ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৫
মেহজাবিন নাদিয়া
হসপিটালের ভেতর গমগমে পরিবেশ। ডাক্তাররা রোগীদের নিয়ে ব্যস্ত; কেউ কেউ আবার স্ট্রেচারে করে নতুন নতুন রোগীদের দ্রুত ভেতরে নিয়ে যাচ্ছেন।ওটির সামনের একটি বেঞ্চে বসে আছে অরি। থেকে থেকে ফোঁপাতে ফোঁপাতে কাঁদছে মেয়েটা। সারিম এক হাতে অরিকে জড়িয়ে ধরে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। তবে অরি যেন থামার পাত্রী নয়; সে বারবার সারিমের হাতটা মুখে চেপে ধরে কেঁদেই চলেছে। সারিম একদৃষ্টে বউয়ের এই কান্না দেখছে।অরির কান্না তার কাছে কেমন অসহ্য থেকছে, বাবার জন্য তার কেন যেন একটুও খারাপ লাগছে না।
ডাক্তার কিছুক্ষণ আগেই এসে জানিয়েছেন,আরিশান মৃধা অতিরিক্ত মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে হার্ট অ্যাটাক করেছেন। তাঁকে আপাতত আইসিইউতে শিফট করা হয়েছে। পরিস্থিতি এখন আগের থেকে কিছুটা আশঙ্কামুক্ত।
সারিম ধারনা,বাবার এই মানসিক চাপের একমাত্র কারণ জেবা।হয়তো কাল রাতের বলা সারিমের কথাগুলো ওনার মনে বেশিই প্রবাহ ফেলেছে।বউ ডিভোর্স দিবে শুনে লোকটা নিজেকে সামলাতে না পেরে হার্টঅ্যাটাক করেছে।একবার বলবে বউ মানে না আবার সেই বউয়ের জন্যই মরতে বসবে।এদের এই প্রেমের নাটক দেখলে বাঁচে না সারিম।
আহা! সারিমের কত ইচ্ছে ছিল আজ ছুটির দিনে বউটাকে নিয়ে একটু ঘুরতে বের হবে। কিন্তু কথায় আছে না-‘অতি সুখ কপালে সয় না’। ঠিক সেটাই ঘটল তার সাথে। হুট করে বাপটা হার্ট অ্যাটাক করে বসলো! তার ওপর আবার শ্বশুরের শোকে কেঁদে কেঁদে বউটারও নাজেহাল অবস্থা। মনে মনে জেবার ওপর চরম ক্ষুব্ধ হলো সারিম। মেয়েটা বিয়ের আগে এত ভালোবাসা দেখালো, অথচ বিয়ের পরেই সব ভালোবাসা ফুরুৎ! এটার একটা স্থায়ী ব্যবস্থা আজ সারিম করেই ছাড়বে। এত ঝামেলা আর সহ্য হচ্ছে না তার।
ইতিমধ্যেই আনজুমান শেখের কাছে আরিশান মৃধার খবর পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ভদ্রমহিলা সদ্যই ভাই হারিয়েছেন, তবুও আরিশান মৃধার খবর শুনে তিনি দ্রুত আসছেন বলে জানিয়েছেন। জেবা বর্তমানে তাঁদের বাড়িতেই রয়েছে।স্বামীর অসুস্থতার কথা শুনে মেয়েটা আসবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ সারিমের। তবে যদি আসে সারিম আজ ছাড়বেনা একে। উচিত একটা শিক্ষা দিয়ে জন্মের ডিভোর্স ছুটাবে মেয়ের।
হঠাৎ সারিমের কানে কান্নার উচ্চ শব্দ ভেসে এলো। সে মাথা উচু করতেই দেখতে পেল, রুবাব মৃধা শাড়ির আঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে আসছে এদিকেই-ভাবটা এমন যেন তাঁর ভাই আর বেঁচে নেই! পাশে আনতারা মৃধাও আছেন।তার চোখেও পানি দেখা যাচ্ছে।
এসব দেখে সারিমের মেজাজ চড়ে গেল। এই ধরনের পারিবারিক ফালতু মেলোড্রামা তার কখনোই পছন্দ নয়। নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল সারিম, _”আল্লাহ তুমি আমাকে এদের সহ্য করার মতো ধৈর্য দাও!”
রুবাব মৃধা এসে অরির পাশের জায়গাটায় বসলেন, আর তাঁর পাশেই আনতারা মৃধা। হসপিটালের এই অংশটি সাধারণ ওয়ার্ডগুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও নিঝুম; মূলত ভিআইপি রোগীদের জন্যই বরাদ্দ এই বিশেষ এরিয়া।
ঠিক তখনই হাসপাতালে হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করলেন আনজুমান শেখ। সঙ্গে দেখা গেল জেবাকেও। মেয়েটির পরনে টিয়া রঙের একটি থ্রি-পিস, চুলগুলো কিছুটা উসকো-খুসকো। ফোলা ফোলা চোখ দুটো জানান দিচ্ছে মেয়েটা কেঁদেছে; চোখের নিচে স্পষ্ট ডার্ক সার্কেল। সারিমের নজর জেবার ওপর গিয়ে পড়ল।
অরি এতক্ষণ কাঁদছিল, এবার কান্না থামিয়ে তাদের দিকে তাকাল। আনজুমান বেগম চিন্তিত গলায় জানতে চাইলেন,
_”আরিশান ভাইয়ের অবস্থা এখন কেমন?”
উপস্থিত কেউই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারল না, কারণ তারা মাত্রই এসেছে। অরি আর সারিম আগে থেকেই ছিল দেখে আনতারা মৃধা সারিমকে জিজ্ঞেস করলেন, _”তোমার বাবার অবস্থা এখন কেমন?”
সারিম জবাব দিল,
_”আগের চেয়ে কিছুটা ভালো, এখন বিপদমুক্ত।”
কথাটা শুনে যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল জেবা। এতক্ষন দম বন্ধ হয়ে আসছিলো মেয়েটার। যখনি শুনতে পেয়েছে আরিশান মৃধা হার্টঅ্যাটাক করেছে তখন থেকেই যেন নিশ্বাসটা আটকে ছিলো মেয়ের। আনজুমান বেগমকে কোনোরকম তাড়া দিয়ে এখানে নিয়ে এসেছে।
এদিকে আনতারা মৃধা আবার সারিমকে প্রশ্ন করলেন, _”ডাক্তার কি কিছু বলেছেন?তোমার বাবার হার্ট অ্যাটাকের কারণ সম্পর্কে?”
সারিম গম্ভীর মুখে উত্তর দিল, _”অতিরিক্ত মেন্টাল স্ট্রেস।”
জেবা অবাক হলো।মানসিক চাপের কারণে লোকটার হার্ট অ্যাটাক হতে পারে শুনে। এমন কী বড় ধরনের মানসিক চাপ ছিল, যার কারণে ওনাকে হার্ট অ্যাটাকের মতো মারাত্মক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হলো!জেবা থাকাকালীন তো লোকটাকে সেইরকম কোনো চাপে থাকতে দেখেনি। তাহলে হুট করে আবার কি এমন হলো।
সকালেই আরিশান মৃধাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। এখন প্রায় সন্ধ্যা। সারাদিন ধরে হাসপাতালে কেবল সারিম আর অরিই ছিল। অবশ্য সকালে আনতারা মৃধা একবার এসেছিলেন, তবে বিশেষ জরুরি কাজের কথা বলে উনি আবার চলেও যান। আরিশান মৃধার জ্ঞান ফেরেনি দেখে অরি বাড়ি যেতে রাজি হয়নি-সারিম তাকে বাড়ি ফিরে বিশ্রাম নিতে বললেও সে বাবাকে ছেড়ে যেতে নারাজ। অগত্যা সারিম সকাল থেকেই এখানে বসে বসে বউকে পাহারা দিচ্ছে।
এমন সময় আইসিইউ থেকে চিকিৎসক ও নার্স বেরিয়ে এলেন। তাঁরা কিছুক্ষণ আগেই আরিশান মৃধার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করতে ভেতরে গিয়েছিলেন।
ডাক্তার সবার সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং বললেন,
_”রোগীর জ্ঞান ফিরেছে,তাকে কেবিনে শিফট করা হয়েছে।আপনারা চাইলে এখন দেখা করতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন, রোগী যেন কোনোভাবেই মানসিক চাপে না পরে। ওনার সামনে কোনো বিশৃঙ্খলা বা হট্টগোল করা একদমই চলবে না। এতে মস্তিস্কে অতিরিক্ত চাপ পড়ে আবারও বড় ধরনের কার্ডিয়াক অ্যাটাক বা স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।”
আনতারা মৃধা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
_”রোগীর বর্তমান শারীরিক অবস্থা কেমন? আমরা ওনাকে কবে বাড়ি নিয়ে যেতে পারব?”
ডাক্তার জানালেন,
_”ওনার প্রাথমিক অবস্থা এখন অনেকটাই স্থিতিশীল। তবে পূর্ণাঙ্গ শারীরিক উন্নতির জন্য ওনাকে আরও কিছুদিন হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে। এরপর শারীরিক পরিস্থিতি দেখে আমরা ছাড়পত্র দেব।”
কথা শেষ করে ডাক্তার চলে গেলেন। ডাক্তার যেতেই আনতারা মৃধা এবং রুবাব মৃধা-দুজনে একসাথে আরিশান মৃধার সঙ্গে দেখা করতে কেবিনের-এর ভেতরে প্রবেশ করলেন।
ভেতরে আরিশান মৃধা বেডে শুয়ে আছেন চোখ বন্ধ করে। এমন সময় রুবাব মৃধা ছুটে এসে ওনাকে ওই অবস্থাতেই জড়িয়ে ধরেন। হুট করে জড়িয়ে ধরায় চোখ মেলে তাকান আরিশান মৃধা। দেখতে পান রুবাব মৃধা ওনাকে ধরে কাঁদছেন। বোনকে এভাবে কাঁদতে দেখে আরিশান মৃধা ক্যানোলা পরা বাম হাতে তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলেন,
_”রুবাব, স্টপ ক্রাইং। আই অ্যাম ওকে!”
রুবাব মৃধা ওই অবস্থাতেই জড়িয়ে ধরে বললেন,
_”একদম মিথ্যা বলবে না তুমি!কতটা ঠিক আছো, তা তো নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছি। সুফিয়ানের মতো তুমিও কি আমাদের ছেড়ে চলে যেতে চাচ্ছ? ডাক্তার বললেন তুমি মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে হার্ট অ্যাটাক করেছ! বলো, কিসের এত মানসিক চাপ তোমার,হ্যাঁ?”
আরিশান মৃধা বোনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললেন,
_”ডাক্তার মিথ্যা বলেছে। আমি একদম ঠিক আছি, কিছুই হয়নি আমার।”
আনতারা মৃধার চোখেও জল। তিনি পাশ থেকে বলে উঠলেন,
_”কতটা ঠিক আছো, তা তো দেখাই যাচ্ছে! জানো, তোমার এই অবস্থা দেখে আমি কতটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম? আজ যদি তোমার কিছু হয়ে যেত, তবে আমার কী হতো-ভেবে দেখেছ একবার?”
আরিশান মৃধা এদের আবেগের নাটক দেখে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন। বিরক্তি এসে ভর করেছে ওনার ওপর। এই মুহূর্তে চোখের সামনে এদের কাউকেই দেখতে ইচ্ছে করছে না ওনার। দুচোখ শুধু সেই হাঁটুর বয়সী মেয়েটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আচ্ছা, মেয়েটা ওনার অসুস্থতার খবর জেনেও দেখতে এলো না একবার? এতটা পাষাণ হয়ে গেল মেয়েটা! আর হবেই না বা কেন, এখন যে সেই রমণীর মনে অন্য কারও বসবাস। ওনার মতো বয়স্ক পুরুষের কিছুতে,মেয়েটার কী-ই বা আসে যায়! থাকুক মেয়েটা তার পছন্দের পুরুষকে নিয়ে, আরিশান মৃধা আর কিছুই বলবেন না তাকে। মনে মনে শুধু দোয়া করবেন-মেয়েটা যেন বড় একটা ছ্যাঁকা খায়, যার কাছেই মন দিতে যাক না কেন! যেন শেষ পর্যন্ত এই আরিশান মৃধা নামক পুরুষটাই তার একমাত্র আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। তখন তিনি মানা করবেন না, জেবাকে নিজের কাছেই রেখে দেবেন। জোর করে ধরে এনে বেঁধে রাখার বয়স ওনার নেই এখন!থাকলে ওনি সেটাই করতেন।
ঠিক তখনই কেবিনে প্রবেশ করলেন আনজুমান বেগম, অরি ও সারিম। জেবা তাদের সাথে ভেতরে আসেনি। লোকটাকে কাল থাপ্পড় মারার বিষয়টা নিয়ে ভেতরে ভেতরে এখনো ওর প্রচণ্ড অপরাধবোধ কাজ করছে। পরিস্থিতি যাই হোক এভাবে
নিজের থেকে বয়সে বড় মানুষ এর গায়ে হাত তোলাটা একটা বেয়াদপি মনে হচ্ছে ওর কাছে। তাই আর কখনোই লোকটার মুখোমুখি হতে চায় না জেবা। সে শুধু ওনার শারীরিক অবস্থা কেমন, তা জানতেই হাসপাতালে এসেছে।
আরিশান মৃধা আনজুমান বেগমকে দেখে আশার আলো পেলেন-ভাবলেন, ওনার সঙ্গে হয়তো জেবাও এসেছে। কিন্তু চারপাশে কিছুক্ষণ নজর বুলিয়েও কাউকে দেখতে না পেয়ে আবারও হতাশ হলেন। এবারও ওনার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো; মেয়েটা ওনাকে দেখতে আসেনি!
আনজুমান বেগম এগিয়ে এসে আরিশান মৃধার শারীরিক অবস্থার টুকটাক খোঁজখবর নিলেন। আরিশান মৃধা অগত্যা সবার কথার উত্তর দিলেন। অরি সারিমের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আরিশান মৃধাকে সুস্থ দেখে মেয়েটা নিশ্চিত হয়ে স্বস্তিবোধ করল। আরিশান মৃধা অরির দিকে তাকালেন; এরপর মুখের গম্ভীর ভাবটা সরিয়ে আদর মাখা ইশারায় অরিকে কাছে ডাকলেন। বাবার ইশারা পেয়ে অরি প্রফুল্ল মুখে ওনার দিকে এগিয়ে গেল। আরিশান মৃধা অরিকে একহাতে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেলেন। এত সব বিরক্তির মাঝে অরি যেন এই মুহূর্তে ওনার এক টুকরো সুখ।
সারিম তাদের দিকে তাকিয়ে মুখ ভেঙাল। বেচারার একটাই দুঃখ-এই বাবা নামক মানুষটার কাছ থেকে জীবনেও দুই পয়সার পাত্তা পেল না সে! সব আদর-ভালোবাসা যেন তার বউ একাই নিয়ে নিলো! অথচ সারিম ওনার নিজের রক্তের সন্তান, নিজের ডিএনএ; তারপরও তাকে এত অবহেলা! ব্যাপারটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।
আরিশান মৃধা দূর থেকে ছেলের এই মুখ ভেঙানো ঠিকই লক্ষ্য করলেন। সামান্য খোঁচা মেরে তিনি বলে উঠলেন-
_” কিছু একটা পোড়ার গন্ধ পাচ্ছি বলে মনে হয়।”
উপস্থিত সবাই অবাক চোখে ওনার দিকে তাকাল; একমাত্র সারিম ছাড়া। সে ভালোভাবেই বুঝতে পারছে যে তার বাবা তাকে খোঁচা মেরেছে। রুবাব মৃধা কৌতূহল প্রকাশ করে জিজ্ঞাসা করলেন-
_”কিসের গন্ধ, ভাই? আমরা পাচ্ছি না কেন?”
সারিম বাঁকা হেসে বলে উঠল
_”ঐসব প্যাপারিকার গন্ধ তোমার নাকে আসবে না, ফুফু। তোমার ভাই তো আবার ইয়া বড় ডিজিটাল নাক নিয়ে জন্মেছেন, তাই শুধু উনিই পাচ্ছেন!”
আরিশান মৃধা ছেলের কথায় চুপ মেরে গেলেন। এই ‘জাউরা’ ছেলেকে একটা কথা বলতে গেলে সে দশটা ভরে দেয়!নিজের মান-সম্মান বাঁচাতে এই মুহূর্তে আর কোনো কথা বাড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলেন না। চুপি রইলেন। অরি মৃদু হেসে আদরে ওনার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। আরিশান মৃধা মেয়ের এই স্নেহে মুচকি হাসলেন। এসব দৃশ্য দেখে আনতারা মৃধা আর রুবাব মৃধা ভেতরে ভেতরে জ্বলে-পুড়ে ছাই হচ্ছিলেন। ওনাদের কাছে এসব আদিখ্যেতা মনে হচ্ছে।
এমন সময় সেখানে উপস্থিত আনজুমান বেগম এগিয়ে এসে বললেন-
_”আমি তাহলে এখন আসি। আগামীকাল আবার সাদমানের বাবাকে নিয়ে আসব।”
আনতারা মৃধা হালকা হেসে ওনার সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিদায় জানাতে প্রস্তাব করলেন-
_”আসুন, আমি আপনাকে বাইরে পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।”
সারিম মাঝখান থেকে ফোড়ন কেটে বলে উঠল-
_”আমি আন্টিকে এগিয়ে দিয়ে আসি। বাইরে আমার কিছু কাজও আছে।”
আনতারা মৃধা থেমে গেলেন। আনজুমান শেখ সারিমের সঙ্গে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। বাইরে জেবা দাঁড়িয়ে ছিল। ফুফুকে বের হতে দেখে মেয়েটি সেদিকে তাকাল। আনজুমান বেগম ওকে সঙ্গে নিয়ে যেতে উদ্যেগ হতেই সারিম বলে উঠল-
_”জেবা থাকুক, আমি ওকে কাল সকালে বাড়ি পৌঁছে দেব।”
আনজুমান শেখ এতে রাজি হলেন না। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন-
_”ওর এখানে আর কোনো দরকার আছে বলে তো মনে হয় না। তা ছাড়া কিছুদিন পর তোমার বাবার সাথে ওর সম্পর্কের যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তাও শেষ হয়ে যাবে।”
সারিম বিনয়ের সাথে বুঝিয়ে বলল-
_”আমি তো ওকে হাসপাতালে থাকতে বলছি না, আন্টি। জেবাকে অরির সাথে বাড়ি পাঠাব। রাতে অরি বাড়িতে একা থাকবে, তাই জেবাকে আজ রাতে অরির সাথে থাকতে বলছিলাম আরকি। আমার কাজ সেরে ফিরতে যদি বেশি দেরি না হয়, তবে রাতেই জেবাকে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার।”
আনজুমান বেগম প্রথমে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করলেও অরির একা থাকার ব্যাপারটা ভেবে শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন। জেবাকে থাকার অনুমতি দিয়ে বললেন-
_”ঠিক আছে। তবে সকালেই ওকে পৌঁছে দিয়ে আসবে কিন্তু।”
সারিম মাথা নাড়ল। এরপর আনজুমান বেগমকে বিদায় জানিয়ে জেবাকে রেখে সেখান থেকে নিজের কাজে গেল।জেবা চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।কিছুক্ষণ পর সারিম ফিরে এসে জেবার অস্বস্তি বুঝতে পেরে ওকে সাথে আসতে বলল। সে জেবাকে একটা ওয়েটিং রুমের সামনে নিয়ে গিয়ে সেখানে কিছুক্ষণের জন্য অপেক্ষা করতে বলল। মেয়েটা বেশ ঘেমে উঠেছে দেখে একজন ওয়ার্ডবয়কে ডেকে ঠান্ডা কিছু নিয়ে আসতে বলল। ওয়ার্ডবয় দ্রুত এসে জেবাকে এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত দিয়ে গেল। সারিম গ্লাসটা জেবার হাতে দিলে জেবার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে থাকায় সে দেরি না করে এক ঢোকেই পুরোটা গিলে নিল।
সারিম এসে জেবার সামনের সিটে মুখোমুখি বসল। জেবার কেন যেন আজ ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। সারিম ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় প্রশ্ন করল।
_”ঠিক আছ?”
জেবা নিচু স্বরে ছোট করে বলল, “হুঁ।”
সারিম এবার আসল প্রশ্নটা করল-
_”বাবার সাথে দেখা করতে ভেতরে গেলে না কেন? উনি তোমার অপেক্ষায় ছিলেন।”
আরিশান মৃধা তার অপেক্ষা ছিলেন শুনে জেবার মনটা ভেতরে ভেতরে কেমন যেন ব্যাকুল হয়ে উঠল। কিন্তু মুখে কী বলবে, ভেবে পেল না। সে তো লোকটার থেকে নিজেকে দূরে রাখতেই এমনটা করছে! তার ওপর রুবাব মৃধাকে দেখে জেবার অস্বস্তি আরও বেড়ে গিয়েছিল। ভদ্রমহিলা এমনিতেই তাকে দেখতে পারেন না, তার ওপর আজ কেমন এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। সে জন্যই সে আর ভেতরে যায়নি। তবে সারিমের সামনে নিজের এই দুর্বলতাটুকু প্রকাশ না করে গম্ভীর হয়ে বলল-
_”ওনার মুখ দেখার আমার কোনো ইচ্ছে ছিল না, তাই যাইনি। আমার যত দ্রুত সম্ভব ডিভোর্স চাই।”
সারিম শান্ত গলায় আবার শুধাল-
_”তাহলে ওনার অসুস্থতার খবর শুনে,ছুটে এসেছিলে কেন?”
জেবার সোজাসাপ্টা উত্তর-
_”বেঁচে আছেন না মরে গেছেন, তা জানতে। সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে এটুকুই কেবল দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে আসা।”
সারিম এবার একদম নিশ্চুপ হয়ে রইল। মেয়েটা যে সহসা নিজের মনের অনুভূতি স্বীকার করবে না, তা সে ভালো করেই বোঝলো। এদের মধ্যকার এই শক্ত মান-অভিমানের দেয়াল ভাঙতে সারিমকেই এখন মাঝখানে কিছু একটা করতে হবে। বেচারার কী এক কপাল! যে বয়সে নিজের প্রেম সামলানোর কথা, সেই বয়সে এসে তাকে সামলাতে হচ্ছে বাপের প্রেম! একেই বোধহয় বলে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস-ভালো ছেলে হয়ে জন্মালো বলে সব ঝাক্কি-ঝামেলা যেন শেষমেশ তারই ঘাড়ে এসে পড়ল!
আনতারা মৃধা আরিশান মৃধার বিছানার পাশে একটি টুলে বসে আছে। ওনার থেকে কিছুটা দূরে বসে আছে রুবাব মৃধা।এদিকে অরি চুপচাপ বিছানায় বাবার পাশে বসে আছে। এমন সময় রুমে একজন নার্স প্রবেশ করলেন। রাত প্রায় সাড় আটটা বাজে। আরিশান মৃধাকে এখন রাতের ওষুধ দেওয়ার সময় হয়েছে।
নার্সকে আসতে দেখে অরি উঠে দাঁড়াল। আগের স্যালাইন শেষ হয়ে যাওয়ায় নার্স স্ট্যান্ড থেকে পুরোনো স্যালাইনের বোতল খুলে নতুন একটি স্যালাইন ঝুলিয়ে দিলেন। এরপর তিনি আনতারা মৃধাকে রাতের ওষুধগুলো বুঝিয়ে দিলেন। আনতারা মৃধা নিজে ডাক্তার হওয়ায় তা বুঝতে তাঁর কোনো অসুবিধা হলো না। কাজ শেষে নার্স আরিশান মৃধার শরীরে একটি ইনজেকশন দিলেন।
তা দেখে আনতারা মৃধা নার্সকে জিজ্ঞেস করলেন,
_”এটা কিসের ইনজেকশন?”
নার্স খালি ইনজেকশনের শিরিসটা পাশের বাটিতে রাখতে রাখতে বললেন,
_”ঘুমের ইনজেকশন। উনি ভীষণ দুর্বল, এখন ওনার প্রচুর ঘুমের প্রয়োজন।”
ঠিক তখনই রুমে প্রবেশ করল সারিম। নার্স তাঁর কাজ শেষ করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। সারিম অরির দিকে তাকিয়ে মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,
_”তুমি আর ফুফু এখন বাড়ি চলে যাও। বাবার সাথে আমি আর অরি থাকছি।”
রুবাব মৃধা বাধা দিয়ে বললেন,
_”তুই তোর বউকে নিয়ে বাড়ি যা। আমি আর তোর মা থাকি। তোরা তো সারাদিনই ছিলি।”
সারিম না মেনে বলল,
_”কোনো সমস্যা নেই। তোমরা যাও, নিচে ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”
এবার আনতারা মৃধাও মানা করতে চাইলেন ছেলেকে। কিন্তু কিছু বলার আগেই আরিশান মৃধা গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,
_”আমাকে প্লিজ একটু একা থাকতে দাও সবাই। তোমরা সকলে বাড়ি ফিরে ফিরে যাও।আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। যাওয়ার সময় রুমের লাইটটা অফ করে দিয়ে যেও।”
আরিশান মৃধার কথা শুনে কেউ আর থাকার জন্য জোরাজুরি করল না। আনতারা মৃধা ও রুবাব মৃধা আর বাধা না দিয়ে। একসঙ্গে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। তাঁরা চলে যেতেই আরিশান মৃধা অরিকে ডেকে বললেন,
_”অদ্রিজা, তুমি সারিমের সাথে বাড়ি ফিরে যাও।”
অরি একটু চিন্তিত হয়ে বলল,
_”তোমার কোনো সমস্যা হবে হলে? আমি থাকি নাহয়?”
আরিশান মৃধা বারণ করে বললেন,
_”না না, দরকার নেই। আমার কোনো সমস্যা হবে না, তাছাড়া নার্স তো আছেই দেখভাল করার জন্য। তুমি নিশ্চিন্তে বাড়ি যাও।”
কথাটা শুনে অরিও রাজি হয়ে গেল। সে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে রুম থেকে বের হলো। সারিমও বের হওয়ার উপক্রম করছিল, এমন সময় আরিশান মৃধা ডেকে বললেন,
_”সারিম, লাইটটা বন্ধ করে দিয়ে যাও।”
সারিম বাবার কথা শুনেও লাইট বন্ধ করল না। উল্টো বাবার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে গেয়ে উঠল,
_”তুমি দিও না গো বাসর ঘরের বাতি নিভাইয়া… আমি অন্ধকারে একলা ঘরে যাবো মরিয়া।”
গানটি গেয়েই সারিম লাইট না নিভিয়ে রুম থেকে চলে গেল। আরিশান মৃধা ছেলের এমন জাউরামি দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। কতটা বেয়াদব হলে বাবার সাথে এমন রসিকতা করে চলে যায়! ছেলের ওপর ওনার বেশ রাগই হচ্ছিল।এই ছেলেকে ঠিক করতে না পারার আফসোস,ওনার কোনোদিন যাবে বলে মনে হয়না।
ঠিক তখনই রুমের দরজা খোলার শব্দ হলো। আরিশান মৃধা ভাবলেন ছেলেটা হয়তো আবার ওনাকে জ্বালাতে এসেছে। তাই না তাকিয়েই বিরক্তি নিয়ে বলে উঠলেন,
_”বেয়াদব ছেলে, আবার কেন এসেছো?”
কথাটা বলে ঘুরে তাকাতেই ওনার দুচোখ আটকে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে জেবা! মেয়েটা ওনাকে দেখে বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেলো মনে হচ্ছে। এই অসময়ে জেবাকে এখানে দেখে আরিশান মৃধা যেমন অবাক হলেন, তেমনই মনে মনে বেশ প্রশান্তি অনুভব করলো।যেন সকল অসুস্থতা ও ক্লান্তি এই মেয়েটার সামান্য উপস্থিতে নিরাময় করে গেছে। জেবা রুমের এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
_”কোনো সমস্যা?”
জেবা খুব কষ্টে ওনার দিকে তাকাল, কিন্তু পরক্ষণই চোখ নামিয়ে ফেলল। একটু ইতস্তত করে মিনমিনিয়ে বলল,
_”আমি অরিকে খুঁজতে এসেছিলাম। সারিম ভাই বলল অরি নাকি এখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
কথাটা শুনে আরিশান মৃধা এবার ছেলের চক্রান্ত বুঝতে পারলেন। মনে মনে প্রথমবারের মতো ছেলের এই জাউরামির জন্য কৃতজ্ঞতা বোধ করলেন। জেবা ওনাকে চুপ থাকতে দেখে আবার জিজ্ঞেস করল,
_”অরি কোথায়?”
আরিশান মৃধা সংক্ষেপে উত্তর দিলেন,
_”অদ্রিজা চলে গেছে।”
অরি চলে গেছে শুনে জেবা যেন আকাশ থেকে পড়ল। তাহলে কি সারিম ভাই মিথ্যা বলল ওকে! এর আগেও সারিম ওকে মিথ্যা বলে আরিশান মৃধার রুমে পাঠিয়েছিল। এবারও নিশ্চয়ই একই কাজ করেছে! জেবা আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু দরজার লক ধরে টান দিতেই দেখল-বাইরে থেকে দরজা বন্ধ!
জেবা বিশাল বড় ধাক্কা খেলো যেন। লোকটা এত বড় ধাপ্পাবাজ! আর সে বারবার ওনার এই ফান্দে পড়ে বিপদে পড়ে।এদিকে জেবাকে চলে যেতে দেখে আরিশান মৃধার মন খারাপ হয়ে গেল। তিনি হাতের ক্যানোলা থেকে স্যালাইনের নলটা এক টানে ছিঁড়ে ফেললেন। আজ জেবার সাথে ওনার খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা আছে, এভাবে মেয়েটিকে যেতে দেওয়া যাবে না। এ কথা ভেবেই তিনি বিছানা ছেড়ে দাঁড়াতে গেলেন। কিন্তু দাঁড়াতেই ওনার মাথাটা কেমন চক্কর কেটে ঘুরে উঠল, চোখগুলো দিয়ে ঝাপসা দেখতে লাগলো।
ওদিকে জেবা অনেক চেষ্টা করেও দরজা খুলতে না পেরে চরম বিরক্ত হয়ে রুমের মাঝখানে ফিরে এলো। আর ফিরতেই দেখল-আরিশান মৃধা ঢলে পড়ে যাচ্ছেন! জেবা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ওনাকে দুহাতে ধরে ফেলল। আরিশান মৃধাও সামাল দিতে না পেরে জেবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
কেমন এক অদ্ভত অনুভূতির টানে, আরিশান মৃধা জেবার আরও কাছে ঘেঁষে এলেন। জেবা হঠাৎ এই পরিস্থিতিতে ভীষণ বিব্রত হয়ে পড়ল। সে কোনোমতে ওনাকে বিছানায় বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু নিজের ভারসাম্য হারিয়ে নিজেই আরিশান মৃধার ওপর পড়ে গেল!
আরিশান মৃধা সেই অবস্থাতেই জেবাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। জেবা শত চেষ্টা করেও ওনার আঁকড়ে ধরা হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারল না।
পরদিন —
ভোরের আলো ফুটতেই অরির চোখ মেলল। দেখল-সারিম তাকে খুব শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। অরি সেদিকে তাকিয়ে মনে মনে কিছু সুন্দর অনুভূতি অনুভব করল। সারিমের করা শক্ত বাঁধনের কারণে অরির একটু নড়াচড়া করতে অসুবিধা হচ্ছিল।
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৪
সে খুব কাছ থেকে স্বামীর ঘুমন্ত মুখটা লক্ষ্য করল। এরপর হাত বাড়িয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দিল সারিমের চোখের পাতা। তারপর ধীরে ধীরে হাতটা নামিয়ে আনল সারিমের ঠোঁটে। লজ্জা ভুলে গিয়ে অরি সামান্য মাথা উঁচিয়ে সারিমের ঠোঁটে একটি চুমু দিল।আর অমনি সারিম সাথে সাথে অরির ঠোঁটে এক কামড় বসিয়ে দিল! ব্যথায় অরি আক্ষেপের সাথে “আহ্” করে শব্দ করে উঠল।
