Home চোখের আড়ালে ভালোবাসি চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৫ (২)

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৫ (২)

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৫ (২)
আয়াত বিনতে নূর

ওয়াশরুমের দরজা খুলে বের হতেই ফারিস থেমে গেল এক পা।রুমের হালকা ডিম আলোয় বিছানার ধারে বসে আছে নিশিতা হাতে তার ফোন। ভেজা চুল কাঁধে ছড়িয়ে, চোখে ধরা পড়ে যাওয়া বিস্ময় আর অস্বস্তি মুখটা অদ্ভুত কোমল দেখাচ্ছে।
এক সেকেন্ডের জন্য বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল তার।
কিন্তু মুখ? স্বাভাবিক। কঠিন। নিরাবেগ।
নিশিতা ফারিসকে দেখেই তড়িঘড়ি করে ফোনটা বিছানায় রেখে দিল। সেই তাড়াহুড়োটা ফারিসের চোখ এড়ালো না। চোখের কোণে যেন খুব সূক্ষ্ম এক রেখা নড়ল ওটা হাসি কি না বোঝার উপায় নেই। নিশিতা চোখ নামিয়ে নিল।
ফারিস টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

“এতো রাতে আমার রুমে তুই? ব্যাপার কী?”
কণ্ঠে কোনো রাগ নেই, আবার মায়াও নেই শুধু সোজা প্রশ্ন।নিশিতা গলায় আটকে যাওয়া স্বর সামলে বলল,
“না মানে এমনিই এসেছিলাম আরকি ”
দুই সেকেন্ড চুপ থেকে হঠাৎ সরাসরি তাকাল,
“আর আপনার ফোনে আমার এতো গুলো ছবি কোথা থেকে আসলো?”
ফারিস কোনো তাড়াহুড়ো দেখাল না। যেন প্রশ্নটা সে আগেই অনুমান করেছিল। ক্লজেট খুলে ভেতর থেকে টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করতে বের করতে শান্ত স্বরে বলল,
“সব কথা বলার জন্য না।”
একটা ছোট, ঠান্ডা, বন্ধ দরজার মতো উত্তর।
নিশিতা থমকে গেল। কী বলবে বুঝতে পারল না। এতগুলো অনুভূতি, এতগুলো প্রশ্ন এক কথায় আটকে গেল।সে আবার মুখ খুলতে যাচ্ছিল

“আমি আসলে। ”
ফারিস ঘুরেও তাকাল না। শুধু বলল,
“আমি অতিরিক্ত কথা পছন্দ করি না।”
সুর উঁচু না। তবু স্পষ্ট সীমা টেনে দেওয়া।
কথাটা সরাসরি এসে লাগল নিশিতার মনে। বুকের ভেতরটা কেমন খচ করে উঠল। সে চুপ করে গেল। যে কথাটা বলতে চেয়েছিল আর বলা হলো না।
কিন্তু ঠিক তখনই তার মাথায় হালকা এক দুষ্টুমি বুদ্ধি খেলে গেল। চোখের কোণে অচেনা ঝিলিক এল।চুপচাপ বসে থাকা মেয়েটার ভেতরে যেন হঠাৎ একটু ঝড় উঠল।
ফারিসের একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দুজনের মাঝের দূরত্বটা হঠাৎ খুব ছোট হয়ে গেল। নিশিতা পায়ের পাতার উপর ভর দিয়ে একটু উঁচু হয়ে দাঁড়াল, দুটো হাত তুলে তার গলা জড়িয়ে ধরল। আচমকা স্পর্শে ফারিসের শরীর টের পেল সে কাছে এসেছে, খুব কাছে। ফারিস পিছনে ফিরতেই চোখে পড়ল নিশিতার দুষ্টুমি ভরা চোখদুটো।
নিশিতা নরম, খেলাচ্ছলে সুরে বলল,

“আমাকে আবার আগের মতো একটু ছুঁয়ে দিবেন কি?”
ফারিস কোনো তাড়াহুড়ো করল না। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল নিশিতার মুখে। সেই দৃষ্টিতে প্রশ্ন আছে, সতর্কতা আছে আর চাপা আগুনও আছে। তবু কণ্ঠ শান্ত,
“কি ব্যাপার? হঠাৎ তুই এমন করছিস কেন? কিছু খেয়েছিস?”
নিশিতা উত্তর না দিয়ে আলতো করে তার গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। নিশিতা ফারিসের গালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলল “ওম ” আর একটাও কথা না?
চলুন”।
ফারিসের ঠোঁট আবারও এক সূক্ষ্ণ হাসি ফুটে উঠলো। নিশিতার দিকে শান্ত কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

” চল এইবার তোকে আমার গভীরে নিয়ে যাই,
যেখানে শুধু” আমি আর তুই থাকবি”।
“No one’s coming here I’ll feel you more and more, from deep within.” “The flavor is magical. Let’s lose ourselves in it,
together.”
তারপর একটু ঝুঁকে ধীরে,
“আগুনের কাছে এভাবে দাঁড়ালে গরমটা লাগবেই।”
কথার ভেতর ইঙ্গিত ছিল, টান ছিল কিন্তু নিয়ন্ত্রণও ছিল। হঠাৎই নিশিতার বুক ধড়ফড় করে উঠল। নিজের দুষ্টুমির মাত্রাটা বুঝতে পারল সে। তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল,
“না… না… আমি যাই। অনেক রাত হয়েছে…”
ঘুরে বের হয়ে যেতে যাবে ঠিক তখনই ফারিস এক ঝটকায় তার কবজি ধরে টেনে নিল কাছে। আর পরের সেকেন্ডেই তাকে কোলে তুলে নিল অনায়াসে। নিশিতা বিস্ময়ে শ্বাস আটকে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।ফারিস শান্ত গলায় বলল,

“এখন পালানোর সুযোগ নেই। অর্ধেক কথা, অর্ধেক স্পর্শ আমি পছন্দ করি না।”
নিশিতাকে খাটের উপর ফেললেও ফারিস আর এক ইঞ্চিও এগোল না। দুহাত বিছানার দুপাশে রেখে ঝুঁকে থাকল কিন্তু স্পর্শ করল না। তাদের মাঝে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরত্ব। নিশিতার দ্রুত ওঠানামা করা বুক, কাঁপা শ্বাস সবই টের পাচ্ছে সে। চোখে সেই তীব্র দৃষ্টি কিন্তু নিয়ন্ত্রণও ঠিক ততটাই শক্ত। ফারিস নিচু, ভারী স্বরে বলল,
“আগুন নিয়ে খেলতে নেই, নিশিতা। জ্বালানোর আগে এটা মনে রাখা উচিত ছিল তোর, জান।”
নিশিতার চোখ ভিজে উঠেছে। কাঁপা গলায় বলল,

“ছাড়ুন আমি মজা করছিলাম। ”
ফারিসের দৃষ্টি নরম হলো একচুল। তবু সরে গেল না।
“কিন্তু আই অ্যাম সিরিয়াস, হার্টবিট।”
কথাটা বললেও তার কণ্ঠে হিংস্রতা নেই বরং গভীর, দমিয়ে রাখা আবেগ। কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। শুধু দুজনের শ্বাসের শব্দ। নিশিতা ফারিসের দিকে তাকালো। ফারিস চোখে তৃষ্ণা নিশিতাকে নিজের করে পাওয়ার।
ধীরে ধীরে নিশিতা কাছে গেলো। নিশিতা উপর নিজের শরীরের সমস্ত ভর নিশিতার উপর চাপিয়ে দিলো তারপর নেশা মাখা কন্ঠে বলল,

“চল আবারও সেই দিনের মতো ছুয়ে দি তোকে। যেখানে তোর শীরের প্রত্যেকটা কোনে কোনে আমার স্পর্শ থাকবে। আমার দেওয়া ভালোবাসার দাগ থাকবে। আমি নামক মানুষ তোর মধ্যে থাকবে। ”
এই বলে নিশিতার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো। শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো নিশিতার ঠোঁট। নিশিতার জানো শ্বাস আঁটকে মারা যাবে এবার নিশ্বাস নেওয়ার কোনো সুযোগ ওব্দি নেই। নিশিতা বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরলো হাত দিয়ে। ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকলো। কিছুক্ষণ পর ফারিস নিজেই নিশিতাকে ছেড়ে দিলো।
নিশিতার ঠোঁট ফুলে গেছে। হালকা হালকা রক্ত জমেছে। ফারিস নিশিতার দিকে তাকিয়ে বলল,

” এতোটুকুতেই হাঁপিয়ে উঠলি জান? কিন্তু এই খেলা তো তুই শুরু করেছিস শেষটা আমিই করবো।”
নিশিতা কিছু বলতে পারলো না শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল।ফারিস নিশিতা গলায় মুখ গুঁজে দিলো। মুহূর্তটা ভারী হয়ে আছে অদ্ভুত টানটান অনুভূতিতে। ফারিস তার খুব কাছে ঝুঁকে এলো, কপাল ছুঁয়ে রইল তার গলার পাশে। শ্বাসের উষ্ণতা লেগে গেল ত্বকে। সে গলায় মুখ গুঁজে নরম, থেমে থেমে চুমু রাখতে লাগল কিন্তু আচমকাই থেমে গেল। যেন নিজের ভেতরের ঝড়টা টের পেল। দাঁত বসানোর মতো তীব্রতা এসে আবার মিলিয়ে গেল নিয়ন্ত্রণে। ফারিস একের পর এক চুমু ভরিয়ে দিলো গ্রীবাদেশ। ফারিসের ঠোঁট আরও নিচে নামলো নামতে নামতে বক্ষে গিয়ে আটকালো মুখ ডুবিয়ে দিলো নিশিতার বক্ষে।
নিশিতার পুরো শরীরে ছেয়ে গেলো এক অজানা অনুভূতি যা সুখের ও। চুমুতে ভরিয়ে দিলো বক্ষে আর নিশিতা গলা কাটা মুরগীর মতো ছটফট করতে লাগলো।
ফারিস জানো এতেও ক্ষেন্ত হলো না। ফারিসের আঙুল যখন নিশিতার ড্রেসের বোতামের দিকে এগোতে লাগল, ঠিক তখনই নিশিতা তার কবজি দুহাতে চেপে ধরল। কাঁপা শ্বাস, ভেজা চোখ—কিন্তু এবার দৃষ্টিতে স্পষ্ট অনুরোধ।

“প্লিজ থামুন।”
শব্দটা খুব আস্তে, তবু পরিষ্কার।
মুহূর্তেই ফারিস থেমে গেল। যেন হঠাৎ ঘোর কেটে গেছে। তার দৃষ্টি নেমে এল নিশিতার চোখেসেখানে ভয়, অস্বস্তি আর বিশ্বাস একসাথে মিশে আছে।
চোয়াল শক্ত, কিন্তু কণ্ঠ নিয়ন্ত্রিত,
“সরি হানি সহ্য করে নে না।”
এইবলে একপ্রকার ঝাপিয়ে পড়ে নিশিতার নরম শরীরের উপর। ঘরটা তখন নিঃশব্দ, ভারী শ্বাস আর থেমে থেমে কাঁপা অনুভূতিতে ভরা। আবেগের ঝড় দুজনকেই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে নিজের মতো করে। ফারিসের ভেতরের দমিয়ে রাখা ভালোবাসা, অধিকার আর উন্মাদ টান—সব একসাথে বেরিয়ে এসেছে।
আর নিশিতা ভয়, লজ্জা, টান আর অদ্ভুত এক নিরাপত্তার মিশ্র অনুভূতিতে কাঁপছে। একসময় সব তীব্রতা ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো। ফারিস থামল। যেন হঠাৎ নিজের শ্বাসের শব্দই শুনতে পেল। তার চোখে আগের আগুন নেই বরং গভীর ক্লান্তি আর অদ্ভুত শান্তি।

সে ধীরে নিশিতাকে নিজের কাছে টেনে নিল, শক্ত করে না রক্ষার মতো করে। নিশিতা লম্বা এক নিঃশ্বাস ছাড়ল যেন অনেকক্ষণ পর বুক ভরে বাতাস নিল। ফারিস মাথা নামিয়ে তার বুকে কপাল ঠেকিয়ে রইল। কণ্ঠ খুব নিচু,
“তোর কাছে এলে আমি নিজেকে সামলাতে পারি না তুই আমার দুর্বলতা আর আমি এমন এক উন্মাদ প্রেমিক যে কিনা বার বার শতবার এই সপ্তদশী কন্যার কাছে হার মানতেও রাজি৷ ”
নিশিতার আঙুলগুলো ধীরে ফারিসের ভেজা চুলে ছুঁয়ে গেল। স্পর্শে কোনো দ্বিধা নেই শুধু মমতা। যেন ঝড়ের পরের নরম বৃষ্টি। বাইরে রাত আরও গভীর হলো। ঘরের আলো নিভে রইল।দুজনের শ্বাস ধীরে ধীরে সমান হয়ে এলো। অবশেষে একই নীরবতার ভেতর, একই উষ্ণতার পাশে তারা ঘুমের দেশে তলিয়ে যায়।

এদিকে রাত তখন প্রায় ২ টা। ঢাকা শহর পুরো শান্ত। চারিদিকে নীরবতা, মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। রিভান সেই কখন বাসা থেকে বের হয়েছে, এখনো বাড়ি ফেরেনি। মমতা তালুকদার আর মাহতাব তালুকদার ঘুমিয়ে গেছেন, কিন্তু কিয়াস এক নাগারে রিভানকে কল করছে। তবে রিভানের ফোন তোলার কোনো চিহ্ন নেই। থাকলেও কি করে? সে তো পুরো নেশায় ডুবে আছে।
বারে বসে একের পর এক মদের গ্লাস খালি করছে। অনেকে তাকে থামানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু সবাই বৃথা। নিশিতা আর ফারিসকে এতো কাছে দেখার পর থেকে রিভান কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না। মদ খাচ্ছে আর মাঝে মাঝে বলছে,

“মায়াবিনী, তুমি শুধু আমার তোমাকে আমি ছাড়া আর কেউ টাচ করতে পারবে না। এক দেখাতেই এতোটা মায়া লাগিয়ে দিলে তুমি?”
কেউ তার কথার মানে ধরতে পারছে না। আর রিভান নিজের মতোই, নেশায় আবোলতাবোল কথা বলছে। শেষ পর্যন্ত বারের ম্যানেজার রিভানের প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করলো। ঠিক তখনই কিয়াস আবারও কল করলো। এবার কল রিসিভ করলো ম্যানেজার।
ম্যানেজার কিছু বলার আগেই কিয়াস বলল,
“কোথায় তুই, রিভান? এতো রাত হয়ে গেছে আর তুই বাড়ি ফিরিসনি। মম্, ডেড কেউ কিছু জানে না, আর তোরে অনবরত কল করছি, তাও রিসিভ করছিস না।”
ম্যানেজার বলল,

“স্যার মি. তালুকদার বারে আছে। পুরোপুরি ড্রাংক।”
এই খবর শুনে কিয়াস যেন আকাশ থেকে পড়লো।
“হুয়াট? কখন? ওকে, আপনি আমার কাছে লোকেশনটা পাঠান, আমি আসছি।”
কল কেটে নিয়ে, গাড়ির চাবি নিয়ে একপ্রকার দৌড়ে বাড়ির বাইরে বের হলো।গাড়িতে বসে কিয়াস যেন একপ্রকার বাতাসের মতো বারে দিকে সোজা এগিয়ে গেল। রাতের শহরটা শান্ত, রাস্তা ফাঁকা, শুধু মাঝে মাঝে হালকা বাতাসে গাছের পাতার শব্দ। কিন্তু কিয়াসের মন একদম অন্য গল্প করছে রিভানের জন্য উদ্বেগ, রাগ আর হতাশার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
এদিকে রিভান বার কাউন্টারে মাথা এলিয়ে, সম্পূর্ণ মাতাল অবস্থায় পড়ে আছে। চারপাশে লোকজনের কণ্ঠ আর মিউজিকের আওয়াজ তার কাছে কোনোভাবেই পৌঁছাচ্ছে না। এক প্রকার নিজের জগতে হারিয়ে গেছে সে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কিয়াস

“দ্যা সিগার”
বারের সামনে গাড়ি থামাল। বারটা দেখতে বিলাসী, রঙিন আলো আর চমকপ্রদ ডেকোরেশনে ভরা, স্পষ্টতই ধনী এবং পরিচিত মানুষদের জন্য। কিয়াস টাইম নষ্ট না করে গাড়ি থেকে নেমে সোজাসুজি বারের ভিতরে প্রবেশ করলো।
ম্যানেজার কিয়াসকে দেখার সাথে সাথে ভিতরে নিয়ে গেল। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই কিয়াস চোখে চোখ রেখে রিভানকে খুঁজতে লাগলো। আর দেখতেই পেলো, রিভান ড্রাংক অবস্থায় কাউন্টারের উপর মাথা এলিয়ে পড়ে আছে।
কিয়াসের মাথায় এক মুহূর্তে ঝড় বয়ে গেল কীভাবে সেই ছেলে, যে কখনো সিগারেটও হাতে তুলেনি, হঠাৎ করেই ড্রিংকসে নেশার চরম সীমায় পৌঁছে গেল? আর কেন? কোন কারণে এমন হলো? এতগুলো প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরছে, কিন্তু সময় আর সুযোগ নেই চিন্তা করার।
তাই কিয়াস সিদ্ধান্ত নিলো রিভানকে যত দ্রুত সম্ভব বারের বাইরে বের করা। সে এক শক্ত কাঁধে রিভানকে তুলে নিল। ম্যানেজারকে কেবল বলল,

“এইটা ধরেন, আর হেল্প করুন।”
ম্যানেজার ও কিয়াস একসাথে রিভানকে ধরে বারের বাইরে নিয়ে এল। তারপর গাড়িতে তুলে দিল। কিয়াস ম্যানেজারের হাতে ১০০০ টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“থ্যাংকইউ, হেল্প করার জন্য।”
ম্যানেজার মাথা নাড়লো, আর কিয়াস গাড়িতে উঠে বসলো। দীর্ঘ একটি শ্বাস ফেলল, রিভানের দিকে তাকিয়ে। মাতাল অবস্থায় সে গাড়ির আসনে পড়ে আছে, চোখ বন্ধ, কিন্তু শ্বাস দ্রুত।গাড়ি চালু হলো। রাতের ঢাকার চুপচাপ রাস্তায় কেবল হুইল ঘূর্ণনের শব্দ। কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ি তালুকদার বাড়ির সামনে থামল। কিয়াস রিভানের দিকে তাকালো। এত প্রশ্ন, এত কৌতূহল—কিন্তু এখন জিজ্ঞেস করা কোনো ফল দেবে না।

অতএব, সময় নষ্ট না করে কিয়াস একাই রিভানকে ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে বের করলো। নেশার জোরে রিভান ঠিকভাবে দাঁড়াতেও পারছে না। কিয়াস ধীরে ধীরে তাকে ধরে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেল। চারপাশে তাকালো কেউ আছে কি না দেখার জন্য। যদি মমতা বা মাহতাব তালুকদার এমন অবস্থায় রিভানকে দেখতো, এক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটতো, সেটা নিশ্চিত।
কিন্তু, শান্তি। কেউ নেই। কিয়াস কিছুটা নিশ্চিন্ত হলো। তারপর ধীরে ধীরে রিভানকে ধরে, সিঁড়ি দিয়ে উপরে তার রুমে নিয়ে গেল। অনেক কষ্টে, অবশেষে রিভানকে বেডে ফেলে দিল। রুমের লাইট অফ করে কিয়াস নিজেও ধীরে ধীরে ফিরে গেল নিজের রুমে। বাকি রাতটা শুধু নীরবতা আর নেশার একটি ক্ষণস্থায়ী প্রভাব নিয়ে কেটে গেল।

এদিকে জামান বাড়িতে। আরিশা সেই কখন এসে রুমের দরজা আঁটকেছে, অথচ তার নাম না নেয়ার কোনো উপায় নেই। জামান অন্তত একশোবার ডাকলেও আরিশার দরজা খোলার কোনো ইঙ্গিত নেই।
এই সময় উর্মি, আরিশাকে ফোনে ধরতে না পেরে, আবার জামানের কাছে ফোন করছে। আরিশ জামান সাহস করেও কল রিসিভ করতে পারছেন না। কী বলবে সে? কিছু দিন মেয়েটাকে রেখেছে, কিন্তু সামলাতেও পারেনি। এই ভাবনা তাকে আরও অস্থির করে তুলছে।

শেষ পর্যন্ত, আরিশ জামান ফোন টেবিলের উপর রেখে আবারও দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিতে শুরু করলেন।
“লক্ষী মা, আমার দরজাটা খোল কি হয়েছে, বলবে তো আমাকে? তুমি যা চাও সব আমি পূরণ করি,
এটাও করব। আগে দরজাটা খোল লক্ষী মা আমার। তোমার ফারিসকে চাই তো? আমরা কাল যাব চৌধুরী বাড়িতে। তবে তুমি শান্ত হও তার আগে দরজাটা খোলো।”
কিছুক্ষণ ধরে ডাক দিলেও কোনো শব্দ নেই। হতাশ হয়ে ফিরে যাওয়ার সময়, আরিশা নিজের রুমের দরজা ধীরে ধীরে খুলে দিল। জামান দ্রুত রুমের দিকে পা বাড়ালেন। কিন্তু রুমের ভিতরে যা দেখলেন, তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। পুরো রুমে জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কাচের ভাঙা টুকরো মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে। আয়নার কাচও ফাটল ধরে গেছে, যেন কেউ চরম রাগে বা হতাশায় সেটি ভেঙে ফেলে। বেডে চাদর মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

কিন্তু এসব তোয়াক্কা না করে জামান এগিয়ে গেলেন আরিশার দিকে। আরিশা দেখে ভয়ংকর লাগছে চোখের কাজল লেপটেপে ছড়ানো, চোখ দুটো ফোলাফোলা, রক্তিম।জামান ধীরে ধীরে বললেন,
“আর না বেটা। কালকেই আমরা চৌধুরী বাড়িতে যাব। তুমি যা চেয়েছো, তাই হবে। ফারিস শুধু তোমার হবে, আর কারও না। কিন্তু নিজেকে এভাবে টর্চার করা বন্ধ করো। তুমি ফারিসকে চাও, আর ফারিস তোমারি হবে, বেটা।”
আরিশা কান্না করতে করতে জামানকে জড়িয়ে ধরল।
“আমি খুব ভালোবাসি ফারিসকে, ড্যাড। ওকে ছাড়া নিজেকে কল্পনাও করতে পারি না। যে করেই হোক, আমার কাছে এনে দাও ওকে, প্লিজ।”
জামান আরিশার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

“দেবো, বেটা। কিন্তু তুমি আর কান্না করবে না, প্রমিস করো?”
আরিশা চোখের পানি মুছে মাথা নেড়ে বলল,
“ওকে, ড্যাড।”
জামান বললেন,
“ওকে, বেটা। রেস্ট করো, আমি আসছি এখন। সকালে দেখা হবে।”

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৫

আরিশা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। ভিতরের আগুন এখনও পুরোপুরি নেভেনি। মুখে এক চিন্তায় ভরা হাসি রেখে বলল,
“আসছি আমি, ফারিস। তুমি যাকেই চাও না কেন, শেষ ওব্দি তুমি আমারই হবে। এট এ্যানি কস্ট।”
আজকের রাতটা যেন এক বিবিশীখার মতো ভালোবাসার আগুনে পুড়ে থাকা দুই হৃদয়।

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৬