Home unpredictable Unpredictable part 11

Unpredictable part 11

Unpredictable part 11
Jannatul firdaus mithila

সফেদ রঙা টাইলসের মেঝেটা কেমন ভরে গিয়েছে র*ক্তে। হেনরির নিথর দেহ পড়ে আছে অদূরে। চোখদুটো কেমন উল্টে এসেছে কোটর ছেড়ে। মুখটা সেজেছে ফেকাসে প্রলেপে। বুকের খাঁচায় পালাক্রমে ছু*রিকা*ঘাতে জায়গাটা কেমন গর্ত হয়ে গেলো মনে হচ্ছে! ওদিকে সামনেই মুখোশধারী অজ্ঞাত যুবক নির্বিকার ভঙ্গিতে নাচঁছে। একবার কোমর দুলিয়ে, আরেকবার দু’হাত দুলিয়ে। সামনেই ক্যামেরা সেটআপ। চলছে লাইভ! যা দেখানো হচ্ছে কানাডার সকল টিভি-চ্যানেলে। যুবক বেশ কিছুক্ষণ নেচে-কুঁদে অবশেষে থামলো। মুখে সফেদ রঙা মুখোশ, যার পুরোটাই এখন রঙ পাল্টেছে লালে। যুবক ধীরেসুস্থে পা বাড়িয়ে এগিয়ে আসে ক্যামেরার নিকট।

মাথাটা হালকা ঝুঁকিয়ে, হাতে ধারালো ছু*রি নাচিঁয়ে। ক্যামেরার অ্যাংগেলে নিখাঁদ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সে কেমন হাত নাড়িয়ে বিদায় জানালো। পরমুহূর্তেই আবার কি মনে করে নিজের ডানহাতটা ক্যামেরার সামনে এনে ❝ টুইঙ্কেল ❞ লেখা অংশটা দেখায় সে। তারপর ঘাড় সামান্য কাত করে গ্লাভস পড়া বাহাতের তর্জনী দিয়ে নামের অংশটা খানিক আনমনে বুলিয়ে হঠাৎ টপাটপ চুমু খেলো সেথায়! তার ওমন কার্যকলাপে চোখ বেরিয়ে আসার যোগাড় সাধারণ জনগনের। প্রত্যেকের চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্ক! কেউবা ভয়ে পেট উগড়ে বমি করছে। কেউবা এসব নৃশংসতা সইতে না পেরে তক্ষুনি চোখ সরিয়েছে অন্যত্র।এরমধ্যে সচেতন কয়েকজন তক্ষুনি হাতে রিমোট নিয়ে চ্যানেল পাল্টেছে দ্রুত! কিন্তু বালাইষাট! সকল চ্যানেলেই যে একই লাইভ সম্প্রচারিত হচ্ছে। তা দেখে কারোর আর বুঝতে বাকি নেই যে টিভির প্রতিটি চ্যানেল একই সাথে, একই সময়ে হ্যাক হয়েছে! ওদিকে লাইভে থাকা মুখোশধারী ব্যাক্তি এবার ফের তাকালো ক্যামেরায়। সময় নিয়ে তৎক্ষনাৎ দু’হাতের মিডল ফিঙ্গার দেখাতেই লাইভ কাট হলো আচমকা!

অন্যদিকে, রাষ্ট্রের প্রশাসন ব্যবস্থায় আঙুল উঠেছে এতক্ষণে। টিভি চ্যানেলের মতো ব্রডকাস্ট সার্ভারে এসে কেউ এতো সহজে কীভাবেই বা এসব করার দুঃসাহস দেখায়? প্রশাসন কী করছে এখনও? কানাডিয়ান রেডিও–টেলিভিশন অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশনস কমিশন। ওরফে সিআরটিসি। কর্মরত সকল আইটি কর্মকর্তারা অবোধের ন্যায় এদিক ওদিক ছুটছেন। প্রত্যেকের হাতে একগাদা ফাইল।ইতোমধ্যেই সিআরটিসির চেয়ারপারসন — মাইকেল মন্ডের কাছ থেকে চলে এসেছে বেশ কড়া শাসানি! দিয়েছে সকল আইটি হেডকে চাকরিচ্যুত করবার বিশেষ ধমকি! এই ভয়েই তটস্থ সকলে। সাধারণত টিভি-চ্যানেলে ব্রডকাস্ট সার্ভার থাকায় প্রায়শই কিছু অসাধু ব্যাক্তিবর্গের হাতে এসব চ্যানেল হ্যাক হবার সম্ভাবনা থাকে। তবে সে সম্ভাবনা ৯০% এরও বেশ নিচে। সিআরটিসির আইটি হেডেরা বেশ কয়েকবার ট্রায় করেছেন ইমার্জেন্সি ব্রডকাস্ট চলাকালীন কাট করতে তবে বরাবরই ব্যর্থ হয়েছেন তারা। বোঝাই যাচ্ছে, টিভির ওপাশে লাইভ করতে থাকা মুখোশধারী ব্যাক্তি বেশ শক্তিশালী হ্যাকিং সিস্টেম ব্যবহার করেছে।

আইটি হেড রবার্ট হ্যারি, কনফারেন্সের বিশাল রুমের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি অনড় সম্মুখের প্রজেক্টরের পর্দায়। যেখানে দেখা যাচ্ছে দেশের সকল চ্যানেল স্টুডিওর লোগো। সহযোগী কর্মী পালাক্রমে কনফারেন্স কল দিয়ে যাচ্ছে দেশের প্রতিটি টিভি চ্যানেলের স্টুডিওতে।প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে একযোগে কল রিসিভ হয়। মুহুর্তেই প্রজেক্টরের পর্দায় ভেসে ওঠে দেশের সকল চ্যানেল স্টুডিওর হেডদের মুখশ্রী। প্রত্যেকের মুখখানায় কেমন রাজ্যের আতঙ্ক ছেয়ে আছে। রবার্ট মোটেও সময় ব্যয় না করে কঠিন গলায় প্রশ্ন করে ওঠে,

“ আপনাদের কাছে কোনোধরনের ফিশিং ইমেইল গিয়েছে? অথবা কোনো ধরনের ইনসাইডার থ্রেট ডিটেকশন হয়েছে?”
তার এহেন প্রশ্নে বাদবাকি চ্যানেল স্টুডিওর কর্মকর্তারা কেমন ঠোঁট উল্টালেন। সদ্যোগে বলে ওঠেন —
“ নো স্যার!”
এরূপ প্রতিত্তোরে মেজাজ বিগড়ে যায় রবার্টের। সে কেমন দাঁতে দাঁত চেপে হুংকার ছুঁড়ে বলে,
“ হোয়াট দা ফা*ক! এমন কিছুই ডিটেক্ট না হয়ে থাকলে, লাইভ করা ব্যাক্তি আপনাদের চ্যানেলগুলো হ্যাক করলো কীভাবে? সে নিশ্চয়ই আকাশবাণী ছুঁড়ে আপনাদের চ্যানেলগুলো হ্যাক করেনি!”
এহেন কড়া জবাবে থমথমে সকলের মুখ। কেউবা মাথা নুইয়ে ফেলেছে আলগোছে। রবার্ট দাঁত কিড়মিড় করতে করতে কনফারেন্স থেকে বেরিয়ে যায়। দু’হাত পকেটে গুঁজে ফোঁস ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলতে ব্যস্ত সে। কিয়তক্ষন বাদেই সেথায় আগমন ঘটে ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি হেড — মিরা! ভিনদেশী নারী,হাঁটু সমান ক্রপ টপ জড়ানো গায়ে। মাথাভর্তি বাদামি রঙা কার্লি চুলগুলো কেমন খুলে রাখা। হিল জুতোর ঠকঠক শব্দ তুলে মেয়েটা এসে দাঁড়ায় রবার্টের পাশে। দুহাত বুকের কাছে বেঁধে গম্ভীর কন্ঠে বলে,

“ কোনো ক্লু পেয়েছো?”
রবার্ট সিগার ধরিয়েছে। দু-আঙুলের মাঝে সিগার রেখে ফুঁকছে জোরালো টানে। সময় নিয়ে মিরার প্রশ্নোত্তরে বলে,
“ নাহ! সবগুলো বাস্টা*র্ডের একই কথা — তাদের কমিউনিকেশনের সাথে না-কি কোনরূপ মিসম্যাচ হয়নি!”
বলেই ফের সিগারে টান বসায় রবার্ট। এদিকে মিরা গম্ভীর! ঠোঁটের কোণ কামড়ে রেখেছে দাঁতের একাংশ। সে কেমন ভ্রু কুঁচকে বলে ওঠে,
“ আচ্ছা রবার্ট! এর মানে এমনটা নয়তো — আমাদের সিস্টেমেই প্রবলেম হয়েছে? কেননা আমাদের এখান থেকেই তো সকল চ্যানেল স্টুডিওকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।”
থমকায় রবার্ট! হতভম্ব চোখে তাকায় ঘাড় বাকিয়ে। পরক্ষণেই কেমন শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলে,
“ এতোবড় কথাটা এতক্ষণ আমার মাথায় এলো না কেনো?”
মিরা গম্ভীর মুখেই ঠোঁট পিষে হাসলো। মুখটা অন্যত্র ঘুরিয়ে বলল,

“ অতিরিক্ত উত্তেজনা মানুষের চিন্তাশক্তি কমিয়ে ফেলে রবার্ট। আই থিংক, তোমার সাথেও তা-ই হয়েছে।”
রবার্ট তক্ষুনি হাত থেকে সিগারটা ছুড়েঁ ফেলে মেঝেতে। পায়ের ব্যুট জুতোর তলে তা বেশ কয়েকবার পিষে ফেলে তৎক্ষনাৎ পা বাড়ায় ক্রিয়েটিভ প্রডিউসারের রুমের দিকে। সে যেতেই মিরা কেমন বাঁকা হাসলো। ঘাড় বাকিয়ে তক্ষুনি তাকালো কনফারেন্স রুমের দরজার পানে।যেথায় গা লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নুয়েল। মিরা গম্ভীর মুখে চোখের ইশারায় কি যেন একটা বললো তাকে। আর ওমনি লোকটা কেমন ধীরেসুস্থে এগিয়ে আসতে লাগলো। হাতে কফির ট্রে। মিরার কাছ থেকে প্রায় দু-কদম দুরত্বে দাঁড়িয়ে থেকে সে ট্রে এগিয়ে দিলো মিরার দিকে। মিরা মুচকি হেসে কফির কাপটা আলতো করে উঠিয়ে, কাপের তলানিতে লুকিয়ে থাকা ছোট মেমোরি কার্ডটা সরিয়ে নেয় আলগোছে। পরক্ষণে হাতে কফি কাপ নিয়ে ইশারায় নুয়েলকে সরে যেতে বলে। নুয়েল বিচক্ষণ মানুষ। তৎক্ষনাৎ কেটে পড়লো জায়গা হতে।এদিকে মিরা তখন কফির কাপে আলতো করে চুমুক বসিয়ে এদিক-ওদিক নজর বুলালো সর্তকভাবে। যে-ই দেখলো আশেপাশে কেউ নেই, ওমনি সে নিজ হাতের তালুতে লুকিয়ে থাকা মেমোরিটা আলগোছে নিজের বুকের ভাঁজে লুকিয়ে নেয়। তারপর একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় কফির কাপে চুমুক বসায় আবারও।

টুং শব্দ তুলে কাঁচের ডেস্কের ওপর পড়ে থাকা ফোনের স্ক্রিনটা কেমন জ্বলে ওঠে আচমকা। সামনের সোফাটায় পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে নিহাদ। সোফার হাতলে বাঁহাতের কনুই ঠেকিয়ে রাখা। ফোন জ্বলতেই টনক নড়ে তার। সে কেমন দ্রুত নড়েচড়ে বসলো। হাত বাড়িয়ে ডেস্কের ওপর থেকে ফোনটা তুলে নিলো হাতে। মুহুর্তেই তার আঁখিদ্বয়ের সম্মুখে ভেসে ওঠে একখানা মেসেজ।যেথায় গোটা গোটা অক্ষরে লিখে রাখা —
❝ ডান!❞

মেসেজটা দেখামাত্রই নিহাদের ঠোঁটের কোণে আচমকা লেপ্টে গেলো এক চিলতে বাঁকা হাসির রেশ। সে কেমন রয়েসয়ে উঠে দাঁড়ায়। দু’হাত কোমরে চেপে, শরীরটা খানিক বাঁকিয়ে নেয় এদিক-ওদিক। গতরাত থেকে এপর্যন্ত এই এক জায়গায় বসে আছে ছেলেটা! শরীর তো জমবেই! শুধু কী তার? গোপন কক্ষে বসে থাকা ১২জন দক্ষ হ্যাকারদেরও তো ঐ একই অবস্থা! গতকাল মধ্যরাতে এই ১২জনকে কিডন্যাপ করে আনা হয়েছে এখানে। মাস্টারের হুকুম মতে বলা হয়েছে —
❝ সকাল ৬-৬:৩০ অবধি দেশের সকল টিভি চ্যানেলকে একযোগে হ্যাক করতে হবে!❞
প্রথম প্রথম এহেন কথায় সকলে ভিন্নমত পোষণ করলেও যে-ই শুনলো মাস্টারের হুকুম, ওমনি তাদের শরীরে কেমন দরদর করে ঘাম ছুটে গেলো। প্রাণের অসম্ভব মায়া থাকায় অনিচ্ছা থাকা স্বত্বেও লোকগুলো কেমন কাজে লেগেছে! টানা ৪ ঘন্টার বিরতিহীন পরিশ্রমে অবশেষে সার্থক তারা। কাজ হয়েছে কথামতো।
নিহাদ ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো গোপন কক্ষে। বেশ বড়সড় এক কামরা। কোনরকম দরজা, জানালার উপস্থিতি নেই পুরো ঘরজুড়ে। চারিদিকে লাল রঙা লাইটের টিমটিমে আলো জ্বলছে। কামরার একপাশে সেটআপ করা হয়েছে অত্যাধুনিক ডিভাইস। তাদের সম্মুখেই বসে আছে ১২জন নামী-দামী হ্যাকার। প্রত্যেকের হাত-পা তাদের চেয়ারের সঙ্গে বেড়ি দিয়ে বাঁধা। যেন কেউ পালাতে না পারে। নিহাদ চুপচাপ ভেতরে ঢুকলো। দু’হাত পকেটে গুঁজে আরামে দাঁড়ালো কেমন। সময় নিয়ে গলা উঁচিয়ে ডাকলো,

“ গার্ডস!”
মুহুর্তেই দরজা দিয়ে একে একে ছুটে এলো বেশ কয়েকজন কালো পোশাকধারী গার্ডস। হাতে অস্ত্র! নিহাদ সময় নিয়ে নিজের পকেট থেকে বেশ কয়েকটা চাবি ছুঁড়ে দিলো একজন গার্ডের হাতে। গম্ভীর গলায় হুকুম ছুড়ে বলল,
“ লেট দেম ফ্রী!”
হুকুম তামিল হলো একযোগে। গার্ডস সকলে দ্রুত এগিয়ে গেলেন হ্যাকারদের কাছে। চাবি দিয়ে বেড়িগুলো খুলে দিতেই মানুষগুলো যেন স্বস্তি পেলো ততক্ষণে। মুখে ছেয়ে গেলো প্রশান্তির ছাপ। নিহাদ তখন গম্ভীর মুখে ফের আদেশ করলো বডিগার্ডদের,
“ ওদের দিয়ে এসো!”
কথাটা বলামাত্রই বডিগার্ডেরা এগিয়ে এসে প্রত্যেকের চোখের ওপর পট্টি বেঁধে দেয়। হ্যাকাররা নড়লোচড়লো না। কেননা আনার সময়ও তাদের এভাবেই আনা হয়েছে। নিহাদ পা গুনে গুনে এগিয়ে আসে। রহস্যময় কন্ঠে বলে,
“ হেভ আ নাইস জার্নি!”

❝ প্রফেসর হেনরি খুন হয়েছে তাও আবার ভীষণ নৃশংসভাবে! প্রত্যেকেই স্বচক্ষে দেখেছে সে নিউজ!❞
এহেন খবরে মূহুর্তেই শোরগোল পড়ে গেলো পুরো হোটেল জুড়ে। মিস সারাহ আতঙ্কে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন। ওদিকে বাদবাকি স্টুডেন্টসহ এক্সপার্টদেরও একি হাল! সকলের মাঝে এক ভিন্ন উৎকন্ঠা। তবে একজনের মাঝে তেমন কোনো ভাবান্তর নেই! সে যে আর কেউ নয় মেহমেত রায়ান। সে কেমন গম্ভীর মুখে চলে গেলো ভার্সিটি ক্যাম্পাসে। আজ প্রথম দিন! টিমের সাথে থাকা জরুরী।

ভার্সিটির বিশাল মাঠ জুড়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সমাগম। সকলের মাঝেই ফিসফিস চলছে আজকের ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সম্বন্ধে। এরইমধ্যে মেহমেত চলে যায় নিজের টিমের জন্য বরাদ্দকৃত ট্রেনিং রুমে। তাকে দেখেই সকল স্টুডেন্টরা কেমন হা করে তাকিয়ে রইলো কিয়তক্ষন! কেউ হয়তো ভাবেইনি আজ এক্সপার্ট আসবেন ট্রেনিং এ। গুরুগম্ভীর মেহমেত গটগট পায়ে ক্লাসে ঢুকে। হাতে একখানা ফাইল! নিজের জন্য বরাদ্দকৃত টেবিলের কাছে গিয়ে, হাতের ফাইলটা নামিয়ে রাখে সেথায়। গম্ভীর মুখেই একবার চোখ ঘুরিয়ে তাকায় পুরো ক্লাসে। মেজরেরা কেমন হা করে তাকিয়ে আছে তার দিকে! মেহমেত বুঝি বিরক্ত এতে। সে খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,
“ শো মি ইউর প্রজেক্টস!”

মুহূর্তেই সকলের ঘোর ভাঙলো যেন। সবাই কেমন তাড়া দেখালো নিজেদের ফাইল সাবমিটে। মেহমেত একবার সরু চোখে তাকায় সবার পানে। পরক্ষণেই ভরাট কন্ঠে বলে,
“ যতটুকু আমি জানি, এবারের প্রতিযোগীতায় ২৫টা ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট পার্ট নিয়েছে। সেদিক থেকে ভাবলে, সাইকোলজি ডিপার্ট্মেন্টেও ২৫জন মেজর থাকার কথা বাট আপনারাতো ২৪জন।আরেকজন কোথায়?”
সকলেই ঠোঁট উল্টায়। মাথা নাড়িয়ে জানায় — তারা জানেনা। এহেন উত্তরে বেজায় অসন্তুষ্ট মেহমেত। মুহুর্তেই কপাল কুঁচকে ছেলেটা কেমন দাঁত খিঁচে বিরবির করে,
“ কেয়ারলেস ফেলো! এরা আবার আসে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে! হাহ..!”

গম্ভীর মুখে ভার্সিটির ক্যাম্পাসে হাঁটছে আয়রা। পরনে ব্লু-জিন্স। গায়ে লং কুর্তি। তারওপর জড়িয়ে রাখা ওভারকোট। মাথায় বরাবরের ন্যায় কারকোল রঙের হিজাব। বাহাতে রোল করা স্কেচবুক। ডান কাঁধে ঝুলছে টোট ব্যাগ। মেয়েটার চোখেমুখে একরাশ চিন্তার ভাঁজ। কে ছিলো ঐ লোক? সে কেনোইবা প্রফেসর হেনরিকে মারলো? সে-কি তবে তার জন্যই….. না না! কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই নিজেকে সামলায় আয়রা।পরক্ষণেই ভাবে,
“ এমনও তো হতে পারে প্রফেসর হেনরির সাথে কারোর পূর্ব শত্রুতা ছিলো! তার জের ধরেই হয়তো এমনটা করেছে ঐ লোক!”
আয়রা নিজ ভাবনায় নিমগ্ন। ঠিক তখনি তার ফোনটা কেমন কর্কশ শব্দে বেজে ওঠে! আয়রা ভ্রু কুঁচকে ফোন বের করে আনে কাঁধের ব্যাগ থেকে। স্ক্রিনে চোখ ফেলতেই তার কুঁচকে রাখা ভ্রু-দ্বয় বুঝি কুঁচকে এলো আরও। সে একবার চাইলো কলটা কেটে দিতে, তবে পরক্ষণেই আবার কি মনে করে কলটা কাটলো না আয়রা। শক্ত চোয়ালে কলটা রিসিভ করে কানে ঠেকিয়ে কঠিন গলায় বলে,

“ হেলো!”
ওপাশ থেকে ভেসে আসে কারো খিলখিল হাসির শব্দ। আয়রা থমকায়। হতবিহ্বল কন্ঠে আচমকা বলে,
“ আমায়রা?”
ফোনের ওপাশে মেয়েটা এখনো হাসছে। কিছুক্ষণ পর হাসি থামিয়ে সে বলে ওঠে,
“ হ্যাঁ! কেনো চিনতে পারছোনা আমায় আপু?”
আয়রা মুখাবয়ব আগের ন্যায় গম্ভীর। সে কেবল বলে,
“ এই নম্বর দিয়ে কল দিলি যে? তোর ফোন কোথায়?”
আমায়রার মুখটা কেমন উদাস হলো যেন। সে কেমন উদাস গলায় টেনে টেনে বলল,
“ ফোনটা গতকালকে হাত থেকে পড়ে গিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে আপু। তাই আরকি…”
কথাটা শেষ হবার আগেই ফোনের ওপাশ থেকে আয়রা কেমন ফটাফট বলে ওঠে,
“ বিকেলে মানি ট্রান্সফার করে দিবো। মার্কেটে গিয়ে পছন্দমত ফোন কিনে নিস।”
এহেন কথায় আমায়রা কেমন খুশিতে লাফিয়ে ওঠে। গদগদ কন্ঠে পরক্ষণেই বলে,
“ রিয়েলি? আই লাভ ইউ আপু! ইউ নো হোয়াট? ইউ আর দি বেস্ট বড়আপু ইন দি ওয়ার্ল্ড!”
আয়রার মুখাবয়বে পরিবর্তন নেই। সে একবার বামহাতের কব্জি উল্টে সময় দেখে। পরমুহূর্তেই তার চোখদুটো উঠে গেলো কপালে। যাহ! ক্লাসে যেতে সে-তো লেট করে ফেললো। আয়রা তৎক্ষনাৎ পা বাড়ায় ত্রস্ত। ফোন কানে ঠেকিয়ে যেইনা কিছু বলবে ওমনি ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসে এক পৌঢ়ার কর্কশ গলা!

“ হেলোওওও!”
আয়রার পদযুগল থামলো। চোয়াল হয়ে গেলো শক্ত! কপালে পড়লো গোটাকতক বিরক্তির ছাপ। ওপাশ থেকে পৌঢ়া বলছেন,
“ কিতালো? কথা কস না যে?”
আয়রা নাক ফুলিয়ে নিশ্বাস ফেলছে। সময় নিয়ে প্রতিত্তোরে বলে,
“ কী শুনবেন?”
“ কিতা আর শুনমু? বিদেশ গিয়া পইড়া আছোস, বিয়াশাদীর খবর নাই। তোর বয়সী মাইয়া হোগল বিয়াশাদী কইরা দুগা-তিনগার মা হইয়া গেছে।আর তুই এহোনো বিয়াই করস নাই। কই কি… তোর তো ছুডো একটা বইনও আছে না-কি? হেরেও তো বিয়া দেওন লাগবো।”
আয়রা গজগজ করছে রাগে। ঠোঁট দুটো খানিক গোল করে নিশ্বাস ফেললো খানিকটা। পরক্ষণেই কেমন কঠিন গলায় প্রতিত্তোরে বললো,

“ আপনার বয়সীও তো অনেকে অক্কা পেয়ে ভূত হয়ে গেছে। অথচ আপনি এখনো না মরে বেঁচে আছেন। আবার অন্যদের তুলনায় আপনার চাপার জোরও তো কম না! ঠিকই তো খোঁচাখুচিঁ করছেন। তা নিয়ে আমি আপনাকে কিছু বলেছি? বলিনি তো! তাহলে আমাকে নিয়ে আপনার এতো চিন্তা হচ্ছে কেনো? আপনি নিজের চরকায় তেল দেন!”
কথাটা ব’লেই আয়রা কল কাটলো। ওদিকে পৌঢ়া হতভম্ব! ঐটুকুন মেয়ে কি-না তাকে মরা নিয়ে খোঁটা দেয়? এত্ত সাহস?

❝ এক্সকিউজ মি স্যার!❞
হোয়াইট বোর্ডের কাছে দাঁড়িয়ে আছে আলেকজান্ডার। সাইকোলজি ডিপার্ট্মেন্টের সহকারী এক্সপার্ট। বোর্ডে ছক আঁকছিলেন তিনি। ওমনি ক্লাসরুমের দরজার কাছ থেকে ভেসে আসা নারী কন্ঠে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় সে। ভ্রু কুঁচকে বলে,
“ ইয়েস?”
আয়রা গম্ভীর মুখে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে,
“ মে আই কাম ইন?”
“ নো ইউ ডোন্ট নিড টু!”
আয়রার কথার পিঠে তারই পেছন থেকে ভেসে আসে মেহমেত রায়ানের ঝাঁঝাল কন্ঠ! ছেলেটা কেমন ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে আয়রার পেছনে। হাতে একগাদা সফেদ রঙা কাগজ। মেহমেত ঝাঁঝ দেখিয়ে আর-ও কিছু বলতেই যাবে ওমনি আয়রা রয়েসয়ে পেছনে ঘুরলো। মেহমেত থমকায়! কন্ঠস্বর হারিয়ে হা করে তাকিয়ে রইলো বেচারা! চোখদুটো কেমন মেয়েটাতেই নিবদ্ধ! ওদিকে আয়রা মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অপরাধী কন্ঠে বলে ওঠে,

“ সরি স্যার! নেক্সট টাইম লেট হবে না।”
মেহমেত আগের মতো দাঁড়িয়ে আছে। চোখের পলক অবধি পড়ছেনা তার। বুকটা বুঝি তার ধড়ফড়িয়ে ফেটে যাবে এখনি! বুকের খাঁচায় বন্দীরত ছোট্ট দৈহিক অঙ্গটুকু যেন ম্যারাথনে দৌড়াবে এবার। আয়রা ধীরেসুস্থে চোখ তুলে ওপরে। সম্মুখের মানুষটার সাথে চোখাচোখি হতেই ছেলেটা তৎক্ষনাৎ বুকের বা পাশে হাত চেপে ধরে। ঠোঁট গলিয়ে অস্ফুটে তার বেরিয়ে আসে,
“ উফফ!”
ভ্রু কুঁচকায় আয়রা। বিরক্তি নিয়ে তাকালো মেহমেতের পানে। গম্ভীর অথচ কঠিন গলায় ফের বললো,

“ স্যার! আপনার আমাকে দেখা হয়ে গেলে আমি কী ভেতরে যেতে পারি?”
সম্বিৎ ফিরলো মেহমেতের। তৎক্ষনাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে বুকের ওপর থেকে হাত সরিয়ে আনে আলগোছে। নিজের করা বোকামীতে সে যেন নিজেই বড্ড বিরক্ত হলো এমুহূর্তে! সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে বলে ওঠে,
“ ইয়াহ! শিওর।”
কথাটা বলতে দেরি, আয়রার গটগট পায়ে ক্লাসে ঢুকতে দেরি নেই।এদিকে তার চলে যাওয়ার পথে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেহমেত। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ টেনে বিরবির করে বলল,
“ যাকে এই দু-চোখ হন্নে হয়ে খুঁজছে, এই হৃদয় কী আর জানতো, নিয়তি তাকে আমার সামনেই রেখেছে!”

অন্ধকার রুম! মেঝেতে বসে আছে মুখোশধারী যুবক। গায়ে তার এখনো র*ক্তে ভেজা কাপড়চোপড়। মুখের ওপর আঁটকে আছে সাদা মুখোশ। প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পর, অন্ধকার ঘরের দরজা খুলে কেউ যেন ঢুকলো ভেতরে।মুহুর্তেই অন্ধকার রুমে এক ছটাক এলো এসে ফের মিলিয়ে গেলো তা! দরজার কাছ থেকে ব্যুট জুতো পরিহিত পাদুকা এগিয়ে আসে ধীরে ধীরে। পরক্ষণেই সে পায়ের মালিক মুখোশধারীর সামনে এসে হাঁটুগেড়ে বসলো। বাধ্যের ন্যায় মাথা নুইয়ে রেখে নিচু কন্ঠে বলল,
“ জেডি! হিজ বডি ওয়াজ কমপ্লিটলি ডিসট্রয়েড।”

মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা জেডির বাদামী ঠোঁটদুটোয় মুহূর্তেই ছড়িয়ে গেলো পৈশাচিক হাসির রেশ। সে সময় নিয়ে হাত উঁচিয়ে মুখ থেকে মুখোশটা খুলে নিলো এক ঝটকায়। পরক্ষণে সে মুখোশ ছুঁড়ে ফেলল দূরে। ডান হাঁটু সামান্য উঁচিয়ে, হাতের কনুই ঠেকালো তাতে।পরমুহূর্তে বামহাত আলগোছে বাড়িয়ে দিলো নিহাদের দিকে। নিহাদ হাসলো একটুখানি। পকেট থেকে মোটা সিগারটা বের করে এনে দিয়ে দিলো জেডির বাড়িয়ে রাখা হাতে। জেডি হাসলো ঠোঁট পিষে। ঠোঁট দু’টোর সামান্য ফাঁকে আলগোছে গুঁজে নিলো সিগারটা। পাশ থেকে নিহাদ তক্ষুনি লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় সিগারেটের শেষ ভাগে। জেডি মনের সুখে সিগারে সুখটান দিলো। দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে তক্ষুনি গা এলিয়ে দিলো মেঝেতে। সময় নিয়ে হাঁটুর ওপরে হাঁটু রাখলো আবারও। দু’হাত নিয়ে গেলো মাথার পেছনে। অন্ধকার সিলিংয়ে চোখ রেখে নিহাদকে বললো,

“ টার্ন অন দা লাইট!”
নিহাদ তক্ষুনি ছুটলো লাইট অন করতে।অন্ধকারে হাতরিয়ে হাতরিয়ে কিয়তক্ষন বাদেই পেয়ে গেলো সুইচ। ছেলেটা কেমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তৎক্ষনাৎ আঙুল চাপলো সুইচে। মুহুর্তেই অন্ধকার রুমের পুরো সিলিং জুড়ে ছেয়ে গেলো এক অপরুপার হাতে আকাঁ ছবি! যেখান থেকে রং-বেরঙের আলো ভেসে আসছে মৃদু! নিহাদ ভড়কে তাকায় সেদিকে। হতভম্বের ন্যায় কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতেই তার কর্ণকুহরে ভেসে এলো জেডির শান্ত অথচ ভয়ানক ভারী কন্ঠ! ছেলেটা সিলিংয়ের দিকে কেমন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সুর তুলে বলছে,

Unpredictable part 10

❝ টুইঙ্কেল টুইঙ্কেল লিটল স্টার!
হাউ আই ওয়ান্ডার, হোয়াট ইউ আর?
আপ এবাব দা ওয়ার্ল্ড সো হাই!
লাইক আ ডায়মন্ড ইন দা স্কাই!❞

Unpredictable part 12