Unpredictable part 12
Jannatul firdaus mithila
“ প্রফেসর হেনরির ম*র*দেহের এখন অব্ধি তেমন কোনো হদিস পাওয়া যায়নি কেন? আশ্চর্য! যেখানে কেউ একজন লাইভে এসে তাকে হ*ত্যা করেছে, সেখানে এখন পর্যন্ত তার দেহটা নাকি আপনারা খুঁজে পাননি। এটাও মানতে হবে আমাদের? আপনার পুলিশ বাহিনী করছেটা কী? এভাবে যখন – তখন কেউ এসে জনসম্মুখে যাকে পাচ্ছে তাকে মেরে দিয়ে যাচ্ছে, অথচ আপনারা বসে বসে কি-না আঙুল চুষছেন?”
একের পর এক ঝাঁঝাল বাক্য ছুঁড়ে যাচ্ছেন বোস্টন ইউনিভার্সিটির সহকারী প্রিন্সিপাল — ম্যাথিউস। ডেস্কের ওপাশে গুরুগম্ভীর মুখে সবটা চুপচাপ শুনে যাচ্ছেন পুলিশ চিফ জেনারেল লিওন। ম্যাথিউস কথা থামাতেই তিনি খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে ওঠেন। নিজ আসনে নড়েচড়ে বসে হাত বাড়িয়ে বললেন,
“ আপনি বসুন আগে।”
ম্যাথিউস শুনলেন না। ললাটে ভীষণ বিরক্তির ভাঁজ টেনে ফের ঝাঁঝ দেখিয়ে বললেন,
“ আমি এখানে বসতে আসিনি মিস্টার। আপনাকে যা জিজ্ঞেস করলাম তার উত্তর দিন। এখন অব্ধি হেনরির ম*র*দেহ আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি কেনো?”
ফর্সা চেহারার মধ্যবয়স্ক মানুষ লিওন। মাথাটা সম্পূর্ণ টাক। বলিষ্ঠ টানটান দেহের অধিকারী ব্যাক্তি কেন যেন এবারেও নিশ্চুপ! মুখ খুলতেই যেন যত আপত্তি তার। ম্যাথিউসের রাগ বাড়ছে তরতর করে। তিনি তক্ষুনি শক্ত হাতের থাবা বসালেন পারটেক্সের টেবিলের ওপর। মুহুর্তেই টেবিলের ওপর সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা ফাইল হতে শুরু করে, কাঁচের গ্লাসটাও কেমন ঝনঝনিয়ে উঠল। এতে খানিক ভ্রু কুঁচকালেন লিওন। এতক্ষণে গুরুগম্ভীর কন্ঠে শক্ত বানী আওড়ালেন,
“ নিজেকে সংযত করুন মিস্টার ম্যাথিউস। ভুলে যাবেন না এটা পুলিশ স্টেশন। আমার মত ডিউটিরত একজন অফিসারের সঙ্গে আপনার এমন ঔদ্ধত্য আচরণের জন্য কিন্তু আমি আপনাকে যেকোনো সময় হাজতে ভরতে পারি। তাই একটু সাবধান।”
এহেন নিরব হুমকিতে টলেনি ম্যাথিউস। টেবিলের ওপর থাবা বসিয়ে রেখেই ঝুঁকে এলেন সামান্য। অফিসারের দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে দাঁত খিঁচে বললেন,
“ ক্যানাডিয়ান পুলিশ বলে বেঁচে গেলেন লিওন। আদারওয়াইজ এতক্ষণে আপনার এমন গা-ছাড়া ভাবসাবের জন্য ঠিকই আপনাকে সাইজ করে ফেলতাম। বাট সমস্যা একটাই — আমরা এখানকার বাসিন্দা নই। যাকগে, ব্যাপার নাহ। কোনো একদিন নাহয় বোস্টন আসবেন। কথা দিচ্ছি, একদম জামাই আদর করব আপনাকে।”
কাশি উঠে গেল লিওনের। বেচারা বুক চেপে কাশছেন অনবরত। ম্যাথিউস ক্রুর হাসলেন। সময় নিয়ে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে, গটগট পায়ে প্রস্থান ঘটালেন পুলিশ স্টেশন থেকে। তিনি চক্ষু আড়াল হতেই ফোঁস করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন লিওন। মানুষটার হয়েছে যত জ্বালা! একদিকে ঐ অদেখা মাস্টার, যিনি কি-না হুকুম তামিল করেছে — হেনরির কেস ডিসমিস করতে। আরেকদিকে এসব লোকজন, মিডিয়া ব্যাবসায়ীদের যত্তসব ফাউল আগ্রহ! দুটো দিক দিয়েই বেচারা পড়েছেন জ্বালায়।
সন্ধ্যা পড়েছে টুকটাক! গোধূলির শেষ লগ্নের এই সময়টা বরাবরই পছন্দ আয়রার। জানালার দ্বার ঘেঁষে কাউচের ওপর বসে আছে মেয়েটা। দেখছে বাইরের দৃশ্য। আকাশটা যে কী সুন্দর লাগছে! হলদেটে-বেগুনী রঙে সেজেছে আকাশপট, ঘোমটা স্বরুপ উড়ছে সাদা মেঘের দল। আয়রা অনিমেষ চোখে দেখছে সবটা। বরাবরের মতো গম্ভীর ভাবসাব আপাতত নেই তার মুখে। ঠোঁটের কোণে ঝুলছে এক চিলতে স্মিত হাসি। আয়রার হঠাৎ করেই ইচ্ছে করল গান গাইতে। মেয়েটার গানের গলা আবার ঢের ভালো! তবে সেই ভালো এবং মনোমুগ্ধকর কন্ঠে কেন যে সে কারো সামনে গান গায় না… আয়রা খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে সুর তুললো কন্ঠে। গুনগুন করে বেশ মুগ্ধতার সাথে চোখদুটো বুঁজে গাইতে লাগলো,
“ তুমি সুখ যদি নাহি পাও
যাও সুখেরী সন্ধানে যাও–[২]
আমি তোমারে পেয়েছি হৃদয় মাঝে,
আরো কিছু নাহি চাই গো।
আমারো পরানো যাহা চায়।
তুমি তাই,তুমি তাই গো।[২]”
গান গাইছে তো গাইছেই আয়রা। আজ বোধহয় গানের মাঝে বেশ ভালো মতই ডুব দিয়েছে মেয়ে। তাইতো দরজায় সে-ই কখন থেকে কলিং বেল বেজে চলেছে, যা এখন অব্ধি মায়াবিনীর কানে গেল কি-না জানে। আয়রা থামল সময় নিয়ে। ঘনপল্লব বিশিষ্ট টানা টানা হেজেল চোখজোড়া খুলল রয়েসয়ে। কিয়তক্ষন চুপ করে বসে থাকতেই ঘরের দরজায় এবার তুমুল শব্দে কড়া পড়ল। এতে ধ্যান ভাঙে আয়রার। এতক্ষণের শান্তশিষ্ট মুখাবয়বে পরিবর্তন এল মুহুর্তেই। কপালে গোটাকতক ভাঁজ ফেলে, সে এগিয়ে আসে দরজার নিকট। একহাতে নব ঘুরিয়ে দরজাটা আলতো ফাঁক করতেই সামনে থেকে তৎক্ষনাৎ ভেসে আসে রিয়াদ এবং আয়ানের উদ্বিগ্ন কন্ঠ।
“ অরু! দেয়ার ইজ আ প্রবলেম।”
এহেন কথা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই আয়রা কেমন গম্ভীর হলো। একহাতে দরজা ধরে রেখে গম্ভীর মুখে আওড়ালো,
“ কী হয়েছে?”
রিয়াদ এবং আয়ান একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল এক-আধবার। আয়রা সরু চোখে দেখল তা। রিয়াদ তখন উদ্বেগ ভরা কন্ঠে বলে,
“ যেই লোকটা তোর ওপর এটাক করতে এসেছিল তাকে আমরা ঘরে আঁটকে রেখেছিলাম। কিন্তু… ”
“ কিন্তু?”
আয়রার সন্দিহান কন্ঠে খানিক ঢোক গিলল রিয়াদ। সময় নিয়ে শুধালো,
“ কিন্তু এই মাত্র ঘরে গিয়ে দেখলাম, লোকটা সেখানে নেই। বোধহয় পালিয়েছে!”
কথাটা শুনতেই কপালে বিরক্তির ছাপ টানল আয়রা। তক্ষুনি দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ হোয়াট দা ফা*ক আর ইউ সেয়িং? কিভাবে আটকে রেখেছিলেন যে পালিয়ে গেল?”
রিয়াদ মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাশ থেকে আয়ান তখন আগ বাড়িয়ে বলে,
“ আসলে অরু… আমরা ঠিকঠাক মতোই আঁটকে রেখেছিলাম বাট সে যে কিভাবে বের হলো!”
আয়রা আর শুনতে পারলোনা। তক্ষুনি রুমের দরজা লাগিয়ে চলে গেল ভেতরে। কিয়তক্ষন বাদেই বেরিয়ে এলো পরিপাটি রুপে। মাথায় হিজাব বাঁধল, হাতে নিলো ফোন। গায়ে জড়ালো মোটা ওভারকোট। বাইরে যা ঠান্ডা পড়ে না.. একদম গা হিম ধরিয়ে দেবার মত ঠান্ডা। আয়রা দ্রুত কদমে হাঁটা ধরল করিডরের পথে। রিয়াদ এবং আয়ানও ছুটলো মেয়েটার পিছুপিছু। আয়ান জোরালো পায়ে হাঁটার একফাঁকে আয়রাকে কেমন সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
আয়রা প্রতিত্তোর করেনি সাথে সাথে। হাতের ফোনটায় খানিক আঙুল চালিয়ে জিপিএস ট্রেকার অন করল তৎক্ষনাৎ। রিয়াদ আড়দৃষ্টিতে দেখল। অবাক কন্ঠে প্রশ্ন করল,
“ জিপিএস ট্রেকার কেনো?”
আয়রা হাতের ফোনটা এদিক ওদিক ঘোরাচ্ছে। রিয়াদের ওমন কথায় গম্ভীর কন্ঠেই প্রতিত্তোরে বলে,
“ ঐ রাস্কেলের হাতে আমি আমার ব্ল্যাক পার্ল ব্রেসলেট পরিয়ে দিয়েছিলাম। এন্ড ইউ গায়েস নো দ্যাট, আমার ব্রেসলেটে জিপিএস ট্রেকার ইনসার্ট করা আছে।”
মেয়েটার এহেন উপস্থিত বুদ্ধিতে দারুন মুগ্ধ হলো রিয়াদ এবং আয়ান। দু’জনে ফের একে অপরের সঙ্গে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে নিল এ-ই ফাঁকে। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করার পর তিনজনেই ঢুকল এলিভেটরের ভেতর। আয়রার দৃষ্টি এখনও ফোনের স্ক্রিনে। যেথায় জ্বলজ্বল করছে লাল মার্ক করা চিহ্নটি। এর মানে লোকটা এই হোটেলেই আছে।
এলিভেটর এসে থামল গ্রাউন্ড ফ্লোরে। কাঁচের দরজাটা খুলে গেল আপনাআপনি। আয়রা তক্ষুনি বেরিয়ে এল ভেতর থেকে। হাতের ফোনটায় স্থির দৃষ্টি রেখে হাঁটতে লাগল সম্মুখে। সে যত এগুচ্ছে, জিপিএস ট্রেকারের লাল চিহ্নটা ততবেশি লাফাচ্ছে। আয়রা পায়ের গতি বাড়ায় এবার। ছুটতে ছুটতেই হঠাৎ খেয়াল করে, সে রেস্টুরেন্টের পেছনের দরজার কাছে চলে এসেছে। আয়রা থামল একটুখানি। ভ্রু কুঁচকে একবার তাকালো রেস্টুরেন্টের বাইরে। আরেকবার চোখ ঘুরিয়ে আনলো ফোনের স্ক্রিনে। লাল চিহ্নটা এবার দূরে যাচ্ছে। আয়রা আর সময় নিলো না। আগপাছ না ভেবে চটজলদি বেরিয়ে গেল হোটেলের বাইরে। ওদিকে রিয়াদ এবং আয়ানও আসছে পিছুপিছু। মেয়েটা রীতিমতো দৌড়াচ্ছে। তাদেরও তো সে-ই সাথে দৌড়াতে হচ্ছে। এতে অবশ্য সমস্যা নেই তাদের। আয়ান ছোটার একপর্যায়ে হঠাৎ বলে ওঠে,
“ রিয়াদ! অরুকে আটঁকা। সামনে ওভারপাস আছে।”
এবার যেন টনক নড়লো রিয়াদের। সত্যিই তো! মেয়েটা তো মেইন রোডের দিকে ছুটছে। তাকে এমুহূর্তে আটকানোটা অতীব জরুরি।
আয়রা থামেনি একমুহূর্তের জন্যও। ছুটতে ছুটতে মেয়েটা এসে থামল ওভারপাসের কাছে। তন্ময় চোখে এদিক ওদিক তাকাতেই হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকালো রোডের ওপাশের ফুটপাতের দিকে। যেথায় আরামে দাঁড়িয়ে মদ গিলছে কাঙ্খিত লোকটা। আয়রা তৎক্ষনাৎ উদ্যোত হলো লোকটাকে ডাকতে। তবে চারপাশের যানবাহনের অতিরিক্ত কোলাহলে তার ডাকগুলো কী আর যাচ্ছে লোকটার কানে? আয়রা কিয়তক্ষন সময় সুযোগের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইলো ঠায়। কিন্তু রাস্তাটা যা ব্যস্ত না…গাড়ি তো থামছেই না। এরইমধ্যে রিয়াদ এবং আয়ান এসে হাজির ততক্ষণে। দু’জনেই কেমন লম্বা লম্বা নিশ্বাস ফেলছে দেখো! আয়ান উদ্বিগ্ন কন্ঠে আয়রাকে শুধালো,
“ এখানে কেনো এলি অরু?”
আয়রা প্রতিত্তোরে মৌন। অদূরের লোকটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ করে বসল আরেক কান্ড! আয়ান, রিয়াদের সামনেই ছুট লাগালো ব্যস্ত রাস্তার মাঝে। এদিকে তার ওমন কান্ডে হতভম্ব দু’জনে। আয়রাকে আটকানোর কথা বেমালুম ভুলে গেল একমুহূর্তের জন্য। তাদের হতভম্বতা কাটলো ঠিক তখন যখন দেখল দূর থেকে ছুটে আসা এক গাড়ি হঠাৎ মাঝ রাস্তায় ব্রেক কষেছে আয়রাকে দেখে। রিয়াদ তক্ষুনি চেচিয়ে উঠে,
— অরু থাম! এটা মেইন রোড।
থামছেনা অরু। ব্যস্ত রাস্তার মাঝ দিয়েই ছুটছে মেয়েটা। উল্টো পথ দিয়ে সাই সাই বেগে ছুটে আসছে অসংখ্য গাড়ি। প্রত্যেকটার স্পিড অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত। অথচ এতকিছুতে মোটেও পাত্তা দিচ্ছেনা অরু। গা বাঁচিয়ে গাড়িগুলোকে পাশ কাটিয়েই ছুটছে মাঝ দিয়ে। সুউচ্চ ওভারপাসের বাঁদিকের ফুটপাতের মোটা বাউন্ডারির ওপর, উল্টোদিকে মুখ করে উঠে দাঁড়িয়েছে লোকটা। দাঁড়িয়েছে বললে ভুল হবে, সে-তো টলছে রীতিমতো। এমন একটা জায়গায় এহেন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকাটা আদৌও সুস্থ মস্তিষ্কের লক্ষ্মন কি-না কে জানে! অরু ছুটছে তার দিকেই। লোকটাকে জীবিত অবস্থায় ধরাটা ভীষণ জরুরী তার জন্য। তাইতো এরূপ ব্যস্ত রাস্তা দিয়েও সে দৌড়াচ্ছে কেমন। ওদিকে ওভারপাসের ডানদিকের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে রিয়াদ এবং আয়ান সর্তক কন্ঠে ডাকছে অরুকে। তবে অরুর কান অব্ধি সে ডাক পৌঁছাচ্ছে কি-না কে জানে! এহেন পরিস্থিতিতে উপায়ন্তর না পেয়ে রিয়াদ নিজেও ছুটলো মেয়েটার পিছুপিছু। ব্যস্ত রাস্তা, একপাশ দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে আসছে গাড়ি। একটা যদি ভুলক্রমেও গায়ের সাথে লেগে যায় তাহলেই হলো! চিরদিনের মত বাঁচার আশা খোয়াতে হবে যে কারো। অরু দৌড়াতে দৌড়াতেই হাঁক ছুড়ছে লোকটার উদ্দেশ্যে। বারবার বলে যাচ্ছে,
“ হেই স্টপ! নিচে নামেন আপনি। আমি ধরব না আপনাকে। ছেড়ে দিব প্রমিস!”
লোকটা টলতে টলতে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় পেছনে। ততক্ষণে অরু এসে থামল ফুটপাতের কাছে। শান্ত মস্তিষ্কে ধীরে ধীরে হাত নাড়িয়ে লোকটাকে বলল,
“ প্লিজ নিচে নামুন। আপনি পড়ে যেতে পারেন।”
লোকটা হাসছে কেন যেন। নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে থেকে নেশালো কন্ঠে আওড়ালো,
“ না না! আমি এখন উড়ব। দু-হাত দু’দিকে ছড়িয়ে আকাশে উড়ব।”
শুকনো ঢোক গিলল অরু। ধীরে ধীরে কদম বাড়িয়ে শান্ত কন্ঠে শুধালো,
“ ইউ আর ড্রাঙ্ক। ফর গড স্যাক, প্লিজ কাম ডাউন।”
শুনলোনা লোকটি। ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসির রেশ টেনে চোখের পলকেই ঝাপ দিল ওভারপাসের ওপর থেকে। মুহুর্তেই থমকালো অরু। আচমকা চেচিয়ে বলল,
“ নো নো!”
লোকটা পড়ে গেল নিচে। এতো সাড়াশব্দের মাঝেও নিচ থেকে ধপ করে এক বিকট শব্দ ভেসে এল অরুর কানে। অরু এখনো হতভম্ব! মস্তিষ্ক ফাঁকা লাগছে তার। সে সময় নিয়ে নিজেকে সামলালো একপ্রকার জোর করেই। তক্ষুনি ছুটে এসে ওভারপাস থেকে খানিক উঁকি দিয়ে দেখল — নিচের ব্যস্ত রাস্তায় উপুড় হয়ে পড়ে আছে লোকটা। নিচ দিয়ে তার ভেসে যাচ্ছে লহু। আশেপাশের সবগুলো গাড়ি থেমে গিয়েছে ইতোমধ্যে। কেউ কেউ গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে লোকটার কাছে। অরু আহত চোখে তাকিয়ে রইল কেবল। পেছন থেকে ততক্ষণে রিয়াদ চলে এসেছে তার নিকট। সে-ও ওভারপাস থেকে খানিক উঁকি দিয়ে দেখল নিচের পরিস্থিতি। পরমুহূর্তে সে কিছুটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে তাকায় অরুর মুখ পানে। মেয়েটাকে একদৃষ্টিতে নিচে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে কেমন শান্ত কন্ঠে বলল,
“ এবার সত্যিটা কিভাবে জানব অরু? লোকটা তো শুধু একা মরলো না, নিয়ে মরলো কিছু অপ্রকাশিত সত্যি!”
অরু নিশ্চুপ! কথা বলার স্থিতিতে নেই সে। আজ আবারও একজন ম*রলো তার চোখের সামনে। প্রাণ দিল স্বইচ্ছায়! অরু জানতেই পারলোনা, লোকটা কেন তাকে মারতে এসেছিল। কার কথায় করেছিল ওমন কাজ। কে আছে আড়ালে, অপ্রকাশ্যে লুকিয়ে?
ক্লান্ত পায়ে হাঁটছে অরু। মুখটা কেমন গম্ভীর আঁধারে ছেয়ে আছে তার! রিয়াদ এবং আয়ান বরাবরের ন্যায় এটা-সেটা বুঝিয়ে যাচ্ছে মেয়েটাকে, তবে অরু তা শুনছেনা কি-না কে জানে! তার মুখাবয়বে খুব একটা স্পষ্ট নয় তা। অরু চুপচাপ হোটেলের বিশালাকৃতির কাঁচের দরজা দিয়ে ঢুকতে গেলে হঠাৎ কোত্থেকে যেন একজন ডেলিভারি ম্যান এগিয়ে এলেন তার নিকট। মাথায় কালো ক্যাপ, মুখ ঢাকা হসপিটাল মাস্কে। হাতে একখানা কাগজ তার। তিনি এসেই কেমন গমগমে গলায় শুধালেন,
“ আপনিই মিস আয়রা?”
ভ্রু গোটায় অরু। ওপর নিচ মাথা নাড়ায় নিঃশব্দে। ডেলিভারি ম্যান তৎক্ষনাৎ দু-কদম পিছিয়ে গিয়ে, দু’হাতে ঠেলে ঠেলে একটা মোটা কাগজের কার্টুন নিয়ে এলেন। রিয়াদ কেমন সন্দিষ্ট চোখে তাকিয়ে আছে। ডেলিভারি ম্যান কার্টুনটা অরুর দিকে ঠেলে দিয়ে বললেন,
“ নিন মিস। আপনার পার্সেল।”
গম্ভীর হলো অরু। ভ্রু গোছালো আরেকবার। গমগমে আওয়াজে শুধায়,
“ কিসের পার্সেল? কে পাঠিয়েছে?”
ডেলিভারি ম্যান সোজা হয়ে দাঁড়ালেন এবার। একহাতে রয়েসয়ে মুখ থেকে মাস্ক সরালেন। ঠোঁট উল্টে অবোধের ন্যায় বললেন,
“ তাতো জানিনা মিস। আমায় শুধু আপনার নাম এবং এড্রেস দিয়ে বলল, এটা যেন আপনাকে দিয়ে দেই।”
“ বাট আপনি আমায় চিনলেন কী করে?”
লোকটার কথার পিঠে আলগোছে প্রশ্ন ছুঁড়ে বসে অরু। লোকটা কেমন ইতস্তত হেসে জবাব দেয়,
“ আপনার ছবি দেওয়া হয়েছিল মিস।”
কথাগুলোতে কেমন যেন রহস্য রহস্য গন্ধ পাচ্ছে অরু। কানাডা এসেছে দুদিনও হয়নি, এরমধ্যে তার নামে পার্সেল পাঠালো কে? এরূপ বিস্তৃত চিন্তায় কুপোকাত অরু। চোখেমুখে একরাশ সন্দেহ লেপ্টে তক্ষুনি উদ্যোত হলো পার্সেলটা খুলতে। ডেলিভারি বয় আলগোছে কেটে পড়লেন সেখান থেকে। তার ভাব এমন, এক্ষুণি এ জায়গা থেকে কেটে পড়লেই বোধহয় বাঁচে সে। এদিকে অরু কেমন ব্যস্ত হাতে কার্টুনটা খুলছে। ওপর থেকে রেপিং পেপার গুলো দুমড়েমুচড়ে সরিয়ে দেয় একটানে। পরক্ষণে গম্ভীর মুখে কার্টুনের মুখ খুলতেই হঠাৎ তার নাকে এসে বারি খেল এক অদ্ভুত পঁচা দুর্গন্ধ! যা নিশ্বাসের সঙ্গে ভেতরে ঢুকতেই গা গুলিয়ে ওঠে অরুসহ বাকি দু’জনের। আয়ান তো তৎক্ষনাৎ দু’হাতে নাক চেপে ধরেছে নিজের। রিয়াদ মুখ ভরে থুতু ফেলল ডাস্টবিনে। অরু না চাইতেও একপ্রকার জোর করে কার্টুনের ওপর স্তরের কাগজগুলো সরালো। পরমুহূর্তেই তার চোখে পড়ল অসংখ্য কালো রঙা ফুটফুটে গোলাপ! যার ঠিক মাঝখানটায় জ্বলজ্বল করছে একখানা লাল গোলাপ। অরুর কুঁচকে রাখা ভ্রু-দ্বয় কুঁচকে গেল আর-ও। সে মনে মনে ভাবল —
“ ফুল থেকে এতো বিশ্রী গন্ধ আসছে কিভাবে?”
নিজ ভাবনাতেই অরু এবার আরেকটু এগিয়ে এসে, কার্টুন থেকে দু’হাতে ফুলগুলো বের করে আনলো সময় নিয়ে। ফুল বের করার একপর্যায়ে সে হঠাৎ টের পেল ফুলের নিচের স্তরে কিছু একটা আছে। যা খুব ভেজা, চ্যাপ চ্যাপে! অরুর কৌতুহলী মন অরুকে জোর করছে আবারও। বারবার সায় দিচ্ছে ভেতরটা আরেকটু খতিয়ে দেখতে। কিন্তু তার হাত যত গভীরে যাচ্ছে, সেই বিশ্রী দুর্গন্ধটা ততই তীব্র হচ্ছে! অরু নিশ্বাস আঁটকে হাত ঢোকায় ভেতরে। হঠাৎ তার হাত আটকালো কিছু একটার সাথে। অরু তেমন কালবিলম্ব না করে তৎক্ষনাৎ চোখ কুঁচকে বস্তুটা একটানে উঠিয়ে আনলো। মুহুর্তেই রিয়াদ এবং আয়ান কেমন চেঁচিয়ে উঠল আতংকে। চোখ কুঁচকে রাখা অরু বুঝলো না এর কারণ। ধীরে ধীরে সে চোখ খুলতেই হঠাৎ দেখল তার দু’হাত ভরে যাচ্ছে র**ক্তে। হাতের লাল কাপড়ে মোড়ানো বস্তুটা থেকে চুইয়ে পড়ছে লাল তরল। অরু ঘাবড়ে গেল মনে হচ্ছে! আতঙ্কে ঢোক গিলল বেশ কয়েকবার। সাহস করে কাঁপা কাঁপা হাতে বস্তুটার ওপর থেকে কাপড় সরাতে উদ্যত হলেই রিয়াদ ফের চেঁচিয়ে বলল,
“ স্টপ অরু! এটা রিস্কি হতে পারে।”
অরু ভীষণ কৌতুহলী। খুব সহজে যেন তেন বিষয়ে ভয় পায় না মেয়েটা। তাইতো সে রিয়াদের এতো নাকচ করা স্বত্বেও ঠিকই কাপড় সরাতে লাগল বস্তুর গা থেকে। সময় নিয়ে কাপড়টা সরাতেই যা দেখল, তাতে তার নিশ্বাসটা আঁটকে গেল মুহুর্তেই! দৃষ্টি হলো বিস্ফোরিত। শরীরটা কাঁপতে কাঁপতে ঝাকাঁতে লাগল কেমন। তার হাতে এমুহূর্তে হেনরির কা*টা মাথা। কী বিভৎস রুপ বেরিয়েছে তার! অরু আর ধরে রাখতে পারলোনা তা। তক্ষুনি কাঁপতে কাঁপতে মাথাটা ফেলে দিল মাটিতে। সঙ্গে সঙ্গে কাপড়ের নিচ থেকে বেরিয়ে এলো একখানা মোড়ানো চিরকুট। অরুর দৃষ্টি থমকায় তাতে। কাঁপা কাঁপা হাতে হালকা ঝুঁকে চিরকুটটা নিয়ে নিল হাতে। রয়েসয়ে চিরকুট খুলতেই অরু বুঝি ঝটকা খেলো আরেকবার। চিরকুটের গায়ে ইটালিক হরফে লেখা —
❝ ওয়েলকাম টু মাই ডার্ক ওয়ার্ল্ড টুইঙ্কেল। আজকে থেকে তোমার প্রতিটা নিশ্বাসের খবর রাখার দায়িত্ব আমার। আজকের পর থেকে যে চোখ আমার টুইঙ্কেলের দিকে তাকাবে, সে চোখ অন্ধ হবে চিরতরে। যেই হৃদয়ে তুমি নামক টুইঙ্কেলের ভাবনা আসবে, সেই হৃদয় ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হবে আমার হাতে। কথা দিলাম!❞
টুইঙ্কেল! নামটা পড়তেই চোখদুটো কেমন বড়সড় হয়ে গেল অরুর। এই নামটা আজ সকালে লাইভে থাকা যুবকটা নিজের হাতে এঁকেছিল না? তারমানে? তারমানে দাড়াচ্ছে..হেনরিকে তবে কেউ তার জন্যই মেরেছে? অরু আর ভাবতে পারলোনা। প্রেসার ফল হচ্ছে তার। হাতদুটো কাঁপতে লাগল বেশ। আবারও কী তবে প্যানিক এটাক হচ্ছে তার?
এদিকে পাশ থেকে রিয়াদ আর সইতে পারলোনা এহেন বিভৎসতা। ছেলেটা তৎক্ষনাৎ গা গুলিয়ে বমি করতে লাগলো মাটিতে বসে। আয়ান নাকমুখ কুঁচকে তাকিয়ে রইলো চুপচাপ। অরুর চোখের সামনে সবকিছু কেমন আধার হয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। মেয়েটা টলতে টলতে হাঁটু গেঁড়ে বসলো জমিনে। অনিমেষ চোখে তাকিয়ে রইলো হেনরির মাথার দিকে। অন্যদিকে, হোটেলের কর্মরত দু’জন স্টাফ ততক্ষণে দেখে ফেললেন এহেন কান্ড। তারা তক্ষুনি চেঁচাতে চেঁচাতে পুরো হোটেল তুলে ফেললেন মাথায়। প্রায় মিনিট খানেকের ব্যাবধানে মানুষের ঢল চলে এল ঘটনাস্থলে। মিস সারাহ দৌড়ে এসে যেইনা প্রিয় মানুষের কা*টা মাথা পড়ে থাকতে দেখলেন, ওমনি তিনি চিৎকার দিয়ে ওঠলেন। আশেপাশে সকলের মাঝে ছড়িয়ে গেল এক অজানা ভয়। প্রত্যেকের চোখে দেকা দিল এক অদ্ভুত আতংক। এরূপ বিভৎস দৃশ্য কী আর ওতো সহজে দেখা যায়? ওদিকে এহেন উত্তেজিত ভীড়ের মধ্য দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে এলেন মেহমেত। গম্ভীর মুখে একবার তাকালেন হেনরির মাথার পানে। তবে আশ্চর্যজনক ভাবে মেহমেতের চোখমুখ একদম স্বাভাবিক। সে চোখ ঘুরালো জমিনে বসে থাকা অরুর পানে। মেয়েটাকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে তার বেশ আরাম লাগল। কেন যেন ইচ্ছে হলো, নিজেও তার পাশে গিয়ে বসতে। অনিচ্ছা থাকা স্বত্বেও অরুর সাথে তাল মিলিয়ে হেনরির মাথাটা একযোগে দেখতে। নিজের এরূপ উদ্ভট ভাবনায় আনমনে হাসে মেহমেত।
Unpredictable part 11
সবাই যখন আতঙ্কে জড়সড়! ঠিক তখনি হোটেলের একদম সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা রোলস রয়েজ গাড়ির ভেতর থেকে একজোড়া নীলচে সবুজ চোখ চুপচাপ দেখতে লাগল অরুকে। পরোখ করতে লাগলো গভীরভাবে। তার ঠোঁটের কোণে লেপ্টে আছে কুটিল হাসির রেশ। সে ধীরে ধীরে গাড়ির কাঁচের ওপর হাত রাখল, যেখানটায় দেখা যাচ্ছে অরুকে। সাইকোদের মত ভয়ানক কন্ঠে আওড়ালো,
“ এ-তো সবে শুরু টুইঙ্কেল!”

Apu porer part din taratari please 🥺😞 i wait for this
একমাস টাইম লাগলো একটা পর্ব লিখতে, আপনি কি বোঝেন কতটা অধীর আগ্রহে আমরা থাকি? তাড়াতাড়ি পর্বগুলো দিবেন প্লিজ।
আপু , আপনার লেখা অনেক ভালো । কিন্তু তাড়াতাড়ি দিলে ভালো হয় ।