চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪০
আয়াত বিনতে নূর
এইদিকে তনয়া সে অন্য রকম একটা মেয়ে। সবসময় হাসিখুশি থাকে, সবাইকে হাসায়, চৌধুরিবাড়িটাকে যেন নিজের প্রাণচাঞ্চল্য দিয়ে মাথায় তুলে রাখে। বাড়ির কোথাও একটু নীরবতা নামলেই তনয়ার হাসি আর কথায় সেটা ভেঙে যায়। সবাই অভ্যস্ত ছিল তাকে এমনই দেখতে।
কিন্তু কেউ জানতো না, এই হাসির আড়ালে গত প্রায় এক বছর ধরে তনয়া নিজের ভেতরে কী ভয়ংকর যুদ্ধ লড়ে যাচ্ছে।
এক বছর ধরে সে একটা ছেলের সঙ্গে রিলেশনশিপে ছিল। বিশ্বাস করেছিল, ভেবেছিল—এই মানুষটা তাকে বুঝবে, সম্মান দেবে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ছেলেটার কথাবার্তা বদলাতে শুরু করল। একদিন হঠাৎ করেই সে এমন কিছু প্রস্তাব দিল, যা তনয়ার আত্মসম্মানে আঘাত করে বসল।
সেই কথাগুলো এখনো তনয়ার কানে বাজে,
“এগুলো তো নরমাল ব্যাপার, তনয়া। এত সিরিয়াস হচ্ছো কেন?”
“না… এগুলো নরমাল না।”
তনয়ার গলা তখন কেঁপে উঠেছিল।
“তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো, তাহলে রাজি হওয়া উচিত।”
“ভালোবাসা মানে কি নিজের সম্মান বিসর্জন দেওয়া?”
সেদিন তনয়া স্পষ্ট না করে দিয়েছিল।
আর ঠিক সেই ‘না’-টাই যেন সব শেষ করে দিয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে ছেলেটা দূরে সরে গেল। ফোন ধরল না, মেসেজের রিপ্লাই আসা বন্ধ হয়ে গেল। একসময় পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
তনয়া নিজের সাথে কথা বলেছিল—
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
এতো সহজেই কি কাউকে ছেড়ে দেওয়া যায়?
এক বছর… একটা বছর কি এমনিই মুছে যায়?
রাতে একা হলে তনয়া ফিসফিস করে নিজেকেই বলত,
“আমি তো ভুল কিছু করিনি… তাহলে শাস্তিটা কেন শুধু আমার?”
বাইরে থেকে মনে হতো, সে স্বাভাবিক। হাসছে, কথা বলছে, সবার খোঁজ নিচ্ছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ভেঙে যাচ্ছিল প্রতিদিন একটু একটু করে।
আজ গাড়ির সামনের সিটে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকা তনয়ার চোখে যে নীরবতা জমে আছে, সেটা আসলে সেই না-বলা কথাগুলোর ভার।
যেটা সে কাউকে বলতে পারেনি কারণ তনয়া জানে, সে শক্ত। সবাই তাকে শক্ত হিসেবেই চেনে।
কিন্তু কেউ কি জানে, শক্ত মানুষগুলোর ভাঙনটাই সবচেয়ে নিঃশব্দ হয়?
নিশিতা আর রিয়া ধীরে ধীরে তনয়ার রুমে ঢুকতেই চারপাশটা অদ্ভুত এক নীরবতায় ভরে উঠল। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তনয়া স্থির হয়ে আছে—চোখ দুটো বাইরের দিগন্তে আটকানো, যেন সেখানে সে কিছু খুঁজছে, কিংবা কিছু রেখে এসেছে। জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়া আলো তার মুখে পড়লেও সেই আলো তাকে বর্তমানের সঙ্গে বেঁধে রাখতে পারছে না।
নিশিতা আর রিয়া যে তার রুমে এসেছে, সে বিষয়ে তনয়ার কোনো ধারণাই নেই। তাদের উপস্থিতি, পায়ের শব্দ—কিছুই যেন তার কানে পৌঁছায় না। মনে হয়, সে এই ঘরে নয়, এই সময়ে নয়; বরং নিজের ভেতরের কোনো অজানা জগতে হারিয়ে আছে। দিন-দুনিয়ার সব ব্যস্ততা, সব বাস্তবতা তার কাছ থেকে বহু দূরে সরে গেছে—এখন সে কেবল একা, নিঃশব্দ, আর গভীর কোনো ভাবনার ভেতর বন্দী।
নিশিতা ভালো করে তাকাতেই বুকের ভেতরটা কেমন জানি মোচড় দিয়ে উঠল। তনয়ার চেহারাটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, যেন জীবনের রঙগুলো ধীরে ধীরে মলিন হয়ে পড়েছে। চোখের নিচে জমে থাকা কালচে ছাপ স্পষ্ট বলে দিচ্ছে—কয়েক রাত ধরে ঘুম তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কালো ক্লিপ দিয়ে চুলগুলো কোনোমতে বাঁধা, কিন্তু দেখলেই বোঝা যায় বহুদিন চিরুনির ছোঁয়া পায়নি; অবহেলা যেন চুলের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে আছে।
এই দৃশ্যটা নিশিতার চোখে সহ্য হলো না। বুকের ভেতর অজানা এক কষ্ট হাহাকার করে উঠল। এই তনয়াকে দেখে তার বারবার মনে পড়তে লাগল আগের সেই মেয়েটার কথা যে ছিল হাসি-খুশি, প্রাণচঞ্চল, সবার সঙ্গে হাসতে হাসতে কথা বলতো, যার উপস্থিতিতে চারপাশটা আপনাতেই উজ্জ্বল হয়ে উঠত।
নিশিতার মনে প্রশ্ন জাগলো এটা কি সত্যিই সেই তনয়া? নাকি সময় আর যন্ত্রণার চাপে সে ধীরে ধীরে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছে?এখন এমন অবস্থায় কেন সে? দেখে তো একেবারেই মনে হচ্ছে না নিজের প্রতি কোনো যত্ন আছে তার। মুখে জমে থাকা বিরক্তি আর ক্লান্তির ছাপটা এতটাই স্পষ্ট যে লুকানোর কোনো চেষ্টাই যেন করেনি। নিশিতার মনে হতে লাগল—তনয়ার নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। নাহলে এমন হাসি-খুশি, প্রাণোচ্ছল একটা মেয়ে এভাবে মন খারাপ করে নিজেকে ঘরের ভেতর বন্দী করে রাখবে কেন?
ভাবনাগুলো মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে খেতেই নিশিতা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল তনয়ার দিকে। রিয়াও তার পেছন পেছন গেল। রিয়ার কাছেও পুরো ব্যাপারটা একদম স্বাভাবিক লাগছে না। তনয়াকে বরাবরই সবাই হাসি-খুশি দেখেছে; তার এই হঠাৎ বদলে যাওয়াটা রিয়ার মনেও অদ্ভুত এক ঝড় তুলে দিল। নিশিতা কাছে গিয়ে আলতো করে তনয়ার কাঁধে হাত রাখল।
হঠাৎ সেই স্পর্শে তনয়া একটু কেঁপে উঠল—যেন বহুক্ষণ পর বাস্তবের ছোঁয়া তাকে নিজের ভেতরের অন্ধকার ভাবনার জগৎ থেকে টেনে বের করে আনলো।পিছনে তাকাতেই তনয়া নিশিতা আর রিয়াকে দেখে একটু চমকে উঠল, তারপর দ্রুত নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে বলল,
“আরে! তোরা এখানে? আমার রুমে?”
একটু থেমে,
“কিছু হয়েছে নাকি?”
কথাগুলো স্বাভাবিক শোনানোর চেষ্টা থাকলেও তার কণ্ঠের ভেতর লুকিয়ে থাকা ভাঙা সুরটা নিশিতা আর রিয়ার চোখ এড়ালো না। সেই কণ্ঠে এমন একটা দুর্বলতা ছিল, যা চাইলেও আড়াল করা যায় না। নিশিতা নিজের কণ্ঠটাকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে বলল,
“কি হয়েছে তোমার, আপু?”
এই প্রশ্নটা শুনে তনয়ার ভেতরে যেন এক মুহূর্তের জন্য নিজের অস্তিত্বের অনুভূতি ফিরে এলো। তবুও সে নিজেকে শক্ত করে নিয়ে হালকা হাসির আড়ালে বলল,
“আরে আমার আবার কি হবে? আমি তো ঠিকই আছি।”
এরপর নিশিতা আর রিয়ার কাছ থেকে একটু সরে গিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“তোদের কিছু লাগবে? লাগলে আমাকে বল।”
নিশিতা স্থির দৃষ্টিতে তনয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। আর চুপ থাকতে পারল না। গলায় মিশে থাকা উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে উঠল,
“সত্যি তুমি ঠিক আছো, আপু? এভাবে না খেয়ে থাকছো… এভাবে চললে তো অসুস্থ হয়ে পড়বে।তোমার চোখের নিচে কালি পড়েছে, মুখটা ফ্যাকাসে লাগছে। তারপরও তুমি বলছো তুমি ঠিক আছো?”
নিশিতার কথাগুলো যেন তনয়ার বানানো শক্ত দেয়ালে একের পর এক আঘাত করছিল।তনয়া কোনো কথা বলল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, চোখ দুটো যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। তার এই নীরবতা দেখে রিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না। গলার ভেতর জমে থাকা উদ্বেগ নিয়ে বলল,
“সত্যি করে বলো তো, আপু… কি হয়েছে তোমার? তোমাকে দেখলেই বোঝা যাচ্ছে তুমি ঠিক নেই। তারপর আবার ছোট আম্মু কখন খাবার দিয়ে গেছে, তুমি সেটাও খাওনি। এভাবে মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”
রিয়ার কথায় তনয়ার ঠোঁটে একটু হাসি ফুটল। কিন্তু সেই হাসিটা সাধারণ কোনো হাসি নয় ওটা কষ্ট লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা, চোখের কোণে জমে থাকা অব্যক্ত যন্ত্রণার আড়াল। একটু থেমে সে বলল,
“আরে পাগলী, আমি ঠিক আছি। আসলে কিছুদিন ধরে পড়াশোনা নিয়ে একটু চিন্তায় ছিলাম, তাই এমন লাগছে। আর আমি একটু পরেই খাবার খেতে নিতাম। তোদের এত চিন্তা করার কিছু নেই।”
তারপর কথার মোড় ঘোরাতে চেয়ে তনয়া বলল,
“আচ্ছা, এখন বল তোরা কেন এসেছিস? এমনি এমনি তোরা দু’জন আমার রুমে আসিসনি, সেটা আমি ভালোই জানি।”
নিশিতা তনয়ার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
“বলবো, আপু। কিন্তু তার আগে তুমি একটু খেয়ে নাও।”
এই বলে নিশিতা তনয়াকে আলতো করে ধরে বেডে বসালো। তারপর টেবিলের ওপর রাখা খাবারের প্লেটটা তুলে তনয়ার হাতে দিয়ে বলল,
“আগে খেয়ে নাও। তারপর সব কথা হবে।”
তনয়া খেতে চাইছিল না। কিন্তু নিশিতা আর রিয়ার লাগাতার জোরাজোরিতে শেষমেশ একটু খাবার মুখে দিল। তবুও কেন জানি খাবারটা তার গলা দিয়ে নামতে চাইছিল না। গলা শুকিয়ে আসছিল, বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠছিল। চোখের কোণে জল জমে ছলছল করতে লাগল। অনেক কষ্টে, নিজের অনুভূতিগুলো শক্ত করে চেপে ধরে সে খাবারটা গিলল। অল্প কিছু খেয়ে প্লেটটা পাশে রেখে তনয়া ধীর গলায় বলল,
“এবার বল তো, কি বলবি?”
নিশিতা এসে তনয়ার পাশে বসে নরম স্বরে বলল,
“আপু, আজকে তো তালুকদার বাড়িতে আমাদের বাড়ির সবাই যাচ্ছে। ওখানে পার্টি আছে। তুমিও চলো না, প্লিজ। আমরা আমি, রিয়া আর অহনা—শপিংয়ে যাবো। তুমিও চলো না, প্লিজ প্লিজ।”
নিশিতার কথা শুনে তনয়া মনে মনে ভাবল—তাহলে সকালবেলা আম্মু যে পার্টির কথা বলছিল, সেটাই।
সে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,
“দেখ তোরা যা। আমার শরীরটা ভালো না, আমি একটু রেস্ট নেই। তোরা ঘুরে আয়।”
কিন্তু কথাটা শেষ হতেই রিয়া আর অহনা একসাথে বলে উঠল,
“না না, আপু। তোমাকে যেতেই হবে।”
শেষমেশ রিয়া আর নিশিতার জোরাজুরিতে তনয়া হাল ছেড়ে দিয়ে বলল,
“আচ্ছা, আচ্ছা… আমি যাবো।”
“তাহলে কখন যাবি?”
রিয়া প্রায় লাফাতে লাফাতে প্রশ্ন করল। খুশিতে লাফিয়ে উঠে রিয়া বলল,
“এখনই! চল নিশি, আমরা গিয়ে রেডি হই। আপু, তুমিও রেডি হয়ে নাও।”
এই বলে সে নিশিতার হাত ধরে টানতে টানতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। নিশিতা হেসে রিয়াকে বলল,
“যা, গিয়ে রেডি হয়ে নে। আমিও রেডি হয়ে নিচ্ছি। আর অহনাকে একটা কল করতে হবে, এখনও তো আসেনি।”
এই কথা বলেই নিশিতা আর রিয়া যে যার রুমে রেডি হতে চলে গেল।
এদিকে অহনা কখন যে রেডি হয়ে বেরিয়ে এসেছে, কেউ খেয়ালই করেনি। আজ সে পরেছে হালকা গোলাপি টপ, তার সঙ্গে প্লাজু কাট জিন্সের প্যান্ট। মাথায় পরিপাটি করে বাঁধা হিজাবটা তাকে আরও শান্ত, স্নিগ্ধ করে তুলেছে। সত্যি বলতে, বের হওয়ার কোনো ইচ্ছে তার ছিল না। কিন্তু নিশিতা আর রিয়ার এত অনুরোধ বরং বলা যায় জোরাজোরির কাছে শেষমেশ হার মানতে হয়েছে। তার ওপর সামনে পরীক্ষা। পড়াশোনার চাপ, ভেতরের অজানা দুশ্চিন্তা সব মিলিয়ে অহনার মনটা বেশ অস্থির। হাসি মুখে নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করলেও চিন্তার ছায়া চোখের গভীরেই লুকিয়ে আছে। রিকশাটা ধীরে ধীরে এগোতে এগোতে শেষমেশ এসে থামল চৌধুরী ভিলার সামনে। বিশাল ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে যেন মুহূর্তের জন্য সময়টা থমকে গেল ভেতরে কী অপেক্ষা করছে, তা কেউই ঠিক জানে না।
অহনা একবার থমকে দাঁড়িয়ে বাড়িটার দিকে তাকাল। সত্যিই, বাড়িটা অসম্ভব সুন্দর কোথাও কোনো খুঁত চোখে পড়ার মতো নয়। বিশাল আয়তন আর পরিপাটি আলিশান গড়নটা এক নজরেই চোখ জুড়িয়ে দেয়। এমন একটা বাড়িতে সে ঠিক কত বছর পর পা রাখতে যাচ্ছে, সেটা মনে করতে গিয়েও অহনার মনে পড়ল না। ধীরে ধীরে রিকশা থেকে নামল সে। বুকের ভেতরটা অজানা এক অনুভূতিতে ভারী হয়ে উঠল। তারপর রিকশাওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে চৌধুরী ভিলার সামনে এগিয়ে গেল।
এসময় সিকিউরিটি এগিয়ে এলো তাকে দেখে। অহনা তার দিকে তাকাতেই সিকিউরিটি ভদ্র কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি অহনা ম্যাডাম, না?”
অহনা হালকা মাথা নেড়ে উত্তর দিল,
“জি… আমি অহনা।”
সিকিউরিটি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“আচ্ছা, আপনি ভেতরে যান ম্যাডাম। নিশিতা ম্যাডাম আপনার কথা বলে রেখেছিলেন।”
অহনা আর কিছু না বলে মাথা নেড়ে ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল চৌধুরী ভিলার বিশাল ফটক পেরিয়ে।ভিতরে ঢুকেই অহনা থমকে গেল। চোখের সামনে ছড়িয়ে থাকা বিশাল বাগানটা যেন এক আলাদা জগত। চারপাশে কত রকমের গাছগাছালি, আর তার মাঝখানে পানির ফোয়ারা—স্বচ্ছ জলের ছিটে ছিটে শব্দে জায়গাটা আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তবে এত সৌন্দর্যের মাঝেও অহনা বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল না। কারও দৃষ্টি আকর্ষণ না করে সোজা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
বাড়ির ভেতরে পা রেখেই সে মুগ্ধ হয়ে গেল। বাইরে থেকে যতটা সুন্দর মনে হয়েছিল, ভেতরটা তার চেয়েও বেশি আলিশান—পরিপাটি সাজানো, রুচিশীল আসবাব, আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা এক ধরনের আভিজাত্য।
এই সময় ড্রয়িংরুমে আফিয়া চৌধুরীর চোখে পড়ল অহনাকে। মেয়েটাকে দেখে তার কেমন যেন চেনা চেনা লাগল, কিন্তু ঠিক মনে করতে পারলেন না। কৌতূহল নিয়ে তিনি অহনার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন,
“তুমি…?”
কথা শেষ হওয়ার আগেই অহনা ভদ্রভাবে বলে উঠল,
“আন্টি, আমি অহনা।”
নামটা শুনেই আফিয়া চৌধুরীর মুখে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। তিনি স্নেহভরে অহনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“এত বড় হয়ে গেলে আম্মু? তা আমাদের বাসায় আসো না কেন? কত বছর পর যে আসলে! সেই ছোট্ট ছিলে তখন দেখেছিলাম, আর আজ…!”
অহনা লাজুক হেসে বলল,
“আসলে আন্টি, নিশিতা আর রিয়া আমাকে কল করে নিয়ে এসেছে। আমি তো আসতেই চাইনি, সামনেই পরীক্ষা আবার। তাই সবকিছু নিয়েই একটু চিন্তায় আছি।”
আফিয়া চৌধুরী হেসে সান্ত্বনার সুরে বললেন,
“এত চিন্তা করিস না মা। সব ঠিক হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা আছেন না? একটু মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে আসবি। একদমই তো আসিস না। একটু ঘোরাঘুরি করলে মনও ভালো থাকে।”
অহনা মাথা নেড়ে বলল,
“জি আচ্ছা, আন্টি। কিন্তু নিশিতা কোথায়?”
আফিয়া চৌধুরী হেসে বললেন,
“উপরে যা। ওরা ওদের রুমেই আছে। করিডরের সামনের দিকের পাশের রুমটাই নিশির।”
অহনা আর কথা বাড়াল না। মাথা নেড়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল উপরের তলায়, যেখানে তার অপেক্ষায় আছে পরিচিত মুখগুলো। আফিয়া চৌধুরী মেডকে ডেকে বললেন নাস্তা বানাতে এবং তা নিশিতার রুমে পৌঁছে দিতে। এরপর নিজেই চলে গেলেন তার রুমে, যেন সব কিছু সুশৃঙ্খলভাবে চলুক।
অহনা উপরে উঠে নিশিতার রুমের দরজা খুলল। ভিতরে ঢুকেই দেখল নিশিতা হিজাব বাঁধছে। মুখে হালকা অবাক ভাব, আওয়াজ কনট্রোল করে অহনা বলল,
“কি রে, নিশি? আমাকে এভাবে আসতে বললি কেনো? আর যাবিটা কোথায়? বলতো না…”
কথার শেষ হওয়ার আগেই নিশিতা হাসিমুখে
অহনাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আমি জানতাম তুই আসবি। আর যাবো কোথায়? তোকে তো বলেছি। এবার আবার জিজ্ঞেস করছিস কেনো, হ্যা? আর হ্যাঁ, নিচে কাউকে কিছু বলিস নি তো?”
অহনা হেসে বলল,
“আচ্ছা, আচ্ছা, হয়েছে। আমি কাউকে কিছু বলিনি। কিন্তু রিয়া কোথায়?”
নিশিতা অহনাকে ছেড়ে দিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে বলল,
“ও রিয়া ওর রুমে রেডি হচ্ছে। তুই বস, একটু পরেই বের হবো।”
নিশিতা আজকে গাঢ় নীল রঙের গাউন জামা পরে, সঙ্গে সাদা চুরিদার পায়জামা আর হালকা রঙের হিজাব। ফর্সা ত্বকের ওপর গাঢ় নীল রঙটা আরও ফুটে উঠেছে। অহনা এক নজরে তাকিয়ে বলল,
“তোকে তো একদম নীল পরী লাগছে রে নিশু! এতো সুন্দর কেন?”
নিশিতা কিছু বলার আগেই মেড দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
“মেম, আসবো?”
নিশিতা হাসি দিয়ে বলল,
“হুম, এসো। আর কতোবার বলেছি আমাকে ম্যাম বলবি না। আপু বা নাম ধরে ডাকলে।”
মেড কোনো কথা না বলে নাস্তা অহনার সামনে রেখে চলে গেল। অহনা একটু খানি খাবার মুখে দিল। নিশিতা তখন আরও ধীরে ধীরে রেডি হয়ে নিল। চোখে কাজল দিয়ে, ঠোঁটে স্ট্রবেরি ফ্লেভারের লিপগ্লস লাগিয়ে বলল,
“ব্যাস, হয়ে গেছে, আমি রেডি। তুই তাড়াতাড়ি নাস্তা খেয়ো, আমি রিয়া আর তনয়া আপুকে ডেকে আনি।”
অহনা একটু খানি নাস্তা খেয়ে আবার মুখে হাসি ফোটাল। ঘরটা তখন এক অদ্ভুত আনন্দ আর উত্তেজনায় ভরে উঠল আজকের দিনের অপেক্ষা আর পরিকল্পনা যেন সব একসাথে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
এর মাঝে রিয়া রেডি হয়ে উঠে উপরের দিকে এসে ঢুকল। অহনাকে দেখে চোখ বড় করে বলল,
“কি রে, অহনা! তুই কখন আসলি? আমাকে একবার বললিও না? তোরা দু’জন মিলে গল্প করছিস, আমাকে বাদ দিয়ে?”
নিশিতা হেসে উত্তর দিল,
“আরে গাধী নারে! একটু আগেই এসেছে অহনা। আর তুই তো রেডি হচ্ছিলি, তাই তোকে ডাকিনি। এবার বক বক করে আমার মাথায় খাস না তো।”
রিয়া আর কিছু বলল না। শুধু নিশিতার দিকে তাকিয়ে রইল। নিশিতা রিয়ার এভাবে তাকানো দেখে কৌতূহলভরে জিজ্ঞেস করল,
“কি হলো? এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো? প্রথমবার দেখছিস নাকি আমাকে?”
রিয়া লাজুকভাবে বলল,
“নারে… তোকে খুব সুন্দর লাগছে নিশি। একদম অন্য রকম।”
নিশিতা লজ্জা পেয়ে হেসে বলল,
“আচ্ছা, আচ্ছা, হয়েছে। চল, এবার নাহলে দেরি হয়ে যাবে। ১২ টা বেজে গেছে এমনিই। তনয়া আপুকে ডেকে আনি, চল।”
অহনা উদ্দীপনায় বলল,
“দাড়া, আমিও যাচ্ছি তোদের সাথে।”
তাকে আসতে দেখে রিয়া সতর্কভাবে বলল,
“তুই তো কিছুই খাইনি অহনা। একটু কিছু তো খা।”
অহনা হেসে বলল,
“আরে, খেয়েছি। আর খেতে ইচ্ছে করছে না।”
নিশিতা বলল,
“আচ্ছা… চল, আপুকে নিয়ে বের হই। ওহ্! দারা, আমার ব্যাগটা নিয়ে আস।”
রিয়া তৎক্ষণাত জিজ্ঞেস করল,
“শপিং তো করবে যাবো, কিন্তু টাকা???”
নিশিতা চিন্তিত হয়ে কিছুক্ষণ থমকে রইল। সত্যিই তো, টাকা আছে, কিন্তু শপিং করার মতো টাকা যেন কম। হঠাৎ করেই তার মনে একটা উপায় এলো।
“দারা… টাকা আছে,”
বলল নিশিতা, ক্লজেট খুলে একটি ক্রেডিট কার্ড বের করে নিজের ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল।
অহনা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ওটা কি?”
নিশিতা হেসে বলল,
“ক্রেডিট কার্ড।”
রিয়া কৌতূহলভরে জিজ্ঞেস করল,
“ওটা কার?”
নিশিতা ঢং করে উত্তর দিল,
“আমার। এবার চল, নাহলে সত্যি দেরি হয়ে যাবে।”
সত্যিই, ক্রেডিট কার্ডটা ফারিস কিছুদিন আগে নিশিতাকে দিয়েছিল। জানো, নিশিতা চাইলে কারও কাছে কিছু চাইতে হয় না—নিজের মতোই খরচ করতে পারে। গত ৭ বছর ধরে প্রতি মাসে বড় একটি এমাউন্ট ক্রেডিট কার্ডে জমা হচ্ছে। ফারিস কখনো সেই টাকায় হাত দেয়নি—সবকিছু শুধু নিশিতার নিজের জন্য।
নিশিতা, রিয়া আর অহনা রুম থেকে বেরিয়ে আসতেই দেখলো তনয়া ওদের দিকে এগোচ্ছে, পুরোপুরি রেডি হয়ে। তনয়া অহনার কাছে এসে হেসে বলল,
“আরে, অহনা না? এতোদিন পর আসলে আমাদের বাসায়? হুঁ??? মাঝে মাঝে তো আসতে হয় না?”
অহনা হেসে উত্তর দিল,
“আসিই তো, আপু। তুমি কেমন আছো?”
তনয়া মুচকি হেসে বলল,
“এই তো, আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি?”
“আলহামদুলিল্লাহ, ভালো।”
উত্তর দিল অহনা।
“পড়াশোনা কেমন চলছে?”
তনয়া জিজ্ঞেস করল।
“জি, আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”
অহনার কথায় তনয়ার মনটা আরও হালকা হয়ে গেল। সবাইকে দেখে শান্তি ফিরে এলো। মুহূর্তের জন্য মনে হলো, মনটা অনেক হালকা।
নিশিতা চমৎকারভাবে বলল,
“আচ্ছা আপু, বাকি কথা গাড়িতে গিয়ে বলো। এখন চলো। নাহলে শপিং করে বাড়ি ফিরে আসতে সময় হবে না। চল, তাড়াতাড়ি।”
তনয়া হেসে মাথা নেড়ে সায় দিল।নিশিতা, অহনা, রিয়া আর তনয়া সবাই মিলে নিচে নামলো। ড্রয়িং রুম ফাঁকা দেখে তনয়া জোরে একটা নিশ্বাস ছাড়ল। তারপর সবাই বাড়ির বাইরে যাওয়ার জন্য এগিয়ে গেল।
মাঝে মাঝে হাঁটার শব্দ শুনে নিশিতা কণ্ঠ তুলল,
“আরে, তোমরা জুতা খুলে হাঁটো। নাহলে কেউ পরে আসবে, আর শপিং এ যাওয়া হবে না আমাদের।”
নিশিতার কথায় সবাই জুতা খুলল। তারপর গুটি গুটি পায়ে তারা ধীরে ধীরে বাড়ির বাইরে বের হলো। বাইরে বেরিয়ে রিয়া আর নিশিতা যেন কোনো বিশ্ব জয় করার হাসি দিতে লাগল। নিশিতা চিৎকার করে বলল,
“এবার চলো! পুরো শপিং মল আমরা নেবো!”
তারপর রাজুর দিকে তাকিয়ে বলল,
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৯
“আঙ্কেল, গাড়ি বের করো। শপিং এ যাবো। তাড়াতাড়ি চলো, নাহলে দেরি হয়ে যাবে।”
রাজু কিছু না বলে চুপচাপ গাড়ি নিয়ে গ্যারেজ রুম থেকে বের করল। নিশিতা জানতো, পুরাতন ঢাকা থেকে মল পর্যন্ত খানিকটা রাস্তা যেতে হবে। তাই সবাই দ্রুত গাড়িতে উঠে বসলো। সামনের সিটে বসল তনয়া, আর পিছনে রিয়া, নিশিতা আর অহনা একসাথে বসলো। গাড়ি রওনা হলো।
