Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ৯

জাহানারা পর্ব ৯

জাহানারা পর্ব ৯
জান্নাত মুন

সকাল থেকে আমি, পলি আর ছোট কাকি মনিরা বেগম– রোকেয়া বেগমের ঘরে বসে আছি। ইতিও থাকতো। কিন্তু নাবিলা চৌধুরী জোর করে স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েছে। আমিও কিছু বলি নি। কারণ সে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। এদিকে ইতিকে স্কুলে পাঠিয়ে তারপর নাবিলা চৌধুরী ম্যাম সাহেব সেজে অফিসে চলে গেছে ছোট ছেলের সাথে। আর শ্বশুর মশাই, কাকা শ্বশুর মশাইও নাস্তা করে ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে যায়। বাসায় আছি বলতে আমি দাদি, পলি, কাকি আর ঐ হা’রামজাদাটা। সকালে যে একবার রুমে ঢুকেছিল আর বের হয় নি। আমিও আর দেখতে যাইনি। লতা গিয়েছিল খাবারের কথা জিজ্ঞেস করতে। কিন্তু সে নাকি বাহির থেকে খেয়ে এসেছে।

–“নাতবউ আজকে কিন্তু বউমাকে দারুণ ধুয়ে দিছ।আমি তো ওর সাথে জীবনেও এমনে কথা বলতে পারি নাই। আল্লাহ তোমারে একখান বড় কলিজা দিছে।”
দাদির কথা শুনে মৃদু হাসলাম। মনে মনে ভাবলাম, আমার পার্সোনালিটি তো এমন ছিল না। তাহলে হঠাৎ কেন আমার এমন পরিবর্তন? আমি প্রতিবাদী বাট অভদ্র তো আর না। হ্যাঁ, হয়তো একটা কালরাতই আজ আমার এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী। নাবিলা চৌধুরী যদি সুসন্তান জন্ম দিতো, তাহলে তো আমার জীবনটা এমন হতো না।
এদিকে দাদির কথায় পলি আর কাকিও হাসতে লাগলো। মনিরা বেগম বললো,

–“মা আপনি যা বললেন। সকালে যখন জাহানারা কাবিনের টাকা আপার মুখে ছুঁড়ে দেওয়ার কথাটা বললো তখন আমার এমন হাসি পেল কি বলবো। কত কষ্ট করে যে হাসি আটকে রাখছি।”
মনিরা বেগমের কথায় পলিও সুর টেনে বললো,
–“হ্যাঁ গো কাকিয়া, মা’র মুখ দেখে আমারও প্রচুর হাসি পেয়েছিল। বিয়ের আজ সাত মাস হতে চললো। আজকের মতো মার মুখ কখনো দেখিনি।”
–“আচ্ছা পলি তোমার বয়স তো বেশি না। আমার চেয়েও বয়সে অনেক ছোট হবে। তাহলে এত অল্প বয়সে বিয়ে করার কারণ কি ছিলো?”
আমার কথা শুনে পলি মুখটা গোমরা করা ফেললো।কাকিয়া ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। আমি পলির অন্ধকার চেহারা দেখে বললাম,

–“ইট’স ওকে আমাকে বলতে হবে না। আমার কারণে হার্ট হয়ে থাকলি আ’ম সরি।”
আমার কথায় পলি তৎক্ষনাৎ আমার হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলে উঠলো,,
–“আরে না ভাবি সরি বলার কিছু নেই। আসলে ঐদিনটার কথা মনে পড়লে একটু খারাপ লাগে। তবে আমার উনার সাথে বিয়ে হওয়ায় আমি এখন অনেক খুশি। উনি আমাকে অনেক ভালোবাসেন। আসলে তখন আমি ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে সবে ভর্তি হয়েছি। আমার বাবা না থাকায় অনেক কষ্ট করে সংসার ও আমার পড়াশোনা চলে আরকি। আমার বড়ভাই আমার চেয়ে দু বছরের বড়। আপনার দেবরের থেকেও ছোট। আব্বুর আগে মোদির দোকান ছিল। বর্তমানে এটা ভাইয়া চালায়। প্রতিদিন ভাইয়া বারোটার পরে বাসায় আসে। সেইদিন আম্মু বাসায় ছিলো না। নানুর অসুস্থতায় জন্য নানুকে দেখতে গিয়েছিলো। আর ভাইয়াও বাসায় নেই । আমি ঘরের সব দরজা জানলা বন্ধ করে পড়ছিলাম। ভাইয়া আসলে খাবার দিয়ে ঘুমিয়ে পড়বো। তখন রাত বারোটার দিকে হঠাৎ ঘরের দরজায় শব্দ হয়। আমি ভাইয়া ভেবে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দেই। দরজা খুলতেই দেখি উনি দাড়িয়ে আছে। পড়নে পাঞ্জাবি পাইজামা। আমি ভয় পেয়ে দরজা বন্ধ করতে নিলেই উনি বলে উঠেন,,

–“এটা কি পলাশের বাসা না?”
ভাইয়াকে খুঁজছে ভেবে আমি দরজা হালকা ফাঁক করে দাড়ালাম। বললাম, “হ্যাঁ এটাই পলাশের বাড়ি।” তখন উনি বললেন ভাইয়াকে ডেকে দিতে। আর বলতে মন্ত্রীর ছেলে ইমরান চৌধুরী এসেছে। আমি বললাম ভাইয়া দোকানে আছে।তখন উনি বললো,,
–“ওহোহো, তাহলে তো ভুল সময়ে চলে আসলাম। আসলে আপনার ভাইয়ার দোকান থেকে আমাদের কর্মীরা ফিল্ডে কাজ করার সময় বাকিতেই খেয়ে চলে যাচ্ছে। আমি এই পথ দিয়েই যাচ্ছিলাম। তাই ভাবলাম ঘুরে দোকানে না গিয়ে এখানে টাকা দিয়েই সোজা বাসায় চলে যাবো। আচ্ছা একটা কাজ করেন, আপনি পলাশকে টাকাটা দিয়ে বলবেন ইমরান চৌধুরী দিয়ে গেছে। আরো লাগলে পরে দিয়ে দিবো।”

উনি আমার কাছে একটা টাকার ভান্ডেল দিলেন। যেখানে ৫০হাজার টাকা ছিলো। উনি যখন চলে যাবেন তখনই পাশের বাসার দু’জন কাকিমা আটকে দেয় এবং চিৎকার করে সব লোক জড়ো করে। তাদের কথা অনুযায়ী, “আমি ইমরান চৌধুরীর সাথে অপকর্ম করে টাকা নিয়েছি। আর সেটা তারা দেখেছে।”
তারপর যা হয়। প্রতিবেশীরা আমাদের আটকা দেয়।আর এই খবর পেয়ে একে একে সবাই আসে। বাবা মানে শ্বশুর বাবাও আসলেন। সকলে কথা বলার পর বুঝতে পারে প্রতিবেশীরা আমাকে আর ইমরানকে ভুল বুঝেছে। কিন্তু মেয়ে মানুষ কে কি কথা শুনাতে ছেড়ে দেয় পাড়া প্রতিবেশীরা? সবাই জানাজানি হয়ে যাওয়ায় সেইদিনেই ভোর সারে চারটায় আমাদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। এর পর যা হয় আরকি? মা প্রচুর ক্ষ্যা’পে যায় আমার উপর। আমি নাকি উনার ছেলেকে ফাঁ’সিয়ে উনার ছেলের বউ হয়েছি।
পলির এই ঘটনা সবাই জানে। আমার জন্য পলি আবার বললো। আমি মনযোগ দিয়ে শুনলাম। দাদি ও কাকিয়াও শুনলো। পলির ঘটনাটা আসলেই দুঃখজনক। কিন্তু বিশ্বাস করেন ভাই আমার সাদা মনে একটাই কালা কথা ঘুরছে, চৌধুরী বাড়ির সব ছেলেপুলেরা কি খালি কট খেয়েই বিয়ে করে নাকি?

দুপুর ১২টার উপরে বাজে আর কত অন্যের রুমে বসে দিন কাটানো যায় ? এখন তো নিজের রুমে যেতে হবে। কিন্তু এখন কি করবো? ইফান চৌধুরী নামক শয়তানটা তো এখনো রুমে না জানি কি করছে? সকালে যে অ’সভ্য লোকটার ইয়ের মধ্যে হাঁটু মে’রেছিলাম, এখনো মনে থাকে যদি তাহলে তো ঘরে ঢুকলেই আমার খবর করবে। আর এইদিকে নিজের জামা কাপড় কিছুই নিয়ে আসলাম না। পলির একটা শাড়ি পড়ে আছি। এখন দুপুরে গোসল করে কি পড়বো? আরেকটা শাড়ি কি পলির কাছে চাইবো? না থাক কেমন দেখাবে। আর ওর কাপড়ই বা আমি কেন পড়বো? যে বিয়ে করে এনেছে তার তো পয়সার অভাব নেই।

মনে মনে কথাগুলো ভাবতে ভাবতে সিদ্ধান্ত নিলাম এখন রুমে যাবো। আর ঐ ইফান চৌধুরী কে বলবো, আমার জামা কাপড় কিনে দেওয়ার জন্য। নিজের পয়সা কেনই বা খরচ করতে যাব হাহ্।
শুকনো ঢুক গিলে নিজের মনে সাহস জুগিয়ে এসে দাঁড়ালাম ইফানের রুমের দরজার সামনে। যতই হোক পুরুষ মানুষের সাথে কি আর শরীরের জোরে পারা যায়? দরজার সামনে আরো কিছু সময় দাঁড়িয়ে হিজিবিজি চিন্তা করলাম। তারপর আস্তে করে দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। কিন্তু কেউ নেই। ওমা অসভ্য লোকটা কখন বাসা থেকে চলে গেল? আমি বিছানার দিকে এগিয়ে চাদরটা ঠিক করতে লাগলাম। তখনই কারো ফোনালাপ কানে আসলো। তারমানে লোকটা বাসা থেকে এখনো বের হয়নি, এখানেই আছে। আমি আস্তে আস্তে বেলকনির দিকে এগোলাম। তখনই কানে আসলো ইফান চৌধুরীর ফোনালাপের কিছু কথা।

জাহানারা পর্ব ৮

❝সারারাত ঘুমাতে পারি নি ঐ সো’য়া’রের বাচ্চা কে খুঁজতে খুঁজতে। এখন বাসায় একটু ঘুমাচ্ছিলাম আর তুই শা’লা তাও করতেদিলি না।❞

জাহানারা পর্ব ১০