Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ২১

জাহানারা পর্ব ২১

জাহানারা পর্ব ২১
জান্নাত মুন

গভীর রাত, সমস্ত ধরণী অন্ধকারে তলিয়ে আছে। আমি অটো ভারা মিটিয়ে রাস্তার পাশে দাড়ালাম। স্ট্রিট লাইটের হলদে আলোয় স্পষ্ট দৃশ্যমান গেইটের উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। আমি সেই দিকটায় বেশ কিছুক্ষণ এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলাম। অতঃপর গেইটের ভেতরে প্রবেশ করলাম। হাসপাতালের প্রতিটি ইউনিটের কোণায় কোণায় লাইট জ্বালানো। মানুষ এখান থেকে ওখানে ছোটাছুটি করছে। আমি আর সময় নষ্ট করলাম না। এদিক ওদিক একবার তাকিয়ে কালো বোরকার উপর পড়া কালো হিজাব ওড়নাটা দিয়ে মুখটা আরেকটু আড়াল করে নিলাম।

হাসপাতালের নতুন ভবনের দোতলার ২০৫ নাম্বার রুমে I CU তে ভর্তি ইফান চৌধুরী। কক্ষের সামনে চেয়ারে বসে আছে নাবিলা চৌধুরী,নুলক চৌধুরী আর ইমরান। বাকিরা হয়তো হাসপাতালের বিভিন্ন ফর্মালিটি নিয়ে ব্যস্ত। এদিকে ক্লান্ত হয়ে তিনজনই ঝিমাচ্ছে। আমি সেই সুযোগটায় ব্যবহার করে তাড়াতাড়ি I CU কেবিনে ঢুকে পড়লাম। আস্তে করে দরজাটা লাগিয়ে সামনে তাকাতেই চোখ পড়লো হসপিটাল বেডে অচেতন পরে থাকা ইফান চৌধুরীর উপর। ইফানকে বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল চিকিৎসা প্রধান করা হচ্ছে। সময়ের স্বল্পতার কারণে দেশের বাইরে নেওয়া সম্ভব হয় নি। পুরো ICU কেবিন অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামে ভরপুর।

ইফানের মুখে অক্সিজেন মাস্ক,দু হাতে ক্যানুলা লাগানো এখনো শরীরে রক্ত আর সেলাইন চলছে। ইফানকে এই অবস্থায় দেখে ভীষণ শান্তি লাগছে। কিন্তু এখানে বেশি দেরি করা যাবে না। কিছুক্ষণ পর পর কেবিনে ডক্টর আর নার্স আসা যাওয়া করছে। তাই আমাকে যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। আমি এগিয়ে গেলাম বেডের কাছে। আস্তে করে ওর অক্সিজেন মাস্কটা খুলে দিলাম। সাথে সাথেই ওর শ্বাসকষ্ট ভেসে উঠলো। পরক্ষনেই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় তার বুক উঠানামা শুরু করেছে। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে লাইফ‑সাপোর্ট যন্ত্রগুলোর মনিটরের দিকে তাকালাম। প্রত্যেকটি স্কিনেই গ্রাফ স্পন্দন খুব ফাস্ট চলা শুরু করেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্পন্দনগুলো ধীরে ধীরে একেবারে স্থির হয়ে যায়। আমি আবার তাড়াতাড়ি তাকালাম ইফানের দিকে। না সে আর মুভ করছে না। আর শ্বাস নেওয়ার বৃথা প্রয়াস চালাচ্ছে না। অবশেষে পৃথিবীর বুক থেকে মুচে দিলাম ইফান চৌধুরী নামক এক পাপিষ্ঠ পুরুষ কে।

আমি ইফানের মুখের উপর কিছুটা ঝুকে পড়লাম। মনযোগ দিয়ে তাকে দেখতে লাগলাম। আজ আমার এতদিনের সাধনা পূরণ হয়েছে। আমি ইফানকে শেষ বারের মতো বিদায় দিয়ে কিছু বলতে যাব ঠিক তখনি দরজায় খুব জুড়ে জুড়ে করাঘাত হতে থাকে। বাইরে থেকে ভিষণ চেঁচামেচি করছে। আমার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা আবার মিলিয়ে যায়। সবাই তো চলে এসেছে এখন আমি কিভবাে কেবিন থেকে বেরিয়ে যাব। এসব ভাবতে ভাবতেই দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমি চটপট করতে করতে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকলাম। না তবুও ভিষণ কষ্ট হচ্ছে। তখনই আমি আচমকা শুয়া থেকে উঠে বসে পড়লাম। কেমন যেন বুকের ভেতর ধকধক করছে। অন্ধকার রুম,টিকটিক শব্দ করে ঘড়ির কাঁটা ১টা বেজে ২৫ এর ঘরে এসেছে। আমি বুকে হাত রেখে হাঁপিয়ে চলেছি। দিন দুনিয়ার কোনো কিছুই এই মূহুর্তে আমার মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পারছে না। বেশ কিছুক্ষণ পর বাস্তবতায় ফিরলাম। হাঁপাতে হাঁপাতেই এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলো আলগোছে কানে গোজে অস্পষ্টভাবে বিরবির করলাম,
–“এটা বাস্তব না? আমি কি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম!”

তখনই দরজায় একাধারে হওয়া করাঘাতের শব্দ কানে পৌঁছায়। দরজার বাইরে থেকে পলি আর ইতির কোন্দনরত গলা ভেসে আসছে। দুজনেই বারবার বলে যাচ্ছে,
–“জাহানারা ভাবি তাড়াতাড়ি দরজা খোল সর্বনাশ হয়ে গেছে।”
–“বড় ভাবি বের হও। আল্লাহ গো আমার ভাইরে বাঁচাও,,,,,,”
ওদের অস্বাভাবিক ডাকাডাকি শুনে আমি আর কিছু ভাবতে পারলাম না। এক ছুটে রুমের লাইট অন করে দরজা খুলে দিলাম। সাথে সাথেই আমার বুকে হামলে পড়লো ইতি। পলি আচল দিয়ে মুখ ঢেকে ফুুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। ইতি জোরে জোরে হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে শুধু এইটুকুই বলছে,

–“ভাবি ভাইয়া…..আ..আমার ভাইয়া…”
অতিরিক্ত কাঁদার ফলে কিছু বলতেও পারছে না মেয়েটা। আমারও ভিষণ টেনশন হতে লাগলো কি হয়েছে? আমি প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে পলির দিকে তাকালাম। সেও বলার মতো অবস্থায় নেই।
–“আরে তোমরা এভাবে কাঁদছ কেন? কি হয়েছে বলবে তো না কি?”
–“ভা ভাইয়া…”
আবার হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে এইটুকু বললো ইতি। তবে ভাইয়া কথাটা শুনেই সন্ধ্যার কথাটা মাথায় চলে আসে। ইমরান অনেক চিন্তিত হয়ে বাসা থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যায়। আচ্ছা ছেলেটার আবার কিছু হয়নি তো? ভেবেই চিন্তিত হয়ে পলির দিকে তাকিয়ে তাকে জিগ্যেস করলাম,

–“ইমরানের কি কিছু হয়েছে পলি?”
ঐদিক থেকে পলির আওয়াজ আসতে পারলো না। তার আগেই নিচ থেকে সোরগোল কানে আসে। আমি ওদের দু’জনকে রেখেই ঝটপট নিচে নামলাম। এসেই দেখি ইকবাল চৌধুরী ও ইরহাম চৌধুরী বাসা থেকে বেড়িয়ে গেল। অনেকটাই দৌড়াতে দৌড়াতে। এদিকে কাকিয়া মনিরা বেগম আর দাদি রোকেয়া বেগম হাউমাউ করে কেঁদে ভাসাচ্ছে। এরই মাঝে নাবিলা চৌধুরী আর নুলক চৌধুরীও রেডি হয়ে তাড়াহুড়ো করে বেড়িয়ে এসেছে। হঠাৎ করেই দাদি আমাকে দেখতে পান সিঁড়ির কাছে। তৎক্ষণাৎ ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে বিলাপ জুড়ে দিয়েছে।
–“নাত বউরে, তর কি হইবো রে বইন? আমার নাতির যে আল্লাহর ডাক পড়সে। আল্লাহ আল্লাহ গো আমার নাতির জান ভিক্ষা দেও গো…”
দাদির বিলাপে এবার সামিল হলো কাকিয়া। তিনিও ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলতে লাগলো,

–“আল্লাগো এই বয়সে এতটুকু মেয়েটারে বিধবা বানিও না গো আল্লাহ। জাহানারা মা রে এভাবে চুপ করে থেকো না মা। এতে মনের উপর আরও চাপ পড়বে। একটু কেঁদে আল্লাহ কে ডাক মা। স্ত্রীর দোয়া আল্লাহ বেশি কবুল করে।”
আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। তবুও যতটুকু বুঝলাম ইফান চৌধুরীর সাথে কিছু একটা হয়েছে। তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে গেলো একটু আগের স্বপ্নের কথা। তখন তো আমি ইফানকে খা’রাপ অবস্থায় দেখেছি। আচ্ছা তার সাথে সত্যিই খা’রাপ কোনো কিছু হয়নি তো। এটুকু ভাবতেই আমার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। এতো ভালো একটা নিউজ পেলাম আল্লাহ কে ধন্যবাদ জানাবো না? অবশ্যই জানাবো। তাই মৃদু স্বরে বলে উঠলাম,
–“আলহামদুলিল্লাহ।”

তারপর সামনে তাকাতেই চোখ পড়লো নাবিলা চৌধুরী আর নুলক চৌধুরীর তীক্ষ্ণ চাউনিতে। উনারা তড়িঘড়ি করে চলেই যাচ্ছিল। কিন্তু দাদি আর কাকিয়ার ডাকে আমাকে লক্ষ করেই থেমে যায়। তখন থেকে একইভাবে দুজন এভাবে তাকিয়ে আছে। আশ্চর্য বিষয়, আমি এখনো কিছু বুঝতেই পারলাম না কি হয়েছে? আর উনারা আমাকে এমন সুক্ষ্ম নজরে দেখছে। আচ্ছা উনারা কি ভাবছেন যা হয়েছে তার জন্য আমিই দায়ি? এসব ভাবনার মাঝে মনে আরেকটা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। এই যে, “দাদা, কাকিয়া, পলি এবং ছোট্ট ইতিও কাঁদছে ইফানের জন্য। অথচ নাবিলা চৌধুরীর চোখে অশ্রু কণার ছিটেফোটাও নেই। কি সাংঘাতিক মহিলা ছেলের জন্যও নিজের চিরচেনা সত্তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না।”

এরই মাঝে গটগট করে সদর দরজা দিয়ে বেড়িয়ে গেলেন নাবিলা চৌধুরী। উনার অ্যাটিটিউড দেখে আমি চোখ উল্টে আরেক পাশে তাকাতেই চোখ আটকালো নুলক চৌধুরীর দিকে। তিনি এখনো আমার দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে আছে। উনার ক্ষেত্রেও একই ব্যপার। আগের ন্যয় অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে। উনি কি ভাবেন আমি উনার এমন দৃষ্টিকে ভয় পাই?
❝F*u*ck her thoughts, হাহ্।❞
মনে মনে অ’শ্রাব্য এক গা’লি দিয়ে আমিও একই ভাবে উনার চোখে চোখ রাখলাম। আমাদের দুজনের সাথে যেন স্নায়ু যুদ্ধ চলছে। অথচ আমাদের দু’জনের মধ্যে কউই জানতে পারলাম না, আমাদের অগোচরে কোনো একটি সুপরিচিত মুখে পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠেছে।

নুলক চৌধুরীও এবার তারাহুরো করে বেড়িয়ে গেলন। এদিকে বাড়ির সবাই আমাকে ঘিরে মরা কান্না জুড়েছে। আমি এত তাড়াতাড়ি কখনো ঘুমিয়ে পড়ি না। যেহেতু গত রাতে এত চাপ গেছে। তারপর সারাদিন শরীরও জ্বরে হালকা গরম ছিলো। তাই ক্লান্তিতে ১১টার দিকেই চোখ লেগে গিয়েছিল। আর আজই এত ভয়ানক স্বপ্ন দেখলাম।
সবাই মিলে আমাকে সবটা জানালো কিছুক্ষণ আগে ইফানের অনেক বড় একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে। এখন নাকি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে আছে। ইফানের জন্য বিন্দু মাত্রও কষ্ট অনুভব হচ্ছে না। তখনই মনের একটা কোণ থেকে কেউ বলে উঠলো,

–“সে যেমনই মানুষ হোক তোমার স্বামী…”
এই টুকু বললো কি বললো না, তার মধ্যেই মনের আরেক প্রান্ত থেকে তাচ্ছিল্য করে বলে উঠলো,
–“সাবধান জাহানারা। স্বামী তো দূর ওকে মানুষ মনে করলেও তোমার শিক্ষায় বাধবে। ও নি*কৃষ্ট, জানো*য়ার,খু*নী, রে*পি*স্ট। ওকে তুমি এই জীবনে কখনোই ক্ষমা করবে না।”
মনের বাকন্দিতায় যখন বুদ হয়ে আছি তখনই কানে এসে বাড়ি খায় একটা অস্বাভাবিক শব্দ। আমি সেই শব্দকে অনুসরণ করে বাম দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম সোফার এক কোণে বসে আছে নোহা। তার হাতে অ্যাপেল কোম্পানির iphone সিক্সটিন প্রোম্যাক্স। তবে ব্যাক কাভারে কোন বেডার জিম করা পেশিবহুল উদলা পিক। সেটাও বড় কথা না। মেয়েটা এমন আশ্চর্য রকমের আওয়াজ করছে কেন? আমি গিয়ে ওর সামনে দাড়ালাম। চোখ ছোট ছোট করে ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম,

–“কি সমস্যা? এরকম অদ্ভুত আওয়াজ করছ কেন?”
আমার গলা শুনে চোখ উপরে তুললো। নাকে একটা টিস্যু গুজে ফোনে নিজেকে ভালোভাবে দেখে ক্লিক করে একটা সেলফি তুলে নিলো। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে আবার নাক টেনে টেনে গলা থেকে ঐ অদ্ভুত শব্দ বের করলো।
–“ই ই ই।”
বিরক্তি তে মুখ দিয়ে “চ” বর্গীয় শব্দ বেরিয়ে আসলো,

–“এই মেয়ে মুখ দিয়ে এরকম উদ্ভট আওয়াজ বের করছ কেন?”
আমার কথা শুনে আবার একই ভাবে আওয়াজ বের করলো নোহা। অতঃপর নেকামি স্বরে উত্তর দিলো,
–“আমার বেইবিটা হসপিটালে ভর্তি তাই অনেক কান্না পাচ্ছে।”
এবার এমন শব্দের কারণ বুঝতে পেরে নাক ছিটকে বলে উঠলাম,
–“আর আমি ভেবেছিলাম কষা হয়েছে। তাই এমন করে কু*তাচ্ছ।”

আমার কাথা মেয়েটা শুনলো কি শুনলো না কি জানি? সে আবার মনযোগ দিয়ে ঐরকম শব্দ বের করতে করতে নাকের টিস্যু টা চেইঞ্জ করে আরেকট নিয়েছে। আবার নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে তো সেলফি তুলছে। আমি যা বুঝার বুঝে গেলাম। নিশ্চয়ই এর মাথায় গন্ডগোল আছে। না হলে নিজের মায়ের পেটের ভাই হাসপাতালে দম যায় যায় অবস্থা। আর সে এসব করছে। আমার আর ভালো লাগছে না। এদিকে বাড়িতে যারা থেকে গেছে তারা বিলাপ করে কেঁদে ভাসাচ্ছে। তাই আর এখানে এক দন্ড থাকতে ইচ্ছে হলো না। আবার সিঁড়ির উদ্দেশ্য পা বাড়াবো তখনই নোহার নেকামি কন্ঠ কানে আসে।
–“প্রিটি গার্ল আমার ভিষণ কষ্ট লাগছে। এই মূহুর্তে ভালো সেড সং শুনলে মন ভালো হয়ে যাবে। কয়েকটি সেড সংয়ের নেইম বল তো।”
এই মেয়ে টা কি লেভেলের বোকা*চো*দা ভাবতে পারছেন? অন্তত আমি ভাবতে পারছি না। তাই চোয়াল শক্ত করে দাঁত দাঁত চেপে প্রতিত্তোর করলাম,
–“তোমার দুঃখ কমাতে নারগিচ আপার গানই বেস্ট।”
আমি আর কোনো দিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করলাম না। আর সোজা উপরে যাওয়া ধরলাম। আমি নিজের রুমে যেতে যেতে শুনতে পেলাম নোহা ই ই আওয়াজে নাক টেনে কান্না করে নারগিচ আপার বেগুনওয়ালা গানটা শুনছে।

–“Goodbye. My Dear ফা*কিং বুলবুলি।”
ইফানকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে ডোর ক্লোজ করার সাথে সাথেই তার বাক্যটাও শেষ হলো। এতক্ষণের নিভু নিভু চোখগুলো তার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এম্বুলেন্সের ভেতরে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা আরম্ভ করে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক দেওয়া হয়। ডক্টর তার পালস চেক করতে থাকেন বার বার। কারণ সময়ের সাথে সাথে র’ক্ত চলাচল ও হৃৎস্পন্দন কমতে থাকে। ইতোমধ্যে চৌধুরী বাড়িতে খবর চলে গেছে। তাই ডক্টররা ইফানকে যথাসম্ভব প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হসপিটালের ICU তে নিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখার নিদারুণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যত সময় যাচ্ছে ততই ডাক্তারদের মুখ অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। তারা ভিষণ শঙ্কিত আধও কি ইফান চৌধুরীর বন্ধ চোখগুলো আবারও খুলে পৃথিবীর আলো দেখতে পারবে কিনা? নাকি এই পাপিষ্ঠ পুরুষ অকালে ঝরে পড়বে পৃথিবীর বুক থেকে?

দশমিনিট আগে ইফান আর পঙ্কজ কে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ICU অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়।তবে ড্রাইভার ফারুক কে হসপিটালে আনার পথেয় সে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে। চৌধুরী বাড়ির কর্তা কর্তৃরা হসপিটালে পৌঁছেছে আরও বিশ মিনিট পর। কারণ উত্তরা থেকে মেডিকেল হসপিটাল বেশ কিছু টা দূরে। তারা সকলে ICU অপারেশন থিয়েটারের বাইরে অপেক্ষা করছে।পুরো দের ঘন্টার পর অপারেশন থিয়েটার থেকে বেড়িয়ে আসে একজন ডক্টর। উনাকে দেখেই সকলে এগিয়ে উদগীব হয়ে জানতে চায় ইফানের অবস্থা।ডাক্তারের মুখ আরও অন্ধকার হয়ে যায়। তবুও তিনি ইকবাল চৌধুরীর সামনে দাড়িয়ে জানালেন,

–“স্যার পেসেন্টের অবস্থা ক্রিটিক্যাল। তবে যতটুকু দেখে এসেছিলাম মি. পঙ্কজকে তাতে বুঝা গিয়েছে বডিতে অনেক আ’ঘাত পেয়েছে। কিন্তু মি. ইফান চৌধুরীর বডিতে তেমন অ’ঘাত না লাগলেও মাথায় প্রচুর আ’ঘাত পেয়েছে। এখনো পুরোপুরি র’ক্তক্ষরণ বন্ধ করতে সক্ষম হইনি আমরা। আমাদের আরও কিছু সময় দিতে হবে। তবে এইটুকু বলে রাখবো সকল পরিস্থিতির জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকবেন।
ডাক্তার দ্রুত কথা বলেই আবার অপারেশন থিয়েটার কেবিনে ঢুকে পড়ল। এদিকে সকলেই ভেঙে পড়েছে। এই যে নাবিলা চৌধুরী এতক্ষণ এতটা শক্ত ছিলেন। আর এখন ডাক্তারের শেষ কথা শুনার পর পরই চোখ দিয়ে একফোটা নোনাজল গড়িয়ে পড়েছে।

নিশুতি রাত, ঘড়ির কাটা ঘুরতে ঘুরতে ৩টা বেজে ৪৭ মিনিটে পৌছেছে। যখন থেকে জানতে পারলাম ইফানের এ’ক্সিডেন্ট হয়েছে তখন থেকেই রুমে পায়চারী করে যাচ্ছি।মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না এটা কি আসলে এক্সিডেন্ট নাকি প্ল্যান। ভাবনার ইতি টানলাম ফোনের কর্কষ আওয়াজে। তাড়াতাড়ি কলটা রিসিভ করে বেলকনিতে চলে আসলাম।
–“হ্যালো! কি খবর?”
ঐপাশের ব্যক্তি আমাকে বেশ কিছু সময় একনাগাড়ে বলে গেল যা আমি ছাড়া কাকপক্ষীও শুনতে পাইনি। কিন্তু অপর প্রান্তের কথা শুনে আমার চেহারায় চিন্তার ভাজ পড়ে। আমি আনমনেই ফোনকলের ঐ পাশের ব্যক্তির উদ্দেশ্য বললাম,

–“প্ল্যানে এ’ক্সিডেন্ট তো ছিলো না। তাহলে কিভাবে হলো এটা?”
আমি বলতে বলতেই পিছনে ঘুরি। তখনই দেখতে পাই রুমের দরজার ওপাশ থেকে একটি ছায়া সরে গেছে। অদ্ভুত লাগে এই বিষয় টা। বিয়ে করে আসার পর থেকেই আমার সাথে এমনটা হচ্ছে। যখন মনে হয় কেউ একজন আছে তখনই তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজা খুলে দেখি কেউ নেই। রুমের আশপাশ একদমই শূন্য। আজ খুব ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেলাম। তারপরই আচমকা দরজা খোলে যাকে দেখলাম তাকে কখনো কল্পনায় করি নি। তারমানে এতদিন বাড়ির কাজের মেয়ে লতা কান পেতে দাড়িয়ে থাকতো। আমাকে থা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লতা চোখের পানি মুচে কান্না জড়িত গলায় বললো,

–“জাহানারা আপা নিচ থেকে আমাকে পাঠিয়েছে বড় আম্মা। হাসপাতাল থেকে খবর এসেছে ইফান দাদাবাবুর অবস্থা বেশি বালা না।ঐ অপেরেশন ঘর আইশুতে আছে।”
লতার কথায় কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উত্তর করি,
–“ঐটা অপারেশন আর আইসিইউ হবে।”
লতার কথায় আমি ভুল ধরায় কিছুটা ল’জ্জা পেল।
–“আইচ্ছা আপা আমি তাইলে যাই।”
–“কখন থেকে আমার রুমের সামনে দাড়িয়ে ছিলে?”
লতা যখন চলে যাচ্ছিল তখনই আমি প্রশ্ন ছুড়লাম। সে আবার পিছন ফিরে চোখ মুচতে মুচতে বললো,
–“এইতো আপা আপনিও দরজা খুলসেন আমিও এসে থামলাম রুমের সামনে। কিন্তু ডাক দেওয়ার আগেই আপনি দরজা খুলে দিসেন।”

আমি ওর কথায় হালকা ঠোঁট প্রসারিত করে স্বাভাবিক ভাবে জিজ্ঞেস করলাম,
–“লতা তুমি এখানে আসার আগে আশেপাশে কাউকে দেখছ?”
লতা কয়েক সেকেন্ড ভেবে বললো,
–“উমমম না তো আপা। হগ্গলেই তো ডয়িং রুমে বয়া আছে।”
–“ঠিক আছে তুমি যাও।”
লতা মাথা নাড়িয়ে চলেই যাচ্ছিল তখনই আমি আবার পিছু ডাকলাম,
–“আ ঐটা ডয়িং রুম নয় ড্রয়িং রুম হবে।”

জাহানারা পর্ব ২০

লতা কান্নার মধ্যেই দাঁত কেলিয়ে দিলো। ল’জ্জায় তার কান দিয়ে ধোঁয়া ছুটছে। সে আর এখানে দাঁড়ালো না তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে গেলো। আমি তার যাওয়ার পানে চেয়ে। মেয়েটার বয়স আর কত হবে এই ২৮ কি ২৯। দারিদ্র্যতার কারণে অল্প বয়সে মা বাবা বিয়ে দিয়ে দেয়। আর বিয়ের পরেও সুখ হয় নি। জামাই জুয়া*খেলে সব অর্থ নষ্ট করে দিয়েছে। তারপর প্রতিদিন রাতে মদ খেয়ে বাড়িতে এসে লতা কে মা’রধর করতো। কয়েক বছর সংসার করার পর জন্ম নেয় একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তান। মেয়ে হওয়ায় লতাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় তার জামাই। তারপর আশ্রয় নেয় তার মায়ের কাছে। বাবার বাড়ি অবস্থা ভালো না হওয়ায় ভাই বউরা উঠতে বসতে খোটা দিতো। সেই জ্বালায় বৃদ্ধা মার কাছে পাঁচ বছরের মেয়ে কে রেখে দিনের পর দিন এই বাড়িতে কাজ করে চলছে।
এইসব ভেবেই ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে রুমে ডুকে আবার দরজা লাগিয়ে দিলাম। আমার কাছে এই চৌধুরী বাড়িটাকে অশরীরীর মতোই লাগে। যত তারাতাড়ি এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া যাবে হয়তো ততই আমার জন্য মঙ্গল।

জাহানারা পর্ব ২২