Home চোখের আড়ালে ভালোবাসি চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৬

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৬

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৬
আয়াত বিনতে নূর

সময় কখনো কারও জন্য থেমে থাকে না। অতিবাহিত হতে থাকে তার মতো, নিজের গন্তব্যের রাস্তায়, নিজের ঠিকানা খুঁজে নিতে। সময় মানুষের জন্য অপেক্ষা করে না, তবে মানুষ সময়ের জন্যই অপেক্ষা করে।
চোখের পলকে কেটে গেছে প্রতিটা মাস, প্রতিটা দিন, প্রতিটা সকাল, প্রতিটা রাত—সঙ্গে প্রতিটা প্রহর। সময়ের এই নিরন্তর ছুটে চলার মাঝে কত কিছুই না বদলে যায়। কারও জীবনে আসে নতুন কোনো সকাল, আবার কারও জীবনে নেমে আসে দীর্ঘ রাত। কেউ পুরোনো কষ্ট ভুলে নতুন করে হাসতে শেখে, আবার কেউ সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো বুকের ভেতর আগলে রেখেই দিনের পর দিন পথ চলে।
প্রতিটা সময়েই কারও জীবনে ছিল দুঃখ, আবার কারও জীবনে ছিল অতীতের ভয়ঙ্কর কিছু স্মৃতি। আবার কখনো সেসব ভুলে হেসেছে, কখনো বা আড়ালে কেঁদেছে। স্মৃতি এমন একটা জিনিস, যা মানুষের জীবন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যায় না। সময়ের সঙ্গে হয়তো স্মৃতিগুলো একটু পুরোনো হয়, অনুভূতিগুলো কিছুটা মলিন হয়, কিন্তু একেবারে হারিয়ে যায় না কখনোই। আর সেই স্মৃতিকে সঙ্গে রেখেই আমাদের এগিয়ে যেতে হয়। নিজের গন্তব্য খুঁজে নিতে হয়।

এর মাঝেই নিশিতার পরীক্ষা শেষ হয়েছে প্রায় মাস খানেক। বরাবরের মতোই নিজের মেধাশক্তি দিয়ে ক্লাসে টপ করেছে নিশিতা। সবকিছুর মাঝেও নিজের পড়াশোনাটাকে প্রাধান্য দিয়েছে সে। তার স্বপ্নগুলো যে তাকে পূরণ করতেই হবে।
মা-বাবার আদরের দুই মেয়ে। কোনো ছেলে সন্তান হয়নি। সবার কথা ছিল—বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবার কী হবে? কোনো ছেলেও তো নেই যে তাদের দেখে রাখবে।
কথাগুলো একসময় বড্ড গায়ে লাগত নিশিতার। মনে মনে প্রশ্ন জাগত, মেয়ে বলে কি তারা নিজেদের মা-বাবার দায়িত্ব নিতে পারবে না? এটা কেমন কথা?
এজন্যই না মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল সে—সবার মুখ বন্ধ করে দেবে। পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। একদিন এমন জায়গায় যাবে, যেখানে কেউ তার মা-বাবাকে নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না।
তবে মাঝখানে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেলেও গুছিয়ে নিতে খানিকটা সময় লেগেছে তার। নিজের মনকে বুঝতে, নিজের ভেতরের অস্থিরতাগুলোকে সামলাতেও সময় প্রয়োজন হয়েছিল। তবে এখন ভালোই মনোযোগী হয়েছে সে পড়াশোনায়।

হাসি, কান্না, বাচ্চা, ফারিসের শাসন—সব মিলিয়েই কেটেছে নিশিতার দিনগুলো। কখনো বা বকা খেয়েছে দুষ্টুমি করতে গিয়ে, কখনো বা ফারিস তা বুঝতে পেরে বুকে টেনে নিয়েছে তাকে। শত অভিমান ভুলে আবার হেসেছে নিশিতা।
ফারিসের বুকে খুঁজে নিয়েছে নিজের নিরাপদ আশ্রয়টুকু। এক আকাশসম শান্তির ঠিকানা। তার সবকিছু।
জীবন জীবনের মতোই গতিশীল। কোনো কিছুই থেমে নেই। নিশিতার কলেজ, ফারিসের অফিস—রোজকার দিনের ব্যস্ততা। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে বিকেল, তারপর রাত। সবকিছুকে ঘিরেই চলছে জীবন। কোনো কিছুই যেন পরিবর্তন হয়নি, অথচ কোথাও একটা অদৃশ্য দূরত্ব এসে পড়েছে তাদের মাঝখানে।

জানো, সবকিছু আগের মতোই আছে। তবে ফারিসের দম ফেলার মতো অবস্থা নেই। কাজের চিন্তা, বড় টেন্ডার আর টেন্ডারের মিটিংগুলো সামলাতে সামলাতে নাজেহাল অবস্থা তার। একসঙ্গে দুটো ব্যবসার হাল ধরতে গিয়ে নিজেকে তো দূর, নিশিতাকেও ঠিকমতো সময় দিতে পারছে না সে।
কাজের ব্যস্ততায় সকালে সূর্যের আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই ফারিসকে বের হয়ে যেতে হয়, নিশিতাকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখেই। ঘুমন্ত নিশিতার মুখটার দিকে তাকিয়ে কখনো কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে সে। তারপরও কাজের তাড়া তাকে বের করে নিয়ে যায়। আবার ফিরতে ফিরতে মাঝরাত হয়ে যায়। তখনও নিশিতা থাকে গভীর নিদ্রায় তলিয়ে।
ফারিসেরও এতে কিছু করার নেই। তবে সে ভালোই বুঝতে পারছে, তার বউ তার ওপর অনেকটা অভিমান করে আছে। মাঝে মধ্যে যদি এত ব্যস্ততার মাঝেও ভুল করে একটু সময় পায়, নিশিতাকে দেখতে না পেলেই সে অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
ফারিস কয়েকবার বোঝানোর চেষ্টা করলেও কোনো কাজে আসেনি। কাজের চাপ, ব্যস্ততা—সবকিছু বোঝাতে চেয়েছে সে। কিন্তু ফারিসের কোনো কথাই নিশিতা ধ্যানে আনেনি। নিজের কষ্টের কাছে যুক্তিগুলো যে বড়ই তুচ্ছ মনে হয়েছে তার।
ফারিস শুধু বড় বড় কয়েকটা শ্বাস ফেলেছে।
তার পিচ্চি বউটার অভিমান যে কীভাবে ভাঙাবে, সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না সে।

বউয়ের অভিমান ভাঙাতেই কি না, আজ শত শত কাজ ফেলে বিকালেই অফিস থেকে ফিরেছিল ফারিস।
এভাবে আর চলতে দেওয়া যাবে না। নাহলে তার বউ যা জেদি, কবে তাকে অভিমানের চক্করে স্বামী বলেই অস্বীকার করে বসে!
মনে মনে কথাটা ভেবেই নিজের অজান্তে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠেছিল ফারিসের ঠোঁটে। তবে সেই হাসির আড়ালেও ছিল একরাশ ক্লান্তি। সারাদিনের ব্যস্ততা পেরিয়ে আজ সে শুধু নিজের বউটার কাছে ফিরেছে।

অফিস থেকে ফারিসকে হঠাৎ করে এভাবে ফিরতে দেখে নিশিতা খানিকটা অবাকই হয়েছিল। আবার ফারিসের উপস্থিতি বুঝতেই নিশিতার ঠোঁটের কোণে অনিচ্ছুক একটা হাসি ফুটে উঠল। মুহূর্তেই সেটা চাপা দিয়ে ফেলল সে।
না, এত সহজে গলে গেলে চলবে না।
কিন্তু এত ব্যস্ততার মাঝে ফারিস সব কাজকর্ম ছেড়ে কেন এলো? কী-ই বা তার উদ্দেশ্য? বিষয়টা মাথায় খেলল না নিশিতার। নয়তো ব্যস্ততার মাঝে ফারিস এত তাড়াতাড়ি ফিরবে—এটা তার জানা ছিল না।
জানালার ফাঁক গলে বিকেলের ম্লান আলোটা ঘরে এসে পড়েছে। পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা সেই আলো কখনো বিছানার ওপর, কখনো মেঝের একপাশে এসে থেমে আছে। বাইরে থেকে আসা হালকা বাতাসে পর্দাটা মাঝে মাঝে দুলে উঠছে। সেই বাতাসে নিশিতার খোলা চুলগুলোও উড়ছে আলতো করে।
বিছানার এক কোণে চুপচাপ বসে আছে নিশিতা। হাতে ফোন, অথচ চোখ আটকে আছে একই জায়গায়। ফোনের স্ক্রিনে কী আছে, সেদিকে তার কোনো খেয়ালই নেই। তার সমস্ত মনোযোগ যেন অন্য কোথাও।
নিশিতা কিছুটা অবাক হলেও তা প্রকাশ্যে আনেনি। তার অভিব্যক্তি এমন ছিল, যেন সে আগে থেকেই জানত ফারিস আসছে। নিশিতা ফারিসের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে মনোযোগ দিল।

ফারিস নিশিতার অভিব্যক্তি বুঝল না। সে ভেবেছিল, এভাবে কিছু না জানিয়ে তাড়াতাড়ি এসে নিজের বউকে চমকে দেবে। কিন্তু নিশিতার মুখশ্রী দেখে মনে হলো না, সে একটুও অবাক হয়েছে বা হুট করে এভাবে ফারিসের আগমনে তার কাছে ব্যতিক্রম কিছু মনে হয়েছে।
ফারিস বুঝল, তার বউ সহজে ধরা দেওয়ার পাত্রী নয়। কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করল নিশিতাকে। তারপর ধীর পায়ে কাছে গেল।
ফারিসকে এভাবে আসতে দেখে এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো নিশিতার। বুকের ভেতর কোথাও যেন অকারণে একটা ঢেউ উঠল। যে মানুষটার ওপর এত অভিমান, সেই মানুষটাকেই এতদিন পর সামনে পেয়ে মনটা কেন যেন আবারও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
অদ্ভুত এক আকর্ষণ তাকে ঘিরে ধরল। সে চাইছে না ফারিসের উপস্থিতি নিজেকে বোঝাতে, তারপরও বেইমান মন বারবার বলছে—

একবার তাকাও নিশি, শুধু একবার।
নিশিতা তবুও নিজেকে শান্ত করতে চাইছে।
সে কেন কথা বলবে ওই বাজে লোকটার সাথে? সবসময় কাজ নিয়েই ব্যস্ত। তার দিকে একবার ফিরেও যে তাকায়নি এই কটা মাস, সে কেন কথা বলবে তার সাথে?
নাহ্, কোনো প্রশ্নই আসে না।
নিশিতা বিছানায় অনড় হয়েই বসে থাকল। সে ধরা দেবে না আজ এত সহজে। সে ছোট বলে কি তার রাগ নেই? নাকি তার অভিমান করা বারণ?
লোকটা তাকে এই কটা মাসে সময়ই বা দিয়েছে কতটুকু? তবুও সে চুপটি করে সহ্য করে গেছে। নিজের অভিমান, কষ্টগুলো চাপা দিয়েছে ছোট্ট মুচকি হাসির আড়ালে। অথচ লোকটা কি সত্যিই বোঝেনি?

তারা একই ঘরে থেকেও যেন আলাদা। একই ঘরে ঘুমিয়েছে, একই ছাদের নিচে থেকেছে, অথচ দিনের পর দিন কথা জমে থেকেছে মনের ভেতর। নিজের আবেগ, নিজের কষ্ট, নিজের অভিমান—সবকিছুই ভিন্ন। অথচ লোকটা কিছুই বোঝেনি।
এগুলো ভাবতেই নিশিতার ছোট্ট মনটা যেন একরাশ হতাশা, ক্লান্তি আর কষ্টে বিষিয়ে উঠল। না চাইতেও আজ তার দুটো চোখ টলমল করছে। চোখের পাতার কিনারায় জমে থাকা পানিগুলো যেন যেকোনো মুহূর্তে গড়িয়ে পড়বে। না চাইতেও চোখ দুটো আজ কিছুতেই বাঁধ মানছে না।
এতগুলো দিনের জমানো অভিমান, কষ্টগুলো যেন উগরে বের হতে চাইছে। নিজের অনুভূতিগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারছে না নিশিতা।
ক্লান্ত সে।

এবার তার নিস্তার চাই।
সে তো কখনোই নিজের কষ্টগুলো চেপে রেখে সবকিছু সয়ে নেওয়ার মতো মেয়ে নয়। তাহলে কেন নিজেকে খোলাসা করতে এত দ্বিধা তার? এত অস্বস্তি কেন প্রকাশ পাচ্ছে ফারিসের সামনে আজ?
যে মানুষটা সবসময় সবদিকে বটগাছের মতো আশ্রয় হয়েছে, সব বিপদে আগলে রেখেছে, নিজে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে—তার সামনে আজ কেন সে স্বচ্ছ পানির মতো হতে পারছে না?
এত মাত্র কয়েকটা দিনের দূরত্বই কি তাহলে এতটা ফাটল ধরিয়ে দিল নিশিতার মনে?
জানালা দিয়ে এক ঝলক রোদ নিশিতার মুখে পড়ল। বিকেলের ম্লান আলোটা পড়তেই নিশিতার ভাবনায় ছেদ পড়ল।
ফারিসের দিকে তাকাতেই বুক কেঁপে উঠল তার।
ফারিস গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। চোখেমুখে জিজ্ঞাসা। কপালে হালকা ভাঁজ পড়েছে ফারিসের। হয়তো নিশিতাকে এতক্ষণ কিছু একটা ভাবতে দেখেই তার কপালে চিন্তার ভাঁজ।
নিশিতা নিশ্চুপ। কথা হারিয়ে ফেলেছে এমন অবস্থা। কী বলবে, না বলবে—স্বয়ং কাজ করছে তার মনে।

ফারিস ব্যাপারটা কিছুটা বুঝল হয়তো।
জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস ফেলল। তারপর পাশের টেবিলের চেয়ারে কোটটা রাখল। শার্টের হাতা গুটিয়ে ধীর কদমে নিশিতার সামনে গিয়ে বসল।
নিশিতা এখনও নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। নয়নজোড়া ফোনের স্ক্রিনের দিকে হলেও ফারিস ঢের বুঝতে পারল, নিশিতার চোখ টলমল করছে।
ভেতরের কষ্টগুলো আর বাঁধ মানছে না। ফারিসের থেকে এতটা দূরত্ব নিশিতাকে পোড়াচ্ছে, তা আর বুঝতে বাকি নেই তার।
তবে এত কিছু যে সে নিশিতার জন্যই করছে!
নিশিতার কোনো শখ অপূর্ণ থাকুক, কিংবা তা নিয়ে মনে ক্ষীণ পরিমাণ আফসোসও যেন না থাকে—সেই চেষ্টাই ফারিস করছে। তার যত শ্রম, যত খাটুনি—সবকিছু শুধু আর শুধুমাত্র নিশিতার মুখের হাসিটা অটুট রাখার জন্যই।
সেখানে ফারিসের কাছ থেকে কিছুদিন সময় না পেয়েই মেয়েটা যে বাচ্চাদের মতো আহ্লাদী হয়ে যাবে, তা কেন জানত না?
ফারিস ধীরে সুস্থে নিশিতার সামনে আরামদায়ক নরম বিছানার ওপর বসল।
নিশিতার দিকে তাকাল। তবে নিশিতা তাকাল না, আর কোনো প্রত্যুত্তরও করল না। চুপটি করে বসে রইল নীরবে।
নীরবতা ভেদ করে ফারিসের গম্ভীর কণ্ঠটা যেন পুরো কক্ষে ছড়িয়ে গেল—

—“কী হয়েছে, সুইটহার্ট? রেগে আছিস কেন আমার ওপর?”
ফারিসের কথায় নিশিতার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। সেটা ভয়ে নাকি অভিমানে, তা বোঝা গেল না।
এবার মনে হয় চোখের পানি বাঁধ হারাবে। আর আটকে রাখতে পারছে না। তার ওপর আবারও ফারিসের এভাবে প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়ায় খানিকটা ভয়ও পেয়েছে নিশিতা।

ফারিস এখনও চেয়ে আছে নিশিতার ভীত মুখশ্রীর দিকে। হয়তো বা নিজের প্রশ্নের উত্তরটা খোঁজার চেষ্টা করছে।
নিশিতা এখনও নিশ্চুপ। মুখে যেন কুলুপ এঁটে আছে। তার কথা বলা বারণ…!
ফারিস এতক্ষণ যাবৎ নিজের প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে বিরক্ত হলো। সঙ্গে কিছুটা ব্যাকুলও।
ফারিস আর নিশিতার জবাবের অপেক্ষা করল না। বরং একটানে নিশিতাকে উঠিয়ে নিজের উরুর ওপর বসাল।
ব্যাপারটা এতটাই নিখুঁত আর চটজলদি হলো যে নিশিতা কিছু বুঝে ওঠার আগেই হতভম্ব হয়ে গেল।
কান্না আর ভয়ের জায়গায় আশ্রয় পেল একরাশ বিস্ময়।
ঘরের পরিবেশটা নীরব। কারও মুখে কোনো কথা নেই। ঘরের সিলিং ফ্যানের শোঁ শোঁ শব্দ আর খোলা জানালা দিয়ে আসা প্রাকৃতিক বাতাসের শব্দের সাথে মিশে যাচ্ছে নিশিতা আর ফারিসের শ্বাস-প্রশ্বাস।
নিশিতা হতভম্বের মতো বসে আছে ফারিসের উরুর ওপর। এত দ্রুত গতিতে ঘটনাটা ঘটল যে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে নিশিতা। মুখটা ছোট করে বসে আছে।
ফারিস নিশিতার অভিমানী মুখটা নিজের দিকে ঘোরালো। নিশিতা বাধা দিল না, আর না কিছু বলল। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার দিকে।
ফারিস কিছুক্ষণ নীরবে নিশিতার দিকে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টিতে এমন এক অদ্ভুত মায়া ছিল, যার অর্থ নিশিতা বুঝেও বুঝতে চাইলো না।
তারপর স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল—

—“মনে হয় বউ আমার রাগ করেছে। এখন কিভাবে আপনার রাগ ভাঙাবো ম্যাডাম, যদি বলতেন তাহলে সুবিধা হতো।”
নিশিতা নিশ্চুপ। প্রতিজ্ঞা করেছে কথা না বলার এমন অভিব্যক্তি তার। হৃদয়ে ব্যথা যে বুঝে না তার সাথে কিসের কথা? একটু পরেই হয়তো তাকে ভুলে আবারও কাজে মগ্ন হবে। তার থেকে নিশিতা চুপ থাকায় শ্রেয় মনে হলো।
ফারিস দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শত শত কাজ ফেলে যেখানে শুধু মাত্র কিছু সোনালি মুহূর্ত কাটানোর অপেক্ষায় সবকিছু ছেড়েছুড়ে ঢাকা শহরের ব্যস্ততাকে দূরে ঠেলে আসলো, সেখানেই তার বউ অভিমান করে আছে। বিষয়টা বেশ তিক্ত লাগল তার কাছে। তারপরও তা প্রকাশ্যে আনল না।
নিশিতা ভালোই বুঝতে পেরেছে, সে কিছু বলার আগেই ফারিস তার মন পড়ে ফেলেছে। যা সে এতদিন ধরে মনের ভিতরে চাপা কষ্ট আর দুঃখগুলো লুকিয়ে রেখেছিল, তা প্রকাশ করার আগেই ফারিসের সামনে স্বচ্ছ পানির মতো পরিষ্কার।

নিশিতার বিষয়টা মাথায় খেলতেই মাথা নিচু করে ফেলল। চোর যে ধরা পড়ে গিয়েছে।
শেষ বিকেলের সোনালি আলো মাঝে মাঝে পর্দার ফাঁক দিয়ে নিশিতার মুখে পড়ছে। আলো-ছায়ার সেই খেলায় মেয়েটাকে যেন আরও স্নিগ্ধ লাগছে। খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে, আর সেই চুলের ফাঁক দিয়ে কখনো তার মুখটা স্পষ্ট হচ্ছে, কখনো বা আড়াল হয়ে যাচ্ছে।
ফারিসের চোখে তা এড়াল না।
নিশিতাকে নিজের উরুর ওপর থেকে যত্নসহকারে বিছানায় বসালো। নিশিতা টু শব্দও করল না। শুধু হাতের মধ্যে পেঁচানো ওড়নাটা নিজের আঙুল দিয়ে ঘুরাতে লাগল ছোট বাচ্চার ন্যায়।
ফারিস তা দেখে বাঁকা হাসল।
তারপর উঠে দাঁড়াল।
ফারিসকে উঠে দাঁড়াতে দেখেই নিশিতা বসা অবস্থায় চোখ কুঁচকাল। আবারও যদি এই লোকটা চলে যায়!
এতদিন পরে একটু কাছে আসলো। কতটা স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে তার রাগ ভাঙালো। এখন কি আবারও তাকে একা রেখে চলে যাবে?
কথাটা মাথায় আসতেই নিশিতার গাল বাচ্চাদের মতো ফুলে উঠল। কিছু বলতে যাবে, ততক্ষণাত্ ফারিস বলল—

—“চুপচাপ বস। আমি আসছি। একটা জিনিস ফেলে রেখে এসেছি, সেটায় আনতে যাচ্ছি। জায়গা থেকে নড়লে তোর খবর বের করবো।”
নিস্তব্ধ ঘরটা যেন ফারিসের হুমকি আর নীরবতায় আরও নির্জন হয়ে গেল। নিশিতা চুপ হয়ে গেল। ফারিস ঘরের বাইরে চলে গেল।
নিশিতা কিছুক্ষণ ফারিসের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। কোনো কথা বলল না। বিনাবাক্যে বসে রইল।
চৌধুরী ভিলাটা যেন আজ একটু বেশিই শান্ত অন্য দিনের তুলনায়। বাড়িতে মানুষ বলতে আফিয়া চৌধুরী, আমেনা চৌধুরী, রিয়া আর নিশিতা ছিল। বাকি সবাই যে যার কাজে।
আর রিয়া তো কলেজ থেকে এসেই নিজের রুমে ঢুকেছে আর বের হয়নি। পরীক্ষার ফলাফল জানার পর একটুর জন্য ফেল করতে করতে বেঁচে গেছে জানার পর পড়াশোনায় খানিকটা মনোযোগী হয়েছে সে। দিনের বেশির ভাগ সময় পড়াশোনা নিয়েই থাকে।
আর আফিয়া চৌধুরী আর আমেনা চৌধুরী নিরিবিলি প্রকৃতির মানুষ, তাই তাদেরও সবসময় যে যার রুমেই থাকা হয়।
উপরের ফাঁকা করিডোরে বড় জানালা দিয়ে সোনালি রোদ এসে পড়েছে। করিডোরের মেঝেতে আলোটা লম্বা হয়ে ছড়িয়ে আছে। পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা বাতাসে হালকা করে পর্দা দুলছে।
পুরোটা নীরব।

সামান্য পাতার নড়নচড়নও উপেক্ষা করা যাবে না, এতটাই নিস্তব্ধতা।
ফাঁকা করিডোরে ফারিসের পদচারণার শব্দটাও একটু জোরালো শোনাল। হাতে প্যাকেট নিয়েই উপরে নিশিতার ঘরের দিকে যাচ্ছে সে।
তাড়াহুড়োয় গাড়িতেই ব্যাগটা ফেলে রেখে এসেছিল সে।

নিশিতার ঘরে প্রবেশ করতেই ফারিসের চোখ পড়ল নিশিতার ওপর।
চুপটি করে ঘাপটি মেরে বসে আছে বেডের এক কোণে। সিলিং ফ্যানের হাওয়ায় উড়ছে খোলা সিল্কি চুলগুলো। বড্ড মায়াবী লাগছিল নিশিতাকে।
কিছু একটা নিয়ে হয়তো ভাবছে। তার জন্য আবারও মাঝে মাঝে কপালে ভাঁজ পড়ছে। স্ট্রবেরির মতো গোলাপি দুটো ঠোঁট বারবার কিছু আওড়াচ্ছে জানো।
ফারিস তা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করল। তারপর ধীর পায়ে প্রবেশ করল রুমে।
ফারিসকে আসতে দেখে নিশিতা নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিল। হয়তো বা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল কিছুটা, নয়তো বা অভিমান।
ফারিস নিশিতাকে গুটিয়ে থাকতে দেখে বিরক্ত হলো, তবে তা মুখে প্রকাশ করল না।
শুধু মাত্র গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
—“ভয় পাচ্ছিস আমাকে?”
নিশিতা নিশ্চুপ। কী বলবে তা বুঝে উঠতে পারল না।
ফারিস আবারও বলল—
—“রাতে কাছে আসলে ভয় পাস। দিনের বেলা জড়িয়ে ধরলে ভয় পাস। তোর নরম দুটো ঠোঁট জোড়া আমি আঁকড়ে ধরলে ভয় পাস। তোকে ছুঁলে ভয় পাস। সবকিছুতেই ভয় পাস জান। তোকে আদরটা করবো কখন?
আবারও কাছে না আসলে আমার দূরত্বকে ভয় পাস।”
নিশিতা হতভম্বের মতো চোখ ডাগর করে ফারিসের পানে চেয়ে রইল। লজ্জায় জানো মাথা কাটা যাবে। এই মুহূর্তে ফারিসের সামনে থেকে দৌড়ে পালাতে পারলে হয়তো তার শান্তি লাগতো। কিন্তু তা সম্ভব নয়।
ফারিসের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল—

—“কথা যেদিকে যায় না কেন, এই বেডার কথার মাঝে রোমান্স, চুম্মাচুম্মি, আদর—এগুলো না আনলে শান্তি লাগে না। নিলজ্জ, বেহায়া পুরুষ মানুষ একটা।”
—“কী রে, কিছু বললি জান?”
নিশিতার ধ্যান ভাঙতে তড়িৎ বেগে মাথা নেড়ে না বলল।
হুট করে ফারিসের হাতের কালো ব্যাগটার ওপর নিশিতার দৃষ্টি গেল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর নিশিতা ফারিসের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—
—“এটা কী, ফারিস ভাই? কী আছে এতে?”
ফারিস ব্যাগটা পাশে রেখেই বলল—
—“এদিকে আয়, দেখিয়ে দিই কী আছে।”
নিশিতা বিনাবাক্যে বেড থেকে নেমে ফারিসের দিকে এগোলো। তবে মনে রয়েছে অসংখ্য দ্বিধা। কী আছে তা জানার অদম্য উচ্ছ্বাসও কম নয়।
ফারিসের হাতে থাকা কালো ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে নিশিতার চোখে কৌতূহল আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
কী আছে এতে?

কেনই বা এত তাড়াহুড়ো করে গাড়ি থেকে ব্যাগটা আনতে গেল ফারিস?
আর তার জন্যই বা কী এনেছে?
প্রশ্নগুলো একের পর এক মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল নিশিতার।
তবুও কিছু জিজ্ঞেস করল না সে।
শুধু নীরবে ফারিসের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
আর ফারিসের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল মৃদু এক হাসি।

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৫ (২)

মনে হলো, তার পিচ্চি বউটার এতদিনের অভিমান ভাঙানোর জন্য আজ সে সত্যিই কিছু একটা ভেবে এসেছে।
কী আছে সেই কালো ব্যাগে?
সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৭