Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৭ (৪)

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৭ (৪)

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৭ (৪)
মাইশা জান্নাত নূরা

ঘাসের উপর থেকে একটা গ্লাস ভাঙা অবস্থায় পাওয়া সানগ্লাসটা এখনও সারফারাজের হাতে ধরা। সারফারাজ আশেপাশে নজর বুলালো। ইতিমধ্যেই জায়গাটা সুনশান, জনমানবশূন্য স্থানে পরিণত হয়ে গিয়েছে। সামনে বিশাল জায়গা জুড়ে তৈরিকৃত কৃত্রিম পুকুরের পানির উপর পুকুরের ধার দিয়ে বসানো রং বেরঙের সোলার স্ট্রিট লাইটগুলোর আলো পড়ায় পানির প্রকৃত রং-ও বোঝা যাচ্ছে না।
সারফারাজের পিছনে ওর থেকে ২ হাত সম দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে আছে আহাদ। সারফারাজ আহাদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো….

—”আশপাশটাতে একটু নজর বুলাও আহাদ। তেজের সানগ্লাসটা এখানে অবহেলিত, ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকার বিষয়টা আমাকে ভাবাচ্ছে।”
আহাদ ‘ওকে বস’ বলে আশপাশটা একটু ঘুরে ঘুরে নজর বুলিয়ে দেখতে শুরু করলো। সারফারাজ সেখানেই বেন্ঞ্চের উপর বসলো দু’চোখ বুঁজে। কিয়ৎক্ষণ পর আহাদ এসে বললো….
—”বস! আশপাশটা দেখা শেষ। এখানে কোথাও তেজ স্যার বা নির্ঝর স্যার নেই।”
এই বলে আহাদ ওর ডান হাত উঠিয়ে ইশারায় একটা সাইড দেখিয়ে বললো….
—”আর ঐ সাইডটা ঘন জঙ্গল বস। ওখানে বিভিন্ন ধরনের হিং*স্র পশুদের বাস। আমার মনে হয় না তেজ স্যার বা নির্ঝর স্যার আপনাকে কল করে আসতে বলার পর ঐ সাইডে যাওয়ার সাহস করবেন।”
সারফারাজ চোখ তুলে তাকালো আহাদের দিকে। অতঃপর বললো…

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—”তাহলে কি বলতে চাইছো তুমি আহাদ? আমার ভাইদের, এমপি সারফারাজ ইউসুফ খানের ভাইদের কেউ কি*ড*ন্যাপ করার সাহস দেখিয়েছে?”
আহাদ একবার ঢো*ক গিললো। মুখের ভিতরটা এতোটাই শুকিয়ে গিয়েছে আহাদের যে এক ঢোকে গলা ভিজলো না কিন্ঞ্চিত পরিমাণও। তবুও খানিকটা সাহস সন্ঞ্চার করে আহাদ বললো….
—”আমার তো তাই মনে হচ্ছে বস।”
সারফারাজ ওর দু’হাত শক্ত ভাবে মুষ্টিবদ্ধ করে নিলো তৎক্ষনাৎ। গাঁটগুলো চাপের ভাড়ে স্পষ্ট হলো। শিরাগুলোও ফুলে উঠেছে খানিকটা। সারফারাজ ওর পাজামার পকেট থেকে ফোনটা বের করে পিহুকে কল করলো। ঘড়িতে তখন প্রায় ৯টায় বাজে।

পিহু ওদের রুমে বিছানায় আধশোয়া হয়ে লেখিকা ‘নুসাইবা ইভানার’ প্রথম প্রকাশিত বই ‘অর্ধাঙ্গিনী’ পড়ছিলো। বইটা সে গতকাল নীরার থেকে নিয়েছিলো। নীরার রুমে সমসাময়িক অনেক লেখক-লেখিকার প্রকাশিত গল্পের বই সংগ্রহ করে রাখা রয়েছে। নীরাকে মাঝেমাঝেই বইগুলো পড়তে দেখে পিহু নিজ থেকেই নিজের বই পড়ার ইচ্ছা পেষন করেছিলো নীরার কাছে।
যেহেতু পিহু ও সারফারাজ সদ্য বিবাহ বন্ধনে আবব্ধ হয়েছে তাই নীরার কাছে এই ‘অর্ধাঙ্গিনী’ বইটাই পিহুর পড়ার জন্য বেটার হবে বলে মনে হয়েছিলো। গুণে গুণে প্রায় ৫০টা পৃষ্ঠা পড়া শেষ করেছে পিহু গতকাল থেকে। তখুনি পাশে রাখা পিহুর ফোনটা বেজে উঠলে সে ঘাড় ঘুরিয়ে ফোনস্ক্রিণের দিকে তাকাতেই ‘আই লাভ ইউ’ দিয়ে সেইভ করা নাম্বারটা দেখলো। পিহুর ঠোঁটে মুচকি হাসির রেখা ফুটে উঠলো। বিয়ের আগে সারফারাজ যখন পিহুকে এই ফোনটা গিফট করেছিলো তখন সে নিজেই নিজের নাম্বার ‘আই লাভ ইউ’ নামে সেইভ করে রেখেছিলো। আজও তা পিহু পরিবর্তন করে নি। পিহু ফোনটা রিসিভ করতেই ফোনের ওপাশ থেকে সারফারাজের শীতল কন্ঠ ভেসে আসলো….

—”কি করছো বউ?”
পিহু শান্ত কন্ঠে বললো….
—”পড়ছিলাম।”
—”কি পড়ছো?”
—”একটা গল্পের বই।”
—”আরে বাহ, আমার বউটা কবে থেকে বইপ্রেমী হয়ে গেলো! টেরই পেলাম না।”
—”উহুহ, এখনও পুরোপুরি বইপ্রেমী হয়ে যাই নি। গতকালই নীরার থেকে নিয়েছিলাম বইটা পড়ার জন্য। তবে পড়তে যে ভিষণ ভালো লাগা কাজ করছে তাতে বইপ্রেমী হয়ে উঠতে খুব বেশি সময় লাগবে বলে মনে হচ্ছে না আমার।”
সারফারাজ স্মিত হেসে বললো….

—”বিভিন্ন ক্যটাগরির বই পড়া ভালো। মন মাইন্ড ফুরফুরে থাকে।”
পিহু ছোট্ট করে ‘হুম’ বললো। সারফারাজ বললো….
—”সবাই খেয়ে নিয়েছে?”
—”হুম, শুধু আপনারা তিন ভাই-ই বাকি।”
পিহুর এই কথাতেই সারফারাজ বুঝতে পারলো যে তেজ আর নির্ঝর বাড়িতে যায় নি। সারফারাজ সরাসরি পিহুকে ওরা ওখানে আছে কিনা এই প্রশ্নটা করলো না কারণ পিহু ওদের নিয়ে চিন্তা করবে। সারফারাজ নিজেকে যথাযথ শান্ত রেখে বললো….

—”তুমিও খাও নি যে সেটা আমি জানি।”
পিহু ওর নিচের ঠোঁট আলতো করে কাঁ*ম*ড়ে ধরলো কেবল। কিন্তু কিছু বললো না। সারফারাজ আবারও বললো….
—”আজ আর আমার জন্য না খেয়ে অপেক্ষা করো না তুমি বউ। এখুনি খেয়ে নাও”
পিহু বললো….
—”কেনো? আপনি কি বাহিরেই খেয়ে নিয়েছেন?”
—”উহুহ। খাওয়া হয় নি এখনও। আজ আমার একটা জরুরী মিটিং আছে ১০ টা থেকে। সেই সূত্রে শহর থেকে অনেকটা দূরে আসতে হয়েছে আমাকে। মিটিং শেষ হতে হতে মাঝরাত হয়ে যেতে পারে। ওতোরাতে এই রাস্তা ধরে বাসায় ফেরাটা নিরাপদ হবে না তাই ভাবছিলাম রাতটা এখানেই কাটিয়ে দিবো। তোমার কোনো আপত্তি নেই তো বউ?”

পিহুর লজ্জামাখা হাসিমুখখানা মূহূর্তেই মলিন বর্ণ ধারণ করলো সারফারাজের না ফেরার কথা শুনে। পরমুহূর্তেই সারফারাজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে পিহু আর বাঁধ সাধলো না। জোরপূর্বক হেসে বললো….
—”সাবধানে থাকবেন। আর সময় মতো খেয়ে নিবেন। তবে আজে-বাজে কিছু খাবেন না। কারণ জায়গার পরিবর্তন হলেও আমাদের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া উচিত। নয়তো বিভিন্ন ধরণের সমস্যা হতে পারে। আর হ্যাঁ, কাজ শেষ করে বিশ্রাম নিবেন। তারপর বাসায় ফিরে আসবেন।”
পিহুর প্রতিটি কথায় সারফারাজ মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে মৃদু হাসছে। অতঃপর সারফারাজ বললো….
—”জো হুকুম আপকা বিবিজান।”
পিহু সারফারাজের কথা স্পষ্ট বুঝতে না পারায় বললো….
—”হু? কি বললেন পুরোপুরি বুঝলাম না!”
—”বললাম, আমি তোমাকে যেমন ভালোবাসি তেমন তুমিও যে আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছো তা আমি বুঝতে পেরেছি।”
পিহু বললো….

—”উহুহ, আপনি এমনটা বলেন নি।”
—”কিন্ত এটা তো সত্যি! সত্যি না? তুমিই বলো।”
পিহু এবার খানিকটা লজ্জা পেয়েছে। লজ্জামাখা কন্ঠেই বললো….
—”জানি না। রাখুন তো।”
এই বলে পিহু কল না কেটেই ফোনটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে নিঃশব্দে হাসতে শুরু করলো। পিহুর হৃদপিণ্ডের গতি বেড়েছে। ফোনের ওপাশ থেকে সারফারাজ যেনো সেই মৃদুভাবে ‘ধুক ধুক’ করার শব্দ শুনতে পারছে। পিহু আনমনেই বললো….

—”বিয়ের পর আজই প্রথম গোটা একটা রাত আমাকে একা এই ঘরে কাটাতে হবে আপনাকে ছাড়া এমপি সাহেব। জানি না কেনো এমন শূন্য শূন্য অনুভব হচ্ছে বুকের ভিতরটাতে। জানি না আমি। সত্যিই জানি না। আপনার কথায় এই অনুভূতিগুলো কাউকে ভালোবাসার পর থেকে শুরু হয় কিনা তা আমি জানি না।”
পিহুর বলা প্রতিটি কথা সারফারাজ ওপাশ থেকে শুনতে পারলো। সারফারাজের ঠোঁটে তৃপ্তির এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। অতঃপর সারফারাজ শব্দ করে একবার প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলে কলটা কেটে দিলো।
পিহুকে কল করেছে সারফারাজ সেটা বুঝতে পারা মাত্রই আহাদ সেখান থেকে সরে গিয়েছিলো খানিকটা দূরে। তবে ওর নজর ঠিকই সারফারাজের উপর ছিলো। সারফারাজ ইশারায় আহাদকে নিজের কাছে ডাকলো। আহাদ সারফারাজের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো…..

—”বস, এখন আমাদের করণীয় কি?”
সারফারাজ শীতল কন্ঠে বললো…..
—“আগে বাংলো বাড়িতে খোঁজ নাও। ওরা ওখানে না থাকলে সরাসরি আইজিপির সঙ্গে কথা বলো। ঢাকায় ঢোকার ও বেরোনোর সব রাস্তায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করার ব্যবস্থা করতে বলবে উনাকে।
রাস্তাগুলোতে প্রয়োজনের থেকে বেশি চেকপোস্ট বসাতে হবে। প্রত্যেকটা গাড়ি থামিয়ে তাতে নিখুঁত তল্লাশি নিতে হবে। পাশাপাশি সব চেকপোস্টের সিসিটিভি ফুটেজ লাইভ মনিটরিং এর আয়ত্তে রাখতে হবে।”
আহাদ তৎক্ষনাৎ নিজের কাজে লেগে পড়লো।

পিহু ওর কোলের উপর থাকা গল্পের বইটা বেডসাইড টেবিলের উপর রেখে ভালোভাবে শুয়ে পড়লো। লাইটটা নিভালো না। পায়ের কাছে অবহেলায় পরে থাকা কম্বলটাও টেনে গাঁয়ে জড়ালো না। তবে যে ভাবে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে পিহু তাতে ওর শরীরের জন্য কম্বলটা নেওয়া জরুরী ছিলো। পিহু বিরবিরিয়ে বললো…..
—”মন চাইছিলো বলতে আপনাকে ফিরে আসার জন্য কিন্তু মস্তিষ্ক বাঁধা দিচ্ছিলো কারণ আপনার নিরাপত্তাটা বেশি জরুরী এখানে। এ কোন দোটানার মাঝে ফেললেন আপনি আমায় এমপি সাহেব।আমার পাশে আপনার থাকার এই রোজকার অভ্যাসটা আজ ভুলে আমি কিভাবে ঘুমাবো!”

আহাদ সারফারাজের দেওয়া ১ম ধাপের কাজ সম্পন্ন করে আবারও ওর সামনে এসে দাঁড়ালে সারফারাজ বললো….
—”অফিসে যাবো চলো।”
অতঃপর সারফারাজ আহাদের সাথে গাড়ি নিয়ে পুনরায় নিজের সিক্রেট অফিস এড়িয়ার উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়লো। সারফারাজ ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে বসে আছে। আহাদ ড্রাইভ করতে করতে বললো….
—”বস, ওখানে কি কোনো বিশেষ কাজ আছে? না মানে আবারও যেতে হচ্ছে যে!”
সারফারাজ ফোনে টাইপিং করতে করতে বললো…
—”বিশেষ তো বটেই।”

বেশ খানিকক্ষণ পর ওরা গন্তব্যস্থলে পৌঁছালো। সারফারাজ ও আহাদ একসাথে গাড়ি থেকে নামলো। সারফারাজ ওর হাত জোড়া উপরে উঠিয়ে একত্র করে গা চাড়া দিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করলো। ওর পিছন পিছন আহাদও আসছে। চারপার্শে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পি*স্তল ধারী গার্ডসরা রোবটের মতো অনুভূতি শূন্য হয়ে দাঁড়িয়ে পাহাড়া দিচ্ছে।
সারফারাজ সকল গেইট অতিক্রম করে সোজা ট*র্চা*র রুমের ভিতরে প্রবেশ করলো। আহাদ সেই রুমের দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ড দু’জনকে উদ্দেশ্য করে ফিসফিসিয়ে বললো…..
—”কোনো নতুন মাল এসেছে নাকি?”
একজন গার্ড বললেন…
—”হুম একটু আগেই এসেছে।”

অতঃপর আহাদ ভিতরে প্রবেশ করতে করতে শুকনো ঢোক গি*লে মনে মনে বললো….
—”আজ টমির ভুঁড়ি ভোজটা দারুণ হবে বলে মনে হচ্ছে।”
টর্চার রুমের ভিতরেই একটা চেয়ারে বসে আছে সারফারাজ মেরুদণ্ড সোজা করে পায়ের উপর পা তুলে। দৃষ্টি ওর নিজের পায়ে থাকা কালো সু এর উপর। যেখানে অল্প স্বল্প ধুলো লেগে রয়েছে। সারফারাজের থেকে দেড় হাত সম দূরত্ব বজায় রেখে আরেকটা চেয়ারে হাত-পা-মুখ বাঁ*ধা অবস্থায় বসিয়ে রাখা হয়েছে রায়হান গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিসের মালিক মরহুম রায়হানের জামাতা হামিদুরকে।

হামিদুর নিজেকে ছাড়ানোর জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করছে। কিন্তু শক্ত বাঁধনের কাছে তাকে হার মানতে হচ্ছে বারবার। হামিদুরের মুখ থেকে কেবল ‘উমম উমম’ শব্দ বের হচ্ছে। সারফারাজ আহাদকে উদ্দেশ্য করে বললো….
—”ওর এই উম উম শব্দটা আমার কানের পো*কা নাড়িয়ে দিচ্ছে আহাদ। মুখটা খুলে দাও দেখি কি বলতে চায় ও।”
আহাদ তৎক্ষনাৎ হামিদুরের মুখের বাঁধন খুলে দিলে হামিদুর যেনো নিজের যায় যায় অবস্থা হওয়া প্রাণটা ফিরে পেলো। কতোক্ষণ জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে নিজের শরীরটাকে হালকা করলো সে। অতঃপর বললো….
—”আমাকে এভাবে এখানে তুলে আনার মানে কি এমপি সাহেব?”
সারফারাজ ওর জুতোর উপর ফুঁ দিয়ে অবশিষ্ট ধুলোটুকু উড়িয়ে বললো…
—”একটু আতিথেয়তা দেখানোর ইচ্ছে হয়েছিলো তাই আপনাকে উঠিয়ে আনা হয়েছে।”
হামিদুর কিছুটা রাগ নিয়ে বললো….

—”এ কেমন আতিথেয়তা! এমন একটা বদ্ধ করে চেয়ারের সাথে বেঁধে রেখে একপ্রকার দম আ*টকিয়ে মে*রে ফেলার চেষ্টা করাকে অতিথি সেবা করা বলে?”
সারফারাজ বাঁকা হেসে বললো….
—”বলে না বুঝি? তাহলে আপনার ভাষায় এটাকে কি বলে?”
—”অ*ত্যা*চার করা বলে। নিরাপরাধ, নি*র্দোষ একজন মানুষকে কওয়া নেই বলা নেই তার কর্মস্থল থেকে উঠিয়ে এনে এভাবে বেঁধে রাখাকে হ্য*রাস করা বলে। আপনি একজন পাওয়ারফুল এমপি হতেই পারেন। কিন্তু দেশের আইন-কানুন সবার জন্যই সমান তাই আপনার নামে হ্য*রা*সমেন্টের মামলা করলে আপনি আপনার পদটাও হারিয়ে ফেলতে পারেন।”

—”ওওও আমি তো ভয় পেয়ে গেলাম। আহাদ! এবার আমার কি হবে? আমি আমার এমপি পদ হারিয়ে ফেলবো। তারপর আমাকে মা*মলা থেকে বাঁচতে সাপুড়েদের মতো আজ এখানে কাল ওখানে বাসা বেঁধে বেঁধে থাকতে হবে।”
সারফারাজের এরূপ কথায় আহাদ এইমূহূর্তে কেমন রিয়াকশন দিবে তা সে বুঝে উঠতে পারছে না। হামিদুর অবাক চোখে তাকিয়ে আছে সারফারাজের দিকে। পরক্ষণেই সারফারাজ আহাদের পকেট থেকে রি*ভ*ল*বারটা ছোঁ মে*রে নিয়ে সোজা হামিদুরের মুখের ভিতরে পুড়ে দিলো। হামিদুরের মাথা পিছনের দিকে হেলে গেলো। ভ*য়ে তাঁর কলিজার পানি শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। চোখজোড়ার আকৃতি অনেকটা বড় হয়ে গিয়েছে। সারফারাজ রাগে হি*স*হিসিয়ে বললো…..

—”তুই খুব ভালো ভাবেই জানিস তোকে এখানে উঠিয়ে আনার পিছনে কারণটা কি। তবুও আমার সামনে নাটক করছিস? নাটক করছিস তুই?”
হামিদুর ওমতবস্থাতোই মাথা এপাশ ওপাশ নাড়িয়ে ‘না’ সূচক জবাব দিলে সারফারাজ ওর হাতে থাকা রিভ*লবা*রটার ট্রিগার এর আঙুলটা রেখে বললো…..
—”আমার আঙুলের একটা চাপই যথেষ্ট তোর মুখের ভিতরটা ছিদ্র করে মাথার পিছন দিয়ে বু*লে*ট বের হয়ে যাওয়ার জন্য। তাই আমার সামনে মি*থ্যে কিংবা একটাও অপ্রয়োজনীয় শব্দ বলিস না। যা জিজ্ঞেস করবো পরিষ্কার ভাবে সত্য সত্য এন্সার করবি।”

হামিদুর এবারও ইশারায় বুঝালো সে ওমনই করবে যেমনটা সারফারাজ বললো। সারফারাজ হামিদুরের মুখের ভিতর থেকে রিভ*ল*বারটা বের করতেই হামিদুর জোরে জোরে কাশতে শুরু করলো। একটু পর হামিদুর নিজেকে স্বাভাবিক করে নিলে সারফারাজ বললো….
—”আমার ভাইয়েরা কোথায়? কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস ওদের? কার কথায় এমনটা করেছিস তুই? কতো টাকা নিয়েছিস বিনিময় হিসেবে?”
হামিদুর ঘা*ব*ড়ানো কন্ঠে বললো…
—”আ-আমি জানি না এমপি সাহেব, আমি সত্যিই জানি না আপনার ভাইয়েরা কোথায়! আপনার সাথে আমার পারসোনাল কোনো শ*ত্রুতা নেই যে তার ব*দলা নিতে আমায় এমন কিছু করতে হবে। আমি সত্যি বলছি এমপি সাহেব। আমি কিছু করিনি আপনার ভাইদের সাথে। আমি কিছু করি নি।”
হামিদুরের মুখের কথায় বিশ্বাস না হলেও তাঁর চোখ দেখেই সারফারাজ বুঝতে পেরেছে সে কিছু করে নি তেজ ও নির্ঝরের সাথে। তাহলে তেজ ও নির্ঝরকে কে কি*ডন্যা*প করলো এটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না সারফারাজ। সারফারাজ ওর হাতে থাকা রিভ*লবারটার অগ্রাংশ দিয়ে নিজের কপালের ডানপাশে বুলাতে বুলাতে হামিদুরের থেকে সরে এসে বললো….

—”আমার ভাইদের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত এ এখানেই বাঁধা অবস্থায় থাকবে। সে বিষয়ে গার্ডসদের জানিয়ে রাখো আহাদ।”
এই বলে সারফারাজ হ*ন-হ*নিয়ে ট*র্চার রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো। আহাদও ছুটলো সারফারাজের পিছন পিছন। মাঝখানে সে গার্ডসদের হামিদুরের উপর কড়া নজর রাখতে বলেছে। সারফারাজ ওর গাড়ির ড্রাইভিং সিটে এসে বসে গাড়ি স্টার্ট করলো। আহাদ ছুটতে ছুটতেই এসেছে ভিতর থেকে গাড়ি পর্যন্ত এই রাস্তাটা। একটুর জন্য গাড়ি মিস করলো না সে। ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে বসে হাঁপরের মতো বুক উঠানামা করে নিঃশ্বাস ফেলছে আহাদ।
সারফারাজ পুরো ঢাকা শহর খুঁজে দেখতে শুরু করেছে। বিভিন্ন চেকপোস্টে ওর মোতায়েন করা পুলিশদের সাথে কথা বলেছে সে। কিন্তু সব খান থেকেই ফলাফল শূন্যই মিলেছে সারফারাজের। তেজ আর নির্ঝরের কোনো হদিস নেই কোথাও। এভাবে কি করে দু’জন প্রাপ্ত বয়সের ছেলে উধাও হয়ে যেতে পারে সেটা সারফারাজ কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না৷

দেখতে দেখতেই গোটা একটা রাত কেটে গেলো। নির্ঘুম, দুশ্চিন্তা, অজানা ভয় মনের ভিতর জমে রেখে সারফারাজ এখনও ঘুরছে এখানে সেখানে। স*ন্দেহ ভাজন এমন অনেককে গ্রে*প্তার করে তাঁদের পারসোনালি জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সারফারাজ। কিন্তু কেউই তেজ ও নির্ঝরের সন্ধান দিতে পারে নি।

সূর্যের তেজী আলো চোখে-মুখে এসে পড়তেই নির্ঝর চোখ-মুখ কুঁ*চকে নিলো। পিটপিট করে চোখ খুলতেই মাথার উপর খোলা আকাশ দেখে চারপাশে তাকাতেই দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিশাল বিশাল আকৃতির গাছপালায় ঘেরা ঘন জঙ্গল দেখে ভিষণ অবাক হলো সে। মাথাটা ভিষণ ভার হয়ে আছে নির্ঝর। কোনোরকমে একহাতে নিজের মাথা চেপে ধরে উঠে বসলো নির্ঝর। বিরবিরিয়ে বললো…..
—”এই জঙ্গলের ভিতরে আমি এভাবে পরে আছি কেনো? আমি কি আদোতেও বেঁচে আছি? তেজ ভাই কোথায়?”
এই বলে নির্ঝর উঠে দাঁড়িয়ে তেজকে ডাকতে শুরু করলো। কিয়ৎক্ষণ পর নিজের থেকে খানিকটা দূরে একটা মাঝারি লম্বা ঘন ঘাসের ঝাড়কে নড়েচড়ে উঠতে দেখে নির্ঝর দু’কদম পিছিয়ে গেলো। নিজের দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে সামনের দিকে এগিয়ে ভী*ত স্বরে বললো…..

—”ওখানে কে রে?”
এই বলে নির্ঝর একবার ঢোক গি*ললো। ঝাড়ের ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না কিন্তু আগের মতো এবারও ঝাড়টা নড়েচড়ে উঠলো। নির্ঝরের ভয়ের মাত্রা বেরে গেলো। নির্ঝর মনে মনে দোয়া-দরুদ পাঠ করতে শুরু করলো। বিরবিরিয়ে বললো…..
—”কোনো হিং*স্র জ*ন্তু-জা*নো*য়া*র নেই তো ঐ ঝোপের আড়ালে? আল্লাহ তুমি আমাকে বাঁচাও।”
তখুনি একটা বড় সাইজের ইঁদুর ঝোপের আড়াল থেকে বেড়িয়ে এলো। দ্রুত পায়ে ছুটলো নির্ঝরের দিকে। নির্ঝর ওতোটা লক্ষ্য না করেই ‘আ আ আ’ বলে চি*ল্লিয়ে উঠে ঐ জায়গাতেই গোলগোল ঘুরতে শুরু করলো। পরক্ষণেই একটা গাছকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দু’চোখ বন্ধ করে চিল্লিয়ে বললো….
—”বাঘ-সিংহ-হাতি তোমরা আমার দাদা-চাচা-ভাতিঝি। আমায় তোমরা খেও না। মে*রো না। আমি অবিবাহিত, অবলা একটা শিশু বাচ্চা। সবে সবে ক বছর হলো ১৮ পেরিয়েছি। আমার মেলাদিন বাঁচার শখ আছে। আমায় বাঁচার সুযোগ দাও। কথা দিচ্ছি তোমাদের শান্তি নষ্ট করতে আমি আর জীবনেও এই জ*ঙ্গল মুখো হবো না। অজ্ঞানেও না সজ্ঞানে তো আরোই না।”

পরপরই নির্ঝর ওর কাঁধের উপর কারোর ছোঁয়া অনুভব করতেই ভ*য়ে লাফ দিয়ে মাটির উপর থেকে পা জোড়া তুলে গাছের সাথে পেঁচিয়ে নিয়ে উপরে উঠার চেষ্টা করতে নিলে তেজ বললো….
—“নেশা কি এখনও ছুটে নি তোর? গাছে উঠছিস কেনো?”
তেজের কন্ঠ কর্ণপাত হতেই নির্ঝর চোখ মেলে ঘাড় হালকা বাঁকিয়ে তেজের দিকে তাকালো। তেজকে দেখা মাত্র নির্ঝরের সব ভয় কমে গেলো এক নিমিষেই। তৎক্ষণাৎ নির্ঝর গাছ ছেড়ে নেমে দাঁড়িয়ে বললো…..
—”তেজ ভাই, আমায় একা ফেলে কোথায় চলে গিয়েছিলে তুমি?”
তেজ বললো….

—”আরে ব্যটা সব দো*ষ তো তোরই। গতকাল কি কি করেছিলি সব ভুলে গিয়েছিস?”
তেজের এরূপ কথা শোনামাত্র নির্ঝরের গতকাল অনুর সাথে ও ওদের বাসা থেকে বের হওয়ার পর রাস্তায় অপরিচিত দু’টো মেয়ের থেকে হওয়া বে*ইজ্জতির কথা মনে পড়লো। নির্ঝর মুখ ছোট করে বললো……
—”আবারও সেই বে*ইজ্জতির কথা মনে করিয়ে দিলে তুমি ভাই!”
তেজ দাঁতে দাঁত চেপে বললো……
—”আবার যদি কোনো সিনেমাটিক কাহিনী করেছিস এখানে তাহলে তোর মুখের মধ্যে শেয়ালের পা*য়খানা লেপে দিবো।”
নির্ঝর সঙ্গে সঙ্গে ওর মুখ দু’হাতে চেপে ধরলো। তেজ ওর পশ্চাৎদেশের উপর হাত বুলাতে বুলাতে বিরবিরিয়ে বললো…

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৭ (৩)

—”এই খা*টা*শটার সামনে কিছুতেই বলা যাবে না যে, গতকাল ২ নাম্বার সারার জন্য ওকে নিয়ে জ*ঙ্গলের ভিতরে এসেছিলাম ঝোপের আড়ালে বসতেই ইঁদুরে আমার পশ্চাৎদেশে কাঁ*ম*ড়ে দিয়েছিলো যা সা*প কাঁ*ম*ড়েছে ভেবে পেনি*কে পরে অ*জ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম আমি মাত্র ওর ডাকে সেন্স ফিরেছে আমার। নাহলে আমার মান-ইজ্জতের ফালুদা বানাতে নিজ্ঝরিয়া ছাড়বে না।”

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৭ (৫)