Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ৬৬

জাহানারা পর্ব ৬৬

জাহানারা পর্ব ৬৬
জান্নাত মুন

আজ অনেকদিন পর সিআইডি টিমের সকল অফিসাররা ডিনার করতে বাইরে এসেছে। একই টেবিলে সকলে বসে খাচ্ছে এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলে হাসিঠাট্টা করছে। কণা বেশ কিছুক্ষণ বাঁকা চোখে ডক্টর সুমিকে দেখল। অতঃপর অরনার সাথে আরেকটু চেপে বসে ফিসফিস করে বলল,
–“দেখলেন ম্যাম এই ডক্টর সুমির ভাবটা। যেই আরমান স্যারকে দেখে অমনি তার ভাব শুরু হয়ে যায়। যতসব বিরক্তিকর কারবার।”
অরনা ডক্টর সুমির দিকে তাকাল। ডক্টর সুমি খুব সুন্দর করে অল্প অল্প খাবার মুখে তুলে ধীরে ধীরে চিবচ্ছে। আলতো হাতে আবার কখনো ছোট চুলগুলো কানে গুঁজে দিচ্ছে। ঠোঁটে এক বিস্তৃত হাসির রেশ। অরনা কোনো মতে ঠোঁট টিপে নিজের হাসি সংবরণ করে সুমির থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। সুমির অভার এক্টিং দেখলে যে কারো হাসি পেয়ে যাবে।

–“তো হিমন কেমন চলছে দিনকাল ?”
ডক্টর আবদুল কালামের কথায় সকলে হিমনের দিকে তাকাল। হিমন বুক টানটান করে বসে শক্ত কন্ঠে বলল,”আপনি আমার সাথে কথা বলবেন না। আপনি আমার মতো সাদাসিধা মাসুম বাচ্চাকে ফাঁসিয়েছেন।”
–“কেন, ডক্টর আবার কি করল ?”
জিতু ভাইয়া জিজ্ঞেস করতেই হিমন কাঁদু কাঁদু মুখ করে বলল,”কি করলো মানে! এই ভদ্রলোক আমাকে ভুলিয়ে-বালিয়ে বিয়ে করিয়েছে। বিয়ের আগে আম্মার কাছে সম্মন্ধ এনে বলেছে, মেয়ে একদম সহজসরল। আর এখন বিয়ের পর হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি কত সহজসরল। আগে আম্মার ক্যাচাল শুনতে হত আর এখন বউয়েরটাও শুনতে হয়।”
হিমনের কথা শুনে সকলে হাসিতে মেতে উঠল। সবাই কে হাসতে দেখে হিমন থমথমে খেল। আব্দুল কালাম বলল,”তো এসপি সাহেব আপনার কি খবর, বিয়ে কবে করছেন?”

–“আমি বিয়ে-টিয়ে করছি না ।”
–“আরে ভায়া আমার কাছে ভালো একটা পাত্রীর সন্ধান আছে।আপনি বললে..”
–“আমাকে কি পাগাল পেয়েছেন যে আপনার সম্মন্ধ করা পাত্রী বিয়ে করা হিমনের মতো বেকায়দায় পড়তে যাব।”
আরেক দফা সকলে উচ্চ স্বরে হেসে উঠল। আবির হেয়ালি করে বলল,”স্যার তাড়াতাড়ি বিয়েটা করে নিন।”
–“আমার বিয়ে নিয়ে তোমার কিসের তাড়া?”
–“না মানে স্যার আপনার জন্যই তো আমারটা আটকে আছে।”
–“আমি কি তোমাকে ধরে রেখেছি নাকি বিয়ে না করতে?”
আবির শুকনে কেশে বিরবির করে বলল,”শালার সম্বন্ধী নিয়ে না জানি ভবিষ্যতে আরও কত কি অত্যাচার সইতে হয়। ধুর ধুর।”

–“কি বিরবির করছ?”
–“কিছু না স্যার।”
আবির ভোতা মুখ করে খাওয়ায় মন দিল। জিতু ভাইয়া আবিরের এমন চেহারা দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসতে লাগল। বাকি সবাই আবারও হেসে উঠল। আবির থমথমে খেয়ে সবার দিকে তাকাল। জিতু ভাইয়া এবার আওয়াজ করে হেসে আবিরের পিঠ চাপড়ে বলল,
–“সঠিক সময় আসলে সিরিয়াল ভেঙে হলেও তোমার বিয়েটা দিয়ে দিবো।”
জিতু ভাইয়ার কথা শুনে আবির লজ্জায় পড়ে গেল খানিকটা। জিতু ভাইয়ার ইঙ্গিতপূর্ণ কথা শুনে ভালোই বুঝতে পেরেছে কথার আসল মানে। বাকি সবাই এখন আবিরকে ঠেস দিয়ে এটা-ওটা বলে হাসিতে মেতে উঠেছে। এরই মাঝে ডক্টর সুমি লাজুক চেহারা করে বলে উঠলো,

–“স্যার আমার মনে হয় খুব শীগ্রই আপনারা বিয়ের দাওয়াত পাবেন।”
হাসি থামিয়ে সকলে সুমির দিকে মনযোগ দিল। ডক্টর সুমি আরেকটু ভাবসাব নিয়ে বসল। ডক্টর আব্দুল কালাম সুমির এমন ভাবসাব দেখে শক্ত কন্ঠে বলল,”যা বলার পরিষ্কার করে বল।”
–“আসলে স্যার আমার একজনের সাথে বিগত তিন বছর ধরে রিলেশন। এখন পরিবার থেকে আমাদের বিয়ের আলোচনা চলছে। সম্ভবত বিয়ের পাকাপাকি কথা হচ্ছে। তাই আরকি..।”
সুমির এমন কথা শুনে অরনা, কণা আর হিমন একে অপরের দিকে কিছুক্ষণ চোখাচোখি করে গা দুলিয়ে হেসে উঠল।ওদের হাসি দেখে মনে হচ্ছে ডক্টর সুমি কোনো জোকস বলেছে।

রাত প্রায় সারে এগারোটা বেজে গেছে।বেশ এক দেড় ঘন্টা সবাই মিলে আড্ডা দেওয়ার পর এবার সবাই রেস্টুরেন্টে থেকে বেড়িয়ে এসেছে। বাকিদের বিদায় দিয়ে জিতু ভাইয়া যখন গাড়িতে উঠবে তখনই তার মনে হলো কেউ তার পিছু নিয়েছে। আচমকা পিছনে ফিরতেই লক্ষ করল একটা মেয়ে ফোন তার দিকে ধরে আছে। হয়-তো পিকচার নিচ্ছে। মেয়েটার পড়নে একটা মোটা হুডি আর লেগিংস। মাথায় ও মুখে স্কার্ফ ওড়না পেঁচানো এবং চোখে সানগ্লাস। জিতু ভাইয়ার কাছে ধরা পড়তেই মেয়েটা উল্টো দিকে দৌড় দিল। জিতু ভাইয়াও আর এক মূহুর্ত সময় ব্যয় করল না, মেয়েটির পিছু নিল।
মেয়েটা হাই হিল পড়ে থাকায় বেশিক্ষণ দৌড়াতে পারল না। দু মিনিটের মধ্যেই মেয়েটা রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে। জিতু ভাইয়া কাছে গিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে কোমরে দু’হাত ধরে সটাং হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কয়েক মূহুর্ত পর মেয়েটা মুখ তুলে জিতু ভাইয়ার দিকে তাকাতেই জিতু ভাইয়া আশ্চর্য হয়ে আওড়ালো,

–“য়্যু বিচ!”
–“জিতু বেইবি আমি পড়ে গেছি।”
-“জাস্ট শাট আপ।”
নোহাকে জিতু ভাইয়া ধমকে উঠলো। নোহা গাল ফুলিয়ে একা একা উঠে দাঁড়াল। জিতু ভাইয়া অন্যদিকে ফিরে নিজের রাগ সামলানোর চেষ্টা করছে। কারণ এই মেয়েটা আজ কি পরিমাণ বাজে কমেন্ট করেছে যা ভাবলেই জিতু ভাইয়ার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। ভাগ্যিস নোহার কমেন্ট কেউ দেখার আগেই ডিলিট করে মেয়েটাকে ব্লক করেছে।
জিতু ভাইয়া কড়া চোখে নোহার দিকে তাকিয়ে শক্ত কণ্ঠে বলল,
–“এই মেয়ে মাঝ রাতে নি’র্লজ্জের মতো আমার পিছু নিয়েছ কেন? মতলব কি?”
–“তোমার ললিপপটা টেস্ট করা।”
–“নোহাআআআ..।”

নোহার তৎক্ষনাৎ ডাবল মিনিং প্রতিত্তোর ভেসে আসতেই জিতু ভাইয়া গর্জে উঠল। জিতু ভাইয়া হাত ওঠাতেই নোহা চোখ খিচকে বন্ধ করে নিল। জিতু ভাইয়া রাগে আবার হাত নামিয়ে দাঁত কটমট করল। তারপর নিজেকে সামলে কোনো বাক্য বিনিময় না করে বড় বড় পা ফেলে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতেই নোহা আবার পিছু নিল। জিতু ভাইয়া আচমকা থেমে পিছন ফিরতেই দেখল নোহা আবার ফোন তার দিকে ধরে রেখে এগিয়ে আসছে। জিতু ভাইয়া দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ ও চোয়াল শক্ত করে নোহার দিকে এগিয়ে গেল। নোহা পালানোর আগেই জিতু ভাইয়া নোহার ফোন খপ করে নিয়ে নিল। অতঃপর ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই জিতু ভাইয়া গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলো,

–“নোহাআআআআ।”
নোহা ভয়ে হাতের নখ কামড়াতে লাগল। নোহা এতক্ষণ ধরে জিতু ভাইয়াকে ফলো করছে আর জিতু ভাইয়ার মেইন পয়েন্ট এবং পাছার পিক তুলছে। তার ফোনে এতক্ষণ যতগুলো ছবি তুলছে তাতে একটাতেও জিতু ভাইয়ার সম্পূর্ণ ছবি নেই। সব ছবিই জিতু ভাইয়ার নিম্নাংশের।
জিতু ভাইয়া রাগে গজরাতে গজরাতে এক হাতে নোহার ফোন সজোরে মুঠো করে ধরে চোখ খিচকে দাঁতে দাঁত পিষতে লাগল। তবুও রাগ না দমাতে পেরে গাড়ির ডিকিতে সজোরে পাঞ্চ বসিয়ে দিল। নোহা ভয়ে ভয়ে জিতু ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। জিতু ভাইয়া নিজেকে সামনে নোহার হাতে ঠাস করে ফোনটা ধরিয়ে দিয়ে বলল,
–“মাপ চাই ভাই। তোর মত মহিলা আমি আমার জীবনে একটাও দেখি নি।”
–“থাংকু।”

নোহা লাজুক কণ্ঠে বলল। জিতু ভাইয়া কি করবে কিছু বুঝতে না পেরে নিজের মাথার চুল খামচে ধরল। অতঃপর নিজের গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বেশ খানিকটা এগোতেই লক্ষ করল নোহা এখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে তার গাড়ির দিকে তাকিয়ে। হঠাৎ জিতু ভাইয়ার মনে পড়ল সেইদিনের ঘটনা। জিতু ভাইয়া আবার গাড়ি পিছিয়ে নিয়ে আসল। গাড়িতে বসে থেকেই উইন্ডো খুলে বলল,
–“এখনো এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কারণ কি, বাড়িঘর নেই নাকি? না বাড়ি ফেরার ইচ্ছে নেই?
নোহা মুগ্ধ নয়নে জিতু ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।জিতু ভাইয়া অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল,”গাড়ি কি নিয়ে এসেছ, নাকি আরেকটা বিপদ বানানোর পাঁইতারা করছ?”
এবার নোহার টনক নড়ল। সে আড় চোখে তাকিয়ে দেখল তার মার্সিডিজ দাঁড়িয়ে আছে। আজ সাথে আবার দুজন গার্ডও নিয়ে এসেছে। নোহা কিছু একটা ভেবে বলে উঠলো,
–“আমাকে একটু লিফট দিয়ে আসবে, প্লিজই?”
জিতু ভাইয়া বিনাবাক্যে গাড়ির ডোর খুলে দিল। নোহা ঝটপট গাড়িতে উঠে বসল। অতঃপর সারা রাস্তা বকবক করেই যাচ্ছে অনর্গল। চৌধুরী বাড়ির প্রায় কাছে চলে আসতেই জিতু ভাইয়া বলল,

–“জাহানের কি খবর?”
–“হু?”
–“বলছি জাহান কেমন আছে।”
–“অনেক ভালো আছে। কেন ভালো থাকবে না, আজ তো ইফান বেইবি এসেছে।”
নোহার কথায় জিতু ভাইয়া ব্রু কুঁচকে নোহার দিকে তাকিয়ে শুধালো, “ও এসে গেছে?”
–“হ্যা তো। আমি তো আসার আগে দেখে আসলাম ইফান বেইবি প্রিটি গার্লকে কোলে তুলে নিয়ে চলে যাচ্ছে।”
–“কিহ্ এত রাতে কোথায় যাচ্ছে?”
–“সে তো জানি না। বাট দেখলাম গার্ডেনে হেলিকপ্টার দাঁড়িয়ে। সাথে আবার বেইবির বেশ কিছু গার্ডও ছিল। আমি রেডি হচ্ছিলাম বের হব বলে। তখন হেলিকপ্টারের আওয়াজ পেয়ে বেলকনিতে আসি, আর তখনই দেখি।”
নোহার কথায় বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল জিতু ভাইয়া। বেশ কিছুক্ষণ এটা ওটা ভাবার পরও কোনো হিসাব মিলাতে না পেরে বিরবির করে উঠলো,”এত রাতে কোথায় যেতে পারে ?”

কেমন বমি বমি লাগছে। বুকের ভেতরটায় ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। আচমকা চোখ মেলে তাকিয়ে জোরে জোরে শ্বাস ছাড়লাম। ভেতরের অস্থিরতা কিছুটা দমতেই নজর আটকালো মৃদু অন্ধকারাচ্ছন্ন রুমটায়। সম্ভবত সম্পূর্ণ রুমটা কালোয় মুড়ানো। ভাবতে ভাবতে এক হাত মাথায় রাখলাম। মাথাটা হঠাৎ এত ভার লাগছে কেন? চোখ বন্ধ করে নিজের ভিতরে শ্বাস টেনে নিলাম। অতঃপর একটু সময় নিয়ে ধীরে ধীরে চোখ খুলতেই টনক নড়ল, এটা তো আমার রুম না। তাহলে আমি এখন কোথায়?”
প্রশ্নটা মাথায় আসতেই ধরফরিয়ে উঠে বসলাম। সামনে তাকাতেই নজর আটকালো বিলাসবহুল সিঙ্গেল কাউচটায়। স্বয়ং মাফিয়া বস বসে আছে পায়ের উপর পা তুলে। কালো সুট, কোট ও বুট পড়ে পরিপাটি হয়ে সেজে আছে। তার সামনে সাজানো বিভিন্ন ওয়াইনের সমাহার। কাউচে গা ছেড়ে ওয়াইনের গ্লাসে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছে আর রাজকীয় ভঙ্গিমায় পা নাড়াচ্ছে। তার নিষ্প্রভ চাহনি আমাতেই নিবদ্ধ।
আমি অবাক নয়নে বাকরুদ্ধ হয়ে শুধু তাকিয়ে দেখছি। আমার এমন চাহনি দেখে ইফান বাঁকা হাসল। আমি কিছু বলব তার আগেই ভেসে আসলো ইফানের গলার হাস্কি স্বর,

–“ওয়েলকাম টু মাই স্কাই প্যালেস, বেইব।”
–“স্কাই প্যালেস?”
ইফানের কথার পিছেই অস্পষ্ট আওড়ালাম। ইফানকে এ নিয়ে জিজ্ঞেস করব তার আগেই নজর আটকে যায় রুমে। কারণ রুমে বিশাল বড় কাচের দেয়াল। কাচের দেয়ালটা এমনভাবে চারপাশ জুড়ে বিস্তৃত যে, এখান থেকে শহরের ৩৬০-ডিগ্রি পূর্ণ দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। আমি বেড থেকে স্পষ্ট দেখতে পারছি বাইরে মেঘ ভাসছে। রাত হওয়ায় তেমন স্পষ্ট নয়। তবে মনে হচ্ছে আমি আকাশের সন্নিকটে। দৃশ্যটি বেশ মনোমুগ্ধকর। তাছাড়া বিশাল বড় বড় ভবন চোখের সামনে ঝলঝল করছে। আমি আর কিছু না ভেবে ঝটপট বিছানা থেকে নামতে গেলেই খেয়াল করলাম আমার পড়নে একটা ভারী এক্সক্লুসিভ লাল টকটকে শাড়ি। শাড়িটির মূল আকর্ষণই শাড়ির দামি স্টোন গুলো। শুধু শাড়ি না, আমার দেহে বিভিন্ন ডায়মন্ডের জুয়েলারি। হাতে ডায়মন্ডের ব্রেসলেট, কানের দুল আর গলায় চকার।
আর নিজেকে নিয়ে ভাবতে পারলাম না, চোখ আটকায় বাইরের ভিউ দেখে। হঠাৎ করেই নিচ থেকে উপরে উঠে আসা রংবেরঙের এত্তো এত্তো ফানুস আমার চোখে পড়ে। আমার চোখের আড়াল হয়ে একটু একটু করে অনেকগুলো আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। আমি সময় অপচয় না করে চটজলদি কাচের দেয়ালের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। এত্তো সুন্দর দৃশ্য আমি আমার জীবনে কখনো দেখি নি বোধহয়। চোখের সামনে বিশাল বড় বড় একের পর এক ভবন। সবগুলো ভবনই আশ্চর্যজনক ভাবে সুন্দর। তাছাড়া এখান থেকে পুরো শহর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আর পুরো শহরের উপর আকাশে ভাসছে শত শত আলোকিত বিভিন্ন রকমের ফানুস।

হঠাৎই আমার বুক ধুকপুক করতে লাগল। এত সুন্দর ভিউ, এতো আয়োজন উহু এটা তো বাংলাদেশ হতে পারে না। তাহলে আমি এখন কোথায়? মনের মধ্যে আবারও প্রশ্ন উঁকি দিতেই জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে জলদি পিছনে ইফানের দিকে তাকালাম। ইতোমধ্যে ইফান উঠে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। ইফান আসতে আসতে তার পিছনের বিশাল এলইডি অন হয়ে রাত বারোটা বাজতে থ্রি, টু কাউন্টিং শুরু হল। আমি ইফানের দিকে প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
–“এএটা তো বাংলাদেশ মনে হচ্ছে না। তাহলে আমি কো…”

❝You and I, don’t say goodbye
All we need is one night in Dubai
Close your eyes and dim the lights
All we need is one night in Dubai.❞
আমার বাকি শব্দ মুখেই আটকে গেল। আমি স্তব্ধ হয়ে শুধু এলইডি স্ক্রিনে তাকিয়ে। যখন ওয়ান গোনা শেষ হল তখনই লাউডলি গান বেজে উঠেছে। আর স্ক্রিনে প্রদর্শিত হচ্ছে বিশাল এক ভবন। যেখানে পুরো ভুবনের শীর্ষ থেকে পাদদেশ সবটা জোরে এলইডি স্ক্রিনে ভেসে উঠছে অসম্ভব সুন্দর গ্রাফিক্স এনিমেশন করা একটা লেখা,
“Happy Anniversary My Dear Bulbuli”.

আকাশচুম্বী ভবনটিতে এলইডি স্ক্রিনের পাশাপাশি এলইডি লাইটের শক্তিশালী লেজার বিম ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে সরাসরি আকাশের দিকে ও শহরের অন্য দিকগুলোতে বিভিন্ন রঙের আলো ছুঁড়ে দিচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে পুরো আকাশ এবং শহরটি একত্রে আলোর ঝলমলে উৎসবে মেতেছে। আবার আকাশচুম্বী ভবনটির নিচে বৃহত্তম নৃত্যমান ফোয়ারা। যেখানে ফোয়ারার জলরাশি অনেক উপরে উঠে যাচ্ছে। সেখানে আলো এবং জলের সমন্বয়ে এক মনোমুগ্ধকর শো পরিবেশন হচ্ছে।
আতশবাজির তীব্র শব্দে এলইডি স্ক্রিনে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। আমি ঝটপট পিছনে ঘুরে কাচের দেয়ালে হাত ঠেকিয়ে বাইরের দিকে তাকাতেই আরেক দফা স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আকাশে শত শত ফানুশের ভীড়ে আরও উপরে গিয়ে একের পর এক আতশবাজি বিস্ফোরিত হয়ে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে চারপাশে। আশ্চর্যের বিষয় আতশবাজি বিস্ফোরিত হয়ে আলো বিচ্ছুরিত হতেই একটা অবয়ব প্রদর্শিত হচ্ছে। যেখানে আমি দু হাত মেলে চোখ বন্ধ করে প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুভব করছি। আমার খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে আর আশেপাশে সবটা জুড়ে সরিষা ক্ষেত।

–“সুইটহার্ট।”
ইফান পিছন থেকে এক হাত কাচের দেয়ালে রেখে আরেক হাত দিয়ে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে হাস্কি স্বরে আওড়ালো। আমার ভেতরে অস্থিরতার পাল্লা আরও বাড়তে লাগলো। ইফান আমার কাঁধে তার নাক ঘষে পুনরায় হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,
–“হ্যাপি অ্যানিভার্সারি সুইটহার্ট।”
আমাদের বিবাহবার্ষিকী লোকটার তাহলে ভালো করেই মনে আছে। কিন্তু এখন আমার কি বলা উচিত। আমি কয়েক মূহুর্ত স্থবির হয়ে থেকে হিসহিসিয়ে বললাম,
–“এএটা কোথায়?”
–“দুবাই। নাও উই আর কারেন্টলি স্টেইং অ্যাট মাই পেন্টহাউস অন দ্য ওয়ান-জিরো-এইট ফ্লোর অব দ্য বুর্জ খলিফা।”
–“বুর্জ খলিফা!”
আমি অবাক স্বরে আওড়ালাম। ইফান ঠোঁট কামড়ে বাঁকা হাসল। আমি আবার পিছনে ফিরে বাইরের দিকে তাকালাম। আতর্কিত হয়ে আওড়ালাম,

–“আমি এখন বুর্জ খলিফার ১০৮ ফ্লোরে দাঁড়িয়ে!”
–“ইয়াহ্।”
আমি ইফানের দিকে ঝটপট ঘুরে তাকালাম। কৌতূহল বশত কিছু বলতে গিয়েও বললাম না।বরং চোখ কুঞ্চিত করে শুধালাম,
–“আমি এখানে কি করে আসলাম? আমি তো বাড়িতে ঘুমচ্ছিলাম।”
আমার বোকা কথা শুনে ইফান আমার দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে রইল খানিকটা সময়। অতঃপর আমার ঠোঁটে আলতো চুমু খেয়ে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বলল,
–“হুম ঘুমিয়েছিলে আমি নিয়ে এসেছি।”
ব্যস এটুকু বলেই আমার গলায় মুখ ডুবাতে নিলেই আমি একটু সরে দাঁড়ালাম। ইফান ব্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকাল। আমার চেহারায় এখনো কৌশল দেখে ইফান ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলতে লাগল,
–“লন্ডন থেকে সোজা বিডিতে ব্যাক করি। তারপর তোমাকে নিয়ে প্রাইভেট জেটে করে চার ঘন্টা জার্নি শেষে দুবাই আসলাম।”
কথা শেষ হতেই ইফান হাতের উল্টো পিঠ নাকে ঘষল। আমি চোয়াল শক্ত করে শুধালাম,

–“তুমি ড্রাগস নিয়েছ?”
–“আ’ম ভেরি টায়ার্ড ওয়াইফি। আজ চারদিন হবে ঘুমাই না। রাইট নাউ, আই জাস্ট ওয়ান্ট টু স্লিপ উইথ য়্যু ইন মাই আর্মস।”
ইফান ড্রাগস নিয়েছে শুনে প্রথমে রাগ হলেও এখন একটু শীতল হয়েছে ওর অঘুমাত্মক চেহারা দেখে। ইফান একটু থেমে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে তার সাথে মিশিয়ে আবার বললো,
–“বাট এখন ঘুমানো যাবে না।”
–“কেন?”
ইফান ঠোঁট কামড়ে হেসে হাস্কি কণ্ঠে বলল,”ডু ইউ ওয়ান্ট টু স্লিপ উইথ মি?”
আচমকা ইফানের এমন কথা শুনে থমথমে খেয়ে গেলাম। ইফানকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে লাগলাম। ইফান বাঁকা হেসে তুড়ি বাজাতেই পুরো রুম আলোকিত হল। আমি পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে আশ্চর্য হলাম। কালোয় সজ্জিত অ্যাপার্টমেন্ট। ভারী চমৎকার দেখতে। আমি টায়ার্ড ফিল করছি। আমার এখন ঘুমের প্রয়োজন। আমি বেডে বসতেই গ্লাসে নিজের চেহারা লক্ষ করলাম। অসম্ভব সুন্দর করে মেকআপ করা। ঠোঁটে ডিপ রেড লিপস্টিক। আমি আড় চোখে ইফানের দিকে তাকিয়ে রিনরিন কন্ঠে শুধালাম,

–“আমার ড্রেস কে চেইঞ্জ করেছে ?”
–“আমি ছাড়া আর কেই বা করবে জান। বাই দ্য ওয়ে, আই নোটিসড ইউ’ভ গটেন প্রিটি চ্যাবি ইন জাস্ট আ উইক!”
–“মিথ্যুক।”
আমার কথায় ইফান হেসে ফেলল।আমি মুখ মুচড়ে আবার সারা রুমে দৃষ্টি বুলিয়ে ইফানকে বললাম,
–“শুনেছিলাম স্কাই প্যালেস অপার্টমেন্টগুলো অনেক সুন্দর। এখন দেখছি সত্যিই সুন্দর।”
আমার কথা শেষ হতে না হতেই ইফান এসে আমার সামনে দুই হাঁটু গেড়ে বসল। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই আমার দিকে একটা বক্স এগিয়ে দিল। আমি চোখ তুলে ইফানের দিকে তাকাতেই সে ইশারা করল খুলতে। আমি কপাল কুঞ্চিত করে খুলতেই দেখি কয়েকটি পেপার। আমি পেপারে একবার চোখ বুলাতেই চমকে উঠলাম।
–“এএই স্কাই প্যালেস অ্যাপার্টমেন্টা আমার?”
–“অফকোর্স বেইব। দিস ইজ ফর মাই পার্সোনাল ফেয়ারি। ডিড ইউ লাইক ইট?
–“আমার চাই না।”
মূহুর্তেই ইফানের চেহারার রং বদলে গেল। এক টান মেরে আমার কোমর তার দিকে টেনে নিয়ে চোয়াল শক্ত করে হিসহিসিয়ে বলল,

–“আই রিয়্যালি হেইট দ্য আইডিয়া অব রিজেকশন, অ্যান্ড ইউ নো দ্যাট ভেরি ওয়েল, ডিয়ার।”
ইফান একটু থামলো। অতঃপর হালকা হেসে ফের বলল,”বাই দ্য ওয়ে, ইফ ইউ ডোন্ট লাইক ইট, দ্যাটস ওকে।আই হ্যাভ অ্যানাদার সারপ্রাইজ ফর ইউ। কাম উইথ মি।”
–“কোথায়?”

জাহানারা পর্ব ৬৫

ইফান কোনো উত্তর না করে আচমকা আমাকে পাঁজা কোলে তুলে নিল। অতঃপর অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বের হওয়ার জন্য এগোতে লাগল। আমি ওর গলা জড়িয়ে ধরে কর্কশ কণ্ঠে শুধালাম,
–“কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমায়?”
–“উমম বললামই তো সারপ্রাইজ এন্ড আইল অলসো ইন্ট্রোডিউস য়্যু টু সামওয়ান। লেট’স গো বেইব।”

জাহানারা পর্ব ৬৭