Home লাল শাড়িতে প্রেয়সী লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫৭

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫৭

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫৭
Fatima Fariyal

আকাশে হালকা নীলচে আভা, বাতাসে সকালের শীতল ছোঁয়া। সবাই মিলে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ল তাজমহল দেখার উদ্দেশে। আহাদের জোরাজুরিতেই এত ভোরে বের হওয়া। তার দাবি, ভোরবেলার তাজমহল নাকি সবচেয়ে স্নিগ্ধ, সবচেয়ে শান্ত লাগে। আহিয়া অবশ্য সেই স্নিগ্ধতার কোনো কিছুই টের পাচ্ছে না। তার চোখ আধবোধা, ঘুমে ঢুলুঢুলু করতে করতে হাঁটছে। ঠিকমতো ভারসাম্যও রাখতে পারছে না। আদনান একপাশ থেকে তার হাত ধরে রেখেছে, যেন কোনোভাবে হোঁচট খেয়ে পড়ে না যায়।
তাদের ঠিক পিছনেই হাঁটছে আহাদ আর রিদিতা। এই দৃশ্যটা চোখে পড়তেই আহাদ গলা উঁচু করে চেঁচিয়ে উঠল,

“আহি! তোর কী শরীর খারাপ? অন্যের সাহারা নিয়ে হাঁটছিস কেন? এদিকে আয়!”
আহিয়ার ঘুম একেবারে উধাও হয়ে গেল। আদনান মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে। মনে মনে ভাবছে, এখানে এসেও শান্তি নেই! সে কী কোনোদিন শান্তিতে একটু রোমান্স করতে পারবে না?
রিদিতা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ কনুই দিয়ে আহাদের পেটে গুতো দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“ওরা ওদের মতো ঘুরুক না! আপনি এমন করছেন কেন?”
আহাদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “কেমন করেছি?”
“গ্রামের হিটলার ফুফু-শাশুড়িদের মতো করছেন।”
“কীহ! আমি হিটলার ফুফু-শাশুড়ি?”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

রিদিতা নির্বিকারভাবে বলল, “এর থেকেও বেশি হিটলারি করেন। আপনার শিরায় শিরায় হিটলারি।”
“রিদি! আমি রেগে যাচ্ছি কিন্তু!”
“পারেন তো খালি এই রাগটাই দেখাতে। নাকের ডগায় রাগ নিয়ে ঘুরে বেড়ান সারাক্ষণ। এটা এই কয়েকদিনের জন্য বাংলাদেশে রেখে আসলে কী হতো!”
“রিদি!”
এবার সত্যিকারে আহাদের কণ্ঠে রাগের আভাস। রিদিতা ঠোঁট কামড়ে চুপ করে গেল। না হলে রাগ কোন তুঙ্গে উঠবে, সেটার কোনো ঠিক নেই।
আদনান দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল,
“তোর ভাইয়ের মতো এমন হিংসুটে মানুষ আমি জীবনে দুটো দেখিনি। আমি আমার বউ নিয়ে হাঁটছি, তাতে ওর এত জ্বালা কেন? নিজের বেলায় ষোল আনা, আমার বেলায় চার আনাও না!”
আহিয়া আড়চোখে তাকাল আদনানের দিকে। ঠোঁটে চাপা হাসি।

“আপনি কী কম হিংসুটে? আপনারা দুজনেই এক গোয়ালের গরু।”
“কোন দিক দিয়ে গরু মনে হয় আমাকে?”
“এটা তো কথার কথা।”
“তাই বলে গরু?”
“আপনার কী গায়ে লেগেছে?”
“আহি!”
“ঠিক আছে ধলা বিলাই।”
“কীহহ!”
“এটাও পছন্দ হয়নি?”
“আহিইইই!”
“সরি আদনান ভাই, সরি… আর বলবো না।”
“কী আবার বল!”
আহিয়া মুখ ফস্কে আদনান ভাই বলে ফেলেছে। যার কারনে আদনানের রাগ বেরে গেল। আহিয়া কথার মোড় ঘুড়াতে বলল,
“দেখুন ওই ছেলেটা কত সুন্দর!”
“আহি!”

আহিয়া হেসে এক দৌড় লাগাল। আদনান ক্ষিপ্ত হয়ে তার পিছু নিল। অন্যদিকে, শাহীন আর নীলা পাশাপাশি হাঁটলেও দুজনের মন দুই প্রান্তে। কেউ কারোর দিকে চোখ তোলে না। মাঝখানে অদৃশ্য নীরবতা আর অস্বস্তির দেয়াল। আহাদ জানে নীলার ভেতরে কী চলছে। জানে শাহীনের নীরবতার মানে। তবু সে কখনোই এসব নিয়ে রিদিতার সঙ্গে আলোচনা করেনি। আর করবেও না। সে চায় না রিদিতার মনে কোনো সন্দেহের আঁচর পড়ুক। চায় না তাদের সম্পর্কের কোথাও এক ফোঁটাও ফাটল ধরুক। তাজমহলের স্নিগ্ধ সৌন্দর্য দেখতে শত মানুষ ভীর করেছে; অথচ এখানে সবার গল্প আলাদা, সবার যুদ্ধ আলাদা। কেউ হাসছে, কেউ নীরব, কেউ নিজের ভেতর ভেতরেই লড়ছে।
তাজমহল ছাড়াও আরও কিছু জায়গায় ঘুরে হোটেলে ফিরতে ফিরতে রাত নামল। ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। রাত বারোটা পেরোলেই ২২ অক্টোবর; আহাদের জন্মদিন। বাংলাদেশ থেকেই রিদিতা পরিকল্পনা করেছিল, আহাদের জন্মদিনেই সে সুখবরটা দেবে। আহিয়া শুরু থেকেই সব জানে। নীলা আজ জেনেছে। অথচ তার মুখে কোনো হাহাকার নেই, কোনো আক্ষেপ নেই। বরং অদ্ভুত এক শান্তি ছড়িয়ে পড়েছে বুকের ভেতর। নিজের ভাঙা জীবনটার ফাঁকে অন্য কারো জীবনে নতুন প্রাণ আসছে, এই অনুভূতিটা তাকে ভারী শান্ত করে দিচ্ছে।

সবাই তো এখানে অচেনা, পরিবেশটা ভিন্ন, তবু আহাদের অগোচরে যতটুকু পারা যায় তিনজন মিলে আয়োজন করেছে। সব গুছানো শেষে আহিয়া আদনানকে কল দিল। আদনান পুরো পরিকল্পনা জানে। আগেই বলে রাখা হয়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আহাদ রুমে ঢুকে, সব অন্ধকার। স্বাভাবিকভাবেই কপালে ভাঁজ পড়ল। লাইট অন করতেই পরিবেশ ভিন্ন; সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার প্রেয়সী। লাল শাড়িতে মোড়ানো, যেন আগুনের মতো উজ্জ্বল। চারদিকে লাল গোলাপ, বেলুনে ভরা রুম। টেবিলের উপর কেক, ক্যান্ডলগুলো ছোট ছোট আগুনের শিখার মতো জ্বলজ্বল করছে। রিদিতা এসে তার গলার কণ্ঠমনিতে একটা নরম চুমু খেলিয়ে জড়িয়ে ধরল। আহাদ একটু বিচলিত হয়ে হাসল।

“কী ব্যাপার রিদি রানি! হঠাৎ এত ভালোবাসা? কাহিনি কী?”
রিদিতা অদ্ভুত কোমল কণ্ঠে বলল,
“আপনার জন্য ভালোবাসাটা আমার হঠাৎ হঠাৎই আসে মন্ত্রীমশাই। কী করব বলুন?”
“সবসময় কীভাবে আসবে, শিখিয়ে দেবো?”
আহাদের গলায় দুষ্টুমি। “না, না।” মাথা নাড়ল।
আহাদ চারপাশে চোখ বুলিয়ে বলল,
“এসবের কারণটা জানতে পারি?”
রিদিতা মাথা তুলে তার গাঢ় বাদামি চোখে চোখ রাখল। সেই চোখে আজ গভীরতা, আবেগ, আর একরাশ ভালোবাসা।

“শুভ জন্মদিন মন্ত্রীমশাই। আপনার প্রতিটা জন্মদিন আমাকে নিয়ে শুভ হোক। আমি এভাবে সারাটা জীবন আপনার রাগের কারণ হতে চাই। আপনি যতদিন বিদ্যমান, আমার অস্তিত্ব ততদিন বর্তমান। আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি.. আপনার কল্পনা ছাপিয়ে, তার চেয়েও বহু গুণ বেশি ভালোবাসি।”
আহাদ কয়েক মুহূর্ত নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল। আজ তার জন্মদিন? সে তো ভুলেই গিয়েছিল। সেই ছোটবেলায় এসব করেছে, বড় হওয়ার পর এসব তার জীবনে আর গুরুত্ব পায়নি। অথচ আজ তার প্রেয়সী সবটাকে আবার জীবন্ত করে তুলেছে।

“এসব কখন করলে? কীভাবে…?”
“সারপ্রাইজ। পছন্দ হয়েছে আপনার?”
আহাদ তাকে টেনে নিয়ে গ্রীবায় মুখ গুঁজে দিল। “হুম। খুব।”
“আপনার জন্য আরেকটা সারপ্রাইজ আছে।”
রিদিতার কণ্ঠে চাপা কাঁপন।
“সেটা কী?”
রিদিতা নিজেকে ছাড়িয়ে তাকে টেনে বসাল। হাতে তুলে দিল একটা লাল বক্স।
“এটা আপনার উপহার।”
“ক… কী এটা?”
“খুলেই দেখুন।”

কেমন অজানা অনুভূতি ঘিরে ধরল তাকে। বক্সটা খুলতে গিয়েই খেয়াল করল, তার হাত কাঁপছে। কেন কাঁপছে, সে নিজেও জানে না। কম্পিত হাতে বক্স খুলতেই চোখে পড়ল,
আলট্রাসোনোগ্রাফির কাগজ। আর পাশে রাখা দুই জোড়া ছোট্ট বাচ্চার জুতা। আহাদ বোবা হয়ে গেল। বাদামি চোখ দুটো অশ্রুতে টলমল করে উঠল। সে চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করল,
“এটা… এটা কি সত্যি?”
রিদিতা মাথা নাড়ল। অর্থাৎ হ্যাঁ। আহাদের গলা শুকিয়ে আসছে। নিশ্বাস আটকে আসছে। বিশ্বাস করতে পারছে না। রিদিতা তার উরুতে বসে খসখসে গালে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি ব্যাঙের বাচ্চা চেয়েছিলেন না? আপনার দুটো বাচ্চা আসছে। আপনি বাবা হতে যাচ্ছেন, মন্ত্রীমশাই।”
আহাদ তখনো বোবার মতো বসে।
“আমি… বাবা হবো?” নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। রিদিতা দ্বিধায় পড়ে গেল।
“আপনি খুশি হননি?”

এইবার আহাদের টনক নড়ল। ধীরে ধীরে তার হাত রাখল রিদিতার উদরে। যেন নিজের অস্তিত্ব ছুঁয়ে দেখতে চাইছে।
এক মুহূর্ত পর হঠাৎ সে ফেটে পড়ল।
“আমি বাবা হবো? আমি সত্যিই বাবা হবো? আমি… আমি এখনই আম্মাকে বলতেছি। না, না.. আগে বাবাকে বলি। তুহিন… তুহিন বদমাইশ আমাকে বাচ্চা নিয়ে খোঁটা দিয়েছিল! অপমান করেছে আমাকে.. আগে ওকে বলি। আমি বাবা হবো! আল্লাহ! আমি বাবা হবো! রিদি.. জানু! আমি সত্যিই বাবা হবো!”
আহাদ ঘরের মধ্যে পাগলের মতো পায়চারি করছে। কখনো মাকে কল দিচ্ছে, কখনো বাবাকে। তার এই উচ্ছ্বাসে রিদিতার চোখ ভিজে ওঠে। তখনই আহাদ তার পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে। তার হাতে, গালে, ললাটে, গ্রীবায় অজস্র ছোট ছোট চুমু ছড়িয়ে দেয়।

“আমি বাবা হবো জানু। আমি একসাথে দুই সন্তানের বাবা হবো।”
“হ্যাঁ।”
রিদিতা হাসে পাগলামো দেখে। সে রিদিতার গালে হাত রেখে বলে উঠল, “তুমি জানো? এটা আমার জীবনের বেস্ট সারপ্রাইজ ছিল। আমার সেরা জন্মদিন এটা সেরা! আমি অবশেষে বাবা হবো। আমার দুটো ছানা হবে, ছোটো ছোটো গুলু গুলু বেবি হবে নাহ? তুহিন বজ্জাতটাকে মুখে ঝামা ঘঁষে দিবো।“
হঠাৎ উদ্বিগ্ন হয়ে আহাদ আবার বলল, “কিন্তু তুমি এটা আগে বললে না কেন? হেহ? এজন্যই তোমার শরীর খারাপ ছিল। এখনো খারাপ লাগছে, তাই না? আমি এখনই আদনানকে ডেকে আনছি..”
রিদিতা তার হাত চেপে ধরে।

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫৬

“কী করছেন আপনি? শান্ত হন। আমি ঠিক আছি।”
“আমি কীভাবে শান্ত হবো হুম? কীভাবে?”
রিদিতা হেসে উঠল তার গালে হাত রেখে। এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে আহাদ প্রেয়সীর কোমল চোখে। এরপর হঠাৎ তাকে বুকে চেপে ধরে কেঁদে ওঠে। কান্নার তোড়ে তার কাঁধ দুলছে। রিদিতাও নাক টানছে। কোথায় জন্মদিন, কোথায় সারপ্রাইজ, সব মিলিয়ে মুহূর্তটা ডুবে গেছে ঘন আবেগের ধোঁয়ায়।

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫৮