চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৩৬
আরোবা চৌধুরী আরু
সায়মানের হঠাৎ ধমক শুনে নাফিসা লাফিয়ে উঠল ভয়ে। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরতে লাগল। কাঁপা কণ্ঠে মিনমিন করে বলল,
“প্লিজ… আমাকে আমার সিটে বসতে দিন।”
সায়মান ওর দিকে একবার তাকাল। তারপর আর কিছু না বলে, টেনে ওকে পাশের সিটে বসিয়ে দিল।
গাড়ি আবার চলা শুরু করল।
সাইফান মুখ টিপে হাসতে হাসতে বলল,
“ভাইয়া, আমি তো অনেক এক্সাইটেড! বাসায় গিয়ে যখন তোমাদের বিয়ের কথা বলব, তখন এক এক জনের রিঅ্যাকশন কেমন হবে সেটা ভাবতেই হাসি পাচ্ছে। আমার তো মন চাচ্ছে, এখনই হসপিটালে সিট বুকিং দিয়ে আসি ! সবাই শুনলেই হার্ট অ্যাটাক করবে যে তাদের আদরের বড়ছেলে এমন একটা মিনি মাইক্রো বউ নিয়ে এসেছে। তার ওপর সেই বউটা আর কেউ না, আমাদের ছোট নাফু…”
সায়মান কোন উত্তর দিল না সাইফানের কথায়।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
নাফিসা সাইফানের হঠাৎ বলা কথায় চমকে উঠল। কথাগুলো শুনে দুই হাত কসলাতে লাগল। মনে ভয় ঢুকে যাচ্ছে,, বাড়ির সবাই যখন ওদের ব্যাপারটা জেনে যাবে, তখন কী প্রতিক্রিয়া হবে? হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল ওর । নিশ্চয়ই ঝামেলা হবে। বিশেষ করে মামনি মামনিকে কী জবাব দেবে, সেটা ভাবতেই মাথা ঝিমঝিম করছে।
নাফিসা আস্তে করে মাথা ঘুরিয়ে সায়মানের দিকে তাকাল। দেখল, সায়মান মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। নাফিসা এক ঢোক গিলে নিল তার পর মাথাটা নিচু করে বলল,,
“প্লিজ, এখন বাসায় জানাবেন না আমাদের বিয়ের ব্যাপারে। আমার পরীক্ষার পর সবাইকে জানাবেন।” –——— নাফিসা ভয় মেশানো কণ্ঠে অনুরোধ করল।
সায়মান গাড়ি চালাতে চালাতেই একবার নাফিসার দিকে তাকাল, কিন্তু কোনো উত্তর দিল না।
সাইফান চোখ ছোট করে নাফিসার দিকে তাকাল।
“এই ছটু ভাবি, আমার সব এক্সাইটেড তুমি এইভাবে ধ্বংস করে দিতে পারো না। আমার ভাই কি বউ নিয়ে এখনো পর্যন্ত লুকোচুরি খেলবে? এত বছর ধরে তোমাদের লুকোচুরি চলছেই। আর মূল কথা হলো, ভাইয়ের বিয়ের কারণে আমার বিয়ে আটকে আছে! আমার অমৃত খাওয়া কি জীবনে হবে না নাকি? হাই আল্লাহ!”
নাফিসা সাইফানের কথা শুনে প্রথমে একটু লজ্জা পেলেও, না চাইতেও মুচকি হেসে ফেলল। তারপর আবার মুখ ঘুরিয়ে নিল।
সাইফান এবার সায়মানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাই রে ভাই, তোর বউ কি বলছে শুনছো? প্লিজ, তাড়াতাড়ি বিয়ের খবর সবাইকে জানাইয়া দাও। আর পারলে আজই আমার বিয়ের ব্যবস্থা করো। আমি আর কন্ট্রোল করতে পারছি না। অমৃত খাওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখা আমার জন্য অসম্ভব। ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড ইয়ার!”
নাফিসা এবার সায়মানের দিকে তাকাল, তার উত্তর শোনার আশায়।
সায়মান গম্ভীর গলায় উত্তর দিল,,
“ঠিক সময়ে আমি সবাইকে বলে দেব। আর তুমি তোমার পড়াশোনায় মন দাও, বাকিটা আমার দায়িত্ব। এক্সাম শেষ করো নিশ্চিন্তে। এক্সামের পর আবার বিয়ের জন্য প্রস্তুত থেকো।”
সায়মানের প্রথম কথায় নাফিসার মনে আনন্দ হল। কিন্তু পরের কথাটা ঠিক বুঝতে পারল না। অবুঝের মতো সায়মানের দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ সাইফান এক লাফে সায়মানের সিট খামচে ধরে সামনে চলে এল
“আরে ভাই! তুমি আবার বিয়ের প্ল্যান করছো নাকি? মানে বাসর আবার করবা?” –——— বলে মুখে হাত দিয়ে লজ্জা পাওয়ার ভান করল । তারপর আবার বলা শুরু করলো,
“প্রথমবার তো বিয়ে করলে, আসামি ধরতে গিয়ে, তারপর আবাসিক হোটেলে বাসর! এবার নেক্সট বারের প্ল্যান কি ভাই? যাই করো, আমাকে সাথে নিও। পিলিজ! আমাকেও এমন এক্সপেরিয়েন্স দাও, প্লিজ ভাই।”
এবার নিজের সিটে বসে কপালে হাত ঠুকতে ঠুকতে হতাশ গলায় বলতে লাগল সাইফান,,
“কত মানুষ আজকাল কড খায়, আর আমার শালা কপালে কড খাওয়ার ভাগ্যটুকু ও নাই। এবার থেকে যে মেয়ের ভালো লাগবে , সেই শালিকে সাথে নিয়ে যেভাবেই হোক কড খাওয়ার ব্যবস্থা করব।”
নাফিসা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। হো হো করে হেসে দিল।
সায়মান নাফিসার হাসি শুনে গভীরভাবে তাকাল ওর দিকে। জীবনে এই প্রথমবার নাফিসাকে এতটা খোলামেলা হাসতে দেখল ও।
সাইফান সায়মানের দিকে তাকালো,,তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,,
“ভাই, গাড়িটা ঠিক করে চালাও। তোমার বউ তোমার কাছ থেকে কেউ ছিনিয়ে নেবে না। পরে মন ভরে দেখিও। এখন গাড়ির দিকে মন দাও। না হলে আমি অমৃত খাওয়ার আগেই পটল তুলব। যদি আমি অমৃত না খেয়ে মরি, তাহলে আল্লাহ আমাকেই অভিশাপ দেবেন অমৃত না খেয়ে মরার অপরাধে।”
সায়মান এবার চোখ রাঙিয়ে সাইফানের দিকে তাকাল।
সায়মানকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে,সাইফান গোমরা মুখ করে বলল,
“কী রে ভাই? বউকে তো মুগ্ধ হয়ে গিলে খাচ্ছো, আর ছোট ভাইকে আগুনে পোড়ানো দৃষ্টিতে তাকাচ্ছো! ছিঃ ভাই ছিঃ! একবার বাসর করেই এমন হয়ে গেছো? এইসব চলবে না।”
“আর একটা বাজে কথা বললে তোকে তুলে গাড়ি থেকে ফেলে দেব।” –——— সায়মান ধমক দিয়ে উঠল।
“হ্যাঁ, অবশ্যই ফেলবা। বউকে কোলে নিয়ে ঘুরবা, আর ভাইয়ের বেলায় ফেলে দিবা। এটা আমি মানি না। আমার সাম্য চাই তুমি আইনের মানুষ হয়ে বেআইনি……………. ”
সায়মান আবার রেগে তাকাতেই সাইফান কথা বলা বন্ধ দিয়ে দাঁত বের করে বোকা বোকা ভঙ্গিতে হাসল।
এবার গাড়ির ভেতর নীরবতা নেমে এল। সায়মান নিজের মতো ড্রাইভ করতে লাগল। সাইফান চুপ করে নিজের ফোনটা বের করে ফোন চাপতে লাগলো। নাফিসা জানালা দিয়ে বাইরের ব্যস্ত শহর দেখতে লাগলো।
অবশেষে গাড়ি এসে থামল রাশিদ ভিল্লার সামনে।
সায়মান পার্কিং লটে গাড়ি পার্ক করল। গাড়ির পার্ক করা হয়ে গেলে, খোলামাত্র নাফিসা আর সাইফান দ্রুত নেমে গেল। দু’জন দাঁড়িয়ে রইল গাড়ির পাশে। কিছুক্ষণ পর সায়মানও ধীর ভঙ্গিতে নামল। দুজনকে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কপাল কুঁচকে বলল,
“কি হলো? এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভেতরে চলো।”
বলেই সায়মান সোজা এগিয়ে গেল। পেছন পেছন নাফিসা আর সাইফান হাঁটতে লাগল।
হাঁটতে হাঁটতে সাইফান মুখ বাঁকিয়ে নাফিসাকে বলল,,
“ছটু ভাবি, তুমি কিন্তু ঠিক করোনি। আমার সব এক্সপেরিমেন্ট একেবারে ধুলিস্যাৎ করে দিলে।”
নাফিসা ভয়ার্ত চোখে অসহায় দৃষ্টিতে সায়ফানের দিকে তাকাল।
সেই দৃষ্টি দেখে সাইফান ভ্রু কুঁচকে হেসে ফেলল। তারপর বলল,
“প্লিজ বোন আমার, মুখের ভঙ্গিটা চেঞ্জ করো। তোমার বর যদি তোমাকে এইভাবে আমার দিকে তাকাতে দেখে, তো সঙ্গে সঙ্গে ধরে বসবে আমি বুঝি আবার কী বলে দিলাম তোমাকে। তারপর তো আমার হালত খারাপ!
নাফিসা মৃদু স্বরে বলল,
“ভাইয়া, প্লিজ, চুপ করো এভাবে বলিও না ।”
সাইফান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“হুঁ, আমি চুপ না করলে, তুই তোর জামাইয়ের কাছে নালিশ দিবি, তাই তো?”
এইবার নাফিসা একটু বিরক্ত হয়ে জোরে বলল,
“ভাইয়া!”
দু’জনের এই কথোপকথনের মাঝেই তারা ভেতরে প্রবেশ করল। ডাইনিং রুমে তখন খুব একটা ভিড় নেই। দু’একজন সার্ভেন্ট কাজ করছে আর আফিয়া বেগম সোফায় বসে তাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছিলেন।
সায়মানদের আসতে দেখে আফিয়া বেগম দাঁড়িয়ে এগিয়ে এলেন। স্নেহের ভঙ্গিতে সায়মানের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“কিরে, চোখ-মুখ এতো হলুদ হয়ে গেছে কেন? অনেক দূরের পথ, গ্রাম থেকে আসতে নিশ্চয়ই কষ্ট হয়েছে।”
আফিয়া বেগমের কথা শুনে পিছন থেকে সাইফান খিকখিক করে হেসে ফেলল। মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আরে আম্মু, চোখ-মুখের ক্লান্তির আসল কারণ তো অন্য কিছু… তোমার ভদ্র ছেলে প্রথমবার সাধ—”
হঠাৎ সায়মানের রাগী চোখের দৃষ্টি তার দিকে পড়তেই বাকিটা আর বলল না। মুখ বন্ধ করে মাথা নিচু করে ফেলল।
তারপর আবার নাটকীয় ভঙ্গিতে আফিয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আম্মু, প্লিজ আমাকে বাঁচাও। তোমার বড় ছেলে যে কোনো সময় চোখ দিয়ে আমাকে ভস্ম করে দেবে। উচিত কথা বললেই সবাই আমার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমি তো নিরীহ মানুষ!”
সায়মান তার এসব কথায় কর্ণপাত না করে সোজা হাঁটতে শুরু করল। তবে হঠাৎ পেছন ফিরে নাফিসার দিকে তাকাল। দেখল, নাফিসা ইতিমধ্যেই আফিয়া বেগমের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
নরম গলায় সায়মান বলল,
“অনেক জার্নি করেছো। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নাও।”
বলেই সে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
সাইফান এবার আর বাড়াবাড়ি না করে আফিয়া বেগমের গালে চুমু দিল। দুষ্টুমি ভরা চোখে বলল,
“আম্মু, আমার বিয়ের ব্যবস্থা তাড়াতাড়ি করে দাও। আমি আর দেরি করতে চাই না। আগে থেকেই এলার্ট করে দিলাম। তোমার পেমেন্টটাও এডভান্স করে দিলাম। বাদবাকি তুমি নিজেই আব্বুর কানে দিও। আমি এখন রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ঘুম দেব।”
বলেই সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।
ওকে যেতে দেখে আফিয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,
“হায় আল্লাহ, আমার কপাল! এক ছেলে বিয়ে করবে বলে পাগল, আরেক ছেলে একেবারেই বিয়ে করতে চায় না। এই চক্করে আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। নাতি-নাতনির মুখ বোধ হয় আর কোনোদিন দেখতে পারব না।”
মামনির এই হতাশ ভরা কথা শুনে নাফিসার বুকের ভেতর অদ্ভুত অস্থিরতা তৈরি হলো। এতদিন মামনিকে সত্যি কথা না বলে ভুল করেছে, এটা ওর মনে হলো। পরে যদি মামনি অন্যভাবে জানেন, তাহলে ভুল বুঝবেন না তো?
আফিয়া বেগম ডাক দিলেন,
“কিরে, নিজের গ্রামের বাড়ি ঘুরতে গিয়ে আমাকে একেবারে ভুলেই গেছিস নাকি? একবার ফোনও দিলি না, মামনির খবর নিলি না যে!”
নাফিসা লজ্জায় আমতা আমতা করে বলল,
“আসলে মামনি, ফোন সঙ্গে করে নিয়ে যাইনি তো…”
আফিয়া বেগম ভালো করে ওর দিকে তাকালেন। নাফিসা তখনো সুতি থ্রিপিস পরা, ওড়নাটা দিয়ে নিজেকে ভালোভাবে ঢেকে রেখেছে। শরীরের কোথাও বাড়তি কিছু দেখা যাচ্ছে না। তবে মুখটা অস্বাভাবিকভাবে ফ্যাকাশে লাগছে।
আফিয়া বেগম বললেন,
“কিরে, জামা-কাপড় কিছু নিয়ে যাসনি নাকি? তেহু তো হুট করে আমাকে ফোন করে বলল, তোকে কলেজ থেকে নিয়ে যাবে। তখনই তো বলেছিলাম, কয়েকটা জামা-কাপড় কিনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হোক, যেহেতু কিছুদিন থাকবি। এত তাড়াতাড়ি চলে এলি কেন? সায়মান তো বলেছিল, তুই গ্রামে এক সপ্তাহ থাকবি।”
নাফিসার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। এই ব্যাটা কী সুন্দর মিথ্যা বলতে শিখেছে! DSP সাহেব নিলজ্জ তো বটেই, ফাঁসানোর কৌশলও রপ্ত করেছে!
তবুও মুখে শান্ত থেকে বলল,
“আসলে মামনি, কলেজে কিছু কাজ ছিল তাই তাড়াতাড়ি চলে আসতে হলো। পরে আবার যাবো। আর জামা কিনতে মনেই ছিল না, তাই গ্রাম থেকে একটা কিনে পড়ে নিয়েছি।”
আফিয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“আচ্ছা, যা। মুখে তো ক্লান্তি ফুটে উঠছে। একবার ফ্রেশ হয়ে নে। আমি তোদের তিনজনের রুমে খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি, নিচে নামতে হবে না।”
নাফিসা হাসিমুখে বলল,
“মামনি, রুহি আপুরা কই?”
“ওরা সবাই বাইরে গেছে। তোকে খুব মিস করছিল। তোকে নিয়ে বারবার কথা হচ্ছিল।”
“আমিও ওদের খুব মিস করছিলাম। আচ্ছা মামনি, আমি তাহলে উপরে যাই।”
“যা মা, বিশ্রাম নে।”
নাফিসা মাথা নেড়ে ঘরের দিকে এগোল।
রুমে ঢুকে দরজা লক করে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আস্তে করে ওড়নাটা খুলে বিছানায় রাখল। তারপর আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল। শরীরে সায়মানের রেখে যাওয়া চিহ্নগুলো চোখে পড়তেই আঙুল দিয়ে আলতো ছুঁয়ে দিল। স্পর্শ করার সাথে সাথে ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। মনে পড়ল সায়মানের উন্মাদনা।মস্তিষ্কে ওই দৃশ্য আসতেই গা শিরশির করে উঠল। আজ যেন নিজেকে পূর্ণ মনে হচ্ছে—হালাল স্বামীর প্রথম স্পর্শ পেয়েছে বলে।
ভাবনার ঘোর ভাঙল দরজায় নক পড়ার শব্দে।
ঠক… ঠক… ঠক…
তাড়াতাড়ি ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে দরজা খুলতেই দেখল, একজন সার্ভেন্ট খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝল, মামনি পাঠিয়েছেন। খাবারটা হাতে নিয়ে টেবিলে রাখল। আবার দরজা লক করে দিল।
তারপর আলমারি থেকে কাপড় বের করে ওয়াশরুমে গেল। অনেকক্ষণ ধরে শাওয়ার নিল। ফ্রেশ হয়ে এসে ধীরে ধীরে খাওয়া শেষ করল। শরীর বিছানায় এলিয়ে দিল। চোখ বন্ধ হতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
বিকেলের আবহাওয়াটা তখন একেবারেই মনোমুগ্ধকর। সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে, আকাশজুড়ে লাল-কমলা আর সোনালি রঙের মিশেল। চারপাশের হাওয়া নরম, স্নিগ্ধ। দূরে কোথাও পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে বাসায় ফিরছে। জানালা দিয়ে সেই আলো ঘরে এসে পড়েছে, ঘরটাকেও যেন এক অদ্ভুত শান্তির আবেশে ভরিয়ে তুলেছে।
এমন সময় নাফিসার ঘুম ভাঙল। আধো জাগরণে আরাম করে শরীর টানতে গিয়ে হঠাৎ বুঝতে পারল, সে শক্ত এক বাঁধনে আটকে আছে। কপাল গুটিয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকাতেই দেখল, তার হালাল পুরুষ তাকে বুকের ভেতর একেবারে আসতে-পিষ্টে জড়িয়ে ধরে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।
সায়মানের চুলগুলো কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে, নিঃশ্বাসের ছন্দে সামান্য নড়ছে। এতটা শান্ত, এতটা কোমল রূপ নাফিসা এর আগে কখনো দেখেনি। একেবারে নিষ্পাপ শিশুর মতো লাগছে তাকে। নাফিসার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
আস্তে করে হাত বাড়িয়ে সায়মানের কপালে ঝরে পড়া চুলগুলো গুছিয়ে দিতে লাগল নিজের নরম আঙুল দিয়ে। সেই স্পর্শে যেন ওর ভেতর থেকে গভীর এক মায়া, এক ভালোবাসা জেগে উঠল।
সায়মান হালকা নড়ল, কিন্তু জড়িয়ে ধরা হাতের বাঁধন আরও শক্ত হয়ে গেল। নাফিসা এবার ওর বুকে মুখ গুঁজে চোখ বুজে রইল।
তারপর আবার মুখ তুলে, অনেকক্ষণ ধরে হালাল পুরুষের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল নাফিসা। সায়মানের শক্ত অথচ আকর্ষণীয় ঠোঁটজোড়ার দিকে দৃষ্টি আটকে গেল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কম্পন উঠল, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো। এক ঢোক গিলে সাহস সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ল। নিজের নরম গোলাপি ঠোঁটজোড়া আস্তে করে ছুঁইয়ে দিল স্বামী নামক সেই হালাল পুরুষের ঠোঁটে।
মুহূর্তেই নাফিসার শরীরে বিদ্যুতের মতো ঝটকা খেলে গেল। এতটাই তীব্র অনুভূতি যে সঙ্গে সঙ্গে সরে আসতে চাইল। কিন্তু আর সম্ভব হলো না। এতক্ষণ যে ঘুমের ভান ধরে ছিল সায়মান, তার বউ শেষ পর্যন্ত কি করে সেটা দেখার জন্য কিন্তু বোকা মেয়েটা এর কিছুই টের পেল না।
পরক্ষণেই ওর শক্ত হাত নাফিসার কোমর চেপে ধরল, অন্য হাতটা আলতো করে চুল সরিয়ে মাথার পেছনে রাখল। টান দিয়ে তাকে আরো কাছে টেনে নিল।
শিকার যখন স্বেচ্ছায় শিকারির কাছে ধরা দেয়, তখন কি শিকারি সেই সুযোগ হাতছাড়া করে? সায়মানও করল না। নিজের অধিকারী স্পর্শে, নিজের উন্মাদ ভালোবাসায় নাফিসার নরম ঠোঁটজোড়ায় রাজত্ব শুরু করল। নাফিসার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছে , হৃদস্পন্দন যেন কানে কানে বাজতে লাগল।
চোখ বুজে ওর অধরে অধর মেলাল, কিন্তু ততক্ষণে সায়মান তাকে নিজের শরীরের নিচে নিয়ে ফেলেছে। ছোট্ট শরীরটা যেন পুরোটাই ঢেকে গেল স্বামীর শক্ত আগলে।
নাফিসা প্রথমে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। অবাক হয়ে থ হয়ে ছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই স্বামীর উচ্ছ্বাস সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। প্রতিটি স্পর্শে, প্রতিটি আলিঙ্গনে, প্রতিটি উন্মাদনায় নাফিসার বুক ভরে উঠছে অদ্ভুত এক মিষ্টি অনুভূতিতে।
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৩৫
দীর্ঘ সময় পর সায়মান অবশেষে তার পিচ্চি বউয়ের ঠোঁট ছেড়ে দিল। দুজনের শ্বাস তখনও এলোমেলো। নাফিসা লজ্জায় মুখ গুঁজে ফেলল সায়মানের বুকে, আর সায়মান গভীর তৃপ্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের দিকে।
