জাহানারা পর্ব ৪৯
জান্নাত মুন
ক্লাস থেকে স্যার বেড়িয়ে আসতেই সকল ছাত্রছাত্রী কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হৈ-হুল্লোড় করতে করতে বেড়িয়ে আসলো।জুই তার প্রাণের দুই সখী মিনা আর সোমার হাত ধরে গল্প করতে করতে ক্লাস রুম থেকে বেরোচ্ছে।ঘড়ির কাটা বেলা চারটায়।মিনা জুইকে বললো,
–“চল দোস্ত ফুচকা খাই।”
বাক্যটা বলেই মিনা ঢুক গিললো।সোমা মিনার কথা শুনে সায় জানিয়ে বললো,”হ দোস্ত, চল গিয়ে ফুচকা খাই।”
সোমা আর মিনার জিহ্বে জল এসে পড়েছে। দুজনের চোখমুখ খুশিতে ঝিলিক দিচ্ছে।জুই একটু ভেবে বললো,”গতকালও তো খেলাম।আজ আর ফুচকা খেতে মন চাইছে না রে।”
মিনা তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো, “তাহলে তুই কি খাবি।তুই যা খাইবি আমরাও তা খাব।” মিনার কথায় সোমাও সায় দিলো।জুই ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কিছুক্ষণ ভেবে বললো,”চল আজ ভেলপুরি খাই।”
জুইয়ের কথা শুনে দুই বান্ধবী খুশিতে গদগদ করে বলে উঠলো, “তাহলে তো আরও বেশি মজা হবে।চল তাড়াতাড়ি।”
তিন বান্ধবী তাড়াতাড়ি স্কুল থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতেই পিছন থেকে একটা মিষ্টি মেয়েলি কন্ঠ কানে আসে,
–“জুই….”
ভীড়ের মধ্যে নিজের নাম শুনতে পাওয়ায় পিছন ফিরলো জুই।ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে চোখ বুলালো। কিন্তু কাউকে পেল না।জুই সামনে ফিরতে যাবো তখনই চোখ আটকালো কলেজ ড্রেস পরহিত একটা মেয়ের দিকে।মেয়েটার পিছনে কালো পোশাকধারী তিনজন গার্ড।জুই ঠিক চিনতে পারছে না বিষয়টা বোধগম্য হতেই ইতি নিজের মুখের কালো মাস্ক খুলে ফেললো।জুইয়ের আর চিনতে বাকি রইলো না মেয়ে টা যে ইতি।জুইয়ের অবাক চাহনি দেখে ইতি ঠোঁট প্রসারিত করে অমায়িক হাসলো।জুইও অবাক হয়ে হেসে দিলো।ইতি জুইয়ের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো,
–“কেমন আছ জুই?”
–“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।তুমি?”
–“আলহামদুলিল্লাহ আমিও অনেক ভালো আছি।”
জুই অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো,”ইতি তুমি আমাদের কলেজে কি করছ?”
–“আমি এই কলেজে পড়ি জুই।”
–“ও মা তাই ! আমি তো তোমাকে কোনোদিন কলেজে দেখি নি।”
জুইয়ের কথায় ইতি হেসে বললো,”আসলে আমি আজই কলেজে প্রথমদিন ক্লাস করতে আসলাম।আমাকে তো মম কলেজে আসতে দেয় না।টিচার্স আমাকে বাসায় পড়িয়ে আসে।জাহানারা ভাবির থেকে শুনলাম তুমিও নাকি এই কলেজে পড়। তাই আজ আব্বু কে বলে মমকে ম্যানেজ করে চলে এসেছি তোমার সাথে দেখা করতে।”
জুই খুশি হয়ে বললো,”ওয়াও তাই!! খুব ভালো করেছ।তোমার সাথে তো সেই কবে আমাদের বাসায় দেখা হয়েছিলো।তারপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।আজ দেখা হয়ে ভীষণ ভালো লাগছে।”
জুইয়ের কথায় ইতি খুশিতে আত্মহারা। জুই আর ইতিকে এভাবে হেসে কথা বলতে দেখে সোমা আর মিনা চেহারা অন্ধকার করে ফেললো।আসলে ছোট থেকে তারা বেস্ট ফ্রেন্ড। তাদের মধ্যে কখনো কোনো বাড়তি ফ্রেন্ড আসে নি।আসলেও সোমা ঝগড়া করে তাড়িয়ে দিয়েছে।
সোমা জুইয়ের হাত ধরে টেনে তার কাছে নিয়ে এসে রাগে বললো,”ঐ শয়তান ঢাকা আইসায় বান্ধবী পাতিয়ে ফেলছস।”
মিনা গাল ফুলিয়ে বললো,”তুই কিন্তু কামটা ঠিক করলি না জুই।আমি অনেক কষ্ট পেলাম।”
জুই হাহাহা করে হেসে মিনা আর সোমার হাত ধরে ইতির সামনে দাঁড়িয়ে পরিচয় করিয়ে দিলো,
“ইতি এই হচ্ছে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড মিনা আর সোমা।আর সোমা ইতি হচ্ছে আমার জাহানাপুর একমাত্র ছোট ননদ।”
জুই বেস্ট ফ্রেন্ড বলায় মিনা আর সোমার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে গেলো।তারা ইতির সাথে পরিচয় করে নিলো।কিছুক্ষণ কথা বলার পর জুই বললো,”ইতি তুমি কি এখন থেকে রোজ কলেজে আসবে নাকি?”
ইতি মন খারাপ করে বললো,”আমি তো জানি না মম রোজ আসতে দিবে কিনা।আর……. ”
ইতি থেমে গেলো।তার মনটা আরও খারাপ হয়ে গেছে। জুই বললো,”আর কি?”
–“আমার না কোনো ফ্রেন্ড নেই। আমি কার সাথে এসে গল্প করবো। আজ না আমি একা একা ক্লাসে বসে ছিলাম।”
ইতির কথা শুনে তিন বান্ধবীর কষ্ট লাগলো।সোমা বললো,”আহা রে তোমার কোনো ফ্রেন্ড নেই। ”
ইতি মন খারাপ করেই বললো,”মম ছোট থেকে বাইরের কারো সাথে মিশতে দেই নি।তাই কখনো আমার ফ্রেন্ড হয় নি।”
সকলের মনটা খারাপ হয়ে গেলো।জুই ইতির হাত ধরে বললো,”ঠিক আছে আজ থেকে আমরা তিনজন তোমার ফ্রেন্ড হলাম।”
সোমা আর মিনাও হ্যাঁ বললো।এই প্রথম ইতির কোনো ফ্রেন্ড হওয়ায় মেয়েটার চোখে পানি চলে এসেছে।কোনো মতে কান্না আটকাতে চাইছে।জুই হেসে বললো,”আরে তুমি কাঁদছ কেন?চল আজ আমরা এক সাথে ভেলপুরি খেতে যাই।”
ইতি কান্না ভুলে অবাক হয়ে বললো,”ভেলপুরি!!সেটা কি জুই?”
ইতির কথা শুনে তিন বান্ধবী চোখাচোখি করলো।তারপর জুই হেসে বললো,”তুমি কোনোদিন খাওনি?”
ইতি মাথা নাড়িয়ে না বললো।মিনা ইতিকে বললো,”কোনো ব্যপার না।চল আজ প্রথম ট্রাই করবে।ভীষণ মজা।একবার খেলে প্রতিদিন খেতে মন চাইবে।”
ইতি নতুন বান্ধবীদের সদয় আচরণে সব সংকোচ ভুলে রাজি হলো।তারা যাবে তখনই একজন গার্ড বলে উঠলো,
–“ম্যাম, নাবিলা ম্যাম স্টেইটলি বলে দিয়েছে কলেজ শেষ হলেই আপনাকে চৌধুরী মেনশনে পৌঁছে দিতে।”
ইতি নাকচ করে বললো,”আমি এখন ফ্রেন্ডদের সাথে খাব।তোমাদের সাথে এখন যাব না।তোমরা আব্বু কে বলে দাও।”
গার্ডগুলো ইতির কথা অনুযায়ী ইকবাল চৌধুরীর থেকে পারমিশন নিচ্ছে।সোমা আর মিনা একে অপরের দিকে চোখাচোখি করলো।
হঠাৎই জুইকে কেউ পিছন থেকে ঢেকে উঠলো।জুই তাড়াতাড়ি পিছনে তাকাতেই দেখলো জিতু ভাইয়া। জুই খুশিতে দৌড়ে ভাইয়ার কাছে গিয়ে বললো,
–“ভাইয়া তুমি!! ”
জিতু ভাইয়া জুইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,”কাজে অনেক ব্যস্ত ছিলাম তাই তিনদিন তোর সাথে দেখা করতে আসতে পারি নি।সব ঠিকঠাক আছে তো।”
–“জি ভাইয়া সব ঠিকঠাক আছে।”
–“এখন বাসায় যাবি তো।চল আগে তোর কি কি লাগবে কেনাকাটা করে দিই।”
–“ভাইয়া এখন আমরা বাইরে ভেলপুরি খেতে যাব।আজ যাব না।আমার সবকিছুই আছে আপাতত কিছু লাগবে না।”
জুইয়ের কথায় জিতু ভাইয়া মিনা আর সোমার দিকে তাকাতে নিলেই চোখে পড়লো ইতিকে।মেয়েটা সাদা কলেজ ড্রেস পড়ে আছে।দু কাঁধে দু’টো বিনুনি সামনের দিকে ফেলে রাখা।ইতি এতক্ষণ জিতু ভাইয়ার দিকেই তাকিয়ে ছিল।হঠাৎই জিতু ভাইয়া তার দিকে তাকিয়ে পড়ায় লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলেছে।গাল দুটো লাল বর্ণ ধারণ করেছে।জিতু ভাইয়া আনমনা হয়ে বিরবির করলো,
–“লজ্জাবতী এখানে!!”
জুই সেটা শুনে উত্তর করলো,”ভাইয়া ইতিও আমাদের কলেজে পড়ে।আজই আমি জানতে পারলাম।তাই তো ওকে নিয়ে আমরা বাইরে খেতে যাব।”
জিতু ভাইয়া শুকনো কেশে ইতির থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।অতঃপর যেতে যেতে বললো,”আমার সাথে আয়।”
জুই, সোমা আর মিনা খুশিতে একসাথে বলে উঠলো, “হুররে,আজ ভাইয়া ট্রিট দিবে।”
জুই ইতির এক হাত ধরে বললো,”চলঅঅঅ…”
ওদের আনন্দ দেখে ইতিও হেসে জুইয়ের সাথে ছুটলো।
কলেজের সামনে ফুচকাওয়ালার ভ্যান গাড়িটার কাছে চারজন দাঁড়ালো।জিতু ভাইয়া ফুচকাওয়ালা কে বললো ওরা যা খেতে চায় তা দিতে।সকলে প্লেটে দুটো ভেলপুরি নিয়ে টোলে বসে পড়লো।সোমা আর মিনা বড় বড় কামড় দিয়ে খাওয়া শুরু করেছে।ইতি ওদের খাওয়া দেখছে।এই প্রথমবার খাবে তাই বুঝতে পারছে না কি করবে।এদিকে জুই জিতু ভাইয়া কে ডেকে বললো,
–“ভাইয়া আজ আমাদের সাথে তুমিও খাও।”
জিতু ভাইয়া এক হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে আরেক হাতে ফোন টিপছিলো।জুইয়ের কথা শুনে ফোনে দৃষ্টি রেখেই উত্তর করলো,”তোরা খা।আমি এসব খাই না।”
মিনা বললো,”ও ভাইয়া আজ কে খাও না।এই দেখ ইতিও কোনোদিন খায় নি। আজ খাবে।”
মিনার কথা শুনে জিতু ভাইয়ার টাইপিং করা হাতটা থেমে গেলো।তিনি মাথা নিচু করে হাতে প্লেট নিয়ে বসে থাকা ইতির দিকে তাকালো।যদিও সানগ্লাস পড়ে থাকায় কেউ বুঝতে পারে নি।তবে লাজুক মেয়েটা কেমন হাঁপ সাপ করছে।সোমা যতবার ভেলপুরি তে কামড় দিচ্ছে ততবারই ঠোঁটের আশপাশ সস দিয়ে মেখে যাচ্ছে।ইতি এটা দেখে মনে মনে ভাবছে,”ইশশশ সবার সামনে কিভাবে খাব আমি!”
এরই মাঝে জুই বলে উঠলো, “ভাইয়া আজকে খাও না।এটা অনেক মজা।”
জিতু ভাইয়া আর না করলো না।ফোনটা পকেটে রেখে,চোখের রোদ চশমাটা শার্টে গুঁজে ইতির পাশে দূরত্ব বজায় রেখে বসে পড়লো।লাজুক ইতির বুকটা ধুকপুক করতে শুরু করেছে।মেয়েটা অযাচিত কারণে নার্ভাস ফিল করছে।ভেলপুরি প্লেটে ধরে রাখা হাত দু’টো কাঁপছে।জুই আরেকটা ভেলপুরি বানাতে বললো ফুচকাওয়ালা মামাকে।ইতি জুইয়ের কানাকানি বললো,
–“জুই আমি দুটো কাবো না।একটা তুমি নিয়ে নাও।”
জুই আরেকটা ভেলপুরি বানাতে না করে দিলো।জিতু ভাইয়াকে বললো,
–“ভাইয়া তুমি আমারটা খেয়ে নাও।ইতি দুটো খেতে পারবে না।”
জিতু ভাইয়া ইতির দিকে তাকালো।কোনো শব্দ ব্যয় না করে ইতির প্লেট থেকে একটা তুলে নিলো।ইতি আশ্চর্য হয়ে ভাইয়ার দিকে তাকালো।ভাইয়া একটা কামড় দিয়ে বললো,
–“নট বেড।ট্রাই করতে পার।”
ইতি তাড়াতাড়ি চোখ নিচে নামিয়ে নিলো।জিতু ভাইয়া খাওয়ায় মনযোগ দিয়েছে।ইতি আড় চোখে ভাইয়ার দিকে তাকালো।ভাইয়া চিবচ্ছে, তারপর গিলছে।কন্ঠ নালি উঠানামা করছে। বিষয়টা ইতিকে আকর্ষণ কারছে।ইতি মুগ্ধ নয়নে ভাইয়াকে দেখতে লাগলো।ভাইয়া নিজের খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াতেই মেয়েটার হুশ ফিরলো।ইতি খেতে লাগলো।আবার আড় চোখে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জিতু ভাইয়াকে দেখতে লাগলো।এই প্রথম কোনো পুরুষ কে এতটা গভীর ভাবে দেখছে সে।তার কোমল গোলাপি ওষ্ঠ কোণে হাসির ঝলক দেখা দিচ্ছে।
সেই কখন থেকে অটোরিকশা চলছে তো চলছে।অবশ্য খারাপ লাগছে না।অনেকদিন পর এভাবে ঘোরা হচ্ছে।আমার পাশেই বসে আছে ইফান। তার দৃষ্টি আমাতেই নিবদ্ধ। যদিও আমি ওর দিকে তাকাচ্ছি না।খোলা রাস্তা দিয়ে গাড়িটা চলতে চলতে হঠাৎ এসে থামলো।আসেপাশে অনেক মানুষ। বাম দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল বিশাল বড় একটা গেইট।সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা আনন্দ মেলা।চারপাশে খুব সুন্দর করে সাজানো। আমি ইফানের দিকে ঘুরতেই দেখি সে নেই।আমি অবাক হলাম।
“আমি এখানে…।”
আমি ঝটপট ঘুরে তাকালাম। ইফান হেসে হাত বাড়িয়ে দিলো।আমি ইফানের বাড়িয়ে দেওয়া হাতকে উপেক্ষা করে একাই নামলাম।হঠাৎই নজর পড়লো আমাদের অটোরিকশাটার থেকে বেশ খানিকটা দূরে ইফানের গার্ডদের তিনটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।আমি দৃষ্টি সরিয়ে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে ইফানের দিকে ঘুরে তাকালাম।
–“এখানে নিয়ে আসার কারণ?”
ইফান মৃদু হেসে আমার হাত ধরে ভেতরে নিয়ে যেতে লাগলো।আমি ইফানের দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বললাম,
–“আমি বাসায় যাব।”
ইফান সামনে এগিয়ে যেতে যেতে প্রতিত্তর করলো,”বাসায় গিয়ে কি করবে?তোমার জামাই তো এখানে।”
–“অসহ্য!!”
ইফান আমাকে নিয়ে ভেতরে আসতেই আমি বেশ অবাক হলাম।ভেতরে কত মানুষ। জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট,নাগরদোলা আরও কত কি!!আজ বহুবছর পর মেলায় আসলাম তাই এই পরিবেশ দেখে অবাক হচ্ছি কিছুটা।এদিকে ইফানকে আর আমাকে দেখে আসেপাশের কিছু মানুষ অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে।আমি আসেপাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখলাম।না আসলেই সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে!আমি ইফানের হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে চাইলাম।এতে ইফান আমার বাহু ধরে ওর সাথে মিশিয়ে নিলো।সকলের সামনে অস্বস্তিতে পড়লাম।এদিকে কয়েকজন লুকিয়ে আমাদের দিকে ফোন ধরে ভিডিও করতে নিলেই তাদের চোখ পড়ে আমাদের পিছনে আসা গার্ডদের দিকে।গার্ডরা চোখ রাঙাতেই সকলে আমাদের থেকে চোখ সরিয়ে নিলো।
ইফান আমাকে নিয়ে চারপাশ ঘুরে দেখাচ্ছে।আমার কি লাগবে জিগ্যেস করছে।আমি কোনো উত্তর করছি না।ইফান আমাকে হাওয়ায় মিঠাই এর দোকানে নিয়ে গেলো।আমাকে আর কিছু জিগ্যেস না করে দুটো হাওয়াই মিঠাই কিনে দিল।অতঃপর আমার হাতে জোর করে ধরিয়ে দেয়।আমি সেগুলো অনিচ্ছা সত্যিও হাতে ধরে রেখে বললাম,
–“আমি কি বলেছি খাব, আজীব!”
–“তোমাকে কোন কিছু বলতে হবে না।আমি সব জানি।আর এটাও জানি এই ফুড তোমার পছন্দ।”
আমি আশ্চর্য হলাম ইফান কিভাবে এটা জানলো আমি হাওয়াই মিঠাই খেতে পছন্দ করি!আমি কিছু বলতে নিলেই ইফান আমার হাত থেকে হাওয়াই মিটায় নিয়ে আমার মুখে পুরে দিলো।আমি সেটা মুখে নিয়ে কটমট করে তাকিয়ে।ইফান ঠোঁট টিপে হাসছে।আমি মুখের মিঠাই শেষ করতে লাগলাম।ইফান আমাকে মনযোগ দিয়ে দেখছে।আমার ঠোঁটে মিঠাই লেগে আছে।গোলাপি ওষ্ঠগুলো ঝলমল করছে।ইফান অন্যদিকে তাকিয়ে ঢোক গিললো।আমি খাওয়া শেষ করতেই আমার দিকে তাকালো।আমার ঠোঁটে এখনো মিঠাই জেলির মতো লেগে আছে।ইফান আমাকে ইশারা করলো।আমি বুঝলাম না।ইফান পুনরায় আমার ঠোঁটে ইশারা করলো।আমি বিরক্ত হয়ে চোখ সরু করে ফেললাম।ইফান আমাকে আর কিছু না বলে আমার ঠোঁট আঁকড়ে ধরলো।আমি সরে যেতে নিলেই মাথায় ধরে তার সাথে চেপে ধরে রাখলো।সেভাবেই নিজের জিহ্বা দিয়ে আমার ঠোঁটে লেগে থাকা মিঠাই চুষে খাচ্ছে।পাবলিক প্লেস অথচ কারো সাহসে কুলালো না আমাদের দিকে তাকাতে।কারণ সকলেই ইফান চৌধুরী কে ভালো করে চিনে জানে।
ইফান আমার ঠোঁট ততক্ষণ নিজের দখলে রাখলো যতক্ষণ মিষ্টি স্বাদ মুখে গেছে।আমার ঠোঁটের আসেপাশে মিষ্টি স্বাদ নিয়ে ঠোঁট ছেড়ে জিহ্বা দিয়ে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে হাস্কি স্বরে বললো,
–“এবার ঠিক আছে।”
আমি হাতের উল্টো পৃষ্ঠা দিয়ে কোনো মতে ঠোঁট মুছে ইফানকে বকতে লাগলাম,”কু*ত্তার বাচ্চা। নি*র্লজ্জ ন*ষ্ট পুরুষ।”
আমার কথা শুনে ইফান হেসে দিলো।তারপর আমাকে টেনে নিয়ে নাগরদোলায় উঠে বসলো।আমি কতবার বারণ করলাম।কিন্তু বেপরোয়া লোকটা শুনলো না।নাগরদোলা ঘুরতে শুরু করেছে।এদিকে আমার কলিজা লাফাচ্ছে।না পারছি চেঁচাতে আর না পারছি ইফানকে ঝাপটে ধরতে।বাকিরা ঠিকই চিৎকার চেচামেচি করছে।নাগরদোলা যখন উপর উঠছে তখনই আমি শক্ত করে চোখ বন্ধ করে নিলাম।আমি ভয় পাচ্ছি দেখে ইফান তার বুকের সাথে চেপে ধরলো।আমিও ওর বুকের কাছে কোটের কিছুটা অংশ শক্ত করে ধরলাম।ইফান ঠোঁট কামড়ে হেসে আমার মাথা তার বুকে আরও চেপে ধরলো।
নাগর দোলা থেকে নেমে আমি রাগে গজগজ করতে করতে আরেক দিকে যেতে লাগলাম।ইফান আমার পিছু পিছু আসছে।
বিশাল বড় মেলা আমরা হয়তো একাংশ ঘুরতে পেরেছি।এরই মাঝে সন্ধ্যা নেমে আসলো।চারিদিক থেকে মাগরিবের আযান ভেসে আসছে।ধরণীতে আধার নেমে এসেছে।সব জায়গায় লাইটিং থাকায় বুঝা বড় দায় এখন দিন না রাত।চারিপাশে শব্দ দূষণ।আমি ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম।ইফান পিছন থেকে এসে বললো,
–“জান তোমার অনেক খিদে লেগেছে তাই না।”
–“আমি কি তোমাকে একবারও বলেছি যে আমার খিদে লেগেছে?”
ইফান আমার হাত ধরে আরেকটা স্টলে নিয়ে যেতে যেতে বললো,”অনেক সকালে অল্প খেয়ে বেড়িয়েছ। এখন তুমি অনেক ক্ষুধার্ত।”
আমার কোনো কথা শুনলো না।আমাকে জিগ্যেস করলো কি খাবে।আমি হা না কিছু বলতে পারছি না।আসলেই আমি অনেক ক্ষুধার্ত।তার উপর সামনে এত সুন্দর সুন্দর খাবার পেটের ক্ষুধা আরও বেড়েই চলেছে।আমি কিছু বলছি না দেখে ইফান নিজেই এক প্লেট চিকেন ফ্রাই,স্যান্ডউইচ আর চিংড়ি ফ্রাই নিলো।তারপর আমার হাতে খাবারের প্লেট ধরিয়ে দিলো।আমি উশখুশ করছি কি করবো না করবো।কারণ ইফান নিজের জন্য কিছু নিলো না।আমি ওর সামনে একা কিভাবে খাব!আর এটাই বা কিভাবে জিগ্যেস করবো আপনি কাবেন না?আমার ভাবনার মাঝেই ইফানের কন্ঠ স্বর কানে আসলো,
–“ঠান্ডা হয়ে যাবে খেয়ে নাও।আমি স্ট্রিট ফুড খাই না।”
এবার আমি কিছু না ভেবে খেয়ে নিলাম।অসম্ভব খুদা পেটে। তার উপর ফেবারিট ডিশ।আমার খাওয়া শেষ হতেই ইফান টিস্যু দিয়ে আমার ঠোঁট মুছিয়ে পানির বোতল এগিয়ে দিলো।
ইফান আমাকে নিয়ে কসমেটিকসের স্টলে গেলো।আমি তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বললাম,”এত অভিনয় কিসের জন্য?”
ইফান আমার দিকে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো,”কিসের অভিনয়?” আমি এটা ওটা হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে বলালম,”এই যে এত ভালো মানুষের মতো আচরণ করছেন।”
–“আমি ভালো মানুষ না সেটা তুমি কেন পুরো বিশ্ব জানে।ভালো মানুষী দেখানোর কোনো কারণ নেই।তোমার প্রতি আমার অনুভূতি অলওয়েজ ট্রু।”
ইফান নিজের কথা শেষ করেই একটা ছোট কালো টিপ আামর কপালে পড়িয়ে দিলো।আমি চোখ উল্টে দেখার চেষ্টা করলাম।ইফান হেসে বললো,”উমমম পারফেক্ট।”
আমি ভাবলেশহীন ভাবে ইফানকে জিগ্যেস করলাম,”এতদিন পর হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলেন।আমি তো ভেবেছিলাম হয়তো একেবারে হারিয়ে গেছেন।”
–“আমি ফিরে আসায় খুব দুঃখ হচ্ছে তাই না?”
আমি ইফানের কথায় দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লাম।ইফান মনযোগ দিয়ে আমার ক্লান্ত চেহারাটা দেখতে লাগলো।কিছুক্ষণ চুপ থেকে হিসহিসিয়ে বললো,”তুমি যতই চেষ্টা কর আমাকে তোমার থেকে আলাদা করতে। কিন্তু পারবে না।আমি তা কখনোই হতে দিব না।”
–“আলাদা তো তখন হয় যখন এক থাকে।আমাদের মাঝে তো প্রথম থেকেই বিশাল এক দেওয়াল।”
–“তাহলে এই দেওয়ালটাই ভেঙে দিব।”
–“দেখা যাবে।”
ইফান নিজের পছন্দ মতো আমার জন্য এটা-ওটা কিনছে।মনে তো হচ্ছে পুরো মেলার সব নিয়ে নিচ্ছে। আমি যেদিকে, যে জিনিসে তাকিয়েছি সব কিনে নিয়েছে।আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে এসব কান্ড দেখছি। এবার ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আসেপাশে মানুষের ভীড়ে চোখ বুলালাম।ইফান গার্ডদের ডেবিট কার্ড দিয়ে চলে এসেছে।গার্ডরা জিনিসগুলো নিচ্ছে।
হঠাৎই পিছন থেকে ইফান এসে আমার খোপায় কাঠি ব্যান্ট গুঁজে দিলো।আমি ক্লান্ত চেহারা নিয়ে ইফানের দিকে তাকালাম। ইফান আমার গালে হাত বুলিয়ে বললো,
–“বেশি টায়ার্ড লাগছে?”
আমি সামনে হাঁটা ধরে বললাম,”আমার সিদ্ধান্ত কি আপনি কখনো শুনেছেন?” আমার কথায় ইফান হাসলো।
❝ভেবে দেখেছ কি তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে…❞
আমি হাঁটতে হাঁটতে আরেক দিকে আসলাম।হঠাৎই কানে গানের সুর আসলো।আমার পা আপনা-আপনি থেমে গেছে।আমি সেই দিকে তাকিয়ে দেখলাম মানুষের অনেক ভীড়।সেখানে কিছু সিঙ্গার তাদের গানের দল নিয়ে বসেছে।এক দুজন সুর মিলাচ্ছে।বাকি কজন ইন্সট্রুমেন্ট বাজাচ্ছে।আমি কয়েক পলক মোহ দৃষ্টিতে দেখলাম।মনের ব্যথা গুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।বুকের বাম পাশে চিনচিন ব্যথা অনুভব করছে।আমি একটা ঢুক গিলে দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম।
ইফান আমাকে গভীর দৃষ্টিতে খেয়াল করলো।অতঃপর যেদিকে গান হচ্ছে সেদিকে এগিয়ে গেলো।আমি তাকে খেয়াল করলাম না।আমি অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়ালাম।
❝বন্ধু-তুমি-ভালো তুমিতো চাঁদের-আলো
আমি মনে হয় ব্রামণ হয়ে চাঁদে হাত বাড়াই….❞
আমি তপ্ত শ্বাস ছেড়ে এক পা এগোতেই আরেকটা নতুন গানের সুর কানে আসলো।কান্ঠটা আমার চেনা ঠেকছে।তাই আচমকা আমার পা থেমে যায়।আমি তৎক্ষনাৎ সেদিকে ফিরে তাকালাম।
❝জলসে সে যাব জানি মানছে না মন খানি।
পাবনা যেনও মিছেমিচি কোন তোমাকে ছুঁতে চাই।
আমি কোন বার বার প্রেমে পড়ে যাই।
এই জনমে পাই বা-না পাই পর জনমে চাই……❞
আসেপাশের সকল মানুষ ইফানের গান শুনে চিৎকার চেচামেচি শুরু করেছে।অনেকে তাল মিলিয়ে গাইছে।আমি দেখছি, ইফান গানের দলের সাথে গিটার হাতে বসে।একেকটা তারে হাত চালিয়ে গলার সাথে গিটারেও সুর তুলছে।তার অপলক দৃষ্টি আমাতেই আবদ্ধ। ঠোঁটে চোখে সুক্ষ্ম হাসির ঝলক।আমি চরম আশ্চর্য।আমার অবাক হওয়া চেহারা দেখে ইফানের ঠোঁটের কোণে হাসি আরও প্রসস্থ হচ্ছে।আমি দু’হাত বুকে গুঁজে দাঁড়িয়ে শুধু দেখতে লাগলাম।
ইফান আমাকে একটা ব্রিজের ওপর নিয়ে এসেছে।চারিদিকে অন্ধকার থাকায় বুঝতে পারছি না এটা কোন জায়গা।আমি ব্রিজের ব্যালুস্ট্রেড ধরে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে।যত দূর পর্যন্ত চোখ যায় সবটাই অন্ধকার।যতটুকু ব্রিজ লাইটের আলোতে দেখা যাচ্ছে সেটা বাতাসে হালকা কুয়াশা বা হেজে আলোটা আবছা দেখাচ্ছে।ফুরফুরে ঠান্ডা হাওয়ায় খানিকটা ঠান্ডা অনুভব করছি।আমি জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলাম।দু’হাতে দুই বাহু ঘষছি।হঠাৎই ইফান পিছন থেকে আমার সাথে মিশে দাঁড়ায়।দু’হাতে আগলে ধরে তার ওভার লং কোট দিয়ে আমাকে খানিকটা ঢেকে নিলো।এখন আর ঠান্ডা অনুভব হচ্ছে না।
কিছুটা সময় পেরিয়ে গেলো।আমি আগের মতো দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে কোনো প্রকার শব্দ ব্যয়হীন।ইফানও কিছুক্ষণ চুপচাপ আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে সেদিকে চেয়ে।হঠাৎই কানে ইফানের হাস্কি স্বর কানে আসলো,
–“হঠাৎ এত শান্ত চুপচাপ হয়ে গেলে কেন?”
আমার থেকে উত্তর আসলো না।ইফান তপ্ত শ্বাস ছেড়ে কিছুটা ঝুঁকে আমার মাথায় গাল ঠেকালো।আমাকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হিসহিসিয়ে বললো,
–“অন্ধকারে একা এত ভয় পাও তবুও কেন প্রতিদিন বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাক এত রাত পর্যন্ত।”
–“সব খবরই রাখতে দেখছি।”
–“তোমার কি মনে হয়,আমি দূরে গিয়ে তোমার চোখের আড়াল হয়েছিলাম বলে তোমাকেও আমার চোখের আড়াল হতে দিতাম?”
আবারও আমার থেকে উত্তর আসলো না।ইফান আমার চুলের ঘ্রাণ টেনে নিয়ে হিসহিসিয়ে বললো,”আমি পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন আমার এই চোখজোড়া তোমাতেই সীমাবদ্ধ।”
ইফান আমার শাড়ির আচল ভেদ করে পেটে হাত রাখলো।ঘারে চুম্বন এঁকে দিচ্ছে। সমান তালে আমার উন্মুক্ত উদারে তার হাতের বিচরণ।আমি কোনো প্রতিক্রিয়া করছি না।ইফান গাঢ় চুমু খেতে খেতে আমার কানে ঠোঁট রাখলো।স্পোকি টোনে ফিসফিস করে বললো,
–“আমি ছিলাম না রাতে একা একা খুব ভয় পেতে তাই না সোনা।”
ইফানের কথাটা আমার টনক নড়ালো।সত্যি কথা বলতে তো রাতে একা থাকতে আসলেই ভয় পেতাম।যদিও কখনো প্রকাশ করি নি।বিয়ের পর থেকেই খালি মনে হতো আমার দিকে কয়েক জোড়া চোখ নিবদ্ধ।
ছয়মাস আগে যখন আমার বাপের বাড়ি থেকে আবার চৌধুরী বাড়িতে আসি তখন সব ঠিকঠাক ছিলো।সমস্যাটা আবার শুরু হয় যখন দুদিন পর ইফান দেশের বাইরে চলে যায়।কিন্তু ইফান কিছুদিনের মধ্যেই আবার দেশে চলে আসে।তারপর আবার সব স্বাভাবিক।আমার আন্দাজ মতে ইফান দেশের বাইরে থেকেও আমাকে স্টক করার সময় বিষয়টা বুঝতে পারে আমি কিছু একটা কারণে নিজের রুমে থাকতে ভয় পায়।তাই ইফান নিজের কাজ দ্রুত শেষ করে ফিরে আসে।
ইফান আরও দুমাস আমার সাথে থাকে।কিন্তু হঠাৎই কিছু একটা কারণে দেশ ত্যাগ করে।তারপর প্রায় তিন মাস পেরিয়ে যায়। আমি কেন!!চৌধুরী বাড়ির কারো সাথেই ইফানের কোনো যোগাযোগ ছিলো না।
ইফানের অনুপস্থিতিতে সেই থেকে আমার সাথে অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে।
জায়ান ভাইকে হারানোর পর থেকে আমার রাতে আকাশ দেখার অভ্যাস তৈরি হয়।আমি যখন বেলকনিতে দাঁড়ায়, আমার মনে হয় আমার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে।কখনো মনে হয় বাগানে কেউ হাঁটছে।যদিও কিছু কখনো কিছু দেখতে পাই নি।তবে অনেক ভয় পাই।তবুও বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখার অভ্যাস ছাড়তে পারি না।আমি হ্যালুসিনেশন করি আমার ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে জায়ান ভাই।মূহুর্তেই আমার সব ভয় কেটে যায়।
–“প্রতিদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে কি খুঁজ বেইবি?”
ইফানের কন্ঠ স্বর কানে আসতেই আমি কল্পনা থেকে বেড়িয়ে আসলাম।আমার চোখ দুটো এখনো আকাশের দিকেই স্থির।আজ আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে।আকাশ ভর্তি লক্ষ কোটি তারার মেলা।আমি আনমনে বলে উঠলাম,
–“এক বিন্দু সুখের দিশা।”
–“আমি তোমাকে এক আকাশ পরিমাণ সুখ এনে দিব।তুমি শুধু আমার হয়ে যাও জান।”
–“আপনার থেকে সুখ না নেওয়ার বিনিময়ে যদি আমাকে সারাজীবন দুঃখ বয়ে বেড়াতে হয়।তাহলে আমি দুঃখ নিয়েই বাঁচতে রাজি।”
আমার বাক্যটা শেষ হতে না হতেই এক টান মেরে ইফান নিজের দিকে ফিরিয়ে আমার গলায় থাবা মেরে ধরলো।এতক্ষণের সব নমনীয়তা ক্রোধে রুপ নিয়েছে।ইফান আমার গলা ধরে রেখেই ব্রিজের ব্যালুস্ট্রেডের সাথে চেপে ধরলো।ওর চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। চোখ দুটো রাগে টগবগ করছে।ইফান দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে বললো,
–“হারা/মির বাচ্চা মেরে ফেলবো তোকে।একদমই জানে মেরে ফেলবো।রাখ তর বালের সুখ। তুই কষ্টে থাকারই যোগ্য। তোকে কষ্টেই রাখবো।”
গলা এমন ভাবে শক্তে চেপে ধরেছে যে আমি দম নিতে পারছি না।আমি ইফানের হাত ধরে গলা থেকে ছাড়াতে চাইছি।আমার এমন অবস্থা দেখে ইফান ছেড়ে দিলো।অতঃপর আমাকে তার কাছে টেনে উন্মাদের মতো চুমু খেতে লাগলো।আমি জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছি।ইফান তার বুকে আমাকে মিশিয়ে নিয়ে বলতে লাগলো,
–“অনেক লেগেছে সোনা।খুব ব্যথা পেয়েছ?আ’ম সরি জান আ’ম সরি।”
আমি ইফানকে ঠেলে সরে দাঁড়ালাম।ইফান ঢোক গিলে আমাকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম।তারপর আগের মতো অপলক আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম।নিজের প্রতি করুণা হয় যদি একটু চিৎকার করে কাঁদতে পারতাম তাহলে হয় তো বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা যন্ত্রণাটা একটু উপশম হতো।আমি ভালো নেই জায়ান ভাই, সত্যি ভালো নেই।
ইফান অসহায় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।কেউ কোনো কথা বলছি না।হঠাৎই ইফান আমাকে পিছন থেকে ঝাপটে ধরে কাঁধে মুখ ডুবিয়ে হিসহিসিয়ে বলে উঠে,
–“এভাবে চুপ করে থাকিস না বউ।তোর এই নিরবতা আমাকে চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দেয় আমি ধ্বংসের দারপ্রান্তে।”
ইফান থামল।আবারও নীরবতা।ইফান আমার শরীর থেকে নাক টেনে ঘ্রাণ নিলো।ওর তপ্ত শ্বাস আমার ঘারে আঁচড়ে পরছে।ইফান তার খরখরে ওষ্ঠজোড়া আমার কানে ছুঁইয়ে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,
❝আমি তোর সব কষ্ট দূর করে দিবো বুলবুলি। একদিন আসবে,আমাদের মধ্যে সব দূরত্ব ঘুচে যাবে।প্রয়োজনে আমি হেরে গিয়ে হলেও তোকে জিতিয়ে দিব।শেষ বেলায় তুই হাসবি জান।তোর সুখের জন্য যদি আমাকে নিঃশেষ হতে হয়, তবে জেনে রাখ আমি অকালেই ঝরে যাব।❞
রাতের অন্ধকারে সব ছেয়ে যাওয়ার সাথে সাথে অন্ধকার ছোট্ট রুমের সবটা জুড়ে শতাধিক মোমবাতি জ্বলে উঠেছে।রুমের চার দেয়ালে বহু সংখ্যক সুন্দরী মেয়ের ছবি সহ অদ্ভুত ভয়ানক সব চিত্রকার্য।মোমবাতির হলদে আভায় দৃশ্যমান আমার বিয়ের দিনের লাল লেহেঙ্গা পড়া একটা ছবি।ছবিটার মধ্যে সামনের মোমবাতি থেকে আগুনের শিখা ঝলঝল করছে।
জাহানারা পর্ব ৪৮
শতাধিক মোমবাতির মাঝখানে অশরীরির মতো কেউ একজন বসে আছে।তার সামনে লাল সুতা মোড়ানো পুতুল,ভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্র__মানুষের অবয়ব আঁকি ঝুকি করা কাগজ আর আমার ছবিটা রাখা।আসেপাশে লাল তরলের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।আসলে রক্ত না রং বুঝে ওঠা বড় দায়।গা ছমছমে পরিবেশ। অশরীরির মতো বসে থাকা ব্যক্তি কালোতে মোড়ানো। ধ্যানমগ্ন অবস্থায় মুখ দিয়ে কেমন অদ্ভুত সব আওয়াজ করছে।
হঠাৎই কক্ষে আরেকজন নিঃশব্দে উপস্থিত হয়।কিন্তু ধ্যানমগ্ন থাকা ব্যক্তির বুঝতে অসুবিধা হলো না কে এসেছে।সে অদ্ভুত কন্ঠে বলে উঠলো,
❝ঐ মেয়ে আমাদের সব রাজত্ব ধ্বংস করতে এসেছে।এবার আমাদেরকেই কিছু করতে হবে,,,,❞
