ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৬
মেহজাবিন নাদিয়া
সারিম অরির ঠোঁট ছেড়ে দিল। অরি নিজের ঠোঁট চেপে ধরে রাগী চোখে সারিমের দিকে তাকাল। বউয়ের এই রূপ দেখে সারিম একটু বাঁকা হাসল। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
_”এটা কী করলে যুবতী? ঘুমের ঘোরে আমার ইজ্জতটাই কেড়ে নিলে! এখন আমার বউ জানতে পারলে কী হবে, ভেবে দেখেছ একবার?”
সারিমের কথা শুনে অরি খুব বিরক্ত হলো। লোকটার এই মাথা গরম করা কথা তার একদম সহ্য হচ্ছিল না। মুখে চরম বিরক্তি ফুটিয়ে সারিমকে ধাক্কা দিয়ে সরানোর চেষ্টা করে অরি বলল,
_”অসভ্য লোক, সরুন বলছি! আর ছুঁতেই আসব না আপনাকে। আপনার ইজ্জত আপনি আপনার প্যান্টের ভেতরেই গুটিয়ে রাখুন!”
সারিম ঝট করে অরির হাতটা চেপে ধরল। সারিমের টানে অরি সোজা এসে পড়ল তার বুকের ওপর। সারিম এক হাতে অরির চুল নিয়ে খেলতে খেলতে বলল,
_”বউ, প্যান্টের ভেতরের ইজ্জতটা সিগন্যাল দিচ্ছে তোমার ছোঁয়া পেতে! এখন কী করি বলো তো?”
অরি চোখ ছোট ছোট করে সারিমের মুখের দিকে তাকাল। একটু পরেই সারিমের কথার আসল মানে বুঝতে পেরে লজ্জায় তার গাল দুটো লাল হয়ে উঠল। তবে সারিমকে তা বুঝতে না দিয়ে মুখটা গম্ভীর রেখে বলল,
_”এক কাজ করুন…”
অরি কথার মাঝে থেমে গেলো।সারিম কুঁচকানো ভ্রু নিয়ে তাকাল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অরি আচমকা সারিমকে ধাক্কা দিয়ে নিজের ওপর থেকে সরিয়ে দিল। যাওয়ার সময় পা দিয়ে সারিমকে একটা কিক মারতেও ভুলল না! সারিম অরির নাম ধরে চিৎকার করে বলে উঠল,
_”বউ, কাজটা কিন্তু তুই একদম ভালো করলি না! এর মজা আমি তোকে রাতে বোঝাব।ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার শখ ছুটিয়ে দিচ্ছি দাঁড়া!”
অরি সারিমের কথায় কান না দিয়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। কাল রাতে তারা দুজনে মৃধা নিবাসে না গিয়ে সারিমের ফ্ল্যাটে এসেছিল, কারণ এখান থেকে হাসপাতাল কাছে।ভাবলো এখানে থেকেই আরিশান মৃধার খেয়াল রাখবে। বাড়ি গেলে আবার কতোটা পথ জার্নি করে আসতে হবে।
সারিম ধীর পায়ে বেড থেকে নামল।তার আজ অনেক কাজ আছে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে। পারিবারিক ঝামেলার কারণে নতুন পাওয়া দায়িত্বটা ঠিকঠাক পালন করতে পারেনি, কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার নতুন কাঠামো নিয়ে তাদের পরবর্তী প্রজেক্টের কাজ শুরু হবে। যাওয়ার আগে আরিশান মৃধার সাথে একবার দেখা করে যাবে ভাবল। পরক্ষণেই কিছু একটা মনে পড়তেই সে বাঁকা হাসল। সাইড টেবিল থেকে ফোনটা তুলে একজনকে কল দিল। দুবার রিং হতেই ওপাশের মানুষটি ফোন ধরল।
দেয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে সারিম বলল,
_”আমি না আসা পর্যন্ত দরজা বন্ধ রাখবে। সে যেই আসুক না কেন, আমি ছাড়া যেন কেউ দরজা না খোলে।”
ওপাশের ব্যাক্তি সম্মতি পেতেই সারিম ফোন কেটে দিল। তারপর শিস বাজাতে বাজাতে ওয়াশরুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভিতর থেকে পানি পড়ার শব্দ আসছে, সারিম বুঝল অরি গোসল করছে। অমনি তার মাথায় এক জাউরা বুদ্ধি চেপে বসল।রুমে থাকা একটা ফুলের টব মেঝেতে আছাড় মেরে ফেলে দিল সে। তারপর মেঝেতে বসে মুখ দিয়ে চিল্লিয়ে _”আহ!” করে উঠল।
ওয়াশরুমের ভেতরে অরি কেবল গায়ে শাওয়ার জেল মাখছিল। হঠাৎ কিছু পড়ার শব্দ আর সারিমের চিৎকার শুনে সে খুব ঘাবড়ে গেল। শরীরে কোনোমতে একটা তোয়ালে জড়িয়ে নিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমের দরজা খুলে বাইরে এলো। সারিম তখনো ব্যথার অভিনয় করে যাচ্ছিল। অরি ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
_”কী হয়েছে আপনার? কোথায় লেগেছে, দেখি দেখান!”
অরিকে এভাবে নিজের জন্য ব্যাকুল হতে দেখে সারিম সুযোগটা হাতছাড়া করল না। অরি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সারিম তাকে আচমকা পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। অরি অবাক হয়ে সারিমের দিকে তাকাল। কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই সারিম তাকে নিয়ে ওয়াশরুমের ভেতরে ঢুকে গেল। তারপর শাওয়ার অন করে দুজনে একসাথে ভিজতে লাগল। পানির মধ্যেই অরি সারিমের বুকে ধাক্কা দিতে দিতে বলল,
_”সারিম, একদম ভালো হচ্ছে না কিন্তু বলে দিলাম! আপনি আমার সাথে এসব করার জন্য মিথ্যে নাটক সাজালেন? আর আমি ভেবেছিলাম সত্যিই লেগেছে! ছাড়ুন আমাকে, অসভ্য পুরুষ!”
সারিম অরিকে ছাড়ল না, ওভাবেই কোলে ধরে রাখল। নিজের মুখ দিয়ে অরির তোয়ালের গিটটা খুলে দিল সে। সাথে সাথে তোয়ালেটা পানির তোড়ে অরির শরীর থেকে নিচে খসে পড়ল। লজ্জায় অরি সারিমের বুকে মুখ লুকিয়ে শক্ত করে চোখ বন্ধ করে রাখল। তা দেখে সারিম হালকা হাসল। অরির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
_”বউ.I do..”
_”না!”
_”বাট সরি, আই উইল ডু মাই বেস্ট। নাও…”
কথাটা শেষ করেই সারিম অরির ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। অরি আর তাকে বাধা দিল না। সারিম নিজের মতো করে অরিকে ভালোবাসতে লাগল। শাওয়ারের ঝরনা হয়ে নেমে আসা পানির ফোঁটাগুলো বারবার তাদের দুজনকেই ভিজিয়ে দিতে লাগল। জলের সেই মুক্তোদানার মতো ফোঁটাগুলো তাদের আকর্ষণ যেন আরও হাজার গুণ বাড়িয়ে দিল, নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রাখল দুটি হৃদয়কে-যতক্ষণ না তাদের মধ্যে একজন ক্লান্ত হয়ে পড়ছে।
ধবধবে সাদা চাদরটা গায়ে জড়িয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন জেবা। তার ঠিক পাশেই শুয়ে আছেন আরিশান মৃধা। দুজনের ঘুমন্ত চেহারাতেই কাল রাতের ক্লান্তির ছাপ বড্ড স্পষ্ট।
বাইরে ভোরের আলো ফুটেছে বহু আগেই, তবে জানালার ভারী পর্দা ঠেলে সেই আলোর এক বিন্দুও ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারছে না।
হঠাৎ ঘুমের ঘোরে সামান্য নড়েচড়ে উঠল জেবা। অগোছালো হাতটা পাশে বাড়াতেই স্পর্শ পেল অন্য কারও অস্তিত্বের। মুহূর্তেই তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল। ধীর গতিতে পিটপিট করে চোখ মেলল সে। কিন্তু পাশে ঘুমন্ত আরিশান মৃধাকে দেখেই ধড়ফড় করে উঠে বসল বেচারি!সে এখানে কী করছে?
ভাবনাটা মাথায় আসতেই চোখ আটকে গেল নিজের ওপর। তার গায়ে জড়িয়ে আছে আরিশান মৃধার শার্ট। ফর্সা ত্বকের কয়েক জায়গায় স্পষ্ট হয়ে আছে লালচে ক্ষতের দাগ। জেবা বিস্ফোরিত চোখে তাকাল আরিশান মৃধার দিকে। লোকটা তখনও নিখাদ ঘুমে তলিয়ে আছে।
চোখের সামনে ভেসে উঠল কাল রাতের প্রতিটি দৃশ্য। কতটা নির্মম আর স্বার্থপর হলে একটা মানুষ একটা নারীর অমতকে তোয়াক্কা না করে এমনটা করতে পারে!
ভাবতেই তীব্র ঘৃণায় রি রি করে উঠল জেবার চারপাশ। এই লোকটার প্রতি তার মনের সমস্ত ধারণা কতটা ভুল ছিল! আর দশটা পুরুষমানুষের মতোই লালসার মোহে অন্ধ হয়ে নিচে নামতে যার বাঁধেনি, তার আর আরিশান মৃধার মধ্যে তো জেবা আজ আর কোনো তফাত খুঁজে পাচ্ছে না।
লোকটার মুখটা দেখার তীব্র অনিচ্ছা জাগল জেবার অন্তরে। লোকটা কি একই সাথে দুই খেলায় মেতেছে? আনতারা মৃধাকেও ছাড়ছে না, আবার তাকেও নয়?
না, এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না। এই মুহূর্তে এই পুরুষটার মুখোমুখি হওয়ার বিন্দুমাত্র শক্তি কিংবা ইচ্ছে জেবার নেই। সে চলে যাবে-বহুদূরে, যেখানে এই অশুভ ছায়া তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। লোকটা তার নিজের স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে সুখে থাক। জেবা নামের কোনো অস্তিত্ব যে তার জীবনে কখনো ছিল, তা যেন সে চিরতরে ভুলে যায়।
তার ভালোবাসা না হয় একতরফা হয়েই রয়ে গেল। তা বলে নিজের বাবার খুনির স্বামীর সাথে সংসার? না, তা কোনোদিন সম্ভব নয়।
বিছানা ছেড়ে ধীর পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল জেবা। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুবিন্দুগুলো দুহাতে নিঃশব্দে মুছে নিল। নিচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নিজের পোশাকগুলো কুড়িয়ে নিয়ে সোজা ঢুকে গেল ওয়াশরুমে। নিজের জামাটা বদলে নিয়ে বের হয়ে এলো দ্রুত।
আরিশান মৃধার শার্টটা খুব যত্নে রেখে দিল বেডের পাশে। এবার চলে যাওয়ার পালা। কিন্তু দু-পা বাড়াতেই কেন যেন থমকে দাঁড়াল সে। বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠল এক অজানা টানে। পিছু ফিরে তাকাল বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা পুরুষটার দিকে।
ধীর পায়ে আবার এগোলো সেখানে। বেডসাইড টেবিল থেকে শার্টটা তুলে আঁকড়ে ধরল হাতের মুঠোয়। তারপর ঘুমন্ত আরিশান মৃধার এলোমেলো চুলে একহাত রেখে, গভীর ভালোবাসায় কপালে এক টুকরো আলতো চুমু আঁকল।
ঘুমের ঘোরে আরিশান মৃধা সামান্য নড়ে উঠতেই জেবা চট করে হাত সরিয়ে দূরে সরে এলো। যাওয়ার আগে শেষবারের মতো তাকাল সেই চেনা মুখটার দিকে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো নোনা জলে। আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল সে।
কিন্তু দরজায় হাত দিতেই জেবার খেয়াল হলো-দরজা বাইরে থেকে লক করা!
রাতের স্মৃতিটা মনকে নাড়া দিয়ে গেল। দরজা তো কাল রাত থেকেই বন্ধ! এখন সে কী করবে? কাউকে ডাকবে? কিন্তু ডাকলে যে আরিশান মৃধার ঘুম ভেঙে যাবে! তবে কি কারো আসার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবে এখানে? কিন্তু কেউ এসে যদি তাদের এই অবস্থায় দেখে ফেলে? তাছাড়া, এই মুহূর্তে আরিশান মৃধার মুখোমুখি হওয়া তার পক্ষে অসম্ভব!
পায়চারি করতে করতে জেবার চোখ গিয়ে আটকে গেল বেডসাইড টেবিলে রাখা ফলের বাটিতে। সেখানে একটি ফল কাটার ছোট ছুরি রাখা রয়েছে-যার ডগাটা বেশ সুচালো।একটা বুদ্ধি খেলে গেল জেবার মাথায়।
সে তড়িঘড়ি ছুরিটা তুলে নিয়ে দরজার কাছে গেল। অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে লকটার মেকানিজম পর্যবেক্ষণ করে লকের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল ছুরির চোখা ডগাটি। তারপর ধীরেসুস্থে কিছুক্ষণ ঘোরাতেই সামান্য শব্দে খুলে গেল লকটি!জেবা বুক ভরে একটা দীর্ঘ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
রুম থেকে বের হয়েই চটজলদি আবার আগের মতো ছুরিটির সাহায্যে লকের ভেতরে পেঁচিয়ে ঘরটি বন্ধ করে দিল জেবা-যাতে বাইরে থেকে বোঝা না যায়।
তবে পা বাড়ানোর আগে, দরজায় কয়েকবার আলতো কড়াঘাত দিয়ে নক করে গেল সে। যেন এই সামান্য শব্দেই অন্তত আরিশান মৃধার ঘুমটা ভেঙে যায়!
কিছুক্ষন পর অরিকে নিয়ে সারিম হসপিটালে এল বাবাকে দেখতে। কেবিনে প্রবেশ করতেই দেখা গেল, আরিশান মৃধা ল্যাপটপে ব্যস্ত। পাশের সোফায় বসে আছেন আনতারা মৃধা ও রুবাব মৃধা। ওনাদের সাথে ফুলও এসেছে।
ফুলকে দেখেই সারিম মুখ বাঁকাল। অরি অবশ্য তাকে দেখে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না, কেবল সারিমের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। দুজনকে এভাবে হাতে হাত রেখে ঢুকতে দেখে ভেতরে ভেতরে জ্বলে উঠল ফুল। সারিম তার এই জ্বলুনিটা খেয়াল করে মনে মনে বেশ মজা পেল।
তবে এই মুহূর্তে সারিমের মাথায় অন্য দুটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল-জেবা কোথায়? আর রুমের দরজাই বা খুলল কে?
অবশ্য সারিমকে বেশিক্ষণ ভেবে আকুল হতে হলো না, পাশ থেকে আনতারা মৃধাই কথা বলে উঠলেন,
_”সারিম!তোমার কি দিন দিন জ্ঞান বুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে। বাইরে বউ নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছো ভালো কথা, কিন্তু তাই বলে অসুস্থ বাবাকে রুমে এভাবে লক করে যাবে? ওনার যদি একা একা কিছু হয়ে যেত, তখন কী হতো? ভাগ্যিস একদম সঠিক সময়ে সিকিউরিটি এনে লকটা খোলা পেয়েছিলাম!”
সারিম মায়ের কথায় কোনো কান দিল না। মহিলার ব্যবহারে তার মনে মনে খুব হাসি পেল। ভাবখানা এমন যেন স্বামীর প্রতি ভালোবাসায় দরদ একদম উতলে পড়ছে! অথচ দু-দুবার এই স্বামীকেই ধোঁকা দেওয়ার সময় একবারও সেই ভালোবাসার কথা মনে পড়েনি।
অরি এবার সারিমের হাত ছেড়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে আরিশান মৃধার পাশে দাঁড়াল। আরিশান মৃধা গম্ভীর মুখে ল্যাপটপে চোখ রেখেই সামান্য সরে বসলেন। তারপর হাতের ইশারায় পাশে দেখিয়ে দিয়ে বললেন,
_“এখানে এসে বসো, অদ্রিজা।”
অরি চুপচাপ বাবার পাশে গিয়ে বসল। দৃশ্যটা দেখে রুবাব মৃধার মনের ভেতর হিংসার আগুন জ্বলে উঠল। তিনি কত চেষ্টা করছেন সারিমের বউ হিসেবে ফুলকে আনতে,আর এই মেয়েটাকে সারিমের জীবন থেকে হটিয়ে দেওয়ার! অথচ তার ভাই অরির সাথে এমন ব্যবহার করছেন যেন অরিই ওনার নিজের মেয়ে! বিষয়টা যেন এমন-নিজেরটার কোনো খোঁজ নেই, অন্যকে নিয়ে মাতামাতি। ভাইয়ের রাগ সম্পর্কে তার খুব ভালোই জানা আছে, অথচ সেই মানুষটাই এই মেয়েটার সাথে কখনো একটা উচ্চবাচ্য পর্যন্ত করেন না!
এদিকে সারিমের মন্ত্রণালয়ে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। কেবিনের পরিস্থিতি যা দেখার সে দেখে নিল। মনে মনে নিজের সিদ্ধান্তটা এবার বদলাতে বাধ্য হলো সে-হয়তো এটাই এখন সঠিক পথ।আসার সময় লয়ারের সাথেও তার কথা হয়েছে।
সে বাবার দিকে তাকিয়ে সবার সামনে স্পষ্টভাবে বলল,
_”বাবা, জেবার ব্যাপারে তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।”
জেবার নাম শুনতেই কান সজাগ করে ফেললেন আনতারা মৃধা। রুবাব মৃধাও কৌতূহলী চোখে তাকালেন। অরি আর আরিশান মৃধা-দুজনে একসাথে মাথা তুলে চাইল।
সারিম গলা ঝেড়ে বলতে শুরু করল,
_“আগামী মাসের ২৫ তারিখ তোমার আর জেবার ডিভোর্স পেপারের কাজ সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। দুজনেই প্রস্তুত থেকো। আমি ওর ফুফুকে বিষয়টা জানিয়ে দেব। আশা করি এবার তোমার সমস্ত ঝামেলার অবসান ঘটবে, আর আমিও একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস ফেলতে পারব।”
‘ডিভোর্স হবে-কথাটা শোনার পর আনতারা মৃধা ও রুবাব মৃধার মনের ভেতরটা খুশিতে উপচে পড়ল, যদিও তা মুখে প্রকাশ করলেন না। অরি একটু আশাহত হলো, যদিও সে জানত শেষমেশ এমনটাই ঘটতে চলেছে।
আরিশান মৃধা ছেলের কথা শুনলেও কোনো রকম প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। শুধু গভীর চোখে কেবিনে থাকা মানুগুলোকে মেপে নিতে লাগলেন। ওনার এই নিঃশব্দতা দেখে সারিমও আর কথা বাড়াল না। এমনিতেই তার অনেক দেরি হয়ে গেছে, এখন দ্রুত বের হতে হবে। তাছাড়া আরিশান মৃধার অসুস্থতার কারণে আগামী কিছুদিন আয়ুশের সাথে তাকেও কাজের প্রচণ্ড চাপ সামলাতে হবে।
পরিত্যক্ত একটা জীর্ণ ঘরের মেঝেতে শুয়ে আছে অবিরাম। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে অনেক মানুষ। তাদের পোশাক-আশাক, সাজসজ্জা আর হাবভাবই বলে দেয়-তারা সবাই পাহাড়ি আদিবাসী।বিগত দু-তিন দিন ধরে অবিরাম এভাবেই নিস্তেজ হয়ে পড়ে রয়েছে। তার মাথার একটা বড় অংশ কেটে গেছে, যেখানে লাগানো রয়েছে বিশেষ ধরনের এক ঔষধি গাছের পাতার পেস্ট-যা পাহাড়ে হাত-পা কেটে গেলে বা বড় কোনো ক্ষত হলে আদিবাসীরা ব্যবহার করে থাকে।
হঠাৎ দেখা গেল অবিরামের হাত-পায়ের আঙুলগুলো সামান্য কেঁপে উঠল। দৃশ্যটা পাশে থাকা বয়স্ক প্রবীণ কবিরাজের নজরে আসতেই তিনি পাহাড়ি ভাষায় বলে উঠলেন,
_“মনে হচ্ছে লোকটার জ্ঞান ফিরবে এখন!”
কথাটা শুনে উপস্থিত বাকি সবাই উৎসুক চোখে অবিরামের দিকে চেয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর সত্যি সত্যিই পিটপিট করে চোখ মেলল অবিরাম। চোখের সামনে বাঁশ আর খড়কুটো দিয়ে বানানো ছাদ দেখে বেশ অবাক হলো সে। সারা শরীরে তার প্রচণ্ড ব্যাথা,যেন প্রতিটা হাড় ভেঙে আসছে।
ধীরে ধীরে দৃষ্টি ঘোরাতেই নজর আটকালো চারপাশে ঘিরে থাকা মানুষগুলোর দিকে-যারা সবাই গভীর কৌতূহল নিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। অবিরামের শটকাট মাথায় কিছুই ঢুকছিল না! সে কোথায়? কীভাবে এখানে এলো? আর এই লোকগুলোই বা কারা?
শরীরের তীব্র যন্ত্রণাকে তোয়াক্কা না করে অবিরাম কষ্টেসৃষ্টে উঠে বসার চেষ্টা করল। তাকে উঠতে দেখে সেই পাহাড়ি কবিরাজ লোকটা মৃদু এগিয়ে এলেন। ইশারায় তাকে শান্ত হতে বললেন।শোধালেন,
_“এখন কেমন লাগছে আপনার?কোথাও ব্যাথা আছে।”
অবিরাম ওসব কুশলবিনিময়ে কান দিল না। তার মন অজানা এক ব্যাকুলতায় ছটফট করছে। কবিরাজের প্রশ্নের দিকে কোনো পাত্তা না দিয়ে অস্থির গলায় সে জিজ্ঞেস করে উঠল,
_“আমি এখানে কীভাবে এলাম? আমাকে এখানে কে নিয়ে এসেছে?”
তার কথার ধরণ দেখে ভিড়ের মধ্য থেকে এক পাহাড়ি যুবক এগিয়ে এলো। বলল,
“আমিই আপনাকে এনেছি।নদীতে জাল দিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে দেখি ঝরনার তোড়ে ভেসে আসা আপনার শরীরটা আমার জালে আটকে গেছে। অনেক কষ্টে আপনাকে পানি থেকে টেনে তুলে এই কবিরাজ সাহেবের কাছে নিয়ে আসি।”
যুবকের কথা শুনতেই অবিরামের হঠাৎ একটা জরুরি জিনিসের কথা মনে পড়ে গেল! তীব্র আতঙ্কে তার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। সে পাগলের মতো চারপাশটায় চোখ বুলিয়ে বলে উঠল,
_“ক্যামেরা! আমার ক্যামেরাটা কোথায়? আমার ক্যামেরাটা দেখেছেন আপনারা?”
‘ক্যামেরা’ শব্দটা শুনে আদিবাসীদের অনেকে একগাল হেসে বোকার মতো একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। তারা জিনিসটা ঠিক বুঝতে পারল না। আর যারা বুঝতে পারল, তারাও চুপ করে রইল।
উপস্থিত মানুষগুলোর মুখের অবয়ব আর মৌনতা দেখে অবিরাম বুঝে গেল-এরা কেউ তার ক্যামেরার হদিস জানে না।আর জানার কথাও না। ঐ ক্যামেরা যেভাবেই হোক তাকে খুজে বের করতে হবে। নয়তো সত্যিই টা জানা যাবে না আর।
আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না সে। শরীরের অসহ্য যন্ত্রণা ভুলেই ওই অবস্থাতেই ঘর থেকে একছুটে বাইরে বেরিয়ে এলো।ওকে এভাবে ছুটছে দেখে পাহাড়ি বেশ কয়েকজন লোকও কৌতূহল আর উদ্বেগে তার পিছু পিছু দৌড়াতে শুরু করল।
_”সবকিছু ঠিকঠাক রেডি তো। আমি এসে বাকিটা দেখে নিব।
বলে কলটা কেটে দিলো আরিশান মৃধা।অপরপাশের ব্যাক্তিটি কি বলল শোনা হলো না।প্রতিদিনের অভ্যাসমতো আজ সকালেও ঘুম থেকে উঠে জগিং দিয়ে নিজের দিনটা শুরু করলেন আরিশান মৃধা। দীর্ঘ এক মাস পর আজ সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি চলেই এলো। আজ দুপুর বারোটায় ওনাকে কোর্টে যেতে হবে-সেখানেই তার আর জেবার ডিভোর্সের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পূর্ণ হবে। আজকের পর থেকে দুজন সম্পূর্ণ দুই পথের পথিক।
গত এক মাসে জেবার সাথে ওনার এক দিনের জন্যও দেখা হয়নি বললেই চলে। অবশ্য আরিশান মৃধা নিজেই ইচ্ছা করে সেই সুযোগটা দেননি। ওনি আগে বুঝতে চেয়েছেন নিজেকে। আসলেই কি ওনি জেবার জন্য কিছু ফিল করেন কি করেন না।
বাগানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আরিশান মৃধা কফিতে চুমুক দিচ্ছেন,দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে গভীর মনোযোগে বাবাকে পর্যবেক্ষণ করছে সারিম। খুব সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করতেই সারিমের চোখে পড়ল-তার বাবা আগের চেয়ে অনেকটাই বদলে গেছেন!
আগে যে লোকটা নিজের সাজগোজ নিয়ে একদমই মাথা ঘামাতেন না, সাধারণ ফরমাল পোশাকেই দিন কাটাতেন-তিনিই এখন দিনদিন যেন নিজেকে তরুণ প্রমাণ করতে ব্যাকুল!
বুড়ো বয়সে বাবার এমন ভীমরতির কথা জানতে পেরে সারিমের মস্তিষ্ক দুই দিন স্তব্ধ হয়ে ছিল। এখন সে শতভাগ নিশ্চিত-এই লোক তার পিচ্চি বউয়ের প্রেমে পড়ে এমন রঙ্গলিলা করছে!দুনিয়া জাহান্নামে যাক, ওনার তাতে কিছুই যায়-আসে না।
ঠিক তখনই অরি ঘুম-ঘুম পায়ে এসে পেছন থেকে সারিমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার পরনে সারিমের একটা শার্ট।সারিম বারান্দা থেকে অরিকে এক ঝটকায় কোলে তুলে ঘরের ভেতর নিয়ে এলো। অরি সারিমের দুই হাত ধরে গলার সাথে লেপ্টে রইল। সারিম ভালোবেসে এক হাত দিয়ে অরির চুলগুলো গুছিয়ে দিল। অরি মৃদুস্বরে বলে উঠল,
_“সারিম…”
_“হুম, বউ?”
_“আপনি আমাকে আর আগের মতো ভালোবাসেন না।”
_“এমন কেন মনে হলো তোমার?”
অরি সারিমের বুকের বাঁ পাশে হাত রেখে বিষণ্ণ গলায় বলল,
_“কারণ আপনি আমাকে আর আগের মতো গুরুত্ব দেন না। সারাক্ষণ কাজ আর কাজ! আমার একদম ভালো লাগে না এসব।”
সারিম অরির দুগালে হাত রেখে তার কপালে আলতো এক চুমু এঁকে বলল,
_“কাজের বড্ড চাপ ছিল বউ, তাই সময় দিতে পারিনি। আর কখনো এমন হবে না, প্রমিস! আমার কাছে সবকিছুর আগে তুমি।”
অরি কথাটা বিশ্বাস না করে নাক সিঁটকে বলল,
_“মিথ্যা!একদম মিথ্যা বলছেন আপনি! কারণ আমি নিজে দেখেছি।”
_“কী দেখেছ?”
অরি কোনো জবাব দিল না। হঠাৎ করেই খিলখিল করে হেসে উঠল সে! হাসতে হাসতে বিছানায় একেবারে গড়াঘড়ি খাওয়ার অবস্থা!
সারিম কপালে হাত দিয়ে অরির কাণ্ড কারখানা দেখতে লাগল। সকাল-সকাল মেয়েটাকে ভূত-প্রেতে ধরল নাকি? এই একটু আগে কী সব আবেগী কথা বলছিল, আর এখন পারমাণবিক শয়তানের মতো হাসছে!
সারিম এক হাতে অরিকে টেনে এনে নিজের কোলে বসাল। অরি তখনও হেসে চলেছে। সারিম ধমক দিয়ে বলল,
_“চুপ, ফাজিল মেয়ে! এভাবে পাগলের মতো হাসছ কেন?”
সারিমের ধমক শুনে অরি বড় বড় চোখ করে তাকাল। সারিম ভ্রু কুচকে কিছু বলতে যাবে-আচমকা অরি আবার হেসে উঠে ‘ওয়াক’ করে একটা শব্দ করল!পরের মুহূর্তেই সারিমের কোলে বসে তার গায়ে বমি করে একাকার করে দিল!
এমন আকস্মিক আক্রমণে সারিম একদম অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তবে নিজেকে সামলে নিয়ে অরির ঘাড় চেপে ধরে পিঠে হাত বোলাতে লাগল সে।এদিকে অরি বমি করতে করতেও হেসে যাচ্ছে! যেন আজকের দিনটাতে হাসবে বলেই পণ করেছে সে!
সারিম ধমকে উঠে বলল,
“চন্দ্রিমা, তোমার এই শয়তানি হাসি বন্ধ করো! নয়তো এক আছাড় দেব বেয়াদপ মেয়ে! এত হাসার কী আছে এখানে?”
সারিমের গম্ভীর ধমক খেয়ে অরির মুখটা এক নিমেষে চুপসে ছোট হয়ে গেল। সারিম অরিকে ওই অবস্থাতেই কোলে তুলে নিল-মেয়েটাকে আগে পরিষ্কার করা দরকার।
তবে অরির এই অস্বাভাবিক আচরণ সারিমের কাছে খুব অদ্ভুত ঠেকল। গত কয়েক দিন ধরেই মেয়েটা কেমন যেন অদ্ভুত আচরণ করছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
ওয়াশরুমে ঢুকে সারিম অরির গা থেকে শার্টটা খুলে তাকে খুব সাবধানে ফ্রেশ করিয়ে দিল, তারপর নিজেও ফ্রেশ হয়ে নিল। আর এই পুরোটা সময় অরি একদম ছোট্ট বাচ্চাদের মতো সারিমের আদর আর যত্নগুলো উপভোগ করে গেল।
এমন সময় রুমে প্রবেশ করলো ফুল। এসেই আশেপাশে সারিমকে খুজতে ব্যাস্ত সে। একমাস হয়ে গেছে অথচ এখনো অব্দি ফুলের বাড়ি যাওয়ার নাম নেই। অবশ্য রুবাব মৃধা আর আনতারা মৃধা মিলেই ওকে রেখে দিছে।আরিশান মৃধাকে হসপিটাল থেকে আনার পর, দুদিন থেকেই রুবাব মৃধা বাড়ি ফিরে যান। তবে যাওয়ার আগে ফুলকে কৌশলে রেখে যান।
সারিম অরিকে ফ্রেশ করিয়ে বাহিরে নিয়ে এলো। অরির পরনে একটা ওভারসাইজ টিশার্ট। প্রচন্ড দুর্বল চিত্তে সারিমের হাতের উপর ভর রেখে বের হলো অরি। সারিম অরিকে বিছানায় বসিয়ে দিলো। রুমের এসি কিছুটা বাড়িয়ে দিলো। যাতে অরির অস্থিরতা একটু কমে। জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলছে মেয়েটা।ফুল অরির প্রতি সারিমের এতো কেয়ার দেখে হাতের আঙ্গুল গুলো মুষ্টিবদ্ধ করে নিলো। চোখে আগুনের অগ্নিশিখা।সারিম এতক্ষনে তাকে লক্ষ করলো। জিজ্ঞেস করল ফুলকে।
_”কিছু বলবি?এভাবে হাবলার মতো দাড়িয়ে আছিস কেন। ”
ফুল এবার নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে বলল।
_”মামি আপনাদের খাবার খেতে নিচে ডাকছেন। আমাকে বলল ডেকে দিতে।”
সারিম একহাতে অরিকে জরিয়ে রাখলো। অরি সারিমের বুকে ডলে পরে আছে। সারিম ফুলের উদ্দেশ্যে বলল।
_”এক কাজ কর আমাদের ব্রেকফাস্ট এখানে নিয়ে আয়। অরি অসুস্থ সেজন্য নিচে যাচ্ছিনা।”
ফুল মাথা নেড়ে সায় জানালো।এরপর পিছু ঘুরে রুম থেকে বের হতে নিলো। যাওয়ার আগে অরিকে সারিমের সঙ্গে আবার একবার দেখে নিলো। অরির প্রতি সারিমের এতো কেয়ার সহ্য হয়না ফুলের। বউ হয়েছে তো কি হয়েছে। এভাবে এতো যন্ত করার কি আছে।সারিম ফুলের সেই দৃষ্টি দেখলো। তবে তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কড়া গলায় ধমকে উঠে।
_”দেখা শেষ!এবার যেতে পারিস।
ফুল এবার চোখ মুখে তীব্র রাগ ও জ্বলুনি ফুটিয়ে হনহন করে রুম ছেড়ে বের হলো। ফুল যেতেই সারিম বিরক্তির একটা শ্বাস ছাড়লো। এরপর আবার অরির দিকে মনোযোগ দিলো। অরি তখনো সারিমের বাহুতে ঢলে পরে আছে। সারিম আলতো হাতে অরির চুলে হাত বুলাতে লাগলো।বেশ চিন্তিত হলো মনে মনে অরির সাস্থের কথা ভেবে।বিকেলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে ভাবলো।
দুপুর বারোটা বেজে দশ মিনিট।আরিশান মৃধা তার সহকারীকে নিয়ে গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। ওনাকে দেখে ভিড়ের অনেকেই সরে দাঁড়াল এবং কোর্টের কর্মচারীরা তাকে সম্মান জানাল। আরিশান মৃধা কোনো আনুষ্ঠানিকতার দিকে না গিয়ে গাম্ভীর্য বজায় রেখে একটি কেবিনে ঢুকলেন।ভেতরে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল জেবা আর আনজুমান শেখ। আরিশান মৃধা জেবার দিকে তাকালেন। একটা সাধারণ থ্রি-পিস পরা মেয়েটার চেহারা একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। এক মাসে শরীর শুকিয়ে এত রোগা হয়েছে যে গায়ের হাড় পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। স্ত্রীর এই অবস্থা দেখে আরিশান মৃধার ভীষণ বিরক্তি হলো। মেয়েটা নিজেকে তো কষ্ট দিচ্ছেই, সঙ্গে ওনাকেও একপ্রকার মানসিক যন্ত্রণায় জ্বালিয়ে মারছে।
ওনাকে দেখেই লইয়ার এগিয়ে এসে কুশল বিনিময় করলেন এবং বললেন-
_”প্লিজ বসুন, স্যার।”
আরিশান মৃধা বসতেই লইয়ার একটি খাম ওনার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন-
_”আপনার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ শেষ। এখন শুধু আপনাদের দুজনের স্বাক্ষর বাকি।”
আরিশান মৃধা টেবিল থেকে কলম তুলে নিয়ে খামটি খুললেন। এদিকে জেবা চোখ দুটি খিঁচে শক্ত করে বন্ধ রেখেছে। আরিশান মৃধা এই কাগজে সই করে দিলেই তাদের সব সম্পর্কের শেষ। ভালোবেসেও আজ তাকে হারিয়ে ফেলতে হচ্ছে ভেবে জেবার বুকটা খালি খালি লাগছে। হাত দুটো শক্ত করে মুঠো করে সে কান্না আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু কোনো আবেগ না দেখিয়ে আরিশান মৃধা কাগজে সই করে পেপারটি নিজের সহকারীর হাতে দিলেন।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আনজুমান বেগম কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। তিনি জেবার কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এবার আরিশান মৃধা চোখের ইশারায় লইয়ারকে কিছু নির্দেশ দিলেন। লয়ার তা বুঝে আনজুমান বেগমকে বললেন-
_”ম্যাডাম, আপনাকে একটু বাইরে অপেক্ষা করতে হবে।”
আনজুমান বেগম অবাক হয়ে বললেন-
_”আমি কেন বাইরে যাব? মেয়ের অভিবাক আমি, আর আমিই থাকব না?”
লইয়ার তাকে শান্ত স্বরে বোঝালেন-
_”দেখুন ম্যাডাম, এটাই নিয়ম। বিচ্ছেদের আগে দম্পতির ব্যক্তিগত কিছু বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, যেখানে অন্য কারও থাকা নিষেধ।”
এবার আর কথা না বাড়িয়ে আনজুমান বেগম বাইরে চলে গেলেন। তিনি বের হতেই আরিশান মৃধা ওনার সহকারীকেও বললেন-
_”তুমি বাইরে গিয়ে গাড়িতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করো।”
জেবা একটু অবাক হলো। ‘আমাদের’ মানে কি? ওনি কি অন্য কাউকে নিয়ে এসেছেন? কিন্তু আশেপাশে তো আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না!
লইয়ার তার ফাইল থেকে একটি নীল রঙের কাগজ বের করে আরিশান মৃধার হাতে দিলেন। আরিশান মৃধা মনোযোগ দিয়ে কাগজটি দেখে নিলেন। তবে জেবার এসবের দিকে কোনো খেয়াল ছিল না। সে একরাশ বিষাদ নিয়ে বসে রইল। আর বারবার চোখ ভিজে আসাকে সামলানোর চেষ্টা করতে লাগল।
লইয়ার বললেন-
_”এখানে আগে ম্যাডামের সই লাগবে।”
আরিশান মৃধা জেবার দিকে তাকালেন। মেয়েটা থমথমে হয়ে বসে আছে। ওনি একটি কলম আর কাগজটি জেবার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন-
_”এখানে সই করো, জেবা।”
লইয়ার সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন-
_”আপনার এতে পূর্ণ সম্মতি আছে তো, মিস জেবা?”
জেবা বুঝলো, এটা হয়তো ডিভোর্সেরই সম্মতি। সে চুপ করে রইল। তার মন খুব করে চাইছিল-আরিশান মৃধা অন্তত একবার তাকে বলুক থেকে যেতে, তাকে আটকে রাখুক জোর করে।তবে তেমন কিছুই ঘটবে না তা ভালোই জানে জেবা।আরিশান মৃধার বাড়িয়ে দেওয়া কলমটা হাতে নিয়েও সে এক বর্ণ লিখতে পারছে না। বুকের ভেতরটা ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই তার বিবেক তাচ্ছিল্য করে ওঠে-
_‘ভুলে যাস না, লোকটার স্ত্রী তোর বাবার খুনি!’
আবার মন বলে ওঠে-
_‘এখানে ওনার কী দোষ? ওনিতো ঠিকই বলেছিলেন, শক্ত কোনো প্রমাণ ছাড়া কাউকে এভাবে দোষী বানানো যায় না।’
জেবাকে এভাবে গভীর ভাবনায় ডুবে থাকতে দেখে লইয়ার আবার ডেকে উঠলেন-
_”মিস জেবা, আপনার থেকে তো কোনো সম্মতির লক্ষণ দেখছি না।”
আরিশান মৃধা আড়চোখে জেবাকে দেখলেন। মেয়েটার এই নিরবতাই সব বলে দিচ্ছে। ওনি খুব ভালো করেই বুঝছেন, জেবা চাইছে ওনি তাকে আটকাক। তাই আরিশান মৃধাও চুপ করে দেখতে চাইলেন মেয়েটা এবার কী করে।বেশ কিছুক্ষণ পার হয়ে গেলেও জেবাকে চুপচাপ দেখে লইয়ার আবার প্রশ্ন করলেন-
_”মিস জেবা, আপনি কি এই ডিভোর্সে কোনো অসম্মতি জানাচ্ছেন?”
জেবা এতক্ষণে মাথা নাড়ল। সে নিজেকে শক্ত করল এবং মনকে বোঝাল আবেগ সামলাতে। লোকটা নিশ্চয়ই তাকে এখন নির্লজ্জ ভাবছে! ভাবছে হয়তো সাথে থাকার জন্যই সে সই করছে না। জেবা লুকিয়ে চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু মুছে নিল। তারপর কাগজের লেখাগুলো পড়ার কোনো প্রয়োজন মনে না করেই সই করে দিল।
কাজ শেষ হতেই আরিশান মৃধা কাগজটি নিজের দিকে টেনে নিয়ে একবার চোখ বোলালেন। ওনার ঠোঁটের কোণে হালকা এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। এরপর আরিশান মৃধা নিজেও চটজলদি সেই কাগজে নিজের স্বাক্ষর বসিয়ে দিলেন।
ওনার এই তাড়াহুড়ো দেখে জেবার মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে নিজেকে কতটা বোকা ভাবল! সে আশা করছিল লোকটা তাকে আটকাবে, অথচ লোকটা কত অনায়াসে সই করে দিল! জেবাকে জীবন থেকে সরানোর জন্য যেন ওনার তর সইছিল না।
লইয়ার তাদের দুজনের সই করা নীল কাগজটি নিজের দিকে টেনে নিলেন। তারপর খুব মনোযোগ দিয়ে তাতে চোখ বোলাতে লাগলেন। জেবা নিষ্পলক চোখে সব দেখে যাচ্ছিল; তার বুক ফেটে কান্না আসছিল। অথচ আরিশান মৃধা পাশে বসে আছেন একদম নির্ভাবনায়, যেন কিছুই হয়নি! ওনার এই উদাসীনতা জেবাকে ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছিল।
সে ভেবেই কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিল না-যে মানুষটাকে সে প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছে, তাকে আর কোনোদিন নিজের বলে দাবি করতে পারবে না! আজ থেকে সব শেষ। আরিশান মৃধা নামের পুরুষটি এখন থেকে তার জন্য এক সম্পূর্ণ পরপুরুষ। সে চাইলেও আর কোনোদিন এই লোকটার ওপর নিজের অধিকার খাটাতে পারবে না। অধিকার তো এখন শুধুই আনতারা মৃধার। দুজন ভালোবাসার মানুষ হয়তো এবার সব ঝামেলা মিটিয়ে এক নতুন, সুখী সংসার শুরু করবে। লোকটা হয়তো খুব সহজেই ভুলে যাবে যে ‘জেবা’ নামের কেউ কখনো তার জীবনে এসেছিল।
কিন্তু জেবা? সে কি আদৌ পারবে ভুলতে? বিশেষ করে যখন ঠিক গতকালই সে জানতে পেরেছে, তার গর্ভে বেড়ে উঠছে এই লোকটারই অস্তিত্ব! কোনো নারীর পক্ষেই এমন পরিস্থিতিতে স্থির থাকা সম্ভব নয়, জেবাও পারছিল না।এমন সময় পাশে বসা লইয়ার সেই নীল কাগজের ওপর চোখ রেখে গম্ভীর কণ্ঠে পড়ে শোনাতে লাগলেন-
_”মিস জেবা সুলতানা শেখ, আপনার অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, ইসলামিক শরিয়াহ ও প্রচলিত পারিবারিক আইন অনুযায়ী আপনার আর আরিশান মৃধার দ্বিতীয়বারের পুনর্বিবাহের লিখিত কাবিননামা। এতে আপনি বিশ লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করে স্বজ্ঞানে সম্মতি দিয়েছেন।এখানে ইসলামিক আইনের ১৮ নম্বর ধারা-অর্থাৎ ‘আত-তাফউইদ্ব বিত-তালাক’ (স্ত্রীকে প্রদানকৃত তালাকের অধিকার)-রদ করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, জনাব আরিশান মৃধার অনুমতি ছাড়া আপনি তাকে একতরফা তালাক দিতে পারবেন না। ভবিষ্যতে যদি কোনো গুরুতর বা বিশেষ কারণ ঘটে, তবে শরিয়াহ আদালতের শরণাপন্ন হয়ে উপযুক্ত প্রমাণ পেশ করতে হবে। প্রমাণে ব্যর্থ হলে বা বিষয়টি ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে স্বামীর সম্মতি ছাড়া এই বিবাহবিচ্ছেদ আইনত ও সামাজিকভাবে সিদ্ধ হবে না।”
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৫
লইয়ার প্রতিটি কথা যেন জেবার মাথায় বজ্রপাতের মতো এসে পড়ল! বিচ্ছেদের কাগজে সই করতে এসে সে যে দ্বিতীয়বার বিয়ের কাবিননামায় সই করে বসেছে, তা ধারণারও বাইরে ছিল।জেবার এই হা হয়ে যাওয়া হতবাক চেহারা দেখে এতক্ষণ গম্ভীর হয়ে থাকা আরিশান মৃধা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না; আচমকা ফিক করে হেসে উঠলেন! তবে পরক্ষণেই মুখে হাত দিয়ে নিজের হাসি চেপে আবার আগের মতো গম্ভীর হয়ে গেলেন।
