Home জোড়া পাতার দিনলিপি জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৯

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৯

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৯
তোনিমা খান

সময়ের কী অদ্ভুত বিচার!
একজন কাঁদছে ভালোবাসা, মুক্তি আর হারিয়ে যাওয়া ভরসা ফিরে পাওয়ার উল্লাসে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আরেকজন কাঁদছে ভালোবাসা আর ভরসা হারিয়ে আবারও ঘৃণা, লাঞ্ছনা আর নোংরা এক দুনিয়ার বন্দিদশায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাওয়ার বেদনায়।
একজনের চোখের জল আনন্দের।
অন্যজনের চোখের জল অভ্যস্ত দুঃখের।
বিন্দুর উল্লাসে ফাতিমা নীরবে মাথা নুঁইয়ে সরে গেল।
মলিন মুখে বুকভরা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যে পথ ধরে এসেছিল, আবার সেই পথেই ফিরে যেতে লাগল সে। এবার আর ছোট্ট বুকের ভেতর কোনো প্রত্যাশা নেই তার লিলির কাছে। কোনো অলৌকিক পরিবর্তনের অপেক্ষাও নেই। মুখে হাসি নেই, কিন্তু চোখেও পানিও নেই। কারণ সে জানে—এই ঘৃণা, এই লাঞ্ছনা, এই বন্দিদশাই তার জীবন। রোজ রাতে আম্মি তার মন-মস্তিষ্কে কথাগুলো এমনভাবে গেঁথে দেয়। ফাতিমা ভুলে যায়নি।
কিন্তু প্রতিরাতে ঘুমিয়ে যাওয়ার পর ধবধবে সাদা পোশাক পরা কেউ কেন তাকে এক অন্য দুনিয়ায় নিয়ে যায়? যেখানে মায়েরা তাদের সন্তানকে বুকের ভেতর আগলে রাখে। যেখানে শিশুরা মুক্ত আকাশের নিচে একসঙ্গে ছুটে বেড়ায়। যেখানে কাউকে আটকে রাখা হয় না। যেখানে কারও ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কারোর নিজেকে বিকিয়ে দিতে হয় না। যেখানে মানুষ মানুষকে ভালোবাসে।

কেন দেখায় সেই স্বপ্নগুলো?
যখন স্বপ্ন ভাঙতেই আম্মি আবার বলে,
‘তাদের জন্য এসব ভালোবাসা, মুক্তি, উজ্জ্বল শৈশবকাল নিষিদ্ধ!’
হয়তো তার ভেতরে এখনও এমন একটা ছোট্ট মেয়ে বেঁচে আছে, যে বিশ্বাস করতে চায় তার জন্যও কোনো এক পৃথিবীতে ভালোবাসা অপেক্ষা করছে। তার ও মুক্ত পাখির ন্যায় উজ্জ্বল শৈশব পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাকে সেখানে যেতে হবে।
কিন্তু আজকের পর থেকে হয়তো আর এই সুখময় দুঃস্বপ্নগুলো ফাতিমা দেখবে না। সে গুটিগুটি পায়ে উপরে চলে গেল।

বিন্দু উদভ্রান্তের মতো ছুঁয়ে দিচ্ছে তালহারের দেহ। যেন এটা স্বপ্ন নাহয়! চুলের গোছায় সেই চিরচেনা ভরসার চুম্বন অনুভব হতেই বিন্দু শব্দ করে কেঁদে উঠল। এটা স্বপ্ন নয়। জড়িয়ে ধরা পুরুষালী গলদেশ আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। তোতলাতে তোতলাতে বলল,
‘তালহার…আ…আমায় আবার আপনার মাঝে লুকিয়ে নিননা। স…সবাই খারাপ! কারোর এ…একটুও করুনা হয়নি আমার বাচ্চাটার উপর। আ..মি অ..অনেক অনুরোধ করেছিলাম কিন্তু কেউ শোনেনি।’
তালহার অনবরত তার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে। দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
‘হুশশ! যতদিন এই মানুষটা বেঁচে আছে ততদিন কেউ তোমার কিচ্ছু করতে পারবে না। ডোন্ট বি স্কেয়ার্ড!’
বিন্দু সিক্ত নয়নে তার কাঁধে ঠোঁট চেপে ধরে। তাকে পুনরায় একটি সুরক্ষিত বলয়ে আগলে নিয়েছে কেউ। তার ভয় কমতে শুরু করল। কারণ সে তো জানে, এই বুক থেকে তাকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। বহুদিনের বিচ্ছেদের পর আজকের এই মিলনে কোনো ঘৃণা, অভিযোগ, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা কোনো তৃতীয় ব্যক্তির ছায়া নেই।

বিন্দু তখনো নীরবে ফোঁপাচ্ছে। ফোঁপাতে ফোঁপাতেই সে তালহারের একটি হাত এনে নিজের উদরের ঠিক মাঝ বরাবর রাখল। উষ্ণ সেই স্পর্শে দুটো শরীরই ঈষৎ কেঁপে উঠল। বিন্দুর কণ্ঠ কাঁপছিল। কান্নায় ভেঙে যাওয়া গলায় সে সাহস জোগায়। ফিসফিসিয়ে বলল,
‘ও একটা সুস্থ-সবল, স্ট্রং বাচ্চা, তালহার। আমরা ওকে রাখি, প্লিজ? আপনি পাশে থাকলে আমি সব কষ্ট সহ্য করে নিতে পারব। প্লীজ তালহার!’
মৃদু মেদ যুক্ত উদর ছুঁয়ে থাকা তালহার চোখ বন্ধ করে নিল। তবুও বন্ধ চোখের পল্লব ভিজে উঠল। সে অনুভূতিদের দমাতে পারছে না। যার অস্তিত্বটুকু অনুভব করার জন্য এতদিন ছটফট করেছে, আজ সেই অনাগত প্রাণ তার হাতের আজলায়। এত কাছে! অথচ আজও নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে পারল না সে।
শুধু ছোট্ট করে বলল,

‘ওকে।’
ছোট্ট একটা শব্দ। সেই একটি শব্দেই যেন বিন্দুর পৃথিবীটা বদলে গেল। তার চোখ বাঁধভাঙা উল্লাসে ভিজতে লাগলো।
তার ওষ্ঠকোণে স্নেহের হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু আচমকাই সেই হাসি মিলায়ে যায়। মোহগ্রস্ত বিন্দু সচকিত হয়। অস্ফুট স্বরে ডেকে উঠল,
‘ফাতিমা?’
সে নিজের সুখের মাঝে এতটাই ডুবে ছিল যে ভুলে গেল এক সপ্তাহ যাবৎ সে কারোর সুখ ছিল! সে চকিতে তালহারের থেকে দূরে সরে গেল। তালহার ভ্রু কুঁচকালো নিজের শূন্য বুক আর তার অস্থিরতা দেখে।
‘কী হয়েছে? এমন করছ কেন?’
বিন্দু চকিতে পিছু ফিরে তাকালো দরজার পানে। ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,

‘তালহার… আপনি একটু এখানে বসুন হ্যাঁ? কোথাও যাবেন না। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে একটু আসছি।’
সে দৌড়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে তালহারের দিকে। তার হাত দুটো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। এতটাই শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে যে তার নখ চুবে যাচ্ছে তালহারের হাতে। সে ছলছল নেত্রে চেয়ে অনুনয়ভরা কণ্ঠে বলল,
‘কোথাও যাবেন না কিন্তু। আপনি ব্যতীত এই পুরো পৃথিবীটা ভীষণ ভয়ঙ্কর তালহার। আমি ভয় পাই সবাইকে। আমি শুধু আপনার মাঝেই থাকতে চাই। আপনি কোথাও যাবেন না।’
তালহারের মুখে না চাইতেও হাসি ফুটে উঠল। বিশ্ব জয়ের হাসি। অবশেষে সে মেয়েটিকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে, এই দুনিয়া কতটা জালিম! কতটা নিকৃষ্ট!
সে এক হাত ছাড়িয়ে নেয়। বহু বছরের বদ অভ্যাসের জোরেই কপাল ছুঁয়ে থাকা অবাধ্য চুলগুলো গুছিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিলো। বুকভরা একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গিয়ে তার কপাল বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। স্পর্শটা দীর্ঘ ছিল। ক্ষীণ স্বরে বলল,

‘তোমার জীবনের প্রতিটা দুঃখের সমাপ্তি হিসেবে তুমি সবসময় আমাকেই পাবে। আমার থেকে পালাতে চাইলেও তোমার গন্তব্যের শেষ আমার কাছেই‌ হবে। চিন্তা করো না। যেখানেই যাও না কেন ফিরে এসে শুধু আমাকেই পাবে!’
বিন্দুর চোখেমুখে আর ভয় দেখাগেল না। বরং তাকে অকুতোভয় দেখালো। সে প্রগাঢ় হেসে তালহারের হাতের উল্টোপিঠে একটা চুমু দিয়ে নির্ভয়ে ছুটলো সেই পথে, যেই পথ থেকে এসেছিল। ওই পথে যে কেউ তার লিলির অপেক্ষায় আছে।

লাগোয়া কাঠের বারান্দা দিয়ে শীতল, সতেজ সমীরণ ফুরফুরিয়ে প্রবেশ করে। জুতা খুলে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসা ফাতিমার কোঁকড়ানো ফুলে থাকা চুলগুলো দুলছে সমানতালে। আরশির সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও নার্গিসের দৃষ্টি চিরুনির দিকে। অদ্ভুত বিষয় হলো, সে কখনো আয়নার দিকে তাকাতে পারে না। আয়নার দিকে তাকাতে পারে না, না-কি আয়নায় ভেসে ওঠা মুখটি দেখতে পারে ন? কে জানে! সে নত দৃষ্টিতে কোমর সমান চুলগুলো আঁচড়াতে আঁচড়াতে উদাসীন কণ্ঠে বলল,
‘বই পড়তে বসো ফাতিমা।’
মায়ের আদেশ আসতেই ফাতিমা নীরবে জানালার কাছে থাকা টেবিলের চেয়ারে গিয়ে বই খুলে বসল। নার্গিস ফিরে তাকালো মেয়েটির পানে। বিগত এক সপ্তাহ যাবৎ যত জেদ করেছিল আজ আর সেই জেদ দেখা যাচ্ছে না ফাতিমার মাঝে। সে সত্যটা মানতে শিখে গিয়েছে। নার্গিস ধিমি কণ্ঠে বলল,
‘আগেই বলেছিলাম, ওই জীবনের স্বপ্ন দেখো না যা তোমার জন্য নিষিদ্ধ। সত্যটা মানতে শেখো, ফাতিমা। কষ্ট কম হবে।’

আম্মির রোজকার মতো সেই একই কথাগুলো আজ ভীষণ পীড়া দিল ছোট্ট ফাতিমার ছোট্ট মনটিতে। খাতার উপর চেপে রাখা পেন্সিলটা থরথরিয়ে কাঁপছে। দারুচিনি রঙা ডাগর ডাগর চোখদুটো ঝাঁপসা হয়ে আসল। নিজেকে আটকাতে না পেরে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। নার্গিস উদাসীন চিত্তে হাসলো।
‘কান্না করো। ভেতরে যেটুকু যা আশা পুষেছিলে সবটুকু ধুয়েমুছে বের করে দাও ফাতিমা। এইটুকু তোমার প্রাপ্য! তুমি সুখ চাওয়ার মতো পাপ করেছ। যা আমাদের মতো মানুষের জন্য নিষিদ্ধ!’
বলতে বলতেই নার্গিসের চোয়াল শক্ত হয়ে আসল। ফাতিমার কান্নার শব্দে ভারী হতে লাগল কাঠের ঘরের শিতল সমীরণ। নার্গিস হঠাৎ করেই অনুভব করল ওই কান্নার শব্দ তার ভেতরে থাকা হৃদযন্ত্রটা টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলছে। কিন্তু তার তো মাতৃত্ব অনুভব করার মতো হৃদয় নেই? সে অদ্ভুত পীড়ায় ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে তড়াক চেয়ার ছেড়ে উঠে যায়। নিজেকে ব্যস্ত রাখার ব্যর্থ চেষ্টায় সে হাঁক ছেড়ে শাহিনকে ডাকল,

‘শাহিন! শাহিন!’
‘জি, মালকিন!’
শাহিন ছুটে আসল।
‘নিচে কী হয়েছে?’
‘মালকিন, মেয়েটাকে খদ্দেরের সাথে ঘরে পাঠিয়েছে। সাঈদা আম্মা নাকে কানে ঢুকিয়ে দিয়েছে, খদ্দের যদি অখুশি হয় তবে তার পরিণতি খারাপ হবে।’
‘তা ওই মেয়ে এত খুশি ছিল কেন?’
‘তা তো জানি না, মালকিন। সাঈদা আম্মা ওদিকে আর যেতে দেয়নি।’
‘আচ্ছা, আম্মা কোথায়?’
‘হুরশালার চাঁদনী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে মালকিন সেখানে গিয়েছে।’
নার্গিস তড়াক চিন্তিত লোচনে উঠে দাঁড়াল। হুরশালা সেই জায়গা যেখানে অজস্র সুন্দরী নারীরা রয়েছে। হুরশালায় আসা সকল গ্রাহকের চাহিদা যারা পূরণ করে। আর চাঁদনী হুরশালার সবচেয়ে সুন্দরী নারী। তার অন্যরকম চাহিদা।

সে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
‘সে কী চাঁদনীর আবার কী হলো?’
‘জানি না মালকিন। আম্মা দেখছে ওইদিক। আপনাকে এইদিক দেখতে বলছে। খদ্দের যেন হাসিমুখে ওই মেয়েকে নিয়ে বিদায় নেয়।’
নার্গিস দুশ্চিন্তা নিয়ে মাথা নাড়লো। চাঁদনী অসুস্থ মানে আজকে হুরশালার আয়োজনে ব্যাঘাত ঘটা। গ্রাহকদের অসন্তুষ্ট করা। কিন্তু তার দুশ্চিন্তা সেখানে নয় বরং অন্য জায়গায়।বকারণ চাঁদনী অনুপস্থিত থাকলে পুরো খানদানের সবচেয়ে সুন্দরী নারীটিকেই আজকে রাতের দায়িত্ব পালন করতে হবে। যেই সুন্দরী নারীটি সে নিজেই। কিন্তু সে তো এটা চায় না। সাঈদা মায়ের পর সে-ই সৌন্দর্যের দিক থেকে অনন্য। আজ পর্যন্ত কেউ তার সৌন্দর্যকে টেক্কা দিতে পারেনি। তবে এই ধারা বদলাবে খুব শিঘ্রই। আর সেটা বদলাবে তার নিজের মেয়ের হাত ধরেই।

নার্গিস পায়চারী থামিয়ে ফিরে তাকালো নীরবে হেঁচকি তুলে কাঁদতে থাকা মেয়ের পানে। ফাতিমা— অপার্থিব সৌন্দর্যের অধিকারী একটি বাচ্চা। সে এতটাই সুন্দর যে এক দেখায় যে কারোর প্রথম দৃষ্টি থমকে যাবে। সবচেয়ে সুন্দর তার চোখদুটো। যা সূর্যের আলোয় নৈস্বর্গিক সৌন্দর্যের সাথে জ্বলজ্বল করে। তার ঠোঁটের কোনে মলিন হাসি। এই মেয়েটিকে জন্ম দিতে তাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে। কিন্তু জন্মানোর পর যখন তার এই সৌন্দর্য সকলে দেখল, তখন সকল দুঃখ ভুলে গেল! কারণ ফাতিমাই সেই মেয়ে যে কি-না পরবর্তীতে তাদের এই ব্যবসার রানী হবে। তাকে সুন্দরী হতেই হতো।
সে চোখ সরিয়ে নিলো মেয়ের থেকে। পৃথিবীতে দু’টো জিনিস আছে যার দিকে সে তাকাতে পারে না। এক নিজের দিকে আর এক মেয়ের দিকে। সজোরে দরজা খুলে কেউ ছুটে ঘরে ঢুকতেই নার্গিস রাগান্বিত দৃষ্টিতে ফিরে তাকালো। তার দৃষ্টি সচকিত হয় বিন্দুকে দেখে। তেমনি ফাতিমার কান্নাও থমকে যায়। নার্গিস রুক্ষ স্বরে নিজ ভাষায় জিজ্ঞেস করল,

‘তুমি এখানে কী করছ?’
বিন্দু দরজা আটকে এগিয়ে আসল তার দিকে। নার্গিসের ভ্রু কুঁচকে গেল। ক্রুব্ধ স্বরে বলল,
‘তুমি খদ্দেরকে অখুশি করেছ? সে কোথায়? দেখো তুমি যদি বাড়াবাড়ি করো তবে তোমার বাচ্চার আজ শেষ দিন।’
তার কথা শেষ হতে পারল না তার আগেই বিন্দু তার হাত আঁকড়ে ধরলো। নার্গিস চমকালো।
‘কী করছ?’
বিন্দু ছলছল চোখে তাকালো তার কঠিন চোখের দিকে। ভীষণ নম্র স্বরে বলল,
‘তুমি কী জানো নার্গিস, সৃষ্টিকর্তার পর মা হয় একটা সন্তানের সুরক্ষাবলয়। সৃষ্টিকর্তার পর একমাত্র মা-ই আছে যে কি-না তার সন্তানের জন্য সবকিছু করতে পারে।’
‘তুমি আবার আমায় এসব জ্ঞান দিচ্ছো?’

‘নাহ, কিন্তু তুমি কী জানো সৃষ্টিকর্তার পরে তুমিই একমাত্র সেই মানুষ যে কি-না ওই নিষ্পাপ শিশুটিকে এই জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারো। সৃষ্টিকর্তা তোমার কোলে কী পাঠিয়েছে তুমি নিজেও জানো না নার্গিস। ও একটা পবিত্র, নিষ্পাপ, মূল্যবান প্রাণ। ওকে নিজের মতো এই নোংরা পরিবেশে কলুষিত হতে দিও না।’
নার্গিস চোয়াল শক্ত করে তাকে ঝাড়া দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল।
‘দূর হও। আমার মেয়ে নিয়ে এত আগ্রহ দেখাতে হবে না তোমায়। ও আমার মেয়ে আমি বুঝে নেব ওর কী করতে হবে।’

বিন্দু আশ্চর্য হলো! ধৈর্য হারালো। সে ক্ষিপ্ত স্বরে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
‘তুমি কি মানুষ? তুমি কী একজন নারী? তুমি কী করে একটা জলজ্যান্ত পরীকে জন্ম দিলে? তোমার ভেতরে কী একটুও অনুভূতি নেই? তুমি কী ভালো মন্দ বোঝো না? তুমি কী জানো না একাধিক পুরুষের নোংরা, হিংস্র কামুকতার স্পর্শ ঠিক কতটা যন্ত্রণাদায়ক হয়? তুমি আমায় একটা কথা বলো, তোমার কী ভালো লাগে একাধিক পুরুষের দেহতলে নিজেকে পিষ্ট হতে দেখেতে? তোমার দেহে ব্যথা লাগে না? বুকের ভেতর যন্ত্রণা হয় না? নিজের উপর ঘৃণা হয় না? আমি জানি, তোমার একটু হলেও কষ্ট হয়। আমি জানি তুমিও একটা স্বাভাবিক জীবন চাও। তবে তুমি সেই একই যন্ত্রণার মাঝে কী করে নিজের মেয়েকে ঠেলে দিতে পারো? ওর দিকে একটু তাকাও। সে একটা পুতুল, নার্গিস। তুমি কী এটা দেখতে পারবে যে একাধিক পুরুষ ওর পবিত্র দেহটিকে খুবলে খাচ্ছে?’

‘ব্যাস! আর একটা কথাও বলবে না।’
বিন্দু উন্মাদের মতো চেঁচাচ্ছিল তার মাঝেই নার্গিস চেঁচিয়ে উঠল। রাগান্বিত স্বরে বলল,
‘আর একটাও কথা বলবে না। এটাই ওর জীবন। আমার হাতে কিছু নেই। ওর ভুল ও আমার গর্ভে জন্মেছে। আর এই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত ওকেই করতে হবে। এখান থেকে বিদায় হও নয়তো আম্মা আসলে কিন্তু তোমার করুন অবস্থা হবে!’
বিন্দু হতাশ হলো নার্গিসের সেই একই কঠিন মুখ দেখে। সে দমে যায় না।
‘তুমি এক মুহুর্তের জন্য একটু একজন মায়ের মতো করে চিন্তা করো, নার্গিস। ও ইচ্ছাকৃত তোমার গর্ভে আসেনি। তোমার নোংরা কৃতকর্মের ফল। ওকে তোমরা এনেছ নিজেদের নোংরা কাজের দ্বারা। এতে ওর দোষ কোথায় বলো? ও তো একটা স্বাভাবিক শৈশব ডিজার্ভ করে, নার্গিস। নিজেদের ভুলের শাস্তি ওকে কেন দিচ্ছো? আমার তো মনে হচ্ছে তুমি এটাও জানো না ওর বাবা কে?’
সহসা নার্গিস গর্জে উঠল,

‘মুখ সামলে কথা বলো! তুমি আমার হাতে এখন চড় খাবে!’
বিন্দু এবার শব্দ করে কেঁদে উঠল। শ্রান্ত দেহে সে ধপ করে নার্গিসের সামনে বসে পড়ল। অনুনয় করে বলল,
‘আমি তোমার পায়ে পড়ছি নার্গিস। তুমি চাইলে সব পারো। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর কন্যার নামের মতোই একটা পবিত্র জীবন ও দিতে পারো। শুধু নিজের ওই কঠিন হৃদয়টাকে একটু নরম করো নার্গিস। তুমি যা এমনিই পেয়ে গেছ তা আমি তিন বছর হাজার দোয়া করেও পাইনি। ফাতিমা একটা পবিত্র জীবন ডিজার্ভ করে। যেখানে নেশাগ্রস্ত কোনো নোংরা পুরুষ টাকার বিনিময়ে ওর পবিত্র দেহটিকে খুবলে খাবে না।’
ছোট্ট ফাতিমা তখনো খাতার দিকে তাকিয়ে আছে। যেমনটা মায়ের আদেশ ছিল। নার্গিস মেয়ের নতমুখের দিকে তাকালো। তার কণ্ঠ আর মুখশ্রী থেকে তেজ সরে যায়। ফুটে ওঠে সহানুভূতি। সে উদাসীনতার সাথে বলল,

‘নিজেই একজন বিকে যাওয়া নারী। একটু পর তোমায় খদ্দের নিয়ে যাবে। সেখানে গিয়ে তোমার সাথে কী হবে তা তুমি নিজেই জানো না। অথচ তুমি আমার মেয়ের চিন্তা করছ? আমার কাছে কোনো উপায় নেই ওকে একটা পবিত্র জীবন দেয়ার জন্য!’
‘তুমি চাইলেই দিতে পারবে, নার্গিস।’
‘কী করে? আমি ওকে এই দেশের যেখানেই সরাই না কেন আম্মা খুঁজে নেবে। আম্মা ওকে কিছুতেই হারাতে চায় না। আমার আর আম্মার পর ওই সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে!’
নার্গিসের কণ্ঠে নমনীয়তার আভাসে বিন্দু দ্রুত উঠে দাঁড়ালো। সতর্ক কণ্ঠে বলল,
‘এই দেশে না বরং এই দেশ থেকেই বাইরে বের করে দাও। তাহলে আর তোমার মা খুঁজে পাবে না।’
নার্গিস থমথমে মুখে তার দিকে ফিরলো।

‘কীভাবে?’
বিন্দু আশ্বাসভরা কণ্ঠে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
‘নিচে যে লোকটা আছে। সে আমার স্বামী।’
‘কী?’ নার্গিস বিস্ফোরিত চোখে তাকালো।
‘হ্যাঁ। আমি তোমায় বলেছিলাম না সে আমায় ঠিক খুঁজে নেবে? দেখেছ, সে চলে এসেছে ঠিক সময়ে। তুমি ফাতিমার উপর একটু করুনা করো। ওকে আমার সাথে যেতে দাও। বিশ্বাস করো আমি কখনো ওর মা হতে চাইব না। ওর মা শুধুমাত্র তুমি থাকবে। আমি শুধুমাত্র ওর একটা বন্ধু আর একটা সুন্দর, পবিত্র ভবিষ্যত হবো। যেই ভবিষ্যতে কেউ ওকে নোংরা স্পর্শ করতে পারবে না। ও আর পাঁচটা বাচ্চাদের মতো একটা সুন্দর শৈশব পাবে। মুক্ত পাখির মতো জীবনযাপন করবে। প্লীজ নার্গিস! একটু করুনা করো ওই বাচ্চাটির উপর।’
বিন্দু আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে নার্গিসের পাথর মন গলানোর জন্য।‌ কিন্তু একবার যেই মনে আল্লাহ তায়ালা মোনাফিকের সিল মেরে দেয় তা কী নরম হয়? আদৌও কী নার্গিস মানবে?
দীর্ঘ পাঁচ মিনিট পরেও নার্গিসকে চুপ দেখে বিন্দু আবার ভেঙে পড়লো। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে। ক্ষিপ্ত স্বরে বলল,

‘এখন চুপ করে কেন আছো? এতক্ষণ সুযোগের দোহাই দিয়েছ আমি তোমায় সুযোগ দেখিয়েছি। তবে এখন কেন চুপ করে আছো? নিজের গর্ভে লালন করা ওই মেয়েটার উপর কী তোমার একটুও দয়া হয় না? আর দশ বছর পার হলেই তোমার এখানে আসা পুরুষরা তোমায় রেখে তোমার মেয়ের কচি, ফুলের ন্যায় পবিত্র মেয়েটার উপর লোলুপ দৃষ্টি ফেলবে। তুমি মা হয়ে সেটা সহ্য করতে পারবে? তোমার মেয়েটা যন্ত্রণায় কাতরাবে আর তোমায় অভিশাপ দেবে নার্গিস। ঠিক যেমনটা তুমি তোমার মাকে দাও। ঠিক যেভাবে তুমি নিজেকে আয়নায় দেখতে পারো না সেভাবে ফাতিমাও নিজেকে হয়তো এমনি আয়নায় দেখতে পারবে না। তোমার মেয়েকে একটা স্বাভাবিক জীবন দেয়া মা হিসেবে তোমার দায়িত্ব। তুমি সৃষ্টিকর্তার দেয়া আমানতের খেয়ানত করছ! আল্লাহর গজব পড়বে তোমার উপর।’
সে এতটাই রাগান্বিত স্বরে চেঁচামেচি করল যে শাহিন ছুটে আসল। বদ্ধ দরজায় ধাক্কা দিয়ে শাহিন চিন্তিত কণ্ঠে বলল,

‘মালকিন, কী হয়েছে? ভেতরে কে চেঁচামেচি করছে? ওই মেয়েটা?’
বিন্দু হাপাচ্ছে আর কাঁদছে। সে কী করে ওই মুক্ত জীবনে সুখ করবে এই নিষ্পাপ পুতুলটিকে ধ্বংস হতে দিয়ে।
পাথরের ন্যায় থমকে দাঁড়ানো নার্গিস একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বিন্দুর দিকে। যে কি-না তাকে ঘৃণাভরা চোখে দেখছে। সে মুখ খুললো। আদেশের সুরে বলল,
‘কিছু হয়নি শাহিন। তুমি এখান থেকে যাও।’
দরজা ধাক্কানো থেমে গেল। নার্গিস তখনো চুপ। বিন্দু তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
‘তুমি নিজেই চাওনা ফাতিমা একটা সুন্দর জীবন পাক, তাই না? আসলে আমার-ই ভুল যে আমি তোমার কাছে অনুরোধ করেছি। আমি জানতাম না একজন মা এতটা নিকৃষ্ট হতে পারে।’
বলেই সে দরজার দিকে পা বাড়ালো। এখন তালহার ই তার ভরসা। সে দরজার কপাট খুলতে গেলেই নার্গিস পিছু ডাকল,

‘দাঁড়াও।’
বিন্দু ফিরে তাকালো। একদফা চমকালো নার্গিসকে ছুটে কাবার্ডের দিকে যেতে দেখে। নার্গিস দ্রুত হাতে কাবার্ডের উপরে থাকা লাগেজটা বের করে তাতে ফাতিমার প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড় ঢুকাতে লাগলো।
বিন্দু অবুঝ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
‘কী করছ? আমায় কেন ডেকেছো?’
নার্গিস দ্রুত হাতে জামা, জুতা, মাথার স্কার্ফগুলো ঢোকাতে ঢোকাতে ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
‘ফাতিমা আরামদায়ক সাদামাটা পোশাক পরতে পছন্দ করে। মাথায় বান্দানা পরা ওর শখ। আর সবসময় ব্যালেরিনা জুতা ই পড়ে।’
বিন্দু চোখেমুখে অপ্রতিরোধ্য বিস্ময়ের আনাগোনা। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। নার্গিস ঝড়ের গতিতে পুরো কাবার্ডের এক পাশ ঢুকিয়ে দিল লাগেজের ভেতর।
পরপরই বেডসাইড মিইন কাবার্ড থেকে কিছু ওষুধ বের করে তাকে দেখালো,
‘এই নীল রঙের পাতার ওষুধটা ওর গ্যাস হলে খাওয়াতে হয়। আর এই সিরাপটা ঠান্ডা, জ্বর হলে। আর এই সিরাপটা কাশি হলে।’

বলেই সেগুলোকেও সে ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল। সবশেষে সে একটা ড্রাইফ্রুটসের কৌটা আর একটা সোনার বক্স ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল,
‘ওর হাতে সারাদিন কিছু না কিছু ড্রাই ফ্রুটস থাকে। এগুলো না খেতে পারলে ও ঝামেলা করে। আর এই লাল বক্সটাতে ওর জন্য গড়িয়ে রাখা কিছু সোনার অলংকার আছে। এগুলো ওর।’
লাগেজের চেইন আটকে দিয়ে সে লাগেজ সমেত এগিয়ে আসে বিন্দুর সামনে। হতভম্ব বিন্দুর চোখে চোখ রেখে ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘ওর শুধু চিংড়ি মাছে এলার্জি আছে। আর কোনোকিছুতে নেই। সকালে এক গ্লাস দুধ, একটা ডিম আর কিছু ফল থাকতেই হবে। নয়তো সারাদিন তার মন খারাপ থাকে। দুপুরের খাবারে এক ধরণের গোশত থাকলে পেট ভরে ভাত খায়। রাতে যা দেয়া হয় তাই খায়। আর বৃষ্টির পানি গায়ে লাগলেই জ্বর আসে। এমনিতে বছরে তিনবার জ্বর হয় ওর। ওই সময়ে চব্বিশ ঘন্টা কারোর বুকে জড়িয়ে নিয়ে থাকতে হয়। তোমায় ওর মা হতে হবে না। শুধু ওর যখন‌ জ্বর হবে তখন ওকে একটু চব্বিশ ঘন্টা বুকে জড়িয়ে রেখো। নয়তো ওর ভীষণ কষ্ট হয়, ছটফট করে।’

সে বিন্দুর দিকে লাগেজটা এগিয়ে দিল। নার্গিসকে দেখে মনে হচ্ছিল সে গলা কাঁটা মুরগির মতো কাঁদছে কিন্তু তার চোখে এক ফোঁটা পানি নেই। থমকে থাকা বিন্দুর আগে ঘৃণা হতো নার্গিসকে ছুঁতে। কিন্তু এই প্রথম মনে হলো, সে একজন মাকে দেখছে। আর এই মা’টিকে সে জড়িয়ে ধরতে চায়। বিন্দু বিলম্ব করল না। ঝট করে নার্গিসকে জড়িয়ে ধরলো। ধিমি কণ্ঠে বলল,
‘নিজের মাতৃত্বকে লাঞ্ছিত হতে না দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ নার্গিস। আজকের এই সিদ্ধান্তের জন্য তুমি নার্গিসের চোখের দিকে না তাকাতে পারলেও, তুমি ফাতিমার মায়ের চোখের দিকে একদিন ঠিকই গর্বের সাথে তাকাতে পারবে।’

নার্গিস অনড়, চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে। থমথমে মুখে বলল,
‘আম্মা এসে পড়বে। সে দেখলে কোনোদিন ফাতিমাকে নিতে দেবে না।’
বিন্দু অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে ঘন ঘন মাথা নাড়লো। বলল,
‘আমি তার একটুও কষ্ট হতে দেব না। এটা একজন মায়ের ওয়াদা আরেকজন মায়ের কাছে।’
নার্গিস স্মিত হাসল। বিন্দু ছুটে গেল চেয়ারে নত মুখে বসে থাকা বাচ্চাটির দিকে। সে ফাতিমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসতেই ফাতিমা মুখ তুললো। বিন্দু তার দুগাল আঁকড়ে ধরে চোখের পানি মুছে দিয়ে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। বলল,
‘আমার ফাতিমা কাঁদছে কেন? তুমি কী লিলির সাথে যাবে?’
ফাতিমা মায়ের দিকে তাকালো। নার্গিস শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো। বিন্দু পুনরায় বলল,
‘তোমার আম্মি অনুমতি দিয়েছে তোমায় আমার সাথে যাওয়ার জন্য। তুমি কী আমার সাথে যেতে চাও? লিলি, তুমি আর পেটের ভেতরে থাকা পুতুল একসাথে থাকব। খেলা করব, বাইরে ঘুরতে যাব, পার্কে যাব, একসাথে ঘুমাব, একসাথে রান্না করব, পড়াশুনা করব।’
ফাতিমাকে আরো নতুন নতুন স্বপ্ন বোনার প্রশ্রয় দিয়ে দিল বিন্দু। মুক্তির তৃষ্ণায় তৃষ্ণার্ত ছোট্ট সত্তাটি ছটফট করে উঠল সেই স্বপ্নগুলোর কথা ভেবেই। না জানি বাস্তবতা কত সুন্দর!
সে মায়ের দিকে তাকালো। অনুনয় ভরা কণ্ঠে বলল,

‘Kya main Lily ke sath ja sakti hoon, ammi? Please jaane dijiye. Mera yahan dam ghutta hai. Aap to har waqt mere paas nahin rehtin. Jab raat ko aap nahin hoti hain, bure aadmi mere sapno mein aakar mujhe darate hain.’
(আমি কি লিলির সাথে যেতে পারি, আম্মি? প্লিজ যেতে দাও না। এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। তুমি তো সব সময় আমার পাশে থাকো না। রাতে যখন তুমি থাকো না, তখন খারাপ লোকগুলো আমার স্বপ্নে এসে আমাকে ভয় দেখায়।)
নার্গিসের মনে হলো তার বুকের ভেতর কেউ খঞ্জল কুপে দিয়েছে। সে ভেতরে ভেতরে গলা কাঁটা মুরগির মতো ছটফট করে উঠল। কিন্তু বাহিরে শান্ত, স্থির কোনো ভয়ঙ্কর সমুদ্রের ন্যায় শান্ত, ছমছমে। সে মেয়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। হাত বাড়াতে গেলেই দেখল তার হাত থরথরিয়ে কাঁপছে। কেন কাঁপছে? সে জানে না। সে নিজের উপর জোর করে মেয়ের হাতটা আঁকড়ে ধরল। কখনো প্রকাশ্যে চুমু না খাওয়া মা’টি আজ বড্ডো সাহস করে একটা চুমু খেলো ফাতিমার কপালে। কঠিন চোয়ালে জোরপূর্বক মিষ্টি একটা হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,

‘এখন থেকে আর তোমার দম বন্ধ হয়ে আসবে না। রোজ রাতে খারাপ লোকেরা এসে তোমায় ভয় ও দেখাবে না। আজ থেকে তুমি সবার সাথে খেলতে পারবে। কেউ তোমায় ঘৃণা করবে না। যাও, লিলির সাথে গিয়ে ক’দিন ঘুরে আসো।’
নার্গিস জানে একবার পবিত্রতা আর মুক্তির স্বাদ পেয়ে গেলে ফাতিমা কখনোই আর এখানে ফিরে আসবে না। কিন্তু তার ভেতরে কোথাও না কোথাও একটা সত্তা লুকিয়ে আছে, যে কি-না সন্তানকে চিরতরে দূরে চলে যেতে বলতে পারছে না। তাই বেড়াতে যাওয়ার কথা বলল। হয়তো তাতে তার ভেতরের ওই লুকায়িত সত্তাটির ছটফটানি একটু কমবে। তার সন্তানটি বেড়াতে গিয়েছে। তাকে ছেড়ে যায়নি তো! নার্গিস দ্রুত সরে যায় তার থেকে।
সহসা ফাতিমার চোখ খুশিতে বড় বড় হয়ে গেল। সে চিৎকার করে বিন্দুকে বলল,

‘Lily jaldi chalo. Ammi ne ijazat de di hai tumhare sath jaane ke liye. Jaldi chalo nahin to der ho jayegi.’
( ‘লিলি তাড়াতাড়ি চলো! আম্মি তোমার সাথে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিয়েছে। তাড়াতাড়ি চলো, না হলে দেরি হয়ে যাবে।’)
সে দ্রুত এই বন্দীশালা থেকে বের হওয়ার জন্য বিন্দুকে তাড়া দিচ্ছে। নার্গিসের কঠিন সত্তাটাও একটু একটু করে ভেঙে যেতে লাগল তার উল্লাস দেখে। সে মা হিসেসে তার সন্তানের জন্য অভিশাপ! এর থেকে নিকৃষ্ট জীবন আর কি-ই বা হতে পারে?
বিন্দু প্রগাঢ় হেসে তাকে কোলে তুলে নিলো।
নার্গিস ফাতিমার বিড়াল ব্যাগটিতে একটা পানির পট আর একটা ফলের নামের বই ঢুকিয়ে দিয়ে তার কাঁধে ঝুলিয়ে দিল। ফাতিমা ঘন ঘন হাত নেড়ে মাকে বিদায় দিয়ে বলল,

“Ammi, Allah Hafiz. Main jaldi wapas lout aaungi.
(আম্মি, আল্লাহ হাফেজ। আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসব।)
ওটা শুধুই একটা স্বান্তনা ছিল। নার্গিস মলিন হাসল।
তালহারের দীর্ঘ অপেক্ষায় চ্ছেদ ঘটল দরজা খুলে কেউ ঢুকতেই। তালহার ফিরে তাকালো। ফাতিমাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিন্দু। ফাতিমা খানিক‌ ভ্রু কুঁচকে নিলো তালহারকে দেখেই। বিন্দু তাকে বলল,
‘Fatima, ye aapki Lily ke shohar hain. Salam do.’
(ফাতিমা, উনি তোমার লিলির স্বামী‌। সালাম দাও।)
ফাতিমা কিছুটা থমথমে মুখে কলের পুতুলের মতো বলল,
‘Assalamu Alaikum, Lily ke shohar!’
(আসসালামুয়ালাইকুম, লিলির স্বামী!)
তালহারের মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠল ‘লিলি কি শহার’ শুনে। বিন্দু তালহারের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘Talhar, ye Fatima hai. Meri chhoti si dost!’
(তালহার, এই হলো ফাতিমা। আমার ছোট্ট বন্ধু।)
তালহার স্মিত হেসে ফাতিমার মতো করেই জবাব দিল,
‘Walaikum Assalam, Lily ki chhoti dost!’
(ওয়ালাইকুমুস সালাম, লিলির ছোট্ট বন্ধু।)
ফাতিমা পিটপিট করে চেয়ে বলল,
‘Lily ne bataya ki tum acche aadmi ho.’
(লিলি বলেছে, তুমি ভালো লোক।)
‘Woh to main hoon.’
(তা তো আমি বটেই।)
তালহার মৃদু হেসে বিন্দুর দিকে তাকালো। তার দৃষ্টি প্রশ্নবিদ্ধ। বিন্দু সেই প্রশ্নের মানে বুঝল। টলমলে চোখে চেয়ে বলল,

‘সে একটা সুন্দর, পবিত্র জীবন ডিজার্ভ করে, তালহার।’
তালহার অবুঝের মতো চেয়ে রইল। বিন্দু আবার বলল,
‘আমরা কি ওকে আমাদের সাথে নিয়ে যেতে পারি?’
তালহার হকচকিয়ে গেল। তার ললাটে মৃদু দুশ্চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। কেননা সে নিজেও ভারতে এসেছে অবৈধ পথে, আর বিন্দুকেও একইপথে বাংলাদেশে নিয়ে যেতে হবে। এর মধ্যে আরও একজনকে সাথে নেওয়া ভীষণ বিপদজনক। কিন্তু সেটা এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় চিন্তা নয়। সে অস্ফুট স্বরে বলল,
‘মানে কী? ওর পরিবার ওকে নিতে দেবে?’
বিন্দু মাথা দোলালো,
‘ওর মা অনুমতি দিয়েছে। ওর নানি হয়তো ওকে এই নোংরা জীবন থেকে দূরে পাঠাতে দেবে না, কিন্তু ওর মা চায় না তার সন্তান এই আবর্জনার মধ্যে বড় হোক। প্লিজ তালহার, হেল্প মি। আর পাঁচটা বাচ্চার মতো স্বাভাবিক, সুন্দর একটা শৈশব পাওয়া তো ওর অধিকার। আমাদের কারণে হয়তো এই নিষ্পাপ শিশুটা অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি পাবে।’
তালহারের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠল।

‘তার মা কোথায়?’
তালহারের কথা শেষ হতে না হতেই নার্গিস ফাতিমার লাগেজ নিয়ে এগিয়ে এলো। তালহার নারীটির আপাদমস্তক দেখে তাকে সালাম দিল। নার্গিস গাম্ভীর্যের সাথে জবাব দিল। তালহার বিন্দু আর ফাতিমাকে একপলক দেখে নার্গিসের উদ্দেশ্যে বলল,
‘আমি কি আপনার সাথে একান্তে একটু কথা বলতে পারি?’
নার্গিস সম্মতি দিতেই বিন্দু ফাতিমাকে নিয়ে নীরবে কামরা থেকে বেরিয়ে গেল। তালহার মুখোমুখি দাঁড়ালো নার্গিসের। জিজ্ঞেস করল,
‘আপনি সজ্ঞানে ফাতিমাকে আমাদের সাথে যেতে দিচ্ছেন?’
নার্গিস গম্ভীর গলায় জবাব দিল,
‘হ্যাঁ।’
‘আপনি নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিশ্চিত তো?’
‘আমি হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিই না। আর কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তা নিয়ে কখনো আফসোসও করি না।’
নারীটির চিবুকে পেশাগত কাঠিন্য আর দম্ভ স্পষ্ট। তালহারের নিজের মনেও একটা প্রশান্তির নিঃশ্বাস বয়ে গেল। কেননা ওই পরীটার মতো নিষ্পাপ বাচ্চাটিকে এই পরিবেশে সে নিজেও মানতে পারছিল না। সে ধীরস্বরে বলল,

‘আমি আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আপনার সিদ্ধান্তের মান রাখব।’
নার্গিস থমথমে মুখে বলল,
‘শুকরিয়া।’
‘আমি কি আপনাকে একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারি?’
‘সীমার মধ্যে থেকে করবেন।’
‘অবশ্যই।’
তালহার প্রথম মুহুর্তে সায় জানালো। এবং দ্বিতীয় মুহুর্তেই সীমা লঙ্ঘন করে কাটকাট কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
‘ফাতিমার বাবা কে?’
নার্গিসের চোখে ক্রোধ ফুটে উঠল।
‘আপনাকে না মাত্রই বললাম, সীমার মধ্যে প্রশ্ন করবেন?’
‘ফাতিমা এখন আমার জীবনের সাথে জুড়ে গিয়েছে। তাই এটা জানা আমার অধিকার। ওর বাবা কে?’
‘ওর বাবা নেই।’
নার্গিস এক কথায় শেষ করে দিল।
কিন্তু তালহারের চোখের উপচে পড়া কৌতূহল এই জবাবে শান্ত হলো না। থমথমে মুখে বলল,
‘আমি একজন গোয়েন্দা অফিসার! এখানে হয়তো আমার কোনো ক্ষমতা নেই, কিন্তু আমি আমার দক্ষতা হারাইনি।’
নার্গিসের চোখ সরু হয়ে এলো,

‘আপনি কী বলতে চাইছেন?’
তালহার কথা পেঁচালো না। পকেট থেকে সুপ্তর একটা ছবি বের করে নার্গিসের মুখের সামনে তুলে ধরল। গমগমে স্বরে বলল,
‘সুপ্ত শাহরিয়ার ওর নাম জানেন নিশ্চয়ই। আপনার মায়ের সাথে তার খুব ভালো সম্পর্ক। কাশ্মীর সুপ্তর প্রিয় একটা জায়গা যেখানে ও বছরে অন্তত দুইবার আসে। বিগত আট বছরে ও মোট ছাব্বিশ বার কাশ্মীরে এসেছে। সুপ্তর অভ্যাস, বদ অভ্যাস সব আমার আগাগোড়া জানা। এটাও জানা আপনার মায়ের সাথে ওর ভালো সম্পর্ক ঠিক কেন।’
নার্গিসের দৃষ্টি থমকে আছে চোখের সামনে তুলে ধরা ওই হাস্যোজ্জ্বল মুখের সুদর্শন পুরুষটি দিকে। সেদিকে একাধারে তাকিয়েই বলল,

‘তো?’
‘তো এটাই যে, ওর সাথে আপনার কোনো না কোনো সম্পর্ক ছিল। অ্যান্ড বাই এনি চান্স, ফাতিমা সুপ্তরই মেয়ে!’
নার্গিসের পুরো দেহ একটা তীব্র ঝাঁকি খেল। হাত দুটো কেঁপে উঠল ঈষৎ, দৃষ্টি হয়ে উঠল অস্থির। তবে কণ্ঠ আগের মতোই অটল রেখে বলল,
‘এমন হাজারটা সুপ্তর সাথে আমার ওঠাবসা। তার কী ব্যাখ্যা দেবেন আপনি?’
‘আমি হাজারটা সুপ্তর ব্যাখ্যা চাইছি না, আমি শুধু এই সুপ্তর ব্যাখ্যা চাই। কারণ ফাতিমার চোখ, কপাল কুঁচকানোর ভঙ্গি, চেহারার গঠন—সবটা সুপ্তর মতো। সে তার বাবার মতোই সুন্দর!’
তালহারের চোখেমুখে ফুটে থাকা অদম্য আত্মবিশ্বাস নার্গিসের ভেতরের কাঠিন্য নাড়িয়ে দিল। সে তালহারের চোখে চোখ রাখল,

‘তো?’
নিজের ধারণা সত্যি প্রমাণিত হতেই তালহারের মাঝে যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
‘তার মানে ফাতিমা সুপ্তরই মেয়ে…’
‘আপনি আপনার জবাব পেয়ে গিয়েছেন নিশ্চয়ই?’
‘সুপ্ত কেন জানে না তার একটা মেয়ে আছে?’
তালহার চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
নার্গিসের কঠিন চোয়াল কিছুটা শিথিল হয়ে এলো। ধীমি কণ্ঠে বলল,
‘টাকার বিনিময়ে মনোরঞ্জন নেওয়াই গ্রাহকদের কাজ। কাজ শেষ হয়ে গেলে আর কোনো কিছুর দায়ভার তাদের থাকে না।’
তালহারের চোখেমুখে ঘোর বিরোধিতা ফুটে উঠল,
‘মানে? একটা মানুষের তো অধিকার রয়েছে তার সন্তান সম্পর্কে জানার! সুপ্তর জানা উচিত ছিল তার একটা মেয়ে আছে।’
‘এটা আমাদের ব্যবসার নীতি নয়। আমাদের শুধু গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অধিকার আছে; ভালোবাসা, সম্মান কিংবা স্বীকৃতি চাওয়ার অধিকার নেই। আর আমাদের তো সন্তান ধারণ করারও কোনো অধিকার নেই…’

বলতে বলতেই থমকে গেল নার্গিস। কিন্তু তালহার ঠিক সেখানেই আটকে গেল।
‘তাহলে ফাতিমা কেন পৃথিবীতে?’
নার্গিস মুখ তুলল। চোখে চোখ রেখে থমথমে মুখে বলল,
‘এর জবাব দিতে বাধ্য নই আমি। আপনার যথেষ্ট প্রশ্নের জবাব আমি দিয়েছি, আর সম্ভব নয়। আপনারা যদি ঝামেলা ছাড়া এখান থেকে বের হতে চান, তবে এখনই বের হন। নয়তো আম্মি এসে গেলে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যাবে। তখন আপনি আর আপনার স্ত্রীসহ সবাই আটকে যাবেন এই বন্দিদশায়।’
‘আপনার আম্মির এত ক্ষমতা এখনো হয়নি।’
তালহার কপাল ঘষতে ঘষতে বলল।
নার্গিস শান্ত দৃষ্টি ফেলে পা বাড়ালো চলে যাওয়ার জন্য। পেছনে ফেলে রেখে গেল অনুতাপ আর অস্থিরতায় জর্জরিত এক অসহায় বন্ধুকে।
তালহার পেছন থেকে আবার ডেকে উঠল,
‘বিগত পাঁচ বছরে বহুবার সুপ্ত এখানে এসেছে। এমনকি তিন মাস আগেও এসেছিল। আমি নিশ্চিত সে আপনার কাছেও এসেছিল, ফাতিমাকেও দেখেছে। কখনো কি সে ফাতিমাকে খেয়াল করেনি? জিজ্ঞেস করেনি সে কার মেয়ে?’

নার্গিসের পা থেমে গেল। সে না ফিরেই বলল,
‘সে বহুবার ফাতিমাকে দেখেছে, দু-একবার কথাও বলেছে। কিন্তু সে এমন কিছুই খেয়াল করেনি, যা আপনি এক দেখায় খেয়াল করলেন। কার মেয়ে—এটা জিজ্ঞেস করার ইচ্ছা বা প্রয়োজন কোনোটাই তার ছিল না। কারণ এতে তার কিছুই যায়-আসত না। হয়তো তার ধারণা সত্যি হয়ে যাওয়ার ভয়েই সে সবসময় এই প্রশ্নটা এড়িয়ে গেছে। আর আমারও কোনো প্রয়োজন ছিল না তাকে এটা জানানোর।’
তার কণ্ঠে এমন কিছু একটা ছিল, যা তালহারকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দিল। হ্যাঁ, সুপ্ত তো সব কিছু নিয়েই এমন উদাসীন ছিল। তার কাজ ছিল শুধু একাধিক নারীর মাঝে ডুবে থাকা। কার কী গেল বা এলো, তা নিয়ে কোনো ভাবনাই তার ছিল না—দায়িত্ববোধ তো অনেক দূরের কথা।
ভুলে ভুলে জর্জরিত ছেলেটার ওপর আগেই করুণা হয়েছিল তালহারের, কিন্তু আজ সেটা যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল। সে বিড়বিড় করে স্বগতউক্তি করল,
‘সৃষ্টিকর্তা ঝুলি ভরে সুখ দিয়েছিল তোর কোলে। কিন্তু তুই হিংসায় অন্ধ ছিলি। একবার ও নিজের দিকে চেয়ে দেখিসনি। সারাজীবন শুধু অন্যকে হিংসা করে আর ভুল বুঝে নিজের সুখগুলোকে পায়ে ঠেলে দিলি। এই ভুলের কোনো প্রায়শ্চিত্ত হয় না রে সুপ্ত… আমি তোর এই পরিণতির জন্য দোষী নই, তুই নিজে আর তোর কর্মই এর জন্য দায়ী।’
বুকভরা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল তালহার। কিন্তু ইদানীং বুকের ভেতরটা অনুতাপের ভারে নুয়ে আসে। কারো আর্তচিৎকার যেন তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়, কোনোভাবেই শান্তি পায় না সে। আজকের এই সত্য তার অস্থিরতা যেন আরও বাড়িয়ে দিল। ছেলেটির তো জানার অধিকার ছিল, তার একটা সন্তান আছে!
সে বুকে হাত দিয়ে ডলতে ডলতে নতমুখে বেরিয়ে এলো, নার্গিসকে পাশ কাটিয়ে। কিন্তু এবার নার্গিস নিজেই পিছু ডাকল,

‘শুনুন।’
তালহার ফিরে তাকালো। নার্গিস পরনের ওড়নাটা খামচে ধরে জিজ্ঞেস করল,
‘সুপ্ত আপনার কী হয়?’
‘আমার একমাত্র বন্ধু।’
‘আমি চাই না সে কোনোভাবে ফাতিমার ব্যাপারে জানতে পারুক।’
তালহার মলিন মুখে বলল,
‘সে আর কোনোদিনই জানতে পারবে না, সৃষ্টিকর্তা তার ঝুলিতে কতখানি সুখ দিয়েছিল। কখনোই জানতে পারবে না যে সে ফাতিমার মতো এমন একটা ফুটফুটে মেয়ের বাবা…’
নার্গিসের কপালে ক্ষীণ ভাঁজ পড়ল। তবুও সে ওই প্রসঙ্গে আর কথা বাড়ালো না।
‘আর কিছু বলবেন?’
নার্গিস শুকনো ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল,
‘সে… সে কেমন আছে?’
তালহার একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘আল্লাহর কাছে আছে। হয়তো ভালো আছে, কিংবা খারাপ… আমি জানি না। আপনি তার জন্য দোয়া করবেন, সে যেন অন্তত ওপারে সুখী হয়।’

নার্গিসের পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল! অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
‘ওপারে মানে? আমি তো গত সপ্তাহেও তার কণ্ঠ শুনেছি!’
‘গত সপ্তাহেই সে একটা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছে।’
নার্গিসের দেহ টলে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলে সে ঝট করে দরজার হাতল আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলালো। একজন দে”হ ব্যবসায়ীও তার গ্রহকের প্রেমে পড়ে! তালহার তার করুন দশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
এর মধ্যেই শাহিন ছুটে এসে বলল,
‘মালকিন, ওই মেয়েটা ফাতিমাকে নিয়ে বাইরে বসে আছে কেন?’
নার্গিসকে একপলক দেখে তালহার গটগট করে বেরিয়ে গেল। ঝাপসা হয়ে আসা চোখে নার্গিস তাকায় শাহিনের মুখের দিকে। এক হুঙ্কার ছেড়ে বলে,
‘এখান থেকে যাও বলছি! নিজের কাজে মনোযোগ দাও, নয়তো তোমায় আমি জীবন্ত পুঁতে ফেলব।’
শাহিন ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল। তবে তার চোরা দৃষ্টি তখনো গাড়ির দিকে এগিয়ে যাওয়া বিন্দু আর তালহারকে লক্ষ্য করছিল।

তালহার বিন্দু আর ফাতিমাকে নিয়ে গাড়িতে বসে হর্ন বাজালো। নার্গিস ধীর কদমে এগিয়ে গেল গাড়িটার দিকে। টলমলে পায়ে মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে হাত বাড়ালো মেয়ের দিকে। ফাতিমা তখন একটি প্রজাপতির মতো আনন্দে উড়ছিল। সে তাড়াহুড়ো করে মায়ের বুকে লেপ্টে গেল। শেষবারের মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিতেই নার্গিসের চোখ বেঁয়ে টুপ করে এক ফোঁটা অশ্রু গড়ালো। ফিসফিসিয়ে বলল,
‘আজ থেকে তুমি এতিম। আম্মিকে কখনো মনে রেখো না, ফাতিমা। সে একটা স্বার্থপর। যে শুধুই নিজের স্বার্থের জন্য তোমায় এই জালিম দুনিয়ায় এনেছিল। আম্মি দুঃখিত।’
সে মেয়ের গালে একটা চুমু দিয়ে সরে আসল। গাড়িটি দ্রুত চলে গেল সেখান থেকে। জানালা থেকে ফাতিমা হাসিমুখে তাকে টাটা জানালো। দোতলা থেকে এই দৃশ্য দেখে শাহিনের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
​গাড়িটি চোখের আড়াল হতেই নার্গিসের শরীরটা টলে ঘাসের ওপর পড়ে গেল। সে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল পাহাড়ি ঢালে বিছিয়ে থাকা সবুজ ঘাসের বিছানায়। তার দৃষ্টি তখন দূর সীমানার মুক্ত আকাশে। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,

​‘আগে তো বছরে অন্তত দু’বার আপনার দেখা পেতাম। এখন কী করে দেখা পাব? আপনার স্পর্শ তো আজও আমার দেহে লেগে আছে! বিগত তিন মাস ধরে আমি এই শরীরে আর কারো ছোঁয়া লাগতে দিইনি। আপনিই তো বলেছিলেন, খুব শীঘ্রই আবার আসবেন। এখন আমি বছরের পর বছর কার অপেক্ষায় বসে থাকব? ফাতিমাকে তার বাবার ঐ সুন্দর মুখটা একবারের জন্যও কীভাবে দেখাব? আট বছর আগে কেন এসেছিলেন আমার জীবনে? সেই যে রোগে আক্রান্ত হলাম, আর তো কোনো ওষুধের দেখা পেলাম না!

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৮

আমি নিজেকে আর চিনতে পারি না, নিজের চোখের দিকে তাকাতে পারি না—শুধু আপনার কারণে। আমাদের জন্য ভালোবাসা, স্বামী, সন্তান যদি পাপই হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ কেন আমাদের মনে এমন অনুভূতি দিলেন?’
​তার চোখের কোণ বেয়ে অনবরত গড়িয়ে পড়া নোনা জলগুলো সবুজ ঘাসের আড়ালে লুকিয়ে যেতে লাগল।
সে ছিল ‘মারিজ এ ইশক—ভালোবাসার রোগী’ যেই রোগের কোনো প্রতিষেধক এই মর্ত্যে নেই।

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ২০