Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৮

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৮

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৮
সাইদা মুন

—মিসেস তালহা সিকদার…
তূর্য পিটপিট করে তাকিয়ে আছে, মাথার ভেতর যেন মুহূর্তের মধ্যে হাজারটা হিসাব কষছে। চোখের পাতার ফাঁক দিয়ে বারবার মেহরীন আর তালহার দিকে তাকাচ্ছে, কিছু মিলানোর চেষ্টা চলছে।
তালহা তাকে কোনো গুরুত্ব না দিয়েই মেহরীনকে নিয়ে এগিয়ে গেল চায়ের দোকানের দিকে। যে পাশে তূর্যরা বসেছিল, ঠিক তার বিপরীত বেঞ্চের সামনে এসে তালহা থামল। হাত দিয়ে আলতো করে ঝেড়ে নিল মেহরীনের বসার জায়গাটা, ধুলোবালি যেন তার কাপড়ে না লাগে। তারপর চোখের ইশারায় বসতে বলল।
মেহরীন বসতেই সে দোকানদারের দিকে ফিরে বলল,

—মামা, চারটা দুধ-চা দিয়েন।
তার পাশে বসতে বসতেই সামনে থেকে মিত্তিকা তালহাকে সালাম দিল,
—আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া, কেমন আছেন?
তালহা হাসিমুখে উত্তর দিল,
—ওয়ালাইকুম আসসালাম, আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
—এইতো, আল্লাহর রহমতে ভালোই।
তারপর মেহরীনের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে কৌতূহলী স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—গার্লফ্রেন্ড নাকি?
প্রশ্নটা করতেই তালহা সঙ্গে সঙ্গে মেহরীনের দিকে তাকাল। চোখাচোখি হতেই ঠোঁটের কোণে একফোঁটা হাসি ফুটে উঠল। নরম কণ্ঠে বলল,

—উহু, ওয়াইফ।
মিত্তিকা এগিয়ে এসে হাসিমুখে মেহরীনের দিকে হাত বাড়াল। মেহরীনও উঠে হ্যান্ডশেক করতেই মেয়েটা হালকা করে জড়িয়ে ধরল।
—কেমন আছেন ভাবি?
“ভাবি” শব্দটা কানে যেতেই মেহরীনের গাল হালকা লাল হয়ে উঠল। এই প্রথম কেউ তাকে এই নামে ডাকল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। লজ্জা সামলে মুচকি হেসে বলল,
—আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি, আপনি?
—আমি তো ভালোই, আপনাকে দেখে তো আরও ভালো লাগছে।
তারপর দু’জনের মাঝে হালকা কথাবার্তা চলতে লাগল। ওদিকে তূর্য বসে আছে, মুখটা বাংলার পাঁচের মতো হয়ে গেছে। বিরক্তির নিয়ে তালহার দিকে তাকিয়ে বলল,
—শালা, আগে বললেই হতো এটা মেহরীন। হুদাই আজাইরা কত কী ভেবে ফেলেছি।
তালহা গম্ভীর চোখে ঝাড়ি দিল,
—ইডিয়েট! আমাকে কি তোর যাতা ছেলে মনে হয়? বউ রেখে পরকীয়া করব আমি?
তূর্য সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে বলল,

—তা না.. কিন্তু বউ না মানা ছেলে হঠাৎ করে বউকে নিয়ে ডেটে আসলে সন্দেহ তো হবেই।
তালহার রাগী দৃষ্টি পড়তেই তূর্য সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেল। দোকানের এক ছেলে এসে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ নামিয়ে দিয়ে গেল সকলকে। কথার ফাঁকে ফাঁকে চায়ের ধোঁয়া উঠছে, ধীরে ধীরে তাদের ছোট্ট আড্ডাটা জমে উঠল।
নদীর ধারে বিকেলের এই পরিবেশটা ছিল অপূর্ব। হালকা বাতাস এসে মাঝে মাঝেই গা ছুঁয়ে যাচ্ছিল, পানির ওপর ছোট ছোট ঢেউ রোদের আলোয় ঝিলমিল করছিল। মাঝে মাঝে গাড়ির হর্ন, পথচারীদের কথা, আর চায়ের দোকানের কোলাহল, সব মিলেমিশে তৈরি হয়েছে এক শান্ত অথচ প্রাণবন্ত বিকেল।

মেহরীন নিকাবটা মাথার ওপর তুলে চা খাচ্ছিল। কিন্তু লিলেন কাপড়ের নিকাবটা বারবার গড়িয়ে চোখের সামনে নেমে আসছিল। একবার তুলছে, আবার পড়ছে, ঠিকমতো চুমুক দিতেই পারছে না। বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে কয়েকবার উঠাল। শেষবার যখন আবার নেমে এল, তালহার চোখে পড়ল বিষয়টা। কোনো কথা না বলেই হাত বাড়িয়ে নিকাবটা উপরে তুলে ধরল। মেহরীন চমকে তাকাল। চোখে বিস্ময় কে তার নিকাব ধরল? তবে তালহাকে দেখতেই সঙ্গে সঙ্গে প্রশান্তির এক কোমল হাসি খেলে গেল মুখে। তালহা চোখের ইশারায় বোঝাল, চা খেতে। মেহরীন একগাল ভরে হেসে উঠল। এবার নিশ্চিন্তে দু’হাতে কাপ ধরে ফুঁ দিতে দিতে চা খাচ্ছে।
আর তালহা, সে এক হাতে নিজের চায়ের কাপ, অন্য হাতে স্ত্রীর নিকাব ধরে রেখেই তূর্যর সঙ্গে কথা চালিয়ে যাচ্ছে। একটুও অস্বস্তি নেই, যেন এটা তার স্বাভাবিক দায়িত্ব।

মিত্তিকা এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে দৃশ্যটা দেখছিল। ছোট ছোট যত্ন যে কত বড় ভালোবাসার ভাষা, সেটা যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। অন্য কেউ হলে হয়তো বলে দিত, নিকাব খুলে খাও। এভাবে ধরত কজন? বা এভাবে ধরে রাখার চিন্তাই আসত কজনের? এই ছোট ছোট খেয়ালেও যে এক আকাশ পরিমান ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে তা মানুষ বুঝে না। যদি সকলে বুঝত ছোট ছোট যত্ন, ভালোবাসা আগলে রাখার বড় হাতিয়ার। তাহলে হয়তো বিচ্ছেদ নামের শব্দটা এক কোনে পড়ে থাকত অবহেলায়।
মিত্তিকা বারবার তূর্যকে কনুই দিয়ে গুতো মারছে আর চোখে চোখে ইশারা করছে তাদের দিকে। তূর্য কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল,

—কি সমস্যা? গুতাচ্ছো কেনো?
মিত্তিকা গরম চোখে তাকাল,
—সামনে দেখো তোমার ফ্রেন্ড, যাকে তুমি নিরামিষ বলো, সে দেখো বউয়ের কত্ত কেয়ার করে। কি সুন্দর নিকাবটা ধরে রেখেছে বউয়ের প্রবলেম হচ্ছে বলে। কি জ্যান্টেলম্যান সে। আর তুমি? তুমি কি করো? সামান্য আমার ব্যাগও দুই সেকেন্ড হাতে রাখতে পারো না।
তূর্য থতমত খেল মিনমিনিয়ে বলল,
—না মানে বেবি তুমি তো ম্যাচিউর নিজেরটা নিজেই বুঝো। তালহার বউ পিচ্চি তাই একটু আদটু যত্ন করে বুঝো না।
মিত্তিকা সঙ্গে সঙ্গে ধমক মারল,
—মেয়েটা মোটেও এতটা পিচ্চি না। কথাবার্তা, ভাবভঙ্গি যথেষ্ট ম্যাচিউর। আসল কথা তালহা ভাইয়া বউকে ভালোবাসে তাই যত্ন করছে। তুমি আমাকে ভালোবাসো না তাই যত্নও করোনা।
তূর্য অসহায় মুখে তাকাল। লেগে গেল দুজনের ফের খোচাখোচি। তাদের টানাটানির বড় হত দেখে কথার মাঝেই তালহা গলা খাঁকারি দিল। দুজন থামতেই তালহা জিজ্ঞেস করল,

—এনিথিং রং?
তূর্য ঠোঁট উল্টে বলল,
—শালা তোর বউয়ের প্রতি যত্ন দেখে আমার সংসারে আগুন লেগেছে। দেখ এ বলছে আমি নাকি তাকে ভালোই বাসি না। ভালো না বাসলে কি চারটা বছর এমনি এমনি ঘাস কেঁটে এসেছি?
তালহা শুনল কথাগুলো। পরপর শান্ত কন্ঠে বলল,
—শোনো মিত্তিকা সবার ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম এক হয় না, একেকজনের ভালোবাসার কোড একেকরকম।
তূর্য মুখ ফুলিয়ে বলল,
—এক্সাক্টলি এটাই বোঝাতে পারছি না। একটু আগে যে, সে রাগ করল সকলের সামনে আমি হাটু গেড়ে বসে তার রাগ ভাঙালাম সেটা তো সে দেখলও না।
তালহা মৃদ্যু হাসল,

—অন্যেরটা দেখে কখনো নিজের ভালোবাসাকে জাজ করবে না। তুমি যেটা পেয়েছো, সেটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখো, দেখবে সেটাই তোমার কাছে সেরা লাগবে। প্রত্যেক সম্পর্কের যত্নের ভাষা এক হয় না, বরং আলাদা হয়। আর আমাদের তা বুঝে নিতে হয়। তাছাড়া আমার বন্ধু কিন্তু সলিড, তুমি বলতে পাগল।
মিত্তিকা অপরাধবোধে ধীরে মাথা নিচু করল। এই প্রথম স্পষ্ট করে বুঝতে পারল, তূর্যের যত্নগুলো কখনোই সামান্য ছিল না। চারটা বছরে ছেলেটা কম কিছু করেনি। সারাদিনের ক্লান্তি বয়ে এনে শেষ পর্যন্ত সময়টা রাখত শুধু তার জন্যই। রাতের ঘুম বিসর্জন দিয়েও কথা বলত, খোঁজ নিত। সপ্তাহে অন্তত একদিন তাকে নিয়ে ঘুরতে যায়। কই এইদিনটাও তো পারত ফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরতে। অথচ এই দিনটা সে রেখেছে শুধুমাত্র তাদের দু’জনের একান্ত সময় কাটানোর জন্য। এমনও দিন গেছে সে রাগ করে ব্লক মেরেছে। রাত দুইটা তিনটায়ও ছেলেটা পাগল হয়ে ছুটে এসেছে বাসার নিচে। এগুলো কি তুচ্ছ কিছু? অথচ সে কী করছিল? অন্যের চকচকে যত্ন দেখে নিজের পাওয়া ভালোবাসাটাকে ছোট করে দেখছিল। তুলনার পাল্লায় তুলে নিজের সম্পর্কের মূল্য কমিয়ে দিচ্ছিল, যা একেবারেই অন্যায়।
গলা নামিয়ে বলল,

—সরি…
তূর্য হেসে মিত্তিকাকে আগলে নিল। এক হাতে নিজের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
—হুশ, কিসের সরি মাই লাভ…
মেয়েটা ভাঙা কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
—তুমি আমাকে ভুল বোঝছ? আমি যে এত রাগারাগি করি, এজন্য আমার থেকে মন উঠে যাচ্ছে তোমার?
তূর্য মুখের হাসি রেখেই হালকা গুনগুন করে গেয়ে উঠল,
“তুমি আমার অনেক শখের খুঁজে পাওয়া এক প্রজাপতি নীল…”
সুর থামিয়ে নরম স্বরে বলল,
—তোমার থেকে এত সহজে মন ওঠার নয়। কোনো এক আপন সকালে, তোমার চুলে তেল দিয়ে দেওয়া এখনো বাকি।
মেহরীন মুঁচকি মুঁচকি হাসছিল তাদের ভালোবাসা দেখে। আনমনেই ঘেঁষে বসল, এক হাতে তালহার বাঁ হাতটা জড়িয়ে ধরল আবেশে। তালহা একপলক তাকাল তার দিকে। চোখে চোখ পড়তেই দুজনেই হেসে উঠল।
চা শেষ হতেই তালহা কাপ দুটো নামিয়ে রাখল টেবিলে। উঠে দাঁড়াল বিল মেটাতে মেটাতে বলল,

—তা প্রেম তো বহুত করলি, বিয়ে করছিস কবে?
তূর্য শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে বলল,
—এই বছরই। আর সিঙ্গেল থাকা যাচ্ছে না, কোলবালিশে পোষায় না।
সঙ্গে সঙ্গে মিত্তিকা তূর্যের বাহুতে একটা থাপ্পড় বসাল।
—কিসব কথা বলছ!
তূর্য ঠোঁট কামড়ে হাসল,
—কেন, সত্যি কথাই তো বলছি।
মিত্তিকা রাগী চোখে তাকিয়ে ঝাড়ি মারল,
—নিলজ্জ!

তালহা আর তাদের দিকে তাকাল না। ঘুরে মেহরীনের দিকে চোখ রাখতেই দেখে মেহরীনও আগে থেকেই তাকিয়ে ছিল তার দিকেই। তালহা এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল। হাত বাড়াতেই মেহরীন নিঃশব্দে নিজের হাতটা তুলে দিল তার হাতে।
চারজনেই ধীরে ধীরে হাঁটছে নদীর ধারের আঁকাবাঁকা পথ ধরে। এক পাশে শান্ত নদী, জলের ওপর পড়ন্ত সূর্যের সোনালি আলো ঝিলমিল করছে। বাতাসে ভেসে আসছে হালকা শীতলতা আর কাঁচা ঘাসের গন্ধ।
কখনো তূর্য মিত্তিকাকে খোঁচা দিচ্ছে, কখনো মিত্তিকা রাগী মুখ করে পাল্টা জবাব ছুঁড়ে দিচ্ছে। আবার তূর্যের একেকটা কথায় কখনো সকলে হেসে উঠছে। ছেলেটা বড্ড মজার।
একটু সাইডে আসতেই হঠাৎ তালহা মেহরীনের হাত ধরে থামিয়ে দেয়। তূর্যরা কিছুটা সামনে যেতেই সামান্য ঝুঁকে মেহরীনের কানের কাছে বলল,

—আমারও কিন্তু কোলবালিশে হচ্ছে না…
আচমকা কথায় মেহরীনের চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
—মা…মানে…
তালহা নিচু স্বরে বলল,
—মানে এখন কোলবালিশের বদলে অন্য কিছু দরকার।
মেহরীন জড়তা নিয়ে বলল,
—ক…কি?
তালহা ঠোঁট কামড়ে ফিসফিস করে বলল,
—মেহরীনকে…
মেহরীন যেন স্তব্দ। কি বলবে বুঝে উঠতে পারল না। জায়গাতেই জমে গেল মেয়েটা। তালহার অপ্রত্যাশিত আবদারে। এরমাঝে তূর্যের ডাক পড়ল। তালহা চোখ টিপে মেহরীনের হাত ধরে এগিয়ে গেল সেদিকে। আর মেহরীন সে যেন রোবটের মতো হাঁটতে লাগল তালহার পায়ের তালে তালে
সবাই বসে আছে ঘাসের উপর। সন্ধ্যা নামার আগের মায়াময় পরিবেশ এখন। সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। সুন্দর সেই দৃশ্য উপভোগের মাঝেই চলছিল নানান কথা।

—ভাই, শুনেছি মানুষ ভাইয়া থেকে স্যাইয়া হয়। তুই তো শালা কাহিনি উল্টে দিলি। স্যাইয়া থেকে ডিরেক্ট ভাইয়া..?
বলেই হু হু করে হাসতে লাগল। মেহরীনও মিটিমিটি হাসছে। তালহা গরম চোখে তাকিয়ে বলল,
—শাট আপ ইয়ার! এসব ফাইজলামি একদম পছন্দ হচ্ছে না আমার।
মেহরীন তালহাকে আরেকটু রাগাতে তূর্যের পক্ষ নিয়ে বলল,
—কেন, কেন? তূর্য ভাইয়া খারাপ কি বলল? তালহা ভাইইইইই…
তালহা চোখ রাঙাল, তবে কিছু বলল না। তূর্য প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
—তা তুই মেহরীনকে সবার সামনে আনবি কবে?
তালহা দু’হাত পেছনে ঘাসে রেখে পিঠ হেলান দিয়ে বসল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—খুব শিগগিরই…
—বাহ বেটা, তাহলে তো ট্রিট তাড়াতাড়িই আসছে!
তূর্যের কথায় মাথা নাড়ল তালহা। তবে মেহরীন কৌতূহলী চোখে তালহার দিকে তাকিয়ে রইল। “খুব শিগগিরই” মানে কী? তাহলে কি এবার তাদের সম্পর্কটা সবার সামনে তাড়াতাড়িই আসতে চলেছে? কিন্তু বর্তমানে যেই পরিস্থিতি, এর মাঝে যদি জানাজানি হয়, তাহলে ঝামেলা আরও বাড়বে। চিন্তাগুলো তাকে বেশ ভাবাতে লাগল।

— তাহসান, তুই কাল রাত থেকে কোথায় ছিলি?
রাতে তো বাড়ি ফেরার কথা ছিল।
তানিয়া বেগমের প্রশ্নে তাহসান নরম কণ্ঠে উত্তর দিল,
—রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল। খুব টায়ার্ড লাগছিল, তাই এক বন্ধুর বাসাতেই থেকে গেছি।
—একবার ফোন করে জানাতে পারতিস। ভাবি কত চিন্তা করছিল। এবার যা, ফ্রেশ হয়ে আয়। খাবার দিচ্ছি। আজ আবার সিলেট থেকে তোদের বাড়ির সবাই আসছে।
কথাগুলো বলেই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তানিয়া বেগম। তাহসান কপাল কুঁচকে তাকাল,
—কেন? হঠাৎ এমন কী হলো?
তিনি কিছু বলার আগেই মেহেদি মুখ খুলল,
—মেহরীন আপু নাকি তোমাদের ছোট ফুফুর মেয়ে।
কথাটা শুনতেই তাহসান স্তব্ধ বনে গেল। হতভম্ব দৃষ্টিতে মেহেদির দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষন। মাথায় ঢুকল না সঙ্গে সঙ্গেই কিছু। তবে বুঝল চোখ ফেরাল তানিয়া বেগমের দিকে,

—আন্টি, মেহেদি কী বলছে?
তিনি মাথা নেড়ে বললেন,
—আমরাও তাই-ই শুনলাম।
তারপর তিঞ্জ ঘটনাটা সংক্ষেপে বলতে না বলতেই তাহসান চমকে উঠে দাঁড়াল।
—কি বলছ! সত্যি বলছে ও?
তানিয়া বেগম উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,
—কি জানি বাবা। মেয়েটা তো এসবই বলল। কথা শুনে সত্যই লাগল। এখন সত্য-মিথ্যা যাই হোক, তোদের বাড়ির লোক এলে সব পরিষ্কার হবে। বোনের খবর পেয়ে তো ভাবি অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
—মেহরীন এখন কোথায়?
—ঘরেই থাকার কথা।
এক মুহূর্ত দেরি না করে তাহসান পা বাড়াল তাহিয়ার ঘরের দিকে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকবার টোকা দিল। ভেতর থেকে তাহিয়ার কণ্ঠ ভেসে এল,

—আসছি, আসছি…
শুয়ে শুয়ে মুভি দেখছিল তাহিয়া। দরজায় ডাক শুনে অকারণেই বুকটা কেঁপে উঠল। দরজা লাগিয়ে রেখেছিল, যাতে মেহরীন ঘরে নেই তা কেউ না দেখে। মেহরীন কোথায় এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে চায়না সে। মিথ্যা বলা তার ধাতে নেই, গড়মেল লাগাবেই। ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে দুশ্চিন্তা নিয়েই দরজা খুলল।
দরজার সামনে বিধ্বস্ত অবস্থায় তাহসানকে দেখে সে কিছুটা চমকালো। চোখ দুটো লাল, ফর্সা মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে আছে। দেখে লাগছে, সারা রাত এক ফোঁটাও ঘুমায়নি। চুল এলোমেলো, মুখজুড়ে চাপা অস্থিরতা। চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
—ভাইয়া, তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?
তাহসান কোনো উত্তর না দিয়ে একেবারে সোজা প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
—মেহরীন কোথায়?
তাহিয়া থমকে গেল। যে প্রশ্নটা সে এড়িয়ে যেতে চাইছিল, সেটাই প্রথমেই এসে পড়ল। জড়তা কাটাতে না পেরে আমতা আমতা করে বলল,

—ও..ওই আর কী, ভাইয়ার সঙ্গে গেছে।
কথাটা শোনা মাত্র তাহসানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। এই দুজনের জন্যই কাল রাগ থেকে তার ভেতরটা জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। পুরো রাত নিজেকে নিঃশব্দে কষ্ট দিয়ে কাটিয়েছে সে। নিজেকে সামলে বাড়ি আসতেই এখন সেই একই কথা।
রাগ চেপে রাখতে না পেরে চেচিয়ে উঠল,
—কিসের জন্য গেছে?
তাহসানের আচমকা রাগে তাহিয়া হকচকিয়ে গেল। বুঝল না রাগের কারণ। নিচু স্বরে বলল,
—ওর.. ওর একটা কাগজ আনতে গেছে।
—কিসের কাগজ?
—তা জানি না তো।

রাগ সামলাতে না পেরে তাহসান দেয়ালে সজোরে ঘুষি মারল। আর একটি কথাও না বলে সেখান থেকে সোজা নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। তাহিয়া ভয়ে যেখানে ছিল, সেখানেই জমে রইল। হঠাৎ এমন কী হলো? কেনই বা এতটা রেগে উঠল সে? প্রশ্নগুলো তার মাথার ভেতর এলোমেলো হয়ে ঘুরপাক খেতে লাগল।
হন্তদন্ত পায়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা শব্দ করে বন্ধ করে দিল তাহসান। তারপর দেয়ালে একের পর এক ঘুষি বসাতে লাগল, যেন প্রতিটি আঘাতে জমে থাকা ক্ষোভটুকু নিংড়ে ফেলতে চাইছে। দশ-বারোটা ঘুষির পর ডান হাতটা যখন থেঁতলে গেল, আঙুলের ফাঁক গলে রক্ত চুইয়ে পড়তে লাগল। তখনই সে থামল।

আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের বিধ্বস্ত প্রতিবিম্বের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। চোখে জমে থাকা উন্মত্ততা, মুখজুড়ে অসহ্য রাগ। পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিচ্ছিরি, বিকৃত হাসি। আঙুল বেয়ে রক্ত টপটপ করে পড়ছে নিচে। সেই রক্তমাখা হাতটাই তুলে সে আয়নার গায়ে বড় বড় অক্ষরে লিখল, “MEHRIN”। লেখাটা শেষ হতেই নামটার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষন। তবে হঠাৎই চোখের সামনে ভেসে উঠল তালহার বাইকের পেছনে মেহরীনের বসে থাকার দৃশ্য। বুকের ভেতরটায় মুহূর্তে কিছু যেন ছিঁড়ে গেল। সেকেন্ডে আয়নায় সজোরে আরেকটা ঘুষি মারল সে। ঝনঝন শব্দে আয়নাটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল পুরো ফ্লোর জুড়ে কাচ, ঠিক তার ভেতরের অবস্থাটার মতোই।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৭

তবে সেদিকে কোনো তোয়াক্কা না করেই ফুসতে ফুসতে পকেট থেকে মোবাইল বের করল। চোখে-মুখে এখন প্রচণ্ড রাগের ঝিলিক। নিজেকে সামলে নিয়ে কল লাগাল। দুবার রিং বাজতেই কল রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে ‘হ্যালো’ শোনা যেতেই তাহসান গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,
—লোকেশন পাঠাচ্ছি। সময় মতো চলে আসবে…

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৯