Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৯

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৯

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৯
রানী আমিনা

“শিনজো!”
আনাবিয়া চোখ তুলে তাকালো, দৃষ্টি আঁটকালো তার মীরের স্বর্ণাভ চোখে। মীরের চাহনি লেগে রইলো তার ঘাড় সমান শুভ্র চুলের দিকে, ভ্রুদ্বয় অসন্তোষে কুঞ্চিত। শীতল স্বরে সে বলে উঠলো,
“কাজটা ভালো করোনি।”
“তুমি এখানে কি করছো? আমাকে রিপ্লেস করার জন্য মেয়ে খুঁজতে এসেছো? খুঁজো! অনেক সুন্দর, ডেলিশাস ফিজিকের মেয়ে আছে এখানে, জাস্ট অ্যাজ ইউ লাইক।”
নির্বিকার স্বরে বলল আনাবিয়া। মীর ফোস করে শ্বাস ছাড়লো একটা, পরক্ষণেই বলল,

“বাজে বকবেনা।”
আনাবিয়া দৃষ্টি সরিয়ে নিলো ওর থেকে। চলে যাবে কি যাবেনা ভাবতে রইলো, গেলেও কিভাবে যাবে সেটাও চিন্তার বিষয়। মীরের দৃষ্টি গেলো ওর হাতের দিকে, গোলাপের তোড়া টিকে দেখে শুধোলো,
“কে দিলো?”
“জেনে শুনে প্রশ্ন করছো কেন অকারণ?”
“তোমার মুখে শুনবো৷”
“লিভয়, লিভয় ব্লাকউড৷”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

মীর ওর হাত থেকে ছিনিয়ে নিলো গোলাপ গুলো, ছুড়ে ফেলে দিলো মাটিতে। কাটা বিঁধে সামান্য ছড়ে গেলো আনাবিয়ার হাতের তালু, অস্ফুটস্বরে আর্তনাদ করে উঠলো সে। মীরের গমগমে স্বর ভেসে এলো তখুনি,
“এসব আবর্জনা যেন কখনো তোমার হাত না দেখি। তুমি একজন শেহজাদী, এটা ভুলে যেওনা। তোমার কিভাবে চলা উচিত, কিভাবে কথা বলা উচিত, কাদের সাথে মেশা উচিত, কিভাবে কারো সাথে ইন্টার‍্যাক্ট করা উচিত এসব এতদিন পর এসে শিখিয়ে দেওয়া লাগবে না আশা করি।”
“আমার যেভাবে ইচ্ছা আমি সেভাবে চলবো, যখন যেখানে ইচ্ছা যাবো, যা খুশি করবো, যার সাথে ইচ্ছা কথা বলবো…”

“দাঁত একটাও মুখের ভেতর থাকবে না।”
আনাবিয়াকে কথা শেষ করতে না দিয়েই জোর গলায় বলে উঠলো মীর। আনাবিয়া চুপ হয়ে গেলো। মীর আচমকা টেনে নিলো ওর হাতে, নিকটে নিয়ে এসে ক্ষুদ্র ক্ষতটি হতে বের হওয়া সামান্য রক্তটুকু বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা মুছে মুঠিতে গুজে দিলো এক গোছা সাদা রঙা অর্কিড। আনাবিয়া তৎক্ষনাৎ মাটিতে সজোরে ছুড়ে ফেললো তা। কর্কশ স্বরে বলে উঠলো,
“তুমি কি এতখানি রাস্তা এসমস্ত নাটক করতে এসেছো?”
“হুম।”
মাটিতে ঝুঁকে খুঁটে খুঁটে ফুলগুলো তুললো মীর। আনাবিয়ার হাত টেনে হাতের মুঠিতে ভরে দিলো আবার।
“ফেলবে না।”

আদেশের সুরে বলল সে। আনাবিয়া তোয়াক্কা করলো না একথার, আবারও ছুড়ে ফেললো সেগুলো। মীর রাগ সামলাতে কপাল ঘঁষলো। পরক্ষণেই পকেট থেকে বের করলো রুমাল। টেনে দু’খন্ড করে একটা আরেকটার মাথায় জোড়া লাগিয়ে দড়ির মতোন লম্বা করলো। মাটি থেকে দ্রুত হাতে ফুলগুলো তুলে আনাবিয়ার হাতের মুঠিতে ফুলগুলো ভরে সদ্য তৈরি দড়ি দিয়ে ক্ষিপ্র বেগে ফুল সুদ্ধ বেঁধে ফেললো আনাবিয়ার হাতের মুঠি। রাগত স্বরে বলে উঠলো,

“খুব বাড় বেড়েছে, মাথায় উঠে গেছো! এবার বেয়াদবি করলে তোমাকে সহ বেধে ফেলবো!”
আনাবিয়ার ছাড়া পাওয়ার জন্য মোচড়ামুচড়ি করলো ক্ষণিক, কাজ হলোনা তাতে। বাঁধা হাত খানা ধরে ওকে টেনে জঙ্গলের আরও গভীরে নিয়ে গেলো সে। খুব নির্জনে, একটি পুরাতন শ্যাওলা ধরা গাছের গুড়ির ওপর বসলো মীর। আনাবিয়াকেও টেনে বসালো পাশে। কিয়ৎক্ষণ নিরবে কাটলো দুজনেরই। আনাবিয়া চুপচাপ বসে চেয়ে রইলো ভেজা মাটির দিকে, মীর হাটুতে কনুই ঠেকিয়ে, চোয়ালে হাতের ভর দিয়ে চেয়ে রইলো ওর কর্তিত সফেদ চুলের পানে৷ ক্ষণিক পর নিরবতা ভেঙে নরম স্বরে শুধোলো,
“চুল গুলো কেটেছো কেন?”

উত্তর এলোনা কোনো। আনাবিয়া হাঁফ ছাড়লো আনমনে, যেন দমটা অনেকক্ষণ ধরে আঁটকে ছিলো বুকের কোনো কোণে। মীর ওর ঘাড় ছোয়া চুল গুলোকে হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করে বলে উঠলো,
“তোমার চুল কেটে ফেলা সহ যাবতীয় অপরাধ আমি ক্ষমা করে দিবো, বাট উইদ ওয়ান কান্ডিশন। তোমাকে আমার সাথে প্রাসাদে ফিরে যেতে হবে, আমার সাথে থাকতে হবে, হ্যাপিলি, জাস্ট লাইক বিফো’।”
“একটা কান্ডিশনের ভেতর আরও দশটা কান্ডিশন থাকে জানা ছিলোনা। আমি কোনো ভুল করিনি, তাই ক্ষমাও পাইনা কারো কাছে। আর প্রাসাদে ফিরে যাওয়ার তো প্রশ্নই আসেনা।”

“এমন জেদ করতে হয়না শিনু! বাচ্চাদের মতো করো এখনো, বড় হয়েছো তুমি!”
মোলায়েল স্বরে বলল মীর৷ আনাবিয়া চুপ করে রইলো। চোখে বাষ্প জমলো তার, জঙ্গলে আচমকা শুরু হলো ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। আনাবিয়া তড়িতে মুছে নিলো চোখ জোড়া। মীর মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকালো একবার, পরক্ষণেই আনাবিয়াকে টেনে নিলো নিজের কোলের ভেতর। আনাবিয়া উঠে যাওয়ার জন্য ছটফটিয়ে হাতাহাতি করলো কিছুক্ষণ, কিন্তু ব্যর্থ হলো। মীর শক্ত হাতে জড়িয়ে ওকে৷

“যাবেনা আমার সাথে?”
ভ্রু তুলে শুধোলো মীর। আনাবিয়া তড়িতে মাথা নাড়লো দুদিকে, নাক লাল হয়ে এলো ওর। মীর ওর ফুলের সাথে বাঁধা হাত খানা তুলে ঠোঁট ছোয়ালো, শুধোলো,
“কেন? কেন যাবে না? তুমি না আমাকে ভালোবাসো? তুমি না আমার বউ? তবে কেন যাবে না আমার সাথে?”
“তুমি ভালোবাসোনা আমাকে, একটুও না।”
“কে বলেছে?”
“আমি বলছি।”
“তোমার কথা তুমি বিশ্বাস করো?”
“চোখে দেখা জিনিস মানুষ কিভাবে অবিশ্বাস করে?”

মীর আচমকা টেনে খুলে ফেললো ওর হুডি। আনাবিয়াকে আরও টেনে বসালো নিজের কোলের ভেতর। কাঁধের ওপর থেকে টি শার্ট সরিয়ে ঠোঁট ছোয়ালো। নরম স্বরে আবারও বলল,
“ফিরে চলো শিনজো, আমার সাথে! তোমার যত কথা আছে, অভিযোগ আছে তুমি সব বলবে আমাকে৷ আমি সব শুনবো, সব সমাধানের চেষ্টা করবো, আই প্রমিজ।”
“কোনো অভিযোগ নেই আমার, যা আছে যেভাবে আছে থাকুক। তুমি ফিরে যাও।”
“এমন করতে হয়না, স্বামী আমি তোমার। আমার কথা তোমাকে শুনতে হবে, চলো আমার সাথে। প্লিজ শিনু!”
আনাবিয়াকে আরও শক্ত করে নিজের সাথে চেপে ধরে বলল মীর৷ আনাবিয়া উঠে যেতে চাইলো ওর কোল ছেড়ে, ব্যাস্ত স্বরে বলে উঠলো,

“আমাকে ডর্মে ফিরতে হবে, বেশি দেরি হলে ঢুকতে পারবোনা। ছাড়ো আমাকে।”
“যেতে হবে না। এখানেই থাকো, আমার সাথে।”
“তুমি আমার জন্য আসোনি, আমি জানি। তুমি এসেছো আমার শরীরের জন্য। আমাকে এসব বলে ভোলাতে পারবেনা৷”
মীর আহত হলো! ম্লান দৃষ্টি দিলো আনাবিয়ার মুখপানে, শিথিল হয়ে এলো বাহুবন্ধনী। রুষ্ট স্বরে বলল,
“বাজে কথা বলো কেন? আমার সম্পর্কে এসব ধারণা তোমার কবে থেকে হয়েছে? কে ঢুকিয়েছে এসব কথা তোমার মাথায়? ইলহান? নাকি অন্য কেউ?”
“এসবের মাঝে চাচাজিকে টানবেনা।”

ছাড়া পেয়ে তৎক্ষনাৎ মীরের কোল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল আনাবিয়া। মীর অবজ্ঞাভরে বলে উঠলো,
“খুব দরদ হয়েছে দেখি চাচাজির জন্য! রেড জোনের ট্রি হাউজের পাশে প্রথম দেখায় তোমাকে সে কি বলেছিলো স্মরণে আছে নিশ্চয়?”
“ওসব মনে করতে চাইনা। পাস্ট ইজ পাস্ট! এখন তো সে ভালো হয়ে গেছে, তবে তোমার সমস্যা কোথায়? তাছাড়া সে কম করেনি আমার জন্য! যখন আমার পাশে কেউ ছিলোনা তখন সে থেকেছে আমার পাশে, আমাকে সঙ্গ দিয়েছে, মেয়ের মতো যত্ন করেছে। অন্যদের মতো আখের গুছিয়ে ত্যাগ করেনি আমাকে৷”
“আচ্ছা! তবে আমার কোনো অবদান তোমার জীবনে নেই? আমি কখনো কিছুই করিনি তোমার জন্য? তুমি তার অপরাধ ক্ষমা করতে পারো, সকলের অপরাধ ক্ষমা করতে পারো কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তোমার ‘পাস্ট ইজ পাস্ট’ কাজে আসে না?”

কন্ঠে ক্ষোভ মিশিয়ে বলল মীর, ক্রোধ বাড়লো তার। চুপ করে রইলো আনাবিয়া, বিরক্তিতে কুচকে এলো তার ভ্রুজোড়া। মীর আচমকা উঠে দাঁড়ালো, গমগমে স্বরে বলল,
“অনেক হয়েছে তোমার ফ্রিডম ফ্রিডম খেলা। যথেষ্ট ফ্রিডম পেয়েছো, আর নয়। আজ এখন এই মুহুর্তে তুমি আমার সাথে প্রাসাদে ফিরবে, আমি এর বাইরে একটি কথাও শুনতে চাইনা৷”
“আমি কোথাও যাবোনা, প্রাসাদে তো নয়ই! চাইনা আমার অমন জীবন, চাইনা আমি কোনো আভিজাত্য! যে আভিজাত্য আমাকে ভেতরে ভেতরে পুড়িয়ে মারবে সেই আভিজাত্য আমি কোনোদিনও চাইনা! চাইনা আমি তোমাদের তথাকথিত প্রিন্সেস হতে!

প্রয়োজনে পায়ে পাথর বেঁধে নদীতে ঝাপ দিবো আমি, তবুও তোমার সাথে প্রাসাদে ফিরবোনা! চাইনা তোমার মতো অভিশপ্ত কারো জীবনসঙ্গী হয়ে সারাজীবন তুষের আগুনে জ্বলতে! থাকতে চাইনা আমি তোমার সাথে, বুঝতে পারোনা তুমি? তোমাকে আমি পছন্দ করিনা! ঘেন্না করি তোমাকে আমি, ঘেন্না!”
ক্রোধে চেচিয়ে বলল আনাবিয়া, হাঁফাতে শুরু করলো ক্ষোভে! মীর স্তব্ধ হয়ে গেলো ক্ষণিকের জন্য, অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে রইলো আনাবিয়ার ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ চোখের দিকে! শ্বাসটিও যেন পড়লো না!
আচমকা স্বাভাবিক হয়ে এলো ওর মুখমণ্ডল। অত্যন্ত শীতল স্বরে সে বলল,
“ভুলে যেওনা তুমি একজন শেহজাদী, এমন কিছু কোরোনা যা তোমাকে মানায় না, এবং তোমার বংশপরিচয় সম্পর্কে প্রশ্ন উঠে। তুমি আমার স্ত্রী, তোমার উচিত আমার পাশে দাঁড়ানো, এই সাম্রাজ্যের পেছনে সময় ব্যয় করা, নিজেদের কল্যাণের জন্য ভাবা। কিন্তু না, তুমি সেসব করতে রাজি নয়, অকারণ অভিমান পুষে রেখে নিজের ক্ষতি তো করছোই, সাথে আমারও।”

“অকারণ?”
“হ্যাঁ অকারণই! যা হয়েছে, আমি যা করেছি, অনেক আগেই করেছি। এত গুলো বছর, এত কিছুর পরও তোমার মন পাইনি আমি। কি করিনি আমি তোমার জন্য? কিন্তু তোমার কাছে তোমার নিজের অভিমানটাই বড় হয়েছে সারাজীবন! আমাকে তুমি কোনো মানুষই মনে করোনি, শুধুই নিজের ভোগ বিলাস, মান অভিমান আর নিরাপত্তার জমিন বানিয়েছো আমাকে!”

“কিছুই করিনি আমি তোমার জন্য? এত কিছুর পরও অকৃতজ্ঞের মতো কথা বলো! তোমার খেয়ালিপনার জন্য মরতে বসেছিলাম আমি! তোমার কারণে এতগুলো বছর ধরে এত কষ্ট সহ্য করছি আমি!
যখন তুমি ডার্ক ফরেস্টে হিংস্র পশুর মতোন ঘুরতে, সর্বসাধারণ যখন তোমাকে মৃত ভেবে ভুলে গিয়েছিলো তখন এই আমি স্মরণ করতাম তোমাকে! এই আমার কারণে তুমি আজ এখানে গলাবাজি করতে পারছো! তখন আমি চাইলেই তোমাকে মৃত ভেবে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারতাম। করিনি, কেন জানো? শুধুমাত্র তোমাকে ভালোবাসতাম বলে, তোমার স্থানে আর কাউকে বসাতে পারবোনা বলে!
হ্যাঁ, আমি তোমার ওপর ভর করে চলেছি, আমি তোমার ওপর সর্বক্ষেত্রে নির্ভরশীল, ভীষণ রকম সত্যি৷ কিন্তু এমনটা আমাকে কে বানিয়েছে? তুমি, অনলি ইউ!”

আঙুল তুলে বলল আনাবিয়া। ক্ষণিক ক্ষুব্ধ চোখে মীরের চোখে চেয়ে থেকে বলে উঠলো,
“এই তুমিই আমাকে কখনো আমার মতো থাকতে দাওনি! নিজের সমস্ত ক্ষেত্রে আমাকে তোমার মতামত, তোমার পছন্দ মতো চলতে হয়েছে। আমি কোন পোশাক পরবো, আমি কোন খাবার খাবো, আমি কার সাথে কথা বলবো, কার সাথে বলবোনা, কে আমার সাথে থাকবে, কে থাকবেনা এগুলো সব তুমি নির্ধারণ করেছো!
আমাকে কখনো আমার সিদ্ধান্ত নিতে দিয়েছো তুমি? পঙ্গু করে রেখেছো তুমি আমাকে যেন আমি তোমাকে ছাড়া একটা পাও চলতে না পারি? আর এই অর্কিড, এই অর্কিড তুমি আজ কেন নিয়ে এসেছো? আমার অক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে আমার পুরোনো ক্ষত খুঁচিয়ে তাজা করতে?”
হাতের অর্কিড গুলো সম্মুখে ধরে বলল আনাবিয়া, পরমুহূর্তেই দড়িটা সজোরে টেনে ছিড়ে ফেললো সে। মীর শান্ত রইলো, গম্ভীর স্বরে বলল,

“শিনজো, তোমার কোনো অবদান আমি অস্বীকার করছিনা। ও কথাটি রাগের মাথায় বলে ফেলেছি। তোমাকে আঘাত দিতে আমি অর্কিড গুলো দেইনি, তোমার মন ভালো করতে দিয়েছি। কিন্তু তুমি কখনো আমাকে বুঝতে চাওনা, আমার ভুল গুলোই বার বার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চেয়েছো। সে যেমন তোমার সন্তান, তেমনই আমারও। তুমি যখন তার অস্তিত্বই জানতে না তখন আমি তাকে দেখেছি, তাকে ছুয়েছি, নিজ হাতে দাফন করেছি আমি। যন্ত্রণা শুধু তোমার একার নয় আমারও আছে। কিন্তু তুমি বারংবার প্রমাণ করতে চাও ইউ আর দ্যা ভিকটিম, অ্যান্ড আ’ম দ্যা ব্যাড পার্সন ইন আওয়ার কনজ্যুগাল লাইফ।”
থামলো মীর, ক্ষীন দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও বলল,

“তুমি আজকেই প্রাসাদে ফিরবে, আমার সাথেই। তুমি আমার স্ত্রী, আমার সাথে প্রাসাদে থাকবে, নিজের দায়িত্ব পালন করবে। আমি এর অন্যথা দেখতে চাইনা। আশা করি বুঝতে পেরেছো।”
“তোমার কথা শুনতে আমি বাধ্য নই।”
“অবশ্যই বাধ্য, শতভাগ বাধ্য। তোমার স্বামী আমি, তোমাকে যে কোনো ক্ষেত্রে, যে কোনো অবস্থায় আমার কথা শুনতে হবে৷”
“পারবোনা শুনতে আমি৷
“অবাধ্য হবে না। যথেষ্ট বেয়াদবি করেছো, এখনো করছো। আমি সব সহ্য করেছি, আর নয়। এসব ঝেড়ে ফেলবে এবং আমার সাথে যাবে।”
“আমি কোথাও যাবোনা।”
“কারণ দর্শাও।”
আনাবিয়া চুপ করে রইলো। থমথমে মুখে চেয়ে রইলো মাটির দিকে। মীর দ্বিতীয়বার গুরুগম্ভীর স্বরে বলে উঠলো,
“তোমাকে কারণ দর্শাতে বলেছি।”
আনাবিয়া চোখ তুলে তাকালো ওর দিকে, দৃষ্টি রাখলো মীরের স্বর্ণাভ শকুনি চাহনিতে। নিদারুণ যন্ত্রণায় ভ্রুজোড়া কুচকে ক্রুদ্ধ স্বরে বলল,

“সত্য লুকানোর জন্য!
আমার গর্ভধারণ, পর্ভপাতের মতো এত বড় সত্য কেন লুকিয়েছিলে আমার থেকে? আমাকে সব সত্যি না জানিয়ে, সমস্ত এক্সপ্লেইন না করে কেন সেদিন তুমি দাসীর কাছে গেছিলে? আমাকে না জানিয়ে কেন অন্য কারো মাধ্যমে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে? আমাকে না জানিয়ে কেন বাহারকে নিয়ে এসেছিলে?”
“আমি মানছি, তোমাকে না জানানো আমার ভুল ছিলো। তোমার সাথে পরামর্শ করা জরুরি ছিলো, তোমার কনসেন্ট নেওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু এ ব্যাতিত আমি যা করেছি কোনোটাই ভুল নয়, আমি যা করেছি প্রয়োজনে করেছি। তোমাকে জানাইনি কারণ তুমি মাত্রাতিরিক্ত আবেগী মেয়ে, শুধু শুধু কষ্ট পেতে। তুমি এখনো কি করবে বুঝে উঠতে পারোনা, পদে পদে ভুল করে বসো। তোমার আমার অনুভূতি যদি একত্রে বাঁধা না থাকতো তবে তুমি কখনো কিছুই জানতে না, আমি তোমাকে জানতে দিতাম না।”

“আচ্ছা! তবে অনুভূতি বাঁধা না থাকলে রোজ রোজ আমাকে লুকিয়ে দাসীর সাথে শুয়ে আসতে?”
“এ প্রশ্নের উত্তর তুমি ভালো ভাবেই জানো শিনজো।”
“আর বাচ্চা হলে? তখন কি আমি জানতে পারতাম না? নাকি বাচ্চাকে আমার থেকে লুকিয়ে রাখতে? আড়ালে আড়ালে বড় করতে?”
“তখন তুমি এমনিতেই মেনে নিতে, তোমার কাছে দ্বিতীয় পথ খোলা থাকতোনা৷ আর আমি শুধু বাচ্চাই চেয়েছিলাম, নারী শরীর নয়। এটা তোমার বোঝা উচিত৷ ওরা আমার দাসী, ওদের ওপর অধিকার আছে আমার। এই নিয়ে তোমার কোনো নিষেধ কখনো খাটবেনা আমার ওপর। তবুও আমি শুধুমাত্র তোমার ভালোবাসাকে শ্রদ্ধা করে নিজেকে সব কিছু থেকে বিরত রেখেছি। হাজার বার বলেছি, এখনো বলছি, যা করেছি প্রয়োজনে করেছি৷”
“তুমি জানতেনা এগুলো হবে? জেনেও তুমি সমাধান চাওনি কেন? তুমি পারতেনা আমার সাথে বসে এগুলো নিয়ে আলোচনা করতে? পারতেনা একসাথে সিদ্ধান্ত নিতে? বিয়েই বা করেছিলে কেন তুমি আমাকে? জানতেনা এর কনসেকুয়েন্স কি হবে?”

“হ্যা জানতাম, সবই জানতাম। ভেবেছিলাম সব বদলে যাবে, কিন্তু বদলায়নি। তোমার প্রেগন্যান্সি টা আনএক্সপেক্টেড ছিলো, আমি খুশি হয়েছিলাম অনেক, অনেক অনেক! ভেবেছিলাম সব ঠিক হয়ে গেছে, অপেক্ষা করেছিলাম তোমার থেকে খুশির খবরটা শুনতে, তোমার উচ্ছ্বসিত মুখখানা দেখতে। কিন্তু যা চেয়েছি তা হয়নি, আশা পূরণ হয়নি আমার, উলটো সব খারাপ হয়েছে, শেষ হয়ে গেছে আমার সব! এখানে তুমি আমাকে কাকে দোষ দিতে বলো? নিজেকে? জানতাম এমন হবে? জানলে কখনো তোমাকে এমন সিচুয়েশনে পড়তে দিতাম? জেনে বুঝে তোমাকে কষ্ট দিতাম?”

“যখন জেনেছো তখন কেন কোনো ব্যাবস্থা নাওনি? কেন আমাকে অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় ফেলে রেখে অন্য দাসীর সাথে রাত কাটিয়েছিলে? কেন আমাকে বুকে নিয়ে একটু স্বান্তনা দাওনি, একটু ভালোবাসোনি? কিভাবে সেদিন ওই টানেলের মুখে দাঁড়িয়ে আমাকে বলেছিলে তুমি বাবা হতে চলেছো? কিভাবে আমার সাথে রাত কাটিয়ে পরদিন তুমি অন্য কাউকে বিয়ের উদ্দ্যেশ্যে একা ফেলে চলে গিয়েছিলে?
তুমি যদি সব নিজে নিজেই করবে তবে আমাকে কেন তোমার জীবনে রেখে দিয়েছো? মজা দেখার জন্য? আমাকে কষ্ট দিয়ে তোমার স্যাডিজমকে তৃপ্ত করার জন্য?
এত এত যন্ত্রণা সহ্য করার পরও কিভাবে আমার থেকে নরমাল বিহেভিয়ার আশা করো? কিভাবে আশা করো আমি আগের মতোন ‘হ্যাপিলি’ তোমার সাথে একই কামরায়, একই বিছানায় থাকবো?
পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি পাগল! মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে আমার! আমাকে মুক্তি দাও তুমি, মুক্তি চাই আমার সব কিছু থেকে! তোমার থেকে!”

কেঁদে উঠলো আনাবিয়া। হাত থেকে ছেড়া রুমালের অংশটুকু সজোরে নিক্ষেপ করে ফুল গুলো মাটিতে আছড়ে ফেললো সে। দু’পায়ের নিচে ফেলে বারংবার পিষলো ফুলগুলো। হাটু গেড়ে বসে অঝোরে শুরু করলো কান্না!
মীর এগিয়ে এলো মৃদু পায়ে, নিজেও হাটু গেড়ে বসলো আনাবিয়ার সম্মুখে। মুখের ওপর এসে পড়া সফেদ চুল গুলোকে আনাবিয়ার কানের পাশে গুজে দিয়ে নরম স্বরে বলল,
“শুনো, আমার ভুল হয়েছে, আমার সব জানানো উচিত ছিলো তোমাকে। কিন্তু তখন আমার মাথায় কাজ করেনি, মেন্টালি আনস্ট্যাবল ছিলাম আমি। আমার মনে হয়েছিলো আমার একটা বাচ্চা দরকার, সব রকমের চেষ্টার পর যখন বার বার ব্যর্থ হচ্ছিলাম তখন অধৈর্য হয়ে উঠেছিলাম! আমার…. আমি জানিনা আমার কি হচ্ছিলো, আমি সে সময়ে… তোমাকে হয়তো কোনোদিনই বোঝাতে পারবোনা।

তুমি অসুস্থ ছিলে, ওদিকে আমি…. আমি কিভাবে কি করবো বুঝতে পারছিলাম না, আমি জানতাম না তুমি আমার সাথে এভাবে কানেক্টেড! আমি জানলে তোমাকে ও সময়ে কোনো ভাবেই কষ্ট দিতাম না, বিশ্বাস করো আমাকে! তোমাকে কোনো প্রেশার দিবোনা বলে তোমাকে না জানিয়েই চলে গেছিলাম, ভেবেছিলাম একটা বাচ্চা পেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি তোমাকে পরে সব খুলে বলবো, যেন তুমি কষ্ট না পাও, পেলেও তোমার জন্য তা সহনীয় হয়, বাচ্চাটিকে মেনে নাও। তুমি আমার সাথে কানেক্টেড জানলে আমি কখনোই তোমার থেকে কিছুই লুকোতাম না, আ’ সয়্যার! আমি জানি আমি তোমার থেকে লুকিয়ে ভুল করেছি, আমি ক্ষমা চেয়েছি তার জন্য৷ এখনো চাইছি। আমাকে ক্ষমা করো শিনজো, ফিরে এসো আমার কাছে, ফিরে চলো আমার সাথে!”
বৃষ্টি ঝরছে অনবরত, মীরের ধূসর চুল বেয়ে ফোটায় ফোটায় ঝরে পড়ছে পানি। আনাবিয়ার কান্না এই প্রথমবারের মতোন আশির্বাদ ঠেকলো তার কাছে, ওই ঝুম বৃষ্টিতে চাপা পড়ে গেলো তার চোখের লোনা জল। আনাবিয়ার আনত মুখখানা দুহাতে ধরে উঁচু করে মোলায়েম স্বরে বলে উঠলো,

“আমি তোমাকে কখনো কিছুতে মানা করিনি শিনজো। তুমি যখন যা করতে চেয়েছো আমি তাতেই সায় দিয়েছি, কিচ্ছুটি বলিনি তোমাকে। আমার এত সাধের চুল গুলোকে কেটে ফেলেছো, টু শব্দটি করিনি আমি! প্রাসাদ ছেড়ে, আমাকে ছেড়ে এখানে চলে এসেছো, আমি বাঁধা দেইনি। তোমাকে অঢেল স্বাধীনতা দিয়েছি, যেন তুমি ভালো থাকো, যা ইচ্ছা করতে পারো, নিজের মতো করে চলতে পারো।”
আনাবিয়া ঠেলে সরিয়ে দিলো মীরের হাত জোড়া। কান্না জড়ানো ক্রুদ্ধ স্বরে বলে উঠলো,
“এটা কেমন ভালো থাকা? চব্বিশঘন্টা কেউ আমাকে নজরদারিতে রাখলে, আমার প্রতিটা কাজ টু দ্যা পয়েন্টে নোট করলে আমি কিভাবে ভালো থাকবো? এখানে আমি কিভাবে ভালো থাকবো? একা একা আমি কিভাবে ভালো থাকবো? আরে ভালোবাসি আমি তোমাকে! আমি কিভাবে তোমাকে ছেড়ে এভাবে ভালো থাকবো? আমাকে কি তোমার মানুষ মনে হয়না?

কেউ নেই আমার, কেউ নেই! আমাকে বোঝার মতো কেউ নেই এই পৃথিবীতে, আমাকে ভালোবাসার মতো কেউ নেই! চেয়ে দেখো চারদিকে, সবাই ভালো আছে আমি ছাড়া! তুমিও ভালো আছো, আমার অনুপস্থিতিতে তোমার দৈনন্দিন জীবনে কোনো পরিবর্তন হয়নি, হচ্ছে না।
তো থাকো না ভালো! আমাকে বাদ দিয়েই ভালো থাকো দয়া করে। যাও দাসীদের কাছে, যার সাথে ইচ্ছা রাত কাটাও! এই আনাবিয়া তোমাকে কখনো কিচ্ছুটি বলবেনা, মরে গেলেও না! যাও, চলে যাও। কাউকে দরকার নেই আমার!”
দু’হাতে মীরের বুকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে সরিয়ে দিলো আনাবিয়া। মীর আঁকড়ে ধরলো ওর হাতজোড়া, দুহাতের মুঠোতে শক্ত করে ধরে বলল,

“চুপ করো শিনজো, শান্ত হও। কান্না থামাও, এভাবে বৃষ্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লেগে যাবে।”
“করবোনা আমি চুপ! লাগুক আমার ঠান্ডা, তোমার কিছু যায় আসেনা তাতে! চলে যাও তুমি! আর আমি মরলেও বা তোমার কি? বরং মুক্তি পাবে তুমি, আমাকে দাফন করে এসেই তুমি ছুটে যাবে কোনো দাসীর সাথে বেড শেয়ার করতে!”
মীরের মুখভঙ্গি কঠোর হয়ে এলো। দু’ আঙুলে আনাবিয়ার গাল চেপে ধরে কঠিন স্বরে বলে উঠলো,
“বাজে কথা বলার একটা লিমিট আছে শিনজো। আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না৷ আমি না হয় অপরাধ করেছিলাম, মেনে নিয়েছি আমি দোষী, আমাকে তুমি এখন ঘেন্নাও করছো। আমার দোষের জন্য তুমি আমাকে শাস্তি দাও, চাইলে মারো, কাটো; কিন্তু এসব কোন ধরণের কথা?

তুমি কি কোনোই অপরাধ করোনি? আমার বাচ্চাটিকে কেন মেরেছিলে? আর তো কয়েকটি দিনই ছিলো, তারপরেই তো সব শেষ হয়ে যেতো! বাচ্চাটি তার মতো থাকতো তুমি তোমার মতো! তাহলে? কেন মেরেছিলে? সে বেঁচে থাকলে আজ এত সব কিছু হতো? তবে কেন মেরেছিলে? কি ভেবে নিষ্পাপ বাচ্চাটিকে মেরে ফেলেছিলে? বাচ্চাটি ভূমিষ্ট হওয়ার পর তুমি তার মা কে যা খুশি করতে, আমি কিছুই বলতাম না! বাচ্চাটিকে কেন?”
“আমিকি অনুতপ্ত হইনি? আমি বলেছিলাম আমার ভুল হয়েছে! তার জন্য তুমি আমাকে প্রাসাদ থেকে বের করে দিয়েছিলে! আর আমি যদি তাকে না-ই মারতাম তবে?
তবে বাচ্চাটির মাকে তুমি কি করতে? একটা দুধের বাচ্চার মা, নিজের সন্তানের মা কে তুমি কখনো মেরে ফেলতে পারতে? এতই সোজা সব কিছু?

সে তোমার বাচ্চার মা হলে তোমার প্রতি তার কোনো অধিকার বোধ থাকতোনা? সে কি আমার সামনে তোমার ওপর অধিকার খাটাতে যেতোনা? তখন তোমার কাছে তোমার বাচ্চা আর তার মা-ই হতো সব! আমাকে তুমি উচ্ছিষ্টের মতো ফেলে রাখতে এক কোণে!”
“নিজের মন মতো এভাবে একটা থিওরি তৈরি করে যাচ্ছেতাই কেন করেছিলে? আমি এরকমই করবো কে বলেছিলো তোমাকে?”
“এসব কারো বলার প্রয়োজন হয়না, এগুলা অভিয়াস! তোমার যদি ওদেরই লাগবে তবে আমাকে কেন বিয়ে করেছিলে? জানতেনা আমি বাচ্চা দিতে পারবোনা? আর দাসীর বিছানায় গেছিলেই যখন, আমাকে মেরে ফেলে কেন যাওনি? জানতেনা আমি কি করতে পারি? জানতেনা আমার মাথা খারাপ হবে? আমাকে দিয়ে তোমার সন্তুষ্টি মিলবেনা জানতে না তুমি?”

“বাজে কথা বলোনা শিনজো।”
“একদম শিনজো ডাকবেনা আমাকে! আমি কারো শিনজো নই।”
ফুঁসে উঠে বলল আনাবিয়া, কান্নার কারণে জড়িয়ে আসতে নিলো কথা৷ মীর শক্ত কন্ঠে বলল,
“আমি ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা নই, জানতাম না এসব হবে। জানলে আগে থেকেই প্রস্তুত হতাম, তোমাকেও প্রস্তুত করতাম। লাইফট্রি আমাকে তার সিদ্ধান্ত জানালে আমি নিজের সামনে শুধু তোমাকেই দেখেছিলাম, ভেবেছিলাম হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। নিশ্চিত ছিলাম না জানি, বা এমন আত্মবিশ্বাস থাকাও ঠিক নয়; কিন্তু আমার বিশ্বাস ছিলো, বিশ্বাস করেছিলাম সব ঠিক থাকবে। আমি জানি আমি হটকারিতায় অনেক বড় বড় ভুল করেছি, আমার তখন আরও ঠান্ডা মাথায় ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হতো। কিন্তু আমি তা করিনি, বা পারিনি।”

“তার জন্য আমাকে কেন ভুগতে হবে? তোমার হটকারিতার বলি আমি কেন হলাম? আমার ভালোবাসা কেন বলি হলো? কি ক্ষতি করেছিলাম আমি তোমার? এখন তুমি এখানে কেন? বাচ্চা তো আমি তোমাকে কোনোদিনই দিতে পারবোনা, আমার তো আর কিছুই দেওয়ার নেই তোমাকে! তবে তুমি আমার কাছে আর কি চাও?”
“তোমাকে চাই শুধু।”
বলে উঠলো মীর। তার বিষণ্ণতায় পূর্ণ স্থীর দৃষ্টি আঁটকে রইলো আনাবিয়ার মুখপানে৷ আনাবিয়া তাকালো ওর দিকে। ভ্রু তুলে বলে উঠলো,

“আমাকে আর কি চাও তুমি? কি আছে আমার দেওয়ার মতো তোমাকে? শরীর? সেতো সবারই আছে! তোমার দাসী গুলো তো কম সুন্দরী নয়, কম আবেদনময়ী নয়! তবে আমাকেই কেন চাই তোমার? এখন আবার বোলোনা তুমি আমাকে ভালোবাসো, মিথ্যা বলে ভোলাতে চেয়োনা আমাকে! আমার প্রতি তোমার শুধু কার্ন্যাল ডিজায়ার আছে অর নাথিং এলস্‌!”
“আর একটিও বাজে কথা বলবেনা শিনজো। আমার কথা শুনবে এখন শুধু।”
“কিছুই শুনবোনা আমি। আমি অনেক বেহায়া জানো? আর বোকাও! বার বার ভাবি, বার বার ভাবি তোমাকে আর কক্ষনো স্মরণ করবো না, তোমাকে আর একটুও ভালোবাসবোনা! কিন্তু আমার নির্লজ্জ মন তা শুনতে চায়না, তার তোমাকেই লাগবে। মরে যাওয়া উচিত আমার! শেষ করে দেওয়া উচিত নিজের সমস্ত সাফারিংস। কিন্তু তুমি তো আমাকে মরতেও দিবেনা, তোমার তো এখনো আমাকে টর্চার করা শেষ হয়নি, তুমি তো এখনো তৃপ্ত হওনি!”

“চুপ করো শিনজো। দয়া করে আর একটা বাজে কথাও বলবেনা। তোমাকে আমি সব কিছুর জন্য ক্ষমা করে দিয়েছি, তোমারও উচিত আমাকে ক্ষমা করে দেওয়া। এসব এখানেই শেষ করা উচিত আমাদের, এসব আমার আর একদমই ভালো লাগছে না। ফেড আপ হয়ে গেছি আমি।”
“এতটুকুতেই ক্লান্ত হয়ে গেলে? তবে এতগুলো বছরে আমার কি হয়েছে ভেবে দেখেছো একবারও? ক্ষমা করবোনা আমি তোমাকে। আর আমি কোনো ভুল করিনি যে তুমি ক্ষমা করতে এসেছো আমাকে!”
উঠে দাঁড়ালো মীর৷ চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার। শক্ত হাতে আনাবিয়ার বাহু ধরে হ্যাচকা টানে দাঁড় করালো। কঠিন স্বরে বলল,

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৮

“আর একটা কথাও উচ্চারণ করবেনা, নইলে তোমার অবস্থা খারাপ করে দিবো।”
পরমুহূর্তেই আনাবিয়াকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে টেনে হিচড়ে নিয়ে চলল জঙ্গলের বাইরে। আনাবিয়া চিৎকার করলো, ক্ষণে ক্ষণে আঁকড়ে ধরলো গাছের লতা পাতা, কান্নাকাটির বিকট শব্দে জাগিয়ে তুললো বন, কিন্তু মীর টললো না এতটুকু৷ শেষে তুলে নিলো কোলে, সজোরে নিজের সাথে চেপে ধরে রইলো আনাবিয়াকে। পাঁজর ভাঙার উপক্রম হলো আনাবিয়ার, তীব্র ব্যাথায় ছাড়া পাওয়ার আকুতিও মন গলাতে পারলোনা মীরের। জঙ্গল ছেড়ে রাস্তায় উঠে গাড়ির ভেতর আঁছড়ে ফেললো আনাবিয়াকে। পরক্ষণেই গাঁড়ি হাকালো শিরো মিদোরির উদ্দ্যেশ্যে………

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮০