Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬২ (২)

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬২ (২)

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬২ (২)
আরোবা চৌধুরী আরু

সায়ফান নেচে নেচে বেড়াচ্ছে ঠিক সেই সময় একটা গাড়ির হেডলাইট এসে থামল কাজী অফিসের সামনে। সবাই একসাথে তাকাল। মুখের হাসি মিলিয়ে গেল মুহূর্তেই। সায়মানের গাড়ি।দেখার সাথে সাথে নাফিসা ভয়ে রুহির পেছনে লুকিয়ে পড়ল।সায়মান তাকে বারবার বলে দিয়েছে তার অনুমতি ছাড়া যেন বাড়ি থেকে বের না হয়। এবার… সত্যিই সবার খবর আছে।
সায়মান গাড়ি থেকে নামল। পিছন পিছন রাজিব ও নামল। সায়মান এক সবাইকে দেখে নিল। তারপর তার চোখ গিয়ে থামল নাফিসার ওপর। দুজনের চোখে চোখ পড়তেই নাফিসা আর তাকিয়ে থাকতে পারল না। মাথা নিচু করে ফেলল।
সায়মান এবার হাঁটে সোজা সাইফানের দিকে এগিয়ে আসলো
সাইফান তখনো ভ্যাবলাকান্ত একটা হাসি মুখে এনে পিছন ঘুরে দৌড় দিতে গেলেই তার আগেই সায়মান এক হাতে ওর পিছনের কলার চেপে ধরল।সায়মান গম্ভীরস্বরে বলল,

— হাঁটতে পারিস?
সাইফান একটা ঢুক গিলল। গলায় শব্দ আটকে গেলেও মাথা নাড়ল। সায়মান ওর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্তভাবে জিজ্ঞেস করল,
— তাহলে দৌড়াচ্ছিস কেন?
সাইফান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
— আরে… ভাই… তুমি এখানে…?
সায়মান কলার ছেড়ে দিল।

— তোকে আমি বলেছিলাম নিজের যোগ্যতায় কিছু করতে । তুই কি করলি,
— ভাই আমি তো তোমার কথা মতোই কাজ করেছি। তুমি বলেছ নিজের বিয়ে নিজে কিভাবে করবি দেখে নিতে। আসলে আমার সুমন্দি টা বাংলা সিনেমার ভিলেনদের মতো। ওরে রাজি করিয়ে বিয়ে করাতে করাতে আমার বাসরের ডেট এক্সপায়ার হয়ে যেত। আরে তার থেকে ভালো বিয়েটা করিয়ে ওকে মামা মানিয়ে দিলে সুমন্দি তখন এমনিতেই রাজি হয়ে যাবে ভাগ্নিদের মুখ দেখে। বেশি রিক্স নিতে গেলে আমাদের বংশধর আগাতে দেরি হয়ে যেত ভাই সেজন্যই এই কাজ করা।
সায়মান চোখ ছোট করে তাকাল সাইফানের দিকে। পরের মুহূর্তেই ঠাস করে একটা থাপ্পর পড়ল সাইফানের গালে। সাইফান গালে হাত দিয়ে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।সায়মান বলল,

— সম্মানের সাথে মেয়েটাকে বাড়িতে নিয়ে আসতে বলেছিলাম। এভাবে উলটপালট করে নয়।
তারপর সে জারিনের দিকে তাকিয়ে ডাকল।
— জারিন এদিকে এসো।
জারিন কোনো কথা না বলে চুপচাপ এগিয়ে এলো। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে বলল,
— জি ভাইয়া।
সায়মান জারিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভাইয়া যা জিজ্ঞেস করবো তা সঠিক ভাবে উত্তর দিবে।
জারিন মাথা নাড়িয়ে আবার হ্যাঁ বলল।
— তুমি কি সত্যিই সায়ফানকে ভালোবাসো, নাকি তোমাকে জোর করে এখানে আনা হয়েছে। যদি এমন কিছু হয় তবে ওকে আমি নিজে জেলে ঢুকাবো।
সবাই সায়মানের দিকে তাকালো অবাক হয়ে। আর সায়ফান মুহূর্তের ভিতরে সায়মানের পা ধরে বসে পড়লো।

— ভাই, প্লিজ, এমন করো না। আমি এখনো আমার বাসরটাই করতে পারিনি।তুমি নিজে বাবা হচ্ছো, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখছ আর আমাকে সেই বাবা হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই বঞ্চিত করছো।এটা করিও না ভাই গো আমার ভাই……
— ১ সেকেন্ড এর ভিতর আমার পায়ের কাছ থেকে সরে যাবি। না হলে খবর আছে তোর। — সায়মান জোরে ধমক দিয়ে বলে উঠলো।
সায়মানের ধমকে সায়ফানের শরীর কেঁপে উঠল। কোনো কথা না বলে সে ধীরে ধীরে সরে এসে দূরে গিয়ে দাঁড়াল।
— — হে আল্লাহ… এমন ভাই কারো দিয়ো না, যে ভাইয়ের নিজের ভাইয়ের বাসর করতে সাহায্য করারও মন নেই। আজ শুধু আমার বাসর না, আমার ভবিষ্যৎটাই পিছিয়ে দেওয়া পরিকল্পনা চলছে আল্লাহ।
সায়মান জারিনকে আবার বলল,

— আমার কোশ্চেন এর answer দাও।
জারিন মাথা নাড়ল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
— আমি নিজের ইচ্ছায় এসেছি । আমি ভালোবাসি সায়ফানকে। আর আমরা দুজনেই প্রাপ্তবয়স্ক, নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। ভাইয়া সাইফানকে যেন কিছু না বলা হয়।
এই কথায় সাইফান একেবারে অবাক। এক লাফে জারিনের কাছে গিয়ে সবার সামনে ওর গালে একটা চুমু দিয়ে ফেলল। তারপর গর্বের সুরে বলতে শুরু করল,
— আমার চশমা জান তুমি আমার হয়েই কথা বলছো । বিয়ের করতে না করতেই তুমি পাশে দাঁড়িয়েছে। স্বামীর জন্য টেনশন করছো।
জারিন বিরক্ত আর লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।তারপর দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল,

— নিলজ্জ ধলাবিলাই বড়দের সামনে এসব না করলে নয়৷
সাইফান না দমে উল্টো হেসে বলল,
— আমি তো বড়দের কাছ থেকেই শিখেছি । গালে চুমু দিয়েছি মাত্র। তোমার ওয়ান অ্যান্ড অনলি ভাসুর তো সবার সামনেই বউকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে চুমু দেয়।
এই কথায় এতক্ষণ যে ভয়ের ছিল,কিন্তু সবাই হঠাৎ অবাক হয়ে সায়মানের দিকে তাকিয়ে গেল। নাফিসা লজ্জায় রুহির পেছনে আরও গুটিয়ে গেল। এইবার সাইফানের চোখ গেল সায়মানের দিকে। সায়মান তাকিয়ে আছে, চোখে আগুন। মনে হচ্ছে এখনই গিলে খাবে।
সাইফান পরিস্থিতি বুঝে আবার হাসির চেষ্টা করে বলল।

— প্রমাণ হিসেবে রাজীব ভাইও আছে, সে সব দেখেছে। এমন চোখ গরম করে তাকিয়ে লাভ নেই। এখন আমাকে শুধু একজনই গিলবে সেটা আমার বউ।
সায়মান বিরক্তিতে সাইফানের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল, তারপর চোখ খুলে তাকাল রিশা আর আকাশের দিকে।দুজনেই যেন মাটির সাথে মিশে যেতে চাইছে মাথা নিচু, চোখ নামিয়ে রেখেছে। সায়মান গম্ভীর গলায় ডাকল,
— আকাশ, এখানে আয়।
আকাশের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সে এগিয়ে এলো। গলা শুকিয়ে গেছে, তবুও নিজেকে সামলে বলল,
— জি ভাইয়া।
সায়মান ওর দিকে তাকাল। সেই তাকানোতে রাগ আছে, দায়িত্ব আছে, আবার কোথাও যেন একফোঁটা ভয়ও, বোনকে হারানোর ভয় সায়মান বলল।

— স্পষ্ট করে উত্তর দিবি ।
— আমার বোনকে তুই ভালোবাসিস , নাকি জোর করে নিয়ে আসা হয়েছে বলে বিয়ে করেছিস ? মনে রাখবি, আমার বোন কোনো খেলনা না। এখন পেশারে পড়ে বিয়ে করলি দুদিন পর আমার বোনের সাথে খারাপ ব্যাবহার করবি।
সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে এতকিছু সায়মান জানলো কি করে। অন্যদিকে কথাগুলো শোনামাত্র রিশার চোখ ভিজে উঠল। সে মুখ তুলে তাকাতে সাহস পেল না। দুই হাত দিয়ে জামা শক্ত করে চেপে ধরল।
আকাশ এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। চারপাশে নিস্তব্ধতা। তারপর সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে বলল,
— ভাইয়া, আমি রিশাকে ভালোবাসি। অনেক আগে থেকেই। আমি কখনো জোর করে কিছু করিনি, করতেও পারতাম না। রিশা নিজে চাইলে তবেই আজ এখানে দাঁড়িয়ে আছি। আমি তো পিছাচ্ছিলাম আপনারা সবাই রাজি হবেন কি আমাদের সম্পর্ক নিয়ে।
সায়মান চোখ সরু করে তাকিয়ে রইল।

— ভালোবাসা মুখে বললেই হয় না। প্রমাণ লাগে।নিজের করে একটা দায়িত্ব থাকে। ভালোবাসার মানুষকে ভাগ্যের উপর কখনো ছেড়ে যেতে হয় না। এরপর থেকে যেন মনে থাকে কথাটা ভালোভাবে।
আকাশ এক পা সামনে এগিয়ে এলো।
— প্রমাণ আমি সারাজীবন দিয়ে দেবো ভাইয়া। আপনার বোনকে সম্মান না করতে পারলে আমি নিজেকেই ক্ষমা করবো না। আমি জানি, আমি ওকে ইগনোর করেছি অনেক কিন্তু বিশ্বাস করুন, উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না।
সায়মান কিছু বলল না। এবার সে পাশ ফিরে তাকাল রিশার দিকে।
রিশা মাথা নিচু করে বলল।
— সরি ভাইয়া। আমি নিজের ইচ্ছাতেই এসেছি। আমি জানি তুমি রাগ করবে, কিন্তু আমি নিশ্চিত আমি ভুল মানুষকে বেছে নিইনি।
সায়মান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে হলো বুকের ভেতর জমে থাকা কিছু ভার সে একটু নামাতে পারছে।তারপর সে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল রিশার দিকে।

— হুম অনেক বড় হয়ে গেছিস সবাই নিজের ভালো নিজেরা বুঝে নিচ্ছিস ?
রিশা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দু’চোখ ভরে পানি জমে উঠল। সে এক পা এগিয়ে এসে কাঁপা গলায় বলল,
— সরি বড় ভাইয়া… তোমাকে না বলে এমন করা উচিত হয়নি আমার। আমি জানি, তুমি কষ্ট পেয়েছো। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি খুশি।
এই কথা বলেই সে মাথা নিচু করে ফেলল। কান্নার শব্দ চেপে রাখতে পারছে না। সায়মান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সবাই সায়মনের দিকে তাকিয়ে আছে ভাবছে এবার বুঝি আবার বিস্ফোরণ হবে।
— সমস্যা নেই।
রিশা অবাক হয়ে তাকাল। সায়মান আবার বলল,
— কিন্তু একটা কথা ভেবে রাখবি। ভালোবাসা মানে নিজের আত্মসমর্পণ করা কিন্তু নিজের আত্মবিশ্বাস নিচু করা না। কেউ যদি তোকে অসম্মান করে, আগে সেটা থামাবি। ভালোবাসার নাম করে নিজেকে ছোট করবি না।
এই কথা শেষ হতেই রিশা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এগিয়ে এসে সায়মানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

— বড় ভাইয়া…সরি।
কান্নাভেজা কণ্ঠে বলল সে। সায়মান প্রথমে একটু থমকে গেল। তারপর ধীরে ধীরে হাত তুলে রিশার মাথায় রাখল।
— বোকা মেয়ে, — আস্তে বলল।
নাফিসা চোখ মুছছে,এত সময় ধরে সায়মানকে যত দেখছে তত ভালো লাগা কাজ করছেন। সায়মান সবাইকে একবার দেখে নিল।
— আজ যা হওয়ার হয়ে গেছে। কিন্তু মনে রাখবি পরিবার মানে দায়িত্ব। আজ থেকে সেই দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। কথাটা বলেই সে এক পা পেছাল।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬২

— চল, সবাই গাড়িতে উঠ সোজা রাশিদ ভিল্লা যাবি।
সাবাই সায়মানের কথা মতো গাড়িতে একে একে উঠতে লাগলো।নাফিসা রুহির পিছন পিছন লুকিয়ে যেতে লাগলো। আর মাঝে মাঝে উকি দিয়ে দেখছে সায়মান কি করছে। সায়মান রাজি বের সাথে কথা বলছে। সেটা দেখে নাফিসা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। গাড়িতে উঠতে যাবে ঠিক সেই সময়
— মিসেস সায়মান তাহের রাশিদ আপনি কোথায় যাচ্ছেন।
সায়মানের গম্ভীর স্বর শুনে নাফিসা চোখ বুজে মাথা নিচু করে নিলো। এবার নিশ্চয়ন DSP সাহেব এবার তার রিমান্ডে নিবে।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৩