Home বাবুই পাখির সুখী নীড় বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৪৯

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৪৯

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৪৯
ইশরাত জাহান

রাতের খাবার শেষ করে ঘরে আসলো দর্শন।শোভার খাওয়া শেষ। দিজা দিয়ে যায় খাবার।ঘরে এসে দর্শন দেখে শোভা এক দৃষ্টিতে জানালার বাইরে চেয়ে আছে।মৃদু হেসে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করে,“শরীর এখন কেমন?”
শোভা পিছন ফিরে উত্তর দেয়,“ভালো।”
আসলে যে ব্যাথা এখনও শোভার আছে এটা বলল না।শোভা বিছানা ঝাড়ার জন্য ঝাড়ু হাতে নিলে দর্শন ঝাড়ু নিয়ে বলে,“আমি বিছানা গোছাচ্ছি।তুমি বসো।”
শোভা নাকোচ করে বলে,“আপনি পারবেন না।”
দর্শন কপালে ভাঁজ ফেলে বলে,“তাহলে তো বলতে হয় তুমি আমাকে চেনোই না।বিদেশে নিজের কাজ নিজেকেই করতে হয়েছে।তাই এসব টুকটাক কাজ আমি ভালোই পারি।”

শোভার মনে পড়ে যায় দিজার কথা।দর্শনের সাথে সংসারের শুরুর দিকেই দিজা জানিয়েছিল দর্শন নিজের কাজ নিজে করে।ছোট থেকেই শুধু ওর ঘরটা মোছার জন্য বুয়া যেতো এছাড়া ওর ঘরের সমস্ত কাজ ও নিজেই করতো।আসল কথা মানুষ আর কোলাহল দর্শনের একদম অপ্রিয় হয়ে ওঠে।শোভা চেয়ে চেয়ে দেখছে দর্শনের বিছানা গোছানো।টানটান করে চাদর গুজে দেয় তোষকের মধ্যে।এরপর ঝাড়ল।শোভা মৃদু হেসে দেখে আর মনে মনে বলে,“লোকটা বেশ আলাদা।আমার ভাইজান বা আমার দেখা দাদাজানের মত না। এনার মধ্যে অনেক কিছুই আছে যেগুলো আমার মাথায় ঢোকে না।আদৌ কি এনাকে আমি চিনতে পারব নাকি এর আগেই একমাস পূর্ণ হলে উনি আমাকে তাড়িয়ে দিবেন?”

শোভার মনের মধ্যে ধক করে ওঠে।অতঃপর মনে মনে বলে,“যদি উনি আমাকে তাড়িয়ে দেয় এর থেকে অপমানজনক আর কিছুই নেই আমার কাছে।আমি কি এতটাই অযোগ্য বউ যে তাড়িয়ে দিবে!কিভাবে যোগ্য হবো?ওনার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলে আমি ভালো না ওনার থেকে দূরে থাকলে কোনো এক ছুতোয় আমাদের কাছে আসা হয়ে যায়।ওই সময় উনি আমাকে কিছুই বলেন না আবার আমার সাথে অকারণে বাজে ব্যবহার করেন।এরপরই আবার কিছু হলে উনি নিজেই আমার জন্য ছটফট করেন।আমাকে সুস্থ দেখার জন্য ওনার পাঁয়তারা চলে।এতকিছু এত রূপ কেন দেখান উনি?”
গুড নাইট প্লাকে দিয়ে শোভার দিকে তাকাতেই শোভাকে অন্যমনস্ক দেখতে পায় দর্শন।কপালে ভাঁজ ফেলে শোভার দিকে এগিয়ে এসে শোভার কপালে একটা টোকা দিলো।শোভা হুশে ফিরতেই দর্শন ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করে,“কি ভাবছিলে গভীরভাবে?”
শোভা আনমনে বলে দেয়,“আপনাকে।”
“আমাকে?”

শোভা মাথাটা উপর নিচ করতেই দর্শন খুশি হলো যেনো।তার বউ তাকে নিয়েই ভাবছে শুধু।এটা কেনো ঈদ আনন্দের মতোই দর্শনের কাছে।ও তো এটাই চায়।ওর বউয়ের জগৎ শুধু ওর মাধ্যমে চলবে তবে সেটা শোভার মাধ্যমেই আদায় করতে চায়।নিজে জোর করে না।কারণ দর্শন জানে ও জোর করবার সময় নিজের মস্তিষ্ক ভয়ানকভাবে কাজ করবে।হয়তো এর মাধ্যমে শোভার মধ্যে আঘাত হানবে ঠিক যেমন কুদ্দুসের ব্যাপারটা।দর্শন জানে সে বাড়াবাড়ি করেছে কিন্তু ওই সময়টায় নিজেকে সামলাতে পারেনি।ওর তো শুধু নিজের জিনিসকে নিজের করতেই হবে।দর্শন শুধু একটা জিনিসই বোঝে।ওর বউ শুধু ওর। আর কারো হয়ে কথা বললেও ওর সহ্য হবে না।কারণ যার বউ তার ছাড়া অন্য পুরুষের হয়ে কথা বলা মানে তো তার প্রতিও টান অনুভব করা।এমন আরও উদ্ভট চিন্তাধারা আসে দর্শনের মস্তিষ্কে।রাগ মাথায় যত নেগেটিভ ধারণা দর্শনকে আরো বেশি শেষ করে দেয়।যেটার প্রভাব পড়তে পারে শোভার উপরেও।তাই যত পারে শোভাকে নিয়ে আলাদা জগৎ বানাতে চায়।

শোভা যখন বুঝলো সে দর্শনকে নিজের আবেগের কথা বলে দিছে তখনই লজ্জা পেলো।দর্শনের সামনে থেকে সরে গিয়ে আয়নার সামনে দাড়িয়ে চিরুনি নেয়।দর্শন বুকে হাতভাজ করে প্রশ্ন করে,“আমাকে নিয়ে কি ভাবছিলে?”
শোভা মাথায় চিরুনি ধরতেই দর্শনের প্রশ্নে থমকে গেলো।একটু ভেবেই চুলের জট ছাড়াতে ছাড়াতে বলে,“আপনার মত রাগী গম্ভীর যে কি না তার ঘরে সামান্য মশা ঢোকার সুযোগ দেয়না সে এখন আমাকে রেখে দিচ্ছে।”
“মশার সাথে তো আমার তেমন সম্পর্ক নেই যে তাকে আমার ঘরে রাখবো,যে সম্পর্ক আমার তোমার সাথে আছে।”
শোভা পিছন ফিরে দর্শনের চোখে চোখ রাখলো।দর্শন পলক না ফেলেই ঘোর লাগানো দৃষ্টিতে চেয়ে আছে শোভার দিকে।শোভা যেহেতু চুল আঁচড়াতে থাকে ওর লম্বা চুল আচমকা চিরুনির সাথে পেঁচিয়ে যায়।এমনটা আগে হতো না কারণ শোভা আগে মনোযোগ দিয়ে চুল আঁচড়াত।এই দর্শনের ঘোর লাগানো দৃষ্টিতে যেন মেয়েটা অমনোযোগী হয়ে উঠছে। ভুলে যাচ্ছে অনেক কিছুই।শোভা চুলে টান অনুভব করতেই চোখ বুজে নেয়।দর্শন দ্রুত এগিয়ে এসে বলে,

“কি হলো তোমার?”
“জট লেগে আছে।সারাদিনে চুল আঁচড়ান হয়নি।এখন আরো পেঁচিয়ে গেলো চিরুনির সাথে।”
দর্শন চিরুনি নিয়ে বলে,“তোমাকে আঁচড়াতে হবে না।আমি আঁচড়ে দেই।”
শোভা চুপচাপ রাজি হলো।এর আগেও তো চুল আঁচড়ে দিয়েছে দর্শন।মনে মনে বলে,“আমার চুল আঁচড়ে দেওয়ার দায়িত্ব তবে আপনিই নিয়ে নিচ্ছেন অথচ আমার দায়িত্ব নেওয়াটা এখনও মুখ ফুটে বললেন না।”
দর্শন ধীরে ধীরে চুল আঁচড়ে দিয়ে বলে,“তোমার চুলগুলো বেশ লম্বা।হাঁটু ছাড়ানো।আন্টি যত্ন নিতেন তাই না?”
শোভা মুখে চওড়া হাসি দিয়ে বলে, “আম্মা তো আমার যত্ন নেওয়া বলতে এই চুলগুলো বড় আর মজবুত রাখার চেষ্টা করতো।আমার চুলগুলো দেখলেই আম্মার কথা, আম্মার যত্ন,আম্মার ভালোবাসা মনে পড়ে।”
“কি কি দিতো তোমার মাথায়?”
“নারিকেল তেল।ছোটবেলায় অবশ্য পুকুরের কিনারায় জমে থাকা মাটি দিয়ে শ্যাম্পুর কাজ করে দিতো। আরো কিছু ফল ছিল পাশের বাড়ির রিঠা,আমলকী,হরীতকী এগুলো কিনে শুকিয়ে কি কি যেনো বানাতো আম্মা।এরপর ওরাও গাছ কেটে বিল্ডিং বাড়ি বানায়।আম্মাও দুর্বল হয়ে ওঠে।আমার যত্ন বলতে দোকানের কেনা শ্যাম্পুর পাতা আর তেল।”

দর্শন একটু ভাবলো।অতঃপর জানতে চাইলো,“ওসব গাছ নার্সারিতে পাওয়া যায়?”
শোভা আয়নায় এক দৃষ্টিতে দর্শনকে দেখে বলে,“আমি তো জানি না।কেন?”
“তোমার চুলগুলো ভালো।একদম আমার দাদীজানের মত।আমার মনে হয় আন্টির করা যত্নগুলো ধরে রাখা উচিত।”
শোভা অবাক নয়নে দেখছে দর্শনকে। শোভার চুলের যত্ন নিতে কি না কিছু গাছ কিনবে,যেগুলো দিয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে চুলের যত্ন নেওয়া যায়। চুল আঁচড়ে দেবার পর দর্শন বলে,“বিনুনি পারিনা আমি।সেদিন করে দিয়েছিলাম একটুও ভালো হয়নি।”
শোভা ঠোঁট চেপে হেসে বলে,“আমি করছি।”
বলেই নিজের মত দুইহাত পিছন করে বিনুনি করতে চুলগুলো তিনটে ভাগ করে।দর্শন দেখছে মন দিয়ে।শোভা বামপাশের চুলগুলো মাঝের চুলের ভাজে দিয়ে আবার ডানপাশের চুল নিয়ে একই কাজ করে।চুলগুলো একেকটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিনুনি করতে থাকে শোভা।দর্শন প্রথমবার ইউটিউবে দেখায় তেমন ধরতে পারেনি।তবে আজকে ধরতে পারলো।শোভার অর্ধেক চুল বিনুনি হতেই দর্শন বলে,“ওয়েট।”
শোভা চমকে গিয়ে বলে,“কি হলো?”

“বাকিটা আমি করতে চাই।”
“কি?আপনি পারবেন না।আপনি এখনো ভালোভাবে শিখেননি।”
“এবার আমি পারফেক্টলি পারবো।তুমি জাস্ট চুপচাপ দেখো।”
“না,উল্টো পাল্টা হলে সমস্যা।”
“কোনো উল্টো পাল্টা হবে না।সব পারফেক্ট হবে।”
“টান পড়লে ব্যাথা পাবো কিন্তু।”
“ধীরে ধীরে করে দিবো।কোনো টান লাগবে না।একদম ব্যাথা পাবে না,ওয়াইফি।”
ওয়াইফি শুনে শোভা আবারও থমকে দেখলো।দর্শনের চোখেমুখে আত্মবিশ্বাস।যেটা শোভার মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করতে পারল না।শোভা বিনুনি ছেড়ে দিতেই দর্শন ধরে নেয়।নিজের মত করে বিনুনি করে দিলো।অতঃপর শোভার দিকে ফিরে মৃদু হাসির সাথে বলে,“বলেছিলাম না ব্যাথা পাবে না।”
শোভা পিছন ফিরতেই দর্শনের বুকের সাথে শোভার নাকের ঘষা লাগে।দর্শন ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করে,“ব্যাথা পেয়েছো?”
শোভা নাকে হাত দিয়ে বলে,“না।”

“I will never hurt you.”
শোভা লাজুক চোখে তাকালো।এর মধ্যেই দর্শনের কল আসলো।বিরক্ত ভাব ফুটে উঠল এতে দর্শনের মধ্যে।শোভার সাথে কাটানো এই মুহূর্তে তার কল আসতে হবে কেন?এই রাতে কেউ কেনই বা কল দিবে!দর্শন কল কেটে দিতেই শোভা বলে ওঠে,“কাটলেন কেন?”
“মুড নেই।”
“ইম্পর্ট্যান্ট কল হতে পারে তো।”
“এত রাতে আমার ম্যানেজারের আবার কিসের ইম্পর্ট্যান্ট কল!অফিস টাইমে মনে থাকে না।”
দর্শনের বিরক্তিকর কন্ঠ শুনে শোভা চুপ করে গেল।বলা যায়না দ্বিমত কিছু বললে দর্শন উল্টো পাল্টা কি বলে।দর্শনের ভালো চেয়েও কথা বললে হয়তো ভাববে ম্যানেজারের প্রতি দয়া দেখানো হচ্ছে।শোভা চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পড়ল।দর্শন লাইট বন্ধ করতেই আবারও কল আসে।এবার দর্শন বিরক্তিতে চ উচ্চারণ করে কল ধরে ধমকে বলে,“ইউ ইডিয়ট!এই রাতে বারবার কল করছো কেন?প্রাইভেসি বলতে কি কিছুই জানো না?ফ্যামিলি টাইমে ডিস্টার্ব করা আমার পছন্দ না।”

শোভা ভয়ে কেঁপে উঠলো।ওপাশ থেকে ম্যানেজার ভয়ে তুতলিয়ে বলে,“আসলে স্যার রাত বারোটার পরই মেইল আসলো।যেটা আপনাকে না জানালে আমি তো কালকের ব্যাপারে এগোতে পারবো না।কালকের কাজটার জন্য আপনার পারমিশন প্রয়োজন।”
“এই রাতে কোন ব্রেইনলেস পারসন মেইল পাঠায়?”
“আমাদের নিউ মডেল।যাকে আমরা আমাদের প্রোডাক্ট এর অ্যাড করতে হায়ার করেছি।উনি আমাকে একটু আগেই মেইল করেছেন।জানালেন উনি এখন ফ্লাইটে আছেন।কালকে সকালেই পৌঁছাবেন।আর এগারোটার দিকে আমাদের কোম্পানিতে আসতে চান।মিটিংটা কালকেই করবেন তিনি।তারপর সব ডিল কমপ্লিট হলে উনি অ্যাড করতে রাজি হবেন।আমি ওনাকে কি আনসার দিবো?”

“এটা কি সকালে আমার সাথে কথা বলে ঠিক করা যেতো না?”
“উনি ভীষণ জেদি স্যার।যখন যেটা জানতে চায় তখন সেটার উত্তর না দিলে রেগে যান।এমনও হয়েছে ওনার মেইলের রিপ্লাই দেরিতে দেওয়াতে উনি একটা কোম্পানির অ্যাড করতে না করে দেন।”
“সো হোয়াট!ক্যানসেল হার।হায়ার নিউ ওয়ান।”
ম্যানেজার একটু থেমে আবারও বলে, “সে বাংলাদেশের হয়েও ভারতের নামকরা মডেল।নামকরা অনেকগুলো ওয়েব সিরিজ আছে তার।এমন একজন সেলিব্রেটি হাতছাড়া করাটা ঠিক হবে না।”
দর্শন একটু ভেবে বলে,“তোমার যদি এনাকে বেস্ট মনে হয় তবে তাকেই হায়ার করো।তবে এসব সেলিব্রেটির সাথে আমি মিটিং করব না। প্রত্যেকবারের মত তুমি নিজেই মডেল সিলেক্ট করবে।”

“আপনি সাক্ষাৎ করবেন না?”
“ওদের সাথে সাক্ষাৎ করার ইন্টারেস্ট আমার নেই।”
“ওকে স্যার।”
“আর হ্যাঁ,এভাবে নেক্সট টাইম আমাকে রাতেরবেলা কল করে ডিস্টার্ব করলে তোমাকে ফায়ার করে দিবো।”
“কিন্তু স্যার এটা তো কোম্পানির জন্য ছিলো।”
“অফিস টাইমে যেমন আমি অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি ফ্যামিলি টাইমে ঠিক তেমন ফ্যামিলি।I don’t like it when someone comes to disturb me at my every moment.”
“Sorry sir.”

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৪৮

দর্শন কল কেটে দিলো।চুপচাপ এসে শুয়ে পড়ল শোভার পাশে।শোভা জেগে থাকলেও ইচ্ছাকৃত ঘুমের অভিনয় করে আছে।ব্যাটা ক্ষেপেছে।এখন ঘুমের অভিনয় করে হলেও পরিবেশ শান্ত রাখতে চায়।শোভার এই অভিনয় টিকতে দিলো না দর্শন।হাত বাড়িয়ে শোভাকে নিজের নিকটে টেনে নিলো।শোভার শরীর কেঁপে উঠলো।দর্শন চোয়াল শক্ত রেখে শোভার নরম ত্বকে হাত রেখে বলে,“আমার সাথে অভিনয় করে তুমি ফেইল করেছো ওয়াইফি।Remember, you are not an actress.”
শোভা চুপ করে আছে।দর্শনের এভাবে আচমকা কাছে টানাতে ঘাবড়ে গেলেও দূরে সরলো না।দেখতে চায় দর্শন এভাবেই কি তাকে বউয়ের মর্যাদা দেয় কি না।

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৫০