Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮০

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮০

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮০
রানী আমিনা

হাতে একটা কাঁদা মাটি মাখা কালো রঙা হুডি নিয়ে ছুটতে ছুটতে ক্যাফেটেরিয়ায় এলো সেলিন, চোখে মুখে তার আতঙ্ক৷ ব্রায়ান দাঁড়িয়ে ছিলো সার্ভিস এরিয়াতে, সেলিন হন্তদন্ত হয়ে এসে বলল,
“ব্রায়ান, গতকাল পেছনের বনে পয়জনাস ফ্রগ খুঁজতে গিয়ে নূরের এক ক্লাসমেট এটা পেয়েছে। পরিচিত লাগছিলো দেখে ক্লাসে নিয়ে এসেছিলো আজ, লিভয় দিয়েছে আমাকে। এইটা নূরের হুডি, আমি ভালো ভাবেই চিনি। পরশু রাতে ওর পরণে এটাই ছিলো! নিশ্চয় ওর কিছু হয়েছে, কেউ কিছু করেছে ওর সাথে।”
ভয়ার্ত, জড়ানো স্বরে বলে উঠলো সেলিন। ব্রায়ান শান্ত মুখে বলল,
“তুমি শুধু শুধু চিন্তা করছো সেলিন। তার কিছুই হয়নি, আমি বলছি তোমাকে। ফিরে আসবে সময় হলেই৷ কিছুদিন যেতে দাও।”

“এই সিচুয়েশনে তুমি এত শান্ত কিভাবে আছো ব্রায়ান? আমাদের আর্মিতে যোগাযোগ করা উচিত। নিশ্চয় কেউ কিডন্যাপ করেছে ওকে! ওই বার্থাই কিছু করেছে। ওর কাছে তো ফোনও নেই যে ফোন দিবো, বা ট্রেস করার চেষ্টা করবো! কি হবে এখন? কাকে জানাবো? ওর গার্ডিয়ানের ফোন নম্বর জানা আছে তোমার?”
ব্রায়ান ফোস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
“সেলিন, উনি যেখানেই আছেন ঠিক আছেন। তাঁকে বিপদে ফেলা এত সহজ নয়, তার আশেপাশে দশ বারো জোড়া চোখ সবসময় লেগে থাকে। কিছুই হয়নি তার। তুমি একটা কাজ করো, হুডিটাকে ড্রাই ওয়াশ করতে দাও। উনি ফিরে এলে দিয়ে দিও।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“তুমি ওকে উনি উনি করছো কেন? তোমার কাছে ওর গার্ডিয়ানের ফোন নম্বর আছে কিনা সেটা বলো!”
মেজাজ দেখালো সেলিন। ব্রায়ান ঠোঁট গোল করে শ্বাস ছাড়লো একটা, বলল,
“তোমার জানাই লাগবে? ঠিক আছে, দাঁড়াও। দেখছি আমি।”
ফোন বের করলো ব্রায়ান। এমন সময় ক্যাফেটেরিয়ায় ঢুকলো বার্থা, তার পেছনে জুনায়েদ সাদি। আচমকা তাকে এখানে দেখে চমকালো সকলে। জুনায়েদ সাদিকে কখনো ক্যাফেটেরিয়াতে দেখা যায়না৷ আজ হঠাৎ কি উপলক্ষ্যে, সেটাও বার্থা জাবিনের সাথে!
সেলিন, ব্রায়ানকে এক স্থানে দাঁড়িয়ে গল্প করতে দেখে বার্থা বাজখাঁই গলায় বলে উঠলো,
“এই যে! কি নাম তোমার জানি? ব্রায়ান! এটা কি তোমার বাপের ক্যাফেটেরিয়া? টাকা দিয়ে কি তোমাকে গল্প করার জন্য রাখা হয়েছে এখানে?”

ব্রায়ান থতমত খেলো। সেলিন দ্রুত বেগে সার্ভিস এরিয়া থেকে সরে গিয়ে বসে পড়লো পাশের চেয়ারে৷ বার্থা ধ্বংসাত্মক দৃষ্টি দিলো ওর দিকে। বলল,
“কি ব্যাপার? তোমাদের গুরুমাকে দেখছি না যে! কোথায় সে? পালিয়েছে নাকি?”
সেলিন বলল না কিছুই, গুটিসুটি মেরে বসে রইলো। জুনায়েদ দ্বিধা নিয়ে এগিয়ে গেলো সার্ভিস লাইনের দিকে। ব্রায়ানের সামনে গিয়ে বলল,
“ব্রায়ান! তুমি এখানে কি করছো?”
“জুনায়েদ ভাইজান! কেমন আছেন? আমি…. আসলে…. আমি এখানে পার্টটাইমে আছি।”
“সবাই তোমার ভাইজান দেখি! কোকো লিও-ও ভাইজান, আমিও ভাইজান।”
ব্রায়ান হাসলো, লজ্জাও পেলো বোধ হয় সামান্য। মৃদু স্বরে বলল,
“এই আর কি…. অভ্যাস হয়ে গেছে সবাইকে ভাইজান ডেকে ডেকে!”
বার্থা এগিয়ে গেলো সেদিকে৷ বিস্মিত স্বরে জুনায়েদকে জিজ্ঞেস করলো,

“চিনেন আপনি ওকে?”
“হ্যাঁ, খুব চিনি! কিছু মাস আগেও একসাথে ঘুরতাম সকলে।”
“এই সামান্য সার্ভিস ম্যানের সাথে ঘুরতেন আপনি? ইয়াক!”
চোখ মুখ বিকৃত করে বলল বার্থা৷ জুনায়েদ ভ্রু তুলে তাকালো ওর দিকে, বলল,
“অর্থকড়ি ব্যাতিত আর সব দিক থেকেই সে তোমার সুপিরিয়র বার্থা। তোমার মতন অকর্মণ্য নয় অন্তত, মুরসালিন চাচাজান তোমার এই অহেতুক অহংকার আর চারিত্রিক অধঃপতনের কারণে কথা বন্ধ করেছেন। নিজেকে শোধরাও, সময় আছে এখনো।”
চোখ উল্টালো বার্থা। ব্রায়ান বলল,
“জুনায়েদ ভাইজান, একটা উপকার করবেন?”
“বলো ব্রায়ান, কি উপকার করতে পারি তোমার?”
“একটু এদিকে আসুন!”

জুনায়েদ এগিয়ে গেলো, ব্রায়ান চাপা সুরে তার সাথে কথা বলল কিছুক্ষণ। বিস্মিত দেখালো জুনায়েদকে, খুশিও। বার্থা সেলিনের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলে উঠলো,
“তোমাদের ছোট লোকদের কত সমস্যা দেখেছো? যেইনা একটা বড় ঘরের লোককে দেখবে ওমনি যেভাবে পারা যায় ভিকটিম সেজে, তার থেকে সিম্প্যাথি আর পয়সা আদায় করবে! পারোও বটে তোমরা!”
সেলিন চুপ করে রইলো। বার্থা ওর হাতের হুডিটার দিকে কিয়ৎক্ষণ চেয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলো,
“এটা না ওই অসভ্য মেয়েটার হুডি?”

সেলিন উত্তর দেবার আগেই সেটা খপ করে নিয়ে নিলো বার্থা। এমন খারাপ অবস্থা দেখে বলে উঠলো,
“কোথায় গিয়ে মরেছিলো যে এমন বিশ্রী অবস্থা হয়েছে?”
পরক্ষণেই হুডিটা উলটে পালটে দেখতে দেখতে বলে উঠলো,
“কোন ব্র‍্যান্ড এটা? কোথাকার কোন থ্রিফট থেকে পারচেজ করেছে কে জানে?”
সেলিনের ডাক পড়লো এমন সময়ে, ব্রায়ান ডাকলো তাকে। সেলিন উঠে বার্থার থেকে হুডিটা নিতে গেলে বার্থা দিলোনা। ব্যাস্ত হয়ে গেলো ব্র‍্যান্ড লোগো খুঁজতে। সেলিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সামনে এগিয়ে যেতেই বার্থার কোনো কিছুতে চোখ আঁটকে গেলো। অবিশ্বাসী চোখে সে তাকিয়ে রইলো লোগোর দিকে, স্বর্ণালি সুতোয় লেখা ‘দ্যা দেমিয়ানস’।
ভড়কালো বার্থা। ভীত চোখে একবার ওদের তিনজনের দিকে চেয়ে লোগোটিকে দেখতে দেখতে নিজেও এগোলো সেদিকে।

“জুনায়েদ ভাইজান তোমাকে নূরের খোঁজ জানিয়ে দিবে, অপেক্ষা করো কিছুক্ষণ।”
বলল ব্রায়ান। সেলিন ক্ষণিক অবুঝ চোখে চেয়ে রইলো ব্রায়ানের দিকে। জুনায়েদ সাদিকে ভয় পায় সে, ভয় পায় বার্থাকে, রাজ পরিবারের সাথে সম্পর্কিত সবাইকে! ব্রায়ানের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে জুনায়েদ সাদিকে দেখতে রইলো সে৷ ব্রায়ান চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিলো ভয় নেই তার।
জুনায়েদ ফোন লাগালো কারো কাছে৷ বার্থা এসে দাঁড়ালো ওর পেছনে৷ দু’বার রিং হতেই ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ করলো কেউ, জুনায়েদ বলে উঠলো,
“কোকো ভাইজান, কেমন আছেন?”
ওপাশে কোকো কি বলল শোনা গেলোনা। বার্থা কৌতুহলী চোখে চেয়ে রইলো জুনায়েদের দিকে। সেলিনের পাশে গিয়ে চাপা গলায় শুধোলো,

“নূর আর্মি চিফের মেয়ে?”
“আমি জানিনা, আমাকে ওর বাসার কারো কথা বলেনি কখনো।”
জুনায়েদ সরে গিয়ে কিছুক্ষণ কথা বললো কোকোর সাথে। ক্ষণিক পর এসে ব্রায়ানকে বলল,
“ঠিক আছে সব। তিনি এসে নিয়ে গেছেন উনাকে।”
ব্রায়ান সেলিনকে আশ্বস্ত করে বলল,
“বললাম না, সবই ঠিক আছে। তুমি শুধু শুধু চিন্তা করছো।”
জুনায়েদ বার্থার হাতের দিকে চেয়ে বলল,
“এটা কোথায় পেয়েছো?”

“সেলিনের কাছে ছিলো, নূরের এটা। আমি দেখছিলাম…. একটু।”
“তার জিনিস পত্রের সাথে এটাও রেখে দিবে, পরিষ্কার করে। সময় করে কেউ এসে নিয়ে যাবে।”
বার্থা একবার হুডিটার দিকে চেয়ে দেখলো। ফেব্রিকটা অসাধারণ, এমন ফেব্রিকের পোশাক সে কখনো পরেছে বলে মনে পড়লো না। হাতে নিয়ে রেখেই দিতে ইচ্ছে করছে, ছাড়তে মন চাইছে না। চুপিসারে সে জুনায়েদকে জিজ্ঞেস করলো,
“নূর কি আর্মি চিফ কোকোর মেয়ে? শেহজাদীর সাথে কি তার ভালো সম্পর্ক?”
জুনায়েদ ওর দিকে তাকালে কৈফিয়তের সুরে বলল,
“না… মানে….. ওর হুডির লোগোতে দেমিয়ানদের নাম লেখা!”
“চুপ থাকো বার্থা, তোমার সাথে আমি এ ব্যাপারে পরে কথা বলবো। আপাতত এসব নিয়ে কোনো কথা কারো সাথে বলবেনা, আর হুডিটা অন্যান্য জিনিসপত্রের সাথে রেখে দিবে৷”
ঘুরে সে সেলিনকে জিজ্ঞেস করলো,

“নূরের নিখোঁজের ব্যাপারে অন্য কেউ জানে?”
“আজ ক্লাসে জুলিয়েট ম্যাম জিজ্ঞেস করছিলেন ওর কথা, আমি বলেছি নূরকে আমিও দেখিনি, খুঁজে পাচ্ছিনা। উনি কারো সাথে এ ব্যাপারে কিছু বলেছেন কিনা আমি জানিনা।”
“ঠিক আছে, আমি দেখছি।”

আনাবিয়া দাঁড়িয়ে লাইফট্রির সম্মুখে, মাত্রই এসে পৌঁছেছে। মুখখানা প্রচন্ড শান্ত, নির্বিকার।
সজাগ হয়ে উঠলো লাইফট্রি, আনাবিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিলো নিজের উজ্জ্বল স্বর্ণাভ লতাপাতা গুলি। আনাবিয়ার অনুপস্থিতিতে অনেক শক্তি ক্ষয় হয়েছে তার, ক্ষতিগুলো এখন পুষিয়ে নিতে হবে।
লতাপাতা গুলো এঁকেবেঁকে আনাবিয়ার শরীরের কাছাকাছি আসতেই হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলো সে তাকে, স্পর্শ করতে দিলোনা নিজের শরীর। মৃদু, শান্ত স্বরে বলে উঠলো,
“আ’ ডোন্ট লাইক টাচেস।”

হাত উঁচু করে শুধুমাত্র তর্জনী টা এগিয়ে দিলো, লাইফট্রি নিজের একটি লতা দিয়ে স্পর্শ করলো আনাবিয়ার তর্জনীর অগ্রভাগ। স্বর্ণাভ রশ্মি গুলো প্রবাহিত হলো আনাবিয়ার শরীরে, মুহুর্তেই দৃশ্যমান হলো আনাবিয়ার শরীরের ক্রিস্টালে অঙ্কিত লতায় পাতায় মোড়ানো নকশা গুলো! সেগুলো অনুসরণ করে ক্রমে ক্রমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়লো উজ্জ্বল স্বর্ণাভ আভা, স্বর্ণালি আলোয় ছেয়ে গেলো তার সফেদ চুল, তারকার মতো দ্যুতিময় হয়ে উঠলো তার হীরকখণ্ডের ন্যায় ঝলমলে চোখ জোড়া।

আলগা হলো আনাবিয়ার টেরাকোটা রঙা ঠোঁট জোড়া, গলা থেকে ভেসে এলো এক মোহনীয়, স্নিগ্ধ সুর। ক্রমশ জোরালো হলো তার কন্ঠ, সেই সাথে বাড়লো তার জাদুকরী সুরের মূর্ছনা! মুহুর্তেই আকাশ জুড়ে স্রোতের মতোন প্রবাহিত হতে রইলো উজ্জ্বল স্বর্ণাভ আলো, সজীব করে তুললো শিরো মিদোরির প্রতিটি উদ্ভিদকে, স্নিগ্ধ ঘুমের কোলে ডুবিয়ে দিলো প্রতিটি প্রাণীকে, ভুলিয়ে দিলো যন্ত্রণায় কাতরানো প্রতিটি প্রাণের ব্যাথা।
দায়িত্ব পালন শেষ হলো তার, দায়িত্ব ব্যাতিত আর কিছুই বেঁচে নেই তার ভেতর, থাকতে দেয়নি কেউ। না থাকাই শ্রেয়, এত অনুভূতি কেন থাকবে একজন মানুষের? মস্তিষ্কে জট পাকানো ব্যাতিত অন্য কোনো উপকারে আসেনা সেগুলো।
তাকালো সে একবার ক্রিস্টাল পুলের দিকে। চকচকে পানি, স্বর্ণাভ আলোক স্রোতের ছায়া পড়ছে তার ওপর, ঠিক যেন গলানো সোনা ভর্তি এক পুকুর! আনাবিয়া আজ ডুবলোনা তাতে, কিয়ৎক্ষণ সেদিকে নির্নিমেষ চেয়ে থেকে অবশেষে ধীর পায়ে এগোলো প্রাসাদ অভিমুখে৷

প্রাসাদের মেডিক্যাল জোনের রয়্যাল এরিয়ার সুসজ্জিত কেবিনের আরামকেদারায় বন্ধ চোখে গা এলিয়ে দিয়ে আছে মীর, হাত খানা ঠেকানো কপালে। ওর সম্মুখে সাদা অ্যাপ্রোনে দাঁড়িয়ে এক মধ্যবয়সী পুরুষ, ভোতা শব্দে হাতে থাকা স্বচ্ছ যন্ত্রের ওপর লৌহ শলাকা দিয়ে লিখে চলেছেন ওষুধের নাম। লেখা শেষ হতেই আঙুলের ধাক্কায় লেখাটুকু পাঠিয়ে দিলেন নিজের অ্যাসিস্ট্যান্টের হাতের যান্ত্রিক বস্তুটিতে। সহোযোগিটি তৎক্ষনাৎ বেরিয়ে গেলো ওষুধ গুলো সংগ্রহ করতে৷
কামরা ফাঁকা হতেই মীরের সম্মুখে চেয়ার টেনে বসে পড়লেন তিনি। ইতস্তত স্বরে ডেকে উঠলেন,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি!”
“বলো ইয়াসির।”

“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপনার এই মুহুর্তে খুব বেশি প্রেশার নেওয়া ঠিক হবে না। দয়া করে নিজের ওপর থেকে সব ধরণের প্রেশার কমান। নিজেকে সময় দিন, বিশ্রাম নিন, সময়মত খাবার গ্রহণ করুন। এভাবে শরীরের প্রতি অবহেলা করলে তা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হয়ে উঠবে! আপনার সুস্থতার জন্য বর্তমানে নিয়মিত ঘুমের প্রয়োজন, রোজ অন্তত আট থেকে নয় ঘন্টা। চিন্তামুক্ত থাকা প্রয়োজন, মানসিক প্রশান্তির প্রয়োজন; নইলে এ মাথাব্যাথা কখনোই ঠিক হবার নয়!”
মীর বললনা কিছুই, সেভাবেই রইলো, বোধ করি ইচ্ছে হলোনা তার কিছু বলতে৷ ইয়াসির ক্ষণিক অপেক্ষা করলেন মীরের পালটা জবাবের। কিন্তু জবাব না পেয়ে আবার বলে উঠলেন,
“দয়া করে স্মোকিং ছেড়ে দিন, ইয়োর ম্যাজেস্টি। ওতে আপনার ক্ষতি হচ্ছে আরও। প্রয়োজনে প্রাসাদের কাজ কিছুদিনের জন্য বন্ধ করে কোথাও ঘুরে আসুন, সময় কাটিয়ে আসুন, মেন্টাল প্রেশার কমান। রোজ রোজ এভাবে হাই পাওয়ারের পেইন কিলার নিতে থাকলে কিডনি ফেইলিউরের সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যাবে, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”

মীর তার কথা গুলোকে সম্পুর্ন উপেক্ষা করে বলে উঠলো,
“আপডেট বলো।”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আমাদের চেষ্টা এখনো অব্যাহত আছে। যদিও তেমন কোনো আশার সংবাদ এই মুহুর্তে দিতে পারছিনা, তবে আমরা চেষ্টার ত্রুটি করছিনা।”
“মেয়ে কেমন?”
“মেয়েটিকে যথেষ্ট শক্তিশালী বলেই মনে হয়েছে, ইয়োর ম্যাজেস্টি। বাকিটা পরবর্তীতে বোঝা যাবে। আপনি একটু সুস্থ হয়ে উঠলেই আমরা নেক্সট প্রসেস শুরু করবো, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
“গ্যুড।”
কথা শেষ হতেই অ্যাসিস্ট্যান্টটি পথ্য গুলো নিয়ে হাজির হলো। উঠে বসলো মীর, দু আঙুলে কপাল ঘঁষে চেষ্টা করলো যন্ত্রণা প্রশমিত করার৷ এরপর ওষুধ গুলো গলাধঃকরণ করে বেরিয়ে এলো মেডিক্যাল জোন থেকে।

রাত একটু গভীর হতেই ট্রেতে খাবার নিয়ে এলো ফিলোমেলা। চুপচাপ দাঁড়ালো কামরার সম্মুখে। বুকের ভেতর দুরুদুরু করছে তার। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শেহজাদী কামরা থেকে বের হননি। একদিন মাত্র মধ্যরাতে বেরিয়েছিলেন, তারপর আর নয়। প্রাসাদে ফিরেই নিজেকে ঘর বন্দি করেছেন। কামরায় ঢুকতে দেননা কাউকে, এমনকি হিজ ম্যাজেস্টিকেও না। খাবারটাও দরজার সম্মুখে রেখে যেতে হয় তাকে, ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই!
দরজায় দাঁড়িয়ে মোলায়েম স্বরে ডেকে উঠলো ফিলোমেলা,
“শেহজাদী, আপনার রাতের খাবার।”

কান পাতলো সে দরজায়, ভেতরে শেহজাদীর পা ফেলার মৃদু, মিষ্টি রিনরিনে আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। দ্রুতই সরে এলো সে দরজার নিকট থেকে, দাঁড়ালো দূরে গিয়ে। ক্ষণিক পরেই সশব্দে খুলে গেলো দরজা। ফুড ট্রলিটি ভেতরে টেনে নিয়ে গেলো একটি শ্বেতশুভ্র মাখনসম হাত, পরক্ষণেই দরজাটি বন্ধ হয়ে গেলো আবার।
ফিলোমেলা হাঁফ ছাড়লো, নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে গেলো আবার দরজার দিকে, কান পাতলো। চামচ নাড়ার শব্দ পাচ্ছে সে, শেহজাদী মুখে তুলেছেন স্যুপ। নিশ্চিন্ত মনে ফিরে এলো সে, অপেক্ষায় রইলো কখন আবার দরজাটি মেলে ট্রলিখানা বের করে দিবেন শেহজাদী।
কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর দরজটা সশব্দে খুলে গেলো, ভেতর থেকে আনাবিয়া বের করে দিলো ট্রলি, দরজা বন্ধ হলো আবারও। ফিলোমেলা এগিয়ে গেলো, দরজায় দাঁড়িয়ে শুধোলো,
“শেহজাদী, আপনার কিছু প্রয়োজন?”

উত্তর এলো না কোনো৷ ফিলোমেলা তবুও অপেক্ষা করলো ক্ষণিক, অতঃপর হতাশ হয়ে ফিরে গেলো রয়্যাল কিচেনের দিকে৷
মীর ফিরলো আরও কিছুক্ষণ পর। ফিলোমেলা দাঁড়িয়ে বারান্দায়, মহসিনের সাথে চাপা স্বরে আলোচনা করছে কিছু। মীরকে দেখে তটস্থ হয়ে গেলো দুজনেই, বারান্দার কিনারে সরে গিয়ে নত মুখে আনুগত্য জানালো।
মীর এলো ওদের নিকট, ফিলোমেলাকে উদ্দেশ্য করে শুধোলো,
“বাঘিনী খেয়েছে?”
“জ্বী, ইয়োর ম্যাজেস্টি, উনি খেয়েছেন৷”
“খাওয়ার অভিনয় করে ফেলে দিচ্ছে না তো?”
“না, ইয়োর ম্যাজেস্টি। উনি খাচ্ছেন ঠিকঠাক, আমি দরজায় কান পেতে নিশ্চিত হয়েছি। প্রতি বেলাতে তাই-ই করছি।”

“খাবার, গোসল, ঘুম; এই তিনে যেন কোনো গাফিলতি না হয়। ভালো ভাবে খেয়াল রাখবে।”
ফিলোমেলা মাথা নাড়ালো তড়িতে৷ মীর চলল কামরায়। বাইরের পোশাক ছেড়ে পরে নিলো ট্রাউজার, উন্মুক্ত শরীরে বসে রইলো কিছুক্ষণ। বিশ্রী মাথাব্যথাটা এখনো কমছে না, চোখ মেলে তাকানো দায় হচ্ছে। একটু ঘুমোতে পারলে ভালো লাগতো, কিন্তু এই অসহ্য যন্ত্রণা তাকে ঘুমোতেও দিচ্ছেনা। কতগুলো রাত নির্ঘুম কাটিয়েছে মনে পড়েনা তার। পেইনকিলারের সুবাদে একটু ঘুম হয়, কিন্তু প্রভাব কেটে গেলেই দ্বিগুণ তাণ্ডব নিয়ে ফিরে আসে যন্ত্রণাটি!
ক্ষণিক বিশ্রাম নিয়ে উঠে গেলো আনাবিয়ার কামরার দরজার নিকট। দুবার করাঘাত করে ডেকে উঠলো,
“শিনজো!”
উত্তর এলোনা কোনো। মীর করাঘাত করলো আবারও, কয়েকবার ডাকার পরেও সাড়া না পেয়ে নব ঘুরালো, লক করা ভেতর থেকে। চিন্তিত হলো মীর, তড়িঘড়ি ফিরে এসে ড্রয়ার থেকে বের করলো চাবি। দ্রুত পায়ে গিয়ে ব্যাস্ত হাতে চাবি ঘুরিয়ে সজোরে খুললো দরজা।
ভেতরে ঢুকতেই আনাবিয়াকে বসে থাকতে দেখলো বিছানার ওপর, চুপচাপ। মীর এগিয়ে গিয়ে চিন্তিত, অবসন্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

“এমন করো কেন? কখন থেকে ডাকছি সাড়া দিচ্ছোনা কেন?”
“আমার ইচ্ছা।”
কাঠকাঠ স্বরে বলে উঠলো আনাবিয়া। মীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো, মৃদু পায়ে গিয়ে উঠে পড়লো বিছানায়। বসলো আনাবিয়ার সম্মুখে। দুহাতে আনাবিয়ার মুখখানা ধরে উঁচু করে বলে উঠলো,
“এমন করো কেন আমার সাথে? এরকম করোনা আর। তোমার যদি আমার কোনো এক্সপ্লানেশন ভালো না লাগে, আমাকে যদি ক্ষমা করতে না পারো তবে আমি আবারও এক্সপ্লেইন করবো, আবারও ক্ষমা চাইবো, যতক্ষণ না ক্ষমা করবে ততক্ষণ! কিন্তু আমি এই মুহুর্তে তা করতে ব্যর্থ, আমি ভীষণ রকম চাপে আছি শিনজো! দয়া করে একটু স্বাভাবিক হও, একটু হাসিমুখে থাকো, আমার জন্য!”

“আমি স্বাভাবিকই আছি, এমনটা ভালো না লাগলে আমার কিছু করার নেই৷ অন্য কারো জন্য মুখে কৃত্রিম হাসি ফোটানোর কোনো ইচ্ছে নেই আমার৷”
নির্বিকার স্বরে বলে উঠলো আনাবিয়া। মীর বিষন্ন চোখে চেয়ে রইলো ওর দিকে, বলল,
“ঠিক আছে, আমার জন্য না হোক নিজের জন্য একটু হাসিখুশি থাকো। স্ত্রী তুমি আমার, আমার অর্ধাঙ্গ। অর্ধাঙ্গ বললেও ভুল হবে, তুমি আমার পুরোটাই শিনজো! দয়া করে ভুলে যাও সব, অতীতের সব! আমরা নতুন করে শুরু করবো আবার, সব ভুলে তুমি আমার কাছে থাকো দয়া করে! এভাবে দূরের কেউ হয়ে থেকোনা, আমাকে একটু সঙ্গ দাও।”

“কি চাও তুমি? কিভাবে সঙ্গ দিবো আমি তোমাকে? কোন সঙ্গ চাই তোমার? বিছানার?”
অবজ্ঞাভরে শুধোলো আনাবিয়া। মীর ফোস করে শ্বাস ছাড়লো একটা, ছেড়ে দিলো আনাবিয়ার চোয়াল, নেমে যাতে চাইলো বিছানা থেকে। আনাবিয়া আচমকা খুলে ফেললো ওর রাতের পোশাকের বুকের বোতাম, নামিয়ে ফেললো শরীর থেকে, উন্মুক্ত হলো তার শুভ্র কাঁধ, মোলায়েম বাহু, সুডৌল বক্ষমঞ্জরি। রুক্ষ স্বরে বলে উঠলো,
“তোমার যদি এই-ই প্রয়োজন হয় তবে তুমি তোমার প্রয়োজন মেটাতে পারো, আমার কোনো বাঁধা নেই।”
মীর অবলোকন করলো ওর বক্ষ, শক্ত হয়ে এলো ওর চোয়াল। পরমুহূর্তেই মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সে নেমে এলো বিছানা থেকে, নিজের কামরায় ফিরে যেতে যেতে বলে উঠলো,
“পুট অন ইয়োর ক্লদস!”

মধ্যরাত।
রেড জোনের ক্রিস্টাল পুলের ভেতর গলা অব্দি ডুবিয়ে বসে আছে আনাবিয়া। আকাশে চাঁদ নেই আজ, তারা খচিত আকাশের ছায়া পড়ছে পানির ওপর, ডোবার ভেতর ঘুরে বেড়ানো ছোট ছোট মাছ গুলোর সাতারে কখনো কখনো আন্দোলিত হচ্ছে পানির উপরিভাগ, ঢেউ খেলে যাচ্ছে তারার ছায়া৷
আনাবিয়ার শরীরের পাশে আকুলিবিকুলি করে চলেছে কয়েকটা ছোট বড় মাছ, কেউ কেউ এসে দলবেঁধে খেলা করছে ওর পেট ঘেঁষে। আনাবিয়া তাকিয়ে আকাশের দিকে, শুকতারা টি মাথার ওপর, জ্বলজ্বল করছে। যেন আনাবিয়াকে দেখছে সে-ও, দুজন মুখোমুখি, একা একা।
ক্ষণিক পর আনাবিয়া ডুব দিলো পানির ভেতর, সাঁতরে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে গিয়ে ফিরে এলো আবারও। তারপর উঠে পড়লো পানি ছেড়ে। পাড়ে খুলে রাখা পোশাক গুলো পরে নিলো গায়ে, এগোলো প্রাসাদের দিকে।
কিছুদূর এগোতেই আচমকা মেয়েলি হাসির ঝঙ্কার কানে এলো তার, কারা জানি আসছে এদিকেই। কোন দিক থেকে সেটা আচমকা ঠাহর করতে পারলোনা আনাবিয়া, দ্রুত পায়ে হাটতে শুরু করলো প্রাসাদের উদ্দ্যেশ্যে।
আচমকা পেছন থেকে উচ্ছ্বসিত স্বরে ডেকে উঠলো তাকে কেউ,
“শেহজাদী!”

আনাবিয়া চমকে ফিরে তাকালো, দূরে দাঁড়িয়ে লিন্ডা আর লায়রা। বড় হয়ে গেছে লায়রা, সদ্য তারুণ্যে পা দিয়েছে, সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। লিন্ডার পাতলা শরীরে পুরুত্ব বেড়েছে, নীল চোখ জোড়া জানান দিচ্ছে তার সুখময় জীবনের।
আনাবিয়াকে দেখতে পাওয়ার খুশিতে মুখে হাসি ধরছেনা তাদের। দুজনেই ছুটে এগিয়ে আসতে রইলো আনাবিয়ার দিকে। আতঙ্কিত হলো আনাবিয়া! অস্বস্তি হলো, ভীষণ অস্বস্তি! কারো সামনে পড়তে চায়না সে, কারো কথা শুনতে চায়না, কারো উপস্থিতি চায়না! উলটো ঘুরে তখুনি ঝড়ো বেগে মিলিয়ে গেলো সে জঙ্গলের আঁধারে।
তার দিকে ছুটে আসতে থাকা লিন্ডা লায়রা হতচকিত হয়ে থেমে গেলো তৎক্ষনাৎ। বিস্মিত, ব্যাথিত চোখে তাকালো একে অপরের দিকে, লায়রা শঙ্কিত স্বরে বলে উঠলো,

“শেহজাদীর চুল নেই! কেটে ফেলেছেন তিনি!”
লিন্ডা খেয়াল করে উঠতে পারেনি তা, লায়রার কথাতে টের পেলো সত্যিই শেহজাদী চুল কেটে ফেলেছেন!
উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো লিন্ডা, শেহজাদীর এভাবে চলে যাওয়া স্বাভাবিক ঠেকলোনা তার কাছে। ঠাই দাঁড়িয়ে চিন্তিত মুখে সে ভাবতে রইলো ঠিক কি কারণে শেহজাদী আজ এভাবে চলে গেলেন। এতগুলো দিন বাদে দেখা হওয়ার পরও শেহজাদী কেন উপেক্ষা করলেন ওদের! উনি কি কোনোভাবে ওদের ওপর বিরক্ত? রাগান্বিত?
লিও কাঞ্জি তখুনি এসে উপস্থিত হলো সেখানে, লিন্ডাকে এভাবে একস্থানে স্থীর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লিও ওকে কাছে টেনে নিয়ে উৎকন্ঠিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

“কি হয়েছে লুনা? কাকে ডাকছিলে তুমি?”
“শেহজাদী…. শেহজাদী এসেছিলেন এখানে। আমরা ডেকেছিলাম তাকে, উনি আমাদের দেখা মাত্রই চলে গেছেন। আমরা তার কাছে যাচ্ছিলাম, আমাদেরকে এগোতে দেখে তিনি চলে গেছেন। উনি বোধ হয় রাগ করেছেন আমাদের ওপর! আমরা হয়তো কিছু করেছি।”
গলা ধরে এলো লিন্ডার। লিও ওকে বুকের ভেতর নিয়ে বলে উঠলো,
“হয়তো শেহজাদী চিনতে পারেননি তোমাদের, হয়তো ভেবেছেন অন্য কেউ। চিনলেও হয়তো এই মুহুর্তে তিনি কারো সাথে কথা বলতে চাননা। তাঁকে আমাদের স্পেস দেওয়া প্রয়োজন। শুধু শুধু মন খারাপ করোনা, চলো ফিরে যাই।”
লিওর কথা মনে ধরলোনা লিন্ডার, চেয়ে রইলো সে আনাবিয়ার গমন পথের দিকে৷ লিও কাঞ্জি মিলে দুজনকে বুঝিয়ে নিয়ে গেলো আবার মসভেইলের দিকে।

জানালা বেয়ে কামরায় ঢুকলো আনাবিয়া। ভেজা চুল গুলোতে তোয়ালে জড়িয়ে গায়ের পোশাক গুলো খুলে নতুন পোশাক পরে নিলো। আগের চেয়ে একটু পাতলা হয়েছে সে, কণ্ঠহার জোড়া প্রকট হয়ে উঠেছে বেশ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে চিরুনী দিতে দিতে হঠাৎ খেয়াল হলো মীরের উপস্থিতি অনুভব করছে না সে। এগিয়ে গিয়ে কান পাতলো দুজনের কামরার মধ্যবর্তী দরজায়।
কোনো আওয়াজ নেই, তবে কি মীর ফেরেনি?
বাহিরের দরজার নিকট গিয়ে দাঁড়ালো সে, ক্ষণিক অপেক্ষা করে ডেকে উঠলো,
“ফিলোমেলা!”
ফিলোমেলা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমোচ্ছিলো, আনাবিয়ার কন্ঠে নিজের নাম শুনে চমকে উঠে পড়লো। ছুটে গিয়ে বন্ধ দরজার এপাশ থেকে বলে উঠলো,
“জ্‌-জ্বী শেহজাদী, আপনার কিছু প্রয়োজন?”
“মহসিন কোথায়?”
“উনি ওদিকেই আছেন, পাঠিয়ে দিবো?”
“হুম।”

ফিলোমেলা ছুটলো। ক্ষণিক বাদেই মহসিন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো সেখানে, পেছন পেছন এলো ফিলোমেলা। উত্তেজিত মুখ তার, কতগুলো দিন বাদে শেহজাদী ডেকেছেন কাউকে! মহসিন আনুগত্যের সুরে বলে উঠলো,
“শেহজাদী, আমাকে ডেকেছেন?”
“তিনি কোথায়? এখনো ফেরেননি কেন?”
“ইয়ে…. মানে…. উনি একটু ব্যাস্ত আছেন।”
“কোথায় ব্যাস্ত আছেন? কি কাজ তার এত?”
“হিজ ম্যাজেস্টি মেডিক্যাল জোনে আছেন, শেহজাদী!”
মেডিক্যাল জোনের কথা শুনে বুক কাঁপলো আনাবিয়ার, শঙ্কিত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“মেডিক্যাল জোনে কেন? কি হয়েছে তার? অসুস্থ? গুরুতর কিছু?”
“ক্ষমা করবেন শেহজাদী, আমি এর বেশি কিছু জানিনা। উনি আমাকে এ ব্যাপারে জানাননি কিছুই।”
“তার দেহরক্ষী দুটো কোথায়?”
“তারা দুজন হিজ ম্যাজেস্টির সাথেই আছেন, শেহজাদী। চিন্তা করবেন না।”
আনাবিয়ার কপালে ভাজ পড়লো। মীর কি অসুস্থ হয়ে পড়েছে? গত কয়েক সপ্তাহের অদ্ভুত অস্বস্তিটি কি তবে এরই সংকেত?

ফিরে এসে বিছানায় বসলো আনাবিয়া। চিন্তা করবেনা সে, একদমই না। কার জন্য চিন্তা করবে? সে-ই বা কেন চিন্তা করতে যাবে এত? উহুম!
কিন্তু বাঁধা মানলোনা ওর মস্তিষ্ক, বারেবারে মীরের চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠলো ওর দেহ মন! ঘরময় পায়চারি করতে শুরু করলো সে। কি হতে পারে? কি হয়েছে ওর? কোথায় কি করছে? এত রাতেও কেন ফিরলোনা? তবে কি আজ ফিরবেই না?
পায়চারি করতে করতে মীরের কামরার দরজার নিকট এসে দাঁড়ালো, ক্ষণিক দোনোমোনো করে আলতো হাতে নব ঘুরিয়ে উঁকি দিলো ভেতরে, এক চোখে।

আগের মতোই আছে সব কিছু, কিছুই যেন বদলায়নি। অল্প অল্প করে খুলতে খুলতে একসময় খুলেই ফেললো পুরোটা। মৃদু পায়ে ঢুকে পড়লো কামরায়, সতর্কতার সাথে ফেলতে রইলো পা, যেন চুরি করতে এসেছে।
এই বিছানায় সে কত ঘুমিয়েছে! মীর কত ভালোবেসেছে ওকে এই বিছানার ওপর! যাকগে যাক, দূর হোক ভালোবাসা। আনাবিয়া টেবিলের দিকে এগোলো। এটা সেটা দেখতে দেখতে চোখ গেলো সিগারেটের প্যাকেটের দিকে, পাশেই রাখা ঈগল সদৃশ লাইটারটি।

উৎসুক ভঙ্গিতে প্যাকেটটি তুলে ভেতর থেকে একটা সিগারেট বের করলো আনাবিয়া। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে মীরের মতো ভঙ্গিতে রাখলো দু ঠোঁটের মাঝে, আয়নায় গিয়ে একবার দেখে এলো কেমন দেখাচ্ছে তাকে।
ফিরে এলো আবার, লাইটার টা নিয়ে ধরানোর চেষ্টা করলো, ধরলোও! অগ্রভাগের উজ্জ্বল লাল, নিভু নিভু আগুন দেখে পুলকিত হয়ে উঠলো মন। আগুনটাকে দেখলো কিছুক্ষণ। অতঃপর তর্জনী আর মধ্যমার ফাঁকে সেগারেটের পেট চেপে ধরে এক শোষণে ধোয়া নিয়ে নিলো বুকের ভেতর।
মুহুর্তেই কাশির দমকে অস্থির হয়ে উঠলো সে! ফুসফুস বিদ্রোহ করে বসলো তার, কোনো ভাবেই এই ধোঁয়া সে গ্রহণ করবে না। কেশে টেশে একাকার হয়ে মিনিট খানেক বাদে যখন শান্ত হলো তখন সিগারেট টির দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে উঠলো,

“কি বাল খায় এর!”
তৎক্ষনাৎ কেউ তড়িৎ বেগে ছিনিয়ে নিলো সিগারেটটি, আনাবিয়া চমকে তাকাতেই দেখতে পেলো মীরের রুষ্ট মুখশ্রী, রাগত স্বরে বলে উঠলো,
“মাথা খারাপ নাকি? এসব কি খাচ্ছো?”
“তুমি খেতে পারো, আমি পারিনা?
“না পারোনা।”
“পারি।”
জোরালো স্বরে বলে উঠলো আনাবিয়া। এখনো কাশি আসছে তার, কাশির চোটে মীর কখন এসেছে সে টেরই পায়নি। পরক্ষণেই সিগারেটের প্যাকেট থেকে কয়েকটা সিগারেট হাতে নিয়ে সে ফিরে যেতে নিলো কামরায়। পেছন থেকে মীর বলে উঠলো,

“ওগুলো নিয়ে কোথায় যাচ্ছো?”
“সময় করে খাবো।”
“মেরে তক্তা বানিয়ে দেবো, এদিকে দিয়ে যাও!”
“আমি খাবো বললাম তো।”
“ভর্তা করে খাওয়াবো তোমাকে, এদিকে দাও বলছি!”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৯

মীর এগিয়ে এসে আনাবিয়ার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিলো সেগুলো, অতঃপর প্যাকেট সুদ্ধ ডাস্টবিনে দিলো সবগুলোকে। রেখে দিলো শুধু আনাবিয়ার ঠোঁট স্পর্শ করা সিগারেটটি। বলল,
“আর খাচ্ছিনা আমি, তোমাকে যেন আর কখনো এসব স্পর্শ করতে না দেখি।”
আনাবিয়া বলল না কিছুই, ক্ষণিক শান্ত চোখে চেয়ে থেকে ফিরে গেলো কামরায়।

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮১