প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৭
সাইদা মুন
মেহরীন কালো বোরকাটা গায়ে জড়িয়ে, মুখে নিকাবটা ঠিকমতো বেঁধে নিল। আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নিয়ে নিচে নামতে এগোল। আস্তে ধীরে নিচে নামছে সঙ্গে তাহিয়া। বিকেলের সময়, বাড়িটা এখন নিস্তব্ধ। সবাই যার যার ঘরে, কেউ ভাতঘুমে, কেউ রেস্ট নিচ্ছে। দেখার মতো কেউ নেই। তাও, বের হওয়ার আগে সতর্কতার খাতিরে তাহিয়া একবার নিচে নেমে চারপাশে চক্কর দিয়ে গেছে, কেউ আছে কি না তা দেখে নিতে। তারপরেই বান্ধুবিকে নিয়ে সাবধানে বাড়ি থেকে বের হচ্ছে।
মেহরীন চেয়েছিল তাহিয়াকেও সঙ্গে নিতে। কিন্তু সে যাবে না ঘুম আসছে, এই অজুহাতেই দায়িত্ব সেরে ফেলেছে। বাইরে পা দিতেই চোখে পড়ল তালহাকে। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে। শুভ্র রঙের পাঞ্জাবির পকেটে এক হাত গুজে বাইকের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। অন্য হাতে মোবাইল কিছু যেন মনোযোগ দিয়ে দেখছে তাতে। চোখে কালো চশমা, কবজিতে ঝকঝকে সিলভার ঘড়ি। বিকেলের রোদ মুখে পড়তেই শ্যাম পুরুষটা যেন আরও আলাদা করে জ্বলে উঠছে, অদ্ভুত এক সৌন্দর্য যেন লোকটাকে ঘিরে ধরে আছে।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে গেল মেহরীন। তা দেখে তাহিয়া খোঁচা দিতে ভুলল না। ফিসফিস করে বলল,
—আমার ভাইকে পরে যত খুশি তাকিয়ে দেখবি, আগে এখান থেকে কেটে পর তো ভাই।
বান্ধুবি সাথে ননদের এমন কথায় মেহরীন লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয়। দ্রুত পায়ে এগোতেই দেখে তালহা ইতিমধ্যেই তাকে দেখে বাইকে বসে গেছে। স্টার্ট দিতে দিতেই ইশারা করল বসতে। বোরকাটা সামলে উঠে বসল মেহরীন। তালহার ঘাড়ে এক হাত রাখতেই সে জিজ্ঞেস করল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—ওল ওকে?
মেহরীন বোরকা ঠিক করতে করতে “হ্যাঁ” বলতে গিয়েও থেমে গেল। তালহার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনার হেলমেট?
তালহা আয়নায় তাকিয়ে বাম হাতে চুল ঠিক করতে করতে বলল,
—সামনেই যাবো, তাই হেলমেটের দরকার নেই। শক্ত করে ধরে বসো।
তারপর তাহিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তোর জন্য কী আনব?
তাহিয়া ঝড়ের গতিতে বলে উঠল,
—আমার জন্য আইসক্রিম, ফুচকা আর আচার আনবে। আর হ্যাঁ, সব তিনটা তিনটা করে আনবে।
তালহার কপাল কুঁচকে গেল,
—একার পেটে তিনটে করে খাবি?
তাহিয়া কোমড়ে হাত দিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
—বাহ রে, তুমি আনলে বুঝি মেহেদি ভাগ বসাবে না? আবার মেহরীনও কি চেয়ে চেয়ে দেখবে? তাই সবার জন্যই আনতে বলছি।
বোনের যুক্তিতে হেসে ফেলল তালহা। মাথায় আলতো এক গাট্টা মেরে বলল,
—হয়েছে পাকামি। এখন ঘরে গিয়ে এক ঘুম দিবি।
এই কথার সাথে সাথেই গাড়ি স্টার্ট দিল সে। বাইক চলতে শুরু করল মসৃণ গতিতে। আস্তে আস্তে গতি বাড়ল। মেহরীন হাতটা আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরল। মিনিটখানেকের মধ্যেই এলাকার গলি পেরিয়ে বাইক বেরিয়ে গেল মেইন রাস্তায়, বিকেলের বাতাসে ভেসে থাকা এক নিঃশব্দ যাত্রা শুরু হলো।
তাদের যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তাহিয়া গেটের ভেতর ঢুকল। যেতে গিয়ে সাইডে বসে থাকা দারোয়ান কাকাকে দেখে কপাল কুঁচকাল। দেখল, লোকটা মিটমিট করে হাসছে। সঙ্গে সঙ্গে তাহিয়ার মুখটা আরও কুঁচকে উঠল। এই ব্যাটা এভাবে হাসছে কেন? ভাবতে ভাবতেই এগিয়ে গিয়ে বলল,
—কি ব্যাপার কাকা, আপনি এভাবে পান খাওয়া লাল লাল দাঁতগুলো দেখিয়ে দেখিয়ে কেলাচ্ছেন কেন?
উনার হাসি আরও প্রখর হলো। মাথাটা সামান্য সামনে এনে ফিসফিস করে বললেন,
—ওদের মধ্যে কিচ্ছু চলে তাই না, তাহিয়া ম্যাডাম?
তাহিয়া চমকে উঠল। এই লোকটা জানল কি করে? সব কি কিছু বুঝে ফেলেছে? কীভাবে? না না, এ লোক জানলে তো পুরো পরিবার সহ এলাকাও জানবে। ভয়ে দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কেমনে জানেন?
তিনি পানের পিক ফেলে আবারও ফিসফিস করে বললেন,
—ওইদিন তালহা স্যার রাইতের বেলা মেহরীন ম্যাডামরে নিয়া গেছিলো। আবার আইজকাও। কিচ্ছু তো চলেই। নাইলে এমনে বার বার ঘুরতে যায়?
বলেই দুই হাত জোড় করে এমন ভঙ্গি করলেন, যেন তিনি নিজেই লজ্জা পাচ্ছেন। তাহিয়া তো আঁতকে ওঠেছে। চোখ বড় বড় হয়ে উঠেছে তার।ভালো মানুষের কাছেই খবর এসেছে। এই লোক যে এদিকের সাংবাদিক, সুযোগ পেলেই নিউজপেপারের মতো এর ওর বাসায় খবর বলতে যায়। দাঁত দিয়ে নখ কামড়াতে কামড়াতে কিছু একটা ভেবে বলল,
—বলেন কি?
উনিও উৎসাহিত হয়ে আরও বলছেন,
—হো হো, আমারে ঘুষও দিছিলো যাতে চুপ থাকি।
এই কথা শুনেই তাহিয়া ধমকে উঠল,
—তো ঘুষ খেয়ে আবার কথা বলছেন কেন?
লোকটা থতমত খেয়ে বলল,
—আরে আপনারেই খালি কইলাম।
তাহিয়া রাগী চোখে তাকিয়ে বলল,
—জানা আছে আপনি খালি একজনকেই বলেন। একজন একজন কররে পুরো এলাকারে বলে ফেলেন। এ বিষয়ে মুখ বন্ধ রাখবেন, নয়তো আপনিও যে পাশের বাসার হাফসা খালার লগে ইটিশপিটিশ করেন, নিজের বউয়ের শাড়ি আইনা ওইদিন গিফট দিছেন। সব আমিও ফাঁস করে দিবো।
বলেই মুখ বাঁকিয়ে ভেতরে চলে গেল তাহিয়া। এদিকে দারোয়ান কাকা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন। মুখটা লটকে গেছে। সামান্য একটা কথায় তার সব সত্য এভাবে ফাঁস। অস্বস্তিতে নড়েচড়ে উঠলেন। না না, এই মেয়ে তো সাংঘাতিক সব খবর জানে। চুপ থাকাই শ্রেয়, এই ভেবেই থমথমে মুখে নিজের জায়গায় বসে পড়লেন।
এদিকে তাহিয়া উনাকে জায়গা মতো৷ জব্দ করতে পেরে হেসেই চলেছে। গেট থেকে মেইন দরজা অবধি সরু রাস্তাটা ধরে হাঁটছে। মাঝপথে যেতেই হঠাৎ কারো গলা ভেসে আসায় থেমে গেল।।
—এই লিলিপুট হাসছ যে, পেত্নি টেত্নি ধরল নাকি? তবে আমি তো দাদির কাছে শুনেছিলাম, পেত্নি ধরলে সন্ধ্যা বা দুপুর টাইমে ধরে। এ অবেলায় কেন তোমাকে ধরতে গেল?
কথাটা কানে যেতেই তাহিয়া কটমট চোখে তাকাল পাশের বাসার ছাদের দিকে। কন্ঠটা চেনা। ফারিস দাঁড়িয়ে আছে, দু’হাত বুকে গুঁজে। ঠোঁটের কোণে সেই চেনা খোঁচা মারা বাঁকা হাসিটা, যেন ইচ্ছে করেই রাগটা উসকে দিচ্ছে। এক সেকেন্ডও দেরি করল না তাহিয়া। দুকদম এগিয়ে গিয়ে কোমড়ে দু”হাত ঠেসে, মাথা উঁচু করে তাকাল। গলায় জমে থাকা রাগটা আর আটকাল না,
—এই, আপনার মুখে কি ভালো কথা নেই? যখন দেখি, খালি আজাইরা কথাই বলেন।
মেয়েটা যে সত্যিই ক্ষেপে গেছে, সেটা বুঝে ফারিস এবার হাসিটা সামলে নিল। গলা নরম করে ঠাট্টার সুরে বলল,
—আরে আরে, কুল কুল। এমনি মটুশটু আরও রাগলে ফোলে ব্লাস্ট হয়ে যাবে, কুল বেবিগার্ল কুল।
—এই মিয়া, আপনার সাথে কথা নাই আর। আর আমাকে ডাকবেনও না।
কথাটা বলেই ধপধপ পায়ে পেছন ফিরে চলেই যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ফারিস চেচিয়ে আবার ডেকে উঠল,
—আরে দাঁড়াও দাঁড়াও, একটা কথা আছে।
তাহিয়া থেমে গেল। জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে বিরক্ত মুখে জিজ্ঞেস করল,
—কি কথা?
এইবার ফারিসের মুখটা সিরিয়াস দেখাচ্ছে। তাহিয়াও দাড়ালো শোনার আগ্রহ নিয়ে। গম্ভীরমুখে বলল,
—একটা কথা…
—তো বলুন।
—কিন্তু এভাবে বলা যাবে না।
—কেন?
—আশপাশের মানুষ শুনবে।
—তাহলে কিভাবে বলবেন?
—আমাদের ছাদে আসো।
কথাটা শুনে তাহিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল। ছেলেটার চেহারা দেখে সত্যিই মনে হচ্ছে কোনো সিরিয়াস কথাই আছে। এমনিতেও এখন তার কোনো কাজ নেই। তাই যাওয়াই যায়। একটু ভেবে নিয়ে বলল,
—আসছি।
বলেই তাদের বাড়ির দিকেই হাঁটা দিল। ফারিস চুপচাপ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে তাকে। খয়েরী রঙের থ্রি-পিস পরা মেয়েটা, ওড়নাটা সুন্দর করে মাথায় টানা। হাতে একটা ফোমের হলুদ ইমোজি বল, সম্ভবত ওটা নিয়েই খেলছিল। ছোট ছোট পায়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। যে পথটুকু আসতে ফারিসের সাধারণত এক মিনিটও লাগে না, সেখান দিয়ে আসতে মেয়েটা পাক্কা তিন মিনিট লাগিয়েছে।
ছাদে উঠেই তাহিয়া হাঁপাতে লাগল। বাইরের সিঁড়ি বেয়ে উঠেছে, তাদের বাড়ির ভেতর দিয়েও ছাদের উঠা যায়। কিন্তু এই সময় সবাই হয়তো ঘুমাচ্ছে ভেবে বেল বাজায়নি। হাঁপাতে হাঁপাতে ফারিসের সামনে এসে দাঁড়াল। রেলিংয়ে ভর দিয়ে বলল,
—বলুন, কী বলবেন।
ফারিস গভীর দৃষ্টিতে তাকে একবার পরখ করে নিয়ে বলল,
—এইটুকুতেই হাপিয়ে গেলে? সাধে কি লিলিপুট বলি?
সঙ্গে সঙ্গে তাহিয়ার চোখ দুটো গরম হয়ে উঠল,
—এই, আপনি কি আমাকে অপমান করতে ডেকেছেন?
ফারিস হেসে মাথা নেড়ে না বলল। ঠোঁট কামড়ে হাসছে। মেয়েটাকে রাগাতে তার ভীষণ ভালো লাগে। রাগলে গাল দুটো টমেটোর মতো ফুলে ওঠে, চোখজোড়া গোলগোল হয়ে যায়। বেশ ভালোই লাগে দেখতে। তাহিয়া তার চুপ করে থাকা দেখে আরও বিরক্ত হয়ে উঠল্ল,
—কি কথা বলবেন, বলুন তাড়াতাড়ি…
ফারিস ধীরে হেঁটে এসে তাহিয়ার পাশে রেলিংয়র সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। শান্ত গলায় বলল
—একটা কথা।
—হ্যাঁ তো, একটা কথা কী?
—একটা কথা হলো, তোমার নাম লিলিপুট ..
তাহিয়া বলদের মতো তাকিয়ে রইল। চোখ দুটো আরও গোল হয়ে গেল।
—মানে?
ফারিস এবার ডোন্ট কেয়ার ভঙ্গিতে চুল ঠিক করতে করতে বলল,
—একটা কথা বলতে ডেকেছি। আমি একটা কথাই তো বললাম। দুইটা কথা বলব নাকি?
তাহিয়া হতবাক হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল,
—মানে? এটা কেমন কথা ছিল?
ফারিস মাথা ঝাকিয়ে বলল,
—একটা কথা…
—আমার সাথে মজা করছেন?
ফারিস মনে মনে হেসে উঠল, কিন্তু বাইরে নিজেকে একদম নরমাল রাখল। ঠোঁট উল্টে বলল,
—যাহ বাবা, মজা করব কেন? যা বলতে ডাকলাম, তাই তো বললাম।
এইবার তক তাহিয়া ফুঁসে উঠেছে। সে একটু সরল বলে এমনভাবে তাকে বলদ বানাবে। ভেবেছিল ইম্পর্ট্যান্ট কথা। এখন দেখছে ফাউল কথা। রাগে হাতে থাকা ফোমের বলটা সোজা ছুড়ে মারল ফারিসের বুক বরাবর। সঙ্গে সঙ্গে ফারিস তা হাতে নিয়ে নিল। তাহিয়া আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ধপধপ পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বকতে লাগল,
—আর যদি আপনার কথা আমি শুনি। বেয়াদব লোক। আল্লাহ আপনার কপালে এমন এক দজ্জাল দিক, যে আপনাকে জ্বালিয়ে মারবে। আমাকে জ্বালানোর সব শোধ তুলবে। অসভ্য লোক!
নানান কথা বলতে বলতেই ছাদ ছেড়ে নেমে গেল। এদিকে ওপরে দাঁড়িয়ে ফারিস শব্দ করে হাসছে। হাসতে হাসতে ডাকছে,
—আরে লিলিপুট, একটু জিরিয়ে তো যাও। পানি খাবে? পানি খেয়ে যাও।
বেচারি তাহিয়া রাগে একপ্রকার ছুটেই নিজের বাড়িতে ঢুকে পড়ল, ফারিসের গোষ্ঠী উদ্ধার করতে করতে।
নদীর ধারের এক চায়ের দোকান, দোকানটা ছোট, টিনের চালের নিচে কাঠের বেঞ্চ আর পুরোনো টেবিল। কেতলিতে ফুটতে থাকা চায়ের গন্ধ বাতাসে মিশে আছে। রোদের তেজ এখন আর তীক্ষ্ণ নয়, নদীর জলে পড়ে থাকা আলোটা ভেঙে ভেঙে সোনালি হয়ে উঠেছে। হালকা হাওয়ায় নদীর বুক কেঁপে ওঠুছে, ঢেউগুলো ধীরে ধীরে এসে ঘাটের পাড়ে আছড়ে পড়ছে।
আজ শুক্রবার হওয়ায় জায়গাটা বেশ জমজমাট। কেউ চুপচাপ নদীর দিকে তাকিয়ে বসে, কেউ বা আধা-উচ্চ স্বরে গল্পে মেতে আছে ফ্রেন্ডদের সঙ্গে। কেউ আবার প্রিয়তম প্রিয়তমা নিয়ে এসেছে।
কাঠের বেঞ্চে বসে আছে তূর্য। পাশে বসে থাকা মেয়েটা মুখ ফুলিয়ে নিশ্চুপ। চোখেমুখে জমে আছে অভিমানের মেঘ।
—জান, দেখো আজকেই লাস্ট। আর দেরি করব না। প্লিজ, মাফ করে দাও…
মিত্তিকা সঙ্গে সঙ্গেই তেতে উঠল। ঝাড়া মেরে তূর্যের হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,
—একদম কথা বলবে না। আমাদের রিলেশনটা নিয়ে তুমি একেবারেই সিরিয়াস না। সারাক্ষণ নিজের কাজ আর বন্ধুবান্ধব। সাপ্তাহে একটা দিন যদি পাই, সেই দিনটাতেও আমাকে একটু সময় দেওয়ার জায়গায় তুমি এত লেট করে আসো!
অভিমানে কথাগুলো বলতে বলতেই মেয়েটার গলা ভেঙে এলো। তূর্য তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলল। কী বলবে সে? এই অভিমান করার অধিকার তো মিত্তিকার আছেই। মেয়েটাকে সে ঠিকভাবে সময় দিতে পারে না, নিজের অগোছালো স্বভাবের দায়ে। সবদিক একসাথে সামলাতে গিয়ে বারবারই হোঁচট খায়। আজও তাই হয়েছে। বাইক নিয়ে বের হতে গিয়ে আধা পথে তেল শেষ। ঠেলে ঠেলে পেট্রোল পাম্পে গিয়ে তেল ভরে তারপর আসা, সময় তো লাগবেই। অথচ এদিকে লেইট হওয়ায় প্রিয় মানুষটা ভুল বুঝে বসে আছে।
হতাশ চোখে চারপাশে তাকাতে লাগল সে। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। এখন মুখের কথায় গলবে না মেয়েটা, ভালো মতোই জানে। তখনই চোখে পড়ল চা-ওয়ালাকে। লোকটা মিটিমিটি হাসছে। চোখাচোখি হতেই দোকানের একপাশে রাখা ফুলগুলোর দিকে ইশারায় দেখাল। মুহূর্তেই তূর্যের মনে যেন আশার আলো জ্বলে উঠল।
সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল সে। এগিয়ে যেতেই দোকানদার দুটো গোলাপ বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
—আজকাল এখানে একের পর এক কাপল আসেই, তাই ফুল আনিয়ে রেখেছিলাম। নেন ভাই, নিজের সংসারটা বাঁচান।
লোকটার কথায় হেসে উঠল তূর্য।
—খুব ভালো কাজ করেছেন ভাই। দেখি, এই ফুলের দোহাই দিয়ে যদি একটু মানাতে পারি।
পকেট থেকে টাকা বের করে হাতে ধরিয়ে দিয়ে ফুল দুটো নিয়ে সে এগিয়ে গেল। সোজা গিয়ে মিত্তিকার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মাটিতে। হঠাৎ এমন কাণ্ডে মেয়েটা হকচকিয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি বলল,
—আরে করছ কী, ওঠো, আশেপাশের মানুষ দেখছে।
তূর্য মুচকি হেসে বলল,
—দেখতে দাও। আজ সবাই হোক আমাদের ভালোবাসার সাক্ষী।
চারপাশে তাদের মতোই দু-একটা কাপক, কিছু ফ্রেন্ড সার্কেল, সকলেই তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। কেউ কেউ মুচকি হাসছে।
তূর্য গলা ছেড়ে বলল,
—শুনুন শুনুন সবাই। আমি ভালোবাসি, ভীষণ ভালোবাসি এই মেয়েটাকে। কিন্তু মেয়েটা বুঝেই না আমার ভালোবাসা। অল্পতেই ভীষণ অভিমান করে বসে এই মহারানী। আমি তো আগেই বলেছিলাম, আমি একটু বেপরোয়া টাইপের। আমাকে সামলাতে হবে, আমার এই স্বভাবটা মানিয়ে নিতে হবে। এভাবে এত রাগ করলে চলবে? আমি তো তোমারই, নিজের সঙ্গে নিজে রাগ করে কেউ?
মিত্তিকা লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে। সকলের সামনে এভাবে যে তার ভালোবাসা প্রকাশ করবে সে ভাবনা যেন ছিলই না। মুহুর্তে মনের ভেতরের খারাপ লাগা চলে গেছে। মুগ্ধ হয়ে শুনছিল প্রতিটা কথা। নিজের অহেতুক সন্দেহে এখন নিজেকেই অপরাধী লাগছে। ছেলেট নাহয় একটু বেপরোয়া, তবে ভালো তো তাকেই বাসে। এটা বোঝা উচিত ছিল তার। আশেপাশের কিছু ছেলেরা চেঁচিয়ে উঠল,
—আপু, আর রাগ করে থেকো না।
কয়েকজন তো সিস বাজালো। মিত্তিকা আর অপেক্ষা করাল না, ফুল হাতে নিয়ে মুঁচকি হেসে ফেলল। টেনে তূর্যকে নিজের পাশে বসাল। তূর্যও হেসে বসল। এক বাহু জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে মিত্তিকা বলল,
—আমিও আপনাকে ভালোবাসি মশাই।
তারপর শুরু হলো নিজেদের কথাবার্তা খুনসুটি। নিজেদের কথার মাঝেই হঠাৎ তূর্যের চোখ আটকে গেল দূর থেকে আসা একটা কালো বাইকে। তালহার মতো কাউকে দেখে কপাল কুঁচকে গেল। মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে রইল। বাইকটা যত সামনে আসছে, কপালের ভাঁজ তত গভীর হচ্ছে। তালহা? তাহলে পেছনে বসা মেয়েটা কে? তালহার গার্লফ্রেন্ড? তবে কি তালহা পিচ্চি বউকে মানে না বলে অন্য মেয়েকে জীবনে নিয়ে এসেছে? প্রশ্নটা মাথায় আসতেই চমকে উঠে। বাইকটা দোকানের সামনে এসে থামতেই তূর্য আর বসে থাকতে পারল না। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল।
—কিরে! কে এই মেয়ে ? মেহরীন কোথায়? তুই কি বউ রেখে পরকীয়া করছিস? ছি ছি, তোর থেকে এসব আশা করিনি। মানছি মেহরীন মেয়েটা পিচ্চি। তাই বলে এভাবে ঠকাবি…
নিজের মতো বকবক করেই যাচ্ছে সে। এদিকে তালহা বাইক সাইডে রাখতে রাখতে রাগী চোখে তাকাল তূর্যের দিকে। মেহরীন তো অবাক হয়ে শুনছে একের পর এক কথা। তালহা এগিয়ে এসে তূর্যের ঘাড়ে এক থাপ্পড় বসিয়ে বলল,
—মুখটা বেশি চলছে না?
—বেটা, আমার মুখের চিন্তা বাদ দে। আগে বল, তুই করছিস কী? দেখি দেখি..
বলেই তালহাকে সাইড কাটিয়ে মেহরীনের দিকে তাকাল। তার দিকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করল,
—কে ওইটা? কারে বাইকে নিয়ে ঘুরছিস? কে এই মেয়ে, নাম কী? পরিচয় কী?
তার একেরপর এক প্রশ্ন উপেক্ষা করে তালহা পাঞ্জাবির পকেটে হাত গুজে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল মেহরীনের প্রশ্নাত্মক, অবাক চোখের দিকে। হেসে বলল,
—আপনাকে ঠিক চিনতে পারছে না ও..
মেহরীন চোখ পিটপিট করে নেড়ে বোঝাল, এই কথাটা সেও বুঝতে পেরেছে। এবার তালহার হাসিটা আরও স্পষ্ট হলো, জিজ্ঞেস করল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৬
—তা ম্যাডাম, আপনার নাম যেন…?
তালহার হাসিমাখা মুখখানা দেখে মেহরীনের মুখেও হাসিরা হানা দিল। গালভরা হাসিতে হেসে উঠল মেয়েটা। নিকাবের আড়ালে তার হাসিটা দেখা না গেলেও, চোখ দুটো হাসির ফলে ছোট ছোট হয়ে যেতেই বোঝা গেল মেয়েটা হাসছে। এগিয়ে গিয়ে তালহার এক হাত বেশ অধিকারী ভঙ্গিতে জড়িয়ে ধরল। তূর্যের দিকে তাকিয়ে হাসিমাখা কণ্ঠে বলল,
—তালহা সিকদার..মিসেস তালহা সিকদার…
