জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৬
তোনিমা খান
একজনের প্রতি হাজার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে হারাতে না পারার ব্যর্থতাকেই বোধহয় ভালোবাসা বলে!
বুকের ভেতর আঁছড়ে পড়া ভয়ের ছমছমে নীরবতা ভেদ করে বিন্দু শুকনো ঢোক গিলল। ক্ষণকাল পূর্বে সে যাকে ছেড়ে যাওয়ার মতো ভয়ঙ্কর কথা ভেবে ফেলেছিল, পরবর্তী মুহুর্তেই তাকে হারানোর ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে।
বিন্দু নিজের বিস্ময়কর ভয়ার্ত অনুভূতি সামলে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল,
‘আপনি এখানে কেন এসেছেন?’
মেঘের মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে গেল সুশ্রী গড়নের নারীটির মুখ বিবর্ণ হতে দেখে। ওই মুখে ভয় স্পষ্ট! কিন্তু তার মুখে কোনো দ্বিধা দেখাগেল না। তাকে যেমন কষ্ট দেয়া অসম্ভব, তেমনি তার দ্বারা কষ্ট পাওয়ায় অসম্ভব! সে স্মিত হেসে বলল,
‘আমার খুব ইচ্ছে ছিল তালহার যাকে পাগলের মতো ভালোবাসে তাকে একটাবার সামনাসামনি দেখার। এবং তার মতো আমিও মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি। আপনি তালহারের বর্ণনার থেকেও বেশি সুন্দর!’
বিন্দু এমন জবাবের আশা করেনি। তাই তার ভেতরটা সংকোচে মিইয়ে রইল। ইদানিং খুব সহজে তার কারোর উপর বিশ্বাস আসে না। যেখানে তার স্বামী-ই মস্তবড় এক মুখোশধারী।
সে জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করল। সৌজন্যতার সাথে বলল,
‘ভেতরে আসুন।’
মেঘ নাকচ করল না। ভেতরে এসে চারিদিকে চোখ বুলালো। প্রথমবার যখন এসেছিল সেদিন তার মন ভুল বলেনি। এটা কোনো এক নারীর যত্নে মোড়া সংসার। সে পিছু ফিরে তাকালো। বিন্দু দরজা আঁটকাতেই প্রিশা এক লাফে তার কোলে উঠে গেল।
বিন্দু তাকে বুকের সাথে আগলে নিয়ে কফিটা রেখে দিল। প্রিশা মায়ের গলায় জিভ ছুঁইয়ে আদর করে দিল। বিন্দু স্বভাবসুলভ আদরের সাথে প্রিশার মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
মেঘ অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে দেখল মা মেয়ের ভালোবাসার বিনিময়। ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘আপনি ওর মা তাই না?’
বিন্দু মুখ তুললো।
‘হুম।’
মেঘের স্বচ্ছ চোখদুটো চিকচিক করছে। পুনরায় জিজ্ঞেস করে,
‘ওর নাম কী?’
বিন্দু সৌজন্য হেসে বলল,
‘প্রিশা।’
‘আপনি রেখেছেন?’
‘হুম।’
‘সুন্দর নাম। তালহার বলেছিল, ওর নাম নাকি ওর মা রেখেছে। আমি তখন জানতাম না ওর নামের মতোই ওর মাও খুব সুন্দর।’
মেয়েটির মুখে একের পর এক প্রশংসায় বিন্দু জড়তায় মিইয়ে গেল। মেঘ কেন এসেছে? কী চাইতে এসেছে? তার এই সংসার? তার স্বামী?
সে যন্ত্রণায় জড়িয়ে আসা কণ্ঠে বলল,
‘বসুন।’
‘আমি আপনার ছোট। তুমি করে বলতে পারেন।’
বিন্দু ভেতরের দ্বন্দ্ব ভুলে স্মিত হাসল। বলল,
‘বসো। কী খাবে?’
‘আমি শুনেছি আপনার হাতের রান্না খুব সুস্বাদু। তালহার কখনোই আপনার রান্না ব্যতীত বাইরের খাবার খায়না। যদি সম্ভব হয় আপনার হাতে রান্না করা কিছু খাওয়াবেন?’ ,মেঘ চঞ্চল দৃষ্টি ফেলে বলল।
নিঃসংকোচ আবদার। বিন্দু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সে যে এত সহজ, বন্ধুসুলভ আচরণ নিতে পারছে না তা স্পষ্ট তার চোখেমুখে। সে চোখের পলক ফেলে ধাতস্থ কণ্ঠে বলল,
‘অবশ্যই। কিন্তু তালহার বাইরের খাবার খেতে পছন্দ করে না। আমার রান্না ব্যতীত খায়না এমনটা নয়।’
মেঘ মৃদু হাসল। বলল,
‘হয়তো আপনি এমনটা জানেন। কিন্তু সত্যিটা এটাই যে— তালহার আপনার হাতের রান্না ব্যতীত অন্য কোনো খাবার খায় না।’
‘তুমি তো আমার থেকেও আমার স্বামীকে বেশ ভালো চেনো।’
বিন্দু যতটা হাসিমুখে কথাটা বলল তার ভেতরটা ঠিক ততটাই ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল। তার স্বামীকে কেউ তার থেকে বেশি চেনে—স্ত্রী হিসেবে এর থেকে বড় ব্যর্থতা আর কী হতে পারে?
মেঘ নির্নিমেষ চেয়ে বলল,
‘কারণ সে আমার খুব ভালো বন্ধু।’
‘শুধু বন্ধু?’
‘হ্যাঁ।’
মেঘ দৃঢ় কণ্ঠে বলল।
‘কারণ তাকে একবার আমি ভালোবাসার সংজ্ঞা জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে উত্তরে বলেছিল, ‘ইটস বিন্দু’।
রাতভর যে না খেয়ে তার অপেক্ষা করে—সেটা ভালোবাসা।
তার শাড়ি পরিহিত বিন্দুকে পছন্দ। এরপর থেকে বিন্দু আর কখনো শাড়ি ছাড়া কিছু পরেনি। এটা ভালোবাসা।
রান্না করতে না পারা মেয়েটি শুধুমাত্র তালহারের জন্য রান্না শিখেছে। এটা ভালোবাসা।’
মেঘ একের পর এক ভালোবাসার অদ্ভুত সংজ্ঞা বলে যাচ্ছে। আর বিন্দু এক দৃষ্টিতে চেয়ে তা শুনছে। এগুলো সে জানে। সে এটাও জানে তালহারের কাছে সে এমন একটা দুনিয়া যাকে সে খুব যত্ন সহকারে আগলে রাখে। কিন্তু এটাই কী ভালোবাসার সংজ্ঞা?
সে ধিমি কণ্ঠে বলল,
‘একটা মানুষ আমায় ভালোবাসে এটা আমি বাদে পুরো দুনিয়া জানে। এটা কেমন ভালোবাসার সংজ্ঞা? তুমি এগুলো আমায় কেন বলছ যেগুলো আমি আগে থেকেই জানি!’
‘কারণ, আমি শুনেছি আপনি আমার কারণে তালহারকে অবিশ্বাস করে ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।’
‘আর তাই তালহার তোমায় আমার কাছে পাঠিয়েছে?’
‘উহু, তালহার জানে না আমি এসেছি। এমনকি সে এটাও জানে না, আমি এই বাসার ঠিকানা জানি।’
বিন্দু মৃদু হাসল। এতক্ষণ বাদে সে খেয়াল করল মেয়েটির চোখ চিকচিক করছে। সে বলল,
‘আমি যখন তালহারের জীবনে আসি তখন সে একজন মানুষরূপী যন্ত্রের মতো ছিল। যে কি-না হ্যাঁ আর না ছাড়া কোনো কথা বলত না। আমি তখনি বুঝে গিয়েছিলাম সে কেমন। তাই আমি নিজেকে তেমনি গড়ে তুলেছি। তার থেকে বিন্দুমাত্র ভালোবাসার আশা না করেই আমি তাকে ভালোবেসে গিয়েছি। এরপর তিন বছরের পরিবর্তে আমি এক অন্য তালহারকে পেয়েছিলাম। যে কথায় নয় কাজে ভালোবাসা প্রকাশ করত। যে আমার কাছে আসলে এক অন্যরকম সত্তা হয়ে যেতো। আমি তাতেই নিজেকে সবচেয়ে সুখী একটা মেয়ে মনে করতাম। তালহার আমায় খুব ভালোবাসে। এটা নিয়ে আমার কখনো সন্দেহ কিংবা অভিযোগ ছিল না। আর না এখন আছে। আমার কারোর কোনো সাফাইয়ের প্রয়োজন নেই। সে স্বামী হিসেবে বেস্ট! আমি কখনোই চাইনি সে সারাদিন আমায় ‘ভালোবাসি বলুক… কিন্তু!’
বিন্দু দৃঢ় কণ্ঠে এতটুকু বলেই থেমে গেল। কিন্তু অভিযোগটা ঠিক কোন জায়গায় তা বলল না। একজন বাইরের মানুষকে সে বলবে না, সে তার স্বামীর ভালোবাসার ধরণকে ভালোবাসে না। তার স্বামী তার ভেতরকার মাতৃত্বটাকে তিলে তিলে মেরে ফেলছে। ভালোবাসার দোহাই দিয়ে তার মাতৃত্ব, তার ইচ্ছা অনিচ্ছার গলা টিপে ধরে।
সে যাকে সবটুকু দিয়ে ভালোবেসেছে সে পরিবর্তে তার এতটুকু ইচ্ছার সম্মান তো করতেই পারত?
মেঘ অস্ফুট স্বরে আওড়ালো,
‘কিন্তু?’
বিন্দু মলিন হেসে বলল,
‘কিছু না। তুমি বসো আমি কিছু রান্না করছি।’
মালা তখুনি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসল। বলল,
‘ভাবিজান, দুইটা আনারস আনছে না? তার একটা একটু পঁচা! ফয়সাল ভাই দেইখা কেনে নাই।’
‘আপনি যাওয়ার সময় আনারস দুটোই নিয়ে যাবেন।’
‘ক্যান? আপনি খাইবেন না? আপনার তো পছন্দ।’
‘নাহ। আপনি নিয়ে যান।’
‘ভাইজান ও খাইবে না?’
‘তালহার আনারস খায়না আপনি জানেন না, আপা?’
বিন্দু বিরক্ত নিয়ে বলল। পরপরই বলল,
‘গরুর মাংস কেটে ধুয়ে দিন তাড়াতাড়ি।’
‘জি।’
মালা আড়চোখে মেঘকে দেখতে দেখতে বলল। আরেব্বাস! এই তো সেই মেয়ে!
বিন্দু পুনরায় মেঘের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আমি রান্না করছি তুমি অন্যকিছু খাও। আইসক্রিম, জুস, মিষ্টি?’
মেঘ মলিন হেসে না বোধক মাথা নাড়লো। বলল,
‘আমার আপনার হাতের রান্না খাওয়ার খুব ইচ্ছা।’
বিন্দু এক পলক শান্ত দৃষ্টি ফেলে রান্নাঘরে চলে গেল। মেঘ সেদিকে তাকিয়ে রইল। নারীটি দেখতে আর পাঁচটা মেয়ের মতোই সাধারণ। কিন্তু তার মনে হচ্ছে এই নারীটির থেকে অসাধারণ মেয়ে আর কেউ নেই। কারণ নারীটিকে তালহার ভালোবাসে। নিশ্চয়ই সে বিশেষ!
সে নিজেকে কিছুতেই দমাতে পারেনি তালহারের ভালোবাসাকে এক পলক কাছ থেকে দেখার জন্য। সে শুধু তফাৎ দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু তফাৎ তাদের বাহ্যিক অবয়বে নয় বরং ভাগ্যে!
মেঘের চোখ বেয়ে টুপ করে এক ফোঁটা অশ্রু গড়ালো। যেটা সে পড়ার আগেই মুছে ফেলেছে। সে টলটলে নেত্রে ফিসফিসিয়ে আওড়ালো,
‘আপনি যত সুন্দর তার থেকেও আপনার ভাগ্য সুন্দর!’
বিন্দু খুব দ্রুততার সাথে ভুনা খিচুড়ি আর গরুর মাংস রান্না করল। মালা ফিসফিসিয়ে বলল,
‘ভাবিজান এই সেই মাইয়া যারে ভাইজান ঘরে আনছিল।’
বিন্দু থমথমে মুখে শুধু বলল,
‘নিজের কাজ করুন।’
মালা মুখ ছোট করে নিজের কাজে মগ্ন হয়। দশটা বিশ নাগাদ বিন্দু মেঘকে নিয়ে একসাথে খেতে বসল। মেঘ মৃদু হেসে খাবারটি মুখে দিল। সে সেই স্বাদ খুঁজল যা তালহার বর্ণনা করেছিল। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত সেই স্বাদ খুঁজে পায় না। তালহারের ভাষ্যমতে যেই খাবার শ্রেষ্ঠ। তারকাছে সেই খাবার সাধারণ খাবারের মতোই লাগছে। নাকি তার ভেতরকার যন্ত্রণা খুঁজতে দিচ্ছে না বিশেষত্ব? নাকি তালহারের কাছে বিন্দু মানেই সেরা। সে সুরাহা করতে পারছিল না।
বিন্দু মৃদু হাসল। বলল,
‘ভালোলাগেনি তাই না? তুমি যার মুখের প্রশংসা শুনে আমার হাতের খাবার খেতে চাইছ। সে আগাগোড়াই এক জটিল মানুষ। তার মনোভাব কেউ বুঝতে পারে না কখনো। তাই তার কথার উপর অন্ধ বিশ্বাস করো না।’
মেঘ চোখ তুলে তাকালো। বলল,
‘কিন্তু তার মধ্যে অদ্ভুত বিশেষত্ব আছে। সে যাকে ভালোবাসে পাগলের মতো ভালোবাসে।’
বিন্দু এবারেও মলিন হাসল। বলল,
‘অতিরিক্ত সবকিছুই ক্ষতিকর!’
মেঘ বুঝল না তার কথা। বোঝার কথাই না। কারণ সে তালহারের ভালোবাসার ধরণ জানে না। সে জানে না তালহার নিজের ভালোবাসাকে আগলে রাখার জন্য ঠিক কতটা পাষণ্ড হতে পারে।
মেঘ ছুটে বেরিয়ে আসে তালহারের ওই পথ থেকে। এই পথে আর ফিরে তাকাবে না সে।
মেঘ যেতেই বিন্দু ঘড়ির দিকে তাকালো। মালাকে দ্রুত ছুটি দিয়ে সে পুরো ঘর আর বাইরের ক্যামেরা বন্ধ করে দিল। খুব তাড়াহুড়ো করে ঘর গুছিয়ে নিয়ে রেডি হয়ে নিল। তালহার আসার আগে তাকে হসপিটালে যেতে হবে। তালহারের কথার সত্যতা যাচাই করতে হবে। নিজের সন্তানের পরিস্থিতি দেখতে হবে। তারপর তালহারকে জানাবে। এরপর তালহারের প্রতিক্রিয়া দেখে সে সিদ্ধান্ত নেবে।
খবরের শিরোনামে তখন ড. জিন্নাহ এর কৃতকর্মের তথ্য এবং আত্মহত্যার খবর আলোড়ন তুলছে।
সুপ্ত ফোনের স্ক্রিন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তালহারের মুখপানে তাকায়। তালহারের মুখে ক্যারিয়ারে কখনো না হারার অহমিকা। তবে তার মুখে অদ্ভুত প্রসন্নতার আভাস। এই সাফল্য সে আগেও দেখেছে। কখনোই তালহারকে এতটা খুশি দেখা যায়নি। সে তীক্ষ্ণ নজরে চেয়ে বলল,
‘এত খুশি লাগছে কেন তোকে?’
নিজ ভাবনায় বিভোর তালহার কিছুটা চমকে তার পানে তাকালো। ধাতস্থ কণ্ঠে বলল,
‘গেলেই দেখতে পাবি।’
‘আমায় ঢাকায় আসতে বলার কারণ?’
‘বললাম না গেলেই দেখতে পাবি!’
সুপ্ত নীরবে আবার সিগারেট ধরালো। জিজ্ঞেস করল,
‘কোথায় যাচ্ছি আমরা?’
‘আপাতত একটু হাসপাতালে যাব তারপর গন্তব্যে যাব।’
‘হাসপাতালে কেন?’
‘একজনের সাথে দেখা করতে হবে।’
‘ডক্টর সুলেখা?’
সুপ্তর কথায় তালহার কপাল কুঁচকে রাস্তা থেকে দৃষ্টি সরালো। ছেলেটির শান্ত মুখপানে চেয়ে বলল,
‘তুই কীভাবে জানলি?’
সুপ্ত সিগারেট ঠোঁটে চেপেই মৃদু হাসল। বলল,
‘বিগত দেড় মাসে আমি অনুভব করেছি তালহার বিন্দুর জন্য পাগলপ্রায়। অবশ্যই হাসপাতালে যেহেতু যাবি সেহেতু কারণ নিশ্চয়ই সেই।’
‘কিন্তু আমি যে ডঃ সুলেখার সাথে দেখা করব সেটা তুই কী করে জানলি?’
সে উদাসীনতার সাথে ফিরে তাকায় বন্ধুর সন্দিহান মুখপানে।
বলল,
‘কুল! এত সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই। সুলেখা গাইনি ডাক্তার না? আমার এখানে যে গার্লফ্রেন্ড আছে। ও যায় প্রায়ই। একদিন বলল, তোকে আর বিন্দুকে দেখেছে। তাই ধারণা করলাম।’
তালহার আশ্বস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘তৃণা?’
‘হুম।’
তালহার কপাল কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে বলল,
‘ একজন গার্লফ্রেন্ড রাজশাহীতে, আরেকজনকে ঢাকায়, আবার অন্য আরেকজনকে আগামী সপ্তাহে মালদ্বীপ যাচ্ছিস। তুই মানুষের মধ্যে পরিস না।’
সুপ্ত চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। বন্ধুর ভুলটা সংশোধন করে দিয়ে বলল,
‘ঢাকায় একজন না। ঢাকায় দু’জন। তৃণার সকালে জব থাকে। তাই ও সকালে আমায় সময় দিতে পারে না।’
তালহার আশ্চর্য হয়ে তাকালো। যদিও এটা ভীষণ বেমানান সুপ্তর সাথে। সে আশ্চর্য হয়ে বলল,
‘ইউ মিন, সকালে তৃণা সময় দিতে পারে না বলে সকালের জন্য আরেকজন রেখেছিস?’
সুপ্ত সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে বলল,
‘হু।’
তালহার ঘৃণাভরা কণ্ঠে বলল,
‘তুই একটা স্কাউন্ড্রেল! এত গুলোর সাথে সময় কাটাতে রুচিতে বাধে না? তোর বডি কাউন্ট কত মনে আছে?’
সুপ্ত নির্বিকার কাঁধ ঝাঁকিয়ে না বোধক মাথা নাড়লো। পরপরই উৎসুক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
‘তোর বডি কাউন্ট কত?’
সহসা তার চোয়াল বরাবর একটা সপাটে ঘুষি পড়ল। তালহার ক্ষুব্ধ স্বরে বলল,
‘মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ!’
সুপ্ত মৃদু ব্যথা গিলে নিয়ে গা দুলিয়ে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে তাকালো বন্ধুর ক্ষুব্ধ মুখপানে। বলল,
‘বিন্দু ভাগ্যবতী!’
তালহার বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল,
‘ভাগ্যিস তুই বিয়ে করিস নি। দেখা যেতো একদিন ও টিকত না। আর মেয়েটার কপালেও দূর্ভোগ ছিল।’
দৈবাৎ দারুচিনি রঙা চোখদুটো থেকে উপহাস মিলিয়ে গেল। ফুটে উঠল অদ্ভুত এক অনুভূতি। ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘এমন এক বিন্দু পেলে হয়তো আমিও তালহার হতাম।’
তালহার চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। সুপ্ত তার চমকানো দেখে স্মিত হেসে বলল,
‘কিন্তু আমি সুপ্ত! আমি আমার জায়গায় অনন্য! আমি কখনোই তালহার হতে চাই না।’
তালহার নিভে যাওয়া আদলে ছোট্ট করে বলল,
‘গুড!’
সুপ্ত রাস্তার পানে দৃষ্টি রেখে বলল,
‘হাসপাতালের দিকে যাসনা।’
‘কেন?’
‘আজ ডঃ সুলেখা আসেনি।’
‘তুই কী করে জানিস? আজ তার চেম্বার খোলা থাকে।’
‘তৃণা গিয়েছিল সকালে কিন্তু পায়নি।’
‘তুই ঢাকায় এসেছিস কখন?’
‘গতকাল বিকালে।’
‘ওহ্!’
তালহার আবার গাড়ি ঘোরালো। সুপ্ত হাসপাতালের পথে এক ঝলক দৃষ্টি ফেলল। তার দৃষ্টিতে স্বস্তির আভাস।
দীর্ঘ আধা ঘন্টা বাদ তালহারের গাড়িটা থামল একটা বস্তিতে। সুপ্ত ভ্রু কুঁচকে তালহারকে অবলোকন করতে করতে এগিয়ে গেল। তালহার একটা তালাবদ্ধ এক তলা ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তালা খুলতেই সুপ্ত বলল,
‘এখানে কেন এনেছিস?’
তালহার জবাব দিল না। সুপ্ত প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে চেয়ে ঢুলতে ঢুলতে ভেতরে ঢুকল। কিন্তু আচমকাই তার দৃষ্টি আঁটকে যায় মেঝেতে। তার দৃষ্টি ছলকে ওঠে এক মুহুর্তের জন্য। ঠোঁটে চেপে রাখা সিগারেটটা পড়ে যেতে গিয়েও সে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
নোংরা রুমটির মেঝেতে হাত পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে এক পরিপাটি অবয়বের পুরুষ। সুপ্ত চমকে তাকায় তালহারের পানে। তার এডামস অ্যাপলটি ক্ষীণ নড়ে উঠল। তালহার ঠোঁটের কোনে একফালি হাসি নিয়ে ফিরে তাকালো। সুপ্তের মুখ থেকে মুহুর্তেই বিচলন মিলিয়ে যায়। সে সিগারেট ঠোঁটে চেপে বলল,
‘ও কে?’
‘তোর মনে আছে আমি বলেছিলাম, প্রাচীকে যারা মেরেছে তাদের মধ্যে আরো দু’জন বাকি আছে?’
তালহার থামল, বাম পা লোকটির পিঠে রেখে বলল,
‘সেই দু’জনের মধ্যে এই একজন। যে ওই মার্ডারের পর দেশ থেকে পালিয়েছিল। দু’দিন আগে দেশে এসেছে।’
সুপ্তর সিগারেটটি ঠোঁটে চেপে ধরলেও তাতে সুখটান আর দেওয়া হলো না। সুখ যেন হঠাৎ করেই মিলিয়ে গিয়েছে। সে ছোট্ট করে বলল,
‘ওহ্!’
পরপরই বলল,
‘তো এখন কী করবি?’
তালহার আশ্চর্য হয়ে তাকালো।
‘কী করব মানে? আমি পাঁচটা বছর যাবৎ তরপাচ্ছি বুকের ভেতর অসহনীয় ভার নিয়ে। আমায় সেগুলো কমাতে হবে। ও আরো একজনের নাম বলবে তারপর এটাকেও জ্যান্ত পুড়িয়ে মারব। এরপর যেদিন সেই শেষ জনকে মারব সেদিন আমার বুকের ভার কমবে, সুপ্ত। আমি প্রত্যেককে প্রাচীর মতোই জ্যান্ত পুড়িয়ে মারব।’
বলেই সে লোকটির চোখের উপর থেকে আর মুখের উপর থেকে পর্দা টেনে খুলে ফেলল। লোকটি চোখ মেলে তাকাতেই আতঙ্ক নিয়ে বলল,
‘আমি শুধু ওই ঘটনাটা জানতাম স্যার। আমি ওই মেয়েটাকে মারার সাথে জড়িত নই।’
তালহার হিসহিসিয়ে বলল,
‘আমি প্রমাণ ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নেই না, তৌকির সাহেব। আমায় দ্রুত নামটা বলে দিন আপনার মৃত্যুটা সহজ হবে। ওইদিন ওই জায়গায় আপনি স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন।’
‘আমি ছিলাম কিন্তু ওই ঘটনা ঘটার আগেই বেরিয়ে গিয়েছিলাম। আমায় মাফ করে দিন, স্যার। এভাবে বিনা অপরাধে আমায় মেরে ফেললে অন্যায় হবে, স্যার।’
সে হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল। কিন্তু তার দৃষ্টি আচমকাই থমকায় ঠিক দরজার কাছে। তার কান্না থেমে যায়। সুপ্তর দারুচিনি রঙা চোখদুটো নিবিড় অন্ধকারে ডুবে যায়।
তালহার টর্চারের জিনিসগুলোর দিকে তাকালো। বলল,
‘আমার হাতে সময় কম, তৈরব। আপনি কোনোভাবেই ছাড়া পাবেন না আমার থেকে। নাম না বললেও আপনাকে মরতে হবে, বললেও মরতে হবে। তার থেকে বলে মরাই ভালো। তাই না?’
লোকটি চকিতে তালহারের দিকে তাকায় আরেকবার সুপ্তর দিকে। তখনো জবাব না পেয়ে তালহার এবার টর্চার শুরু করল। কিন্তু লোকটি তখনো কিছু বলছে না।
তালহার এবার ধৈর্য হারিয়ে ফেলে হাতের মুঠোয় ছুড়িটা নিয়ে একটা টান দিল লোকটির বুক। মুহুর্তেই রক্তের ফোয়ারা ছিটকে বেরিয়ে আসল। লোকটি গগনবিদারী চিৎকার করে উঠল। তালহার তার চুলের মুঠি আঁকড়ে ধরে বলল,
‘শেষবারের মতো বলছি। আমি এমনিতেও বের করে নেব তবে তুই বললে বিষয়টা তাড়াতাড়ি হবে। আমার বুকের ভেতরের ভার কমাতে হবে। তাড়াতাড়ি বল। তুই যদি চাস আমি তোকে ছেড়ে দিতেও রাজি তবুও বল।’
ছেড়ে দেয়ার কথা শুনতেই লোকটির ছটফট করে উঠল। সে ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে কিছু বলতে চাইল কিন্তু তার কথা মুখেই থেকে গেল। তার আগেই একটা নিঃশব্দে একটা বুলেট লোকটির বুকের বা পাশ এফোঁড়ওফোঁড় করে গেল।
তালহার চমকে উঠল। সে হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকালো সুপ্তর আঁকড়ে ধরা রিভলবার টির দিকে। চেঁচিয়ে উঠে বলল,
‘এটা তুই কী করলি? ও এখুনি নাম বলে দিতো!”
সুপ্ত পাল্টা চেঁচিয়ে বলল,
‘ও কোনোদিন বলত না। শুধু তোকে ঘোল খাওয়াতো। আমরা এমনিই বের করে নেব আর একজনকে।’
তালহার রাগে টর্চারের জিনিসগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিল।
‘তাই বলে তুই মেরে ফেলবি?’
‘আমি ওকে আর এক মিনিট বরদাস্ত করতে পারছিলাম না। ওরা আমার একটামাত্র বন্ধুকে অত যন্ত্রণা দিয়ে মেরে এখনো শ্বাস নিচ্ছে কী করে?’
সুপ্ত গর্জে উঠে বলল।
তালহার রাগে ক্ষোভে লাল হয়ে উঠল। সে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো গোঙাতে গোঙাতে নিঃসাড় হয়ে যাওয়া দেহটির পানে। সুপ্ত এগিয়ে গিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে নিলো। পিঠ চাপড়ে বলল,
‘তুই চিন্তা করিস না আমরা আর একজনকে খুঁজে নেব। পৃথিবীর যেই প্রান্তেই থাকুক না কেন!’
তালহার বদ্ধ নেত্রে নিজের রাগ সংবরণ করে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘তা আমি এমনিতেও করব। ওই একজনকে যতদিনে আমি জ্যান্ত পুড়িয়ে মারছি ততদিনে আমি শান্তি পাব না।’
বলেই সে গটগট করে বেরিয়ে গেল ঘরটি থেকে। রিভলবার হাতে সুপ্ত থমকে দাঁড়িয়ে আছে। কর্নকুহরে আন্দোলিত হচ্ছে তালহারের কথাগুলো। চোখের সামনে ভাসছে তালহারের সেই চিরচেনা দৃঢ় প্রত্যয়ী অবয়ব। যে কি-না আজ পর্যন্ত তার লাইফের কোনো লড়াইয়ে হারেনি। সুপ্তর ঠোঁটের কোনে উদাসীন হাসি ফুটে উঠল।
‘মৃতকে মৃত্যুর ভয় দেখানো যায় না।’
যার আসার সে শত বাঁধা পেরিয়ে হলেও আসবেই। তিনগুণ বেশি টাকা দিয়ে আধা ঘন্টার মধ্যে রিপোর্ট করালো বিন্দু। ডক্টর তখন রিপোর্ট দেখতে মগ্ন। বিন্দু উন্মুখ হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘আমার বাচ্চাটা ঠিক আছে, ম্যাম?’
ডক্টর মৃদু হেসে মাথা দোলালো।
‘আপনার বেবির কন্ডিশন একদম সুস্থ, স্বাভাবিক। বাচ্চার বয়স দশ সপ্তাহ।’
‘দশ সপ্তাহ?’
বিন্দু আশ্চর্য হলো। আগে যতবারই সে কনসিভ করেছে সাত সপ্তাহের উপরে বাচ্চা টিকেনি। তার চোখেমুখে উল্লাস ছুঁয়ে গেল। কিন্তু ডাক্তার পরমুহূর্তেই বলল,
‘হ্যা, দশ সপ্তাহ। বেশ সুস্থ সবল ভ্রুনর অবস্থা। তবে আপনি যেই রোগটির কথা বলেছেন সেটাও ঠিক। আপনার অ্যান্টিফসফোলিপিড সিন্ড্রোম রয়েছে। আপনার বাচ্চা যদি টিকেও যায় তবে ছয় থেকে সাত মাসের সময় আপনাকে ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে। আপনার নিজের জীবন এবং বাচ্চার জীবন উভয়ই ঝুঁকিতে পড়বে।’
বিন্দুর মাথায় অসুখের কথা আর ঢুকলো না। তার বাচ্চাটা ঠিক আছে সেটা শুনেই তার চোখ ভিজে উঠল। সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘বাচ্চাটাকে পৃথিবীতে আনার কোনো উপায় নেই ডক্টর?’
‘অবশ্যই আছে। আমি সাজেস্ট করব যদি সামর্থ্য থাকে তবে বাহিরে গিয়ে চিকিৎসা করাতে।’
বিন্দু হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো। ডক্টরের সাথে আরোকিছু আলোচনা করে বেরিয়ে আসল সে।
বেরিয়ে সে হাসপাতালের একটি বেঞ্চে চুপটি করে বসল। দু’হাতে আঁকড়ে ধরা সনোগ্রাফি রিপোর্ট। যেখানে স্পষ্ট ছোট্ট একটি অসম্পূর্ণ অবয়ব। সে রিপোর্টটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে দেখতেই আচমকাই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। রিপোর্টটিকে বুকে চেপে ধরে আকুতিভরা কণ্ঠে বলল,
‘তুমি মাম্মার আবদার শুনেছ? মাম্মার হয়ে থেকে গিয়েছ? মাম্মা, পাপাকে জানাব তোমার কথা। সে নিশ্চয়ই কোনো উপায় বের করবে। কিন্তু মাম্মা কোনোভাবেই তোমার কিছু হতে দেব না। মাম্মা প্রমিস করছি।’
সে রিপোর্ট ছোট ছোট আদরে আদরে ভরিয়ে তুলল। যেন ওটাই তার জলজ্যান্ত সন্তান। সে চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায়। তালহার মিথ্যা বলেনি। তাকে তালহারের কাছে যেতে হবে।
সে দ্রুত হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসে। গেট পেরিয়ে ফুটপাতে উঠতে গেলেই আচমকা কারোর সাথে তার ধাক্কা লাগল। বিন্দু পড়ে যাওয়ার ভয়ে আর্তনাদ করে উঠল। কিন্তু ততক্ষণে একটা শক্তপোক্ত হাত তার বাহু আঁকড়ে ধরে টেনে নিয়েছে।
সুপ্তর মুখটা বিন্দুর ঘাড়ে লাগতেই সে চোখ বন্ধ করে নিলো। একটা লম্বা শ্বাসের সাথে টেনে নিলো চন্দনের মৃদু মিষ্টি সুবাস। বিন্দু চকিতে ছিটকে সরে গেল। ধাতস্থ কণ্ঠে বলল,
‘একটু দেখে চলবেন তো?’
সে চোখ তুলতেই দেখল সুপ্ত পকেটে হাত ঢুকিয়ে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। বিন্দু হতচকিত বলল,
‘আপনি?’
সুপ্ত মৃদু গাম্ভীর্যের সাথে বলল,
‘তুমি এখানে কী করছ?’
বিন্দু মৃদু ইতস্ততা নিয়ে বলল,
‘জি, একটু কাজে এসেছিলাম।’
‘তালহার জানে?’
‘তাকে না জানিয়ে আমি নিশ্চয়ই আসব না?’
সুপ্ত স্মিত হাসল। বলল,
‘তুমি এত সুন্দর মিথ্যা কথা বলতে পারো জানতাম না তো! তালহার এতক্ষণ আমার সাথে ছিল। সে জানে তুমি বাড়িতে। তুমি কী বলবে, তুমি এখানে কী করছিলে?’
বলেই সুপ্ত বিন্দুর হাতের দিকে তাকালো। বিন্দু বিচলিত নয়নে তাকালো। সুপ্ত এক কদম এগিয়ে এলো। রিপোর্টটির দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আমি খুব ভুল না হলে তুমি প্রেগন্যান্ট তাই তো?’
‘আপনাকে বলার প্রয়োজন মনে করছি না।’
বিন্দু কপাল কুঁচকে জবাব দিল। সুপ্ত মৃদু হেসে বলল,
‘মাঝেমধ্যে বলতে হয়। যাচ্ছো কোথায়?’
‘বাড়িতে।’
‘তালহারের কাছে নিজের সন্তানের স্বীকৃতি চাইতে?’
‘মানে?’
‘মানে, এই যে তুমি এখন তালহারের কাছে যাচ্ছো বাচ্চা রাখার আবদার নিয়ে, তাই তো?’
সুপ্ত একই রকম সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিন্দু অস্ফুট স্বরে বলল,
‘আপনি কীভাবে জানেন?’
‘তালহার বলেছে।’
‘বাহ, তালহার আমাকে বাদে সবাইকেই তার ব্যক্তিগত কথা বলে।’
‘তোমাকে বলা যাবে না বলেই তুমি বাদে সবাইকে বলে। তোমাকে বললে তার সংসার থাকবে না। আর তালহার যথেষ্ট বুদ্ধিমান। সে এমন বোকামো কোনোদিন করবে না যার কারণে তার সংসার হুমকির মুখে পড়ে। তবে সে সত্যিই তোমায় অনেক ভালোবাসে।’
‘আপনি কী বলতে চাইছেন?’
‘এটাই যে, যার কাছে তুমি তোমার সন্তানকে রাখার আবদার করতে যাচ্ছো—সে যদি কোনোভাবে জানে তুমি প্রেগন্যান্ট তবে যেকোনো মূল্যে তোমার বাচ্চাকে মেরে ফেলবে।’
‘মুখ সামলে কথা বলুন। এটা তার ও বাচ্চা। সে কোনোদিন এমনটা ভাবতেও পারে না।’
বিন্দু অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে গর্জে উঠল। সুপ্ত নিঃশব্দে গা দুলিয়ে হেসে উঠল। নারীটিকে একদৃষ্টিতে দেখতে দেখতে ধিমি কণ্ঠে বলল,
‘তালহারকে আমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমার মধ্যে এমন কী আছে? সে জবাবে বলেছিল, সে ছাড়া এই প্রশ্নের জবাব কেউ জানবে না। কিন্তু আজ আমি সেই জবাব খুঁজে পেয়েছি।
বিন্দু এমন একজন মানুষ যে কি-না পুরো পৃথিবীর উর্ধ্বে গিয়ে তালহারকে বেছে নেবে। আর এটাই তালহারের শক্তি এবং এটাই তোমার দূর্বলতা।’
বিন্দু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সুপ্ত তার প্রশ্নবিদ্ধ চোখের ভাষা পড়ে স্মিত হাসল। পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করে বলল,
‘আমি প্রমাণ ছাড়া কথা বলি না। আশাকরি এতটুকু যথেষ্ট হবে তোমার অন্ধ বিশ্বাসের জন্য।’
সে একটা রেকর্ডিং অন করল। বিন্দু ভ্রু কুঁচকে ফোনটা কানের কাছে ধরল। কিন্তু সময় যত গড়ায় তার পায়ের তলার জমিন সরে যেতে লাগল।
রেকর্ডিং এ সুপ্তর কণ্ঠ আর তালহারের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে।
‘বিন্দুর কী অবস্থা?’
‘কিছুটা বেটার। শরীর দূর্বল।’
‘হঠাৎ এমন হলো কেন? মাহির গতকাল কিছু করেছে?’
‘উহু।’
‘তবে?’
‘ডক্টর ধারণা করছে, বিন্দু প্রেগন্যান্ট। হসপিটালে যেতে হবে বিকালে।’
‘যদি পজিটিভ হয় তবে কী করবি?’
‘প্রতিবারের মতোই এবারেও মেরে ফেলব।’
‘প্রতিবার মানে? বিন্দুর মিসক্যারিজ হয়নি কখনো?’
‘নাহ, আমি মিসক্যারিজ করিয়েছি। ওর অসুখ থাকলেও বাচ্চা সুস্থ সবল ছিল প্রতিবার ই।’
‘কিন্তু ওর সাথে এমন কেন করছিস?’
‘আমার বাচ্চা পছন্দ নয়। বাচ্চা চাই না আমার। আমার বিন্দু হলেই চলবে শুধু।’
তালহার বেশ রাগের সাথেই জবাব দিল। বিন্দু নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। তার চোখের সামনে ধোঁয়ায় হয়ে আসে সবটা। সে দোদুল্যমান দেহে পড়ে যেতে নিলেই সুপ্ত আঁকড়ে ধরল তার হাত।
‘সাবধানে!’
বিন্দু তার থেকে হাত ছাড়িয়ে নেয়। কাঁপতে থাকা দেহ আর ভিজে ওঠা অশ্রুসিক্ত নয়নে পুনরায় রেকর্ডিংটা কানে ঠেকালো। বারবার শুনলো রেকর্ডিংটা। ওটা তালহারের নিজের মুখের-ই কথা। তবে এবারের মতো আগের দুইবার ও তার বাচ্চারা সুস্থ সবল ছিল। তাদের তালহার মেরে ফেলেছে। এবার এখনো জানেনা বলেই তার বাচ্চাটা সুস্থ সবল আছে।
বিন্দুর চোখ বেঁয়ে অনর্গল অশ্রু গড়াতে শুরু করল। চোখের সামনে ভেসে উঠল তালহারের স্নিগ্ধ মুখশ্রী। যেই মুখ দেখলেই তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে, সেই মুখটিকে সে ঘৃণা করবে কী করে?
বিন্দুকে একদম নীরব হয়ে যেতে দেখে সুপ্ত নম্র স্বরে শুধাল,
‘ঠিক আছো?’
বিন্দু মুখ তুললো। তার চাহনি এক সর্বহারা নারীর ন্যায় বিধ্বস্ত ছিল। সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘আপনি তো তার বন্ধু। এগুলো কেন দেখালেন আমায়?’
‘আমি তার বন্ধু বলে তার অন্যায়কে সমর্থন করতে পারি না। মাতৃত্ব একটা মেয়ের অধিকার। এটা কেউ ছিনিয়ে নিতে পারে না। তাই তালহারকে জানানোর আগেই আমি তোমায় জানিয়েছি— যেন তুমি তোমার বাচ্চাটাকে বাঁচাতে পারো।’
সুপ্ত নির্বিকার বলল। বিন্দু বলহীন দেহে কিয়ৎকাল রিপোর্টটির দিকে তাকিয়ে রইল।
‘বিন্দু?’
সুপ্ত আবার ডাকল। বিন্দু নতমুখে বলল,
‘আপনাকে ধন্যবাদ আমায় জানানোর জন্য।’
বলেই সে সেই পথে হাঁটা ধরল যেই পথ তাকে তালহারের কাছে নিয়ে যাবে।
সুপ্ত স্তব্ধ হয়ে গেল এতকিছুর পরেও বিন্দুকে সেই পথে যেতে দেখে যেই পথে তালহার রয়েছে। সে পেছন থেকে বলল,
‘সেই পথে ফিরে যাচ্ছো যেই পথে কেউ তোমার বাচ্চাকে মেরে ফেলার জন্য কেউ অপেক্ষা করছে? সে হয়তো ম্যানুপুলেট করে এবারেও কোনো না কোনোভাবে তোমার বাচ্চাকে মেরে ফেলবে।’
কিন্তু বিন্দু তখনো হাঁটছে। নত মুখে হাঁটতে হাঁটতেই তার মস্তিষ্কে উল্টেপাল্টে গেল বিগত তিন বছরের স্মৃতির পাতা। তালহারের সাথে কাটানো এক একটা মুহুর্ত!
সেই মুহুর্তটি মনে পড়ল যখন দিনশেষে তালহার তার বুকে মাথা রেখে নিজের ক্লান্তি দূর করত। এমনকি রাতের আঁধারে সরে যেতে নিলেও খপ করে আঁকড়ে ধরে ধড়ফড়িয়ে উঠে বলত,
‘ডোন্ট গো, জাস্ট স্টে উইথ মি।’
ওইতো, ওইটুকুই তার কাছে ভালোবাসা ছিল।
সুপ্তর শান্ত মুখশ্রীতে অদ্ভুত পৈশাচিকতা ফুটে উঠল। চোয়াল শক্ত করে আওড়ালো,
‘প্লান ‘এ’ ফেইল! নো প্রবলেম, আই হ্যাভ অলওয়েজ প্লান ‘বি’।’
বলেই সে ঠিক রাস্তার ওপারে থাকা সাদা মাইক্রো গাড়িটির দিকে তাকালো। ইশারা পেতেই গাড়িটিতে থাকা লোকগুলো দ্রুত ঘুরিয়ে বিন্দুর দিকে যেতে লাগল। চলতে থাকা বিন্দুর পানে চেয়ে সুপ্ত সটান হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বন্ধুর বেশে থাকা শত্রু জগতের সবচেয়ে নিকৃষ্ট আর হিংস্র শত্রুর একজন। তাকে দেখতে ঠিক ততটাই বিদঘুটে খর ভয়ানক লাগছিল যতটা সুন্দর তার আর তালহারের বন্ধুত্ব।
কিন্তু আচমকাই তার হিংস্র দৃষ্টি বদলে গেল। চলতে থাকা বিন্দু হঠাৎ করেই থেমে গেল আর পিছু ফিরে তাকালো। ঠিক তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। আশ্চর্য সুপ্ত সতর্ক ভঙ্গিতে নিজের ডান আলতো জাগিয়ে গাড়িটিকে থামিয়ে দিল।
বিন্দু সোজা এসে তার সামনে থামলো। রক্তিম চোখটি সুপ্তর দারুচিনি রঙা চোখে রেখে বলল,
‘আমায় একটু সাহায্য করবেন?’
সুপ্তর চোখেমুখে এক পশলা বৃষ্টির ন্যায় উল্লাস ছুঁয়ে গেল। কিন্তু তা অপ্রকাশিতই রয়ে গেল। সে মাথা নেড়ে বলল,
‘আই’ম অলওয়েজ এট ইয়োর সার্ভিস, বিন্দু। নির্দ্বিধায় বলতে পারো।’
বিন্দুর কণ্ঠনালী থেকে কথা বের হতে চাইছে না। কিন্তু তবুও সে জোর করে। টলটলে নেত্রে চেয়ে বলল,
‘আমায় একটু তালহারের হাতের নাগালের বাইরে নিয়ে যাবেন? যেখানে কোনোদিন সে আমায় খুঁজে পাবে না?’
সুপ্ত ঠোঁটের কোনে স্মিত হাসি ফুটে উঠল। একটুও বাড়তি কথা না বলে বাম হাতে নিজের গাড়ি দেখিয়ে বলল,
‘চলো।’
বিন্দু আবারো এক পলক ফিরে তাকালো সেই পথে, যেই পথে তালহার রয়েছে। ওই পথে সে তার প্রিয় স্বামীকে আর স্বামীর একনিষ্ঠ স্ত্রীটিকে ফেলে এসেছে।
এই মুহুর্তে যে বিন্দু দাঁড়িয়ে আছে সে শুধুই একজন মা। আর একজন মা তার সন্তানের সুস্থতা আর সম্মানের জন্য সবকিছু করতে হবে।
সে মুখ ফিরিয়ে নিলো। দীর্ঘ তিন বছরের ভালোবাসাকে ভুলে গাড়িতে উঠে বসল। সুপ্তর মুখে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে আরামসে সিগারেট জ্বালিয়ে ঠোঁটে চেপে বিড়বিড় করল,
‘কখনো কোনো লড়াইয়ে না হারা তালহার মুজাহিদ তার ব্যক্তিগত জীবনে বাজেভাবে হেরে গিয়েছে।’
তালহারের অফিস থেকে বের হতে হতে দুইটা বেজে গেল। ফোনের দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে দ্রুত গাড়িতে বসল।
‘পুরো বাসার ক্যামেরা বন্ধ কেন? বাসার ক্যামেরা তো কোনোদিন বন্ধ করে না বিন্দু!’
সে বিড়বিড় করতে করতে বিন্দুর ফোনে ফোন দিল। ফোন সুইচড অফ! ট্রাক ও করা যাচ্ছে না। সে গাড়ি স্টার্ট দিল। একহাতে গাড়ি চালাতে চালাতে সদ্য জোগাড় করা ডঃ সুলেখার নাম্বারে ফোন দিল। বিন্দুর বিষয়ে সে নিজেকে ব্যতীত কাউকে বিশ্বাস করে না। সুপ্তকেও না। রিসিভ হতেই সে জিজ্ঞেস করল,
‘ম্যাম, আজ চেম্বারে বসেননি?’
‘বসেছি, তালহার। কেন বলুন তো? বিন্দু ঠিক আছে?’
তালহারের ভ্রু কুঁচকে গেল। সে চকিতে গাড়ি ব্রেক কষে বলল,
‘বিন্দু ঠিক আছে। কিন্তু আপনি কী সকাল থেকেই চেম্বারে?’
‘হ্যাঁ।’
‘সুপ্ত আমায় মিথ্যা বলেছে।’
জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৫
সে অস্ফুট স্বরে আওড়ালো। পরপরই ভীষণ উদ্বেগের সাথে জিজ্ঞাসা করল,
‘ম্যাম, গতকাল কী বিন্দু আপনার চেম্বারে গিয়েছিল?’
‘বিন্দু? কই না তো। বিন্দুর সাথে আমার এক মাসেও তো কথা হয়নি।’
‘তবে ও কী করে ওর অসুখের কথা জানল?’
তালহারের কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। তার মনে হলো সে কোনো অদ্ভুত জালে আটকে গিয়েছে। আর তার ব্যক্তিগত দুনিয়া একটু একটু করে হিংস্র কারোর হাতের মুঠোয় চলে যাচ্ছে। সে দরদর ঘেমে উঠল।
