চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৯
আরোবা চৌধুরী আরু
সকালের হালকা রোদে ভিজে উঠেছে চারপাশ। রাতভর বৃষ্টির ফোঁটা টুপটাপ করে গড়িয়ে গিয়ে ড্রেনে মিলেছে, ভেজা কংক্রিটে গাড়িগুলো যেন আরও চকচক করছে। হালকা বাতাস বইলেও, ভ্যাপসা গরমটা যেন চারিদিকে ঝুলে আছে।
বাড়ির সামনে বিশাল পার্কিং লট আজ যেন ছোটখাটো মেলার চেহারা নিয়েছে। একসাথে খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। বাড়ির বড়রা কেউ যাচ্ছে না, ছোটরা সবাই যাচ্ছে। এমনকি ছোট্ট রাহিলও জেদ করে বসে গেছে—ওকেও শেষমেষ নিয়ে যেতে হচ্ছে। সাধারণত ইমা বেগমের আঁকড়ে থাকা বাচ্চাটা আজ প্রথমবার দূরে যাচ্ছে।
রুশনা এ বাড়িতে এসে উঠেছে মিষ্টিকে নিয়ে, এখান থেকেই সবার সাথে রওনা দেবে বলে।
সবার সাথে দেখা করে এখন বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। মিষ্টি গিয়ে বসে আছে নাফিসার কলে, এক হাতে রঙিন পানির বোতল দোলাচ্ছে। রাহিলও নাফিসার হাত শক্ত করে ধরে আছে। দুইটা বাচ্চাই যেন এক্কেরে ওর সাথেই লেপ্টে আছে।
নাফিসা আজ লেমোনেডা রঙের হাঁটু পর্যন্ত গোল জামা, সঙ্গে সাদা পাজামা আর সাদা ওড়না পরে আছে। ওকে দেখেই তখন মিষ্টি ঝপ করে কোলে চেপে বসে ছিল—থালামণির বোধহয় ওর খুব পছন্দ হয়েছে।
একপাশে দাঁড়িয়ে রুহি, রাইহান আর রিদওয়ান একে অপরের সাথে কথা বলছে। রিশা আর জারিন হাত ধরে দাঁড়িয়েছে, দু’জনেরই আজ সেম ড্রেস—অলিভ কালারের শর্ট কুর্তি, সঙ্গে কালো প্যান্ট। জারিনকে প্রথমে আসতে দেওয়া হচ্ছিল না, কিন্তু রিশার একরোখা জেদের সামনে শেষে তার আম্মুও রাজি হয়ে গেছেন।
সবাই মিলে দাঁড়িয়ে আছে, হালকা আড্ডা, হাসাহাসি। কেউ মোবাইলে গাড়ির সিট সংখ্যা গুনছে, কেউ আবার লাগেজগুলো সঠিকভাবে রাখা হয়েছে কি না সেটা দেখে নিচ্ছে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
ঠিক তখনই সবার চোখে পড়ল ধীরে ধীরে হাঁটতে আসা সায়ফানকে। বাড়ির চিরকালীন “লেট লতিফ” সে। আজ তার পরনে থ্রি-কোয়ার্টার, সাথে স্কাই ব্লু টি-শার্ট—হাতাগুলো গোটানো কনুই পর্যন্ত, সাথে একটা টাই। হাঁটার ভঙ্গিটাই এমন যেন সময়কে বেঁধে রেখেছে সে।
রিশা আর জারিন একসাথে ওর দিকে তাকিয়েই মুহূর্তে মুখ ঘুরিয়ে নিল। জারিন ও রিশা ছোট থেকে একে অপরের বেস্ট ফ্রেন্ড। জারিন এ বাড়িতে আসলেই রিশা ও তার সাথে সায়ফানের ছোটখাটো কথাকাটাকাটি লেগে থাকে। সায়ফান সব সময় ওদের খোঁচা দিয়ে বেড়ায়। আসলে শুধু ওরা নয়, সায়ফান যাকে পায় তাকেই খোঁচাতে ভালোবাসে।
— “আসসালামু আলাইকুম আপি।”
হালকা হাসি নিয়ে এগিয়ে এসে রুশনাকে সালাম দিল সে। কিছুক্ষণ আগে ঘুম থেকে উঠে কোনোরকম গুছিয়ে নিচে এসেছে, তাই রুশনার সাথে এতক্ষণ দেখা হয়নি।
রুশনা প্রথমে একটু থমকে গেলেও, পরক্ষণেই ঝট করে এগিয়ে এসে ওর কান মুচড়ে ধরল।
— “তোর খবর থাকে না কেন, বল? এখন এসে সালাম দিচ্ছিস! আমি এসেছি সেই কখন! ভাই গুলা সব একেকজন ভাই নামে কলঙ্ক, একটাও বোনের খোঁজ রাখিস না!”
সায়ফান ন্যাকামো ভঙ্গিতে কঁকিয়ে উঠল—
— “আহা আপি, লাগতেছে তো! ছাড়ো না!”
রুশনার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠলেও মুখ শক্ত করে বলল,
— “এইরকম ড্রেসআপে কেন? উদ্ভট কম্বিনেশন কেন হইছে তোর ড্রেস?”
সায়ফান কান ডলতে ডলতে বলল,
— “আহা আপি, আর বলো না!জানো তো আমি সৌন্দর্যের শিকার! রাস্তায় হাঁটলেই মনে হয় ফ্রি লটারি বিলি করছি—শুধু মেয়েরা লাইন মারে! বন্ধুরা পড়াশোনার টেনশনে, আমি পড়েছি বিউটি-ক্রাইসিসে। প্রতিদিন এত লাইন সামলাই, কি কষ্ট তা শুধু আমি জানি! তাই ভাবলাম এরকম ড্রেস পরি, কমসে কম পাগল ভেবে কেউ যেনো না তাকায়।”
একটানা মুখ ঝড়ের মতো কথাগুলো বেরিয়ে এলো। সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ল।
রুশনা শব্দ করে হেসে বলল,
— “তুই পারিসও বটে! এক দমে এতো কথা!”
সায়ফানও দাঁত বের করে হেসে দিল—
— “এইটা কিন্তু ট্যালেন্ট, যা আমার ভেতর ভরপুর আছে!”
ওর কথার মাঝেই রিশা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— “ধলা বিলাই, উদ্ভট প্রলাপ বকেই ট্যালেন্ট দাবি করছে আবার!”
সায়ফান গম্ভীর গলায় বলল,
— “এই শুটকি, বেশি বাড়ছিস! জানিস তো—আমারে দেখে মেয়েরা লাইন মারে!” শেষ কথাটা একটু ভাব নিয়ে বলল।
রিশা কিছু বলার আগেই জারিন হেসে ফেলে বলল—
— “কিন্তু ধরতে পারে না, কারণ লাইন সব সময় ব্যস্ত থাকে!”
সায়ফান জারিনের দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলল,
— “আমারে নিয়ে ভাবিও না চশমা, আসক্ত হইয়া যাবে তুমি ও।”
জারিন এবার বমি করে দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
— “তুমি ফ্রি Netpack নাকি, যে আসক্ত হইতে হবে?”
বলেই রিশা আর জারিন হাই-ফাই দিল। সায়ফান দাঁত কিড়মিড় করে কিছু বলতে যাচ্ছিল, তখনই রুশনা গলা ঝেড়ে বলল—
— “এই এই, শুরু করিস না তোরা! সায়মান কই? ওর জন্যই তো দেরি হইতেছে।”
ঠিক তখনই দেখা গেল সায়মানকে। সবার দৃষ্টি একসাথে ওর দিকে চলে গেল।
সায়মানের পরনে কালো জিন্স, সঙ্গে সাদা কটন শার্ট—হাতা গুটানো। চোখে কালো সানগ্লাস, হাঁটায় অদ্ভুত দৃঢ়তা। গম্ভীর মুখে এগিয়ে আসতেই নাফিসার চোখ অজান্তেই ওর দিকে আটকে গেল। ঠোঁট ফাঁক হয়ে গেল বিস্ময়ে।
কিন্তু সেই মুহূর্তেই পাশে ভেসে উঠল রাইমা। ঢোলা প্যান্ট আর হালকা গোলাপি টি-শার্ট পড়া, সায়মানের গা ঘেঁষে হাঁটার চেষ্টা করছে। নাফিসার বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠল। অকারণেই গলায় কাঁটা চেপে বসল ওই দিকে তাকিয়ে।
সায়মান এগিয়ে এসে সালাম দিল রুশনাকে।
রুশনা গম্ভীর গলায় বলল—
— “কিরে, এতক্ষণ পরে আসার সময় হল?”
সায়মান কিছু না বলে হালকা মাথা নাড়ল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে ইমা বেগম আর আফিয়া বেগম বেরিয়ে এলেন, সবাইকে বিদায় দিতে।
এক এক করে সবাই গাড়িতে উঠতে লাগল। একটা গাড়িতে বসেছে রিশা, জারিন, রাইমা, রিদওয়ান ও সায়ফান। অন্য গাড়িটায় রুহি, রাইহান, রাহিল—তার বড় বোন রুহির কোলে ঘেঁষে বসে আছে। আর মিষ্টি তখন নাফিসার কোলে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছিল, বাচ্চাটা এখন রুশনার কোলে। লাগেজ রাখার পর দেখা গেল, আর কোনো সিট ফাঁকা নেই। নাফিসা দাঁড়িয়ে থাকতেই রুশনা বলল—
— “তুই বস গাড়িতে, লাস্ট সিটটা খালি নাই—সামনের সিটে বস।”
ড্রাইভিং সিটে বসলো সায়মান। পাশে একমাত্র ফাঁকা জায়গাটা। চারিদিকে একবার তাকালো, বুকের ভেতর ধুকপুকানি। অনিচ্ছায় গিয়ে নাফিসা বসল সেখানেই। নাফিসা আস্তে আস্তে সিটবেল্টটা বাঁধল। আঙুলগুলো খানিকটা কেঁপে উঠছিল। পাশে বসে থাকা সায়মান গম্ভীর চেহারায় শুধু সামনে তাকিয়ে আছে। গাড়ির ভেতর হালকা এসির ঠাণ্ডা হাওয়াও যেন এই মুহূর্তের অস্বস্তি কমাতে পারছিল না।
সায়মান ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। শব্দটা হঠাৎ করেই চারপাশের নীরবতা ভেঙে দিল। গাড়ি ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করল। পিছন পিছন বাকি গাড়িগুলো সারিবদ্ধভাবে যেতে শুরু করলো।
নাফিসা ঠোঁট কামড়ে চুপ করে বসে আছে। আঙুলগুলো আঁকড়ে ধরল ওড়নার কিনারা। গাড়ির ভেতর হালকা টানটান নীরবতা। সায়মান নিজের মতো গাড়ি চালাচ্ছে। এই গাড়িতে মূলত ওরা দুইজন আর পিছনে জিনিসপত্র রাখা আছে।
অন্যদিকে পেছনের গাড়িতে meanwhile পুরো হুলস্থুল অবস্থা।
সায়ফান মোবাইলের স্পিকারে একেবারে জোরে গান ছেড়ে দিয়েছে— “চলে আয়… চল যাই…”
সাথে নিজে ও গলা ছেড়ে দিয়ে, শয়তানি করে জোরে জোরে চিল্লাচ্ছে।
ওর এমন চিল্লানোর কারণে বাকি সবাই বেজায় বিরক্ত।
রিশা রাগে গরগর করছে, জারিন চেঁচিয়ে উঠল—
— “এই ভলিউম কমান, কানে তালা লইয়া যাবে!”
— “সঙ্গীতের স্বাদ যার নেই, সে-ই এমন কথা বলে! ভাই, প্লিজ কেউ এই মেয়ে দু’টাকে নামাইয়া দেন!” সায়ফান নাটকীয় ভঙ্গিতে উত্তর দিল।
রিশা এবার ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
— “তুমি তো নামবা গাড়ি থেকে। তোমাকে ফ্রি ফেলে আসলে রাস্তায় মিস করবে কে? আর তোমাকে দেখলে মানুষ এমনিতে ও বলবে—সার্কাস থেকে পালাইছে।”
— “এই শুটকি, চুপচাপ বসে থাকবি! বেশি কথা বললে খুলনায় গিয়ে রূপসার নদীতে দুইটাকে চুবাবো!” সায়ফান রেগে বললো। আজ এই দুইটার সাথে সে কথায় কিছুতেই পেরে উঠছে না।
রাইমার ইচ্ছা ছিল ও সায়মানের সাথে বসবে। ও মনে করেছিল এই গাড়িটা সায়মান উঠবে। সেজন্য আগেভাগেই উঠে বসে ছিল। একে তো ওর ইচ্ছা পূরণ হয়নি, তার উপর এদের এত কথাতে এবার বিরক্ত হয়ে গলা চড়িয়ে বলল—
— “চুপ করো তোমরা!
এই রাম ছাগল, তুই চুপচাপ বসে ফোন দেখ। বেশি কথা বললে তোকেও ধরে পন্ডে দিয়ে আসবো।”
রাইমা সায়ফানের দিকে তাকিয়ে আর কথা শুনে চোখ মুখ কুঁচকে বলল—
— “What is পন্ড?”
ওরে আমার ন্যাকা রাম ছাগল! পন্ডে দেওয়া কি জানো না?” মুখ ভেংচিয়ে বলল সায়ফান।
রিশা, জারিন, রিদওয়ান ও সায়ফানের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। ওরাও এই বিষয়ে জানে না।
সায়ফান ওদের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল উত্তরের অপেক্ষায় আছে সবাই। সবগুলো বড়লোকের বেটা-বেটি। সে নিজেও রিসার্চ করে রাখে এসব কথা —ইন্টেলিজেন্ট বয় কিনা!
তারপর একটু ভাব নিয়ে বলল—
— “ক্ষেত খামার বুঝিস? মানুষের ক্ষেতে ছাগল গেলে, সেই জমির মালিক ছাগল ধরে ধরে বন্দি করে রাখে এক জায়গায়। তার বদলে জরিমানা দিয়ে যার ছাগল, সে পরে নিয়ে আসে। এটাকেই পন্ডে দেওয়া বলে। আসলে তোরা জানবি কি করে! আমার মত ইন্টেলিজেন্ট হলে জানতিই।” ভাব নিয়ে বলল সে।
রিদওয়ান, রিশা, জারিন শব্দ করে হেসে দিল। রাইমা মুখ কালো করে, কানে হেডফোন গুঁজে ফিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। তার বিরক্ত লাগছে এসব।
রিদওয়ান হাসতে হাসতে বলল—
— “ভাইয়া, পারোও তুমি!”
অন্যদিকে, রাহিল এখন পিছনের সিটে বসে মিষ্টির সাথে খেলায় মগ্ন। মামা-ভাগ্নে মিলে টুকটাক হাসাহাসি করছে, দুইজনের খিলখিল হাসি পুরো গাড়ির ভেতর ভরে তুলছে। মিষ্টি একটু আগে ঘুম ভেঙে নাফিসার খোঁজ করছিল, কিন্তু রুশনা ধৈর্য ধরে ওকে বোঝালো, তারপর রাহিলের সাথে খেলতে দিল। এখন ও খেলায় মজে গিয়ে নাফিসার কথা ভুলেই গেছে।
রুশনা এদিকে পাশে বসে ফোনে কথা বলছে তার স্বামী হাবিব এহসানের সাথে। ওদিকে থেকে খবর এসেছে, হাবিব আর দু’দিন পর আসবে। হঠাৎ কাজে চাপ পড়ায় তাকে আবার ছুটি ক্যান্সেল করতে হয়েছে। রুশনার চোখেমুখে খানিকটা হতাশার ছায়া হলেও, এখনকার মুহূর্তে বাচ্চাদের খুনসুটি সেই হতাশা ঢেকে দিয়েছে।
গাড়ি চলছে মসৃণভাবে। হালকা ঝিরঝিরে বাতাস জানালার কাঁচে আঘাত করে ভেতরে আসছে। সূর্যের আলো কাচের ভেতর দিয়ে এসে পড়ছে রুহির মুখে, এক ঝলক উজ্জ্বলতা এনে দিচ্ছে তার চোখেমুখে। রুহি গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে বসেছিল, চিন্তায় ডুবে।
ঠিক তখনই রায়হান স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে হঠাৎ একবার পিছনের সিটের দিকে তাকাল। দেখল, সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, সেই সুযোগে, হঠাৎ করেই ও খপ করে রুহির হাতটা চেপে ধরল।
রুহি চমকে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। দ্রুত নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে আবার পিছনে চোখ বুলাল—সবাই যেমন নিজের কাজে মগ্ন, তেমনি আছেও। কাউকে কিছু বুঝতে দেয়ার মতো মুহূর্ত নয়। তবু ভেতরে অদ্ভুত এক ধাক্কা খেল রুহি। ভ্রু কুঁচকে হালকা ইশারায় রায়হানকে হাত ছেড়ে দিতে বলল।
কিন্তু রায়হান কোনো কথা বলল না। হালকা মুচকি হাসি ছড়িয়ে দিল ঠোঁটের কোণে। তারপর আরও জোরে রুহির হাতটা চেপে ধরল, আঙুলের ডগাগুলো টিপে টিপে ওর তালু বেয়ে নামিয়ে আনল। প্রতিটা স্পর্শ যেন হাড়-গোড়ের গভীর পর্যন্ত গিয়ে বিঁধছিল, আবার একসাথে গলিয়ে দিচ্ছে।
রুহির নিঃশ্বাস ভারি হয়ে এলো। বুকের ভেতরে একরাশ কম্পন জমে উঠল। এই ক্ষুদ্র মুহূর্তটুকুই তার কাছে থমকে গেল। গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকার ভান করল সে, অথচ নিজের বুকের ভেতরের ধুকপুকানি লুকোতে পারল না।
রায়হান ধীরে ধীরে ওর হাতটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। ওর বুকের ভেতরে শক্তপোক্ত হৃদস্পন্দন থরথর করে কাঁপছিল, যেন রুহিকে জানিয়ে দিচ্ছে—
“এই হাতটা আমি ছাড়ব না, এই স্পর্শটাই আমার সবচেয়ে সত্যি অনুভূতি।”
রুহির আঙুলগুলো হালকা কাঁপতে লাগল। বুকের ভেতরে যেন এক ঝড় বইছে—অস্বস্তি, চেনা টান, লুকিয়ে রাখা অনুভূতি—সব মিলেমিশে। বাতাসে হালকা পারফিউমের গন্ধ, রায়হানের গায়ের উষ্ণতা, গাড়ির ইঞ্জিনের নরম গুঞ্জন—সবকিছু মিলে মুহূর্তটা হয়ে উঠল ভারী, গভীর, অথচ কেমন এক অদ্ভুত নেশায় ভরা।
দু’জনেই কোনো কথা বলল না। শুধু নিঃশ্বাসের ওঠানামা, একে অপরের হাতের চাপ, আর বুকের ভেতরের ঝড়—এমনই নীরব ভাষায় লিখে দিল তাদের গোপন অনুভূতির গল্প।
গাড়ির ভেতরে নীরবতা যেন হাওয়ার মতো ছড়িয়ে আছে। দু’জন মানুষ যেন আলাদা এক জগতে বন্দি। সায়মান হালকা করে স্টিয়ারিং ঘুরাচ্ছে, চোখ সামনে রাস্তার দিকে; পাশে বসা নাফিসা চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে তাদের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলিত হচ্ছে, আর সাথেসাথেই দু’জনেই দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছে।
সময় যত গড়াতে লাগল, নাফিসার চোখের পাতা ভারি হয়ে উঠতে লাগল। রাস্তার মৃদু ঝাঁকুনি, বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ আর ভেতরের নীরবতা মিলিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি তৈরি করল। অবশেষে নাফিসা নিঃশব্দে চোখ বুজল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাথাটা হালকা দুলে এল সামনে, আবার কাঁপতে কাঁপতে সিটের গায়ে ঠেকল।
সায়মান হঠাৎ গাড়ির ব্রেক কষে এক ঝলক তাকিয়ে রইল। সাদা ওড়নাটা সুন্দরভাবে মাথার চারপাশে জড়ানো, কেবল নিখুঁত গোল মুখখানা দেখা যাচ্ছে। ভেজা ঠোঁটের কোণে নরম এক রেখা, ঘুমের ভেতরও এতটা শান্ত যেন পৃথিবীর কোনো দুঃখই তাকে ছুঁতে পারেনি। সায়মানের বুকের ভেতর হঠাৎ এক অদ্ভুত আলোড়ন জাগল। একেবারে অচেনা ধক করে ওঠা অনুভূতি। সে গলা শুকিয়ে আসতে টের পেল, অজান্তেই একটা ঢোঁক গিলে নিল।
কিছুক্ষণ দ্বিধায় কাটাল—হাত বাড়াবে কি না। তারপর আস্তে করে ঝুঁকল, সাবধানে নাফিসার মাথাটা নিজের রানের ওপর নামিয়ে রাখল। যেন ভয়ে আছে, কোনো রকম অসাবধানতায় নাফিসার ঘুম ভেঙে না যায়।
স্পর্শ পেতেই নাফিসা হালকা নড়ে উঠল। চোখ না খুলেই নিস্পৃহ ভঙ্গিতে দু’হাত বাড়িয়ে সায়মানের পা আঁকড়ে ধরল, যেন এভাবেই নিরাপত্তা খুঁজে পেল। সেই নির্ভরতার স্পর্শে সায়মানের বুকটা অদ্ভুতভাবে হালকা হয়ে গেল।
সে নিচে তাকিয়ে রইল। ঘুমন্ত মেয়েটার মুখটা শান্ত, নিশ্চিন্ত—সায়মানের মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে কোমল দৃশ্যটা হয়তো এই মুহূর্তেই তার সামনে ফুটে উঠেছে। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে একটুকরো হাসি ছড়িয়ে পড়ল। দীর্ঘদিনের ভিতরে জমে থাকা কঠিন ভাবটা ভেঙে গিয়ে বুকের ভেতর এক নরম অনুভূতি জন্ম নিতে লাগল।
কিছুক্ষণের জন্য সে ভুলেই গেল, গাড়ি চলছে, সামনে অনেক পথ।
অবশেষে গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে সায়মান আবার সামনের দিকে তাকাল। স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরল, গাড়ি ধীরে ধীরে আবার গতি নিল। বাইরে পথ এগিয়ে চলল, ভেতরে নিঃশব্দে জন্ম নিল এক অদেখা গল্প।
খুলনার খানজাহান আলী সড়ক থেকে ভেতরের দিকে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক বিশাল প্রাচীন দালান। লোকমুখে পরিচিত নাম—“মোঘল মঞ্জিল”। একসময়ের জমিদার বাড়ি, যার প্রতিটি ইটে ইতিহাসের ছাপ লেগে আছে। উঁচু লাল ইটের দেয়াল, কোথাও রঙ উঠে গেছে, কোথাও আবার শেওলার সবুজ ছোপ। সামনের লোহার গেটের মাথায় পুরনো খোদাই করা নকশা, যার দিকে তাকালেই বোঝা যায় কালের সাক্ষী হয়ে কত কিছু দেখেছে এই দালান।
গেট খুললেই সামনে বিশাল উঠোন, মাঝখানে পুকুর, আর চারপাশজুড়ে সারি সারি নারকেল আর আমগাছ। সব মিলিয়ে যেন এক টুকরো হারিয়ে যাওয়া অতীত।
এই দালানের সামনেই এসে থামল একে একে চারটি চকচকে গাড়ি। আধুনিকতার ঝলমলে ছাপ আর প্রাচীন ঐতিহ্যের গাম্ভীর্য মুখোমুখি দাঁড়াতেই যেন সময় থমকে গেল।
সবাই একে একে গাড়ি থেকে নামছে, কেবল সায়মানের গাড়িটা তখনও স্থির। নাফিসা এখনো ঘুমিয়ে আছে ওর রানের ওপর মাথা রেখে। সায়মান নিচের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে ডাক দিল,
— “এই পিচ্চি… ওঠো।”
নাফিসা হালকা নড়ে চড়ে আবার নিশ্চিন্তে শুয়ে রইল। সায়মান ঠোঁট চেপে আবার বলল, এবার একটু গম্ভীর গলায়,
— “এই পিচ্চি… তোমাকে উঠতে বলছি।”
তার সেই ভারী কণ্ঠে এবার নাফিসার চোখের পাতা কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে চোখ খুলল সে। প্রথমে কিছুটা ঘোরের মধ্যে চারপাশ তাকাল, তারপর মনে পড়ল সে গাড়িতে বসে ছিল। মুহূর্তেই বুকের ভেতর ধক করে উঠল। এতক্ষণ যে সায়মানের এত কাছাকাছি ছিল, তার পায়ের ওপর মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে—এই ভেবে গাল গরম হয়ে উঠল।
তাড়াহুড়া করে উঠে বসল নাফিসা। সায়মান শান্ত স্বরে, একেবারে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
— “নেমে পড়ো… চলে এসেছি আমরা।”
নাফিসা মাথা দাঁড়িয়ে হ্যাঁ জানালো। তারপর আস্তে আস্তে গাড়ি থেকে নামল। চারিদিকে তাকাতেই তার চোখ বিস্ময়ে ভরে উঠল—কেমন অপরিচিত অথচ রাজকীয় পরিবেশ। সামনে দাঁড়িয়ে আছে কিছু অচেনা মানুষ।
রুশনা আপি দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন এক ভদ্রলোককে—বয়স পঞ্চান্ন–ছাপ্পান্ন, সাদা-কালো চুল, চোখেমুখে রাজকীয় সৌন্দর্যের ছাপ। তার মুখে আনন্দ আর আবেগ একসাথে।
পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন আরও কয়েকজন—
এক ভদ্রমহিলা, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি।
আরও দুইজন ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা।
আর আছে ২১–২২ বছরের এক তরুণ ছেলে, সবার সাথে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে।
সায়মান গাড়ি থেকে নামতেই সেই ভদ্রলোক—রুশনার বাবা—এসে তাকে জড়িয়ে ধরলো।
— “কেমন আছো আব্বু ? এতদিন পর মামাদের কথা মনে পড়ল অবশেষে?”
সায়মান ভদ্রলোককে সালাম দিল, তারপর নিজেও বুকে জড়িয়ে ধরল।
লোকটির নাম—আবদুল করিম খান (সায়মানের বড় মামা )।
বড় মামার পাশ থেকে এগিয়ে এলেন তার স্ত্রী—মাহফুজা বেগম (বড় মামী)। তিনি স্নেহভরা চোখে সায়মানকে দেখে বললেন,
— “কেমন আছিস আব্বু ? মামনিদের কথা আর মনে থাকে না তোমার। এখন বড় হয়ে গেছো, তাই বুঝি আর খোঁজখবর নেই না।”
সায়মান হাসিমুখে এগিয়ে গিয়ে বড় মামিকেও জড়িয়ে ধরল।
এবার ছোট মামা—আবুল হাসান খান এগিয়ে এলেন। উষ্ণ হাতে করমর্দন করে বললেন,
— “কী খবর সায়মান? অনেকদিন পর দেখা হলো।”
তার স্ত্রী—শারমিন আক্তার (ছোট মামী)-ও এগিয়ে আসলো,
তাদের ছেলে—আরিফুল হাসান খান (ডাকনাম আরিব), বয়স একুশ-বাইশ, এগিয়ে এসে হাসিমুখে বলল,
— “কেমন আছো ভাইয়া?”
— “হুম! সবাই একটাইকে ভালোবাসা দিলো। আমাকে তো কেউ চোখেই রাখল না!” এদিকে সাইফান পাশে দাঁড়িয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল।
ওর কথাতেই সবাই হেসে উঠল। পরিবেশটা মুহূর্তেই প্রাণবন্ত হয়ে গেল। সবাই সবার সাথে কুশল বিনিময় করল।
নাফিসা চুপচাপ রিশাদের সাথে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ বড় মামা আবদুল করিম খান এগিয়ে এসে রাহিলকে কোলে তুলে নিলেন। মিষ্টি হেসে বললেন,
— “চলো বাবা, সবাই ফ্রেশ হয়ে নেই। তারপর ভেতরে বসে গল্প হবে।”
এভাবে হাসি-খুশির আবহে সবাই ধীরে ধীরে ভিতরের দিকে রওনা হলো—মোঘল মঞ্জিলের বিশাল দরজার ভেতরে।
সবাই একে একে ভেতরে প্রবেশ করছে। ছোট মামার ছেলে আরিব মিষ্টিকে কোলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই তার চোখ আটকে গেল নাফিসার ওপর।
মুহূর্তের জন্য থেমে গেল তার দৃষ্টি। যেন চারপাশের কোলাহল মুছে গিয়ে কেবল ওই এক মুখই সামনে ভেসে উঠল। আবির তাকিয়ে রইল স্থির চোখে।
হঠাৎ নাফিসার মনে হল তার দিকে কেউ তাকিয়ে আছে, চোখ পরল আরিবের দিকে সাথে সাথে চোখ মুখ কুঁচকে নিল । চারপাশে এত অচেনা মানুষ, তার ওপর আবার এভাবে কারো চোখে ধরা পড়া—এক অজানা অস্বস্তি গ্রাস করল তাকে।
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৮
নাফিসা মাথা নিচু করে ফেলল, যেন দৃষ্টিটা এড়িয়ে যেতে চাইল। তারপর ধীরে ধীরে রিশাদের দিকে আরও ঝুঁকে গিয়ে ভিড়ে মিশে গেল। তার ভেতরে হালকা শিরশিরে একটা অস্তিত্ববোধ।
আরিব নাফিসাকে হঠাৎ ভিড়ের ভিতর মিলিয়ে যেতে দেখে, চোখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলো……….
