চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৩
আরোবা চৌধুরী আরু
গাড়িগুলো আগে আগে বেরিয়ে গেল। রাস্তা ফাঁকা হয়ে এলে চারপাশ কেমন চুপচাপ হয়ে গেল। নাফিসা তখনও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে মাটির ভেতর ঢুকে যেতে পারলেই বাঁচে। সায়মান আবার ডাকল, গলা ঠান্ডা গাড়ির দরজা খুলে শুধু বলল,
— মিসেস সায়মান তাহের রাশিদ, দাঁড়িয়ে থাকলে হবে? গাড়িতে ওঠেন।
নাফিসা চুপচাপ গিয়ে সামনে বসল বুক ধক করে উঠছে। দরজা বন্ধ হতেই সায়মান নিজের সিটে গিয়ে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল। কিছুদূর পর্যন্ত কেউ কিছু বলল না। শুধু গাড়ির শব্দ। নাফিসা চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। ভেতরে ভেতরে কী বলবে, কী হবে এসবই ভাবছে।
হঠাৎ সায়মান রাস্তার পাশে গাড়ি থামাল।নাফিসা চমকে মাথা তুলল।অজান্তেই একটা ঢোক গিলল। তার চোখ গিয়ে আটকাল সায়মানের মুখে। সায়মান ধীরে ধীরে তার দিকে ঘুরে তাকাল কিছু না বলে এক হাতে নাফিসার কোমর টেনে তাকে নিজের কোলে বসিয়ে নিল। নাফিসা স্তব্ধ।
— DSP…সাহেব …!
সায়মান গম্ভীর গলায় বলল,
— চুপ। একদম চুপ। এখন আমি কথা বলবো।
নাফিসা চুপ হয়ে গেলো মাথা আরো নিচু করে থুনতির কাছে ঠেকালো। সায়মান আবার বললো,
— তোমার এত সাহস হলো কীভাবে, মিসেস সায়মান তাহের রাশিদ? আমাকে না বলে এভাবে চলে আসো? আবার আমাকে দিয়ে চুরি করিয়েছো সেটা এক কথা। তার উপর এবার কিডন্যাপার বানিয়ে দিলে আমাকে?
নাফিসা কাঁপা গলায় বলল,
— আমি… আমি তো…
নাফিসার কথা শেষ হওয়ার আগেই সায়মান আবার বলে উঠলো,
— তোমার হাজব্যান্ড একজন পুলিশ অফিসার। DSP। এটা ভুলে গেছো নাকি? আমাকে দিয়ে না চাইতেও বউ তুমি চুরি, ডাকাতি আর কিডন্যাপিং করাচ্ছো। আমার জাত যাবে তো এবার বউ ! সাথে পুলিশ সমাজেরও যাবে।
নাফিসার চোখে পানি জমে উঠল।
— আমি কাউকে কিডন্যাপ করিনি…
— ওহ না?
সায়মান ভ্রু তুলল।
— আমার বোনকে পালাতে সাহায্য করা কি? আমার ভাইয়ের নাটকে সাপোর্ট দেওয়া কি? আর নিজে বাড়ি থেকে লুকিয়ে বের হওয়া? এগুলো কী? আইন বইয়ে দেখালে সব কয়টার উপর কেস হয়ে যাবে কিন্তু।
নাফিসা এবার কান্না করে দিল। সায়মানের কোল থেকে সরে আসতে গেলো কিন্তু সায়মান আরো চেপে ধরল নিজের সাথে।
— চুপ করে বসো। আমি কি তোমাকে খেয়ে ফেলবো? খাব কিন্তু এখন না আগে আমাদের বেবিটা চলে আসুক। তারপর ইচ্ছামতো তোমাকে টেস্ট করব বউ আবার।
নাফিসা কান্না থেমে গেল সায়মানের কথায় লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। সায়মান তার থুতনিতে হাত দিয়ে মুখটা একটু তুলল।
— এই যে… এত লজ্জা কিসের? মিসেস সায়মান তাহের রাশিদ, আপনি যে অপরাধ করেছেন তার জন্য আপনাকে এখন শাস্তি পেতে হবে।
নাফিসা চোখ বড় করল।
— আবার কী?
সায়মান নিজের ঠোঁট একটু এগিয়ে দিয়ে বলল,
— চুমু দাও।
নাফিসা একদম গুটিয়ে গেল।
— না…
— কী না? এত সাহস করে বাড়ি থেকে বের হতে পারো, আর এটা পারো না?
মুচকি হেসে বলল সে।
— তোমার এই ছোট্ট পেটে আমার বাচ্চা আছে, আর তুমি এখনো এমন লজ্জা পাচ্ছো?
নাফিসার গাল লাল হয়ে গেল।
— আপনি একদম ভালো না।
— আমি খারাপ হয়েছি বলে আজ তুমি আমার বাচ্চা পেটে করে নিয়ে ঘুরছো।
সায়মান শান্তভাবে আবার বলল।
— দাও।
শেষে নাফিসা খুব আস্তে এগিয়ে এসে তার ঠোঁটে ছোট্ট করে ছুঁয়ে দিল। মুহূর্তের জন্যই।
সায়মান হালকা ভ্রু তুলল।
— এতটুকু? ওকে সমস্যা নাই বাকিটুকুর জন্য আমি আছি।
বলেই সায়মান নাফিসার অধরে নিজের অধর মিলিয়ে দিয়ে পিচ্চি পুতুলের উপর মগ্ন হয়ে গেল। দীর্ঘ সময় পর ছাড় পেলো নাফিসা দুইজনি অনবরত শ্বাস নিতে থাকতো। সায়মান এবার গম্ভীর গলায় বলল ,
— আর কখনো আমাকে না বলে কোথাও যাবে না। যা করবে, আগে বলবে। আমি না করলেও অন্তত জানবো।
নাফিসা মাথা নাড়ালো। সায়মান তাকে আবার সিটে বসিয়ে সিটবেল্ট লাগিয়ে দিল। গাড়ি রাতের রাস্তায় এগিয়ে চলল।
অন্যদিকে……..
গাড়ি থামতেই একে একে সবাই সায়মানের ফ্ল্যাটে ঢুকল। দরজা খুলে ভেতরে পা রাখতেই সবার চোখ একসাথে বড় হয়ে গেল।
ড্রয়িংরুম পেরিয়ে ডানপাশের দুইটা রুম দুটোই ফুল দিয়ে সাজানো।
সাইফান প্রথমে থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হঠাৎ মেঝেতে ধপ করে শুয়ে পড়ল।
— হে আল্লাহ… আমার মতো ভাগ্যবান জামাই আর আছে নাকি!
সবাই হতবাক। কেউ বুঝতে পারছে না এই বাসরঘর কে সাজালো?
রায়হান ফিসফিস করে বলল,
— ভাইয়া তো আমাদের সঙ্গে ছিল… তাহলে?
রিদওয়ান নিচু গলায় বলল,
— ব্যাপারটা রহস্যময়!
ওরা এসেছে দশ-পনেরো মিনিট হবে। ঠিক তখনই দরজা খুলে সায়মান আর নাফিসা ভেতরে ঢুকল।
সাইফান সায়মানকে দেখেই এক লাফে উঠে দৌড় দিল। গিয়ে সোজা জড়িয়ে ধরল তাকে।
— ভাইইইই!
ঠুস ঠাস করে গালে দুটো চুমু বসিয়ে দিল। আরও কিছু বলতে যাবে
ঠাস!
সায়মান শান্ত মুখে ওকে নিজের থেকে সরিয়ে একটা থাপ্পড় দিল।
সাইফান হা করে তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
— থাপ্পড় মেরেছো আই ডোন্ট মাইন্ড একটু বলে মারতে আমি চমকে উঠেছি। যদি হার্ট অ্যাটাক করতাম তাহলে তো বাসর না করে মরতে হতো। যাইহোক ভাই… আই লাভ ইউ! তুমি আমার বাসর ঘর সাজিয়েছ, আমি জানি। তুমি যে তখন ঢং ধরে আমাদের ভয় দেখাচ্ছিলে, আমি বুঝেছি সব! তোমার অন্তরে আমার জন্য কত ভালোবাসা—আমি জানি ভাই! সেই টানেই তো চুমু দিলাম… তাই বলে থাপ্পড়?
সায়মান বিরক্ত চোখে তাকাল।
— নাটক শেষ হয়েছে?
তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
— সবাই ফ্রেশ হয়ে আসো। তারপর খেতে বসবি।
আবার সাইফানের দিকে তাকাল।
— খাবার রাখা আছে। সব গরম করে সবাইকে সার্ভ করার দায়িত্ব তোর।
— ভাইইই! আমি সদ্য বিবাহিত একটা জামাই! আমাকে দিয়ে কাজ করাবা? এটা কি আল্লাহ সহ্য করবে? তুমি আমার এনার্জি লস করাচ্ছো! বাসর করতে গেলে এনার্জি লাগে—
শেষের কথাটা একটু লজ্জা পেয়ে বলল।
সায়মান এবার কড়া গলায় বলল,
— বেশি তেরিবেরি করলে আজ বাসরের স্বপ্ন ভুলে যাবি। যা বলছি, ফটাফট কর।
বলে সায়মান নাফিসার হাত ধরে নিজেদের রুমের দিকে চলে গেল।
সায়মান যেতেই সাইফান মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— হিটলার একটা ভাই হয়েছে! সবাই শুধু আমার বাসরের দিকে নজর দেয়! পুরো জীবনটাই জিঙ্গালালা!
তারপর আকাশের দিকে তাকাল।
— এই তুই শালা, এখন তো আমার বোনের বেডা। আয়, হাতে হাতে কাজ কর।
আকাশ কোনো উত্তর না দিয়ে সোজা কিচেনের দিকে চলে গেল। চুপচাপ খাবার গরম করতে শুরু করল। সেটা দেখে সাইফান মুখ ভেংচিয়ে বলল,
— সবকটা এক রকম!
তবু নিজেও হাত লাগাল। ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে সবাই হেসে কুটি কুটি। রুহি জারিন আর রিশাকে বলল,
— তোরা আগে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়।
ওরা মাথা নেড়ে চলে গেল। বাকিরাও একে একে নিজেদের মতো রুমে ঢুকে ফ্রেশ হতে লাগল।
ওদিকে নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করতেই নাফিসা ধীরে ধীরে সায়মানের দিকে তাকাল। কিছু বলতে চায়, কিন্তু সাহস পাচ্ছে না।
সায়মান কোট খুলে চেয়ারেতে রাখল। তারপর একবার তাকাল তার দিকে।
— কি?
নাফিসা ঠোঁট কামড়ে বলল,
— ফুলগুলো… তুমি সাজিয়েছ?
সায়মান এক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। তারপর নির্লিপ্ত গলায় বলল,
— বাসরঘর কি নিজেরা সাজাতে দিই নাকি?ওয়েট তোমার কি ইচ্ছা হচ্ছে এভাবে ফুল দিয়ে বাসর সাজিয়ে বাসর করতে আবার নো প্রবলেম বেবি টা হওয়ার পর সব করব ধৈর্য ধরো বউ ধৈর্য ধরো।
নাফিসা সায়মানের কথা শুনে হা হয়ে গেল ও কখন এ কথা বলল ওর বাসর করতে ইচ্ছে করছে। দিন দিন অদ্ভুত আচরণ হয়ে উঠছে। নাফিসা নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে আস্তে বলল,
— তাহলে… এত রাগ করছিলেন কেন?
সায়মান কাছে এসে দাঁড়াল।
— রাগ করেছি কারণ দায়িত্ব না বুঝে কাজ করেছে সবাই। আর সাজিয়েছি কারণ… যা হয়েছে, সেটা সম্মানের সাথে শেষ হোক।
নাফিসা চুপ করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। ওর হালার পুরুষের প্রতি ওর ভালোবাসা আরো বাড়ছে দিনকে দিন।
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬২
কিছুক্ষণ পর ডাইনিং টেবিলে সবাই বসে গেল। সাইফান একেকজনের প্লেটে ভাত দিচ্ছে আর মুখে বকবক করছে।
— এই নাও ভাত… এই নাও মুরগি… আমার হাতের রান্না খেয়ে যেন কেউ প্রেমে পড়ে যাস না কিন্তু!
এর ভিতরে রাজিব এসে উপস্থিত হয়েছে দিয়ে খেতে বসেছে।রাজিব হেসে বলল,
— আগে সার্ভ ঠিকমতো কর, তারপর প্রেমের চিন্তা করিস।
সবাই খাওয়া শুরু করল। সায়মান আর নাফিসা খেতে আসেনি ওদেরকে ডাকতে যাওয়া হয়েছিল সায়মান সময় হলে ঠিক হে নিবে বলেছে। আসার টাইমে নাফিসাকে গাড়ির ভিতর খাবার দিয়েছিল ও খেতে খেতে এসেছে সেজন্য আরও মাথা ব্যাথা নেই খাওয়া নিয়ে।
