Home নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ৫

নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ৫

নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ৫
সুরাইয়া জিয়াসমিন

_”সেদিন আমাকে ওই অবস্থায় রেখে কেনো চলে গিয়েছিলেন?বললেন না যে!”
আরহাম মুচকি হাসলো, চোখের পলক ফেলে শান্ত কন্ঠে সুধালো
_”কারণটা জিমি ছিলো। জিমি আমার খুবি ভালো বন্ধু।এটা তোমাকে আমি কালকেও বলেছি,তবে সেদিন,,,,,
জিমি আরহামের একাকিত্বের বন্ধু । জিমি আফ্রিকার বাসিন্দা পড়ালেখার ক্ষেত্রে তাদের একি কলেজে দেখা যায়।আরহামকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার পর তার জীবন ছিলো বোরিং। তার কাজ পাড়ালেখা করা আর বাপের টাকায় খাওয়া। আরহাম কারো সাথেই মিশতো না।
জিমি ছিলো আরহামের মতো, আফ্রিকান হওয়ায় তার সাথে তেমন কেউ মিশসো না আর না জিমি মিশতো।দুই জন দুই দুনিয়ার মানুষ ছিলো। একদিন হঠাৎ করেই অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে তাদের দেখা হয়।জিমির রুপ রং নিয়ে তাকে নিন্দা করছিলো কিছু কলেজ student ,কেউ তাকে পছন্দ করে না এরকমি কিছু।

আরহামো সেদিন ওখানে ছিলো। অতঃপর জিমিকে দেখে তার নিজের কথা মনে পড়লো কারন তাকেও তো তার ব্যবহারের জন্য কেউ পছন্দ করে না,কথায় আছে না পাখি,পাখির কথা বুঝে তেমনি।দুই জন একি পরিস্থিতির স্বীকার ছিলো। সেদিন আরহাম সবার থেকে জিমিকে উদ্ধার করেছিলো,সেই থেকে তাদের পরিচিয়।
এর পর থেকে আস্তে আস্তে তারা ভালো বন্ধু হয়ে উঠে টানা অনেক গুলো বছর তারা এক সাথে ছিলো। পড়ালেখা শেষ করেছে এক সাথে, business ধরেছে এক সাথে,বিদেশে যাওয়ার পর আরহামের কথ চলা হয়েছে জিমির সাথে।
অতঃপর হঠাৎ করেই একদিন আরহামের কারনে তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরে। বিশেষ করে আরহামের ব্যবহার। আরহামের বয়স বারার সাথে সাথে তার খিটখিটে মেজাজের হয়ে যেতে শুরু করে। একদিন আরহাম কোনো কারন ব্যতিতই নিজেই জিমিকে তার নিন্দা করতে শুরু করে। সেদিন জিমি প্রান প্রিয় বন্ধুর কাছ থেকে নিন্দা পেয়ে নিজেই সরে গিয়েছিলো।

অতঃপর আরহামের মাথা ঠান্ডা হয়ওয়ার পরে আরহাম নিজের ভুল বুঝতে পারে জিমিকে অনেক খোঁজে তবে পায় না।সে শুনেছিলো জিমি নিজের দেশে ফিরে গেছে, সামান্য কথায় এতো বছরের বন্ধত্ব ভেঙ্গে দেওয়ায় আরহামো অভিমান করে আর তাকে খোঁজে না।
এর পর ১/২ বছর কেটে যায়।জিমি যাওয়ার পর থেকে আরহাম আরো খিটখিটে হয়ে যায়,কারনে অকারণে নিজের প্রতি বিরক্ত হতে থাকে থাকে সে,এক প্রকার অশান্তিতে ছিলো আরহাম।
ওমন একটা সময়ে ইলোরা তার জীবনে আসে,নেশা করেও শান্তি পাচ্ছিলো না আরহাম।তবে ইলোরার ভরপুর সৌন্দর্য দেখে তার অশান্ত মন কিছুটা সময় শান্ত হয়েছিলো।তাই তো সে ইলোরাকে বেছে নিয়েছিলো।তার সাথে লিভিং রিলেশনে যাওয়ার জন্য নিজেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো,আয়রা পেটে আসায় তাকে বিয়ে করেছিলো।তবে ইলোরাও তার ব্যবহারের বিরক্ত হয়ে তাকে ছেড়ে দেয়। ভাগ্য কতোটা খারাপ তার।
সেদিন রাতে এতো বছর পর হঠাৎ করেই আনন নাম্বার থেকে কল আসে জিমির।জিমি জানায় সে বাংলাদেশে এসেছে এবং আসার পরপরই ফাঁকা রাস্তায় ছিনতাই কারির হাতে পড়েছে। কোনো মতে মোবাইল টা বাজাতে পারলেও তাকে অচেনা এক জায়গায় ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছে।সে কিছুই বুঝতে পারছে না কোথায় যাবে।
কারণ জিমি আরহামের পুরাতন ম্যানেজার থেকে আরহামের বাংলাদেশি নাম্বার জুগার করলেও ঠিকানা জুগার করতে পারেনি কারণ সেই ম্যানেজার নিজেও জানে না এই বিষয়ে,এতো ব্যক্তিগত ব্যাপার তাকে জানানো হয়নি।

জিমি ভেবেছিলো দেশে এসে তার পর আরহামকে কল দিয়ে সারপ্রাইজ দিবে।ঠিকানা জিগ্গেস করবে কিন্তু তার আগেই অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে অঘটন ঘটে যায় তার সাথে।
এতো দিন পর জিমির কন্ঠ শুনে আরহাম হতভম্ব হয়ে যায়।তার বিশ্বাসি হচ্ছিলো না জিমি তার সাথে দেখা করতে এখানে এসেছে।তবে বন্ধুর বিপদের কথা শুনে সে নিজেই তাকে নিতে চলে যায়।সে চেক করতে চাইছিলো আসলেই জিমি এসেছে কিনা। জিমি কোথায় আছে সবটা জেনে তাকে ওখানে দাঁড়াতে বলে নুবাকে রেখেই চলে যায় সে।জিমিকে আসতে বলবে সেটাও পারে না কারণ এমন ফাঁকা রাস্তায় ফেলেছে একটা গাড়িও নেই নাকি।
আরহাম কোনো মতে জিমি পর্যন্ত পৌঁছে যায়,এতো বছর পর জিমিকে দেখে অনেক আবেগ প্রফুল্ল হয়ে যায় আরহাম।সাথে তার wife ও ছিলো।জিমি আরহামকে জানায় এতো বছর পর তার wife এর জ্ঞানে তার রাগ ভেঙ্গেছে তাই তাড়াতাড়ি এসেছে সব ঝগড়া মিটাতে।
যখন আরহাম খু্শি মনে বন্ধু আর বন্ধুর বউকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলো তখনি ঘটে আর এক দুর্ঘটনা।ঠিক যেভাবে তার পিতা অর্থাৎ হারুন মির্জার সাথে ঘটেছিলো।

আরহাম দুর্ঘটনার আগে টের পায় কেউ ইচ্ছা করে এই সব করেছে।কিছুটা পাকা রাস্তায় উঠতেই কোনো এক ট্রাক চালক ইচ্ছে করে বারবার আরহামের গাড়িতে আঘাত করার চেষ্টা করছিলো। আরহাম যতো ট্রাক থেকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলো ততই যেনো ট্রাকটা তাদের ঘাড়ের উপর চড়ে বসছিলো।
এমন করতে করতে হঠাৎ করেই ট্রাকটা তাদের ধাক্কা মেরে উল্টে ফেলে দিলো। আরহাম ড্রাইভ করছিলো তবে সিট বেল্ট লাগায়নি,ফল স্বরুপ সে গাড়ির কাঁচ ভেঙ্গে ফস্কে যেয়ে পড়ে পাকা রাস্তায়।তখনো আরহাম ততটা আঘাত পায়নি।যখন আঘাত প্রাপ্ত আরহাম কোনো মতে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যেতে চাইলো পড়ে থাকা ভাঙ্গা গাড়ির দিকে তখনি অন্য এক গাড়ি এসে আরহামকে ছিটকে ফেলে দিলো রাস্তায় পারে।ইটের উপর ছিটকে পড়ে মাথায় প্রচন্ড চাঁপা আঘাত পায় সে,আর সেখানেই সেন্স হারিয়ে ফেলে। ট্রাক ড্রাইভার নিজের কাজ শেষ করে পালায় তবে সেই সময়ো আরহামের মাথায় একটাই কথা ঘুরছিলো
“কে করলো এই সব,জিমি আর রোজি ঠিক আছে তো।”

এক্সিডেন্ট হওয়ার পরপরই কিছু মানুষ গাড়ি থামিয়ে এগিয়ে আসে।রোজি হুসে ছিলো, আঘাত তেমন পায়নি সে, কারণ সে পাছনে থাকায় কোনো মতে একটু কম আঘাত পেয়েছে।তবে আরহাম আর জিমি কেউ হুসে ছিলো না। অতঃপর রোজি আরহাম আর জিমিকে পাশের হসপিটালে নিয়ে আসে, অবশ্য কয় একজন সাহায্য করেছিলো।যদি পুলিশ ঠিক মতো তদন্ত করতো তবে অবশ্যই আরহামকে খুঁজে পেতো, অন্ততপক্ষে এই ,গাড়ি,এক্সিডেন্ট অথবা রাস্তার সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে।
কারণ হারুন মির্জা বলেছিলো আরহাম গাড়ি নিয়ে বেড় হয়েছে, যদি গাড়ি খুজা হতো তবে আরহামকেও পাওয়া যেতো,তবে লোভি আর অলস পুলিশ টাকার লোভে কোনো কাজি করেনি।
হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার পর তিন জনকেই ভর্তি করা হয়।জিমি আর রোজি কিছুটা সুস্থ হলেও আরহাম আমাথায় আঘাত পাওয়ার ফলে কোমায় চলে যায়।
জিমি বুঝতে পারছিলো না কি করবে?কারণ আরহাম কখনোই তার পরিবার সম্পর্কে তাকে কিছুই বলেনি,জিমি জিগ্গেসো করেনি কারণ সে বুঝতো আরহাম তার পরিবারের প্রতি বিরক্ত তবে মায়ের প্রশংসা করতো বটে। না পরিবার সম্পর্কে,না বাড়ির ঠিকানা জানতো জিমি।না এই দেশের নিয়ম কানুন, মানুষ জনের সাথে পরিচয় ছিলো যে আরামের পরিবার খুঁজে বেড় করবে।

তাই জিমি আর রোজি নিজেরা আরহামের দেখা শুনা করতে শুরু করেছে। doctor বলেছিলো sure কিছু বলা যাচ্ছে না,১/২ মাসে জ্ঞান ফিরতে পারে আবার বছর খানিকো লাগতে পরে,আবার দেখা গেলো জ্ঞান ফিরলোই না।মাথায় যা চোট পেয়েছে সারতে সময় লাগবে। এরপর থেকেই জিমি আরহামের খেয়াল রাখতে শুরু করে।মাথা থেকে পা পর্যন্ত যাতে তার বন্ধুর কোনো সমস্যা না হয়।
নুবা হসপিটালে আরহামের কাছে গিয়েছিলো যা সে নিজেও জানে না,নুবা আয়ারকে নিয়ে হসপিটাল থেকে চলে আসার দুই দিন পর হঠাৎ করেই আরহামের জ্ঞান ফিরে,জিমি খুব ভয় পাচ্ছিলো কিছু মনে আছে কিনা আরহামের তবে জ্ঞান ফিরার ঘন্টা খানকির মাথায় যখন একটু পরিস্থিতি ঠান্ডা,তখনি আরহাম সর্বপ্রথম নিজের মেয়ের কথা মনে করে অতঃপর নুবা,তার পরিবার।
আরহাম নুবার জন্য একটু বেশিই ছটফট করে উঠে কারণ তার কাছে মনে হচ্ছিলো কাল রাতেই সে নুবাকে ছটফট করতে দেখেও রেখে চলে এসেছে। আরহাম সাথে সাথেই বাড়ি ফিরতে চায়।জিমি সবটা খুলে বলে আরহামকে।
আরহাম জিমির কথা গুলো হেসে উড়িয়ে দেয়, কারণ তার বিশ্বাসি হচ্ছিলো না টানা ৮ টা মাস পার হয়ে গেছে। তবু সে উঠে দাঁড়াতেই মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নেয়। শরীরের ভাব গতি দেখে সে বুঝতে পারছিলো কিছু একটা উল্টা পাল্টা হয়েছে তবে বিশ্বাসি করতে পারছিলো না সে।জিমি আর রোজিকে নিয়ে বাড়ি ফিরে ঠিকি তবে ফিরার পর বুঝতে পারে জিমি যা বলেছিলো সব সত্যি।

কথা টুকু শেষ করে আরহাম কেমন করে নিঃশ্বাস ফেললো।নুবা শুধু চেয়ে রইলো,বোঝার উপায় নেই পিঠ পিছে কে এরকম শত্ররামি করছে। আপাতত আরহাম শুধু নিজ বউ বাচ্চাকে নিয়ে ভাবছে।কে তার পিছনে এভাবে লেগেছে তা খোঁজ নেওয়ার বিন্দু পরিমাণ ইচ্ছে হচ্ছে না তার।
আরহামের কথা শেষ হতে হতে আয়রা ঘুমে বেভুর,তা দেখে নুবা চাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে,আরহামকে হাতের ইশারায় পাশে শতে বললো।
আরহাম নুবার ইশারা বুঝে আস্তে করে যেয়ে মেয়ের পাশে শুয়ে পড়লো।নুবা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ঘুমন্ত আয়ারকে আরহামের বুকে ঠেলে দিলো।নুবা টের পাচ্ছে ,মেয়ের এরকম ব্যবহারে আরহামের বুক ভেঙ্গে আসছে।আয়রাকে একটু কোলে নিলে হয়তোবা সেই অশান্ত বুক শান্ত হবে।
যেই ভাবনা সেই কাজ। আরহাম ঠিক আগের মতো করে আয়ারকে বুকে টেনে নিলো।নিজের এক হাত দিয়ে আলতো করে জরিয়ে ধরলো।মেয়েকে বক্ষ স্থলে পেয়ে আরহাম শান্তির নিশ্বাস ফেললো।এতো সময় যেনো তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিলো।
নুবা আরহামকে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলতে দেখে মুচকি হাসলো।এর ভিতরেই আয়রা নড়েচড়ে উঠলো। নুবা আলতো করে আয়রার পিঠে হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বললো,

_”আম্মু আছি তো, মা। ”
নুবার কন্ঠ শুনে আয়রা আবারো শান্ত হয়ে গেলো।আরহাম আয়রাকে বুকে জরিয়ে নুবার দিকে তাকালো।নুবা এগিয়ে এসে আরহামের শরীরের উপর হাত রাখলো ফিসফিস করে সুধালো
_”মেয়ে বুকের ভিতরে আছে না!এবার শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন।”
আরহাম মুচকি হেসে বিরবির করে বললো
_”বউ টা পিছন থেকে জরিয়ে ধরলে আরো ভালো ঘুম আসতো।”
আরহামের আবদার ফেলে দেওয়ার মতো মনে হলো না নুবার কাছে। দুটো ফাল দিয়ে এসে , আরহামকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে পিঠে মুখ গুঁজে দিলো। আরহামের ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠলো।

মাঝখানে কেটে গেছে একটি দিন আরো একটি রাত।সকাল সকাল আরহাম ছাদে এসে জিমির সাথে বসে আছে। কিছু আলাপ করছে তারা।জিমি আরহামের হাস্যোজ্জ্বল ব্যবহারে পুরাই অবাক বনে গেছে। কারণ আরহাম কখনোই এভাবে হেসে হেসে কথা বলতো না।
জিমি পরিষ্কার আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। আরহাম জিমির মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু কন্ঠে বললো
_”বিয়ে কবে করেছো?”
জিমি আরহামের দিকে তাকিয়ে,কিছুটা ভাঙ্গা বাংলায় বললো
_”৩বছর হবে!আর থুমি”
_”এখনো বছর হয়নি,তবে অতী শিঘ্রই হবে।”
অতঃপর জিমি আর আরহাম অতীতের কিছু কথা নিয়ে আলোচনা করতে লাগলো

নুবা চিন্তিত হয়ে ছাদের দিকে যাচ্ছে,সকালে নাস্তার পর থেকে আরহামকে দেখেনি সে,এই নিয়ে চিন্তিত বেচারি।নুবা এক প্রকার ছুটে ছাদে আসলো। আরহাম ২ মিনিটের জন্য তার চোখের সামনে থেকে সরে গেলেই যেনো নুবার হাই পেশার বেড়ে যায়।
নুবা হালকা ঘার্মাত মুখে ছাদের এসে দেখলো আরহাম রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে।নুবা পিছন থেকেই আরহামকে চিনে ফেললো। বাচ্চাদের মতো ছুটে যেয়েই পিছন থেকে তাকে জরিয়ে ধরলো, হঠাৎ এমন হওয়ায় আরহাম কিছুটা চম্কে উঠলো।পরপর নুবার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনেই টের পেলো এটা তার মিনি হাতি ছাড়া কেউ না।
নুবা আরহামকে পেয়েই,চেপে রাখা নিঃশ্বাস ফেলে শান্ত কন্ঠে বললো
_”সকাল থেকে মেয়ের মতো টই টই করে বেড়াচ্ছেন কেনো।দু মিনিট স্থির থাকা যায় না?”
নুবার প্রশ্নে আরহাম বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলো,যেনো মা ব্যতিত এখন আর একজন হয়েছে যে তার চিন্তা করে। আরহাম ধীরো শরীরে নুবার দিকে ফিরে তাকালো।নুবা মাথা উঁচু করে আরহামের দিকে তাকাতেই,নুবার চুমু খাওয়ার ইচ্ছা জাগলো।নুবা ঠোঁট ঠোঁট চেপে তাকিয়ে রইলো। ইস্ সে চুমু খাবে ছ্যে, একদম নির্লজ্জ মার্কা হবে না?

নুবা আরহামের দিকে তাকিয়ে বেশি সময় ভাবতে পারলো না,নিজের ইচ্ছাকে দমিয়ে না রাখতে পেরে,দুই পা উঁচু করে আরহামের গলা জরিয়ে ধরলো।পরপর কোনো সতর্কতা অবলম্বন না করেই আরহামের কাচলে ঠোঁট দুটো আঁকড়ে ধরলো। আরহাম স্তব হয়ে গেলো নুবার কান্ডে । অনুমান করতে পারেনি যে তার বউ এভাবে তাকে হঠাৎ করেই চুমু খাবে।
আরহাম কিছু সময় চুপ থেকে নুবার তালে তাল মিলিয়ে দিলো। আরহাম হয়তোবা বউয়ের তারনায় ভুলেই গেছিলো জিমি এখানেই আছে ‌,যে কিনা ঘুরে ঘুরে ছাদের এপাশ ওপাশ দেখতে ব্যস্ত ছিলো।
মিনিট খানিক পর নুবা হাঁপিয়ে উঠলো,নিজেই আরহামকে ছেড়ে দিলো। আরহামের পেট যেনো ভরলো না, আবারো এগিয়ে আসতে চাইলো।নুবা বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে আরহামের ঠোঁট চেপে ধরলো,মিনমিন করে সুধালো
_” নিঃশ্বাস আঁটকে মেরেই যাবো,এখন আর না।”

আরহাম নুবার সরু কমড় জিরিয়ে ধরলো,ভুরু নাচিয়ে হাসলো সে। দুষ্টু কন্ঠে বলে উঠলো,
_”আজ হঠাৎ করেই এতো প্রেম প্রেম পাচ্ছে যে? চুমু খাওয়ার ইচ্ছা জাগলো কি করে হুম?”
নুবা একটু লজ্জা পেলো,আরহামের বুকে মাথা রেখে শার্টের বোতার এক আঙ্গুল দিয়ে খুঁটতে খুঁটতে বললো
_”এমনিই ইচ্ছা হলো,কেনো হতে পারে না।আপনারি কি শুধু হয় নাকি আজব!”
আরহাম শব্দ করে হাসলো।এই মেয়েটা তার জীবনে আসার পর থেকে সে হাসতে শিখেছে।নুবা আরহামের ব্যক্তিত্ব পুরোই পাল্টে দিয়েছে।সেটা হয়তোবা নুবার নিজেরো জানা নেই।
তাদের লজ্জায় মাখো মাখো মূহুর্তে পাশ থেকে জিমি কেশে উঠলো। হঠাৎ করেই কারো কাশির শব্দ শুনে নুবা ভুরু কুঁচকে পাশে তাকালো, পরপর জিমিকে দেখে হতভম্ব হয়ে গেলো সে।যখনি পরিস্থিতি বুঝতে পারলো তখনি দুটো ফাল দিয়ে আরহামের থেকে দূরে সরে গেলো।
জিমি মিটমিট করে হেসে খুব কষ্ট করে বাংলায় সুধালো

_” আমি খিছুই মনে খরিনি! এতাই সাভাবিক।”
নুবা লজ্জায় লাল নীল হয়ে গেলো। ছোটো ছোটো চোখে আরহামের দিকে তাকালো। আমতা আমতা করে বলে উঠলো
_”আ,,আপনি বলবেন না যে উনিও এখানে আছে।”
আরহাম ঠোঁট হেলিয়ে হেসে সুধালো
_”তুমি বলার সুযোগ দিয়েছো।”
নুবা আরো লজ্জা পেয়ে গেলো, আস্তে আস্তে করে পিছাতে লাগলো,তার ধান্দা বরাবরের মতো সে আবারো দৌড় দিবে। আরহাম নুবার ধান্দা বুঝতে পারে তাকে আরো লজ্জায় ফেলে বললো
_”আপনার দেখে নেওয়া উচিত ছিলো যে আশে পাশে কেউ আছে কিনা।এখন যদি এতো বড় মানুষকে আপনার নজরে না পড়ে ,তবে আমার কি করার sweet honey?”
নুবা লজ্জায় চোখ মুখ খিচে নিলো,এক পলক জিমির দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে হয়তোবা sorry বললো, অতঃপর দিলো এক দৌড়,যেতে যেতে নুবার আফসোস হলো কারণ সেদিন হসপিটালে জিমিকে সে উগান্ডান বলে উপাদি দিয়েছিলো তবে এবার সে অনুভব করলো, রুপ যেমনি হোক, মানুষটা খুবি ভালো।নুবা সারাজীবন জিমি আর রোজির কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে কারণ তারা তার স্বামীকে এতো মাস সামলে রেখেছে।এর প্রতিদান দেওয়ার মতো না!

রোজি সবার সাথে গল্প করছে আর সাথে হালকা বাংলা শিখার চেষ্টা করছে। এদিকে আয়রা হাজেরার কোলে বসে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে রোজির দিকে, হয়তোবা সে ভাবছে এই নতুন মানুষ গুলো হঠাৎ করে কোথা থেকে আসলো?
কথায় কথায় নুবা রোজির কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো।রোজি বিনিময়ে শুরু মুচকি হাসলো।সবি জিমির জন্য, কারণ রোজি তো আরহামকে চিনেও না,জিমি আরামের পাশে ছিলো তাই রোজি নিজের স্বামীর পাশে ছিলো।

আয়রা নুবার এক পা দুই হাত দিয়ে জরিয়ে ধরে কাঁদছে।নুবা অসহায় দৃষ্টিতে আরহামের দিকে তাকিয়ে আছে। আরহামেরো একি অবস্থা। আরহাম চাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে নুবার গলায় শেষ চুমু খেয়ে বললো
_”আগে এই ডিজিটাল যন্ত্রটাকে শান্ত করো। তোমাদের চদনে,এই জনমে আমার আর বাসর করা হবে না। I understand ,যাও।”
বলেই আরহাম ঝুলিয়ে রাখা দু পা বিছানায় উঠিয়ে বসলো।নুবা আয়রাকে কোলে তুলে,আরহামের থেকে দূরে সরে গেলো।
একটু আগেই দুই জন একটু কাছাকাছি এসেছিলো।আয়রা তখন ফ্লোরে খেলানা নিয়ে খেয়াল মগ্ন,তবে যখনি খেলায় করলো নুবা আর আরহাম এক সাথে এবং আরহামের চেহারা আয়রার সামনে ভেসে উঠলো তখনি তাড়াতাড়ি করে হামাগুড়ি দিয়ে এসে নুবার এক পা ধরে উঠে দাঁড়িয়ে কেঁদে উঠলো।
আরহাম বিছানায় বসে ছিলো।নুবা আরহামের দু পায়ের মাঝখানে দাড়িয়ে জামাই আদর খাচ্ছিলো তবে তখনি আয়রার বাচ্চা বেঘাত ঘটিয়ে দিলো।আয়রার কান্না শুনে তাদের বুঝতে বাকি রইলো না যে পাকা বুড়ি টের পেয়ে গেছে।
নুবা কাঁদো কাঁদো চেহারা নিয়ে আরহামের দিকে তাকালো , বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে,বিরবরি করে বললো

_”আপনার আর আমার কাছে আসা হবে না,আয়রার পাপা।আপনি দূরেই থাকুন।”
আরহাম ভুরু কুঁচকে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে, নেতিয়ে যাওয়া কন্ঠে সুধালো
_”কেনো এমন করছিস মা,বাপের কষ্ট বুঝিস না ছ্যে। বুঝিস না ভালো কথা ,তাই বলে কষ্ট আরো বাড়িয়ে দিবি little honey . why bab why?”
বলতে বলতে আরহাম বিছানায় গা হেলিয়ে দিলো।নুবা আরহামের চুপসে যাওয়া মুখ দেখে মিটমিট করে হেসে বলে উঠলো
_”আপনার মেয়ে বহুত হিংসুটে বুঝলেন,যদি ২৯ টা বেবি চলে আসে তখন তো ওর আদরে ভাগ পড়বে।সেই ভয়ে এখন থেকেই আপনাকে সাবধান করছে,তাই না মা। আমার আরু এতো গুলো ভাই বোন চায় না। কারণ সে জানে তার মাম্মার কষ্ট হবে।”
লাস্ট ৩ লাইন আয়রার দিকে তাকিয়ে তার থুতনি চেপে বললো।আয়রা চোখে পানি নিয়ে হাসলো, আরহাম টের পেলো,এই পরিস্থিতি নুবার কাছে সামান্য মাত্র।সে যেনো এতে আরো মজা পাচ্ছে তবে আরহামরি জানে তার কেমন লাগছে।
আজ রাতটাও তার হাতছাড়া হয়ে গেলো।এখন এই আয়রা মায়ের কলিজার ভিতরে ডুকে ঘুমাবে ,একটু সরালেই প্যা পু শুরু করবে।যাক গ্গে, আরহাম মেয়ের জন্য একটু ধৈর্য ধরতে পারবেই।

রাত পেরোতেই সকাল সকাল মেয়ের জন্য হাত ভর্তি খেলনা সাথে নুবার মন পচ্ছন্দ খাবার।নুবার থেকে জেনে আরহাম তার মেয়ে কি কি পছন্দ করে সবি নিয়ে এসেছে সে।
নুবা আয়ারকে নিয়ে রুমে বসে ছিলো,নুবা একটু চিন্তিত বটে, আরহাম বাইরে গেছে।আবার কোনো বিপদ হয় কিনা।কখন ফিরবে এই নিয়ে চিন্তিত সে।
মিনিট খানিক যেতেই আরহাম হাত ভর্তি জিনিস নিয়ে ফিরলো। আরহাম রুমে প্রবেশ করতেই নুবার জানে জান ফিরে আসলো।আরহামকে দেখেই আয়রা তাড়াতাড়ি যেয়ে নুবার কোলে উঠে বসলো।নুবা মনে মনে আয়রার কান্ড দেখে হেসে উঠলো।
আরহাম এগিয়ে এসে সব পেকেট বিছানায় রেখে,পকেট থেকে মেয়ের জন্য আনা especial চকলেট বেড় করে আয়রার দিকে এগিয়ে দিয়ে,আদুরে কন্ঠে সুধালো
_”এটা আমার মামুনির লাগবে,হুম।”
আয়রা একবার আরহামের হাতের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে যেতে চাইলো তবে আবারো নুবার কোলে এটে বসলো।নুবা আয়রার হাত ধরে মৃদু কন্ঠে বললো
_”আব্বু দিয়েছে না,নেও আম্মু। পাপা মাজা দিচ্ছে নিবে না?”
আয়রা লোভ সামলাতে পারলো না, সে উঠে দাড়িয়ে হাঁটার চেষ্টা করলো তবে বিছানায় বেঁধে পড়ে গেলো। আরহাম চম্কে উঠলো। তাড়াতাড়ি এসে আয়ারকে টেনে তুললো।আয়রা যাতে না কাঁদে তাই নুবা স্বাভাবিক কন্ঠেই বললো

_”কিচ্ছু হয়নি তো, ইস্ বিছানা ফেটে গেলো তো আরু,,এটা কি করলেন আপনি,বিছানা ফাটিয়ে ফেললেন হুম?”
নুবার চোখ বড় বড় অদ্ভুত কন্ঠ শুনে আয়রা শব্দ করে হাসলো, পরপরই ড্যাবড্যাব করে আরহামের দিকে তাকালো,যেই না আরহামকে দেখে কেঁদে উঠতে যাবে তার আগেই আরহাম চকলেট এগিয়ে দিয়ে সুধালো
_”আমার মা”কি এটা নিবে না? ”
আয়রা হাত বাড়িয়ে নিলো, আরহাম দুই হাত বাড়িয়ে দিলো মেয়েকে কোলে নেওয়ার জন্য,তবে আয়রা চকলেট নিয়েই হামাগুড়ি দিয়ে নুবার কাছে চলে গেলো। আরহাম নিরাশ হলো,নুবা আরহামের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বুঝালো
_”আর একটু সময় দিন,সব ঠিক হয়ে যাবে।”
আরহাম নুবার কথায় ভরসা পেলো।পরপর মেয়ের জন্য আনা সকল খাবার আর খেলান তার সামনে রেখে বললো
_”এগুলো সব আমার মায়ের, আমার little honey জন্য। ”
নুবা একটা খেলান হাতে নিয়ে আয়রার দিকে এগিয়ে দিয়ে হেসে বলতে লাগলো
_”আয়রার পাপা,আয়রার জন্য এতো কিছু এনেছে,এখান থেকে কি আয়ার আমাকে কিছু দিবে,হুম,দিবে আম্মু, মাম্মাকে কিছু দিবে না?”
আয়রা খিলখিল করে হাসলো,যেনো সে এতো কিছু দেখে খুব খুশি হয়ে।আয়রা একটা রেখে আর একটা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলো। আরহাম বাকি ৩/৪ টা পেকেট হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো
_”রিশিতাকে মামা হিসাবে কিছুই দেওয়া হয়নি। কিছু ড্রেস আর প্রয়োজনীয় জিনিস এসেনি,i think আরশির পছন্দ হবে। তুমি কি সাথে যাবে?”

আরহাম রিশিতাকে একটি সুন্দর কারুকাজ করা স্বর্নের ব্যাসলেট পড়িয়ে দিলো,সাথে একটি চেইন।আরশি এই সব দেখে মৃদু হেসে বললো
_”এই সবের কি দরকার ছিলো ভাইয়া। আব্বু, আরাফ ভাইয়া,খালা মানি,সবাই ওকে অনেক কিছু দিয়েছে।
আরহাম রিশিতার কোলে নিয়ে গাল ছুঁয়ে কপালে চুমু খেয়ে বললো
_”আমি তো দেইনি,মামা হিসাবে আমার কিছু দেওয়া তো লাগবেই।”
রিহান জোরপূর্বক হেঁসে বিরবির করে বললো
_”হ্যাঁ হ্যাঁ, তুই তো অনেক দিয়েছিস ভাই,সাথে‌ দুটো কোপ ফ্রি, সেদিন তিন নাম্বার দিতে দিতে থেমে যাওয়ার কারণ হয়তোবা নুবা ছিলো,তাই না নুবাইরা?”
নুবা মিটমিট করে হাসলো। আরশি কুনুই দিয়ে রিহানকে খোঁচা মেরে ফিসফিস করে বললো
_”আপনার কি অতীতের কথা টেনে তুলা ছাড়া কাজ নেই, সবসময় ভেজাল পাকান, অসভ্য লোক।”
আরহাম একবার রিহানের দিকে তাকালো,যেনো চোখ দিয়ে তাকে গিলে খাবে।রিহান শুকনো ঢোক গিলে আরশির পাশে চিপকে রইলো। আরহাম কিছু সময় নবজাতক রিশিতার সাথে বসে আলাপ করলো অতঃপর নুবা আর আয়ারকে নিয়ে বেড়িয়ে আসলো।

আমিনা বেগম আরামের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলছেন,এই কয়দিন আরহামের সাথে তার আলাপ তেমন হয়নি‌। কারণ সে নুবা আর আরহামকে বিরক্ত করতে চাইছিলো না।এই সময়টুকু নুবার প্রয়জন ছিলো তাই সে আর তাদের সময় নষ্ট করেনি তবে আজ আমিনা বেগম সুযোগ পেয়েছে আরহামের সাথে আলাপ করার।
এতো দিন পর ছেলেকে পেয়ে যেনো আমিনা বেগমের চোখের পানি থামতেই না,বারবার ছেলের গাল ছুঁয়ে দিচ্ছেন। হয়তোবা বোঝার চেষ্টা করেন এটা কি তারি মানিক,তার কলিজার টুকরো।
আমাকে অস্থির হতে দেখে আরহাম আলতো করে জরিয়ে ধরলো।মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে নিজেও আবেগ প্রফুল্ল হয়ে ভাঙ্গা কন্ঠে বললো
_”তোমার ছেলে একদম ঠিক আছে mom, তুমি এতো কান্না করছো কেনো বলো তো। মনে হচ্ছে আমি ফিরে আসায় আরো অখুশি হচ্ছো!”
আমিনা বেগম ছেলের কথায় চমকে উঠে, চোখের পানি মুছে ছেলেকে আঁকড়ে ধরে বললেন
_”কে বলেছে আমি অখুশি হয়েছি।আমি যে কতটা খুশি তা তোকে বোঝানো যাবে না।বড় সন্তান যে একজন মায়ের জন্য কি তা তুই বুঝবি না।”
আরহাম চাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে সুধালো

_”আর তোমার husband ,সে তো আমার মৃত্যুর কথা শুনে নিশ্চিত খুশি হয়েছিলো ?”
আমিনা বেগম চম্কে উঠে ছেলের দিকে তাকালেন,এই ছেলে তার বাপকে এতোটা নিচু মনে করে,আমিনা বেগম কিছু সময় ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকে ভাঙ্গা কন্ঠে বললেন
_”এই সব কি বলছিস তুই,তোর বাবা কিভাবে যে ভেঙ্গে পড়েছিলো তা তুই বুঝবি না আরহাম।উনি বাচ্চাদের মতো কেঁদেছিলেন। ”
আরহাম তাও বিশ্বাস করলো না,মুখ ঘুরিয়ে বললো
_”নিশ্চয় লোক দেখানো, কাঁদতে হতো ,তাই হয়তোবা।”
আমিনা বেগম ছেলের জমে থাকা অভিমান বুঝতে পেরে বললেন
_”তোর বাব তোকে অনেক ভালোবাসে আরহাম, তুই নিজেও আন্দাজ করতে পারবি না যে কতটুকু ভালোবাসেন!লোক দেখানো নয়,রুমে এসে বাচ্চাদের মতো ছটফট করেছিলেন।আর তুই জানিস, তুই ফিরে আসার খুশিতে যে লাক্ষ খানিক টাকা দান করেছেন।আসলে তুই কখনোই বুঝবি না উনি তোকে কতটা ভালোবাসেন ।”
আরহাম নিরব রইলো,কি বলবে সে, শুধু মায়ের কথা গুলো শুনে গেলো।

আরহামের বুকের উপর উঠে তার চুল ধরে ইচ্ছে মতো টানছে আয়রা।কখনো চুল টানছে,তো কখনো চোখে মুখে চাপর মেরে কানা করে দিচ্ছে,কখনো নুবার মতো ঠোঁট টেনে দাত দেখছে।আবার মুখে আঙ্গুল পুরে দিচ্ছে।তবে এই সবের ভিতরেও আয়রা হাসছে,মানে সে আরহামকে মেরে খুশি হচ্ছে।
নুবা রুমে ছিলো না,তবে রুমে এসে আরহামের নাজেহাল অবস্থা সাথে বিছানার বেহাল দশা দেখে হতভম্ব হয়ে গেলো। তাড়াতাড়ি এগিয়ে যেয়ে অবাক কন্ঠে বললো
_”কি হয়েছে? আপনার এই অবস্থা কেন?”
আরহাম মেয়ের দুই হাত চেপে ধরে বললো।
_”আর বলো না,বসে বসে আইল মাটি চাইল করছিলো।ধরেছি কেন তাই কেলানি খেতে হচ্ছে!”
প্রথম বারের মতো আরহামের মুখে এরকম অশুদ্ধ ভাষা শুনে নুবা খিলখিল করে হেসে বসে উঠলো।
_”একদম ঠিক আছে,মেয়ের হাতে দুটো খেলে,তবেই সুধরে যাবেন।”
আসলে আরহাম বিছানার এক কোনায় বসে ছিলো,অন্য দিকে আয়রা বিছানায় বসে খেছিলো।সে নুবার দেওয়া কেকে, না খেয়ে গুরো গুরো করে বিছানায় মাখছিলো, সাথে সব খেলনা ছুরে ছুরে এদিকে ওদিকে ফেলে দিচ্ছিলো।

এই পর্যন্ত ঠিক ছিলো, তবে তার পর হঠাৎ এক পা দুটা করে এগিয়ে যেয়ে বিছানার পাশে রাখা পানির বোতল এনে ,কিভাবে যেনো খুলে তা দিয়ে পুরো বিছানা মেখে,মানিতে লুতুপুতু করে মজা নিচ্ছিলো।এই অবস্থা দেখে মোবাইলে ব্যস্ত থাকা আরহাম যেই না এগিয়ে এসে আয়রাকে ধরে এক ধমক দিলো সেই ঠিক নুবার মতো করে,আয়ার আরহামের মুখে চাপড় মেরে দিলো। আরহাম আয়রাকে কোলে তুলে নিয়ে চোখ ছোটো ছোটো করে বললো,
_”এই বদের হাড্ডি, এগুলো কি করছেন,আপনি জানেন না পাপার অপরিষ্কার পরিবেশ পছন্দ করে না।তাও না হয় আপনার জন্য মেনে নিলাম,তাই বলে পানি দিয়ে খেলবেন? ঠান্ডা লেগে যাবে না?”
আয়রার হাতে ছিলো এক পুতুল,অবুঝ আয়রা বুঝতে না পেরে সেই খেলান দিয়ে আরহামকে এক বারি মেরে অজ্ঞান করে ফেললো, অর্থাৎ বিছানায় ফেলে দিলো। আরহাম আয়ারকে দুই হাত দিয়ে উঁচু করে পিছন দিকে ঝুঁকে ছিলো তাই অতী সহজেই বিছানায় পড়ে গেলো।
সেই সুযেগে আয়ার আরহামের গলার উপর চরে তাকে কেলানি দিতে লাগলো।আয়রার কাছে এগুলো খেলার মতো তবে ছোট্ট হাতের মার বেশ লাগলো আরহামের। কিন্তু আয়রা তাকে মেরে নিজেই হেসে কুটিল হচ্ছিলো তাই তো আরহাম মেয়ের সাথে তাল দিলো।
নুবা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।পরপর খেলায় করলো আরহামের মুখ নক দিয়ে হাঁচড়ে দাগ বানিয়ে ফেলেছে।নুবা এবার এগিয়ে গেলো।আয়ারকে টেনে আরহামের থেকে সরিয়ে নিলো ,তবে আয়রা যেনো এই খেলা খেলে প্রচন্ড মজা পচ্ছিলো তাই আরহামের থেকে সরিয়ে নিতেই ঠোঁট ফুলিয়ে উঠলো।
গত দুই দিন ধরে আয়রা আরহামকে দেখলে কাঁদে না তবে তাকে দেখলেই নুবার কোলে চড়ে বসে,আসলে আমাদের ভিতরের বোর্ডিং আস্তে আস্তে ঠিক হচ্ছে।
নুবা এক পলক বিছানার দিকে তাকিয়ে মাথায় হাত দিয়ে একটু রাগি কন্ঠে বললো

_”এগুলো কি করছিস তুই, আল্লাহ পুরো পানি মুনি নিয়ে, ইস্,তোর বাপ কি চোখ থাকতেও অন্ধ নাকি। এগুলো দেখিনি।
নুবার মৃদু ধমকে আয়রা আরো ফুঁপিয়ে উঠলো
আরহাম বিছানায় উঠৈ বসলো, মেয়েকে ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদতে দেখে এগিয়ে যেয়ে বললো
_”থাক দেও,ওর হয়তোবা,,,,
বাকি কথা বলার আগেই নুবা কিছুটা রাগি কন্ঠে বললো
_ ” একদম চুপ থাকুন,এই সব লাই দেওয়া একদম ঠিক না।আজ আপনার গায়ে হাত তুলছে কাল অন্য কারো উপর তুলবে।তাই অন্ততপক্ষে এই সব বিষয় নিয়ে লাই দিবেন না।”
নুবার রাগি রাগি মুখের দিকে তাকিয়ে আয়রা এ্যাঁ এ্যাঁ করে কেঁদে কেঁদে উঠলো।নুবা আলতো করে আয়রার হাতে চাপড় মেরে বললো
_”আর কক্ষনো হাত নাড়বে, বেয়াদব?”
আয়রা উল্টে নুবার হাতে চাপড় মেরে দিলো,নুবা হতভম্ব হয়ে গেলো।এই মেয়ে তো এখন থেকেই হাত নাড়া শিখে গেছে। এগুলো কি আদেও ভদ্র আচরণ।
আরহাম ভুরু কুঁচকে আয়রাকে নিতে চেয়ে বললো

_”দেও তো, ছোটো মানুষ বুঝে না,এই বয়স না তো কোন বয়সে করবে।এখনো সেই বুঝজ্ঞান হয়েছে তার, যে শাসন করছো, দেও।”
বলেই মেয়ের দিকে এগিয়ে গেলো,তবে আরহাম সামনে যেতেই আয়রা আবারো চড় বসিয়ে দিলো আরহামের মুখে।নুবা হতভম্ব হয়ে গেলো।এই হাত নাড়া,আয়ারকে শিখালো কে?তার সামনে তো এমন কিছু হয় না যে এরকম করবে।নুবা এবার একটু জোরেই আয়রার হাতে চড় লাগিয়ে দিলো।ধমকে উঠে বললো
_”বলেছিলো হাত নাড়বে না, দিন দিন বেয়াদব হয়ে যাচ্ছো।”
নুবার কঠিন শব্দে আয়রা আরো কেঁদে উঠলো,নুবার রাগি মুখের দিকে তাকিয়ে,নাক মুখ খিচে কাঁদল।নুবা ধমক দিয়ে চুপ করতে বললো আয়রাকে তবে সে আরো কেঁদে উঠলো।
আরহামের এবার বেশ রাগ হলো। আরহাম বুঝতে পারলো না যে,এই টুকু বাচ্চা কি বুঝে যে এরকম শাসন করছে। অবশ্য সে হয়তোবা জানে না ছোট্ট বেলা থেকেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।
আরহাম রেগে যেয়ে মেয়েকে নুবার কাছ থেকে নিয়ে নিলো। নুবা স্তব হয়ে গেলো আরহামের হঠাৎ আচরণে।
আরহাম আয়রাকে কোলে নিয়ে,নুবার দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছুটা কর্কশ শব্দে বললো
_”এতটুকু বাচ্চা আমার,ও কি এই সব বুঝে। তুমি এখনি ধমকাচ্ছো ওকে।তার উপর গায়েও হাত তুলছো।ওর যদি মিনিমাম এই জ্ঞান টুকু থাকতো তবে কি এরকম করতো?”
নুবা হতভম্ব হয়ে গেলো,আমতা আমতা করে সুধালো

_”আ,আমি কখন মারলাম,আর আপনার মেয়ে একটা ধরিবাজ, ছোঁয়ার আগেই কেঁদে দেয়,যেনো ছুতের বুড়ি। আমার মার ওর গায়ে লেগেছে নাকি।”
আরহাম কেমন খেকিয়ে উঠে ধমকে বললো
_”তা লাগেনি নাকি। বাচ্চাটার, না লাগলেই কি, এভাবে কাঁদতো ? নিশ্চয় লেগেছে। বাচ্চার গায়ে হাত তোলা কেমন অভ্যাস তোমার?”
_”আপনি এভাবে বলছেন যেনো,আমি সবসময় ওকে মারি আর আপনি দেখে বসে থাকেন?”
_”তা নয়তো কি,এভাবে কেনো মারবে,কোচি হাত যদি জোরে লেগে যেতো।”
নুবা ভুরু কুঁচকে কেমন তেতে উঠে বললো
_”আপনার মেয়ের হাত যেনো ভেঙ্গে ফেলেছি আমি, এমন ভাবে বলছেন।”
_”সেটা কখন বল্লাম?”
_”তাই তো বলছেন!”
নুবাকে এরকম তর্ক করতে দেখে আরহাম কিছুটা তেতে উঠলো,নুবার দিকে তেরে এসে খেকিয়ে উঠলো সে।ধমকে উঠে বললো,
_”একদম মুখে মুখে তর্ক করবি না।বেশি জবান হয়েছে।একটা বললে ১০ টা বলতে হয়।মুখটা বন্ধ রাখা যায় না?”

নুবা সরল চোখে আরামের দিকে তাকিয়ে রইলো।ভিতরে ভিতরে রাগে সে ফাটতে লাগলো,তেরে আসলো,বিষয়টা হজমি করতে পারলো না,এদিকে আয়রা ভেজা চোখে নুবার দিকে তাকিয়ে আছে,তবে কাঁদছে না।নুবার যেনো মনে হচ্ছে,তাকে বকা খাওয়ার জন্য এরকম কাদছিলো।এখন শান্তি হয়েছে।
নুবা আর কিছু বললো না,বিছানার চাদর উঠাতে ব্যস্ত হলো। আরহাম বুঝতে পারলো এই মাত্র বহুত মারাত্মক একটা কাজ করে ফেলেছে। ইস্ কি করলো সে,তাই চুপসে যাওয়া কন্ঠে আমতা আমতা করে পিছন থেকে বলে উঠলো
_”বাচ্চাদের বুঝিয়ে বলতে হয়, এভাবে ধমক দিয়ে,চোখ গড়ম করলে তারা ভয় পায়,আরো বিগরে যায় নুবা।”
নুবার একটু রাগ হলো,মুখ কালো করে,বিছানা থেকে আয়রার খেলান ছুরে ছুটে ফেলতে ফেলতে বললো
_”আপনি এতো ভালো বুঝেন আপনিই নিজের মেয়েকে মানুষ করেন।আমি মারি,ধমক দেই,চোখ গড়ম দেই। আমার কোনো দরকার আছে কি?”
আরহাম ভুরু কুঁচকে শান্ত কন্ঠে বললো
_”এই যে উল্টা বুঝছো।আমি কি বল্লাম আর তুমি কি বলছো।”
নুবা বিছানার চারদ ঝাড়া মেরে বিছানায় রেখে আরহামের দিকে তাকিয়ে পটপট করে বললো
_”আমি যা বলছি ঠিকি বলছি !”
আবারো আরহামের মাথা গড়ম হলো,আরহাম কিছুটা রেগে তেতে উঠে সুধালো
_”একদম উল্টা পাল্টা কথা বলবে না,বলে দিলাম।এই জন্য মাঝে মাঝে তোমাকে অসহ্য লাগে।”
নুবার রাগে শরীর ফেটে গেলো,সাথে অভিমানো হলো,রাগে কাঁপতে কাঁপতে আরহামের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালো,ছলছল চোখে চেঁচিয়ে উঠে বললো

_”কি উল্টা পাল্টা বলেছি?আজ যদি আমার পেটের টা হতো তবে অবশ্য আমার দুটো কথা বলার right থাকতো।আজ সৎ দেখে সেই কথা বলার অধিকার টুকু নেই।আমি মারি,চোখ গড়ম দেই,ধমক দেই তাহলে আপনারটা আপনিই রাখেন না।মা ঠিকি বলেছিলো সৎ কোনো দিনও আপন হয় না।আমিই একটু বেশি আশা করেছিলাম। নিজেকে অন্য কারো বাচ্চার মা ভেবে বসেছিলাম।”
বলেই নুবা অপরিষ্কার বিছানা আর ফ্লোর পরিষ্কার না করেই চলে যেতে লাগলো। আরহাম কর্কশ কন্ঠে বললো
_”এই যে,এই যে বেশি বুজলে।আমি কি বল্লাম আর তুমি কি বললে? সবসময় বেশি বুঝো।”
নুবা যেতে যেতে তেতে উঠে বললো
_”যে কম বুঝে তার কাছেই যান আপনি,আমি তো বেশি বুঝি আমার কাছে থাকার কথাই আসে না, অসহ্য লাগে আমাকে তাই না।”
বলেই গটগট করে চলে গেলো, আরহাম হতভম্ব হয়ে গেলো ।কি থেকে কি হয়েছে গেলো বুঝতে পারলো না সে।পরপর আয়রার দিকে তাকিয়ে দেখলো সেও স্তব হয়ে আরামের দিকে তাকিয়ে আছে। আরহাম চোখের পলক ফেলে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললো

_”এটা ঠিক করলি little honey,এভাবে ঝগড়া বাঁধিয়ে দিলি?এবার আমার কি হবে?”
আয়রা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো।যেনো বলতে চাইলো”আমি কি করলাম পাপা, আমি নির্দোষ , তুমি দোষী।তুমিই তো তেতে এসে ঝগড়া বাধালে পাপা।আমি আর আম্মু ঝগড়া করে আবার মিলে যেতাম, তুমি কেনো মাঝখানে আসলে?”why পাপা why?”
আরহাম কপাল চাপড়ালো,আজ রাতো হাত ছাড়া হয়ে গেলো তার।”এ জনমে মনে হয় আমার আর বাসর করা হবে না খোদা।”

নুবা মুখ কালো করে লিভিং রুমে বসে ছিলো তখনি আরহাম মেয়েকে নিয়ে নুবার পাশে এসে বসলো ।নুবা সরে বসলো। আরহাম বিড়ালের মতো তাকালো নুবার দিকে।নুবার পুরো মনোযোগ টিভির দিকে তবু সে টের পেয়েছে বাপ মেয়ে এসেছে।
আরহাম একটু কথা বলার জন্য মিনমিন কন্ঠে বললো
_”বলছিলাম কি,একটু কিছু বানিয়ে দিতে যদি।পেটের ভিতরে চুহা দৌড়াচ্ছে!”
নুবা উত্তর দিলো না বরং তানিয়াকে ডেকে কিছু বানিয়ে দিতে বললো।নুবা কথা না বলায় আরহামের মুখটা চুপসে গেলো। এদিকে ঘন্টা খানিকো নুবার থেকে দূরে থাকতে পারলো না আয়রা।নুবাকে দেখে আরহামের কোল থেকে নেমে সোফা ধরে এক দু পা করে নুবার কাছে চলে আসলো।
এসেই নুবার কাঁধে হাত দিয়ে”মা মা” ডেকে উঠলো,কোলে বসার চেষ্টা করলো তবে নুবা পাত্তাও দিলো না।টেনে কোলে না নেওয়ায় আয়রার গাল ফুলে গেলো।ঢংগি আয়রা নুবার কাঁধে দুই হাত রেখে তাতে মুখ গুজে ক্ষুত ক্ষুত করতে লাগলো,নুবা বিরবির করে বলে উঠলো

_”আমি মারি,ধমক দেই, আমার কাছে আসছিস কেন?যে ভালো তার কাছে যা।”
আয়রা মুচরে উঠলো।নুবার কোলে উঠার জন্য উতলা হয়ে পড়লো।আয়ারকে ক্ষুত ক্ষুত করতে দেখে নুবা না পেরে তাকে কোলে তুলে নিলো। আরহাম ভাবলো এবার হয়তোবা কথা বলবে নুবা।তাই সে বহুত আশা নিয়ে এগিয়ে আসলো তবে আফসোস তাকে ফেলে রেখে,আয়রাকে নিয়ে উঠে গেলো নুবা।
আরহাম আহাম্মক বনে তাকিয়ে রইলো।এই জন্য বাচ্চাদের নিয়ে কখনো ঝগড়া করতে নেই।তারা তাদের জায়গায় ঠিক থাকে তবে মাঝখানে পড়ে যে তর্ক করেছে সে কালো হয়ে যায়।আয়রা মায়ের কোলে যেতে যেতে কাঁধ দিয়ে উঁকি মেরে আরহামের দিকে তাকিয়ে দাঁত বেড় করে হাসলো যেনো বুঝাতে চাইলো।”আম্মুকে তো আমি পঠিয়ে নিয়েছে পাপা,এবার তুমি কি করবে?”

সেই দুপুর থেকে আরহাম নুবার পিছন পিছন ঘুরছে।এখন রাত ১০ বাজে প্রায়।নুবা এখনো রুমে আসেনি। এদিকে মা মেয়ের ঠিকি মিল হয়ে গেছে।আয়রা আপাতত কি সুন্দর করে নুবার কোলে বসে দুধ খাচ্ছে।মানে মাঝখান দিয়ে আরহাম ফেঁসে গেছে।যাকে নিয়ে ঝগড়া হলো সে ঠিকি, মায়ের সাথে একটু ক্ষুত ক্ষুত করে মায়ের বুকে জাগা পেয়েছে তবে আরহাম,তার কি হবে এখন?
অনেকটা সময় পর আরহাম হাজেরার রুমে প্রবেশ করলো।দেখা মিললো আয়রা বিছানায় বসে নানির সাথে খিলখিল করে হাসছে,আর খেলছে।নুবাও তার সাথে যুক্ত। আরহাম ভিতরে প্রবেশ করে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য গলা ঝেড়ে কাশলো।
নুবা বুঝতে পেরেও বুঝলো না । আরহাম আমতা আমতা করে বললো

_”অনেক রাত তো হলো,রুমে যাবে না?”
নুবা মুখ কালো করে রইলো। আরহাম উত্তর না পেয়ে পাশে এসে দাঁড়ালো মিনমিন করে বললো
_”কি হলো,যাবে না নাকি?”
হাজেরা মেয়ে আর মেয়ে জামাইয়ের মুখের ভাব দেখেই বুঝতে পারলো ঝগড়া হয়েছে,তাই একটু হেসে মৃদু কন্ঠে বললো।
_”ঝগড়া হয়েছে বাবা,সকাল থেকে আমার মেয়েটার পিছন পিছন ঘুরছো যে,তাও পাত্তা পাচ্ছো না ছ্যে?”
হাজেরার কথা আরহামের কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো লাগলো।মুখ কালো করে বিরবির করে সুধালো
_”মেয়ে একটা বানিয়েছেন, কিছু বললেই উল্টা পাল্টা ভেবে ছ্যেত করে উঠে। তাহলে পাত্তা কি করে পাবো আম্মা।”
হাজেরা বেগম মুখ বাঁকিয়ে মৃদু কন্ঠে বললো
_”বউকে সামাল দেওয়ার যোগ্যতা লাগে,সেই যোগ্যতা তোমার আছে বুঝি।থাকলে কি বউ ঘড় রেখে এখানে ওখানে টই টই করে হুম।”
আরহাম জোরপূর্বক হেঁসে কিছুটা তেতে উঠে বললো
_”আপনি কিন্তু আমার ব্যক্তিত্বে হাত দিয়ে ফেলেছেন শাশুমা,এবার কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।”
বলতে বলতে আরহাম শার্টের হাতা গুটিয়ে নিলো। এদিকে নুবা ভুরু কুঁচকে তাকালো,সেও ফাত পেতে আছে,আজ যদি আরহাম তার মা’কে উল্টা পাল্টা কিছু বলে তাহলে সাবান ছাড়া ধুয়ে দিবে।
হাজেরা মেয়ের জামাইকে শার্টের হাতা ঘুটাতে দেখে হাঁটুর বলে উঠে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচল কমড়ে গুঁজতে গুজতে বললো

_”তা কি করবে তুমি বাছাধোন? ”
আরহাম একটু এগিয়ে এসে বললো
_”দেখবেন আমি কি করতে পারি।”
_”সেটাই তো দেখতে চাইছি!”
এ যেনো দুই বেয়াই কথা বলছে এরকম, তাদের দেখে বোঝার উপায় নেই তারা জামাই, শাশুড়ি, তাদের রুখে আসা দেখে মনে হচ্ছে দুই বেয়াই।কি আশ্চর্য ব্যাপার তাই না।
নুবার হাঁটুতে ভর করে বিছানায় উঠে দাঁড়ালো,আর ভাবতে লাগলো,এটা দুটো কি মারামারি করার প্ল্যান করছে নাকি। আরহাম এক পলক নুবার দিকে তাকিয়ে বললো
_”এই তুমি কি রুমে যাবে।”
নুবা মাথা ঝুঁকিয়ে বললো
_”না,ন এ একার না, বুঝলেন।”
হাজেরা কিছুটা এগিয়ে এসে সুধালো
_”আমার মেয়ে যাবে না,কি করবে তুমি।”
আরহাম ব্যস্ত কন্ঠে বললো
_”কি করবো জানেন, দাঁড়ান দেখাচ্ছি।”

বলতে বলতে আরহাম এগিয়ে এসে আয়ারকে কোলে তুলে নিলো,নুবা ভাবলো হয়তোবা মেয়েকে নিয়ে চলে যাবে।তবে আরহাম হাজেরা দিকে তাকিয়ে আয়ারকে নুবার কোলে ধরিয়ে দিলো, পরপর নুবার দুই হাত পেচ দিয়ে আয়ারকে জরিয়ে ধরতে বাধ্য করলো,আয়রা পড়ে যাবে এই ভয়ে নুবাও আয়রাকে জরিয়ে ধিরলো।
সেকেন্ড খানিকের ভিতরে কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই নুবাকে কোলে তুলে নিলো।নুবা হতভম্ব হয়ে গেলো।আয়রাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো।আরহাম নুবা আর মেয়েকে নিয়ে সোজা হাঁটা দিলো।হাজেরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। আরহাম যেতে যেতে বললো।
_”আমি অনেক কিছু পারি আম্মা, আপনি ব্যতিত সবাই জানে।”
বলতে বলতে বেড় হয়ে আসলো।তারা রুম থেকে বেড় হতেই হাজেরা মুচকি হেসে উঠলো। এদিকে মায়ের সামনে এমন একটা কান্ড ঘটায় নুবা লজ্জা পেলো সাথে অভিমানটাও বেড়ে গেলো।
নুবা ছটফট করে উঠলো,আর বললো
_”ছাড়ুন,নামান আমাকে।”
সারাদিন পর নুবাকে তার সাথে কথা বলতে দেখে আরহাম শান্তি পেলো।তবে সিরি দিয়ে উঠতে উঠতে সুধালো

নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ৪

_”ছটফট করলে,একদম ফেলে দিবো। তারপর নাচানাচি করিও, ঠিক আছে।”
নুবা ভুরু কুঁচকে শান্ত হয়ে গেলো,যদি সত্যিই ফেলে দেয়। এদিকে আয়রা যেনো মজা পাচ্ছে।সে মুখ দিয়ে আ উ শব্দ করে হাসতে লাগলো।যা শুনে মনে মনে নুবাও খিলখিল করে হেসে উঠলো তবে প্রকাশ করলো না।

নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ৬