Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি গল্পের লিংক || আরোবা চৌধুরী আরু

চৌদ্দের চিঠি গল্পের লিংক || আরোবা চৌধুরী আরু

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১
আরোবা চৌধুরী আরু

১৪ বছরের এক কিশোরীকে বিয়ে করেছে ৩০ বছর বয়সের পুলিশ ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট (DSP) সায়মান তাহের রাশিদ
টাইটেল: “নবাব বাড়ির গোপন অভিভাবক”
পরিবারের নাম: রাশিদ
ঢাকার হেডকোয়ার্টার থেকে পাঠানো এই অফিসার——— কেবল সাহসী না, একধরনের গম্ভীর অথচ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বে ভরপুর।

যে কিনা কোনদিন বিয়ে না করার শপথ নিয়েছিল নিজের সাথে।
সারা জীবন দেশের হয়ে কাজ করতে চায়। নিজের বাড়িতেও থাকে কম, নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখে।
সে কিনা বিয়ে করেছে এক কিশোরীকে?এ বিষয়ে সে নিজেও এখনো অবগত এখনো ———ঘোমটার আড়ালে যে এক কিশোরী, ছোট্ট ফুল আছে তার বিবাহিত স্ত্রী! বয়স, নাম, ঠিকানা———কোন কিছুই জানে না সে।
এদিকে আল্লাহর কী পরিহাস! ভাগ্যের লীলা খেলায়, এই মেয়েটিই আজ তার বিবাহিত স্ত্রী। যার মুখের দিকে তাকিয়ে লোকজন বলে,”এই লোকটা একবার তাকালে, আসামি নিজে হাতজোড় করে আত্মসমর্পণ করে!” কে ভাবতে পারতো——— একজন পুলিশ অফিসার, অপরাধীদের গলগলায় রক্ত ঠান্ডা করে ফেলে যে মানুষ, একদিন নিজেই এমন এক বিয়ের আসনে বসবে, যেখানে তার কনে… মাত্র ১৪ বছরের এক কিশোরী?
কয়েক ঘণ্টা আগের ঘটনা,
গ্রামের রাতের বেলা,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

উত্তাপহীন আগুন, ——— সাঁতারপাড়া। চারদিকে মাটির রাস্তা, কাঁচা ঘর আর ঠান্ডা বাতাসের ছন্দে জড়ানো সন্ধ্যা। মেঘলা আকাশের নিচে একটা দোতলা আধাপাকা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুইজন পুরুষ।
একজন, লম্বা, শক্ত চোয়াল, চোখে হালকা ক্লান্তি, শরীরে কালো জ্যাকেট——— DSP সায়মান তাহের রাশিদ
আর পাশে তার জুনিয়র, সদ্য প্রমোশন পাওয়া সাব-ইন্সপেক্টর রাজীব চৌধুরী। দুজনে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে বাড়িটার দিকেই।
দোতলার বারান্দায় ফটাফট আলো জ্বলে উঠছে, যেন কোনও উৎসব শুরু হতে চলেছে।

———”স্যার, নিশ্চিত তো?”
রাজীব কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা সামলে জিজ্ঞেস করলো।
সায়মান কিছু বললো না।শুধু একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাইকটা নিস্তব্ধ।
হঠাৎ, সায়মানের মোবাইল বেজে উঠলো।
স্ক্রিনে ভেসে উঠলো———Commissioner Tahmid Iqbal (CID HQ Dhaka)
সায়মান সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করলো।
সাথে সাথে সালাম দিল———
“জি স্যার, বলেন।”
ওপাশ থেকে কণ্ঠ এলো———
“তোমরা বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছো?”
“স্যার, আমরা বাড়ির সামনেই অবস্থান করছি। আমি আর রাজীব দুজনেই প্রস্তুত। কিন্তু স্যার, আমাদের অনুরোধ———আপনি বাকি ফোর্স পাঠাতে একটু দেরি করেন।”

“কেন সায়মান? একা ঢুকে পড়ার রিস্ক নেবে কেন?”
“স্যার, আপনি তো জানেন———আসামি কামরান হোসেন।
সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের অন্যতম মাথা।
ওকে আমরা অনেকদিন থেকে ট্র্যাক করছি। এইবার হাতের নাগালের মধ্যে।
এখন যদি বুঝে যায় যে ওকে ফলো করা হচ্ছে, তাহলে আর ধরা যাবে না।
অসম্ভব ব্যাপার হয়ে যাবে। পালিয়ে যাবে।
সেজন্য আমি যাচ্ছি আগে———এখন কোনো ফোর্স না পাঠানোর দরকার নাই।
আমরা দুইজন মিলে হ্যান্ডেল করতে পারব, স্যার।
এখনই যদি পুরো ফোর্স নিয়ে ঘিরে ফেলি, ও আঁচ করতে পারবে।
আমার প্রস্তাব———আমি আর রাজীব চুপচাপ ভেতরে ঢুকে পরিস্থিতি বুঝে ফেলি। তারপর আপনি ফোর্স পাঠান।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা…

“ঠিক আছে, সায়মান। আমি তোমার বিচারবুদ্ধির ওপর ভরসা করি। তবে খুব সাবধানে।”
“জি স্যার।”
কল কেটে গেল। ফোনটা সাইলেন্ট করে পকেটে রেখে দিল।
সায়মান একটা মৃদু ইশারা করলো রাজীবকে।
দুজনে ধীরে ধীরে বাড়ির পাশের সরু গলি ধরে এগিয়ে গেল।
জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখতে পেল———
লাল বেনারসি পরিহিত এক মেয়ে বউ সাজে, ঘোমটা দিয়ে বসে আছে।
তার পাশে বসে আছে———সন্ত্রাসী কামরান হোসেন।
মাথায় সাদা টুপি, পাজামা-পাঞ্জাবি, হাতে মোটা মোটা আংটি।
খুব অল্প সংখ্যক মানুষ রয়েছে বিয়েতে। মনে হচ্ছে বাড়ির কয়েকজন মানুষ আর দু-একজন সাক্ষী ছাড়া আর কেউ নেই।

সন্ত্রাসী কামরান হোসেন তার এক হাতে সিগারেট।
অন্য হাতে… মেয়েটির পাতলা আঙুল জোর করে ধরে রেখেছে।
বিয়ের কাজী হুজুর সামনে বসে।
“ছবিসহ জন্মসনদটা আনেন তো, মেয়ের বয়স কত আর এগুলো না দিলে তো নিকাহ হয় না, মামা।”
তখন পাশে থাকা তন্দ্রা নামের এক মহিলা——— বয়সে ৪৫/৪৮, গা ভর্তি গয়না, ঠোঁটে চওড়া হাসি——— বললেন,
“ও চৌদ্দ পেরিয়েছে আজ! কিসের সমস্যা?
কাজী বুঝতে পারলো মেয়েটার জোর করে বিয়ে দিচ্ছে,, তবু এমন একজনের সাথে। খারাপ লাগা কাজ করলো মেয়েটার প্রতি তবু মেয়েটার জন্য কিছু করতে পারবে না।
কামরান হোসেন দাড়িতে হাত বোলাচ্ছে, আর শয়তানি হাসি দিচ্ছে।
এই সুযোগে সায়মান ও রাজীব আস্তে আস্তে ঘরের দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকছে।
তারা তখনো শুনতে পায়নি ভিতরের কথাবার্তা।
সায়মান কাঁধে চাপ দিয়ে রাজীবকে পেছনে ঠেলে দিল।
কাজী তখন কাবিননামায় কলম চালাতে যাচ্ছে…
আর ঠিক তখনই—

সায়মান সামনে এগিয়ে এসে জোর গলায় বলল,
কামরান হোসেন, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট!এখান থেকে একদম পালানোর চেষ্টা করবি না। চারদিক ঘেরাও করা হয়েছে।
কোথাও পালাতে পারবি না———আমাদের হাতে ধরা দেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই তোর!
সে আস্তে আস্তে কাছে গিয়ে মাথায় বন্দুক ঠেকালো।
“রাজীব! এখনই বাকি ফোর্সকে ইনফর্ম কর———ভিতরে আসতে বল।”
রাজীব সাথে সাথে ফোন করে সমস্ত ডিটেইল জানিয়ে দিল।
পরিবেশ মুহূর্তেই থমকে গেল।

কিছুক্ষণের মধ্যে ফোর্স এসে পড়ল।
সন্ত্রাসী কামরান হোসেন সহ তার দুই সাথীকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল।
এর ফল ভালো হবে না আমি খুব শীঘ্রই ফিরে আসবো কামরান শাসিয়ে গেল যাওয়ার সময় ।
সায়মান ওর কথা শুনে ওর দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গ হাসি দিল ।
“চলেন স্যার, আমাদের এখন যাওয়া দরকার। কোর্স আগেই চলে গেছে আসামিদের নিয়ে…”
রাজীবের কথা শেষ হওয়ার আগেই———
তন্দ্রা নামের গয়না পরিহিত মহিলাটি বলে উঠলো,
“এই যে অফিসার, এক পা ও নড়াবেন না! আমাদের মেয়ের বিয়ে ভেঙে দিয়েছেন।
এখন এই মেয়ের বিয়ে করবো কে? আমি এখনই চিৎকার করে গ্রামবাসীকে ডাক দিব।”
সায়মান বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকে তাকালো মহিলাটির দিকে। তারপর চোখ ঘুরিয়ে সোফায় জড়োসড় হয়ে বসে থাকা লাল শাড়ি পড়া, ঘোমটা দেওয়া মেয়েটার দিকে তাকালো।
তারপর বলল———

“মেয়ের জন্য যদি এতই ভাবনা থাকে, তাহলে ওইরকম একটা সন্ত্রাসীর সাথে বিয়ে দিচ্ছিলেন কেন?”
মহিলাটি একটু ভয় পেল। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ১৬-১৭ বছরের এক যুবক, ২২ বছরের এক মেয়ে—মনে হচ্ছে তারই ছেলে-মেয়ে। ভয় পেলেও বুঝতে দিল না।
গলা নামিয়ে বললো———
“আমরা তো জানতাম না সে সন্ত্রাসী! ভালো ছেলে মনে করেই বিয়ে ঠিক করেছিলাম আমার বড় মেয়ের সাথে…”
(মিথ্যে কথা বলে দিল!)

চালাক মহিলা তন্দ্রা ও বেশ ভালো করেই জানে———এখন যদি মেয়ের বয়স বলে ফেলে, তাহলে পুলিশ অফিসার কিছুতেই এই মেয়েকে বিয়ে করবে না। যে করেই হোক এই মেয়েকে আজ ঘাড় থেকে নামাবে। এই অনাথ পোড়া মুখীকে বিদায় করলেই ছাড়বে।তার স্বামী বাড়ি নেই——— এই সুযোগে যদি ঝেড়ে ফেলা যায় তা হলে খুব ভালো হবে। তার স্বামীর জন্য এই মেয়েকে এতদিন ধরে পালছে। বোনের মেয়েকে ঘরে নিয়ে এসে বসিয়ে রেখেছে,, শুধু খরচ বাড়ানো ছাড়া কিছু না। যাক আজকে বিদায় করে ছাড়বো।

“আপনার কোন চিন্তা নেই। এবার ছেলের খোঁজ খবর নিয়ে তারপরে বিয়ে দিবেন। আপনারা তো বিপদ থেকে বেঁচে গেলেন আরো ঐরকম একটা সন্ত্রাসীদের হাতে মেয়ে দিতে হয়নি।
আপনার মেয়ের ভালো জায়গায় বিয়ে হবে ইনশাআল্লাহ।সায়মান বলে উঠল।
না কিছুতেই এই অফিসারদের যাইতে দেওয়া যাবে না,, মাথায় আসার সাথে সাথে তন্দ্রা আবার বলে উঠলো। আপনারা এখান থেকে এক পা ও বাড়াবেন না৷
সায়মান চোখ ছোট ছোট করে তাকালো,, ——— এইভাবে বাধা দিলে কিন্তু আমরাও চুপ থাকব না!”
“আমি এখনই গ্রামবাসীকে ডাকবো!

আপনারা দুইজনের ভিতর একজনকে বিয়ে করতে হবে। নাহলে এই মেয়েকে পরবর্তীতে বিয়ে দিতে পারব না। একবার বিয়ে ভেঙ্গে গেলে গ্রামের মেয়েদের বিয়ে হওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। আপনাদের মধ্যে কেউ যদি বিয়ে না করেন,তাহলে আমি চিৎকার শুরু করবো। আর বাকি সবাই তো চলে গেছে গা আপনারা দুইজন কিছু করতে পারবেন না গ্রামবাসীদের এক জায়গায় জড়ো করলে,, —এবার আপনারা যাবেন কেমনে?”

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২

1 COMMENT

Comments are closed.