তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩১
নওরিন মুনতাহা হিয়া
সৃষ্টির মুখে মেঘ তার বউ কথাটা শুনে আদ্রিয়ান খুশিতে আত্মাহারা হয়ে যায়। অবশেষে তার সন্দেহ সত্যি হয়েছে মেঘের আসল পরিচয় মালিহা যার সাথে তার নয় বছর আগে বিয়ে হয়েছে। আদ্রিয়ানের মুখে এক শান্তি আর প্রাপ্তির হাসি ফুটে উঠে তার এখন মনে হচ্ছে সে পৃথিবীর সেরা সুখী ব্যক্তি। আদ্রিয়ানাকে চুপচাপ বসে থাকতে আর মিটিমিটি হাসতে দেখে সৃষ্টি অবাক হয়ে বলে
“আদ্রিয়ান ভাইয়া তুমি হাসছ কেন? আমেরিকায় গিয়ে কি সত্যি তোমার আর মেঘের দেখা হয়েছিল? তুমি আর মেঘ কি একে অপরকে ভালোবাস? তোমরা কি একসাথে সংসার করছ আমেরিকায়?“
সৃষ্টির অনবরত করা প্রশ্ন শুনে আদ্রিয়ানের ঘোর কাটে সে আবার স্বাভাবিক হয়ে বলে
“হুম ‚আমেরিকায় মেঘ আর আমি একসাথে সংসার করছি। আমি মেঘকে অনেক ভালোবাসি! বউ হিসাবে ও কে স্বীকার করে নিয়েছি। কিন্তু মেঘ আমাকে ভালোবাসে কি না তা বুঝতে পারছি না?“
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
আদ্রিয়ানের কথা শুনে সৃষ্টি অবাক হয় কারণ মেঘ অনেক আগে থেকেই আদ্রিয়ানকে ভালোবাসে। প্রায় নয় বছর ধরে মেঘ আদ্রিয়ানের জন্য অপেক্ষা করেছে! প্রতিদিন দেয়ালে থাকা ঝুলন্ত ছবির দিকে তাকিয়ে একা একা কথা বলেছে। বাংলাদেশে থাকতে সৃষ্টিকে মেঘ শতবার বলেছে যে সে ‚আদ্রিয়ানকে ভীষণ ভালোবাসে। কিন্তু এখন যখন আমেরিকায় গিয়ে আদ্রিয়ানের সাথে মেঘের দেখা বা পরিচয় হয়েছে, তখন কেন তার মনের অনুভূতি লুকিয়ে রেখেছে সে! হয়ত আদ্রিয়ানের উপর মেঘ অভিমান বা রাগ করেছে‚সৃষ্টি বলে
“ভাইয়া ‚ মেঘ তোমাকে অনেক ভালোবাসে! গত নয় বছর ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করেছে মেঘ। তোমাকে চোখে না দেখে শুধু এক ছবি দেখে ও তোমার প্রেমে পড়েছে। আম্মু সহ পাড়া প্রতিবেশি মহিলা সকলে মেঘকে আশ্রিতা‚ বেহায়া ‚‚অপয়া বলে গালি দিত তবুও মেঘ এই বাড়ি ছেড়ে যায়নি শুধুমাএ তোমার জন্য। মেঘ বিশ্বাস করত তুমি একদিন বাড়ি ফিরে আসবে এরপর মেঘকে বউয়ের মর্যাদা দিবে ওর প্রাপ্য সম্মান বা ভালোবাসা দিয়ে ওর সাথে সংসার করবে। স্কুল‚কলেজে অনেক ছেলে মেঘকে প্রপোজ করেছিল কিন্তু মেঘ সবার প্রস্তাব রিজেক্ট করে দিয়েছে শুধু তোমায় ভালোবাসে বলে। শুরু থেকে শেষ অবধি মেঘ তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসে আদ্রিয়ান ভাইয়া।“
“মেঘের ভালোবাসার কথা“শুনে আদ্রিয়ান যেমন খুশি হয় তেমন তার কষ্ট আর তীব্র অনুশোচনা হয়। তার ভুল বা স্বার্থপরতার জন্য মেঘকে কষ্ট পেতে হয়েছে‚অপমান আর গালি সয্য শুনতে হয়েছে। সত্যি সে ভীষণ অপরাধী। তার স্ত্রীকে প্রাপ্য সম্মানটুকু অবধি সে দিতে পারেনি। অথচ মেঘ তার জন্য কতো অপেক্ষা আর কষ্ট সয্য করেছে। আদ্রিয়ান দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে সে আজ অনুতপ্ত ভীষণ অনুতপ্ত‚অতীতে করা ভুলের কারণে। সৃষ্টি কথা বলা শেষ করে আবার অনুরোধ করে বলে
“ভাইয়া তুমি কখন মেঘকে কষ্ট দিও না! ওহ্ ছোটবেলা থেকে অনেক অপমান আর কষ্ট সয্য করেছে। ওর সাথে সুখে সংসার কর। মেঘকে তোমাকে ভীষণ ভালোবাসে ওর ভালোবাসার সম্মান করো।“
সৃষ্টির কথার বিপরীতে আদ্রিয়ান বলে
“হুম সৃষ্টি‚আমি তোকে প্রমিজ করলাম এই আদ্রিয়ান বেঁচে থাকতে মেঘ আর কখন কষ্ট পাবে না। হারিয়ে যাওয়া সবকিছু মেঘকে আমি নতুন করে ফিরিয়ে দিবে আদরে‚ সোহাগে‚ যত্নে ওর জীবন আমি রঙিন করে তুলব। আমি নিজে ও মেঘকে ভীষণ ভালোবাসি! আই লাভ মেঘ।“
আদ্রিয়ানের মুখে ভালোবাসি কথা শুনে সৃষ্টি খুশি হয়ে যায়। সত্যি আদ্রিয়ান মেঘকে ভালোবাসে! তবে কি তার বাবার সপ্ন পূরণ হবে মেঘ এই তালুকদার বাড়ির বউ হবে? মেঘের সাথে আদ্রিয়ানের ডিভোর্স হবে না! বরং তারা একসাথে সুখে – শান্তিতে সংসার করবে। মেঘই হবে সৃষ্টির ভাবী! সৃষ্টি খুশি হয়ে উচ্ছাসিত কণ্ঠে বলে
“ভাইয়া তুমি সত্যি মেঘকে ভালোবাসো? তুমি মেঘকে ডিভোর্স দিতে চাও না? ওর সাথে সংসার করতে চাও?“
বোনের এমন উচ্ছাসিত কণ্ঠ শুনে আদ্রিয়ান মৃদু হাসি দিয়ে উত্তর দেয়
“না সৃষ্টি ‚আমি মেঘকে ডিভোর্স দিব না। সারাজীবন মেঘ আমার বউ হয়ে থাকবে! মেঘের সাথে আমি সংসার করব।“
সৃষ্টি খুশিতে গদগদ হয়ে বলে
“ভাইয়া আব্বু আর আম্মু এই কথা শুনলে অনেক খুশি হবে৷ তুমি দাঁড়াও আমি আব্বুকে গিয়ে বলছি যে তুমি মেঘকে ডিভোর্স দিতে চাও না। বরং তুমি মেঘকে ভালোবাসো।“
সৃষ্টি যখন ফোন নিয়ে তার বাবার ঘরে ছুটে যেতে চাই তখন আদ্রিয়ান তাকে থামিয়ে দেয় আর বলে
“সৃষ্টি আব্বু – আম্মু বা পরিবারের কোনো সদস্যকে আমার আর মেঘের কথা বলবি না! ডিভোর্স বা ভালোবাসার বিষয়ে যেনো তারা কেউ কিছু জানতে না পারে!।“
“কিন্তু কেনো ভাইয়া? সবাই জানলে অনেক খুশি হবে“?
“হুম খুশি হবে। কিন্তু আব্বুর রাগ তো তুই জানস? যদি এখন হঠাৎ করে সব ঘটনা একসাথে শুনে হয়ত আব্বু রাগ করতে পারে। এখন বলার দরকার নাই। আমি আর মেঘ খুব শীঘ্রই বাংলাদেশ আসব তখন আমি নিজ থেকে সব জানাব।“
“সত্যি ভাইয়া ‚তুমি আর মেঘ বাংলাদেশে আসবে? কবে আসবে?“
“মেঘের পরীক্ষা শুরু হয়ে কয়েকদিন পর পরীক্ষা শেষ হলে। কলেজ ছুটি দিলে আসব। ততদিন এই কথা লুকিয়ে রাখবি! এবং কি মেঘকে অবধি বলবি না যে‚আমি জেনে গিয়েছি যে মেঘই আমার স্ত্রী।“
“কিন্তু মেঘকে কেনো বলব না ভাইয়া?“
“মেঘ আমার উপর অভিমান করেছে সৃষ্টি। গত নয় বছর ওর সাথে দেখা করেনি ওকে অনেক কষ্ট দিয়েছি তাই রাগ করেছে। অবশ্য ওর রাগ করা স্বাভাবিক তাই যতদিন না আমি নিজ থেকে মেঘ বা পরিবারকে কিছু বলব। তুই কিন্তু ততদিন সব কথা লুকিয়ে রাখবি কাউকে বলবি না। “
“ওকে ভাইয়া বলব না “।
“গুড গার্ল। আই লাভ ইউ মাই সুইট সিস্টার।“
“আই লাভ ইউ টু আমার হ্যান্ডস্যাম ভাইয়া।“
“ওকে ভাইয়া ‚এখন ফোন রেখে দেয়। আমি ভার্সিটিতে যাব।“
“ওকে‚কিন্তু মনে থাকে যেনো সব কথা কিন্তু তুই লুকিয়ে রাখবি। “
“অবশ্যই কাউকে কিছু বলব না। প্রমিজ। “
“ওকে সৃষ্টি। আর ভালো করে পড়াশোনা করবি।“
“বাই ভাইয়া। তুমি আর মেঘ ভালো থেকো। “
সৃষ্টির সাথে কথা বলা শেষ করে আদ্রিয়ান ফোন রেখে দেয় এরপর চোখ বন্ধ করে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ে। হৃদয় গহীনে তার সুখ সুখ অনুভূতি হচ্ছে অবশেষে সে তার ”মেঘবালিকার” আসল পরিচয় খুঁজে পেয়েছে। শুরু থেকে শেষ অবধি তাকে প্রথম দেখায় মেঘের অবাক হয়ে যাওয়া‚তার থেকে দুরত্ব বজায় রাখা চলা। মেঘের চোখে ঘৃণা আর জিয়ার সাথে তাকে দেখে কষ্ট পাওয়া সবকিছু কারণ এখন আদ্রিয়ান বুঝতে পারে।
আদ্রিয়ানের এখন নিজের উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে। বড্ড বোকা ছিল সে! কেনো একবার ও উপলব্ধি করতে পারল না মেঘই তার বউ? মেঘকে দেখে তার মনে যে অজানা অনুভূতি হয়েছিল তার কারণ খুঁজার চেষ্টা কেনো করল না! এইটা কি নিছক মায়া না ভালোবাসা? তা জানার আগ্রহ কেনো দেখাল না সে? সব দোষ আদ্রিয়ানের। কিন্তু এখন আদ্রিয়ান আর মেঘের থেকে দূরে থাকবে না? অসম্ভব? হয়ত মেঘ তার থেকে অভিমান বা রাগ করে দূরে থাকার চেষ্টা করবে! কিন্তু আদ্রিয়ান তার ভালোবাসা আর যত্ন দিয়ে আবার মেঘকে নিজের করে নিবে। অবশ্যই করবে মেঘ শুধুমাএ আদ্রিয়ানের।
[ সকাল ৯: ০০ ]
ড্রয়িং রুমে মনোযোগ সহকারে বসে টিভি দেখছিল মেঘ। কলেজে না যাওয়ার সুবাধে অবসর সময় কাটাতে টিভিতে বাংলাদেশি নাটক দেখছিল। সিঁড়ি দিয়ে কাজের মহিলা নিচে নেমে আসে উপরে আদ্রিয়ানের রুমে গিয়েছিল সে আদ্রিয়ানকে সকালের নাস্তা দিতে। মেঘ একটু আগেই নাস্তা করেছে। কাজের মহিলা মেঘের কাছে গিয়ে বলে
“মেঘ ম্যাম আপনি কি চা – নাস্তা কিছু খাবেন?“
কাজের মহিলার কথার জবাবে মেঘ না বোধক উত্তর দেয়
“না এখন আর কিছু খাব না। তুমি সহ বাড়ির সকল কাজের মহিলারা কি খাবার খেয়েছে?“
“জি ম্যাম সকলে খাওয়া দাওয়া করেছে।“
“ওহ্ আচ্ছা। তুমি তাহলে রুমে গিয়ে বিশ্রাম কর। দুপুরের রান্না করতে এখন ও নিশ্চয়ই দেরি আছে মাএ নয়টা বাজে।“
মেঘের কথা শুনে কাজের মহিলা একটু দূরে চলে যায় এরপর আবার ফিরে আসে। কাজের মহিলা বারবার হাত চুলকায় মেঘকে হয়ত কিছু বলতে চাই কিন্তু সাহস করে বলতে পারছে না। মেঘ কাজের মহিলাকে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে
“কি হয়েছে তুমি এখন দাঁড়িয়ে আছো কেনো? যাও রুমে গিয়ে বিশ্রাম নাও? তুমি কি কিছু বলবে আমায়?“
মেঘের প্রশ্ন শুনে কাজের মহিলা ইতস্তত বোধ করা বাদ দিয়ে সাহস নিয়ে বলে উঠে
“মেঘ ম্যাম, আজ ২৩ তারিখ আর দুইদিন পর বড়দিন। আমেরিকায় বড়দিন উৎসব সকলে তার পরিবার মা _ বাবা আত্মীয় স্বজনের সাথে পালন করে। আর এই বড়দিনে সবাইকে ছুটি দেওয়া হয়। আমরা সকল স্ট্রাফরা বড়দিনের উৎসবে ছুটিতে বাড়িতে যেতে চাই। তাই যদি আপনি।“
কাজের মহিলার এতোখন কি বলার চেষ্টা করছিল তা হয়ত মেঘ বুঝল। আমেরিকায় মানুষ ২৫ তারিখে যে বড়দিন পালন করে তা মেঘ ভুলে গিয়েছিল। বাংলাদেশ মুসলিম দেশ হওয়ার কারণে সেখানে এই উৎসব খুব বেশি পালন করা হয় না। এইজন্য মেঘের মনে ছিল না! মেঘ হাসি মুখে বলে
“বড়দিনের উৎসব যখন পরিবারের সাথে পালন করতে চাও তখন করবে! কি অসুবিধা? আর ছুটির কথা যদি আসে, তবে যাও দিলাম ছুটি তোমাদের। বড়দিনে প্রতৈকে পরিবারের সাথে পালন কর।“
মেঘের কথা শুনে কাজের মহিলা খুশি হয় তবে বাড়ির সকলে স্ট্রাফ যদি ছুটিতে বাড়ি চলে যায়। তবে মেঘ আর আদ্রিয়ানকে রান্না করে খাওয়াবে কে? আর বাড়ির যাবতীয় কাজকর্ম কে করবে? কাজের মহিলা বলে
“কিন্তু ম্যাম বাড়ির সকল কাজের মহিলা চলে গেলে। আপনি আর আদ্রিয়ান স্যার কি খাবেন? রান্না করবে কে? বাড়ির অন্যান্য কাজ কে করবে?“
“তুমি চিন্তা করো না। রান্না আমি করতে পারি। আর বড়দিন উপলক্ষে নিশ্চয়ই আমার কলেজ ও বন্ধ থাকবে। তখন আমি একটু একটু করে করব।“
“কিন্তু ম্যাম।“
“কোনো কিন্তু নয়। বছরের একদিন পরিবার আত্মীয় স্বজনের সাথে আনন্দ করতে হয়৷ যাও, বড়দিনের ছুটি কাটিয়ে আসো।“
“ধন্যবাদ ম্যাম।“
___ দুপুর সাড়ে বারোটা কুয়াশা ডাকা ধরণীর বুকে এক খণ্ড সূর্যের আলোর ঝলমলে রোদ উঠেছে। মেঘ রান্না ঘরে পাক্কা রাধুনির মতো রান্না করছে চুলায় গরম তরকারি টগবগ করছে। আদ্রিয়ান সকাল থেকে তার রুমে বসে ছিল কিন্তু সারাদিন এক ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগছিল না। তাছাড়া তার বউ এখন কি করছে তা জানা উচিত? সকালের পর থেকে মেঘের আর দেখা মিলেনি? রুমে বসে পড়াশোনা করছে হয়ত না বাহিরে কাজের মহিলার সাথে গল্প করছে!
ভরদুপুরে পড়াশোনা নিশ্চয়ই করবে না মেঘ! তাই আদ্রিয়ান মেঘের রুমে না গিয়ে সিঁড়ি দিয়ে বড় বড় পা ফেলে নিচে নেমে এসে উপস্থিত হয় ড্রয়িং রুমে। কিন্তু কোথাও মেঘ বা বাড়ির কাজের মহিলাদের দেখতে পায় না।কি অদ্ভুত বিষয়! বাড়ির সকল স্ট্রাফরা কোথায় চলে গেছে? সারাদিন ড্রয়িং রুমের আশেপাশে দেখা যায় তাদের। আজ কেউ কোথায় নাই বাড়ি ‚বাড়ি ঘর জনমানবহীন ফাঁকা মরুভূমির মতো মনে হচ্ছে।
আদ্রিয়ান যখন আশেপাশে তাকিয়ে কাজের মহিলা বা মেঘকে খুঁজছিল। তখন হঠাৎ রান্নাঘর থেকে খুন্তি নাড়ার শব্দ পায় ‚ আদ্রিয়ান হয়ত ভাবে বাড়ির স্ট্রাফরা রান্না করছে! তাই রান্নাঘরের কাছে এগিয়ে যায় সে। ড্রয়িং রুমের ডান – পাশের এক কোণায় বিশাল বড়ো রান্নাঘর রয়েছে। মেঘ সামনে দিকে ঘুরে রান্না করছে। আদ্রিয়ান রান্না ঘরের ভিতরে ঢুকে অবাক হয়ে যায়। মাথায় খোপা চুলগুলো বাঁধে, গায়ে থাকা উড়না কোমড়ে বেঁধে পাক্কা গিন্নির মতো রান্না করছে মেঘ।
আদ্রিয়ান মেঘের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে কিন্তু অবাক ও হয়। হঠাৎ মেঘ রান্নাঘরে কি করছে বাড়ির অন্য কাজের মহিলারা কোথায়? আদ্রিয়ান এগিয়ে যায় মেঘের কানে এরপর ধীরে ধীরে মেঘের পিছনে গিয়ে দাঁড়ায় । তার মুখ নিয়ে যায় মেঘের কানের কাছে এরপর ফিসফিস করে বলে
“মেঘ তুমি রান্নাঘরে কি করছ? বাড়ির স্ট্রাফরা কোথায়?“
মেঘ মনোযোগ সহকারে রান্না করছিল সে আদ্রিয়ানাকে খেয়াল করেনি। হঠাৎ যখন আদ্রিয়ান মেঘের কানে কানে ফিসফিস করে কথাটা বলে মেঘ ভয় পেয়ে যায়। মেঘ পিছনে ঘুরতে যাবে তখন আদ্রিয়ানের সাথে ধাক্কা লাগে তার ‚ মেঘ আদ্রিয়ানকে দেখে বলে
“আদ্রিয়ান স্যার আপনি এখানে?“ হঠাৎ করে আপনার কণ্ঠ শুনে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।“
মেঘের এমন ভযার্ত মুখ দেখে আদ্রিয়ান হাসে মূলত সে ইচ্ছা করেই মেঘের কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে কথাটা বলেছে। যাতে মেঘ ভয় পায় ‚আদ্রিয়ান বলে
“ওকে সরি মেঘ। কিন্তু তুমি রান্নাঘরে কি করছ? বাসার সব স্ট্রাফরা কোথায়?“
“ও্হ বাসার সকল কাজের মহিলারা বড়দিন উপলক্ষে ছুটি চেয়েছিল। আমি দিয়ে দিয়েছি। বছরের একদিন পরিবারের সাথে আনন্দ করা উচিত। তাই ওরা সকলে ওদের বাসায় চলে গেছে। দুপুরের খাওয়া সময় হয়ে গেছে তাই আমিই রান্না বসিয়ে দিয়েছি।“
বড়দিনের কথা আদ্রিয়ানের মনে ছিল না প্রতিবছর এই দিনে বাড়ির কাজের মহিলাদের ছুটি দেওয়া হয়। আদ্রিয়ান চুলায় রান্না করা পাতিলের দিকে তাকিয়ে বলে
“মেঘ তুমি রান্না করতে পারবে? না আমি বাহির থেকে খাবার অর্ডার করব! “
আদ্রিয়ানের প্রশ্নে মেঘ তার দিকে তাকিয়ে রাগী চোখে বলে
“কেনো রান্না করতে পারব না কেনো? আপনার কি আমাকে দেখে অকর্মা মনে হয়? শুনুন এই মেঘ সব রান্না করতে পারে শুধু রান্না নয় বরং পিঠা ‚ পুলি সব করতে পারে।“
“না‚ মেঘ তুমি অর্কমা হতে যাবে কেনো? আমার বউতো ভীষণ লক্ষী। আমার কিউট লক্ষী বউ।“
আদ্রিয়ান শেষ কথাটা মনে মনে বলল মেঘ তা শুনতে পায় না। আদ্রিয়ান বলে
“সো মিস রাঁধুনি আপনি দুপুরের জন্য কি খারাপ রান্না করছেন?“
“গরম গরম বিরিয়ানি। “
“বিরিয়ানি? বিরিয়ানি আমার সবচেয়ে প্রিয় খাবার।
“হুম জানি “
“তুমি কি করে জানলে মেঘ বিরিয়ানি আমার প্রিয় খাবার?“
আদ্রিয়ানের প্রশ্ন শুনে মেঘ থমকে যায় বিরিয়ানি যে আদ্রিয়ানের প্রিয় খাবার তা মেঘ জানে। শার্লিন বেগমের মুখে বহুবার শুনেছে এইজন্য বেগম সবার প্রথম বিরিয়ানি রান্না করা শিখেছিল তখন। কিন্তু শার্লিন বেগমের কথা মেঘ বলে না সে বলে
”ফারহানা আন্টির বলেছিল আপনার বিরিয়ানি পছন্দ ”।
”আমার বিরিয়ানি পছন্দ তার জন্য কি রান্না করছ? ”
”না‚ এমনি আজ বিরিয়ানি রান্না করার ইচ্ছা হয়েছিল তাই করেছি।”
”ওহ্ ওকে।”
আদ্রিয়ানের সাথে কথা বলা শেষ করে মেঘ আবার তার রান্নার কাজে মনোযোগ দেয়। আদ্রিয়ান সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল মেঘের রান্না ঠিক কতটুকু হয়েছে তা দেখার জন্য পাতিলে হাত দেয়। কিন্তু গরম পাতিল থাকায় হাতে ছ্যাকা লাগে ‚আদ্রিয়ান উফ করে উঠে। মেঘ দেখে আদ্রিয়ানের হাত লাল হয়ে গেছে এইজন্য সে দ্রুত আদ্রিয়ানের হাত ধরে। পানির কলে নিয়ে যায় এরপর কল ছেড়ে দিয়ে তার হাতে পানি দেয় আর বলে
”আদ্রিয়ান স্যার কি করলেন আপনি? গরম পাতিলে কি কেউ হাত দেয়? এখন দেখুন হাত লাল হয়ে গেছে। আপনি যে কি করেন না।”
আদ্রিয়ানের তার হাতের ব্যাথার কথা ভুলে গিয়ে এক দৃষ্টিতে মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকে। মেঘ কতো সুন্দর যত্ন করে তার হাত ঠান্ডা পানির মধ্যে ধরে রেখেছে। ঠান্ডা পানির মধ্যে হাত ভিজিয়ে রেখে মেঘ পাশের লবণের কৌটা থেকে একটু লবণ নিয়ে হাত হয়ে যাওয়া স্থানে দেয়। যাতে সেখানে ফোসকা না পড়ে যায়। আর বলে
”আপনি এখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকুন। হাত লাল হয়ে ফুসকা পড়ে যেতে পারে।”
আদ্রিয়ান চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল কিন্তু শান্ত হয়ে না। আদ্রিয়ানের মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি চলে আসল সে মেঘের মাথায় খোপায় করে রাখা চুলগুলো খুলে দেয়। এরপর পাশে থাকা ফুলকপির সাদা সাদা গুড়া মেঘের মুখে ছিটিয়ে দেয়। কাজের মধ্যে বিরক্ত করায় মেঘ ‚হাতের খুন্তি ধরে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে কড়া শাসন কণ্ঠে বলে
”আদ্রিয়ান স্যার আপনি কি এখান থেকে যাবেন? না হলে কিন্তু বিরিয়ানি সহ আপনাকে রান্না করে ফেলব। রান্না হলে পড়ে টেবিলে বসে খাবেন। এর আগে যেনো আপনাকে রান্নাঘরের আশেপাশে না দেখি।”
আদ্রিয়ান মেঘের কথা শুনে ভয় পেয়ে তাই সে ভাদ্র ছেলের মতো রান্নাঘর থেকে বের হয়ে যায়। মেঘ আদ্রিয়ানের কাণ্ড দেখে হাসে এরপর আবার রান্না শুরু করে। দুপুর দুইটায় মেঘ রান্না করা শেষ করে গোসল করে টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখে। আদ্রিয়ান ও গোসল করে দুপুরের খাবার খেতে আসে ‚মেঘ খাবার বেড়ে দিয়ে নিজেও চেয়ার টেনে বসে পড়ে।
আদ্রিয়ান চামচ দিয়ে প্লেটে থাকা বিরিয়ানির এক বাইট মুখে ভরে নেয়। মেঘ তার খাওয়া বাদ দিয়ে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে মূলত সে জানতে চাই বিরিয়ানি কেমন হয়েছে? আদ্রিয়ানের মুখে প্রশংসা শুনতে চাই। কিন্তু আদ্রিয়ান বিরিয়ানির কোনো প্রশংসা করল না তার মুখের রিয়েকশন দেখে খাবার ভালো হয়েছে না খারাপ হয়েছে তা বুঝা যাচ্ছে না।
আদ্রিয়ান মেঘের তাকিয়ে থাকা সহ সবকিছু খেয়াল করে তবুও ইচ্ছা করে প্রশংসা করে না। বিরিয়ানি ভীষণ মজা হয়েছে। প্রায় একবছর পর সে আবার তার মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ পেয়েছে। বিরিয়ানি এতোই মজা হয়েছে যে তা বলে বোঝানো যাবে না। কিন্তু আদ্রিয়ান চাই মেঘ তাকে নিজ থেকে জিজ্ঞেস করুক বিরিয়ানির কথা। আদ্রিয়ানকে চুপচাপ খাবার খেতে দেখে মেঘ মনে করে হয়ত বিরিয়ানি খারাপ হয়েছে! জোর করে মেঘের মন রখাতে হয়ত আদ্রিয়ান খাবার খাচ্ছে। তাই মেঘ বলে
”বিরিয়ানি কেমন হয়েছে? খুব খারাপ হয়েছে কি? যদি খারাপ হয় তবে আপনি বসুন আমি ডিম ভাজি‚ অন্য কোনো খাবার বানিয়ে নিয়ে আসছি।”
তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩০
মেঘের প্রশ্ন শুনে আদ্রিয়ান হাসে আর উত্তর দেয়
”বিরিয়ানি অনেক মজা হয়েছে। একদম আমার মায়ের হাতের রান্না স্বাদ রয়েছে। এই বিরিয়ানি খেয়ে প্রাণ জুড়িয়ে গেছে আমার। মেঘ সত্যি তুমি পড়াশোনায় যেমন ভালো রান্নায় ও তেমন ভালো।”
আদ্রিয়ানের প্রশংসা শুনে মেঘ খুশি হয়ে যায় সে বলে
”ধন্যবাদ আদ্রিয়ান স্যার। অবশ্য দেখতে হবে না রান্নাটা কে করেছে?”
আদ্রিয়ান ধীর কণ্ঠে ছোট করে জবাব দেয়
”আদ্রিয়ান রোদায়ানের বউ করেছে ।”
