প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৬
সাইদা মুন
—আম্মু মানে..?
মেহরীন আঙুল তুলে ছবিটায় থাকা তিতলি বেগমের পাশের মানুষটির দিকে ইশারা করে ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
—আমার মা।
এক মুহূর্তে চারপাশে যেন সময় থমকে গেল। উপস্থিত সবাই হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইল। মেহরীনের কথার পর সবার দৃষ্টি গিয়ে আটকে পড়ল ছবিটায়। ছবিটা তিতলি বেগমের বিয়ের আগের। তখন তিনি ছিলেন ছিমছাম, চিকন গড়নের, এখনকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে চেনাই মুশকিল। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার ছোট বোন তামান্না। দু’জনেই একই রকম পোশাকে, মুখভরা হাসি নিয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
তাহিয়া বিস্ময়ের সঙ্গে বলে উঠল,
—এটা আমার খালামনি আর আম্মু…
মেহরীন দ্রুত তাকাল তাহিয়ার দিকে। কণ্ঠটা যেন হঠাৎই ক্ষীণ হয়ে এল,
—কিন্তু এটা আমার মা….
পাশ থেকে তাহিয়ার দাদি অবিশ্বাস্য কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,
—হে রে দিদিভাই, এসব কী বলছিস? মজা করছিস?
মেহরীনের চোখ ছলছল করে উঠল। মাথা এদিক-ওদিক নাড়তে নাড়তে সে বলল,
—না, সত্যি। উনি আমার মা।
ঘরের প্রত্যেকটা চোখ তখন সন্দেহে ভরা। এমন দাবি কি সহজে বিশ্বাস করা যায়? হঠাৎ এক অপরিচিত যাকে চিনে কয়েকমাস মাত্র, সে যা খুশি বলল, আর তারা তা মেনে নেবে? এমনটা কি হয়?
মেহরীন অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল তাহিয়ার দিকে। দেখল, সেও একইভাবে তাকিয়ে আছে। অবিশ্বাস আর দ্বিধার দোলাচলে আটকে থাকা চোখ। ছলছলে দৃষ্টিতে মেহরীন তাহিয়ার হাত আঁকড়ে ধরে বলল,
—সত্যি বিশ্বাস কর তাহিয়া, এইটা আমার মায়ের ছবি।
তাহিয়া আর কিছু না বলে হঠাৎ হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। এক ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, হয়তো মাকে খবর দিতে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
দুপুর ঠিক বারোটা।
সিকদার বাড়ির ড্রয়িংরুমে সবাই মেহরীনকে ঘিরে বসে আছে। তিতলি বেগমের চোখ বেয়ে অঝোরে পানি ঝরছে। পুরোনো ক্ষত তাজা হয়েছে তার। বোনকে হারানোর যন্ত্রণারা হানা দিয়েছে। তিনি মেহরীনকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে বসে আছেন। তাহিয়াও কাঁদছে মায়ের কান্নায়। মেয়েটা বড্ড নরম যে কারো কান্নাতে নিজেও কেঁদে উঠে। অন্যদেরও মন তেমন একটা ভালোনা, তিতলি বেগমের কান্নায় সকলেরই মন খারাপ। শুধু রিতু আর সালমা বেগমের দৃষ্টি কেমন ধারালো, সন্দেহে মোড়া।
তালহা মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। চোখ-মুখ সামান্য ফোলা, মুখে ঘুমের রেশ এখনো কাটেনি। টাউজার আর গেঞ্জি পরা অবস্থায় সে সোফায় বসে আছে, মেহরীন আর তিতলি বেগমের ঠিক মুখোমুখি। তিতলি বেগম আদরের ছোঁয়ায় মেহরীনের মুখে হাত বুলিয়ে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
—তুই সত্যিই বলছিস তো মা?
মেহরীন ফোঁপানো কণ্ঠে বারবার মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
—সত্যি। এমন একটা ছবি আমার কাছে ছিল। দাদির কাছ থেকে পেয়েছিলাম আমার মায়ের। ঠিক এইরকমই একই জামা পরা আমার মা আর আমার খালামনির ছবি।
তিতলি বেগমের মুখে ধীরে ধীরে প্রশান্তির রেখা ফুটে উঠল। উত্তেজনায় কথা আটকে এল,
—আমরা ব..বসে ছিলাম, তাই না? ওই জাফলং এর ঝুলন্ত ব্রিজটা পেছনে দেখা যাচ্ছিল?
মেহরীন খানিকটা ভেবে দ্রুত মাথা নাড়াল,
—হ্যাঁ হ্যাঁ, দাদি বলেছিল এটা সিলেটের জাফলং।
সালমা বেগম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। রাগে গলা চড়া করে বললেন,
—ভাবি দেখো, এই মেয়ে মিথ্যাও বলতে পারে। তুমি যা বলছো, তাতেই শুধু হু হা করছে। আমার একে বিশ্বাস হচ্ছে না। তুমি খুব ইমোশনাল, ওর কথার জালে পা দিও না।
মেহরীন অসহায় চোখে তাকাল তার দিকে,
—আন্টি, আমি মিথ্যা বলছি না।
তিতলি বেগম সে কথায় কান না দিয়ে মেহরীনের মুখ নিজের দিকে ফিরিয়ে নিলেন,
—তোর মায়ের মুখে কোনো চিহ্ন ছিল?
মেহরীন একটু ভেবে বলল,
—হ্যাঁ। কানের পাশে ছোট একটা কালো জন্মদাগ ছিল। ওখানে নাকি ছোট ছোট চুল উঠত। সেগুলো ছিঁড়লে মায়ের জ্বর আসত।
এই কথাটুকুই যেন যথেষ্ট ছিল। তিতলি বেগম আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তাহিয়া মায়ের কান্না দেখে পাশে গিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে।
কান্নাভেজা গলায় তিতলি বেগম বললেন,
—এতদিন বলিসনি কেন?
মেহরীন কিছু বলতে যাবে, তার আগেই রিতু উঠে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল,
—বলবে কী করে? এতদিন তো ছবি দেখেনি, তাই মিথ্যা গল্প বানাতে পারেনি। বড় মা, আমি বারবার বলছি, ওর কথার ফাঁদে পা দিও না। এসব মেয়েদের চরিত্র ভালো না। নাটক করে বেড়ায়।
তার কথায় তালহা রাগী গলায় উঠে বলল,
—তার মিথ্যা নিয়ে বলছিস বল, চরিত্রে যাচ্ছিস কেনো?
রিতু সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—এসব যেই মেয়েরা করে, তাদের চরিত্র ভালো থাকে বুঝি?
তালহা ধমক মেরে উঠল,
—চুপ! চরিত্র নিয়ে যেন আর একটা কথাও এখানে না ওঠে।
সালমা বেগম রিতুর পক্ষ নিয়ে এগিয়ে এসে বললেন,
—তালহা, রিতু তো খারাপ কিছু বলেনি। তুই ওর ওপর এমন চেঁচাচ্ছিস কেন? মেয়েটা যে সত্য বলছে, তার প্রমাণ কী?
তালহা চুপ করে গেল। ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার মেহরীনের দিকে তাকাল। মেয়েটা ছলছলে চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের চাহনিতে যেন একটাই অনুরোধ, আপনি অন্তত বিশ্বাস করুন, আমি মিথ্যা বলছি না। তালহা আবার দৃষ্টি ফেরাল বিল্লাল সাহেবের চিন্তিত মুখের দিকে। চোখে চোখে কিছু ইশারা করতেই তিনি ধীরস্থির কণ্ঠে বলতে লাগলেন,
—আমি মেহরীনকে কিছু প্রশ্ন করব। এর মাঝে যেন কেউ নাক না গলায়।
কথাটা যে রিতু আর সালমা বেগমের উদ্দেশ্যে, তা বুঝতে তাদের বেগ পেতে হলো না। অপমানে দুজনের মুখেই কালো ছায়া নেমে এলো। রাগী চোখে মেহরীনের দিকে তাকাল তারা। বিল্লাল সাহেব নড়েচড়ে উঠে সবার উদ্দেশে ফের বললেন,
—কথা শেষ করা পর্যন্ত বাড়তি কথা চাই না।
চাচার কথা শেষ হতেই তালহা মেহরীনের চোখে চোখ রাখল। মেহরীন ভীত মুখে বসে আছে। হাত-পা হালকা কাঁপছে। মনে হচ্ছে, সে যেন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। নিজের মায়ের পরিচয় দিতে গিয়ে এত প্রশ্ন, এত সন্দেহের মুখে পরবে, এই কথাগুলো তার ছোট মাথায় আগে আসেনি। আসলেই তো, হুট করে বলা কথা কেউ কি প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস করে? তার কাছে তো কোনো প্রমানও নেই মুখের কথা ছাড়া।
বিল্লাল সাহেব ধীর গতিতে প্রশ্ন করলেন,
—তোমার মায়ের নাম কী ছিল?
মেহরীন শুকনো গলায় ঢুক গিলে তালহার দিকে তাকায় সে চোখ দিয়ে ভরসা দিতেই উত্তর দিল,
—তামান্না…তামান্না শাহ।
বোনের নামটা শুনতেই তিতলি বেগমের বুকটা মুচড়ে ওঠে। চোখ আরও ছলছল করে উঠল। ঠিক তখনই রিতু ফোঁড়ন কেটে বলে উঠল,
—কিন্তু বড় মা, তোমরা তো আহমেদ পরিবার। আর এই মেয়ে বলছে শাহ, দেখছো এখানেই তো মিথ্যা প্রমাণিত…
রিতুর কথা শেষ হওয়ার আগেই তালহার রামধমকে থেমে গেল সে,
—রিতু.. চুপ থাকতে বলেছিল, কানে ঢোকেনি?
তালহার লালচে চোখ দেখে আর কথা বাড়াল না রিতু। মাথা নিচু করে নিল। তালহা আবার মেহরীনের দিকে তাকিয়ে দেখল, মেয়েটা ভয়ে আরও জড়োসড়ো হয়ে গেছে, তার চেহারার দিকেই তাকিয়ে। কি করুন সে চাহনি। যেন বারবার ভয় পাচ্ছে এই বুঝি তালহাও তাকে অবিশ্বাস করবে। তার পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তালহা হালকা নিশ্বাস নিয়ে নিজের রাগটা সামলে নিয়ে দৃঢ়্য গলায় বলল,
—কোনো ভয় ছাড়া যা সত্য তা খালি বলে যাও। সত্যের জয় অবশ্যই হয়।
মেহরীন যেন মনে একটু বল পেল। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বিল্লাল সাহেবের দিলে ফিরল। তিনি প্রশ্ন করলেন,
—শাহ তোমার বাবার বংশ?
মেহরীন মাথা ওপর-নিচ করে ‘হ্যাঁ’ বলল।
—আর তোমার মায়ের বংশ, বা তোমার নানাবাড়ি কোথায়? কখনো যাওনি?
মেহরীন কাচুমাচু করে বলল,
—না.. কিছুই জানি না। শুধু দাদুর কাছ থেকে শুনেছিলাম, আমার মায়ের বাড়ি সিলেট।
—তাদের কাউকে চেনো?
মেহরীন মাথা নেড়ে ‘না’ বলতেই বিল্লাল সাহেব কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—তাহলে তোমাকে কখনো নানাবাড়ি থেকে কেউ দেখতে আসেনি?
—না। আসলে কেউ জানতই না আমার মায়ের খবর, দাদির থেকে শুনেছি মায়ের বিয়ের পর থেকেই উনার বাড়ির লোক উনার সাথে একেবারেই যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল। এমনকি মেয়ের বিয়ে কোথায় হয়েছে তাও দেখতে আসেনি। আম্মু নাকি বিভিন্ন ভাবে কল দিত তবে কারো সাথেই যোগাযোগ করতে পারত না।
কথাটুকু শুনতেই বিল্লাল সাহেব তিতলি বেগমের দিকে ফিরলেন,
—ভাবি তোমরা সম্পর্ক রাখোনি খোঁজ নেওনি?
তিতলি বেগম অবাক হয়ে বললেন,
—আমরা তো কত খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করলাম। ছোট ভাই তো বোনের খোঁজ আনতে সারা দিন রাত বাইরেই ছিল ধরতে গেলে । তবে কোনোরকমে খোঁজ মেলেনি। কোনোরকমে যোগাযোগ করতে না পেরে কয়েক বছর পর সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছিল।
দুজনের কথা শুনে বিল্লাল সাহেব কিছুটা ভাবল। কথার মাঝেই তিতলি বেগমের সাথে আলাদা ভাবে কথা বলতে চাইলেন। দুজনেই উঠে আড়ালে কিছু কথা বললেন বেশ কিছুক্ষন। এতে যেন মেহরীনের হার্টবিট ফাস্ট হচ্ছে। তাকে ভয় পেতে দেখে তাহিয়া এসে তার পাশে বসল। মেহরীনের হাত ধরতেই মেহরীন টলমলে চোখে তাকায়,
—তাহিয়া বিশ্বাস কর আমি মিথ্যা বলছি না।
তাহিয়া পরম যত্নে মেহরীনের চোখের পানি মুছে দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করে বলল,
—আমার তোর উপর দৃঢ় বিশ্বাস আছে মেহরীন। আই নো আমার বেস্ট ফ্রেন্ড মিথ্যা বলার মেয়ে না।
তাহিয়ার কথায় যেন সাহস পেল কিছুটা। যাক একটা মানুষ তো তার সাপোর্টে আছে। এরমধ্যেই তারা দুজন ফিরে এলেন। বিল্লাল সাহেব এসেই এবার আর ঘুরপাক না করে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন,
—তোমার মা-বাবার বিয়ে কীভাবে হয়েছিল, জানো কিছু?
মেহরীন মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলতেই তিনি বললেন,
—তাহলে বলো।
মেহরীন আস্তে আস্তে বলতে লাগল,
—দাদির কাছ থেকেই শুনেছিলাম। আমার আব্বার নাম মাসেদ শাহ। উনি ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়ালেখা করেছিলেন। তারপর কলেজে পড়ার খুব ইচ্ছে ছিল উনার। কিন্তু পরিবারের অবস্থা তখন অতটা ভালো ছিল না। আব্বা যখন টেন পাস করে, তখন আমার দাদার শরীর খুবই খারাপ ছিল। দুই ছেলে, আবার বউয়ের মুখে অন্ন তুলে দেওয়াই তখন তার পক্ষে দুষ্কর হয়ে পড়েছিল। তাই বাধ্য হয়েই আব্বা কাজে লেগে যায়। টেন পাশের সার্টিফিকেট থাকায় তখনকার সময়ে বেশ ভালো একটা চাকরি পেয়েছিল আব্বা। এরপর আব্বার চাকরির টাকাতেই সংসার চলতে শুরু করে। আব্বা চট্টগ্রাম বন্দরের সাইডের এক কোম্পানিতে কাজ করত। কিছু কারণবশত সেখান থেকে বদলি হয়ে তাকে সিলেট যেতে হয়। সিলেটে যাওয়ার বছরখানেকের মাথায় নাকি আব্বার সঙ্গে কলেজপড়ুয়া এক মেয়ের, মানে আমার আম্মার পরিচয় হয় কোনো একভাবে। সেখান থেকেই তাদের কথাবার্তা চলতে থাকে। আস্তে আস্তে একে অপরকে ভালোবেসে ফেলে। এই বিষয়টা দাদিকে নাকি প্রথম থেকেই জানিয়ে রেখেছিল আব্বা। দাদির কোনো আপত্তি ছিল না। কারণ ছেলে যখন কামাই করে, তখন সে নিজের পছন্দে বিয়ে করতে চাইলে করতে পারে, এই কথাটা দাদির ছিল। প্রায়ই নাকি আম্মা তখন দাদির সঙ্গে কথা বলত। দাদির ভীষণ পছন্দ হয়েছিল আম্মাকে। কিন্তু একদিন নাকি হুট করেই আম্মার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। আম্মা নাকি বিয়েতে না করেছিল। বলেছিল, সে একজনকে ভালোবাসে। কিন্তু কেউ শোনেনি…
বাকিটুকু বলার আগেই তিতলি বেগম কথা কেড়ে নিলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
—সেদিন যদি ওরা আমার বোনের কথাটা একবার শুনত, তাহলে এতগুলো বছর বোনটার থেকে দূরে থাকতে হতো না। সেদিন তামান্না বলেছিল, সে একজনকে পছন্দ করে। এই কথাটা সে প্রথম আমাকেই বলেছিল। সেদিন ভীষণ কাঁদছিল। আমি তাকে আশ্বাস দিয়েছিলাম, বাবা রাজি হবে, আমি তোদের কথা বলব। আমি বলেছিলাম, আব্বাকে বুঝিয়ে বলব। আব্বা প্রথমে রেগে গেলেও পরে আমার কথা ফেলতে পারেনি। বলেছিল ছেলেটাকে একবার দেখতে। সেদিন আব্বা রাজি হলেও দেখার দায়িত্ব দিয়েছিল আমার ভাইদের ওপর। ছোট ভাই গিয়ে দেখেছিল। কিন্তু ছেলেটা কারোরই পছন্দ হয়নি। তারপরও আমি আব্বাকে রাজি করানোর অনেক চেষ্টা করেছি। তামান্নাকেও বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু কেউ কিছু বোঝেনি। জোর করে বিয়ে দিতে গিয়েই বোনটা আমাদের সবাইকে ছেড়ে নিজের ভালোবাসার হাত ধরে চলে গেল। এতটাই রাগ করেছিল যে আজ সতেরোটা বছর ধরে তার কোনো খোঁজ নেই।
তিতলি বেগম কাঁদছেন, সঙ্গে মেহরীনও। বিল্লাল সাহেব তিতলি বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—ভাবি, আপনি যা যা বলেছেন, মেহরীনের মুখেও তো ঠিক সেই একই কথা। তাহলে তো মেয়েটা সত্য কথাই বলছে।
তাহিয়া আনন্দে বলে উঠল,
—তার মানে মেহরীনই খালামনির মেয়ে..
তিতলি বেগম সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন,
—হ্যাঁ, হ্যাঁ। এটাই আমার বোনের মেয়ে। ওর সবকটা কথাই সত্য। ওইটাই আমার বোন, আমার তামান্না। মা তুই আমার তামান্নার মেয়ে? আমার ছোট্ট পরিটারও একটা পরি হয়ে গেছে? খালামনি জানতেই পারলাম না।
বলেই অঢেল মায়া মেহরীনের মুখে ঢেলে দিলেন তিনি। এতদিন পর নিজের আপন মানুষ, নিজের খালার স্নেহে মেহরীনও ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। মায়ের আদর সে বুঝে ওঠেনি কখনো, কিন্তু খালার আদরে যেন মায়ের আদরটাই খুঁজে পাচ্ছে। মা থাকলেও বুঝি এভাবে আদর করে দিত? তিতলি বেগমের বুকে মুখ গুঁজে বারবার তার শরীরের ঘ্রাণ নিচ্ছে মেহরীন। তার ধারনা তামান্না বেগম যেহেতু উনারই বোন হয়তো উনার ভেতরই নিজের মায়ের শরীরের ঘ্রাণটা খুঁজে পাবে।
—আজ সতেরোটা বছর ধরে আমার আদরের বোনটাকে খুঁজে পাইনি। এত খোঁজ করেও আজ পর্যন্ত কোনো খোঁজ বের করতে পারিনি। আর আজ কিনা এত সহজে পেয়ে গেছি। দেখেছিস মা আল্লাহ নিজেই চায় আমাদের মিল। মা, মাকে জানাতে হবে। আমার বোনের খোঁজ পেয়েছি। আমার বোনের মেয়েকে পেয়েছি।
বলতে বলতে এদিক-সেদিক নিজের মোবাইল খুঁজতে লাগলেন। তিনি যেন ছোট বাচ্চা হয়ে গেছেন। যে কিনা নিজের প্রিয় খেলনাটা খোঁজে পেয়ে খুবই আনন্দিত। সেই আনন্দের ভাগিদার নিজের মাকেও করতে চান তিনি। মোবাইল না পেয়ে তালহার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—আব্বু, তোর নানুকে একটা কল দে না। আমার মা যে প্রতিদিন মোনাজাতে তার মেয়েটার জন্য কাঁদে। আজ যে তার দোয়া কবুল হলো।
তালহা শান্ত চোখে কয়েক পলক মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকল। মায়ের চোখে পানি, অথচ মুখে খুশির ঝিলিক। এই খুশি যে বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না, এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই সে হালকা ঢোক গিলে নিল। মাথা নিচু করে নানার নম্বরে কল লাগাল। দুবার রিং হওয়ার পর কল রিসিভ হতেই ফোনটা মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিল।
তিতলি বেগম দ্রুত মোবাইল কানে নিয়ে বলতে লাগলেন,
—আব্বা.. আব্বা।
মেয়ের কান্নামাখা কণ্ঠ শুনে হকচকিয়ে উঠলেন তালহার নানা। পাশে কান পেতে বসে থাকা নানিও বিচলিত হয়ে উঠলেন। দ্রুত ফোনটা হাতে নিয়ে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
—কি হয়েছে আম্মা? কাঁদছিস কেন? সব ঠিক আছে তো? তুই ঠিক আছিস?
তিতলি বেগম কান্নায় যেন কথাই বলতে পারছিলেন না। তবু অস্ফুট স্বরে বললেন,
—তামান্নার খোঁজ পেয়েছি, আম্মা..
কথাটুকু বলেই মোবাইল কানে চেপে ধরে রইলেন তিনি, ওপাশ থেকে কিছু শোনার আশায়। ওপাশে তার মা স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পর হঠাৎই ভেসে এলো কান্নার শব্দ।
—কোথায় আছে আমার তামান্না? আমার মেয়ে কোথায়? আমি এক্ষুনি আসব। আমার মেয়ের কাছে আমি যাব।
তিতলি বেগম মাকে সব খুলে বলতেই ওপাশ থেকে আর কথা এলো না। ওদিকে তখন হইচই পড়ে গেছে। সিলেট থেকে সবাই হয়তো আধা ঘণ্টার মধ্যেই রওনা দেবে, বাড়ির ছোট মেয়ের খোঁজ পাওয়া গেছে বলে কথা। সঙ্গে মেয়ের গহরের নাতনির খবর পেয়েছে।
তিতলি বেগম মেহরীনকে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বসে আছেন,
—এজন্যই বুঝি তোকে দেখলে আমার এত আপন আপন লাগত। আচ্ছা, তোর মা কোথায় রে? আমার বোনটা কোথায়, বল না মা। কতদিন হয়ে যাচ্ছে, দেখিনি। নাম্বারটা দে, কল দিই। কতদিন হয়ে যাচ্ছে আপা বলে ডাকটা শুনিনি।
তিতলি বেগমের প্রশ্ন শুনে মেহরীন কিছুটা থমকে যায়। হয়তো আনন্দে সে ভুলেই বসেছে মেহরীন যে বলেছিল সে অনাথ। বোনের খোঁজ পেয়ে মানুষটা কতটা খুশি, চোখেমুখেই তা স্পষ্ট। কী অদম্য আশায় আছে, বোনটাকে একবার দেখার, কথা বলার। অথচ সে নিজেই তো তার মাকে কোনোদিন সচক্ষে দেখেনি, কথা বলেনি মায়ের সঙ্গে। এই হাসিখুশি, আবেগে ভরা মানুষটাকে কী করে সে কথাটা বলবে, কি করে বলবে তার আদরের বোন এই দুনিয়া ছেড়ে আজ ষোল বছর। ভেবে পাচ্ছে না মেহরীন। চোখ ঘুরিয়ে একবার তালহার দিকে তাকায়। তালহার দৃষ্টি নিজের ওপর পড়তেই অসহায় চোখে তাকায় সে। তালহা চোখ দিয়েই তাকে আশ্বস্ত করে, সত্যিটাই বলতে।
মেহরীন মাথা নিচু করে বলতে শুরু করে,
—ওই ছবিতেই আমি প্রথম আমার মায়ের মুখ দেখেছিলাম, বোঝার বয়স হওয়ার পর। এছাড়া আর আমি আম্মুকে কোনোদিন দেখিনি..
কথাটা শুনতেই তিতলি বেগম যেন কেমন ছিটকে গেলেন মেহরীন থেকে। অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন,
—মানে? কী বলছিস?
মেহরীন মাথা আরও নিচু করে নেয়। ভাঙা গলায় বলতে থাকে,
—আমার জন্মের সময় আম্মুর অবস্থা নাকি খুবই খারাপ ছিল। গ্রামে ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় ভালো ডাক্তার দেখাতে পারেনি। আর আব্বাও আম্মাকে নিয়ে আসার পর শহরের চাকরি ছেড়ে গ্রামেই ক্ষেতখামার করত। তাই শহরে নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থাও ছিল না।
আমার জন্মের সময় সবাই ভয়ে ছিল, হয় বাচ্চা বাঁচবে, নয়তো মা। তবে আল্লাহর রহমতে সেদিন মা-মেয়ে দুজনেই বেঁচে যাই।
বলতে বলতে মেহরীন ঢুকরে কেঁদে ওঠে। তা দেখে তিতলি বেগম এক হাতে তাকে ঝাঁকিয়ে ধরে জিজ্ঞেস করেন,
—তারপর কী? আমার তামান্না ঠিক আছে?
মেহরীন মাথা নেড়ে কান্না চেপে বলে,
—কিন্তু মায়ের অবস্থা নাকি দিনদিন খুব বেশি খারাপ হচ্ছিল। আমার জন্মের দশ দিনের মাথায় উনি আমাদের ছেড়ে চলে যান..
হঠাৎ তিতলি বেগম একেবারে চুপ করে গেলেন। তাঁর কান্নাও থেমে গেল। আশপাশের সবাইও নিস্তব্ধ। তিতলি বেগমের এমন হঠাৎ নিরবতা সকলের মনেই প্রশ্ন জাগাল। ভয়ে আছেন এই কথা শোনার পর এখন তার কি অবস্থা হবে। পরমুহূর্তেই নিরবতা ভেঙে তিতলি বেগম হঠাৎ মেহরীনকে এক ধাক্কা মারলেন। ধাক্কার বেগে মেহরীন সোফা থেকে পড়ে যেতে নিলে কেউ দ্রুত গতিতে তার দু’বাহু আঁকড়ে ধরে তাকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিল।
নিজেকে মেঝেতে পড়তে না দেখে মেহরীন চোখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে তালহা। ঠিক তখনই তিতলি বেগমের হাতটা উঠে আসে মেহরীনের দিকে। রাগে থরথর করতে করতে থাপ্পড় দেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই মেহরীন স্তব্ধ হয়ে যায়। এদিকে তালহা এক টানে মেহরীনকে নিজের পেছনে টেনে আড়াল করে নেয়, আর নিজে এক কদম সামনে এসে দাঁড়ায়। ফলে থাপ্পড়টা মেহরীনের গালে না লেগে তালহার বাহুতে গিয়ে পড়ে।
তিতলি বেগম রেগে তেড়ে যেতে নেন,
—এই মেয়ে কী বলছিস এসব, হ্যাঁ? আমার বোনের কিছু হয়নি। ওর নাম নিয়ে যা খুশি তাই কাহিনি বানিয়ে ফেলবি? আর একটাও বাজে কথা যদি বের হয় আমার বোনের নামে, একদম মেরে ফেলব।
মায়ের এমন তেড়ে আসা দেখে তালহা দ্রুত তাকে শান্ত করতে টেনে অন্য পাশে নিয়ে যায়,
—আম্মু শান্ত হও। তোমার প্রেশার বেড়ে যাবে। এত হাইপার হচ্ছ কেন?
—দেখ না আব্বু, এই মেয়ে কী বলছে! আমার বোন নাকি মারা গে..
বাকিটুকু আর বলতে পারেন না। ফোঁপাতে শুরু করেন। তালহা নিজের বুকে মায়ের মাথাটা চেপে ধরে। ছোট থেকেই সে দেখেছে, মায়ের ভালোবাসা তার বোনের প্রতি কতটা গভীর। নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিল নিজের ছোট বোনটাকে। দুদিন পরপর নিজের বাসায় নিয়ে আসত, কি খাওয়াবে, কী করবে, কী না করবে সব নিয়ে ভাবত। বিয়ের পরও দুবোন আলাদা হয়নি, বরং আরও এক সুতোয় গেঁথে গিয়েছিল। এই বোনের মৃত্যু সংবাদ, সে কি সহ্য করতে পারবে? কিন্তু তারও কিছু করার নেই। মাকে জানাতেই হবে। এছাড়া মিথ্যা আশায় কতদিন রাখবে।
তালহা মায়ের মাথা হাতিয়ে দিতে দিতে নরম সুরে একটা ছোট্ট বাচ্চাকে বোঝানোর মতো করে মাকে বোঝাতে লাগল,
—আম্মু মেহরীনের মা-বাবা দুজনের কেউই এই দুনিয়াতে নেই। কথাটা তো মেহরীন প্রথম দিনই তোমাকে বলেছিল মনে নেই?
তিতলি বেগমের কান্নার গতি বাড়ছে। হ্যাঁ না কিছুই বলছে না। বলার মতো অবস্থাতেও নেই। কান্নার ফলে শরীর বারবার কেঁপে উঠছে। এদিকে সালমা বেগম যেন সুযোগ পেয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে গলা বাড়িয়ে চিৎকার শুরু করল,
—আজ যদি বড় ভাবির কিছু হয়? দেখলি তো তালহা, উপকারীর পিঠে কীভাবে ছুরি মারছে। এই মেয়েটাকে সব দিয়ে রাখছিস, তাও শান্তি হয়নি। পরিবারের ভেতরে ঢুকতে চাচ্ছে, তাও মিথ্যা বলে। নিশ্চয়ই এই মেয়ে কোনোভাবে জেনেছে যে ভাবির বোনের কোনো খোঁজ নেই বহু বছর ধরে। সেটাকেই কাজে লাগিয়ে নিজের জায়গা করতে চেয়েছিল।
তার কথাগুলো যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করল। নিজের দিকে আবারও সবার অবিশ্বাসী দৃষ্টি দেখে মেহরীন ভীষণ অসহায় হয়ে পড়ল। বারবার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। বুক ভেঙে কান্না আসছে। নিজের মায়ের পরিচয় দিতেও তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে? মনের ভেতর একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে, কেন বলতে গেল সে? চুপ করে থাকলেই তো পারত।
তিতলি বেগমের শ্বাসটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছিল। বুকের ভেতরটা যেন চেপে ধরছে কেউ। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, চোখ দুটো আধখোলা, চাহনিতে বেদনা আর অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট। হাত দুটো কাঁপছিল, আঙুলগুলো শক্ত করে শাড়ির আঁচল চেপে ধরেছে। কণ্ঠটা উনার ভেঙে এল, কথাগুলো ঠিকমতো বেরোচ্ছিল না,
—আমার মাথাটা.. মাথাটা খুব ধরছে।
তার কথাতেই চারপাশের সবাই অস্থির হয়ে উঠল। এমনিতেই তিনি প্রেসারের রোগী, তার ওপর এত কান্নাকাটি, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি মুহূর্তে ভয়ংকর হয়ে উঠছে। তালহা আর দেরি করল না। মায়ের হাত শক্ত করে ধরে ধীরে ধীরে বসিয়ে দিল। পিঠে ভর দিয়ে বসাল, যেন অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।
তালহা কিছু বলার আগেই ফাইজা নিজেই দ্রুত এগিয়ে গিয়ে প্রেসার মাপার মেশিনটা নিয়ে এল। সবার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল তার হাতে। তালহা মনোযোগ দিয়ে প্রেসার মাপছে। মেহরীন দূরে দাঁড়িয়ে অপরাধীর মতো তাকিয়ে আছে। নিজের কাছেই নিজেকে ভীষণ দোষী লাগছে। তার একটা কথাতেই মানুষটার এই অবস্থা, ভাবতেই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। মনে মনে বারবার দোয়া করছে, আল্লাহ, তুমি ওনাকে সুস্থ করে দাও।
ডিজিটাল প্রেসার মেশিনের স্ক্রিনে সংখ্যাগুলো ভেসে উঠতেই সবার কপাল একসঙ্গে কুঁচকে গেল। প্রেসার বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেছে। তালহা মায়ের দিকে ঝুঁকে শান্ত গলায় বলছে,
—শান্ত হও আম্মু, ধীরে শ্বাস নাও…এভাবে..
তাহিয়া তাড়াহুড়ো করে মায়ের ওষুধের বক্সটা এনে দেয়। তালহা ডাক্তারের দেওয়া প্রেসারের ওষুধটা বের করে নিজ হাতে মাকে খাইয়ে দেয়। এই ব্যস্ততার মাঝেও দায় এড়ায় না কেউ। সালমা বেগম আর রিতু ফিসফিসিয়ে, কখনো স্পষ্ট গলায়, মেহরীনকে নিয়েই নানা কথা শোনাচ্ছে, এই অবস্থার জন্য তাকেই দায়ী করছে।
মাকে সামলানোর ফাঁকেই তালহা চোখের ইশারায় তাহিয়াকে বলে মেহরীনকে এখান থেকে নিয়ে যেতে। তাহিয়াও আর দেরি না করে মেহরীনকে নিয়ে চলে যায় সেখান থেকে।
বিকেল গড়িয়ে চারটা,
ছাদের এক কোণে একা বসে আছে মেহরীন। গায়ে মেরুন রঙের সালোয়ার-কামিজ, আর ওড়নাটা বড় করে মাথায় দেওয়া। যেন নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার এক নীরব চেষ্টা। তাহিয়া পাশে এসে বসতে চেয়েছিল, কিন্তু মেহরীন একা থাকতে চেয়েছে।
দুপুরে তিতলি বেগমের ওই অবস্থার পর আর নিচে নামেনি সে। মনে হচ্ছিল, তাকে দেখলেই যদি আবার রাগে ফেটে পড়েন। তাই রুমেই নামাজ পড়ে, রুমেই নিজেকে আটকে রেখেছে। দুপুরে বাড়ির ছেলেরা নামাজ পড়ে ফিরতেই সবাই একসঙ্গে খাবার টেবিলে বসলেও তিতলি বেগম আসেননি। তালহা মায়ের খাবার নিজ হাতে নিয়ে গিয়েছিল তার ঘরেই। মা ছেলে একসঙ্গেই নাকি খেয়েছে।
আজ তাহিয়াও মেহরীনের ওপর জোর খাটায়নি। তার মনের অবস্থা বুঝে নিজের খাবারের সঙ্গে মেহরীনের খাবারও ঘরেই নিয়ে এসেছে, যেন মেয়েটা একা ফিল না করে। বাকিরা টেবিলে বসে খেয়েছে।
মেহরীন ছাদের দোলনাটায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। পরিষ্কার নীল আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা সাদা মেঘের দল। বিকেলের নরম রোদে দৃশ্যটা অপার সুন্দর, তবু সেই সৌন্দর্য তার চোখে এসে ধাক্কা খেয়ে ফিরে যাচ্ছে। মনটা বিষণ্নতার ঘন মেঘে ঢাকা, সেখানে আলো ঢোকার কোনো ফাঁক নেই। ক্ষণে ক্ষণে চোখের কোণ ভিজে ওঠে। চুপচাপ গড়িয়ে পড়া অশ্রু সে নিজেই মুছে ফেলে, কারও সামনে ভাঙতে চায় না আর।
—মেহরীনকে তো মেরুন রঙে একটু বেশিই মানায়। তবে এত সুন্দর সাজগোজের মাঝে এই বিষন্ন মুখটা একদম বেমানান লাগছে।
হঠাৎ কারও কণ্ঠে তার ধ্যান ভাঙে। পাশ ফিরে তাকিয়েই দেখে, তালহা। তাকে দেখামাত্রই দোলনা থেকে পা নামিয়ে একটু সাইডে সরে বসে মেহরীন। তালহাকে জায়গা করে দেয়, সে যে পাশে বসবে। তালহাও ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বসে পড়ল। গায়ে শুভ্র রঙের পাঞ্জাবি, সঙ্গে কালো প্যান্ট। এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকেই মেহরীন চোখ সরিয়ে নেয়। অন্য সময় হলে এই রূপে কতশত চিন্তা করে ফেলত। ক্রাশ খেয়ে নানান কল্পনা করে বসত। অথচ এখন যেন এসব কিছুই মনে ধরছে না। সামনে তাকিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
—সাজলাম কোথায়?
তালহা ঘাড় ঘুরিয়ে মেহরীনের মুখের দিকে তাকায়। ফর্সা মুখটা আজ মলিন। চুলগুলো উপরে তুলে খোপা বাঁধা। নাক আর ঠোঁট লালচে, নিশ্চয়ই কান্নার ফল।
—এই যে নাক মুখ ঠোঁট লাল হয়ে আছে দেখলেই তো লাগছে ওই কিসব কালারে আটাময়পদা মাখো তোমরা, ওসবই মেখেছো।
তালহা যে ইচ্ছে করেই ফাজলামো করছে, তা বুঝতে দেরি হয় না মেহরীনের। লোকটা তাকে হাসাতে চাইছে, চেষ্টা বৃথা যেতে দিবে? ভেবেই জোর করে একটু হাসি টেনে এনে বলল,
—ওটা ব্লাশ..
—সে যাই হোক, ওটাই।
তারপর দুজনেই আবার চুপ করে যায়। নীরবতার ফাঁকে তালহা মেহরীনকে মন দিয়ে দেখছে। মাথায় বড় করে ঘোমটা, নাকে ফুল, হাতে বালা, পুরোপুরি গিন্নি গিন্নি লাগছে তাকে। তালহার দৃষ্টি নিজের দিকে স্থির বুঝে মেহরীন প্রশ্ন করল,
—কি দেখেন?
তালহা নির্লিপ্ত গলায় বলল,
—আমার বউরে।
সরাসরি কথাটায় মেহরীনের গাল লাল হয়ে ওঠে। সে মুখ ফিরিয়ে নেয় অন্যদিকে। আবার কিছুক্ষণ নীরবতা। শব্দহীন সেই মুহূর্তে দুজনেই একে অপরের উপস্থিতি গভীরভাবে অনুভব করছে। হঠাৎ মেহরীন অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় তালহার দিকে,
—আপনিও আমাকে সন্দেহ করছেন?
তালহা পাশ ফিরে তার চোখে চোখ রাখে। মাথা নেড়ে “না” জানিয়ে বলল,
—আমি কেন সন্দেহ করব? আমি তো সব আগেই জানতাম।
তালহার কথায় মেহরীন চমকে ওঠে,
—কী! আপনি আগে থেকেই জানতেন?
তালহা মাথা নাড়ায়। মেহরীনের বিস্ময় আরও ঘন হয়,
—কীভাবে জানলেন? আমাকে বলেননি কেন?
তালহা দোলনায় হেলান দিয়ে এক হাত মেহরীনের পেছন দিয়ে নিয়ে তার বাহু ধরে তাকে নিজের কাছে টেনে নেয়। মেহরীনও ঘেঁষে এসে তার কাঁধে মাথা রাখে। তালহা ধীরে বলতে শুরু করে,
—তোমার কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় যখন সব কাগজপত্র আমার হাতে এসেছিল, তখনই খালামণির নাম দেখে সন্দেহ হয়েছিল। পরে নানা তথ্য জোগাড় করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সব মেলেনি। অনেক প্যাঁচ আছে, যেগুলো এখনো খুলতে পারিনি। তবে খুলবই…
মেহরীন কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
—কী প্যাঁচ?
তালহা সঙ্গে সঙ্গে বলে,
—ওগুলো থাক। তবে তোমার এখন সবার সামনে এই কথাটা বলা ঠিক হয়নি।
মেহরীন মাথা তুলে দ্রুত তাকায় তার দিকে,
—কেন?
তালহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
—সবকিছুরই একটা সময় থাকে। সেই সময় মেনে চললে ঝামেলা হয় না। সময়ের আগেপিছে হলে জটিলতা তৈরি হয়। যেমন এখন তুমি পড়েছ।
মেহরীন সন্দিগ্ধ চোখে বলে,
—পরে বললে কি ঝামেলা হতো না?
তালহা প্রতিউত্তরে বলল,
—যা হয়েছে, হয়ে গেছে। সবকিছুই কোনো না কোনো ভালো উদ্দেশ্যেই ঘটে। তবে সামনে তোমাকে খুব সাবধানে থাকতে হবে।
—কেন?
তালহা মেহরীনের মাথাটা নিজের কাঁধে আলতো করে চেপে ধরে বলল,
—সবাইকে বিশ্বাস করবে না। অনেক সময় আপন মানুষই সবচেয়ে বড় শত্রু হয়।
তালহার কথাগুলো মেহরীনের মাথায় ঢুকছে না। অস্থির, অবুঝ কণ্ঠে সে বলল,
—কিসব বলছেন! আমার শত্রু আবার কে? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
তালহা মৃদু হেসে বলল,
—বুঝবে। সময় হলে সব পরিষ্কার হবে। আপাতত আমি নিজেই ধোঁয়াশার ভেতর আছি। আগে নিজে পরিষ্কার হই, তারপর সবার মুখোশ একে একে খুলব…
শেষের কথাগুলো এত ধীরে বলল যে মেহরীন আর শুনতে পায় না। দুপুর থেকে টানা কান্নায় সে ভীষণ ক্লান্ত। মনটা ভারী। তালহার কথায় নানান প্রশ্ন জাগলেও আর কোনো পাল্টা প্রশ্ন না করে তালহার কাঁধেই ঢলে পড়ে রইল নীরবে। তালহাও সেভাবেই বসে রইল। মেয়েটা যদি এই নীরব আশ্রয়ে সামান্য শান্তি খুঁজে পায়, তবে থাক, এই মুহূর্তটুকু এভাবেই থাকুক।
কিন্তু কিছুক্ষণ যেতেই তালহা টের পেল তার পাঞ্জাবিটা ভিজে যাচ্ছে। বুকের ভেতর প্রশ্ন জাগল, মেহরীন কাঁদছে? দ্রুত সে মেহরীনের মাথাটা তুলে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিতেই দেখল, চোখের কোণে জমে থাকা জল আর আটকে নেই। গাল বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ছে একের পর এক ফোঁটা। তালহা গভীর শ্বাস টেনে আঙুলের ডগায় আলতো করে তার চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল,
—এতক্ষণ মায়ের কান্না সামলাতে সামলাতে আমি একেবারে ক্লান্ত। এখন আবার আপনি শুরু করলেন ম্যাডাম?
কথাটা শুনে মেহরীন আরও গুটিয়ে নেয় নিজেকে। মাথা নিচু করে ফেলে, চোখে অপরাধবোধ, মুখে অসহায়ত্ব। তার এই চুপচাপ ভেঙে পড়া তালহার আর সহ্য হলো না। তারই কিছু একটা করা উচিত। কিছু ভেবে নরম সুরে বলল,
—মন খারাপ করে লাভ আছে? চলুন ম্যাডাম চা ডেটে যাইই..
তালহার এমন প্রস্তাব শুনে মেহরীন ক্লান্ত চোখে তার দিকে তাকাল। লোকটা এই সময়ে দাঁড়িয়ে কী আজব কথা বলছে। শরীর-মন দুই-ই বিধ্বস্ত, তার ওপর এই চা-ডেটের আহ্বান। ক্লান্ত কণ্ঠে বলল,
—মজা করছেন?
তালহা দোলনা থেকে উঠে দাঁড়াল। চুল ঠিক করতে করতে বলল,
—উহু মজা কেনো করবো?
মেহরীন তপ্ত নিশ্বাস ফেলে বলল,
—মনে হলো।
—উঠুন উঠুন, বোরকা পড়ে ঝটপট রেডি হয়ে নিন। আমি বাইক বের করছি।
মেহরীন বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল,
—বাড়ির লোক দেখলে?
তালহা সামান্য ভাবান্তর মুখভঙ্গি করে বলল,
—উমম…কেউ দেখলে বলে দিবো আপনার কলেজের ইম্পর্ট্যান্ট কাগজ আনতে যাচ্ছি।
—আমার জন্য এখন মিথ্যা বলা শুরু করবেন বুঝি?
তালহা আলতো হেসে মেহরীনের দিকে ঝুঁকে এসে নাকটা স্নিগ্ধ ছোঁয়ায় টেনে দিল,
—একটু আদটু বলাই যায়।
মেহরীন মৃদু হেসে ফেলল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৫
—যদি ধরা পড়েন?
—ধরা পড়লে পড়লাম। তবে এই সময়টা মিস দেওয়া যাবে না। কারণ এটাই আমাদের সময়। বৃদ্ধ বয়সে নাতি-নাতনিদের গল্প শোনাতে হবে তো, আমাদের সময়ে আমরা কী কী করেছি।
তালহার কথা শেষ হতে না হতেই মেহরীন শব্দ করে হেসে উঠল। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল,
—তবে চলুন মশাই..
