Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৩+২৪

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৩+২৪

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৩+২৪
আরোবা চৌধুরী আরু

রুহি একা বসে আছে ঘরের বিছানার কিনারায়। ঘরটা আধো অন্ধকার——জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া স্ট্রিটলাইটের হলদে আলো বিছানার চাদরে লম্বা ছায়া এঁকে রেখেছে। সিলিং ফ্যান ধীরে ধীরে ঘুরছে, পাতায় পাতায় বাতাসের নিঃশ্বাস। বাইরে কোথাও দূরে রাতপাহারার বাঁশির শব্দ, মাঝে মাঝে একটা কুকুর ডাকে, আবার চুপ। বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধ এখনও টিকে আছে বাতাসে——দিনের শেষ বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু জানালার কার্নিশে জলের ফোঁটা এখনো টুপটাপ পড়ে।

রুহি ফোনটা দু’হাতে ধরে আছে। স্ক্রিনে রাইহানের একটা ছবি ——নীল শার্ট, চোখে সোজাসাপ্টা তাকিয়ে থাকা সেই চাহনি, ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। চোখ থেকে নেমে আসা পানি স্ক্রিনে পড়ে গোল গোল দাগ বানিয়ে দিচ্ছে; সে আলতো করে আঙুল দিয়ে মুছে দেয়, আবার পানি গড়ায়।
আবার,whatsapp এ ঢুকলো, রিশা যে ছবিটা ওর ফোন থেকে পাঠিয়েছিল ঠিক নিচে ছোট্ট নোটিফিকেশন——“ডেলিভার্ড”——কিন্তু “সিন” হয় না কিছুতেই। কতক্ষণ ধরে বসে আছে——ঘড়ির টিকটিক শব্দটা যেন সময়কে আরো ধীর করে দিচ্ছে।
মনে মনে হাজারটা ভাবনা ভিড় করে আসে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“তুমি কি দেখোনি, নাকি দেখেও দেখোনি, রাইহান? আমার আজকের দিনটা কেমন কেটে গেল, তুমি কি বোঝো? সবাই যখন আমার হাসিটা গুনে গুনে সাজিয়ে রাখল, আমি তখন তোমাকে কল্পনা করে কল্পনার ভেতরেই আশ্রয় খুঁজছিলাম। তুমি কি জানো, আজ সিদ্ধান্ত হয়ে গেল—— তোমার কথা মতোই,বড় আব্বুর পছন্দ করা ছেলের সাথে আমার এনগেজমেন্ট ঠিক হয়ে গেল। ‘ভালো ছেলে, ভালো পরিবার।’ ভালো——তাই তো! কিন্তু আমার বুকের গভীরে যে নামটা বারবার ধুপধাপ করে বাজে, সেটা তুমি ছাড়া আর কে?”
বুকের ভেতরটা টেনে ধরা কষ্টে থরথর করে ওঠে। রুহি ফোনটা একটু বুকে চেপে ধরে, তারপর আবার স্ক্রিন জ্বলে ওঠে——একই ছবি, একই নীরবতা।

“আমি কি সত্যিই তোমাকে পাবো, রাইহান? নাকি আমি ‘ভালো মেয়ে’ হতে হতে একদিন দেখে ফেলবো——আমার দু’হাত খালি হয়ে গেছে? মানুষ তো বলে, যার জন্য দোয়া করা হয়, সে একদিন না একদিন এসে দরজায় দাঁড়ায়। কিন্তু যদি দরজাটা খুলবার আগেই তালা পড়ে যায়? যদি আমার পথের শেষে তোমার বদলে অন্য কারও নাম ঝুলে থাকে?”
বাইরে হাওয়ার ছোঁয়ায় পর্দা একটু দুলে ওঠে। সেই সাথে দুলে ওঠে ভেতরের শ্বাসটাও। রুহি খুব ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। মনের ভেতর ঝুলে থাকা কথাগুলো নিজের সাথে নিজে ফিসফিস করে——
“তুমি তো জানো, আমি হুট করে ভেঙে পড়ি না। কিন্তু আজকের এই নরম নীল শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে আমি পুরো ভেঙে গেছি। ”

চোখে জমা জল নেমে এসে গাল ভিজিয়ে দেয়। সে আঙুলের ডগা দিয়ে ছবির ওপর আলতো করে বুলায়, যেন দূর থেকে রাইহানের মুখ ছুঁতে চায়।
“শোনো, আমি অপেক্ষা করবো। এই অপেক্ষাই তো আমার সাহস। সবাইকে খুশি করার ভেতর থেকেও আমি আলতো করে তোমাকেই ডাকবো——নাম ধরে না, কেবল মনে মনে। যদি কপালে থাকে, তুমি উত্তর দেবে; যদি না-ই থাকে, তবে একদিন আমি এই ছবিটা আর্কাইভ করে দিই——কিন্তু আজ না, আজ পারবো না।”
হঠাৎ দূরের আকাশে পাতলা মেঘের আড়াল সরিয়ে অর্ধেক চাঁদ বেরিয়ে আসে; জানালার কাঁচে টুপটুপ জলচিহ্নে একটুকরো ঝিকিমিকি। ঘরে সেই আলো এসে পড়তেই রুহির চোখের জলে চিকচিক করে ওঠে ছোট্ট আশা——ক্ষীণ, তবু টিকে থাকা। সে ফোনের স্ক্রিনটা একবার শেষবারের মতো দেখল——এখনও “সিন” নয়। তবু বুকের ভেতর খুব আস্তে একটা কথাই বাজল,
“আল্লাহর কাছে দিয়েছি, তুমি পথ চিনে নেবে, রাইহান… আমি থাকি অপেক্ষায়।”
রাতটা আরো গভীর হয়। রুহি মাথাটা দেওয়ালে ঠেকিয়ে বসে থাকে——চোখ ভেজা, হাতে ফোন, আর চারদিক জুড়ে নরম নীরবতা; নীরবতার ভেতরেই তার ছোট্ট, জেদি প্রার্থনা ঘুরে ঘুরে ওঠে—— আল্লাহ ঠিক তার প্রার্থনা কবুল করবে।

দুপুরের রোদটা কলেজ ক্যাম্পাসে নরম হয়ে এসে পড়েছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ভেঙে ভেঙে পড়া আলো মাটিতে ছোপ ছোপ দাগ কেটে রেখেছে। হালকা বাতাস বইছে, দূরে ক্রিকেট খেলার শব্দ ভেসে আসছে——কেউ “আউট” বলে চেঁচাচ্ছে, আবার কেউ হেসে গড়িয়ে পড়ছে। ক্যাফেটেরিয়ার সামনে গরম সিঙ্গারার গন্ধ এসে মিশে যাচ্ছে চারপাশের কোলাহলে।
ক্যাম্পাসের একটা কোণায়, পুরনো অশ্বত্থ গাছের নিচে তিনজন বসে আছে——নাফিসা, মেহরিন আর মেহেরাব। গাছটার গোড়ায় চারপাশ ঘিরে বানানো সিমেন্টের বৃত্তাকার বেঞ্চে তারা জায়গা করে নিয়েছে।
নাফিসা বই খুলে একেবারে মুখ গুঁজে বসে আছে, যেন বাইরের পৃথিবীটা তার কাছে নেই। পাশে বসে থাকা মেহরিন বারবার বিরক্ত চোখে তাকাচ্ছে ওর দিকে।

——“আরে ধুর! দুপুরের এই মুডটা নষ্ট করার জন্যই মনে হয় তুই জন্মেছিস, নাফু,” বিরক্ত গলায় বলে উঠল মেহরিন।
——“সত্যিই তো,” মেহেরাব হেসে বলে, “একটু চারপাশে তাকাস, মানুষ-জীবন আছে এখানে। বইটা তো তোকে প্রেমে পড়ার মতো আঁকড়ে ধরেছিস।”
নাফিসা কোনো উত্তর দিল না, পাতায় চোখ গুঁজে রাখল আরও জোরে।
মেহরিন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
——“তুই জানিস তো, তোর এই বইপড়া চেহারাটা দেখে আমাদের রাগ না হয়ে হিংসাই হয়! মনে হয় আমরা এখানে বসে বাতাস খাচ্ছি, আর তুই আমাদের চেয়ে অনেক ‘বুদ্ধিজীবী’। এটা একদম মেনে নেওয়া যায় না।”
মেহেরাব মজা করে ওর সাথে যোগ দিল,

——“ওই রকম করলে কিন্তু একদিন তোকে লোনলি লেডি অব ক্যাম্পাস খেতাব দিয়ে দিব। তারপর আর কেউ পাশে বসবে না——শুধু বই আর তুই। ক্যাম্পাসের পোস্টারেও ছবিটা দিয়ে দিব: ‘সতর্কীকরণ——এ কাছে আসলে বইয়ের ভেতরে হারিয়ে যেতে পারেন।’”
মেহরিন হেসে ফেটে পড়ল।
——“ভালোই তো হবে! অন্তত আমরা বাঁচব। নাহলে আমাদের দুইজনের যত গল্প, মজা——সব নষ্ট হয়ে যায় এই ‘কিংবদন্তি পাঠিকা’র কারণে।”
নাফিসা একটু বিরক্ত মুখ তুলে তাকাল, তারপর আবার নিচে নামিয়ে দিল।
মেহরিন ধৈর্য হারিয়ে তার বই টেনে নিল হাত থেকে।
———“এবার ঠিকঠাক আমাদের সাথে কথা বলবি, নাকি তোর অমূল্য সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যাবি? কথা না বললে তোকে একদম বয়কট ঘোষণা করব।”
মেহেরাব হেসে বলল,

———“আমার মনে হয়, নাফু গোপনে আমাদের দু’জনের কথাই লিখে রাখছে——পরে কোনো বই ছাপাবে। তখন কিন্তু কপিরাইট ক্লেইম করবো। ”
নাফিসা বিরক্ত হয়ে মুখ বাঁকাল।
———“তোরা না, একদম বাচ্চা।”
মেহরিন কপাল উঁচু করে তাকাল, তারপর হঠাৎ সিরিয়াস সুরে বলে উঠল,
———“আচ্ছা, নাফি… তোকে কখনও কারো জন্য বই ফেলে রাখতে ইচ্ছে করে না?”
প্রশ্নটা শুনে নাফিসা থমকে গেল। কিছুক্ষণের জন্য চুপ।
মেহেরাবও এবার খুনসুটি বাদ দিয়ে তাকাল তার দিকে,
——“মানে, বইয়ের বাইরে যে একটা অন্যরকম পৃথিবী আছে, সেটা তুই এড়িয়ে যাচ্ছিস না তো?”
নাফিসার কিন্তু চোখের কোণায় একটু অস্বস্তি খেলে গেল।
———“সবাই সবকিছুর জন্য তৈরি থাকে না, বুঝলি।”

মেহরিন আর মেহরাবের দুজনই চুপ করে গেল। নাফিসার কথার আসল মানে বুঝতে পেরেছে ওরা।
ওদেরকে চুপ থাকতে দেখে, নাফিসা বই এক সাইডে রেখে, ওকে বল কি বলবি এমন স্যাড স্যাড মুখ করার দরকার নাই।
দুজনই আর কথা না বাড়িয়ে, হাসি হাসি মুখ করে গল্প জুড়ে দিল।
চারপাশে পাতা ঝিরঝির শব্দ তুলল। ক্রিকেট মাঠ থেকে ভেসে এল আবার করতালি। দুপুরের হালকা আলোতে তিনজনের কথোপকথন যেন ক্যাম্পাসের কোলাহলের ভেতরেও আলাদা একটা ছোট্ট পৃথিবী গড়ে তুললো।
নাফিসা পাশে রাখা বইটা বন্ধ করে ব্যাগে গুঁজে রাখল। গম্ভীর ভঙ্গিতে দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল,
———“আচ্ছা, আমি উঠি। অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে মনে হয়। ড্রাইভারও হয়তো এসে পড়েছে। কালকে তো রুহি আপুর এনগেজমেন্ট—আজকে বাসায় সবাই বের হবে শপিংয়ে। তাই আমাকে এখনই যেতে হবে। তোরা কিন্তু কাল ঠিক সময়ে চলে আসিস।”
কথাটা শুনতেই মেহরিন সঙ্গে সঙ্গে নাক সিটকাল।

———“উফ! ওই এনগেজমেন্টের কথা শুনলেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।”
মেহেরাবও বিরক্ত মুখে যোগ দিল,
———“সত্যিই, রুহি আপু ওই রিয়াদ বেয়াদবটার ভাইয়ের সাথে বিয়ে করবে———এটা বিশ্বাসই করতে পারি না।”
মুহূর্তের জন্য বাতাসটা ভারী হয়ে গেল। নাফিসা চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে, কিন্তু ভেতর থেকে ভর দিয়ে বলল,
——“আল্লাহ যদি চান, তাই হবে। আর আল্লাহ যদি না চান——তাহলে সে তার ভালোবাসার মানুষটাকেই পাবে, যেভাবেই হোক। আল্লাহ মনে হয় কখনও কখনও বান্দাকে পরীক্ষা নেন। দেখেন, সে কতটা ধৈর্য ধরে, কতটা তাঁর উপর ভরসা রাখে।”
কথাগুলো বলার পর নাফিসা হালকা একটা নিঃশ্বাস ফেলল, যেন বুকের ভেতরের চাপা ব্যথা একটু হলেও বাইরে এল। মুখে ছোট্ট হাসি আনতে চেষ্টা করল, যদিও সেই হাসির পেছনে লুকিয়ে ছিল ভারী অস্থিরতা।
কথাগুলো বলতে বলতে মুখে হালকা হাসি রাখার চেষ্টা করল নাফিসা, কিন্তু সেই হাসির আড়ালেও ক্লান্তি আর অস্থিরতা ধরা পড়ে যাচ্ছিল। সে দ্রুত উঠে দাঁড়াল, চাদরের আঁচল কাঁধে টেনে নিয়ে হালকা হাত নাড়ল,

——“আল্লাহ হাফেজ।”
মেহরিন আর মেহেরাব দু’জনেই একসাথে উত্তর দিল,
——“আল্লাহ হাফেজ।”
হাত নাড়িয়ে বিদায় নিল নাফিসা। ওর হিজাবটা বাতাসে হালকা উড়ল, আর তার হাঁটতে হাঁটতে দূরে মিলিয়ে যাওয়া অবয়বটা অশ্বত্থ গাছের ছায়ার ফাঁক দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
মেহরিন ও মেহেরাব দু’জনেই চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার পেছনে।
ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মেহরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পাশে বসা মেহেরাবও অবচেতনেই একই কাজ করল। ওরা দু’জনই গত চার বছরে নাফিসাকে খুব কাছ থেকে দেখেছে। মেয়েটা স্বভাবে চাপা, ভেতরের কিছুই তেমন করে কারও সাথে ভাগ করে না। হাসে, কথা বলে, কিন্তু বুকের গভীরের অনুভূতিগুলো যেন সবসময় তালাবদ্ধ রাখে।
তবু ওরা দু’জন বুঝতে পারে——নাফিসার ভেতরে অনেক কিছু জমে আছে। চোখের কোনায় হঠাৎ আসা অস্বস্তি, মাঝেমাঝে কথার ভেতর থেমে যাওয়া, কিংবা কোনো প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়া——সবই তো বলে দেয়, মনের ভেতর একঝাঁক অদেখা ঝড় বইছে।
মেহেরাব নিচু গলায় বলল,

——“ওকে যতটা চিনি, মনে হয় অনেক কিছু চাপা দিয়ে রেখেছে।”
মেহরিন নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। দুজনেই জানে, নাফিসার মনের ভেতরের জগতটা তাদের অচেনা থেকে যায়।

ঢাকার নামকরা বড় শপিংমল।
বাইরে থেকেই আলোয় ঝলমল করছে পুরো বিল্ডিংটা। চারদিকের কাঁচের দেয়ালে নীয়ন সাইনবোর্ডের ঝলক, ভেতরে ঢুকতেই ঠান্ডা এয়ারকন্ডিশনের বাতাস মুখে এসে লাগল। লিফটের সামনে লম্বা লাইন, এস্কেলেটরে উঠানামা করছে পরিবার আর তরুণ-তরুণীরা। এক কোণে বাচ্চারা কোলাহল করছে, কোথাও আবার প্রেমিক-প্রেমিকা হাত ধরাধরি করে হাঁটছে। মলের ভেতর গমগম করছে মানুষের ভিড়, ব্যাগ হাতে সবার চোখে-মুখে কেনাকাটার আনন্দ।
রুহি, জারিন, রিশা, নাফিসা, রাইমা আর রিদওয়ানও দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে এতো হৈচৈ——তবুও রুহির চোখে ঝিলিক নেই। অনিচ্ছা সত্ত্বেও এসেছে, শুধু রিশাদের জোরাজুরিতে। রুহি ভেতরে ভেতরে বিরক্ত। রিশা, জারিন, রাইমা, রিদওয়ান——সবাই উৎসাহ নিয়ে দোকান ঘুরছে। বড় আব্বুর কথায় রাহুল আর রিয়াদকেও ডাকা হয়েছে।যে বিয়ে সে চায় না, সেই বিয়ের শপিং করতে এসে বুকটা ভার হয়ে উঠছে বারবার।
এমন সময় রাহুল আর রিয়াদ এসে হাজির। রাহুল ভদ্রভাবে সবার সাথে সালাম দিল, খোঁজখবর নিল, কথা বলল। অথচ রিয়াদ এল এক অদ্ভুত শয়তানি হাসি মুখে টেনে——

——“হাই এভরিওয়ান।”
ওর কথায়, ওরা সবাই উত্তর দিয়া বোধ করল না, মুখ ঘুরিয়ে ইগনোর করল। এটা দেখে রিয়াদের মুখ কালো হয়ে গেল। কেবল রাইমা আর রুহি ভদ্রতার খাতিরে ছোট্ট উত্তর দিল। তারপর সবাই আলাদা হয়ে চারপাশের দোকানে ঢুকে পড়ল।
কাপড়ের দোকানের এক পাশে উজ্জ্বল স্পটলাইটে ঝুলছে নতুন কালেকশনের ড্রেস। রিশা একটা লেহেঙ্গা হাতে তুলে নিল।
——“নাফু, এইটা ট্রাই কর।তোকে দারুণ মানাবে।””
নাফিসা নাফিসা মাথা নেড়ে বলল,
——“আমার দরকার নাই আপি। এখনো অনেক ড্রেস আছে আমার।”
রিশা কপাল কুঁচকে বলল ,
——“না, একদম না। একবার ট্রাই করে দেখ, না মানালে নিবি না।”

না চাইলেও নাফিসার হাতে ড্রেসটা গুঁজে দিয়ে তাকে ঠেলে দিল ট্রায়াল রুমের দিকে। নাফিসা যাওয়ার সাথে সাথে পেছন থেকে ধীর পায়ে রিয়াদ এগোল,যাওয়ার আগে একবার চারিদিক তাকানো দেখলে সবাই নিজেদের মতো ব্যস্ত। ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসি, চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে এগিয়ে গেল । এদিকটাই আশেপাশে কেউ নেই, মলের এক কোনার নিরিবিলি সেকশন। নাফিসা ড্রেস হাতে ট্রায়াল রুমের দরজার দিকে যাচ্ছিল, হঠাৎ এক ঝটকায় একটা শক্ত হাত ওকে টেনে নিল ভেতরে।
চোখ মেলে তাকাতেই সামনে রিয়াদ। দরজা ভেতর থেকে ঠেসে ধরল সে, চোখে সেই নোংরা ঝিলিক।

——“হ্যালো বেয়ান… এভাবে একা একা ড্রেস চেঞ্জ করতে আসে কেউ? হেল্প দরকার হতে পারে তো আমাকে ডাকতেই পারতে। তুমি ডাকলে না বলে তাই ভাবলাম , নিজে থেকে হাজির হয়ে যাই।”
নাফিসার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। গলা শুকিয়ে গেল, কিন্তু চোখে ঘৃণার আগুন। কাঁপা কণ্ঠে বলল—
——“দরজা খোলো, না হলে আমি চিৎকার করব।”
রিয়াদ নিচু স্বরে হেসে উঠল।
——“চিৎকার? আরে, চিৎকার করলেই তো লোকে বলবে তোরই চরিত্রে সমস্যা। আমি যদি বলি——‘এ মেয়ে আমাকে উল্টা প্রলুব্ধ করেছে’? তখন কে বিশ্বাস করবে তোকে?”

কথাগুলো নাফিসার কানে ঢুকতেই যেন পুরো শরীর কেঁপে উঠল। কপালে ঘাম জমল, বুক ধকধক করছে। হঠাৎ রিয়াদ এগিয়ে এসে বাজে ভাবে ওর কাঁধে হাত রাখল। আঙুল শক্ত করে চেপে ধরল, ত্বকে ব্যথার দাগ পড়ে গেল।
নাফিসার চোখ বড় হয়ে উঠল। নিঃশ্বাস গাঢ় হয়ে এল, গাল ফ্যাকাশে। শরীরটা ঘিনঘিন করে উঠল ঘৃণায়। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই বুকের ভেতরের ভয়কে চেপে ধরে অন্যরকম শক্তি জেগে উঠল। চোখ লাল হয়ে উঠল রাগে।
ঠাস করে এক চড় বসাল নাফিসা রিয়াদের মুখে। শব্দটা গমগম করে উঠল ছোট্ট ট্রায়াল রুমের ভেতর। রিয়াদ ধপ করে একপাশে হেলে পড়ল। নাফিসা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল ওকে।
তোকে আগে ভাবতাম, বড়লোকের বিগ্রানো ছেলে হয়তো সেজন্য এমন। এখন দেখছি তুই তো পুরো একটা জানোয়ার, ছিঃ!

রিয়াদ বিস্ময়ে কিছুক্ষণ চুপ হয়ে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ আক্রমণ করবে এভাবে বুঝতে পারিনি ও। যে নাফিসাকে সে ভীতু ভেবেছিল, সে আজ চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর চোখ সরু করে, দাঁত চেপে বলল———
খুব বার বেড়েছে না তোর, সব বার আমি ভাঙবো একবার ধরতে পারলে।
———“শোন, আবার যদি আমার গায়ে হাত দিস, হাত ভেঙে ফেলব আমি। আমি ভীতু নই। আল্লাহ আমার রক্ষক। তোদের মতো জানোয়ার থেকে আমাকেই তিনিই বাঁচাবেন।”
——“কার জোরে এত সাহস পেয়েছিস? সায়মান তো এখানে নেই। আমি বললেই সবাই বিশ্বাস করবে তুই দোষী। তোর এই তেজ আমি চূর্ণ করে দেব।”
নাফিসা বুক ফুলিয়ে, চোখে অটল দৃষ্টি নিয়ে উত্তর দিল—

——“আমার কারো দরকার নেই। আমার প্রমাণও লাগবে না। আমার রবই আমার সাক্ষী। তিনি সব দেখেন। তুই যত মিথ্যে বানাস, আল্লাহর ন্যায়বিচার থেকে পালাতে পারবি না।”
ভেবেছিলাম তোকে অল্পতেই মাফ করে দেব। কিন্তু না তোর এমন হাল করব, যে তোর দিকে কেউ ঘুরেও তাকাবে না। কারো সামনে চোখ তুলে তাকাইতে পারবি না তুই। বলেই এগিয়ে আসতে গেলে,
নাফিসা কোনোভাবে নিজের সমস্ত শক্তি একত্র করে হঠাৎ দরজার কপাট ঘুরিয়ে খুলে দিল। বুক ধুকপুক করতে করতে ভেতর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এলো। চারপাশে আলো আর মানুষের ভিড়, তবুও তার চোখে ভেসছে ট্রায়াল রুমের ভেতরের আতঙ্ক। দ্রুত পা চালিয়ে ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল, যেন যত দূরে যাবে ততই নিরাপদ।
পেছনে দাঁড়িয়ে রিয়াদ দাঁতের ওপর দাঁত চেপে খিঁচছে। ঠোঁটের কোণে বিকৃত হাসি, চোখে জ্বালা আর অপমানের দগদগে আগুন। নিজের ভেতরে ফিসফিস করে বলল———

“এই অপমান, এই চড়! আমি কোনোদিন ভুলব না। তোকে এমন হাল করব যে সারা জীবন মনে রাখবি রিয়াদের নাম।”
অন্যদিকে নাফিসা হাঁপাতে হাঁপাতে রিশা আর জারিনদের সঙ্গে গিয়ে মিশে গেল। মুখটা শক্ত করে রেখেছে, যেন কিছু হয়নি। কিন্তু ওর চোখের ভেতরের আতঙ্ক ঢাকা পড়ে আছে একরাশ জোর করে আনা হাসির আড়ালে।
রিশা চোখ টিপে বলল,
——“কিরে, এত দেরি করলি কেন? এভাবে হাঁপাচ্ছিস কেন? হা হা… প্রেস ট্রাই করেছিস নাকি? ভালো লেগেছে?”
নাফু, এখানেই পরে আসতে পারতিস আমরা একটু দেখতাম কেমন লাগছে, জারিন বলে উঠলো।
নাফিসা কষ্টে ঠোঁট বাঁকিয়ে একটুখানি হাসল। বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তবুও শান্ত থাকার ভান করল। নরম গলায় বলল,

——“হ্যাঁ… ট্রাই করেছি। মানিয়েছে। অনেক মানুষের ভিড় বলে আরে আসলাম না।”
মুহূর্তের জন্য চোখ নামিয়ে ফেলল, যেন কাউকে তার ভেতরের অস্থিরতা বুঝতে না দেয়। মনে মনে দৃঢ় করল———
“না, কিছুতেই কাউকে বুঝতে দেব না। আমার জন্য কোনো ঝামেলা চাই না এই পরিবারে। যতই কষ্ট হোক, আমার ভেতরেই চাপা দিয়ে রাখব।”
কিছুক্ষণ পর দূর থেকে রিয়াদ এগিয়ে এলো। তার চোখে সেই একই শয়তানি ঝিলিক। সে চুপচাপ সবার মাঝে এসে দাঁড়াল, কিন্তু তার দৃষ্টি বারবার ছুঁয়ে গেল নাফিসার দিকে। চোখের ভাষায় যেন হুমকি ছুঁড়ে দিচ্ছে—— “খেলাটা এখনো শেষ হয়নি।”
নাফিসা চুপচাপ মুখ ফিরিয়ে নিল, বুকের ভেতর প্রার্থনা করল——
“হে আল্লাহ, তুমি আমার রক্ষক। আমাকে তুমি আড়াল করে রেখো এইসব জানোয়ারদের থেকে।”
এক এক করে সবাই তাদের শপিং শেষ করল। ব্যাগভর্তি পোশাক, জুয়েলারি আর উপহার নিয়ে বেরিয়ে এল বড় শপিংমল থেকে। নাফিসা সবার মাঝেই নীরব রইল, নিজের ভেতরের ঝড়কে হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখল।
বাইরে এসে যখন গাড়িগুলোতে উঠল সবাই, একে অপরকে বিদায় দিয়ে সবাই বাড়ির দিকে রওনা হল।

পরের দিন।
বাড়ির ভেতর আজ একেবারে উৎসবের আমেজ। চারদিক আলোয় আলোকিত, সিঁড়ির ধাপে ধাপে রঙিন কাপড় ঝোলানো, লিভিংরুমে ব্যস্ত সাজসজ্জা চলছে। ঝাড়বাতির আলোয় চকচক করছে পুরো হলরুম।
আজ রুহির এনগেজমেন্ট।
সবার ভিড় থেকে আলাদা, নিজের ঘরে বসে আলমারি খুলল নাফিসা। হাতে তুলে নিল সেই লেহেঙ্গা——যেটা আগের দিন রিশার জোরাজুরিতে কিনতে হয়েছিল। চোখ বোলাল নরম কাপড়ের ঝলমলে কাজের ওপর। নিঃশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে ভাঁজ করে হাতে নিল। ভেতরে কিছু অদ্ভুত শূন্যতা——তবুও হাসি আনার চেষ্টা করল ঠোঁটে।
লেহেঙ্গা হাতে নিয়ে রিশাদের রুমের দিকে যাচ্ছিল নাফিসা। করিডোর দিয়ে পা ফেলার শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছিল সিঁড়ির নিচের কোলাহলে। কিন্তু হঠাৎ——

ধাক্কা!
সামনে সাবিহা খালেদ দাঁড়িয়ে। কপাল কুঁচকে বিরক্তি ছুঁড়ে দিল——
——“এই মেয়ে! দেখতে পাও না? আমার হাতটা একেবারে ভেঙে দিল রে।”
নাফিসা চমকে উঠল। মাথা নিচু করে বলল,
——“আন্টি… আমি খেয়াল করিনি। মাফ করবেন, দয়া করে।”
বারবার ক্ষমা চাইতে লাগল সে।
সাবিহা খালেদা ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকালেন, চোখে তাচ্ছিল্যের ঝিলিক——
——“ফ্রি মাগনার খাবার খেয়ে শরীরে জোর বেড়েছে বোধহয়। এই জন্যই এমন।”
নাফিসা আরও মাথা নিচু করে ফেলল। শরীর কেমন জমে আসছে লজ্জা আর অপমানে।
——“এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? সঙ্গের মতো, এক গ্লাস পানি নিয়ে আস। তাড়াতাড়ি।”
মাথা নাড়িয়ে আচ্ছা বলল । শান্তভাবে ঘুরে নিজের রুমে লেহেংগা টা দেখে আসলো তারপর আবার নিচে গেল।
রান্নাঘরে ঢুকতেই দেখা গেল, আফিয়া বেগম দাঁড়িয়ে একটা তৈরি করছে । হঠাৎ পেছন থেকে গিয়ে নাফিসা আলতো করে মাকে জড়িয়ে ধরল।
আফিয়া বেগম হেসে বললেন—

——“কিরে, আমার মেয়েটা সারাদিন খোঁজ থাকে না, হঠাৎ এভাবে মামুনির কাছে এলি কেন?”
নাফিসা ঠোঁটে ছোট্ট হাসি আনল——
——“মামুনি, আমি তো আপুদের সঙ্গে বসে ছিলাম আর পড়ছিলাম । সরি গো… হঠাৎ তোমাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হল।”
নাফিসা আফিয়া বেগমের মুখের হাসি লক্ষ্য করলো।
——“কী গো, এত খুশি খুশি লাগছে কেন আজ? কি বানাচ্ছ ?”
——“হ্যাঁ, তেহুর জন্য বানাচ্ছি কফি বানাচ্ছি । খুশিতে গদগদ হয়ে বলল। ”
কথাটা শুনে নাফিসা কেঁপে উঠল। বুকটা হঠাৎ থেমে গেল।ঠিক শুনেছে তো ও ——
——“তেহু মানে… সায়মান DSP সাহেব? আমি ভুল শুনিনি তো?”
ঢোক গিলে আবার জিজ্ঞেস করলে,—— কে এসেছে মামনি?
আফিয়া বেগম অবাক হলেন ওর কণ্ঠের ভারে।

——“হ্যাঁ রে, তেহু এসেছে। জানিস না নাকি? জানবিই বা কী করে, সারাদিন তো বই নিয়ে ঘরে মুখ গুঁজে বসে থাকিস।”
নাফিসার শরীর জমে গেল। চার বছর পর সেই মানুষটা এই বাড়িতে ফিরেছে! বিশ্বাস করতে পারছে না। চারপাশের শব্দ মিলিয়ে গেল, ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগতে শুরু করল। মনে হচ্ছে, পুরো পৃথিবী থেমে গেছে।
আফিয়া বেগম আনন্দে ভরা গলায় আবার বললেন——

——“ভাবছি এ বার তেহুকে বিয়ে দিয়েই ছাড়ব। তাহলে আর পালাতে পারবে না। বউ-বাচ্চা নিয়ে ঘরে থাকলেই তো হলো। বুঝতে পারছিস, কী আনন্দ হবে আমার।”
নাফিসা শুকনো ঢোক গিলল। মনে হচ্ছে বুকটা কেউ চেপে ধরেছে। এতদিন পর তাকে দেখার আনন্দে বুক কেঁপে উঠল, আবার বিয়ের কথা শুনে বুক জ্বলে গেল কষ্টে। যেন ভেতরের আগুন চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
এমন সময় আফিয়া বেগম ব্যস্তভাবে বললেন——
——“এই নাফু, আবার কই হারিয়ে গেলি? শোন না, আমার রুমে আয়। তোকে আজ আমি সাজিয়ে দেব। আমি আগেই একটা শাড়ি বের করে রেখেছি। তাড়াতাড়ি আয়, আমি যাচ্ছি এটা তেহুকে দিয়ে আসতে।”
একনাগারে কথাগুলো বলে চলে গেলেন আফিয়া বেগম।
নাফিসা এখনো রান্নাঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল গালে। বুকের ভেতরটা দাউ দাউ করে জ্বলছে। এতদিন পর প্রিয় মানুষটাকে ফিরে পাওয়ার যে আনন্দ ছিল, তা মুহূর্তেই তিক্ত হয়ে গেল। তার মনে হচ্ছে——

“যার জন্য আমি এতদিন ধরে দোয়া করে আসছি, আল্লাহ কি তাকে ফিরিয়ে দিলেন… শুধু অন্য কারও জন্য?”
এমন সময় একজন স্টাফ এসে জিজ্ঞেস করল——
——“ম্যাম, আপনার কিছু লাগবে?”
চমকে উঠে তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে ফেলল নাফিসা। মাথা নিচু করে বলল,
——“না, কিছু লাগবে না।”
নিজেকে সামলে নিল কোনোভাবে। তারপর এক গ্লাস পানি হাতে নিয়ে সাবিহা খালেদার রুমের দিকে রওনা দিল।
দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে কণ্ঠ এল———

———“আসো।”
ভেতরে ঢুকে নাফিসা আস্তে করে।
সাবিহা খালেদ বিরক্ত গলায় বললেন——
——”কত দেরি হল! রাখো টেবিলে।”
নাফিসা গ্লাসটা রাখল মাথা নিচু করে। কিন্তু চোখ হঠাৎ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা আরেকটা পাত্রে——সেটা ভরপুর ঠান্ডা পানিতে ভর্তি। কাঁচের ভেতর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
মুহূর্তের জন্য নাফিসার ঠোঁটে একটা শুকনো, তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। নিজের ওপর নিজেরই হাহাকার মিশ্রিত উপহাস। শব্দ না করে বেরিয়ে এল রুম থেকে।নিজের রুমের দিকে হাঁটছিল। হঠাৎ পরিচিত কণ্ঠে প্রশ্ন শুনে থেমে গেল——

“এই নাফিসা, কেমন আছো?”
পিছনে ঘুরে দেখল আরিব হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
“আরে! এসে থেকে তো তোমাকে দেখাই পেলাম না। এতক্ষণ কই ছিলে?”——— কথাগুলো বলতেই ওর দিকে এগিয়ে আসলো আরিব।
নাফিসা তাকিয়ে হালকা হাসলো।
“ভাইয়া, রুমে ছিলাম। আপনি কখন আসলেন? আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?”
এতক্ষণ ভালো ছিল না আরিব, কিন্তু নাফিসাকে দেখে যেন সব ভালো হয়ে গেল। আনমনে তার দিকে এক দীর্ঘ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল——

“এতক্ষণ ভালো ছিলাম না, তোমাকে দেখেই ভালো হয়ে গেছি।”
নাফিসা কিছুটা অবাক হয়ে হবলল, “ভাইয়া, আপনার কথা বুঝতে পারিনি।”
“কিছু না। আলহামদুলিল্লাহ, আমিও ভালো আছি। যাই হোক, ফুপুমণির সঙ্গে আমার দেখা হল । তোমাকে দেখলে যেন বলে দিই——তার রুমে যেতে বলেছে।
আর তুমি এখনো রেডি কেন? সময় তো হয়ে গেছে।”
নাফিসা হালকা হাসি দিয়ে বলল, “জি ভাইয়া, এখনই যাচ্ছি।”
নাফিসা বারবার ভাইয়া বলায় আরিবের মুখে যেন অসহায়ের মতো একটি হাসি ফুটল।
“আর একটা কথা বলব——তুমি আমাকে নাম ধরে ডাকো।”
নাফিসা অবাক হয়ে বলল, “কেন ভাইয়া? আপনি তো বড় ভাইয়া, তাই না?”
“কিছু না, যাও।”——আরিব শুধু হাসল।
নাফিসা মাথা নেড়ে তার রুমের দিকে এগিয়ে গেল। আরিব ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোনায় হাসির রেখা দেখলো, নিজে বিড়বিড় করে বলল,

“আর কয় বছর, তারপর তোমার মুখ থেকে ‘সাইয়া’ ডাক শুনাবো। এখনো কিছুদিন ভাইয়া ডেকে নাও।”——কথাগুলো বলতে বলতে তার ঠোঁটের হাসি আরও চওড়া হয়ে গেল, ডান হাত দিয়ে চুলে আঙুল বুলালো।
নাফিসা সরাসরি আফিয়া বেগমের রুমে ঢুকলো।
“এসেছিস তাহলে, হাতে ব্লাউজ আর পেটিকোট দিয়ে ধরিয়ে দিয়ে যা, তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে যা।”
“মামনি, আমি শাড়ি পরবো না। শাড়ি পরে সামলাতে পারি না।”
আফিয়া বেগম হেসে বললেন,

“আরে, আমি সুন্দর করে পরাবো, সামলাতে পারবি। তোর দিয়ে আসা পূরণ করব না, তো কার দিয়ে করব? বাড়ির বাকি মেয়েরা তো আমার কথা শুনে না। ছেলেগুলো যে বিয়ে দিব, বউ নিয়ে এসে বউকে নিজের মেয়ের মত করে রাখব, আল্লাহ ভাগ্যে রেখেছে। সব বসে বুড়ো হচ্ছে, বিয়ে করবে না বলে জেদ ধরে বসে আছে—কপাল আমার কপাল সবই কপাল।”

বলতে বলতে নাফিসা কে ওয়াশরুমের দিকে ঠেলে ঢুকিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ পরে নাফিসা ব্লাউজ আর পেটিকোট পড়ে বের হলো। ওড়না দিয়ে নিজেকে ঢেকে নিয়েছে।
“তাড়াতাড়ি এদিকে এগিয়ে আয়,”——আফিয়া বেগম বললেন।
নাফিসা এগিয়ে এসে আফিয়া বেগমের সামনে দাঁড়ালো।
“এভাবে ওড়না জড়িয়ে রাখলে আমি শাড়ি পরাবো কেমন করে? মার সামনে দাঁড়িয়ে লজ্জা পেতে হবে।”——আফিয়া বেগম বললেন।
নাফিসা ওড়নাটা বেডের পাশে রাখল।
আফিয়া বেগম ঝটপট শাড়ি পরিয়ে দিলেন, সুন্দর করে সাপডা করে, চুলগুলো খুলে মাথায় ছেড়ে দিলেন। চোখে কাজল লাগিয়ে একজোড়া টানা কানের দুল পরালেন। হাতে এক গোছা নীল রেশমি চুরি।
সাজানো হয়ে গেলে আফিয়া বেগম একটু দূরে দাঁড়িয়ে নাফিসাকে দেখলেন।

“মাশাআল্লাহ আড়ালেন মুখ দিয়ে, আমার মেয়েকে মাশাআল্লাহ, অনেক সুন্দর লাগছে।”—চোখ থেকে কাজল নিয়েই ঘাড়ের পেছনে একটুখানি ছুঁয়ে দিলেন।
নাফিসা কিছুটা অস্বস্তি বোধ করল।
দেখে আফিয়া বেগম বললেন,
“এমন করছিস কেন? এত সুন্দর করে সাজিয়েছি, পছন্দ হয়নি?”
“আর্যে মামনি, পছন্দ হয়েছে। তুমি মন খারাপ করো না। তবে সবাই অন্যভাবে সাজছে, আমাকে এভাবে সাজালে অদ্ভুত লাগে।”—নাফিসা বলল।
আফিয়া বেগম এগিয়ে এসে দুই হাতে নাফিসার গালে দুটো হাত দিয়ে আগলে নিয়ে কপালে চুমু দিলেন। ছোট কালো টিপও লাগিয়ে দিলেন।
“ঠিক আছে, এবার রিশাদের রুমে যাও, দেখে আসো ওদের কতো দূর হল।”
নাফিসা মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে রিশাদের রুমের দিকে চলে গেল।
এসবের মধ্যে সে ভুলে গেল——সায়মান এখন বাড়িতে আছে।
আফিয়া বেগম দূরে তাকিয়ে হাসলেন, “নাফিসা যদি আরও বড় হতো, আমার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতাম। কিন্তু মেয়েটা এখনও ছোট, কিছু করার নেই। তার ছেলেগুলো বুড়ো , না হলে দেখা যেত বাকি আল্লাহর ইচ্ছায়।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি আবার নিজের কাজের দিকে মন দিলেন।

রুহি নিজ ঘরে বসে লেহেঙ্গা পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আজকের এনগেজমেন্টের জন্য সাজগোজ সম্পূর্ণ, নরম নীল রঙের লেহেঙ্গার ওপর সূক্ষ্ম সোনার কাজ ঝলমল করছে। ব্লাউজের নকশায় হালকা গোল্ডেন ফিতে, চুড়ি আর জুয়েলারি কম, কিন্তু যথেষ্টভাবে চোখে পড়ছে। চুলগুলো বাঁধা, সামান্য ঢিলে রাখা ঢেউ,কিন্তু মন মরা যে বিয়েতে ওর কোন ইচ্ছাই নেই। বিয়ে করবে না তার জন্য এভাবে সং সেজে থাকতে ইচ্ছা হচ্ছে। সব কিছু আজ অস্থির লাগছে । রিশা, জারিন পাশে বসে আছে।
জারিন মজা করে বললো———

“আপি, তুমি অনেক নরম, সামান্য একটু নাটক করতে পারছ না, মেসেজ সিন করিনি তো কি হয়েছে? ঠিক করবে, বাকি আমরা আছি, টেনশন নিও না।”
রিশা যোগ দিল———
“হ্যাঁ, ঠিক ঠিক। আমাদের থাকতে এতো টেনশন করার দরকার নেই। চিল থাকো, আর নাটক চালিয়ে যাও।”
রুশনা রুমে ঢুকে ওদের এভাবে বসে থাকতে দেখে বলল——
“কিরে, তোরা এরকম কইরে বসে আছিস? নিচে চল, গেস্ট চলে এসেছে।”
ওরা সবাই উঠে দাঁড়াল। ঠিক সেই সময়, নাফিসা ধীরে ধীরে রুমের রুমে ঢুকলো ওকে দেখে ওরা সবাই দাঁড়িয়ে গেল হা করে তাকিয়ে আছে ।
রিশা এগিয়ে এসে জড়িয়ে নিল, “আরে নাফু বেবি, কি লাগছে রে বাবা।
“নাফু তো পুরাই বাঙালি হয়ে গেছে।”—— জারিন বলল।
রুহি মৃদু স্বরে বলল——

“ও, মাশাআল্লাহ।”
রুশনা এগিয়ে এসে থুতনিতে হাত দিয়ে উঁচু করে, উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল——
“মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ! কে সাজিয়ে দিয়েছে এত সুন্দর? আমাদের নাফুকে এমন করে?”
নাফিসা লাল হয়ে গেল, চোখে হালকা লজ্জা, মুখে অচেনা শ্যামলতা।
“আস্তে আস্তে বলো, মামনি,”——ওর ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটল।
ফুপুমনি সাজিয়ে দিয়েছে, তাই বলি না হলে তো আমাদের নাফু সাজুগুজু করে না।
ওরা টুকটাক কথাবার্তা বলে নিচের দিকে গেল।
নিচে আজ ভিড়ের মধ্যে অল্প সংখ্যক গেস্ট। সবাই পরিবারের পরিচিত মুখ, কারো অতি উপস্থিতি নেই। চারপাশে ছোট ছোট কথোপকথন, হেসে কথা বলার শব্দে স্থান ভরে গেছে।
সায়মান ধীর, ফরমাল লুক——গভীর নীল শার্ট, ব্লেজার, ঝকঝকে প্যান্ট আর চকচকে জুতো। পাশে সাইফান, রিদওয়ান——সবার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে ভদ্র,ভাবে।
এই রাইহান ভাইয়া কই রে? ———সায়ফান প্রশ্ন করলো?
ভাইয়া চট্টগ্রাম আছে কাজের চাপে আসতে পারি নি। রিদওয়ান জবাব দিলো।
ওও, ——— সায়ফান বলল।

মঈন রাশিদ সায়মানের সাথে কথা বলছে, হেসে। পাশ থেকে মাহবুব রাশিদ আসলো, হালকা গলা খাইরি দিয়ে——“এসো, আমার সাথে, তোমার সাথে কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।”
সায়মান বাবার দিকে তাকাল, কোনো উত্তর দিল না।
মঈন রাশিদ এবার দুজনের দিকে তাকাল, বুঝতে পেরে সামলাতে চাইল পরিস্থিতি। সামান্য কথা বলল, যেন দ্বন্দ্বের আগেই পরিস্থিতি ঠেকাতে———“চল, তোদের কথা জিজ্ঞেস করছিল সবাই, দেখা করে আসি।”
সায়মান কোনো কথা বলল না, শুধু এগিয়ে গেল।
মাহবুব রহমান পরিচয় করিয়ে দিল আহসান করিমের সাথে। সায়মান ভদ্রভাবে সালাম দিল, হালকা উত্তর দিল, কথাবার্তায় কোনো আবেগ না, শুধু হু-হা করে উত্তর।
এদিকে রিয়াদ চারপাশ ঘুরে ঘুরে নাফিসাকে খুঁজছে। হঠাৎ চোখ গেল সায়মানের দিকে——— বিস্ময়ে থমকে রইল। বড়োসড়ো একটা ঢোক গিললো এই ব্যাটা আবার কবে আসলো। মনে হচ্ছে, বড়সড় বাধা এসে পড়ল। ওর কাজ আরো কঠিন হয়ে যাবে, এবার।
এই সবের মাঝেই, সাইমনের চোখ উপরের দিকে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে একগুচ্ছ রমণী। তাদের মধ্যে এক নীল শাড়ি পরা রমণীকে দেখে থমকে গেল। চোখে অবর্ণনীয় বিস্ময়, বুকের মধ্যে হালকা ধুকধুক, মনটা চিরচেনা উত্তেজনায় জড়িয়ে গেল।

অষ্টাদশী রমণী সাবডা করে পরা শাড়ি, হাঁটার সাথে সাথে আঁচলটা বাতাসে দুলছে। খোলা লম্বা চুল কোমর ছুঁয়ে নেমে এসেছে, চোখে টানা কাজল, আর ঠোঁটে সেই চেনা লাজুক হাসি।
সায়মান তাকিয়ে থাকে স্তব্ধ হয়ে—— অনেক বছর পর আজ আবার তাকে সামনে দেখছে। পিচ্চি মেয়েটা , আর এখন অষ্টাদশীর রমণী হয়ে উঠেছে অপরূপ রূপে। সায়মানের মনে হয় সময় যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেছে। বুকের ভেতর গভীরে এক চিরোচেনা টান কাঁপন তোলে——যেন তাকে বহুদিন ধরেই চেনে, বহুদিন ধরেই অপেক্ষা করছিল এই দৃশ্যের জন্য।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২২

সেই লাজুক চোখের দৃষ্টি আর চেনা হাসি সায়মানকে পুরনো স্মৃতির সাথে মিশিয়ে এক নতুন অনুভূতির জগতে টেনে নিয়ে যায়——যেখানে শুধু সে আর অষ্টাদশী রমণীর মায়াবী উপস্থিতি।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৫