চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫৭+৫৮+৫৯
আরোবা চৌধুরী আরু
মাহাবুব রাশেদের কেবিনটা অস্বাভাবিকভাবে শান্ত। এসি চলছে, পর্দা টানা, বাইরে গাড়ির শব্দ পর্যন্ত ঢুকছে না। সায়মান সোফায় বসে আছে,পিঠ হেলান দিয়ে, চোখ দুটো শূন্যে আটকে।এই রুমে সে বহুবার এসেছে একসময়, মাঝখানে দীর্ঘ বিরতির পর আজকে আসতে হলো। মাহবুব রাশিদ জরুরী ভিত্তিতে ডেকে পাঠিয়েছে তাকে বাবার কথা ফেলতে পারিনি সায়মান।
মাহাবুব রাশেদ টেবিলের ওপাশে বসে কাগজ উল্টাচ্ছিলেন।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন,
“মিডিয়ার সামনে বিয়ের প্রমাণ দিতে হবে। না হলে অবস্থা আরও জটিল হবে। তার ওপর বৌমা এখন প্রেগন্যান্ট, এইটা নিয়ে মিডিয়া ঝাঁপাবে।”
সায়মান ধীরে চোখ সরিয়ে তাকাল। চোখে রাগ নেই, আছে অপমান আর জমে থাকা ক্ষোভ।
“আমি কারও কাছে সাফাই দিতে যাব না। বউ ছোট ছিল বলে এত বছর ছুঁইও নাই। এখন একটু হাত দিলাম। আর চারদিক থেকে শুধু আমার বউ নিয়েই ধান্দা!”
মাহাবুব রাশেদের কপালে ভাঁজ পড়ল।স্বরে কঠোরতা আনলেন,
“মুখের লাগাম টানো। এখন মাথা ঠাণ্ডা রেখে পরিস্থিতি সামলানো দরকার।”
সায়মান হেসে উঠল। হাসিটা কটু, ভাঙা।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“মানে কী?এখন কি মাইক লাগিয়ে বলব,
শুনেন শুনেন, আজ থেকে আমি বউয়ের স্বামী হওয়ার কাজ শুরু করলাম? সময় ধরে, হিসাব করে, মিডিয়ার অনুমতি নিয়ে বাচ্চা পয়দা করব?”
মাহাবুব রাশেদ টেবিলে হাত চাপড়ালেন।
“এইসব বাজে কথা বন্ধ করো।”
সায়মান এবার উঠে দাঁড়াল। কণ্ঠ ভারী, চোখ লাল।
“বাজে না—সত্যি। আমার বউ, আমার সংসার,এটারও নাকি প্রেস কনফারেন্স লাগবে!”
রুমে হঠাৎ ভারী নীরবতা নেমে এল। মাহাবুব রাশিদ চুপ করে সায়মানের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কি করে ঘাড় ট্যাড়া ছেলেকে রাজি করাবে ভেবে পাচ্ছেন না। যত রকম সব তার সাথেই করে এই ছেলে। অনেকক্ষণ পরে তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। স্বরে কঠোরতা নেই,
“ঠিক আছে,”
ধীরে বললেন,
“বিয়ে হয়েছে, এইটুকু প্রমাণ দেখাতে হবে। কনফারেন্সে যেতে হবে। তোমার জন্য না, পরিস্থিতি সামলানোর জন্য। আমার রাজনীতি আর সম্মানের জন্য হলেও এতে তোমার বউ ও জড়িয়ে আছে তারও অপমান করা হচ্ছে। সম্পূর্ণ দিক বিবেচনা করে হয়ে যাওয়া উচিত। ”
সায়মান কিছু বলল না। চোখ নামিয়ে শুধু মাথা ঝুঁকাল।
কনফারেন্স রুমের বাতাস ভারী। এয়ার কন্ডিশনের ঠাণ্ডা বাতাসও যেন ভেতরের উত্তেজনা ঠাণ্ডা করতে পারছে না। সামনের সারি জুড়ে সারি সারি সাংবাদিক, ক্যামেরার লেন্সগুলো তাক করা, মাইক্রোফোন হাতে প্রস্তুত। মাঝখানে বড় টেবিল।চেয়ারটায় সোজা হয়ে বসে আছে সায়মান।
পরনে ডিপ ব্লু ফরমাল শার্ট, হাতা গুটানো। চোখে কোনো ভয় নেই,আছে কেবল দৃঢ়তা। তার এক পাশে বসে মাহবুব রাশিদ, গম্ভীর, চোয়াল শক্ত। অন্য পাশে রাজিব দাঁড়িয়ে আছে। আর রাজিবের পাশেই, চেয়ারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সায়ফান একেবারেই বেমানানভাবে নির্ভীক। পেছনে দুই পাশে বডিগার্ড।দেয়ালের ধারে পুলিশ ফোর্স। ঘরে পিনপতন নীরবতা।
হঠাৎ একজন সাংবাদিক মাইক্রোফোন এগিয়ে দেয়।
“DSP সায়মান তাহের রাশিদ , সরাসরি প্রশ্নে আসি। আপনার স্ত্রী নাফিসার বয়স যখন ১৪, তখনই কি আপনার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল?”
ঘরে একটা চাপা গুঞ্জন ওঠে। সায়মান এক সেকেন্ড চুপ থাকে।
চোখ তুলে তাকায়, একদম সোজা ক্যামেরার লেন্সের দিকে।
গম্ভীর, ধীর কণ্ঠে বলে,
“হ্যাঁ। হয়েছিল।
আপনারা বিষয়টা এতদিন ধামাচাপা দিয়ে রেখেছেন আপনাদের ক্ষমতার জোরে এটা সত্য কি মিথ্যা??
সায়মান চোয়াল শক্ত করে দাঁতের দাঁত চেপে উত্তর দিল,
” আপনারা দেখি সব খবর আগে থেকে জেনে রেখেছেন। তাহলে, নতুন করে আবার জিজ্ঞেস করার মানে কি? স্টেপ নিলেই তো পারে সরকার এই বিষয়ে। ”
মাহবুব রাশিদ পাশ থেকে ফিসফিস করে,
“ঠিক করে বলো ।”
সায়মান একটুও বিচলিত হয় না। নিজেকে শান্ত করে আবার বলল,
“আপনারা যদি ভাবেন, সেটা কোনো স্বাভাবিক বিয়ে ছিল। তাহলে আপনারা পুরো ঘটনাটা জানেন না।”
পাশ থেকে আর একটা সাংবাদিক আর একটা প্রশ্ন করে উঠলো,
“১৪ বছরের একটা মেয়ের সঙ্গে ৩২ বছরের একজন পুলিশ অফিসারের বিয়ে, আপনি কীভাবে এটাকে বৈধ বা নৈতিক বলেন?”
সায়ফান হঠাৎ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে উঠতে যায়,
“নৈতিকতা না জানলে—”
রাজিব ঝট করে সায়ফানের মুখ চেপে ধরে। ফিসফিস করে,
“এখানে শুরু হইস না ভাই। সামনে শুধু ক্যামেরার ক্যামেরা কখন ভাইরাল করে ছেড়ে দেবে তোরে। ”
মাহবুব রাশিদের সব গরম করে সাইফনের দিকে তাকাতেই সায়ফান সঙ্গে সঙ্গে চুপ।তারপর বিড়বিড় করে রাজীবের গানের কাছে বলতে থাকলো,
“বুঝেছ রাজীব ভাই আমার জীবনটাই মূলত বেদনা। বাপ, ভাই , বর্ধমান গার্লফ্রেন্ড মানে হবু হবু বউ এখন থেকে যা কেরামতি দেখাচ্ছে সবাই শুধু চোখ রাঙায়। মারে,, কেউ একটু চুমু দেয় না বলেনা ছেলেটার বয়স হয়েছে একটু বিয়ে দিই। শালার গার্লফ্রেন্ড টাও দূরে দূরে থাকে চশমা শালী একটা। খচ্চর বেডি এক নম্বরের।
সায়মান এবার কণ্ঠ আরও শক্ত করে
“আমি কোথাও বলিনি এটা বৈধ ছিল। আমি কোথাও বলিনি এটা স্বাভাবিক ছিল। আমি বলছি, এটা ছিল একটা শিশুকে বাঁচানোর সিদ্ধান্ত।”
সায়মান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলা শুরু করল আবার,
“ওই মেয়েটা বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছিল।একটা সন্ত্রাসীর সাথে বিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।আমাদের পুলিশ ফোর্স সেই সময় গিয়ে আসামিকে গ্রেফতার করে। কিন্তু পুলিশ ফোর্স চলে যাওয়ার পর আমি আর আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট যাইতে পারিনি এমন একটা সন্ত্রাসীর সাথে বিয়ে কেন দেওয়া হচ্ছিল মেয়েটাকে এটা জানার জন্য। আমরা তখনো জানতাম না আসলে মেয়েটার বয়স কত? ”
এক মুহূর্ত থামে।
“গ্রামের মানুষ আইন বোঝে না। তারা বোঝে অপবাদ। ওরা রায় দিয়েছিল মেয়েটা যদি অবিবাহিত থাকে, তাহলে ওর বাঁচা নেই।”
একজন সাংবাদিক তেড়ে আসে,
“তাহলে আপনি নিজে আইনের লোক হয়ে অন্য কোন সিদ্ধান্ত না নিয়ে, আইন নিজের হাতে তুলে নিলেন?”
সায়মান ঠাণ্ডা গলায়,
“না।
আমি দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলেছিলাম। আর দায়িত্ব আর ভোগ, এই দুইটার মধ্যে পার্থক্য আমি জানি। সম্পূর্ণ বিষয় জেনে তারপরে কথা বলেন। ”
আরেকজন সাংবাদিক প্রশ্ন করে বসলো ,
“তাহলে ১৪ থেকে ১৮ এই চার বছরে আপনার সম্পর্ক কী ছিল?”
সায়মান এবার চেয়ার থেকে একটু সামনে ঝুঁকে পড়ে।
“আমি তাকে কখনো স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করিনি। না মানসিকভাবে, না শারীরিকভাবে।”
ঘরে আবার গুঞ্জন।
সায়মান আবার বলল,
“আমরা আলাদা থাকতাম। সে পড়াশোনা করেছে। আমি তার অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছি।আর সমস্ত ডকুমেন্ট আছে আপনাদের সামনে পেশ করা হয়ে যাবে। ”
সায়ফান আর থাকতে না পেরে চাপা স্বরে বলে,
“ভাই কেমন করে না মানে একেবারে সবকিছু সবার সামনে প্রমান দিবা ওই একটু ইয়ে বলতে চাচ্ছিলাম আর কি…. ।”
রাজিব আবার কনুই দিয়ে খোঁচা দেয়। সায়ফান চুপ হয়ে গেলো। সায়মান একবার সায়ানের দিকে খালি তাকালো কোন কথা বললো না।
এক সাংবাদিক খোঁচা দিয়ে বলল,
“আপনি কি বলতে চান, চার বছর এক ছাদের নিচে থেকেও, কিছুই হয়নি?”
সায়মান ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসে। চোখে ঝিলিক।
“আমি পুলিশ অফিসার। সংযম শব্দটার মানে জানি।”
একটু থেমে আবার বললো,
“আর পুরুষত্ব প্রমাণ করতে আমাকে কোনো শিশুর দরকার হয়নি।”
এই কথায় ঘরে শোরগোল।
মাহবুব রাশিদ আবার ফিসফিস করে,
“এইসব কথা একটু কম— নিলজ্জ ছেলে, এত নির্লজ্জ কথাবার্তা কবে থেকে শিখেছো। ”
সায়মান পাশ ফিরে ফিসফিস করে ঠান্ডা স্বরে বলে,
“আব্বু, নির্লজ্জ কথাবার্তা না করলে যদি মানুষ জন্ম দিত,
তাহলে এই দুনিয়াতে আপনার অনেক সন্তানই জন্মাত না।”
মাহবুবুর রাশিদ জোরে কেসে উঠলো,
” অভদ্র একটা আমি তোমার বাপ হই, এটা মাথায় কিছু কথা বল দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে উত্তর দিল।
সায়ফান সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করল। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি চেপে রেখে সেও ফিসফিস করে উত্তর দিল,
“এইটা তো ঠিক বলেছ ভাইয়া!”
একটু থেমে আবার বলল,
“আর আব্বু, আমার বিয়েটাও তাড়াতাড়ি দাও। তোমার নাতি-নাতনি নিয়ে মুখ দেখাতে চাই। এত দেরি করে ছেলেদের বিয়ে দিচ্ছ কেন? নাতিপতি নিয়ে খেলার ইচ্ছা নেই নাকি? না দেখেই পটল তোলার ইচ্ছা আছে তোমার?”
কথাগুলো শেষ হতেই মাহবুব রাশিদ ধীরে ঘুরে সায়ফানের দিকে তাকালেন। এরপর নিজের মনেই বিড়বিড় করতে লাগলেন,
“দুইটা ছেলে একেবারে অসভ্য হয়ে গেছে। কার মতো এমন নিলজ্জ হয়েছে আল্লাহই জানে…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই সায়ফান আবার একটু সামনে ঝুঁকে মাথা ঢুকিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“আব্বু, তোমার মতোই নিলজ্জ।”
চোখে-মুখে বিন্দুমাত্র ভয় নেই,
“তুমি এতটা সাধু না। সাধু হইলে আমরা এমন হইতাম না। তুমিও নিলজ্জ, নটি বয়। আমরা সব জানি।”
এইবার মাহবুব রাশিদ কিছু বললেন না। দাঁতে দাঁত চেপে চুপ করে রইলেন।
রাগে নাকি অপমানে, নাকি নিজের ছেলের কথায় নিজে আর পেরে না উঠে চেপে ,, কোনোটাই বোঝা গেল না।
ওদের কথা বলার মধ্যে আর একটা সাংবাদিক প্রশ্ন করল আবার,
“১৮ হওয়ার পর কেন তাকে গ্রহণ করলেন?”
সায়মান এবার গলা নরম করে,
“কারণ তখন সে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। আমি তাকে বলেছিলাম, চাইলে চলে যেতে পারো।”
একটু থেমে,
“সে যায়নি। আর শরীয়ত মতে আমাদের বিয়েটা জায়েজ। এটা ভুলে যাবেন না। সবকিছু নিয়ো শৃঙ্খলা মেনেই হয়েছে সবকিছু প্রমাণ কাগজপত্র সামনে তুলে ধরাই হচ্ছে। ”
সায়মান আবার বললো,
“আমি ভুল পরিস্থিতিতে কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু আমি আইন ভাঙিনি, নৈতিকতা ভাঙিনি। যারা অপবাদ দিতে চান, তারা পুরো গল্প জানুন।”
চেয়ার ঠেসে উঠে দাঁড়ায়।
“এই কনফারেন্স এখানেই শেষ।”
পুলিশ ফোর্স এগিয়ে আসে। সাংবাদিকরা চেঁচাতে থাকে।
কনফারেন্স রুম থেকে বের হওয়ার পর কেবিনে ঢুকতেই,
চড়াস!
সায়ফানের গালে সায়মানের হাত এসে পড়ে। সায়ফান কিছু বুঝে ওঠার আগেই,
চড়াস!
আরেকটা থাপ্পড়। এপাশে ঘুরে তাকাতেই দেখে, মাহবুব রাশিদ দাঁড়িয়ে আছেন।
সায়ফান দুই গালে হাত চেপে ধরে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে গেল।
মাহবুব রাশিদ গম্ভীর গলায় বললেন,
“নেক্সট টাইম থেকে আমার সামনে ভদ্রভাবে কথা বলবা। আমি তোমার বাবা, এইটা ভুলে যাইও না।”
সায়মানও আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সায়ফানের গালে আরেকটা চাটি বসিয়ে দিল।
“পরবর্তীতে আমার সামনে এত বেশি মুখ চালাবি না। না হলে আমার হাত আরো চলবে, ছোট ছটোর মতো থাকবি।”
সায়ফান দুই গালে হাত দিয়ে কান্না শুরু করল,ন্যাকামো করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“দেখছো! কি রকম কথাবার্তা বলে! আমি নাকি ছোট,,বাল আমার বিয়ের বয়স হয়ে গেছে এতদিনে বিয়ে দিলে তিন চার বাচ্চার বাপ হতাম। এটা তোমাদের চোখে পড়ে না হুদাই মারো আমাকে। আমি তো সঠিক কথাই বলি ভুল কথাই বলি। আসলেই ভালো মানুষের ভাত নেই সঠিক কথাই দাম নেই । ”
রাজিব পাশে এসে সায়ফানের কাঁধে হাত রাখল। সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
“ভাই, তুই এমনিতেও শয়তান। এত শয়তানি করিস না। শয়তানি করার জন্যই আজ মার খাইলি। এখন আবার ঢং করছিস। তুই ভালো হবি না ভাই।”
সায়মান কেবিন থেকে বের হতে যাবে, ঠিক তখনই মাহবুব রাশিদ ডেকে উঠলেন,
“ দাড়াও ।”
সায়মান থেমে দাঁড়াল।
মাহবুব রাশিদ বললেন,
“তুমি নাকি আলাদা ফ্ল্যাটে শিফট করছ? বাসায় যাবেনা বলছো? এগুলো কোন ধরনের পাগলামো?”
সায়মান ঠাণ্ডা গলায় উত্তর দিল,
“যা শুনেছেন, সেটাই ঠিক শুনেছেন।”
মাহবুব রাশিদ গলা শক্ত করে বললেন,
“ তুমি যেখানে থাকতে চাও থাকো। তোমার স্বভাবে আছে বাড়ি থেকে দূরে দূরে থাকা কিন্তু, আমার বউমা আর আমাদের বাড়ির বংশধর, আমাদের বাড়ির রক্ত বাড়িতেই থাকবে। এই অবস্থায় বাসার মানুষ থেকেও দূরে রাখার কোনো মানে হয় না।”
একটু থেমে আবার বললেন,
“এটা নিয়েও মিডিয়াতে ইস্যু হবে । পাগলামো বুদ্ধি বাদ দাও। আজই বৌমাকে বাসায় নিয়ে আসো।”
শেষ কথাটা একটু নরম হলো,
“আজকে তোমার আম্মু অনেক টেনশনে আছে। অনেক কান্না করছে। তার জন্য হলেও।”
সায়মান আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। বাবার দিকে আর তাকাল না। কেবিনের দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে ঠাণ্ডা, কিন্তু ভেতরে জমে থাকা অভিমানি গলায় বলল,
“আমার বউ-বাচ্চাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। তাদের দেখাশোনা আমি ঠিক করতে পারব।”
এক পা এগিয়ে আবার থামল। কণ্ঠ এবার একটু ভারী।
“আমার বউকে যখন বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, ওই অবস্থায় তখন কোথায় ছিলে?”
ঘরে নিঃশব্দ নেমে এল। সায়মান ধীরে ঘুরে তাকাল।
“আমার বউয়ের কিছু হয়ে গেলে তখন কি করতে? আমার বাচ্চার কিছু হয়ে গেলে তখন কি করতেন?”
কণ্ঠ একটু কেঁপে উঠল, কিন্তু সে নিজেই সামলে নিল।
“আমি কথা বাড়াতে চাই না বলেই যাচ্ছি।”
এইটুকু বলেই সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
পেছন থেকে মাহবুব রাশিদ ছেলের কথা শুনে প্রথমে একটু মুখটা শুকনো হয়ে গেলেও। পরবর্তীতে সায়মানের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে ব্যঙ্গ করে, নকল করার ভঙ্গিতে বলল,
“এবার যেন আমার কাছে কান্না করতে করতে আসবে না,
আব্বু, আমার বউ এনে দাও, কোথায় জানি না, কিভাবে জানি না।
সায়মান থেমে গেল। এবার পুরোপুরি ঘুরে বাবার দিকে তাকাল। চোয়াল শক্ত, চোখে চাপা রাগ।
“তোমার বউকে ওইভাবে বাড়ি থেকে বের করে দিলে তুমি কি করতে?”
এক পা এগিয়ে এল সে।
“আমার ভালো করে জানা আছে। নিজে বউয়ের লেজ ধরে সারাক্ষণ থাকো। একা কোথাও যাইতে দাও না। এত ব্যস্ততার মধ্যেও দিনশেষে ওই বউয়ের কাছেই গিয়ে হাজির হও।”
একটু থেমে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“আর আমাকে এসে শিখাও, আর তোমার বউকে ওইরকম করে ভ্যানিশ করে দিই তখন দেখবো কি করো ?”
গলার স্বর এবার তির্যক।
“ একই ডায়লগ তুমিও দিতে আসবে।”
মাহবুব রাশিদের মুখটা একেবারে চুপসে গেল। যেন কেউ ভেতর থেকে বাতাস বের করে দিয়েছে। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর দাঁতের ফাঁক দিয়ে বিড়বিড় করতে লাগলেন,
“অসভ্য ছেলে একটা…”
একটা হতাশার নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল বুক থেকে। মাথা একটু কাত করে আবার বললেন,
“ঘাড় ট্যারা ছেলে।”
এই ফাঁকে এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা সায়ফান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সায়মানের কথাগুলো শুনে শব্দ করে হেসে দিল।
“হাহ্!”
হাসিটা শেষ হওয়ার আগেই,
চড়াস!
আরেকটা থাপ্পড় এসে পড়ল ওর গালে।
সায়ফান চমকে উঠে দুই গালে হাত দিয়ে সামনে তাকাতেই দেখল, মাহবুব রাশিদ রাগে জ্বলজ্বল চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন।
এক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর হঠাৎ করেই সায়ফান গলা ফাটিয়ে কান্নার মতো করে চিৎকার করে উঠল,
“আমার গালটা কি শাহবাগের মোড় পাইসো নাকি!
যখন-তখন ওইখানের মতো আন্দোলন শুরু করে দিচ্ছো!”
কথার সাথে সাথে হাত নাড়াতে লাগল।
“একের পর এক থাপ্পড় বের হয়ে যাচ্ছে আমার গালে! আমি ফর্সা মানুষ, গাল লাল হইলে সবাই বুঝে যায় থাপ্পড়-থাপ্পড় কিছু খাইছি।”
“তার উপর এমন মার যে গালে দাগ বসে যাই! তোমাদের জন্য এখন মনে হচ্ছে আমি কালো হইলেই ভালো হইতাম। কেউ বুঝত না আমার গালে মার খাওয়ার ছাপ!”
হাত দিয়ে গাল চেপে ধরে আরো জোরে বলল,
“মান-সম্মান এমনিতেই যায়, তার উপর এই ফর্সা গালে লাল ছাপ, একদম লাইভ প্রমাণ! কোথায় এখন বউরের লিবিসটিক এর দাগ থাকবে তা, তোমাদের চোড়ের দাগ ছে….”
রাজিব পাশ থেকে মুখ চেপে হাসি আটকাতে চেষ্টা করছিল। শেষে আর পারল না। কাঁধে হাত রেখে বলল,
“ভাই, থাম। শয়তানি কম কর। শয়তানি করিস বলেই আজ এই অবস্থা।”
একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে যোগ করল,
“এখন আবার ঢং করছিস। তুই ভালো হবি না ভাই। চুপ কর না হলে এখন আবার থাপ্পর পড়বে তোর গালে। ”
সায়মান অন্যদিকে কোনদিকে না তাকিয়ে চলে গেল, মাহবুব রশিদ ছেড়ে দেওয়ার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
” রাজিব আর সাইফান দুই জন্য ওদের দেখাশোনা করবা। তোমার ঘাড় ট্যাড়া স্যারের একটু খেয়াল রেখো। ”
” জি স্যার ”
রাজিব উত্তর করল। তারপর রাজীব সাইফানের হাত ধরে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
সায়মান ফ্ল্যাটে এসে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল, একজন গৃহকর্মী কাজ করছে। ঘরে হালকা শব্দ, সায়মান একবার চারপাশে তাকাল।
নাফিসা কোথায়?
চোখ আপনাআপনি খুঁজে নিল ওকে। বসার ঘর, ডাইনিং, কোথাও নেই। আর কিছু না ভেবে সোজা বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
রুমের দরজাটা ভেজানো মতো ঠেলা দেওয়া। হাত দিতেই খুলে গেল। সায়মান ভেতরে ঢুকে দরজাটা আস্তে করে বন্ধ করে দিল।
ঘরটা শান্ত।শুধু শ্বাস-প্রশ্বাসের হালকা শব্দ।
বিছানার দিকে তাকাতেই সায়মান থমকে গেল।
ওর পিচ্চি বউটা গভীর ঘুমে ডুবে আছে। নিজের আরামেই। সায়মানের একটা টি-শার্ট গায়ে জড়িয়ে, যেটা ওর জন্য একটু বড়, তাই ঘাড়টা ঢিলেঢালা হয়ে নেমে এসেছে। কম্বলটা নেমে গেছে হাঁটুর দিকে। ঘুমের মধ্যে নাফিসার মুখে একধরনের নিশ্চিন্ততা।
ঘুমন্ত মুখটা নরম। চোখের পাপড়ি বন্ধ। ঠোঁট একটু ফাঁক।
ওকে দেখে সায়মানের বুকের ভেতর জমে থাকা সারাদিনের ক্লান্তি ধীরে ধীরে গলে যেতে লাগল।সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। শব্দ হলে ওর ঘুম ভেঙে না যায়।
বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল। তারপর খুব সাবধানে নাফিসার কপালের ওপর ঝুঁকে পড়ল। আঙুল দিয়ে ওর কপাল থেকে এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিল। স্পর্শটা এতটাই নরম যে, নাফিসা শুধু নড়েচড়ে উঠল, পুরো জাগল না।
সায়মান একটু নিচু হয়ে ওর গলার কাছে মুখ নামাল। গলায় মুখ গুঁজে ধরে রাখল কিছুক্ষণ। কিছু বলল না। শুধু নিশ্বাস নিল। এই গন্ধটা, এই উষ্ণতাটা, ওর নিজের ঘর।
হঠাৎ নাফিসা নড়েচড়ে উঠে পড়ল। ঘুম ভাঙার আগের চোখ আধখোলা হয়ে গেলো তারপর হঠাৎ বসে পড়ল।
“ DSP সাহেব …?”
চোখ দুটো এখনো ঘোরে ভরা। সায়মান ওর মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
“ঘুম ভাঙাইছি?”
গলা নরম।
নাফিসা কিছু না বলে শুধু তাকিয়ে রইল। যেন বিশ্বাস করতে একটু সময় লাগছে, সত্যিই সে সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
“ আপনি কখন আসেছেন ?”
কণ্ঠে হালকা অভিমান।
“এই তো একটু আগে।”
সায়মান বিছানার কিনারায় বসে পড়ল।
নাফিসা ধীরে ধীরে নিজের চারপাশটা দেখে নিল। তারপর হালকা হাসল।
“সারাদিন খুব বোরিং ছিল।”
সে কথা বলতে বলতে পাশ ফিরল।
“ আপনি এখানে রেখে চলে গেলেন… পুরো ফ্ল্যাটটা ঘুরে ঘুরে দেখেছি। ভালো লাগেনি। এভাবে আমি অভ্যস্ত না। একা থাকতে পারবো না সবার সাথে থাকতে চাই। ”
একটু থেমে বলল,
“সবাইকে খুব মিস করছিলাম।”
সায়মান চুপ করে শুনছিল। বুকের ভেতর কোথাও একটা খচখচ করে উঠল।
( নাফিসার একা ভালো লাগছিল না সেজন্য পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখার পর। তারপর আলমারির কাবার্ড খুলে সায়মানের অনেক জামা আছে। একটা পরে নেই , … হালাল পুরুষের কথা ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ে কখন ঠিক ছিলো না ।)
নাফিসা কথাটা বলে, একটু নড়েচড়ে বসলো সেই সাথে টি-শার্টটা হাটুর আরো উপরে উঠে গেল, একটু এলোমেলো হয়ে গেল সবকিছু সেদিকে তাকিয়ে সায়মান, ধীরে ধীরে নাফিসার দিকে এগিয়ে এল। নাফিসার ধ্যান ভেঙে গেল। দেখল, সায়মান খুব গভীর দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
সায়মান হাত বাড়িয়ে নাফিসার মুখটা দু’হাতে ধরল। খুব আলতো করে। যেন ও ভেঙে যাবে এমন কিছু। তারপর ওর কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। একটু থেমে, আবার।
নাফিসা চমকে গিয়ে বিছানার চাদরটা খামচে ধরল। নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। চোখ তুলে সায়মানের দিকেই তাকিয়ে রইল।
সায়মান ধীরে ধীরে ওর দিকে ঝুঁকে এল। ওর আধরে নিজের অধরও মিশিয়ে দিল। দীর্ঘ চুমু দেওয়ার পর শার্টের বোতাম খুলে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। নাফিসাও ভারী শ্বাস নিচ্ছে, চোখ তুলে সায়মানের দিকেই তাকিয়ে আছে।
সায়মান ধীরে ধীরে নাফিসার দিকে এগিয়ে এসে তার পেটের ওপর হাত রাখল।
পেটের ওপর আলতো করে চুমু আঁকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“শোনো বাবু, তুমি যেই হও, বাবার কথা শুনছ?
প্লিজ তাড়াতাড়ি এসো। তোমার পিচ্চি মাম্মাকে বাবা ঠিক করে আদর করতে পারছে না, শুধু তোমার জন্য।
তুমি বাবার ভালো বাচ্চা হবে, বাবা–মায়ের রোমাঞ্চে মাঝে কখনো বাধা হবে না।
তাড়াতাড়ি চলে এসো, বাবা তোমার অপেক্ষায় আছে…”
সায়মানের কথা শুনে নাফিসার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মাথার ভেতর যেন কিছুই কাজ করল না।
এই লোকটা কী বলছে! একদম পাগল হয়ে গেল নাকি?
সায়মানের দিকে তাকিয়ে ফ্যালফ্যাল করে বলল,
“আপনি… আপনি কি সব বলছেন?”
বলেই নাফিসা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে নিলো।
সায়মান ওর চোখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“এইভাবে আমাকে সিডিউস করছো ইচ্ছা করে, তাই না? জানো আমি কিছুই করতে পারবো না। ”
একটু থেমে গলা নামিয়ে যোগ করল,
“এমন কেন করলে বউ? এখন তো ইচ্ছে করছে তোমাকে আমার নিচে ফেলে আদরে আদরে পিষে ফেলি।”
নাফিসা নিজের দিকে তাকাল। ঢোক গিলল। বুকের ভেতর ধুকপুক করতে লাগল। তাড়াতাড়ি করে বিছানা থেকে নেমে বলল,
“আমি… আমি এখনই চেঞ্জ করছি।”
সায়মান হেসে ফেলল।
“এখন চেঞ্জ করে কী করবে?”
এক ধাপ এগিয়ে এসে বলল,
“আমার ভেতরে যে আগুন জ্বালালে, তাতে তো সব জ্বালিয়ে দিয়েছো বউ। এখন আগুন নিয়ে ভাবো কিভাবে সামলাবে।”
বলেই আলমারি থেকে নিজের জামা-কাপড় তুলে নিল। ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা ধরল। দরজার কাছে গিয়ে পিছন ফিরে নাফিসার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করো। না হলে তোমার DSP সাহেব শাওয়ার নিয়েও হরমোনের জ্বালা মিটাতে পারবে না। ”
এই কথা বলে সায়মান ওয়াশরুমের ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
নাফিসা একা দাঁড়িয়ে রইল। মুখটা টমেটোর মতো লাল।
লজ্জা, তাকাতে পারল না ঠিকঠাক। তাড়াতাড়ি করে নিজের কাপড় চেঞ্জ করল। আয়নার দিকে তাকিয়ে,
“আল্লাহ… এই মানুষটা কী যে করে!”
ওয়াশরুম থেকে শাওয়ারের শব্দ ভেসে আসছে । নাফিসা আর এক সেকেন্ডও ঘরে থাকতে পারল না। চুপিচুপি রুম থেকে বের হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর সায়মান ওয়াশরুম থেকে বের হলো। গায়ে শুধু একটা টাউজার চুল ভেজা। রুমে তাকিয়ে থমকে গেল। নাফিসা নেই।
ভ্রু কুঁচকে গেল।
“এখন আবার কোথায় গেল?”
ড্রয়িং রুমের দিকে এগোতেই দেখল, রাজীব আর সাইফান বসে আছে। সোফায় গা এলিয়ে, আর কিচেনের দিকে তাকিয়ে দেখল, নাফিসা কফি বানাচ্ছে।
সায়মানের মেজাজ মুহূর্তে খারাপ হয়ে গেল।
“এইখানে কী তোদের?”
গলার স্বরটা একটু উঁচু করে বলল,
“কেন এসেছিস এখানে?”
সাইফান চোখ বড় বড় করে মুখ হাঁ করে বলল,
“কি বলো কী ভাই! তুমি আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছ? এত বড় অপমান!”
নাটকীয় ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,
“ঠিক আছে, আমি এখনই চলে যাচ্ছি।”
তারপর আবার বসে পড়ল।
“থাক, একটু পর চা-টা খেয়ে যাই। রেস্ট.. রেস্ট…. নেই। সারাদিন অনেক ধকল গেছে আমার ওপর দিয়ে। হ্যাঁ এখন ভাবছি সেখানে থেকে তারপর বাড়ি যাবো। বাড়িতে গিয়ে করব রাখি বউ নেই তো যে গিয়ে একটু বউকে আদর করবো। আহাহাহা আমার পোড়া কপাল। ”
বলে আহাজারি করতে লাগলো। রাজীব হেসে ফেলে মাথা নেড়ে বলল,
“ভাই, নাটক বাদ দে। কফি খেয়ে যাই।”
যাব মানে, আমি এখানেই থাকব আর কি করার আছে করুক
সায়মান সোফার উপর সোজা ভাবে শুয়ে পড়ল রাজীবের কোলে মাথা রেখে।
সায়মান বিরক্ত চোখে তাকাল দুজনের দিকে। তারপর কিচেনের দিকে গিয়ে নাফিসাকে ধমক দিল,
“তোমাকে আমি কিচেনে যেতে বলেছি এই অবস্থায়?”
“এত পাকনামা করতে কে বলেছে?”
নাফিসা চমকে উঠল। মাথা নিচু করে মিনমিন করে বলল,
“ ভাইয়ারা এসেছে… আমি শুধু কফি—”
“চুপ।”
এক কথায় থামিয়ে দিল সায়মান।
নাফিসার চোখে পানি চলে এলো, কিন্তু কিছু বলল না।
কিছুক্ষণ পর সবাই মিলে একসাথে খেতে বসলো। টেবিলে খাবার সাজানো হলো। নাফিসা চুপচাপ বসে আছে। চোখ তুলে কারো দিকে তাকাচ্ছে না।
সায়মান নিজের প্লেট টানার বদলে নাফিসার প্লেট নিজের দিকে টেনে নিল। হাতে খাবার তুলে ওর দিকে বাড়িয়ে দিল।
“খাও।”
নাফিসা মাথা নেড়ে ফিসফিস করে বলল,
“না… ওদের সামনে—”
“কি সমস্যা?” —— গলা কড়া হয়ে গেল।
“খাচ্ছ না কেন?”
রাজীব আর সাইফান একে অন্যের দিকে তাকিয়ে হাসি চেপে রাখছে।
নাফিসার গাল আবার লাল হয়ে গেল। মনে মনে সায়মানকে হাজারটা কথা শুনাল।
“এ মানুষটা আমাকে লজ্জা দিয়ে মেরে ফেলবে একদিন…”
তবুও মুখে কিছু না বলে চুপচাপ খেতে লাগল সায়মানের হাতে।
সায়মান নিজে হাতে তুলে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি একই সাথে নিজেও খেয়ে নিচ্ছে। খাওয়া শেষে নাফিসা উঠে যেতে চাইলে সায়মান শান্ত গলায় বলল,
“বসো।”নাফিসা উঠতে গিয়েও থেমে গেল। চোখ নামিয়ে আবার চেয়ারে বসল। মুহূর্তখানেক নীরবতা।
হঠাৎ করেই সায়মান উঠে দাঁড়াল। কিছু বোঝার আগেই নাফিসার হাতটা ধরে টান দিল। নাফিসা অবাক হয়ে তাকানোর সুযোগও পেল না, এক ঝটকায় তাকে কোলে তুলে নিল সায়মান।
“আহ—হহহ!”
গলা কাঁপল নাফিসার।
“চুপ,”
খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল সে, হাঁটতে লাগল নিজেদের ঘরের দিকে। নাফিসার এক হাত সায়মানের ঘাড়ে, অন্যটা অজান্তেই ওর বুকের কাপড় চেপে ধরেছে। মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে আছে।
ড্রয়িং রুমে বসে থাকা সাইফান আর রাজীব হা করে তাকিয়ে রইল।
“এইটা… এইটা কি লাইভ সিরিয়াল নাকি?”
সাইফান ফিসফিস করে বলল। ঠিক তখনই সায়মান পেছনে ঘুরে তাকাল।
“চাঁদনী খালাকে বলিস তোদের রুম পরিষ্কার করে দিতে,”
এক নিশ্বাসে বলে ফেলল,
“যার যার রুমে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়বি। আমাকে কোনো রকম জ্বালালে তুলে আছাড় মেরে বাড়ি থেকে বের করে দেব। মনে থাকে যেন।”
বলে আবার সামনে ঘুরে হাঁটা দিল।
সাইফান ঠোঁট বাঁকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। নিজের সাথেই বিড়বিড় করল,
“জানি না মেয়েটার কি অবস্থা করে ছাড়ে। বল দেখি রাজীব ভাই, দেখেছো আমাকে অপমান করে কেন। আমার মতো ভদ্র মানুষ আর একটা পাওয়া যাবে?”
রাজীব হেসে ফেলল।
“না ভাই, তোর মতো ভদ্র ছেলে দুনিয়াতে একটাও মিলবে না। ওয়ান পিস ভাই তুই ।”
সাইফান চোখ সরু করে তাকাল।।
“তুমি আমাকে অপমান করছ না তো?”
“না রে, প্রশংসা,”
রাজীব হাসি চেপে বলল।
“ভেবে নিলাম তাই,”
নাটকীয় ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল সাইফান,
রাজীব হাত নেড়ে দিল,
“আমি গেলাম। আমার জানেমান বউটার সাথে সারাদিন কথা হয়নি। এখন একটু কথা বলব।”
সায়ফান ও হাত নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ হ্যাঁ যাও,”
“দেখি আমিও রুমে গিয়ে আমার আনরোমান্টিক চশমা আপাকে ফোন দিয়ে একটু রোমান্টিক হতে পারি কিনা।”
ড্রয়িং রুম ফাঁকা হয়ে গেল।
ঘরের দরজা বন্ধ করেই সায়মান নাফিসাকে নামিয়ে দিল না। সোজা বেলকনির দিকে এগোল। বেলকনিতে ঝুলছে কাঠের দোলনাটা নরম কুশনে মোড়া,বাতাসে ও চাঁদের আলোতে আলতো দুলছে।
সায়মান ধীরে নাফিসাকে নিজের কোলে বসিয়ে দিল দোলনার ওপর। নিজে বসে ওকে সামনের দিকে টেনে নিল। এখনো তার গায়ে শুধু ট্রাউজার। দোলনাটা হালকা দুলছে। নাফিসা মাথা নিচু করে বসে আছে।
“কফি বানাতে গিয়েছিলে কেন?”
হঠাৎ জিজ্ঞেস করল সায়মান, গলা নরম।
নাফিসা একটু থেমে বলল,
“ভাইয়ারা এসেছে… খালি হাতে বসে থাকলে খারাপ লাগছিল।”
সায়মান উত্তর দিল না। এক হাত ধীরে নাফিসার পেটের ওপর রাখল। ছোট্ট, নরম একটা উঁচু ভাব। সেই স্পর্শে নাফিসা কেঁপে উঠল।
“এখানে…”
নিজের সাথেই বলল সায়মান,
“এখানে একটা প্রাণ আছে ভাবলে এখনো অবাক লাগে।”
নাফিসা ধীরে চোখ তুলল।
“হুম”
সায়মান নিজের হাত নাফিসার পেটের ওপর খুব যত্নে বুলিয়ে দিচ্ছে। নাফিসা মাথাটা সায়মানের বুকে ঠেসে দিয়ে চুপচাপ বসে আছে।
সায়মান ধীরে কপালে চুমু দিল, তারপর নরম কণ্ঠে গানটা শুরু করল,
সায়মান গুনগুন করে:
“কঠিন, তোমাকে ছাড়া একদিন…♥
কাটানো একরাত, বাড়াও দু’ হাত
হয়ে যাও আজ বাধা বিহীন।
বল, কবিতা হয়ে চল…♥
বাগানে দাবা নল জমানো জল
ছড়ায় যেমন ঠিকানাহীন।
চেয়েছি যতবারি
হয়েছে ছারাছারি
মরেছি ততবারি
এসেছে এক বেদনা দিন…
কঠিন, তোমাকে ছাড়া একদিন…♥”
নাফিসা চোখ বন্ধ করে স্বর শোনে। তার হাতটা সায়মানের হাতের সাথে মিশে গেছে। দোলনাটা হালকা দুলছে।
সায়মান আরেকবার মাথা নিচু করে নাফিসার কপালে চুমু দিল। তার হাতে এখনও নাফিসার পেটের কোমল বুলানো।
“এক চিলে কোঠায়
তোমায় দেখেছিলাম
ঝুল বারান্দাটায়
কত ভুল চুক একেঁছিলাম…
ও, গড়েছি সোজা বনে
পড়েছি কোন আগুনে
চলেছি শুনে শুনে
তোমার আমার অন্তবিহীন…
কঠিন, তোমাকে ছাড়া একদিন…♥”
নাফিসা হালকা করে সায়মানের হাত ছুঁয়ে উত্তর দেয়।
“কম হলে ও হউক
আমাদের দেখাশুনা
সেই চোরা চমক
ছাপোষা ও আনমনা…
চেয়েছি যতবারি, হয়েছে ছারাছারি
মরেছি ততবারি
এসেছে এক বেদনা দিন…♥”
নাফিসা আরেকবার তার হাত সায়মানের হাতে রেখে মাথা বুকে ঠেসে দিল। সায়মান নরমভাবে নাফিসার পিঠের দিকে হাত বুলিয়ে গান শেষ করল। সুখেন নাফিসার অজহরের নিজের অধর মিলিয়ে দিলে।
সকালের আলোটা আজ বেশ নির্লজ্জভাবেই ঘরে ঢুকে পড়েছে। জানালার ফাঁক গলে রোদের নরম রেখা বিছানার চাদরের ওপর ছড়িয়ে আছে। পর্দা নড়ছে হালকা বাতাসে।
সায়মান অনেকক্ষণ পর চোখ খুলল। ঘড়িতে তাকিয়ে হালকা ভ্রু কুঁচকে গেল। বেশ বেলা হয়ে গেছে। তবু আজ কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। দীর্ঘদিনের ছুটি নিয়েছে সে। নাফিসা পাশে ঘুমিয়ে। ঘুমের মধ্যেও তার মুখটা শান্ত। সায়মান আলতো করে তার দিকে ঝুঁকে তাকাল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শান্তি।
নাফিসাও ধীরে ধীরে চোখ মেলে। প্রথমে বুঝতে পারে না সকাল না দুপুর। জানালার আলো দেখে বুঝে যায়, ঘুমটা বেশ লম্বা হয়েছে। সে পাশ ফিরে সায়মানের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।
“কতটা বাজে?” নাফিসার গলা ঘুমঘুম।
“সময় নিয়ে ভাবার দরকার নেই,” সায়মান নরম গলায় বলল,
“আজ আমরা রুমেই থাকব।”
নাফিসা কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ আবার চোখ বন্ধ করল।
অন্যদিকে, সায়ফান ডাইনিং গায়ে শুধু থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট, খালি গা, এক হাতে কফির মগ, আরেক হাতে মোবাইল। সোফার ওপর হেলান দিয়ে বসে আছে। কফিতে চুমুক দিতে দিতে চারপাশে তাকাল।
বেশ বেলা হয়ে গেছে। খাওয়াদাওয়া শেষ। রান্নাঘর ফাঁকা, টেবিল পরিষ্কার। রাজিব সকাল সকাল উঠে খেয়ে বাসার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছে। সেও ছুটি নিয়েছে, স্যারের সাথে সাথে। পুরো বাসাটাই যেন আজ একটু ঢিলেঢালা।
সাইফান গা এলিয়ে দিয়ে কফির শেষ চুমুকটা নিল। এমন সময়,
টিং টং!
কলিংবেলের শব্দে সাইফান চমকে উঠল। ভ্রু কুঁচকে এদিক-ওদিক তাকাল। কাউকে দেখল না।
“এত সকালে আবার কে?” নিজেই বিড়বিড় করে বলল।
কফির মগটা টেবিলে রেখে উঠে দরজার দিকে গেল। দরজার লক খুলে দরজা খোলার মুহূর্তেই,
একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ল একদল মানুষ।
জারিন, রিশা, রিদওয়ান, রাহিল, রুহি আর রায়হান,, হুলস্থুল করে ঢুকে পড়ল ভেতরে।
“এই এই এই—” বলার আগেই সাইফান ভারসাম্য হারিয়ে চিতপতঙ্গ হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল।
“ও আল্লাহ গো….. ও মা গো…. !”
মাজা ধরে কাতর গলায় চিৎকার করে উঠল সাইফান,
“এই সব বানরের দল কোথা থেকে ঢুকে যাচ্ছে বাসায়! আমার মাজাটাও ভেঙে দিল রে!”
ওরা সবাই একসাথে থমকে তাকাল, তারপর মুহূর্তেই হেসে ফেলল।
সাইফান মাজা চেপে ধরে কষ্ট করে উঠে দাঁড়াল। মুখটা বিকৃত করে জোরে জোরে ডাকতে লাগল,
“ভাই এ ভাই! সায়মান ভাই! আমার মাজা ভেঙে দিল এরা কই তুমি !”
তারপর আবার বলে উঠল,
“মাজা ভেঙে গেলে আমি ঠিক করে বাসার করতে পারব না তো ভাই!”
এই কথা শুনে ওদের হাসি আরও বেড়ে গেল।
সাইফান জারিনের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল,
“এই শালী চশমা! তুই হাসছিস কেন? তোরই কপাল পুড়বে আমার মাজা গেলে, তোর লস! বাসর শুরু করার আগে উইকেট পড়ে যাবে। ”
জারিন সঙ্গে সঙ্গে রেগে গেল। চোখ বড় বড় করে বলল,
“মুখের লাইসেন্স ঠিক কর! এখানে সবাই আছে, ছোট বাচ্চারাও আছে!”
সবাই ওদের দুজনের দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে রইল। পরিস্থিতিটা আরও বিব্রতকর হয়ে উঠল।
এই সুযোগে রায়হান সাইফানের দিকে এগিয়ে এসে হালকা ঠাট্টার সুরে বলল,
“ওই তালে তালে টেম্পু চালাচ্ছিস দুইটা!”
হাসতে হাসতে পাশে দাঁড়াল।
“কিরে, কী চলে এখানে?”
জারিনকে সঙ্গে সঙ্গে রিশা আর রুহির হাত চেপে ধরল। লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল জারিন ।
সাইফানও লজ্জা পাওয়ার ভান করে বলল,
“ভাই, তুমি আর রুহি যেরকম তলে তলে টেম্পু চালিয়ে এখন বিয়ে করেছ, ঠিক সেই রকম ভাবেই!”
রায়হানের মুখটা মুহূর্তেই চুপসে গেল। সে কিছু বলল না, শুধু কাশির ভান করল।
ঠিক সেই সময়,
রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো সায়মান আর নাফিসা।
নাফিসাকে দেখামাত্রই ওদের সবার চোখ চকচক করে উঠল। একসাথে প্রায় সবাই এগিয়ে আসতে লাগল।
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫৬
“ভাবি—”
“নাফু —”
“কেমন আছ—”
একসাথে সবাই এগিয়ে আসতে দেখে সায়মান এক হাত তুলে কঠিন গলায় বলল,
“স্টপ।”
সবাই থেমে গেল।
ঘরটা হঠাৎ শান্ত হয়ে এলো। নাফিসা একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, আর সায়মান ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে এসে সবার দিকে তাকাল।

R Opekka sohe.nh
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সবগুলো পর্ব দিয়ে দিয়েন, এত অপেক্ষা কিন্তু ভালো লাগেনা, আমার আবার ধের্য্য কম, তাই আমার মতো অধৈর্য্য ব্যক্তিকে দয়া করে ধৈর্য শেখানোর ক্লাস করাবেন না। ধন্যবাদ।