Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৩

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৩

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৩
আরোবা চৌধুরী আরু

ঘড়ির কাঁটা তখন ৩টা ১৮।
ঢাকা শহর গভীর নিদ্রায়। পুলিশ হেডকোয়ার্টারের করিডোর গুলো যেন ধোঁয়াটে এক শূন্যতা জড়িয়ে আছে। চারপাশে নিঃস্তব্ধতা, মাঝে মাঝে কোথাও-একটা বাতির নীচে পতঙ্গ ঘোরার শব্দ, দূরে কোনো ট্রাফিক সিগন্যালে হালকা হর্ণ।
কমিশনার তাহমিদ ইকবাল নিজের ডেস্কের কাঁচের ওপাশে দাঁড়িয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন। অন্ধকার শহর যেন হঠাৎ করেই এক ভারী বোঝা হয়ে এসেছে তার ঘাড়ে। তিনি পেছন ফিরে তাকালেন সায়মানের দিকে।

সায়মান নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে।
এক হাতে রিভলভার বেল্ট ধরে আছে, আরেক হাতে তার বিয়ের সাদা ফাইল। নাফিসা একপাশে বসে। মাথা নিচু, কাঁধ দুটো ঝিমিয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে এই ছোট্ট শরীরে আর কোনও শক্তিই অবশিষ্ট নেই।
সায়মান আস্তে বললো,
“এই বিয়েটা বাতিল করতে হবে।”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

নাফিসার চোখ একবার কেঁপে উঠল। তার বুকের ভিতর এক যন্ত্রণা শুরু হলো মনে হলো কথাটাতে।মাত্র কিছু শব্দের কথা নাফিসার বুকে কেন জানি অজানা ভয় লেগে আছে । যে বিয়েটার কোন মানেই হয় না সেটা নিয়েই এত কেন ভাবতেছে সে জানেনা। তার এইটুকু বয়সে সে অনেক কিছু দেখে ফেলেছে।
“আইনের ভাষায় ওটা কোনো বিয়েই না। ১৮ বছরের নিচে কোনো বিয়ে বাংলাদেশে অবৈধ। ওর বয়স ১৪, এটা তো আপনি নিজেই শুনলেন। আমরা চাইলে তখনি মামলা করে দিতে পারতাম তন্দ্রাদের নামে। কিন্তু তখন জানত না, পরিস্থিতিকে দোষ দেয়া যায় না। এখন যা করতে হবে সেটা হচ্ছে,এই মেয়েটাকে সুরক্ষিত রাখা, এবং এই বিয়ের সমস্ত দলিল বাতিল করে দেওয়া।”
নাফিসার গলা আবার ফেটে উঠলো,

“না প্লিজ, আবার সেই ঘরে পাঠাবেন না আমাকে! আমি আর ফিরতে চাই না… আমি… আমি থাকবো যেখানেই আপনারা রাখবেন … কিন্তু মামির কাছে না…”
সে হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সায়মানের দিকে তাকায়।
তার কণ্ঠে অসহায়তা, কিন্তু দৃষ্টিতে সাহসের শেষ ধ্বংসাবশেষ,
“আপনি না আমাকে বলেছিলেন, কেউ জোর করবে না? এখন কি আপনি আমাকে আবার সেই দোযখে পাঠিয়ে দিবেন?”

সায়মান কিছু বললো না। ঠোঁট চেপে তাকিয়ে রইল মেয়েটির দিকে।
কমিশনার তাহমিদ ইকবাল একটা ঢুক গিলে, বলল আইনিভাবে না মানো কিন্তু আমাদের ইসলাম অনুযায়ী এই মেয়েটা কিন্তু তোমার স্ত্রী এখন, তুমি না মানলেও আমি বলি কি? আমি চাই ওকে তত্ত্বাবধানে রাখা হোক। ওর সঙ্গে কোনও বৈবাহিক সম্পর্ক রাখতে হবে না। ওর পড়াশোনা, নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ, সবকিছু দেখভাল করো । যতদিন না ও নিজে বড় হয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।”

একটা ছোট বাচ্চা ওকি সিদ্ধান্ত নেবে আপনার বাকি কথাগুলো আমি মানতে পারলে আমি ওকে বউ হিসেবে মানতে পারব না।কঠোরভাবে কথাগুলো বলল সায়মান।
নাফিসা মাথা নিচু করে আছে কথাটা শোনা মাত্র তার দুই চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়তে লাগলো।
সায়মান পাশ থেকে ফোনটা তুলে বললো,
“আমি একটা শিশু সুরক্ষা হোমে যোগাযোগ করছি। ওখানে ওকে কিছুদিনের জন্য রাখা হবে। আমরা তার কেস ল’ মিনিস্ট্রির কাছে পাঠাবো। এরপর দেখা যাবে ওকে কোনও সরকারি আশ্রয়ে রাখা যায় কিনা।”
নাফিসার গলার স্বর খানিক নিচু হলো,

“আশ্রয় চাই না। আমি শুধু পড়তে চাই… আমি স্কুলে যেতে চাই…”
এই শব্দটা যেন একটা বুলেটের মতো এসে আঘাত করে সায়মানের বুকের মাঝখানে।
সে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো।
কমিশনার তাহমিদ ইকবাল আর একবার বড় সরো ঢুক গিললো, আমি একটা কথা বলতে চাই, তুমি মন দিয়ে শোনো, আগে হাইপার হবে না। তুমি মেয়েটাকে তোমার বাসায় নিয়ে যাও?
What? Are you serious, আপনার আইডিয়া আছে আপনি কি বলতেছেন স্যার।
আমি আগেই বলেছি তোমাকে সায়মান শান্ত হও আমার পুরো কথাটা শোনো।

কোন হোম বা আশ্রয় কেন্দ্র না রেখে ওকে তোমার বাসায় নিয়ে যাও বাসায় ওর পরিচয় দেওয়ার দরকার নেই তোমার ওয়াইফ কাউকে জানাবে না তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউ জানতে পারবে না। আর আমি রাজীবকে ও এই বিষয়ে বাইরে খবর পাস করতে নিষেধ করে দিব। কোন হোমে কিভাবে থাকবে না থাকবে জানিনা,, কিন্তু ওকে তোমার বাসায় রেখে দেওয়া বেস্ট হবে। একটা ভালো পরিবারের সাথে মিশতে পারবে তুমি তো তোমার পরিবারকে চেন। আর আমি তোমার পরিবারের সবাইকে ভালোভাবে জানি বলে তোমাকে এই ডিসিশন নিতে বলছি। তোমার বাবার মত ভাল মানুষ একজন ভালো রাজনীতিবিদ কতজনকে হেল্প করে। সেখানে তো এটা তোমার বউ?
স্যার ও একটা ছোট বাচ্চা আমার বউ না?

ওকে রিলাক্স এত হাইপার হয়ো না। তোমার বউ মানতে হবে না। ওকে বাসায় নিয়ে যাও বাসায় কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে তখন বলবে, তোমার ফ্রেন্ড এর বোন বাবা মা নেই হঠাৎ তোমার ফ্রেন্ড এক্সিডেন্টে মারা যাওয়া ওর দায়িত্ব তুমি নিয়েছো। আমার বাসায় রাখতাম ওকে কিন্তু আমার পরিবারের সবাই বাইরে আছে আমি একা ওকে নিয়ে গিয়ে কি করবো। আর তাছাড়াও আমার মনে হয় তোমাদের দুজনের একটু সুযোগ দেওয়া উচিত ।
সায়মানের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো একবার মুখের রিএকশন চেঞ্জ হচ্ছে ওর। সাথে সাথে কথা ঘুরিয়ে বলল, আমি বলছিলাম ওর একটা ভালো পরিবার দরকার এই মুহূর্তে ওর পড়াশোনা, নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ, সবকিছু দেখভাল সব কিছুর জন্য।

সায়মান এবার চুপ করে রইলো, এক মুহূর্ত নীরবতা।
ওকে স্যার আমি রাজি ওকে নিয়ে যেতে।
তাহমিদ ইকবালের চোখ জোড়া চিক চিক করে উঠলো, মনে হল কোন এক যুদ্ধে জয় করেছেন তিনি।
নাফিসা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
এই রাতে, যখন বাইরের পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে, তখন একটি শিশু-আত্মা একটু একটু করে মুক্তির পথ খুঁজে নিচ্ছে।

এই ঢাকারই গুলশান-২ নম্বরের এক সড়কের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে এক রাজকীয় প্রাসাদ,
“রাশিদ ভিলা”।
উঁচু লোহার বিশাল অটোমেটিক গেট, পাশে হাতি-সিংহের মূর্তি, কাঁচের মতো চকচকে পাথরের পথ,বাগানের এক কোণায় ঝর্ণার মতো সাজানো জলের ফোয়ারা, সবকিছু যেন ইতিহাস আর আধুনিকতার এক মোহময় মিশেল।বাড়ির বাম দিকে ছড়িয়ে আছে এক একর জায়গাজুড়ে সুবিশাল বাগান।
বাড়িটা বাইরে থেকে যতটা বিশাল, ভেতর থেকে তার চেয়েও বেশি মনকাড়া।ভেতরে ঢুকলেই মাথার উপর বিশাল ক্রিস্টাল চ্যান্ডেলিয়ার, পোল্যান্ড থেকে আনা মেঝের মার্বেল, দেয়ালে পুরোনো রাজনীতি সভার মুহূর্তগুলো ধরে রাখা তেলচিত্র, সবকিছুই রাশিদ পরিবারের ঐতিহ্যের নিদর্শন। এই বাড়ির গোড়াপত্তন করেছিলেন সায়মান রাশিদের প্রপিতামহ – সৈয়দ মোজাম্মেল হোসেন রাশিদ।

তিনি ছিলেন ব্রিটিশ আমলের প্রথম সারির এক রাজনৈতিক নেতা, যিনি ভারত বিভাগের পর ঢাকায় এসেই এই বাড়ির নির্মাণ কাজ শুরু করেন।
তার পর তার সন্তান, মোস্তাক আহমেদ রাশিদ (সায়মানের দাদা), বাংলাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল নাম। তিনি ছিলেন একজন সংসদ সদস্য, তার নীতিবোধ, রুচিবোধ, এবং মানবিক গুণাবলির জন্য সমাদৃত।
তার দুই ছেলে,

১. সৈয়দ মাহবুব রাশিদ (সায়মানের বাবা),
২. সৈয়দ মঈন রাশিদ (সায়মানের চাচা)
দুজনেই দেশের রাজনীতিতে শক্তিশালী নাম মাহবুব রাশিদ বর্তমানে একটি বড় রাজনৈতিক দলে কেন্দ্রীয় নেতার দায়িত্বে আছেন। রাশিদ পরিবারে সবচেয়ে বয়স্ক ও সম্মানীয় সদস্য,
বিলকিস আরা রাশিদ, যিনি সায়মানের দাদি।

তিনি নিজে একজন প্রাক্তন স্কুল হেডমিস্ট্রেস ছিলেন, আজও তাঁর চোখেমুখে শিক্ষার দীপ্তি ও প্রজ্ঞার জ্যোতি।
সায়মান রাশিদ নিজে একজন DSP (Deputy Superintendent of Police)। তার রাজনীতি করার কোন ইচ্ছা না থাকায় এই পেশা বেছে নেই। তার বাবা এতে অনেক অসন্তুষ্ট তার ওপর।
তাঁর ছোট ভাইয়ের নাম সায়ফান রাশিদ, যিনি বর্তমানে একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ফাইনাল ইয়ার স্টুডেন্ট।বাবার রাজনীতিতে সে পুরা দমে সাহায্য করে। এক কথায় ছন্নছাড়া টাইপের বাবার ডান হাত।
রাশিদ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন,

ফুফু:
সাবিহা খালেদা রাশিদ, পরিবারের মেজো কন্যা। স্বামী মারা গেছে চট্টগ্রামে বসবাস করেন।কিন্তু বর্তমানে থাকে বেশি বাবার বাসায়। তাঁর তিন সন্তান,
১. রাইহান খালেদ (বড় ছেলে), কেবল পড়াশোনা শেষ করে সায়মানদের পারিবারিক বিজনেস যোগ দিয়েছে।
২. রাইমা খালেদ (মধ্যম), সায়ফান এর ভার্সিটিতেই অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে।
৩. রিদওয়ান খালেদ (ছোট ছেলে) ক্লাস টেনে পরে।
ছোট চাচা:
সৈয়দ মঈন রাশিদ,
তিনি ও রাজনীতি করে। আর বড় ভাইকে অনেক সম্মান করে।
তাঁর তিন সন্তান,

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২

১. রুহি রাশিদ (বড় মেয়ে), সায়ফানের সাথে পড়ে দুইজন সেম এজের।
২. রিশা রাশিদ (ছোট মেয়ে),ও ক্লাস টেনে পড়ে।
৩. রাহিল রাশিদ (ছেলে, বয়স ৫-৬ বছর)
তিনজনই দাদি বিলকিস আরা রাশিদের খুব আদরের।কিন্তু বাড়ির বড় সন্তান সায়মান হওয়াই সবাই তাকে সব থেকে বেশি ভালোবাসে। সায়মান বাড়িতে খুব কম আসে। তার মা আফিয়া বেগমের ছেলের জন্য সব সময় অস্থির হয়ে থাকে ভদ্রমহিলা প্রচন্ড লেভেলের নরম মনের মানুষ।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪