Home চোখের আড়ালে ভালোবাসি চোখের আড়ালে ভালোবাসি গল্পের লিংক || আয়াত বিনতে নূর

চোখের আড়ালে ভালোবাসি গল্পের লিংক || আয়াত বিনতে নূর

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ১+২
আয়াত বিনতে নূর

“ভ… ভালোবাসি”—
শব্দগুলো ঠোঁট থেকে বেরোতেই চপাৎ!
নিশিতার গাল ঝলসে ওঠে। মুহূর্তেই চোখে পানি চলে আসে।
একটা থাপ্পড়…
দুইটা…
তিনটা…
গুনে গুনে পনেরোটা।
শেষটা এত জোরে যে সে নিজের ভার সামলাতে না পেরে সরাসরি মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে।
মেঝেতে বসে দুলতে দুলতে, থরথর কাঁপতে থাকা চোখে সে তাকিয়ে থাকে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা
মানুষটার দিকে—

ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী।
তার কণ্ঠ রুদ্ধ, মনে হয় যেন প্রতিটা শব্দই রক্ত দিয়ে বের হচ্ছে—
“ভালোবাসি… অনেক ভালোবাসি আপনাকে, ফারিস ভাই…”
ফারিস দাঁত চেপে রাগে চোখ লাল করে বলে—
“নিশি, আমি তোকে ভালোবাসি না।
আরেকবার ‘ভালোবাসি’ শব্দটা বললে—
শপথ করে বলছি, খারাপ হবে কিন্তু।”
নিশিতা মাথা তুলে ফারিসের দিকে তাকায়—
চোখে কেবল প্রশ্ন।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“আমি কি এতটাই খারাপ, ফারিস ভাই…? আমাকে কি সত্যিই ভালোবাসা যায় না?”
ফারিস মুচকি হাসে, সেই হাসিতে ব্যঙ্গ।
“তোকে ভালোবাসবো?এই ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী তোর মতো মেয়েকে জীবনেও ভালোবাসবে না।
নিজেকে এত গুরুত্বপূর্ণ ভাবিস না।”
নিশিতা যেন ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে।
তবু সে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, কথা বলতে চায়—
কিন্তু ফারিস তার কথা শেষ হওয়ার আগেই গর্জে ওঠে—

“বের হ! এখনই বের হ আমার রুম থেকে!”
“কিন্তু—”
“চলে যা!
একা থাকতে দে আমাকে!”
রাগের মাথায় সে পাশের কাঁচের ফুলদানিটাকে এক লাথি মারে।
ফুলদানিটা চূরচূর শব্দে ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে।
শব্দটা নিশিতার বুকের ভেতরেই যেন ভেঙে বাজে।
ভয়ে নিশি কানে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে পড়ে।
রুমের দরজা ঝাঁপটে ফারিস বের হয়ে গেলে তবেই সে আস্তে আস্তে চোখ খোলে।
চারদিকে নীরবতা।

ফারিস নেই।
ধীরে ধীরে নিশিতা উঠে দাঁড়ায়।
চোখের জল মোছে।
ঠোঁট কামড়ে, কষ্টে, অভিমান আর অপমানের সে ফিসফিস করে বলে—
“ঠিক আছে…
আজকে আপনি আমাকে অপমান করলে…
কিন্তু একদিন তুমি আমাকে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারবে না।
সেদিন আপনি নিজেই পাগলের মতো আমাকে ভালোবেসে ফেলবে, ফারিস ভাই।”
কথাগুলো বলে সে নিজের রুমে চলে যায়।

চরিত্র পরিচয়
ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী
বয়স—২৮।
বিদেশফেরত, স্মার্ট, ঠান্ডা স্বভাবের,গুরুগম্ভীর, রাগি-বদমেজাজি, একদম বিদেশি দের মতো ফর্সা গায়ের রং, বাদামি রঙের চোখের মনি,জিম করা বডি। চৌধুরী পরিবারের বড় ছেলে।নিজ পারিবারিক ব্যবসা “চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রি”তে যোগ দিয়েছে। নিজেরও আলাদা ব্যাবসা আছে। ফারিসের বাবা: আরাফাত চৌধুরী ও তার মা: আফিয়া চৌধুরী
(ফারিসের ছোট ভাই) রাজিব হাসান চৌধুরি বয়স ২৬ রাজিব সে ও তাদের পারিবারিক ব্যাবসা সামলাতে চায়। আর ছোট বোন (রিয়া চৌধুরি)। রিয়া নিশিতার বয়সি,
রিয়ার বয়স ১৭ বছর। সে ইন্টার প্রথম বর্ষের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। রিয়া আর নিশিতা একই কলেজে পরে আবার সমবয়সীও বলা চলে।
আরাফাত চৌধুরিরা দুই ভাই।
ছোটভাই আলতাফ চৌধুরী, ও তার স্ত্রী আমেনা চৌধুরী। আলতাফ চৌধুরির ২মেয়ে
বড় মেয়ে: তনয়া চৌধুরী — বয়স ২০ অনার্স ২ম বর্ষের ছাত্রী। দেখতে ও সুন্দর।
ছোট মেয়ে: আমাদের গল্পের নায়কা নিশিতা চৌধুরি বয়স ১৭ বছর। ইন্টার প্রথম বর্ষের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী।
দেখতে শুধু সুন্দরী না আগুন সুন্দরী বলা চলে , মেধাবী একজন ছাত্রী। রুপে গুণে সবদিক থেকে পারফেক্ট।

এইদিকে—
রুমে ঢুকেই সে ধপ করে বিছানায় বসে পড়ে।
হাঁটুর ওপর মুখ গুজে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে।
“কেনো, ফারিস ভাই…
আমি কি এতটাই খারাপ…?
আমাকে কি সত্যিই ভালোবাসা যায় না…?”
হঠাৎ থেমে যায়।
মনে সন্দেহ জাগে—

“আপনি কি তবে কাউকে ভালোবাসেন…?
আপনার মনে অন্য কেউ আছে…?”
অশ্রু মুছে গভীর শ্বাস নেয়—
“আমি জানতেই হবে… সব জানতেই হবে…”
নির্মম দিন শেষে, ক্লান্ত শরীর আর ভাঙা মনটাকে নিয়ে সে চোখ বন্ধ করে।
কান্না করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে—
সে নিজেও বুঝতে পারে না—

সকাল ৮:০০ টা।পর্দার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো ঘরে ঢুকতেই নিস্পৃহ চোখে ধীরে ধীরে জেগে উঠলো নিশিতা চৌধুরী।
ঘুমের ঠিক মাঝেই টের পেয়েছিল কেউ তাকে ডাকছে।
দরজার ওপার থেকে তার মা আমেনা চৌধুরীর কণ্ঠ—

— “নিশি! ওঠ মা, দেরি হয়ে যাবে।”তাড়াতাড়ি ফ্রেস হয়ে খাবার নাস্তা করতে আয় মা।
চোখ মেলে দেয়ালে থাকা ঘড়ির দিকে তাকাতেই ধাক্কা খেলো নিশি।সকাল ৮টা বাজে।
কাল রাতে কান্নায় ভিজে ভিজে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল—সে নিজেই জানে না।
ফজরের নামাজও পড়ে উঠতে পারেনি—যা সে কখনও মিস করে না।
দ্বিতীয়বার ডাকা মাত্র নিশি তাড়াহুড়া করে বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে দেয়।
দরজা খুলতেই আমেনা চৌধুরীর চোখে ধরা পড়ে তার মেয়ের লালচে চোখ আর ফোলা মুখ।

— “কি হয়েছে তোর মা? তুই কি কান্না করছিলি?”
নিশি হালকা বিব্রত হেসে মাথা নিচু করে, শান্ত স্বরে বলে—
— “না আম্মু! রাত জেগে পড়তে বসেছিলাম, তাই চোখ লাল হয়েছে। চিন্তা করো না।”
মেয়ে যা বললো, সেটাই বিশ্বাস করে আমেনা চৌধুরী তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন—

— “ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাস্তা খেয়ে নে।”
এ কথা বলে তিনি নিচে চলে যান।
নিশি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে।
নিজের চোখ দুটো দেখেই বুকটা আবার কেঁপে ওঠে—
কালকের কান্নায় চোখ দুটো স্বাভাবিকের থেকেও লালচে।
আয়নার দিকে তাকিয়ে সে ধীরে বলে—
— “আপনি কি সত্যিই অন্য কাউকে ভালোবাসেন, ফারিস ভাই?… ”
আবার নিজেই নিজেকে থামিয়ে দেয়।
আজ কলেজের প্রথম দিন, দেরি করা যাবে না।
নিজেকে সামলে গোসল করতে চলে যায়।

অন্যদিকে নিচতলায় টেবিল ভর্তি গরম গরম নাস্তা সাজানো হচ্ছে।
বাড়ির কাজের লোকেরা ব্যস্ত।
ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী—সকালে উঠেই জিম করেছে,জিম থেকে ফিরে লম্বা শাওয়ার নিয়ে,
এখন ফরমাল শার্ট পরে একেবারে রেডি হয়ে।এখন টেবিলে বসে ব্ল্যাক কফি হাতে মোবাইলে স্ক্রল করছে। তার মুখে সেই স্বাভাবিক গম্ভীর ভাব—যা কেউই ঠিক বুঝতে পারে না।
একদম নিঃশব্দ, শুধু কফি কাপের ঠকঠক শব্দ।
সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে রিয়া।টেবিলে বসতেই আমেনা চৌধুরী জিজ্ঞেস করেন—

— “নিশি কোথায়?”তখন গেলাম বলল চলে আসবে এখনো আসে নাই?
রিয়া নাস্তা নিতে নিতে বলে—
— “রেডি হচ্ছে, আসবে এখন” ছোট মা।
ঠিক তখনই নিশি সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে।
তার পা থমকে যায় কিছুক্ষণের জন্য—
ফারিস তার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে।
নিশির চোখ ওঠা মাত্রই ফারিস চোখ ফিরিয়ে মোবাইলে ডুবে যায়।
নিশিও কোনরকমে রিয়ার পাশে গিয়ে বসে।
আজ তার চোখে অপমানের কষ্ট, সত্যিকারের দুঃখ আর ক্ষীণ রাগ—সবই মিশে আছে।
হঠাৎ আমেনা চৌধুরী বলে ওঠেন—

— “কোথায় ছিলি তোকে এতোবার ডাকলাম?”
নিশি শান্ত সুরে বলে—
— “সাওয়ার নিতে গিয়ে দেরি হয়ে গেছে আম্মু।”
তারপর আর কেউ কিছু বলে না।
সবাই নাস্তার দিকে মন দেয়।
এর মাঝে, চৌধুরী পরিবারের কর্তা আরাফাত চৌধুরী ফারিসের দিকে তাকিয়ে বলেন—
— “আজ রিয়া আর নিশিকে কলেজে ড্রপ করে দিস।” ওদের কলেজের প্রথমদিন।

ফারিস মাথা না তুলে শান্ত কঠিন স্বরে বলে—
— “আজ আমার জরুরি মিটিং আছে বাবা। ড্রাইভার নিয়ে যাবে। বাড়িতে গাড়ির অভাব নেই।”
বাবার চোখে হতাশা ফুটলেও তিনি কিছু বলেন না।
তিনি জানেন—ছেলেকে জোর করে কিছু বলা যায় না।
খাওয়া শেষ করে সবাই যার যার কাজে বেরিয়ে পড়ে—
আরাফাত চৌধুরি, আলতাফ চৌধুরি, ফারিস ও রাজিব অফিসে।
তনয়া তার ভার্সিটিতে ;
রিয়া আর নিশিতা গেয়েছে কলেজে।

কলেজে পৌঁছেও নিশির মন ভাঙা।
ক্লাস শুরু হওয়ার আগে চুপচাপ বেঞ্চে বসে থাকে।
রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কল আসায় সে চলে যায়।
ঠিক তখনই পাশেই এসে বসে অহনা—তাদের ছোটবেলার বন্ধু।
হঠাৎ তার কণ্ঠ—

— “কেয়া হুয়া, মেরি জান?”
নিশি চমকে তাকায়, অহনা হেসে ফেলে।
অহনা আবার জিজ্ঞেস করে—
— “কি হয়েছে তোর নিশি? বল না।”
নিশি এবারও নীরব।
অহনা তাকিয়েই বুঝে যায়—
আজও নিশ্চয় ফারিস কিছু করেছে।
কারণ, অহনা খুব ভালো করেই জানে—
নিশি ফারিসকে কতটা ভালোবাসে।
আর সেই ভালোবাসা আজ আবারও আঘাত পেয়েছে…

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩+৪

1 COMMENT

Comments are closed.