাজ বাবা এসেছে!”
ফারাজ বিনীত হাসি দিয়ে সালাম করল।
“কেমন আছেন সবাই?”
চিত্রাও নরম কণ্ঠে বলল, “আসসালামু আলাইকুম।”
তাদের নিয়ে যাওয়া হলো ভেতরের এক ছোট ঘরে। সেখানে শুয়ে আছেন লতা মণি। শরীর কেমন শুকিয়ে গেছে, কিন্তু চোখের দৃষ্টি এখনও স্নেহে পূর্ণ।
চিত্রা কাছে গিয়ে বসতেই লতা মণি দুর্বল হাত বাড়ালেন। “চিত্রা মা… এসেছো?”
চিত্রা হাত ধরে বলল, “হ্যাঁ। আপনি কেমন আছেন?”
লতা মণি মৃদু হাসলেন। “এই তো… সময়ের উপর ভর করে বেঁচে আছি।”
ফারাজ এগিয়ে এসে তার মাথার পাশে দাঁড়াল।
“ডাক্তার দেখানো হয়েছে?”
“হয়েছে বাবা। তবে বয়স তো… শরীর আর আগের মতো সাড়া দেয় না।”
চিত্রা একটু দ্বিধা করে বলল, “মণি… একটা খবর আছে।”
লতা মণি চোখ মেলে তাকালেন। “কি খবর?”
চিত্রার গালে লাজুক হাসি ফুটে উঠল। “আমি… মা হতে চলেছি।” লতা মণির চোখ ভিজে উঠল। তিনি কাঁপা কণ্ঠে বললেন,
“আল্লাহ্… কত সুখের খবর! আমার জীবনে হয়তো আর কতদিন আছে জানি না, কিন্তু এই খবর শুনে বাচার ইচ্ছা কেমন করে যেন বেড়ে গেল। সুফিয়ে যদি বেঁচে থাকত। কত খুশি হতো আজ। তোমার শাশুড়ী একটা মাটির মানুষ ছিল। আল্লাহ ভালা মানুষরে বেশিদিন রাখেন না।”
তিনি চিত্রার মাথায় হাত রাখলেন। “আল্লাহ্ তোমাদের ঘর ভরে রাখুক সুখে।”
ফারাজ কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বললেন, “দোয়া করবেন আর একটা কথা, আপনি যদি এলাহী বাড়িতে এসে থাকতেন ভালো হতো। আপনার আরো ভালো করে যত্ন নেওয়ার সুযোগ পেতাম।”
লতা ফারাজের গালে হাত বুলিয়ে বলে, “তুমি আমার জন্য যা করতাছো, একটা কাজের বুয়ার জন্য যা করছো তা শোধ করতে পারমু না। আমি এতেই খুশি। আল্লাহ তোমারে খুশি রাখুক সারাজীবন। আমি এখানেই খুশি। জীবনের শেষ নিশ্বাস না এই আশ্রমেই ত্যাগ করতে চাই। সুফিয়ের লগে আমার কবর দিও আর কিছু চাই না মানিক।” ফারাজ লতা মণির চোখ মুছে দিলো। এই মণি তার জন্য সবকিছু। মায়ের কত গল্প সে ফারাজকে শুনিয়েছে। ফারাজ নিজের কষ্ট আড়াল করে লতা মণির কপালে চুমু দিয়ে চিত্রাকে নিয়ে বাইরে খোলা হাওয়ায় এসে দাঁড়াল। চিত্রা তাকে প্রশ্ন করে বিরক্ত করল না। কেবল পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলো।
সন্ধ্যার নেমে এসেছে। আকাশে লালচে রঙের শেষ রেখাগুলো ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। ফারাজ কবরস্থানের দিকে গেল। সে চিত্রার হাত ধরে আছে।
চিত্রা বুঝতে পারল, সে কোথায় যাচ্ছে। দূরে কোথাও মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে।
ফারাজ ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল। চিত্রাও পাশে।
একটি নির্দিষ্ট কবরের সামনে এসে সে থেমে গেল।
এখানেই তার মা শুয়ে আছেন। কবরের কাজ ক’দিন হলো সম্পূর্ণ হয়েছে। নামহীন কবরটা এখন আর নামহীন নেই। তাতে খোদাই করে লেখা, “সাফিয়ে সুলতানা।”
ফারাজ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মায়ের কবরের সামনে। দু’হাত তুলে দোয়া করল কিছুক্ষণ। তারপর কবরের দিকে তাকিয়ে নরম কণ্ঠে বলল,
“দেখো মা আজ তোমার কাছে একটা খবর নিয়ে এসেছি।”
চিত্রা নিঃশব্দে পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
ফারাজ ধীরে ধীরে বলল, “আমার চিত্রা মা হতে চলেছে।”
তার চোখে জল চিকচিক করে উঠল। “তুমি তো দাদু হয়ে গিয়েছো মা।”
ফারাজ কবরের মাটিতে আলতো হাত রাখল। “আমাদের জন্য দোয়া করো। চিত্রার জন্য দোয়া করো… আর আমাদের ছোট্ট শিশুটার জন্যও।”
চিত্রা তখন ধীরে ধীরে ফারাজের কাঁধে হাত রাখল।
“মা নিশ্চয়ই শুনছেন।”
ফারাজ একটু মাথা নিচু করে বলল, “আমি জানি… মা কখনও দূরে যাননি। কিছু মানুষ কেবল দূরে যায় হৃদয়ের আরো কাছে থেকে যাওয়ার জন্যই। মাও তেমন। মা নিশ্চয়ই খুশি হয়েছেন বলো?”
“হ্যাঁ হবেই তো। আপনার মতো একজন ছেলে তিনি রেখে গিয়েছেন। না খুশি হয়ে কোনো উপায় আছেন? আপনার মা একজন সৌভাগ্যবান নারী।”
রাত নামার পরেও চিত্রা আর ফারাজ বাসায় ফিরেনি। মাঝ রাস্তায় হুট করে ঝড় শুরু হলো। চিত্রা গিয়েছিল বাজিতপুর। মার্জিয়ার সাথে দেখা করতে। সেখান থেকে ফিরতি পথে সে কি কালবৈশাখী ঝড়। ভাগ্যিস সামনেই তালুকদার বাড়ি ছিল। মোফাজ্জল হোসেন না থাকলে আজ কী যে হতো।
গাড়ি থেকে নামতেই মুহূর্তের মধ্যে ভিজে গেল দু’জন।
চিত্রার চুল বৃষ্টির জলে লেপ্টে গেছে, শাড়ি শরীরের সঙ্গে আঁটসাঁট হয়ে লেগে আছে। ঠিক তখনই বারান্দা থেকে লণ্ঠনের আলো হাতে একজন বৃদ্ধ এগিয়ে এলেন। “কে বাবা?”
ফারাজ এগিয়ে গিয়ে বলল, “চাচা, আমি ফারাজ।”
বৃদ্ধের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। “আরে! ফারাজ বাবা! এই ঝড়ে?”
চিত্রার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মা তো পুরো ভিজে গেছে!”
ফারাজ একটু অস্বস্তিতে বলল, “বৃষ্টি হঠাৎ নামল চাচা… এখন বাড়ি যেতে পারব না। যদি একটু কিছুক্ষণ থাকতে দিতেন।”
মোফাজ্জল চাচা হাত নেড়ে বললেন, “এই কথা বলো কেন? আসো, আসো। এই বাড়ি তো তোমাদেরই।”
মোফাজ্জলের এই বাড়িতে এর আগেও থেকেছে ফারাজ আর চিত্রা। ঝড়ের দিনে এখানে বিদ্যুৎ থাকে না। আজকেও বিদ্যুৎ নেই। চারপাশে কেবল হারিকেনের মৃদু হলুদ আলো। মাটির দেয়াল, বাঁশের সিলিং, পুরোনো কাঠের জানালা। পুরোই নস্টালজিক পরিবেশ। মোফাজ্জলের স্ত্রী ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি চিত্রার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আহা মা! একেবারে ভিইজা গেছো!”
চিত্রা একটু লজ্জা পেল। “হ্যাঁ… বৃষ্টি খুব জোরে পড়ছিল।”
তিনি বললেন, “এইভাবে থাকলে ঠান্ডা লাইগা যাবে। এসো, আমি একটা শুকনো শাড়ি দিই।”
তিনি ভেতর ঘর থেকে একটি ধবধবে সাদা শাড়ি এনে দিলেন। “এটা পরে নাও মা।”
ফারাজের দিকে তাকিয়ে মোফাজ্জল চাচা হাসলেন।
“আর তোমার জন্য একটা লুঙ্গি আছে বাবা।”
ফারাজ একটু বিব্রত হয়ে বলল, “না চাচা… আমি ঠিক আছি।”
“এই ভেজা কাপড়ে থাকবা?”
ফারাজ কুণ্ঠিত কণ্ঠে বলল,
“আসলে… আমি লুঙ্গি পরতে খুব অভ্যস্ত না।”
মোফাজ্জল চাচা হেসে উঠলেন। “শহুরে ছেলে! তাও রাখো… দরকার হলে পইরা নিও। লুঙ্গিতেই তো মজা। সব কাজ সহজে হয়।”
ফারাজ মোফাজ্জলের দিকে তাকাতেই সে গলা ঝেড়ে বললেন, “তোমাগো প্যান্টেনের চেইন খোলার মতো ঝামেলা হয়না। বাথরুমে বসতেও আরাম।”
ফারাজ আর কিছু বলল না। চিত্রাকে পাশের ঘরে নিয়ে গেলেন মোফাজ্জলের বউ।
এই ঘরটাও খুব সাদামাটা।
চাচি বললেন, “আমরা গ্রাম্য মানুষ মা… ব্লাউজ পরি না। শাড়িটা এমন কইরাই পড়ি।”
চিত্রা একটু লজ্জা পেল, কিন্তু পরিস্থিতি তো এমনই।
খালা যত্ন করে তাকে শাড়ি পরিয়ে দিলেন।
ভেজা চুল মুছে দিলেন। “এই তো… এখন ঠিক লাগতাছে।”
চিত্রা মৃদু হেসে বলল, “ধন্যবাদ ।”
খালা চলে গেলে কিছুক্ষণ পর দরজায় কড়া নাড়ল ফারাজ। “আমি ঢুকতে পারি?”
“হ্যাঁ…”
ফারাজ ভেতরে ঢুকেই থমকে গেল। হারিকেনের আলোয় দাঁড়িয়ে আছে চিত্রা। সাদা শাড়িতে, ভেজা চুল কাঁধে ছড়িয়ে। ফারাজ ধীরে বলল,
“…চিত্রা?”
চিত্রা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
“কি হলো?”
ফারাজ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“তোমাকে… খুব অন্যরকম লাগছে।”
চিত্রা হাসল। “গ্রাম্য লাগছে, তাই না?”
“না… খুব সুন্দর লাগছে।”
বাইরে তখনো ঝড় চলছে। আকাশে মেঘের গর্জন, আর তার ফাঁকে ফাঁকে বিদ্যুতের ঝলকানি। টিনের চালায় বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ যেন একটানা সুরের মতো বাজছে। সেই শব্দের মাঝেই উঠোনের একপাশে কাঁচা চুলার আগুন জ্বলছে। আগুনের হলুদ আলো বৃষ্টিভেজা বাতাসে দুলে দুলে উঠছে।
মোফাজ্জলের স্ত্রী আছিয়া বেগম ভিজে কাপড়েই চুলার সামনে বসে হাঁড়িতে কিছু নেড়ে যাচ্ছেন।
চিত্রা বারান্দা থেকে এগিয়ে এসে বৃষ্টির ফোঁটা এড়িয়ে চুলার কাছে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থেকে নরম গলায় বলল, “চাচি, এত কষ্ট করছেন কেন?”
আছিয়া বেগম মাথা তুলে তাকালেন। আগুনের আলোয় তার মুখটা আরও কোমল লাগছে।
তিনি হালকা হেসে বললেন, “অতিথি আইসা বুঝি খালি পেটে থাকব? ফারাজ কইল তুমি নাকি মা হইবা? তোমার জন্য কবুতরের ঝোল করতাছি। কবুতরের বাচ্চা এইসময় খাইলে শরীরে বল হইব। আর বেশি বেশি খাইবা, সব পুষ্টিকর খাওন খাইবা।”
কথা বলতে বলতে হঠাৎ তার গলা ভারী হয়ে গেল।
“আল্লাহ তো আমারে মা হওয়ার তৌফিক দিলো না…” চোখের কোণ বেয়ে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। বৃষ্টির শব্দের মাঝেও সেই নিঃশব্দ কষ্টটা যেন স্পষ্ট শোনা গেল। চিত্রা একটু এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখল। “চাচি, এমন করে বলবেন না। আমরা বুঝি কেউ না? আমাদের বুঝি আপন মনে হয় না?”
আছিয়া চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
চিত্রা আবার বলল,
“আপনার যা লাগবে আমাকে বলবেন। আমাকে না বলতে পারলে বজ্রকে পাঠাইয়া বলবেন। আর ফারাজ তো আছেই।”
আছিয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “তোমরা আসছো এইডাই আমারে অনেক খুশি করছে মা।”
কিছুক্ষণ নীরবতা রইল। শুধু বৃষ্টির শব্দ আর হাঁড়ির ফুটফুট শব্দ। হঠাৎ চিত্রা একটু ইতস্তত করে বলল,
“চাচি… একটা কথা বলি?”
“কও মা।”
“ফারাজের ঠান্ডায় সমস্যা। যদি একটু গরম দুধ…?”
আছিয়া বেগম যেন অপেক্ষাই করছিলেন। আচ্ছা মা, এখনই দিচ্ছি।” তিনি উঠে আরেকটা ছোট হাঁড়ি নামাতে লাগলেন। কাজ করতে করতেই হেসে বললেন, “ফারাজ কিন্তু খুব ভালো ছেলে। যেই যত্ন নেয় তোমার! আমারে কয়বার আইসা বইলা গেল
‘চাচি, খাবারে বেশি ঝাল দিয়েন না। চিত্রার আবার সমস্যা হবে না তো?’ ”
চিত্রা একটু লজ্জা পেল। আছিয়া আবার বললেন,
“এমন স্বামী কইজন পায় মা? স্বামীরে চোট দিও না কইলাম।”
চিত্রা মৃদু হেসে বলল, “চাচি, আমি আবার কবে চোট দিলাম?”
আছিয়া মাটির খুন্তি দিয়ে হাঁড়ি নেড়ে বললেন,
“পুরুষ মানুষ তো বুঝলা। বাইরে শক্ত, ভেতরে নরম। স্বামী কিছু চাইলে না কইরো না কোনোদিন। ঝগড়া-নড়াই তো সব সংসারেই হয়। তোমার চাচা আর আমি… কত ঝগড়া করছি। কিন্তু রাতে আবার এক বালিশেই ঘুমাইতাম।”
তিনি হেসে উঠলেন। “মুরব্বিরা কয়— এক বালিশে ঘুমাইলে নাকি মোহাব্বত বাড়ে।”
চিত্রা মাটির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
আছিয়া আবার একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, “আরেকটা কথা কই… শরীর যত খারাপ থাক না কেন, স্বামীর হক আদায় করবা। স্বামী মানুষ রাগ করলে খোদায়ও নারাজ হয়।”
বৃষ্টির শব্দ তখন আরও জোরে নামছে।
চিত্রা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “আপনি খুব সুন্দর কথা বলেন চাচি।”
আছিয়া মৃদু হেসে বললেন, “সুন্দর না মা… এইডা সংসার করার বিদ্যা।”
চুলার আগুন তখন টুকটুক করে জ্বলছে। হঠাৎ পেছন থেকে গলা খাঁকারি দেওয়ার শব্দ শুনতেই চিত্রা পেছন ফিরে চাইল। ফারাজ এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি তারই দিকে নিবদ্ধ। হঠাৎ আছিয়া বলল, “যাও বাজানের মনে হয় কিছু লাগব।”
চিত্রা ফারাজের দিকে তাকাতেই ফারাজ একটা চোখ মারল তাকে। তা দেখে চিত্রা মুহূর্তেই উনুনের দিকে তাকিয়ে বলল, “রুমে যান। পরে আসছি।”
হঠাৎ ফারাজ ঢং করে বলল, “এইযে মুরব্বি মানুষ এত বিদ্যা দিলো কিছু তো মানো, নইলে ফজিলত কেমন করে হবে? উফ আজ-কাল বউগুলোও না! স্বামীর হক পালন তো দূরে থাক স্বামীকে খালি চোখ রাঙিয়ে তাড়িয়ে দেয়। এদের নিয়ে আর পারি না।”
আছিয়া চিত্রার দিকে তাকিয়ে বলল, “যাও না। পোলায় ডাকে কেন শুইনা আসো। সে ফারাজের দিকে তাকিয়ে বলল, “কি লাগব বাজান?”
“আপাতত আমার হক লাগবে। ভালোয় ভালোয় আমার বউটাকে বলুন রুমে আসতে। নইলে কোলে তুলে রুমে যদি নেওয়া লাগে, কালবৈশাখী ঝড় কিন্তু আরেকটা বয়ে যাবে।”
চিত্রা নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, “আস্তাগফিরুল্লাহ। এই লোকের মুখ আর সুধরাবে না।”
হঠাৎ আছিয়া বলল, “আয়হায় পোলায় রাগ করছে। যাও যাও রুমে যাও। কইল কালবৈশাখী ঝড় নাকি বইব, শুনো রাগের বশে দুই-চারটা কথা শুনাইলে জবাব দিও না। চুপ থাকলে ঝামেলা মিটমাট হইব।”
চিত্রা না পারতে উঠে গেল। ফারাজের দিকে একবার তাকিয়ে বলল, “এই লোক যে কোন কালবৈশাখী ঝড়ের কথা বলছে যা যদি মুখ ফুটে বলতে পারতাম! ভাগ্যিস কেউ বুঝেনি। ঠোঁটকাটা একটা!”
রাত গভীর হয়েছে। হারিকেনের আলোয় ঘরটা হলুদ হয়ে আছে। চিত্রা হাতে এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে ফারাজের কাছে এলো। “এই নিন।”
ফারাজ অবাক হয়ে বলল, “এটা কি?”
“গরম দুধ। চাচি বানিয়ে দিয়েছেন।”
ফারাজ একটু হেসে বলল, “তুমি বলেছো নিশ্চয়ই।”
চিত্রা চুপ করে রইল। ফারাজ দুধটা ধীরে ধীরে খেল।
তারপর জানালার পাশে গিয়ে বসল। বাইরে অন্ধকার রাত। বৃষ্টি পড়ছে টুপটাপ। চিত্রা এসে তার পাশে বসল। দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে বৃষ্টি দেখল। তারপর ফারাজ বলল, “ পুরোনো দিনের প্রেম সত্যি কত চমৎকার তাই না বলো? আগে বিষয়টা ভালো না লাগলে ইদানীং বড্ড ভালো লাগে।
চিত্রা মৃদু হাসল। “আপনি যদি ৯০ দশকের প্রেমিক হয়ে জন্মাতেন?”
ফারাজ তাকাল তার দিকে। “তাহলে তোমাকে চিঠি লিখতাম।”
“কি লিখতেন?”
ফারাজ ধীরে বলল, “লিখতাম
‘চিত্রা, তুমি বৃষ্টির মতো।
তোমাকে ছুঁলেই আমার অভিমানের পৃথিবী ভিজে যায়।’
চিত্রা হেসে মাথা নিচু করল। “খুব কবি হয়ে গেছেন।”
ফারাজ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “না… শুধু প্রেমে পড়েছি।”
“প্রেমে পড়েছেন?” চিত্রা মৃদু স্বরে বলল।
ফারাজ ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ… এমন এক মানুষের প্রেমে, যে নিজেই বুঝতে চায় না তাকে কতটা ভালোবাসা যায়।” চিত্রা জানালার বাইরে তাকাল।
“আপনি কথাগুলো খুব সুন্দর বলেন।”
“কথা সুন্দর না… বরং তুমি সুন্দর বলেই আমার কথা গুলো তোমার এত সুন্দর লাগছে।
চিত্রা চুপ করে রইল।কিছুক্ষণ পরে সে বলল,
“আপনি যদি সত্যিই ৯০ দশকের প্রেমিক হতেন… শুধু চিঠি লিখতেন?”
ফারাজ একটু ভাবার ভান করে বলল, “না… মাঝে মাঝে নদীর ঘাটে অপেক্ষা করতাম।”
“কার জন্য?”
“একটা নীল শাড়ি পরা মেয়ের জন্য। যে লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে হাঁটবে… কিন্তু যাওয়ার সময় একবার ঘুরে তাকাবে।”
চিত্রা মৃদু হেসে বলল, “আপনি নিশ্চিত, সে তাকাত?”
ফারাজ এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।
“তাকাত। কারণ… সে জানত কেউ একজন তার জন্য খুব মন দিয়ে অপেক্ষা করছে।”
বাইরে বৃষ্টি তখন আরও ঘন হয়ে এসেছে। চিত্রা ধীরে বলল, “আপনি সবসময় এত গভীর কথা বলেন?”
ফারাজ মাথা নেড়ে বলল, “না। শুধু তখনই… যখন সামনে বসে থাকে আমার পৃথিবীর রাঙিয়ে দেওয়া সুন্দরতম নারীটা।”
চিত্রার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।
সে কথাটা ঘোরাতে বলল, “আপনি কি কখনো প্রেমপত্র লিখেছেন?”
ফারাজ হেসে বলল,
“না। কিন্তু আজ লিখতে ইচ্ছে করছে।”
“এখন?”
“হ্যাঁ।”
“কাকে?”
ফারাজ জানালার বাইরে তাকিয়ে ধীরে বলল—
“যে মেয়েটা এখন আমার পাশে বসে বৃষ্টি দেখছে… তাকে।”
চিত্রা একটু অবাক হয়ে বলল,
“তাহলে লিখুন।”
“আমার এক জীবন ফুরিয়ে যাবে আগুন সুন্দরীকে নিয়ে লিখলে। তবুও লেখা ফুরাবে না।”
চিত্রা কিছুক্ষণ চুপ করে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ বলল, “আপনি কি কবিতা পড়েন?”
ফারাজ একটু হেসে বলল,
“আগে তেমন পড়তাম না… কিন্তু কিছুদিন ধরে পড়ছি।”
“কার কবিতা?”
ফারাজ জানালার বাইরে তাকিয়ে ধীরে বলল,
“জীবনানন্দ দাশ।”
চিত্রার চোখ একটু বড় হয়ে গেল।
“সত্যি?”
ফারাজ মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ। তার কবিতাগুলো অদ্ভুত… খুব শান্ত, আবার খুব গভীর।”
চিত্রা মৃদু স্বরে বলল,
“আমি তার একটা লাইন খুব পছন্দ করি।”
ফারাজ আগ্রহ নিয়ে তাকাল।
“কোনটা?”
চিত্রা ধীরে ধীরে বলল,
‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে—
এই বাংলায়…’
“তার কবিতায় আবার অদ্ভুত সুন্দর প্রেমও আছে।”
ফারাজ পুনরায় বলল, “তুমি কি বনলতা সেন পড়েছ?”
চিত্রা হেসে বলল,
“কে না পড়েছে! আচ্ছা আপনার জীবনে যদি কেউ বনলতা সেন হয়ে আসে? অনেক পথ হাঁটার পরে
যদি কোনো এক সন্ধ্যায়
কেউ এসে বলে,
‘এখানে একটু বসো।’
“আমার জীবনের বনলতা হয়ে তুমি তো সেই কবেই এসেছো। সন্ধ্যার অপেক্ষা তাই এখন আমি করি না। অপেক্ষা করছি জীবনের অন্তিম সময়ের। শেষটা শুরুর মতোই শেষ হোক তাই চাই।”
চিত্রা এখনো মাথা নিচু করে বসে আছে।
ফারাজ আস্তে বলল,
“চিত্রা…”
চিত্রা তাকাল না।
“হুম?”
“তুমি কি আমার কথায় অস্বস্তি পেয়েছ?”
চিত্রা ধীরে মাথা নাড়ল।
“না… অস্বস্তি না।”
“তাহলে?”
চিত্রা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
“এত সুন্দর কথা কেউ কোনোদিন বলেনি।”
ফারাজ কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব নরম স্বরে বলল,
“সুন্দর মানুষকে সুন্দর কথাই বলতে হয়।”
চিত্রার হাতটা জানালার পাশে রাখা ছিল। ফারাজ ধীরে তার হাতের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত খুব আস্তে তার হাতটা ধরল।
চিত্রা চমকে তাকাল, কিন্তু হাত সরিয়ে নিল না।
তার কণ্ঠ কাঁপল একটু,
“ফারাজ…”
ফারাজ ধীরে বলল,
“ভয় পেয়ো না।”
চিত্রা ফিসফিস করে বলল,
“আমি ভয় পাইনি।”
ফারাজের আঙুলগুলো খুব নরমভাবে তার হাতটা ধরে আছে। বাইরে দূরে কোথাও ব্যাঙ ডাকার শব্দ।
ফারাজ ধীরে বলল,
“জানো চিত্রা… মানুষ মাঝে মাঝে এমন একটা মুহূর্তে এসে দাঁড়ায়, যখন কিছু বলার দরকার হয় না।”
চিত্রা তার দিকে তাকাল। “শুধু মনে হয় এই মানুষটার পাশে থাকাটাই যথেষ্ট।”
ফারাজ একটু এগিয়ে এলো। তাদের মাঝের দূরত্বটা খুব ছোট হয়ে গেল। সে নরম স্বরে বলল,
“চিত্রা… আমি কি একটা কথা বলতে পারি?”
চিত্রা ধীরে মাথা নাড়ল।
ফারাজ বলল,
“আজকে যদি সময়টা এখানেই থেমে যেত… আমি খুব খুশি হতাম।”
চিত্রা হালকা হেসে বলল,
“সময় কি কখনো থামে?”
ফারাজ বলল,
“থামে না… কিন্তু কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো মানুষ সারাজীবন মনে রাখে।”
চিত্রা এবার ধীরে বলল,
“এই মুহূর্তটার মতো?”
ফারাজ উত্তর দিল না। শুধু খুব আস্তে তার হাতটা একটু কাছে টেনে নিল। চিত্রা এখন একেবারে তার পাশে। দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দও যেন শোনা যাচ্ছে।
ফারাজ খুব আস্তে বলল,
“চিত্রা… আমি কি”
কথাটা শেষ করল না। চিত্রা ধীরে তাকাল তার চোখে।
তারপর খুব নরম স্বরে বলল,
“সব কথা বলতেই হবে?” ফারাজের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল। সে হারিকেনের আবছা আলোয় চিত্রার উজ্জ্বল মুখখানি আরো একবার দেখল। চিত্রাকে মাথা রেখে শুতে বলল তার উরুর ওপর। চিত্রা শুতেই সে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “আজ তুমি অনেক প্রশ্ন করলে, এবার আমি একটা করি?”
“করুন।”
“তোমার কাছে আমাকে হারিয়ে ফেলা মানে কী?”
চিত্রা এবার ফারাজের চোখে চোখ রাখল। হাত এগিয়ে নিয়ে তাতে চুমু খেয়ে বলল,
চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৮
❝আপনাকে হারিয়ে ফেলা মানে
এই হৃদয়ে যুদ্ধের ঘোষণা,
মৃত্যু ছাড়া
এই যুদ্ধের আর কোনো সমঝোতা নেই।❞
