Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ৬৮

জাহানারা পর্ব ৬৮

জাহানারা পর্ব ৬৮
জান্নাত মুন

অভিজাত্যের এক অনন্য আবেশে ঘেরা এই অত্যাধুনিক সুইমিং পুল এরিয়া। অগণিত ফেইরি লাইটের মায়াবী বিস্তার যেন এখানে এক স্নিগ্ধ আলোর নহর বইয়ে দিচ্ছে। পুলের অভ্যন্তরে দর্পণ-সম স্বচ্ছ পানিতে ধরা দিয়েছে আশেপাশের মোহময় প্রতিচ্ছবি। ফেইরি লাইটের ঝকঝকে আলোকছটা সেই জলের বুকে মেতেছে এক অপূর্ব জলকেলিতে। আর এই থৈথৈ স্বচ্ছ পানিতে দৃশ্যমান দুটি মানবীর অবয়ব।
ইফান আর আমি পুলের কিনারে একত্রে বসে আছি। ইফান কিছুক্ষণ আগে এক বোতল ওয়াইন হাতে করে নিয়ে এসেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ড্রিংক করে সে আমায় তার ব্যাক স্টোরি শোনাবে। ড্রিংক না করলে নাকি বলার সময় মজা আসবে না। অতঃপর লোভ সামলাতে না পেরে ইফানের সাথে আমিও ঢকঢক করে কয়েক গ্লাস খেয়ে নিলাম।
এখন আমার অবস্থা আরও বেগতিক। নেশার ঘোর এমনভাবে জেঁকে ধরেছে যে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি। এমনকি নিজের শরীরের ভারসাম্যটুকুও ঠিক রাখতে পারছি না। অতঃপর দুলতে দুলতে ইফানের কাঁধে মাথা ঠেকালাম। মূহুর্তেই নাকে এসে হানা দিল পুরুষালি ক্লোনের তীব্র গন্ধ। সেই সাথে নেশাটা যেন এবার আমায় আরও জেঁকে ধরেছে।

আমি দু’হাতে ইফানের গলা জড়িয়ে ধরলাম। তারপর লোকটার ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে জোরে শ্বাস টেনে নিলাম। এই লোকটার দেহের তীব্র ঘ্রাণে এবার নিজেকে আরও মাতাল মাতাল লাগছে। ইচ্ছে করছে লোকটার আরও কাছে যাই। এতটা কাছে যাই যেন তার অতলে সম্পূর্ণ তলিয়ে যেতে পারি। আমি সহসা নড়েচড়ে ইফানকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। অতঃপর লোকটার ঘাড়ে আমার কোমল ওষ্ঠগুলো ছুঁয়ালাম। মূহুর্তেই ঠোঁটের কাছে ওয়াইনের গ্লাস ধরে রাখা ইফানের হাতটা থমকে গেল। হালকা চোখ আমার দিকে ঘুরাতেই দেখল আমার স্নিগ্ধ মুখশ্রী। থা’প্পড়ের আ’ঘাতে কে’টে গিয়ে কিছুটা ফুলে উঠা গোলাপ রঙা আমার ঠোঁট জুড়ে স্নিগ্ধ হাসির রেশ। পরোক্ষণেই ইফানের নজরে পড়ল আমার র’ক্তাভ গালে। তখনকার থা’প্পড়ের ফলে গালে তারই পাঁচটি আঙুলের ছাপ দৃশ্যমান।
ইফান এক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে নিল। এরপর সেখানে এক পশলা নিস্তব্ধতা। যেন এক ক্ষীণ কালের নৈরাজ্য। ইফান তার শীতল ও উদাস চোখে তাকিয়ে রইল পুলের সেই স্বচ্ছ পানির দিকে। তারপর এক বিষণ্ণ স্বরে আনমনে বলতে লাগল…

চৌধুরী বাড়ির পূর্বপুরুষরা জমিদার ছিল। সেই তখন থেকেই চৌধুরীরা যৌথ পরিবারে বসবাস করে। চৌধুরী বাড়ির দুই কর্তা ইদলিস চৌধুরী এবং নাওয়ান চৌধুরী। ইদলিস চৌধুরীর দুই পুত্র সন্তান– ইকবাল চৌধুরী এবং ইরহাম চৌধুরী। আর নাওয়ান চৌধুরীর দুই কণ্যা সন্তান– নুলক চৌধুরী এবং নাবিলা চৌধুরী। নাবিলা চৌধুরী যখন ষোড়শী তখন উনার মা মারা যায়। অতঃপর নাওয়ান চৌধুরীর দুই সন্তানকে রোকেয়া বেগম নিজের মেয়েদের মতো আগলে রাখতে শুরু করে।

নাবিলা চৌধুরী সবেমাত্র পা রেখেছে সপ্তদশীর আঙিনায়। রূপ আর গুণের এক অনন্য মোহনীয়তায় সে যেন এক পরিপূর্ণা রমণী। বাবার কনিষ্ঠ কন্যা হওয়ায় গৃহকোণে তার আদরের সিংহাসনটি ছিল সবার ওপরে। তার চলন-বলন আর আভিজাত্যে এমন এক টান ছিল, যা অনায়াসেই সবার নজর কেড়ে নিত। আর ঠিক এই কারণেই নাবিলা চৌধুরীকে ইকবাল চৌধুরীর মনে ধরে। সময় তার আপন মহিমায় বয়ে চলে; ধীরে ধীরে নাবিলা চৌধুরী বুঝতে পারে যে ইকবাল চৌধুরী তাকে পছন্দ করে। কিন্তু বিপত্তি ঘটে হঠাৎ একদিন।
সেদিন বাড়িতে ছিল শুধু নাবিলা চৌধুরী। রোকেয়া বেগম নুলক চৌধুরীকে নিয়ে ভাইয়ের মেয়ের বিয়েতে চলে যায়। নাবিলা চৌধুরীর পরদিন কলেজে পরীক্ষা থাকায় যেতে পারে নি। এরজন্য অবশ্য তিনি খুশিও হয়েছিল। কারণ বেশি মানুষ তার একদমই পছন্দ না। মেয়েটার মা মারা যাওয়ার পর পরই কেমন একটা গুটিয়ে যায়। একা-একা থাকা তার বড্ড পছন্দ। তিনি সেই রাতে একটা পর্যন্ত পড়া সব কমপ্লিট করে শুয়ে পড়ে।

রাত প্রায় দু’টোর দিকে। টালমাটাল অবস্থায় বাড়ি ফিরে ইকবাল চৌধুরী। তাগড়া যুবক ; পারিবারিক ব্যবসার পাশাপাশি রাজনীতিতে যোগ দিয়েছে সবে। তখন লোকটার মধ্যে ছিল বেপরোয়া ভাব। মদ্যপান করায় মস্তিষ্ক তখন বুদ হয়ে আছে নেশার তোড়ে। তাই কোনো দিক-বেদিক বিবেচনা না করে ঢলতে ঢলতে চলে আসে নাবিলা চৌধুরীর রুমের সামনে। বারবার দরজায় করাঘাত করতে থাকে। নাবিলা চৌধুরী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। যখন দরজায় বেশি আওয়াজ হতে শুরু করে তখন ধরফরিয়ে উঠে বসে। এখনো মেয়েটার ঘুমের রেশ কাটেনি। বরং ঘুমের ঘোরেই হেলেদুলে দরজা খুলে দেয়। তৎক্ষনাৎ মেয়েটার তনুদেহে এসে হেলে পড়ে ইকবাল চৌধুরী। চোখ জুড়ে জেঁকে বসে থাকা নিদ্রা এবার ছুটে পালায়। অতর্কিত হয়ে উঠে। মেয়েটা চিৎকার করবে কিংবা কাউকে ডাকবে তারও ফুরসত হয়ে উঠে না। বরং দরজা বন্ধ করে মেয়েটাকে বিছানায় নিয়ে ফেলে। অতঃপর নেশায় বুদ হয়ে থাকা লোকটা একটা বাক্যই আওড়ায়,

–“নবুরে তোরে আমার বড্ড ভালো লাগে। আজ যে তোরে আমার চাই।”
অনেক আকুতি মিনতি করেছিল সপ্তদশী মেয়েটা। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় নি। বদলে যায় নাবিলা চৌধুরী। আগে যাও মানুষের সাথে যতটুকু মিশতো তাও বন্ধ হয়ে যায়। একদম চুপ আর নিস্তব্ধ হয়ে যায়। চালচলনে প্রকট হয় এক গম্ভীর্য আর দাপটে ভাব। ঐ রাতের জন্য পরে ইকবাল চৌধুরী ক্ষমা চায় আর কথা দেয় নাবিলা চৌধুরীকে বিয়ে করবে।

সময় গড়াতে থাকে নিজ গতিতে। নাবিলা চৌধুরী বাধ্য হয়ে মেনে নেয় এই সম্পর্ক। মেয়েটা স্বপ্ন বুনতে থাকে খুব শীগ্রই একটা সাজানো গুছানো সংসার হবে তার। ভালোবেসে ফেলে ইকবাল চৌধুরীকে। ইকবাল চৌধুরী কথা দেয় এইচএসসি পরীক্ষার পরপরই নাবিলা চৌধুরীকে বিয়ে করবে। সবই ভালো যাচ্ছিল কিন্তু হঠাৎই ইকবাল চৌধুরীর মধ্যে একটু একটু করে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এখন আর রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে মেয়েটার কাছে আসে না। কথাও তেমন হয় না। ভালোবাসা বিনিময় তো দূরের কথা।
তাদের সম্পর্কের পাঁচ মাস চলছে। সামনে এইচএসসি ফাইনাল পরীক্ষা। এদিকে মেয়েটার শরীরের অবনতি হতে থাকে। দিনের পর দিন শুকিয়ে গায়ের রং ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ একদিন বাড়ির কর্তারা সকলকে জানায় আগামীকাল নুলক চৌধুরীর সাথে ইকবাল চৌধুরীর আকদ সম্পন্ন হবে। তারপর নুলক চৌধুরী অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ ফাইনাল দিলেই আনুষ্ঠানিক বিয়ে সম্পন্ন হবে। নাবিলা চৌধুরীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। সেই যে গিয়ে ঘরে ঢুকে আর বের হওয়ার নাম নেই।

এদিকে রোকেয়া বেগম তো খুশিতে আটখানা। উনার সইয়ের বড় মেয়ে নুলক চৌধুরী কে নিজের পুত্র বধু করবে তাই। নুলক চৌধুরীর জন্মের সময়ই ওদের বিয়ের কথা পাকা করে রাখা হয়। নুলক চৌধুরীও বেজায় খুশি। সে যে ছোট থেকেই ইকবাল চৌধুরীকে পছন্দ করে। এদিকে ইকবাল চৌধুরী তার বাবার সাথে গোপনে কথা বলে এই বিয়েতে অমত জানায়। ইদলিস চৌধুরী এক কথার মানুষ। তিনি সেদিন স্পষ্ট বলে দেয়– তার ভাইয়ের মেয়েকেই বিয়ে করতে হবে। নাহলে ত্যাজ্য পুত্র করবে। বাধ্য হয়ে বিয়েতে রাজি হয়। অতঃপর পরদিন ঘরোয়া ভাবে আকদের আয়োজন হয়। যখন সাক্ষীর প্রয়োজন হয় তখন খুঁজ হয় নাওয়ান চৌধুরী অনুপস্থিত।
সকলের অপেক্ষার দেড় ঘন্টা পর নাওয়ান চৌধুরী উপস্থিত হয়। তবে একা নয়; নিজের আদরের ছোট মেয়েকে সাথে নিয়ে। তিনি স্পষ্ট বলে দেয় নুলকের সাথে নয়, নাবিলার সাথে ইকবাল চৌধুরীর বিয়ে হবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, নাবিলা চৌধুরী প্রায় চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

নাবিলাকে দেখতে না পেয়ে নাওয়ান চৌধুরী রুমে গিয়ে দেখে– মেয়েটা আ”ত্মাহ”ত্যা করতে চাইছে। তারপর যখন সব শুনলো তখন নাওয়ান চৌধুরী বরফের মতো জমে যায়।
উপস্থিত সকলেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। ইদলিস চৌধুরী ক্রোধে ছেলের গালে সপাটে থা’প্পড় মা’রে। তারপর সেইদিনই নাবিলা আর ইকবাল চৌধুরীর বিয়ে হয়। নুলক চৌধুরী সেইদিন থেকেই একদম চুপ হয়ে যায়। তার চেহারা এতটাই নির্লিপ্ত থাকত যে তার মনে কখন কি চলে কেউ ঠাহর করতে পারে না। সে কখনো নাবিলা চৌধুরীকে দোষ দেয় নি। কিংবা কারো প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে নি।
বিয়ের কয়েক মাস যায়, কিন্তু ইকবাল চৌধুরীর সাথে নাবিলা চৌধুরীর বনিবানা হয় না। ইকবাল চৌধুরী ঠিকঠাক বাড়িতে আসে না। আসলেও নাবিলা চৌধুরীর সাথে ঝামেলা হয়। ইকবাল চৌধুরী রাগের বশে নাবিলা চৌধুরীর গায়ে হাতও তুলত। ইকবাল চৌধুরীর ভাষ্যমতে, কেন নাবিলা চৌধুরী বিয়ের আগে বাচ্চা নেওয়ার মতো এত বড় সিদ্ধান্ত নিলো?

নাবিলা চৌধুরী হাউমাউ করে কেঁদে ইকবাল চৌধুরীকে বুঝাতে চাইতো,”বাচ্চা হঠাৎই পেটে চলে আসে। এতে তার কোনো হাত ছিলো না। তারপর সে যখন জানতে পারে তখন কিছু করার নেই।”
ইকবাল চৌধুরী নাবিলার গাল চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে বলে উঠতো,”তাহলে নষ্ট করে দিতে।”
নাবিলা চৌধুরী তখন স্তব্ধ হয়ে ব্যথাতুর নয়নে ইকবাল চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে থাকত। এই লোকটা এতটা নিষ্ঠুর! কিন্তু সে তো হতে পারবে না। কিভাবে সে নিজের সন্তান কে মা’রবে? তাই তো সে এতটা পাষাণ হতে পারে নি।

নাওয়ান চৌধুরী ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কি সেই অসুখ তা ডাক্তাররাও বুঝে উঠতে পারছে না । তবে নাওয়ান চৌধুরী বুঝতে পারে– আয়ু হয় তো ফুরিয়ে আসছে। তিনি ঠিক করেন যত দ্রুত সম্ভব নুলকের বিয়ে দিতে হবে। বিশাল সম্পদের মালিক নাওয়ান চৌধুরী ; তাই বিশ্বস্ত একজন ছেলে খুঁজছিল। অনেক ভাবার পর মনে পড়ে তিনি যেমন ছেলে চান তেমন ছেলে তার হাতের কাছেই আছে।

পলক কাইসার ; তখনকার সময়ে মাফিয়াদের জগতে শক্তিশালী মাফিয়া হিসেবে সদ্য নিজের নাম লিখান তিনি। নাওয়ান চৌধুরী যখন থেকে পলককে চিনে তখন পলকের বয়স বারো কি তেরো। বাপ মা হারা দরিদ্র ঘরের ছেলে পলক। নাওয়ান চৌধুরী বিজনেসের একটা কাজে দিল্লি যায়। তখন তার নজরে পড়ে কিশোর পলককে। ছেলেটাকে মালিক অনেক বকাঝকা করছে। যেই গায়ে হাত তুলবে তখনই নাওয়ান চৌধুরী তাকে বাঁচায়। আহা কি মায়াবী, কৃষ্ণ বর্ণ গায়ের রং। পলক তখন নাওয়ান চৌধুরীকে কেঁদে কেঁদে সব কিছু বলে। পলককে তার পারিশ্রমিক ঠিক মতো দেয় না। তারপর চাইলে মা’রধর করে অনেক। নাওয়ান চৌধুরী নিজের হাত থেকে পলককে কয়েক হাজার টাকা দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। পলক সেদিন ভেজা নয়নে নাওয়ান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলেছিল,

–“ম্যাঁ আপকো কভী নহীঁ ভুলুঙ্গী, বাবু।”
যেই কথা সেই কাজ; নিজের ক্ষমতা অর্জন করে ঠিকই নাওয়ান চৌধুরীকে খুঁজে বের করে পলক কাইসার। এর পর থেকে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে তাদের যোগাযোগ থাকে। পুরো বিশ্বের কাছে আতংকের নাম পলক কাইসার হলেও নাওয়ান চৌধুরীর কাছে ছিল স্নেহের সন্তানের মতো।
হঠাৎ এক দুপুরে নাওয়ান চৌধুরী পলক কাইসারকে চৌধুরী ম্যানশনে নিয়ে আসে এবং নুলকের বিয়ের প্রস্তাব দেয়। নুলক পলক কাইসারের সাথে বিয়ের আলোচনা হচ্ছে দেখে সবার সামনে বলে উঠে,

–“বাপি এটা তুমি একদম ঠিক করছ না। আমি মরে গেলেও এই কাল্লুকে বিয়ে করব না।”
কিন্তু শেষ রক্ষা হয় নি। নাওয়ান চৌধুরী জোর করে ওদের বিয়ে দিয়ে ছাড়ে। তারপর পলক কাইসার নুলক চৌধুরীকে সোজা লন্ডন নিয়ে চলে যায়। বিয়ের প্রথম রাতেও পলক কাইসারকে প্রত্যাখ্যান করে নুলক চৌধুরী। পলক কাইসার সাংঘাতিক একজন মাফিয়া হয়েও একজন নারীর থেকে প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে পারছিল না। নুলক চৌধুরী আঙুল তুলে বলে,
–“ছি আপনার মতো কল্লুর সাথে আমি আর ঘর, ইয়াক! আপনাকে দেখলেই তো আমার বমি পাচ্ছে।”
জীবনে প্রথম আসা নারীকে পাওয়ার জন্য নাইট ক্রিম সহ যত ধরনের ফেসিয়াল আছে সব করতে থাকে পলক কাইসার। উদ্দেশ্য একটায়, স্ত্রীর মন পাওয়া।

দেখতে দেখতে নাবিলা চৌধুরী এখন নয় মাসের গর্ভবতী। গলগলে বেশ বড় পেট তার। মেয়েটার চোখেমুখে এক উদাস আর লুকানো ব্যথার ছাপ। তার জীবনে আর কোনো রং অবশিষ্ট নেই। সব যেন সময়ের সাথে সাথে ফিকে হয়ে গেছে। রোজ রোজ ইকবাল চৌধুরীর সাথে তার অশান্তি হয়। ইকবাল চৌধুরী হিং’স্র পশুর মতো অন্তঃসত্ত্বা রমণীর গায়ে হাত তুলে। লোক ল’জ্জায় কাউকে কিছু বলতেও পারে না। কাকেই বা বলবে? তার তো এখন আর মা বোন নেই। নাওয়ান চৌধুরীর শরীরের অবস্থা দিনে দিনে আরও খা’রাপ হচ্ছে। দীর্ঘ শ্বাস ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
রাত নয়টা বাজে। আজ দুদিন পর ইকবাল চৌধুরী বাড়িতে ফিরেছে। ইকবাল চৌধুরী বেজার মুখ নিয়ে রুমে ঢুকতেই চরম অধিকার বোধ নিয়ে নাবিলা চৌধুরী শুধালো,

–“কোথায় ছিলে তুমি?”
–“তা তোমাকে বলতে বাধ্য নই।”
তক্ষুনি নাবিলা চৌধুরী তড়িৎ বেগে ছুটে এসে ইকবাল চৌধুরীর পাঞ্জাবির কলার চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠে,”আলবাত তুমি বলতে বাধ্য। তুমি বাড়ির বাইরে কি কর তা বুঝি আমি জানি না। এই সত্যি করে বল– আর কোন মেয়ের সর্বনাশ করছ তুমি?”
এভাবেই শুরু হয় ঝগড়া। একপর্যায়ে ইকবাল চৌধুরী নাবিলা চৌধুরীকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিয়ে গর্জে উঠে, “তোকে আমি ডিভোর্স দিব। তারপর ওকে এই বাড়িতে আমি বিয়ে করে নিয়ে আসব।”
পেটের যন্ত্রণা শুরু হয়েছে মেয়েটার, তবুও পেটে হাত ধরে উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,”আমি ওকে সব বলে দিব। তবুও যদি ও তোমার জীবন থেকে না সরে তাহলে ওকে আমি মেরে ফেলব।”

কথা-কাটাকাটি থেকে ঝগড়ার শুরু হলেও এক পর্যায়ে ভয়ংকর দিকে ধাবিত হয়। রাগে হিতাহিত হয়ে আচমকা নাবিলা চৌধুরীর পেটে লা’থি মারে ইকবাল চৌধুরী। তৎক্ষনাৎ গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠে ন-মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়েটা। ইকবাল চৌধুরী এই অবস্থায় নাবিলা চৌধুরীকে ফেলে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায়। রোকেয়া বেগম নামাজের মধ্যে চিৎকার শুনতে পেয়ে নামাজ বাদ দিয়েই দৌড়ে উপরে আসে। এসে র’ক্তাক্ত অবস্থায় ফ্লোরে নাবিলা চৌধুরীকে পড়ে থাকতে দেখে আতংকে উঠে। অতঃপর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

গরু জ’বাই করলে যেমন অস্থির আর মৃত্যু যন্ত্রণায় চেঁচায়, ঠিক তেমন বেহাল অবস্থা নাবিলা চৌধুরীর। হাসপাতালে নিতেই তাকে সি সেকশনে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই নাবিলা চৌধুরীর পেট থেকে একটা রুগ্ন ছেলে শিশু বের করে আনে ডাক্তাররা। বাচ্চার সারা দেহে কেমন যেন রক্ত জমাট বেঁধে গেছে মনে হচ্ছে। ছোট্ট মুকুলের মতো হাতটা নড়বড়ে ; অর্থাৎ ভাঙা। বাচ্চা নাড়াচাড়া কিংবা কান্নাকাটি করছে না। ডাক্তাররা হতাশ হয়ে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে একে অপরের দিকে চোখাচোখি করে ঘোষণা করল মৃত। অতঃপর একজন নার্স অসহায় চোখে বাচ্চাটাকে দেখতে দেখতে মেডিকেল তুলায় রাখলো। যখন তুলো দিয়ে ঢেকে দিবে তক্ষুনি মনে হল বাচ্চাটা একটু মুভ করেছে। পরোক্ষণেই নার্স লক্ষ্য করল বাচ্চাটার পেটও মুভ করছে। নার্স চিৎকার করে উঠতেই ডক্টররা এসে দেখল বাচ্চাটা জীবিত। তবে অবস্থা অতি সংকটজনক। দ্রুত বাচ্চাটাকে কাচের বাক্সের মতো যন্ত্রের ভেতর রাখা হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে ইনকিউবেটর।

নাবিলা চৌধুরীর জ্ঞান নেই। ডাক্তাররা সন্দিহান মেয়েটা বাঁচবে কি না! এখন পর্যন্ত মেয়েটার দেহে একের পর এক ব্যাগ রক্ত দেওয়া হচ্ছে। মেয়েটা বোধহয় আর বাঁচবে না। এক দিন, দুই দিন, তিন দিন– বাঁচবে না, বাঁচবে না বলেও ছাব্বিশ দিন চলে গেল। আগের ন্যায় আইসিইউ তে পড়ে আছে মেয়েটা। সাতাইশ দিনের মাথায় জ্ঞান ফিরে। চোখ খুলতেই লক্ষ করে এক রমণী তার বেডের পাশে বসে ঝিমচ্ছে। নাবিলা চৌধুরী মেয়েটাকে চেনারও চেষ্টা করলো না। আচমকা তার হাত চলে যায় পেটে। নেই, তার বাচ্চা পেটে নেই। মূহুর্তেই দুর্বল শরীরের রমণী হাউমাউ করে কেঁদে উঠে সন্তানের খুঁজ করতে লাগল। বসে থাকা মেয়েটার সবে চোখটা লেগেছিল। তবে হঠাৎ চিৎকারে ভরকে যায়। নাবিলা চৌধুরী ঝটপট করে হাতের স্যালাইন লাগানো ক্যানুলা খুলতে উদ্ধত হয়। বসে থাকা মেয়েটা ঝাপটে ধরে শান্তনা দিয়ে বলতে লাগল,

–“আপা, ও আপা আপনি একটু শান্ত হন। আপনার ছেলে সুস্থ আছে।”
মূহুর্তেই থমকে গেল নাবিলা চৌধুরী। ছেলে, তার ছেলে? সে ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছে? মা হওয়ার আনন্দে চোখগুলো মূহুর্তেই জ্বলে উঠলো তার। এতদিন পর তার ওষ্ঠপুটে উদয় হলো হাসির। নাবিলা চৌধুরী ঝলঝল চোখে তাকালো মেয়েটার দিকে। মেয়েটারও চোখ দুটো জলে ভরে এসেছে। পরোক্ষণেই মেয়েটা লক্ষ করল নাবিলা চৌধুরী অদ্ভুত নজরে তাকিয়ে। মেয়েটা কাচুমাচু হয়ে বলে উঠলো,
–“আআমি মনিরা বেগম। আপনার দেবরের স্ত্রী।”
কদিন হলো ইকবাল চৌধুরী হঠাৎ করেই মনিরা মেয়েটাকে চৌধুরী ম্যানশনে নিয়ে আসে। সকলে চরম অবাক ইরহাম চৌধুরীর কান্ড দেখে। বাড়িতে বিপদের শেষ নেই এদিকে ছেলে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে। সবাই কৈফিয়ত চাইলে বলে,”মনিরার সাথে আগে থেকেই সম্পর্ক। এখন বাড়িতে এই অবস্থায় একজন মহিলা থাকলে সুবিধা হবে রোকেয়া বেগমের। তাই বিয়ে করে নিয়ে আসা।”

মনিরা বেগম নাবিলা চৌধুরীকে শান্ত করে শুইয়ে দিয়ে ডাক্তার কিংবা নার্সদের খবর দিতে যায়। কয়েক মিনিটের মাথায় মনিরা বেগম ডাক্তার নিয়ে আসে। কিন্তু ঘটে আরেক বিপত্তি। কক্ষের কোথাও নাবিলা চৌধুরী নেই। সকলে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে। এদিকে নাবিলা চৌধুরী নিজের দুর্বল দেহ নিয়ে ছুটে ছেলের কাছে আসছে। হসপিটালের জরুরি বিভাগ থেকে অ্যানাউন্সমেন্ট করা হচ্ছে ২১৩ নাম্বার বেবিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। নাবিলা চৌধুরীর কানে তার নাম আসতেই পাগলের মতো ছুটছে। আপাতত তার খেয়াল নেই সে যে সিজারের পেসেন্ট। সকল ব্যথা যন্ত্রণা তাকে ছুঁতে পারছে না। পা ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে যে র’ক্ত গড়িয়ে পড়ছে তারও কোনো হদিস নেই তার। আজ সকল কিছুর উর্ধ্বে তার সন্তান। তার নারী ছেঁড়া ধন।

নার্সিং কাউন্টারে আসতেই থমকে যায় রমণীর পা। এইতো বেডে শুইয়ে আছে একটা ফুটফুটে বাচ্চা। বাচ্চার বাম হাতে ব্যান্ডেজ করা। মূহুর্তেই কেঁপে ওঠে রমণীর বুক। কাঁপা কাঁপা পায়ে ভেতরে ঢুকতেই হু হু করে কেঁদে উঠে মেয়েটা। পেসেন্টকে এমন বিধস্ত অবস্থায় দেখে আঁতকে উঠে উপস্থিত সকল নার্স। তড়িঘড়ি করে নাবিলা চৌধুরীকে সিটে এনে বসায়। নাবিলা চৌধুরী তাকায় নিজ সন্তানের দিকে। ছোট্ট আঁখি জোড়া পিটপিট করে তাকেই দেখছে। নাবিলা চৌধুরীর বুকে যেন কেউ পাথর চাপা দিয়ে ধরল। ছেলের এমন করুণ অবস্থা দেখে কান্নায় বুক ফেটে যাচ্ছে। আরও জোরে হু হু করে কেঁদে উঠে মেয়েটা। গাল বেয়ে এক-দু ফোটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ে বাচ্চাটার মোমের মতো কোমল গালে। তক্ষুনি বাচ্চাটা ঠোঁট ভেঙে মৃদু স্বরে ডেকে উঠে,

–“এ্যা”
এবার যেন বাঁধ ভাঙলো। সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। ছোট্ট কোমল মুখশ্রীতে অসংখ্য চুমুতে ভরিয়ে দিল। ভেজা কন্ঠে নিজ সন্তানকে আশ্বাস দিতে লাগলো,
–“আমার বাজান। আমার নারী ছেঁড়া ধন। এই তো আমি বাবা। আর কোনো কষ্ট হবে না। আম্মু তোমাকে আর কোনো কষ্ট পেতে দিবে না। আমার সোনা বাজান।”
ছোট্ট দুধের শিশু খুব কাঁদল তখন। হয় তো জন্মদাত্রীকে কাছে পেয়ে তার সব অভিযোগ ঢেলে দিল।

সময় গড়ায় সম্পর্ক আর ঠিক হয় না। লোকে বলে, মনের উপর কারো জোর কাটে না। ইকবাল চৌধুরীর ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। সে যে অন্য নারীতে ডুবে। তার সকল ধ্যান জ্ঞান সেথায় পড়ে থাকে সবসময়। তার মন আর নাবিলার তরে ফিরে না। কত কত অগুনিত রাত সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে বসে অপেক্ষা করে গেছে স্বামী নামক পাষাণ লোকটার আশায়। ফিরে না, স্ত্রী সন্তানের খবর নেয় না। নাবিলা চৌধুরী গুমরে গুমরে কাঁদে। মাকে কাঁদতে দেখে ঠোঁট ফুলিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে ছোট্ট ইফান।

একমাস দুমাস করে বছর ফুরিয়ে আসে। ছোট্ট ইফান এখন হাঁটতে জানে একটু একটু। মুখ ভরে ডাকে মা,দাদা, দাদি, নানা আরও বেশ কিছু ডাক সে আয়ত্ত করে নিয়েছে। তবে ভুলেও সে আজ অব্ধি বাবা বলে ডাকে নি। কি আশ্চর্য বিষয়! এইটুকু ছেলেও কি বুঝে গেছে বাবা তাকে ভালোবাসে না? নাকি তার চোখের সামনে দিনের পর দিন জন্মদাত্রীকে বাবা নামক পাষাণ লোকটার জন্য কষ্ট পেতে দেখে মন উঠে গেছে। কি জানি?
দেখতে দেখতে মনিরার ঘরে মাহিনের আগমন হলো। আহা নিজ সন্তানকে নিয়ে ইরহাম চৌধুরীর সে কি আহ্লাদ। ছেলেকে কোলে নিয়ে হেঁটে হেঁটে গল্প করে। কবিতা শুনায়, তো কখনো গান শুনায়। সদ্য হাঁটতে শেখা ইফান ছোটো ছোটো পায়ে হেঁটে যখন ছোট ভাইকে দেখতে আসে তখন এই দৃশ্য দরজার বাইরে থেকে আড়ালে দেখে। তার চাচ্চুর মতো তো তার বাবা তাকে কখনো কোলে নেয় নি। এভাবে আদর করে গান শুনায় নি। ইরহাম চৌধুরীর যখন আচমকা দরজার দিকে নজর পড়ে তখন হেসে ছোট্ট ইফানকে ডেকে উঠে,

–“চাচ্চু এসো এসো, আমার কাছে এসো।”
ছোট্ট ইফানকে আর পায় কে। এলোমেলো পায়ে এক দৌড়ে তার মায়ের কাছে চলে যায়। সবাই তাকে ভালোবাসে তাহলে তার বাবা কেন তাকে ভালোবাসে না? ছোট্ট ইফানের মনে কত শতবার প্রশ্ন জাগে, তবে উত্তর নেই।
এক শীতকালীন রাতের কথা। চৌধুরী বাড়ির ছাঁদে সকলে পিকনিক আয়োজন করেছে। সবার কথা রাখতে ইকবাল চৌধুরীও সামিল হয়। তারপর আবারো সেই আগের কাহিনি ঘটে। কথা কাটাকাটি থেকে এক পর্যায়ে নাবিলা চৌধুরীর গায়ে হাত তুলার জন্য উদ্ধত হয় ইকবাল চৌধুরী। তক্ষুনি ছোট্ট ইফান তার বাবার পায়ে ছোট ছোট হাতে থা’প্পড় মা’রতে মা’রতে ঠোঁট ফুলিয়ে বলতে থাকে,

–“আমায় আম্মুলে চার। মাইয়াবাম তরে।”
ছোট সন্তানের এমন কথায় মস্তিষ্ক ক্রোধে ফেটে পড়ে। ফলস্বরূপ রাগে নিজের সকল হুঁশ জ্ঞান হারিয়ে ছোট্ট ইফানকে ছুড়ে ফেলে দেয় দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা অগ্নিশিখার উপর। এতক্ষণ সকলে আরেক দিকে আনন্দ ফুর্তি করছিল বলে খেয়াল করে নি নাবিলা চৌধুরী আর ইকবাল চৌধুরী আবারো ঝামেলা করছে। খেয়াল করলেও কেউ পাত্তা দেয় নি। কারণ রোজকার ঘটনা। কিন্তু হঠাৎ চিৎকার শুনে সবার আগে আগুনের মধ্যে ইফানকে খেয়াল করে মনিরা বেগম। হাতের সকল জিনিস ফেলে ছুটে গিয়ে আগলে নেয় ছোট্ট বাচ্চাটাকে। ছোট্ট ইফানের পিঠে, হাতে-পায়ে সহ দেহের অনেক জায়গা ঝলসে যায়। ইফানকে বাঁচাতে গিয়ে মনিরা ইসলামেরও হাত পুড়ে।
আস্তে আস্তে নাওয়ান চৌধুরী মৃত্যু সজ্জায় ধাবিত হয়। তবে তার বেশ কিছুদিন আগে থেকে একলা ঘরে গুমরে গুমরে কাঁদত। সেই দৃশ্য আড়াল থেকে নাবিলা চৌধুরী বেশ কয়েকবার দেখেছে। মনে মনে নিজেকে হাজার বার তিরস্কার করতো বাবার দুঃখের কারণ হওয়ার জন্য। নাওয়ান চৌধুরী নাবিলা চৌধুরীকে নিয়ে শেষ সময়ে প্রচুর ভাবতেন। যদি তিনি মারা যায় তাহলে মা হারা মেয়ের কি হবে?

অতঃপর জীবনের অন্তিম লগ্নে এসে মেয়ে নাতির হাতে একটা ফাইল ধরিয়ে দেয়। সেখানে তার কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি মেয়ে ও নাতির নামে করে দেয়। সকলেই অবাক হয় সেদিন। কারণ এক কানাকড়িও নুলক চৌধুরীর জন্য রেখে যান নি নাওয়ান চৌধুরী। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগ মূহুর্তেও নাবিলা চৌধুরীকে নাওয়ান চৌধুরী কিছু একটা বলতে চেয়েছিল। আফসোস সেই কথা আর শুনা হয় নি নাবিলা চৌধুরীর। তার আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে নাওয়ান চৌধুরী।
সেই এক্সিডেন্টের পর ইফানের সুস্থ হতে অনেক সময় লাগে। তখন থেকেই ছোট্ট ইফান মা ছাড়া কারো সাথে কথা বলতো না। সারাদিন চুপচাপ মায়ের আঁচল ধরে থাকত। যেন নাবিলা চৌধুরীকে সে আড়াল করলেই মা হারিয়ে যাবে।
তারপর কিছু একটা ঘটে। নাবিলা চৌধুরী বাধ্য হয় সন্তানকে লন্ডনে দিতে। ইফানের দায়িত্ব নেয় পলক কাইসার। পলক কাইসার নাবিলা চৌধুরীকে আপন বোনের থেকেও বেশি স্নেহ করে। তাই নাবিলা চৌধুরী ভরসা পায়। তিনি ভেবেছিল ছেলেটা সেখানে ভালো শিক্ষা পাবে। কখনো কল্পনাও করে নি পলক কাইসার ছোট্ট ইফানকে মানুষ গড়ার নয় মানুষ মা’রার কারিগর তৈরি করবে। তারপর থেকে শুরু হয় ইফান চৌধুরীর জীবনের কালো অধ্যায়।

মাফিয়ারা আর পাঁচটি সাধারণ মানুষের মতো কখনোই জীবন অতিবাহিত করতে পারে না। তাদের জীবন হয় দুর্ধর্ষ। পলক কাইসার ঠিক সেভাবেই ইফানকে তৈরি করতে শুরু করে। প্রথম কয়েক বছর ছোট্ট ইফান কিছুটা স্বাভাবিক জীবন পেলেও বয়সের সাথে তাকে বিভিন্ন কঠোর প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। ইফানের যখন সাত বছর তখন থেকেই প্রশিক্ষণের শুরু। ছোট্ট ছেলেটার দেহে একটু একটু করে ড্রাগস পুশ করা হতো। অন্ধকার গা ছমছমে ঘরে একা বন্দি করে রাখা হতো দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। বরফের পাত্রে তাকে চুবিয়ে রাখা হয় ঘন্টার পর ঘন্টা। মুক্তির জন্য কতই না চেঁচাতো ছেলেটা। কিন্তু কেউ তার প্রতি সদয় ছিল না। এভাবে সহ্য ক্ষমতার পালাক্রমে সময় বাড়তে থাকে। একজন মাফিয়া সদস্য তৈরি হতে হলে, নিজেকে প্রতিকূল অবস্থায় টিকিয়ে রাখতে হলে এগুলো সহ্য করতেই হবে। ইফানকেও করতে হয়েছিল।

বিভিন্ন ধরনের কঠিন কাজ দেওয়া হতো তাকে। কখনো ইফানের শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে রক্ত ঝরতো; তো কখনো সহ্য না করতে পেরে জ্ঞান হারাতো। কেউ ছিলো না ইফানের। তাকে একা একাই সুস্থ হয়ে উঠতে হতো। একবার পলক কাইসার একটি মিশনে চলে যায়। সেই সুযোগে শত্রুরা ইফানকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর ইফানের জীবনে ঘনিয়ে আসে আরেক অমাবস্যা।

ছেলেটাকে ঠিক মতো খাবার দেওয়া হতো না। যাও একবার খাবার জুটতো তাও আবার পঁচা দুর্গন্ধ যুক্ত। ক্ষুধার তাড়নায় সেই অখাদ্যগুলোই অমৃতের মতো খেত। এমনও দিনের পর দিন গেছে ইফানকে টানা কদিন খাবার দেওয়া হতো না। পেটের দায়ে রুমের ভেতরে যেসব পোকামাকড়, মাকড়সার জাল পেত তাই খেয়ে নিতো। কখনো আবার খালি মেঝেতে চেটে চেটে মেঝেতে লেগে থাকা ময়লাগুলোও খেতো পেটের দায়ে। আবার অধিক তৃষ্ণা আর সইতে না পেরে হাত-পা কামড়াতো। সেখান থেকে র’ক্ত বেরিয়ে আসতেই চেটেপুটে খেয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করত । অনেক ভ’য়ানক ড্রাগসও দেওয়া হতো দিনের পর দিন। যন্ত্রণায় কাতরাতো ছেলেটা। কখনো আবার ইফানকে চাবুক দিয়ে মে’রে র’ক্তাক্ত করে সেইখানে লবণ মরিচ দিয়ে দিত। কি মরণ য’ন্ত্রণায় না ছোট বাচ্চা ছেলেটাকে দেওয়া হতো! প্রথম প্রথম খুব কাঁদত ইফান । মা, মা করে চেঁচাতো। আল্লাহ, আল্লাহ করে এই যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে চাইতো। কিন্তু কেউ তাকে বাঁচাতে আসে নি।

মনে জেদ বাসা বাঁধে ছেলেটার। সে আর কাউকে ডাকে না তাকে উদ্ধার করার জন্য। আর সে তার স্রষ্ঠার কাছেও বাঁচার জন্য প্রার্থনা করে না। সে মনে মনে বিশ্বাস করতে শুরু করে তার কেউ নেই। কেউ না। এভাবে প্রায় সাত মাসের মতো শত্রুরা ইফানকে টর্চার করে। পলক কাইসার সেই যে মিশনে গিয়েছিল তখন আ’হত হয়ে হাসপাতালে তিনমাসের মতো পড়ে থাকে। পেন্ট হাউজে ফিরে যখন জানে ইফানকে শত্রুরা তুলে নিয়ে গেছে তখন আরও ভ’য়ংকর রুপ নেই লোকটা। তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকে ইফানকে। অনেকের ধারণা ছিল বাচ্চাটাকে মে’রে ফেলা হয়েছে। কিন্তু পলক কাইসার মানতে নারাজ। অনেক খুঁজে শত্রুদের হাত থেকে উদ্ধার করে আনা হয় ইফানকে।
এইটুকু ছেলে অথচ তার দেহে ছিল শতশত তরতাজা আ’ঘাতের দাগ। শরীরে প্রায় পচন ধরবে এমতাবস্থা। পলক কাইসার ইফানকে উন্নত চিকিৎসা দিয়ে পুনরায় সুস্থ করে। আর তারপর থেকেই সকলে ইফানের কর্মকান্ডে চরম অবাক হয়। ছেলেটা আর কাউকে পরোয়া করে না। আ’ঘাত করলে মুখ থেকে একটা শব্দও উচ্চারণ করে না। চেহারায় নেই কোনো অনুভূতির রেশ। যেন এক জীবন্ত পাথরের মূর্তি। বরং ইফানকে কেউ আ’ঘাত করতে চাইলে সে হয়ে উঠে হিংস্র জন্তুর মতো। হামলে পড়ে, অপরপক্ষের জান কবজ করার আগ পর্যন্ত সে থামে না।

অল্প বয়সেই খু’নে পারদর্শী হয়ে উঠে ইফান। শুধু খু’ন করা নয়; সে হয়ে উঠে অতি ধূর্ত। পলক কাইসার তখন ইফানকে ফ্রান্স পাঠায় আরেকজন মাফিয়া ডনের কাছে। সেখানে ইফানকে আরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হতে থাকে। প্রতিদিনই একে ওকে মা’র্ডার করার মতো নির্দেশ আসে। ইফান সব পরীক্ষায় সফল হতে থাকে। হঠাৎ একদিন ঐ মাফিয়ার সাথে ইফানের ঝামেলা হয় কিছু একটা নিয়ে। ফলস্বরূপ ইফানকে থা’প্পড় মা’রে। মূহুর্তেই ইফানের মধ্যে হিং’স্র সত্তা জেগে উঠে। অতঃপর ঐ মাফিয়াকে খু’ন করে হয়ে উঠে ঐ গ্যাং এর লিডার গ্যাংস্টার ইফান চৌধুরী।
আঠারো বছর বয়সেই গড়ে তুলে নিজের শক্তিশালী টেরোরিস্ট গ্যাং ব্ল্যাক ভেনম। ভেনম ভয়ংকর এক প্রাণঘাতক বি’ষ। আর সেই বি’ষ স্বয়ং মাফিয়া বস ইফান চৌধুরী। কালো দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে তার বিস্তার। সকলের মুখে আতংকের আরেক নাম মিস্টার ভেনম।

এবার ইফান ফ্রান্সেই ঘাটি বাঁধে। যত দিন যায় ইফানের পাপের পাল্লার সাথে পরিচিতিও বাড়তে থাকে। তবে ইফান চৌধুরী হিসেবে নয়; ইয়াং মাফিয়া টেরোরিস্ট গ্যাং ব্ল্যাক ভেনম এর লিডার মিস্টার ভেনম হিসেবে।
এক রাতের কথা; ইফানকে শত্রু পক্ষ আ’ক্রমণ করে রাস্তায়। ইফান সচরাচর ছদ্মবেশে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়ায় বিভিন্ন কাজের জন্য। তাই এসব কাজে তার গার্ডের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু কিভাবে যেন শত্রুরা খবর পেয়ে যায়। ইফান আ’হত অবস্থায় প্যারিসের একটি লোকাল বাসে আশ্রয় নেয়। বাসে যখন আইসি কার্ড দিয়ে ভাড়া দিতে হবে তখনই খেয়াল করে তার কাছে কার্ড নেই। কিন্তু আইসি কার্ড দিয়ে ভাড়া না দিলে তো তাকে উঠতে দিবে না। বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষে বিরবির করে অ’শ্রাব্য গা’লি দিতে থাকে,

–“ওহ্ শীট।”
ইফান বাস থেকে নামার জন্য পিছন ফেরার আগেই খেয়াল করলো কেউ একজন পরপর দুবার কার্ড ছুঁয়ালো মেশিনে। কপাল কুঞ্চিত হয় ইফানের। পরক্ষণেই কানে আসে এক যুবকের কন্ঠস্বর,
–“ডোন্ট ওয়ারি, ব্রাদার। আই’ভ অলরেডি পেইড। প্লিজ গো অ্যান্ড টেক ইয়োর সিট।”
ইফান যুবকটির দিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করলো না। বরং সিটের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে অ’শ্রাব্য ভা’ষায় বিরবির করতে লাগল,
–“দ্যাট বা’স্টার্ড ইজ শোইং মি ফা”কিং কাইন্ডনেস। হোয়াট আ স্টুপিড অ্যাসহোল!”

ইফানকে কোনো বাক্য বিনিময়হীন এভাবে চলে যেতে দেখে যুবকটি অতি আশ্চর্য হয়ে বিরবির করে আওড়ালো,”একটা ধন্যবাদ দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করলো না? ফ্রান্সের মানুষ এত অদ্ভুত কেন?”
কাঁধের ব্যাগটিকে আরেকটু উপরে তুলতে তুলতে ঠোঁট উল্টালো যুবকটি। অতঃপর গিয়ে ইফানের পাশের সিটে বসল। ঘাড় ঘুরিয়ে ইফানের দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করল ইফানের চেহারা দেখার জো নেই। কালো হুডি মাথা অব্দি টানা। মুখে মাস্ক লাগানো। যুবকটি মনে মনে আওড়ালো, “কি অদ্ভুত লোকরে বাবা!”
পরক্ষণেই চোখ আটকালো ইফানের হাতে। ইফান শক্ত করে তার বাম হাত ধরে আছে। আর বাম হাত দিয়ে তরলের মতো চুইয়ে চুইয়ে তাজা র’ক্ত পড়ছে। যুবকটি আঁতকে উঠে চেঁচাতে যাবে তক্ষুনি ইফান মুখ চেপে ধরে ক্রোধিত ধূসর বাদামী আঁখি যোগল যুবকটির উপর স্থির করে। চোয়াল শক্ত করে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,

–“শাট ইয়োর ফা’কিং মাউথ, ইউ ব্যা’স্টার্ড।”
যুবকটি শান্ত হয়ে মৃদু স্বরে বললো,“ইউ আর ইনজার্ড। ইউ নিড মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট।”
ইফান আগের ন্যায় চোয়াল শক্ত করে বসে রইলো, কোনো বাক্য বিনিময় করল না। যুবকটি হতাশ হয়ে নিজের গলা থেকে স্কার্ফটি খুলে ইফানের আহত হাত যত্নসহকারে বেঁধে দিল। ইফান হঠাৎই স্থবির হয়ে গেল। ইফানের কলুষিত জীবনে এই প্রথম কেউ একজন তাকে সিমপ্যাথি দেখাচ্ছে। খুব যত্ন করে তার হাত ধরে আহত স্থানে বেন্ডেজ করে দিচ্ছে।
পরক্ষণেই ইফানের চোয়াল শক্ত হয়ে আসল। ছেলেটার দুঃসাহস দেখে সে অবাক । ইফান এবার চোখ তুলে যুবকটির দিকে তাকাল। অসম্ভব মায়াবী দেখতে শ্যাম বর্ণের যুবকটি। ইফানের দৃষ্টি আটকালো যুবকটির নয়নের পানে। এই চোখ দুটোই বলে দিবে যুবকটি ঠিক কতটা সহজ সরল। ভীষণ মায়াবী দেখতে।

–“আই হোপ দ্য ব্লিডিং উইল স্টপ নাউ।”
যুবকটির কন্ঠ কানে আসতেই ভ্রম কাটল ইফানের। ইফান আ’হত হাত গুটিয়ে আবার চুপচাপ বসে রইল। এবারো চরম অবাক হলো যুবকটি। খানিকটা সময় বাদে এক হাত বাড়িয়ে মৃদু হেসে বলে উঠলো,
–“আই অ্যাম জায়ান শেখ নীরব, ফ্রম বাংলাদেশ।”
ইফান হাত মেলানো তো দূর, একবারো তাকিয়েও দেখল না। এবার আর অবাক হলো না জায়ান। সে এতক্ষণে বুঝে গেছে এখানকার মানুষগুলোই বড় অদ্ভুত। তারপর সবার আগেই মাঝ রাস্তায় ইফান বাস থেকে নেমে যায়।
ফ্রান্সের অন্যতম নামকরা ইউনিভার্সিটি হলো “ইউনিভার্সিটি পিএসএল”। জায়ান এই ভার্সিটিতে পড়ে। সে সবচেয়ে ভালো স্টুডেন্টের কাতারে অন্যতম একজন। ভদ্র, সভ্য এবং ভালো স্টুডেন্ট হওয়ায় ভার্সিটির প্রফেসররা সহ ভার্সিটির মেয়েদের প্রথম ক্রাশ জায়ান শেখ নীরব। মেয়েরা সারাক্ষণ জায়ানের পিছু পিছু ঘুরঘুর করে। তাই জায়ান ছিল অনেকের ভীষণ অপছন্দের মানুষ। বড়লোক ঘরের একটা মেয়ে জায়ানকে খুব পছন্দ করত। আর সেই মেয়েকে ভার্সিটির আরেকজন প্রভাবশালীর ছেলে পছন্দ করে। কিন্তু মেয়েটা সেই ছেলেকে বারবার রিজেক্ট করে জায়ানের জন্য।

একদিন ভার্সিটিতে সবে আসতেই মাঠের মধ্যে কয়েক দল ছেলেপুলে জায়ানকে ঘিরে ধরে। তাদের প্ল্যান জায়ানকে মে’রে এমন অবস্থা করা যাতে আর ভার্সিটি মুখো হতে না পারে। অতঃপর জায়ানকে সকলের সমনে মা’রধর করতে থাকে। কয়েকটি মার খেতেই যখন জায়ানের দেহ নেতিয়ে পড়ে তখন অনুভব করে তার দেহে আর আ’ঘাত লাগছে না। চোখ তুলে তাকাতেই দেখে– তাকে এতক্ষণ মা’রতে থাকা ছেলেদেরকে একটা ছেলে খুব বাজেভাবে মা’রছে এবং কেউই ছেলেটার গায়ে হাত তুলার সাহস দেখাচ্ছে না। জায়ান যখন ছেলেটার চোখের দিকে তাকায় তখনই মনে পড়ে যায়, এই ছেলেকে তো সে কয়েক মাস আগে বাসে দেখেছে। তারমানে ছেলেটা আজ সেই দিনের উপকার তাকে ফেরত দিচ্ছে? জায়ান ভাবনায় বিভোর তক্ষুনি ইফান হাত বাড়িয়ে দেয় তুলার জন্য। আজ বড্ড আশ্চর্য হলো জায়ান, ইফান নিজ থেকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে!

জাহানারা পর্ব ৬৭

জায়ানকে উঠতে না দেখে ইফান নিজেই বাহু ধরে দাঁড় করিয়ে দিল। অতঃপর জায়ানকে প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্রে দিয়ে বিনা বাক্যে চলে যেতে লাগল। তখন পিছন থেকে জায়ান বলে উঠে, “থ্যাঙ্ক ইউ।”
ইফানের পা থামে। সে প্যান্টের পকেটে দু’হাত গুঁজে জায়ানের দিকে তাকায়। আজও ইফানের মুখে মাস্ক লাগানো। তাই জায়ান বুঝতে পারল না– মাস্কের আড়ালে ইফানের ঠোঁটের বাঁকা হাসি। ইফান সাহসা ভারিক্কি কন্ঠে বলে উঠলো,
–“নো নিড, দিস ওয়াজ পেব্যাক।”

জাহানারা পর্ব ৬৯