চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ২৬
আয়াত বিনতে নূর
ফারিস নিজের ভেতরের অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা আর জমে থাকা অনুভূতিগুলো শক্ত করে চেপে ধরে ফোনটা কানে তুলল। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছিল পরিচিত নাম— আফিয়া চৌধুরী। বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠলেও সে নিজেকে সামলে নিল।
ওপাশ থেকে ভীষণ চিন্তিত কণ্ঠে আফিয়া চৌধুরী প্রায় এক নিশ্বাসে বলে উঠলেন—
“কি রে ফারিস! তোকে বাড়ির সবাই মিলে কতবার কল দিলাম, একটাও রিসিভ করলি না কেন? জানিস আমরা কতটা ভয় পেয়েছি? আর নিশিতা কোথায়? তোরা এখন কোথায় আছিস?”
কথাগুলো বলার সময় তার গলায় উৎকণ্ঠা স্পষ্ট, যেন প্রতিটা শব্দেই মায়ের ভয় আর আশঙ্কা লুকিয়ে আছে।
কিছুক্ষণ থেমে তিনি যেন ফারিসের উত্তর শোনার জন্য নিঃশ্বাস আটকে রাখলেন।
ফারিস জানালার বাইরে তাকাল। অন্ধকার রাস্তার আলো-ছায়া তার চোখে পড়লেও মনটা ছিল অন্য জায়গায়।
সে কণ্ঠটা ইচ্ছাকৃতভাবে শান্ত রাখার চেষ্টা করে উত্তর দিল—
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“কাজে ব্যস্ত ছিলাম আম্মু, তাই কলটা ধরতে দেরি হয়ে গেছে। আর নিশি আমার সাথেই আছে। তুমি অযথা চিন্তা করো না।”
একটু থেমে সে আবার বলল—
“ও ঠিক আছে, নিরাপদেই আছে। এখন ঘুমিয়ে পড়ো। আমি ওকে নিয়ে খুব শিগগিরই বাড়ি ফিরে আসবো।”
মায়ের ভয় দূর করতেই যেন সে আরও স্পষ্ট করে
যোগ করল—
“অন্য কারোর সাথে নয় আম্মু, নিশি পুরোটা সময় আমার সাথেই আছে। তাই এত দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই।”
ওপাশ থেকে আফিয়া চৌধুরীর কণ্ঠ কিছুটা নরম হয়ে এলো, কিন্তু চিন্তার রেশ তখনো কাটেনি—
“আচ্ছা বাবা… তুই যদি বলিস ঠিক আছে, তাহলে আমি আর কিছু বলছি না। তবে তোরা সাবধানে আসিস। রাস্তায় খেয়াল রাখিস।”
ফারিস হালকা স্বরে বলল—
“আচ্ছা আম্মু।”
এরপর ফারিস আর কিছু না বলে কল কেটে দিল। ফোনটা নামিয়ে রাখার পর মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল সে। মায়ের চিন্তিত কণ্ঠ এখনো কানে বাজছে, আর সেই সঙ্গে বুকের ভেতর জমে থাকা অদ্ভুত ভারী অনুভূতিগুলো তাকে আরও নিঃশব্দ করে তুলল।
কল কেটে দেওয়ার পর ফারিস ধীর পায়ে ঘুরে নিশির দিকে এগিয়ে গেল। তার চোখে তখন কোনো কোমলতা নেই, কণ্ঠটাও অস্বাভাবিক রকম গম্ভীর।
নিশি তখনো আগের মতোই দাঁড়িয়ে ছিল, যেন সময় থমকে গেছে।
ফারিস নিচু কিন্তু কঠোর স্বরে বলল—
“তাড়াতাড়ি এসব ছেড়ে অন্য কিছু পড়ে আয়। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকিস না। বের হবো… ফাস্ট।”
তার কথার ভেতরে কোনো প্রশ্ন ছিল না, ছিল শুধু আদেশ।
নিশি এতক্ষণ চুপ করে থাকলেও হঠাৎ ভেতরের জমে থাকা ভয় আর প্রতিবাদ একসাথে ফেটে বের হলো। সে চিৎকার করে উঠল—
“যাবো না আমি আপনার সাথে! কোথাও যাবো না!”
তার গলার স্বর কাঁপছিল, চোখে জমে উঠছিল জেদ আর আতঙ্ক।
ফারিস এক মুহূর্ত থামল। তারপর ধীরে ধীরে পিছন ফিরে নিশির দিকে তাকাল। তার চোখে এবার বিরক্তি আর কঠোরতার ছায়া স্পষ্ট। ঠান্ডা কণ্ঠে বলল—
“ওকে… ফাইন। তাহলে বাড়িতেও যাবি না?”
এক পা এগিয়ে এসে সে আরও কঠিনভাবে যোগ করল—
“আমার কাছেই থাকতে চাস তো? তাহলে ঠিক আছে। আমরা এখানেই থাকবো।”
তার কথাগুলো যেন নিশির ওপর ভারী পাথরের মতো এসে পড়ল। ঘরটার বাতাস মুহূর্তেই আরও গাঢ় হয়ে উঠল, আর নিশি বুঝতে পারল— এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া এতটা সহজ নয়।
নিশি মাথা নিচু করেই খুব ধীরে বলল—
“নাহ… নাহ… আমি বাড়িতেই যাবো।”
একটু থেমে কাঁপা কণ্ঠে আবারও বলল—
“কিন্তু আমি কী পরবো? এখানে তো আমার কোনো জামা-কাপড়ই নেই…”
ফারিসের ভেতরটা তখন অদ্ভুত এক অস্থিরতায় ভরে আছে। মাথার ভেতর চিন্তাগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল, কথাগুলোও ঠিকমতো গুছিয়ে আসছিল না।
তবু নিজেকে শক্ত রেখে সে সংক্ষিপ্তভাবে বলল—
“ক্লজেট খুলে দেখ।”
তারপর গলার স্বর আরও কঠিন করে যোগ করল—
“ওখান থেকে কিছু পরে তাড়াতাড়ি আয়। দশ মিনিটের মধ্যে।”
এই কথাগুলো বলার সময় আজ কেন জানি ফারিস নিজেই বুঝতে পারছিল— সে শান্ত থাকার চেষ্টা করছে, কিন্তু সেই চেষ্টা পুরোপুরি সফল হচ্ছে না। বুকের ভেতর জমে থাকা অজানা অস্থিরতা তাকে ক্রমশ অস্থির করে তুলছে। আর এক মুহূর্তও দাঁড়াতে না পেরে সে আর কিছু না বলে গটগট করে পায়ে হেঁটে রুম থেকে বের হয়ে গেল।
ফারিস বেরিয়ে যেতেই ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নিশি আর বেশি কিছু না ভেবে চুপচাপ ক্লজেটের দিকে এগিয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে দরজাটা খুলতেই সে অবাক হয়ে গেল।
চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল নিশির।
পুরো ক্লজেট ভর্তি থ্রি-পিস, শাড়ি, গাউন, লং টপস, নানা রঙের জামা-কাপড়।
শুধু একটায় নয়— পরপর চারটা ক্লজেট জুড়ে সাজানো অসংখ্য পোশাক। আর পাশের আলাদা একটা অংশে নিখুঁতভাবে সাজিয়ে রাখা গহনা— কানের দুল, চুড়ি, নেকলেস, সবই ঝকঝকে।
মুহূর্তের জন্য নিশি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এত কিছু দেখে মাথার ভেতর হাজার প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল, কিন্তু সে সেসব ভাবনায় নিজেকে জড়াল না।
বেশি বাছাবাছি না করে তাড়াহুড়োতেই সে একটা খয়েরী রঙের সাদামাটা টপস বের করল, সাথে নিল একটা জিন্সের প্যান্ট।
জামা দুটো বুকে চেপে ধরে সে দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ হতেই নিশি গভীর নিশ্বাস ফেলল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল— আজকের এই মুহূর্তগুলো তার জীবনে এক অদ্ভুত, অজানা ছাপ রেখে যাচ্ছে।
ড্রেস বদলে বের হয়ে এসে নিশি আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের লম্বা চুলগুলো আলতো করে জড়ো করে কাকড়া ক্লিপ দিয়ে একটা পরিপাটি খোপা করে নিল। তারপর মাথার উপর হালকা করে উড়না টেনে নিল— যেন নিজেকে একটু আড়াল করা যায়, একটু শক্ত থাকা যায়। বুকের ভেতরটা কেমন অজানা আশঙ্কায় ভারী হয়ে ছিল।
ধীরে ধীরে সে নিচে নামল।
নিচে নেমেই দেখল, ফারিস সোফায় এক পা তুলে বসে আছে। হাতে ফোন, মনোযোগ দিয়ে স্ক্রল করছে। চারপাশে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা, শুধু ফোনের আলো আর ফারিসের গম্ভীর উপস্থিতি।
নিশি কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
ফারিস হঠাৎ চোখ তুলে তাকাল। নিশিকে দেখে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
“এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? থাকার ইচ্ছে থাকলে সোজা করে বল।”
তার কথায় যেন বিরক্তি আর অধৈর্যতা মিশে আছে।
নিশি তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়ল—
“নাহ নাহ… আমি যাবো।”
তার গলাটা ছোট হয়ে এলো, কিন্তু সিদ্ধান্তে সে অনড়।
ফারিস এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল। তারপর যেন হঠাৎ কিছু মনে পড়েছে—
ঠান্ডা স্বরে বলল—
“আর হ্যাঁ… আমাদের বিয়ের কথা এখন কেউ যেন না জানে।”
একটু থেমে আরও বলে উঠে —
“তুই এখনও ছোট। সময় হলে আমি নিজেই সবাইকে সব কিছু বলে দিবো।”
ফারিসের কথাগুলো নিশির কানে ঢুকলেও মনটা অন্যখানে চলে গেল।
সে মনে মনে তিক্ত হাসি হাসল
“আমার বয়েই গেছে বিয়ের কথা বলতে”।
কিন্তু সেই কথাগুলো মুখে আনার সাহস তার হলো না। ফারিস আর কোনো কথা না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। তার পেছনে পেছনে নিশিও চুপচাপ বেরিয়ে এলো। বাইরে রাতের বাতাসটা কেমন ভারী লাগছিল।
ফারিস গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল। নিশি স্বাভাবিকভাবেই ব্যাক সিটে বসতে ডোরের হাতল ধরল।
ঠিক তখনই ফারিস গম্ভীর, আদেশমূলক কণ্ঠে বলল—
“সামনের ফ্রন্ট সিটে এসে বস। ফাস্ট।”
নিশি যেন কথাটা শুনতেই পেল না— ব্যাক সিটের দরজাই খুলতে যাচ্ছিল।
তখন ফারিসের কণ্ঠ আরও ঠান্ডা, আরও হুকুমের মতো হয়ে উঠল—
“আমার কি বাইরে বেরিয়ে তোকে বোঝানো লাগবে?”
এই কথার ভেতরের চাপ আর কঠোরতা নিশিকে মুহূর্তেই থামিয়ে দিল। আর কিছু বলার সাহস তার হলো না। চোখ নামিয়ে চুপচাপ সামনে গিয়ে ফ্রন্ট সিটে বসে পড়ল।
দরজা বন্ধ হতেই ফারিসের কালো মার্সিডিজ ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল। বাগানবাড়িটা ঢাকা শহর থেকে অনেক দূরে। এখান থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে কম করে হলেও দুই ঘণ্টা লাগবে। সেই কারণেই ফারিস আজ একটু বেশি স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছিল। রাস্তায় গাড়ির হেডলাইটের আলো ছুটে চলছিল অন্ধকার ভেদ করে।
ড্রাইভিংয়ের মাঝেই সে মাঝে মাঝে পাশ ফিরে নিশির দিকে তাকাচ্ছিল—
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ২৫
কখনো আয়নার ভেতর দিয়ে, কখনো সরাসরি।
নিশি চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু প্রতিটা দৃষ্টি সে অনুভব করছিল।
গাড়ির ভেতরটা নীরব, অথচ সেই নীরবতার ভেতর জমে ছিল না বলা অনেক কথা, অনেক টানাপোড়েন— যা সামনে গিয়ে আরও গভীর কিছু ঘটনার ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
