Home আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২২

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২২

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২২
সাবিলা সাবি

সমুদ্রের নীরবতা ভেদ করে দ্রুত এগিয়ে আসছিল আরেকটি জাহাজ।
সামনে উড়ে চলেছে শ্যাডো। বারবার ডানা ঝাপটিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সে।
কিছুক্ষণ আগেই শ্যাডোর দেওয়া সংকেত অনুসরণ করে মার্ক আর জ্যাক নিজেদের পথ বদলে এখানে চলে এসেছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে ইভানা। মেয়েদের পৌঁছে দিয়ে সে ফিরে এসেছে ইতিমধ্যে
জাহাজটা তীরে যতই কাছে আসতে লাগল, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠল দৃশ্যটা।
সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে আছে দানিয়েল। তার দৃষ্টি স্থির গাছটার দিকে। গাছের গোড়ায় শুয়ে আছে হিয়া। মুখ ফ্যাকাশে, কপালে শক্ত করে বাঁধা রুমাল দিয়ে ব্যান্ডেজ রক্তে হালকা ভিজে গেছে। শ্বাসপ্রশ্বাস চলছে, কিন্তু শরীর এতটাই দুর্বল যে চোখ খোলা রাখার শক্তিটুকুও নেই।
জাহাজটা কাছে আসতেই মার্ক আর ইভানা এক মুহূর্ত দেরি করল না। দ্রুত বোটের পাশে নোঙর ফেলল।
মার্ক উদ্বিগ্ন গলায় বলে উঠল,

— “বস!”
দানিয়েল শুধু একবার মাথা তুলল।
তার কণ্ঠে কোনো আবেগ নেই, কিন্তু চোখের ক্লান্তি স্পষ্ট।
— “Hiya injured।”
ইভানার মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
— “মিস্ট্রেস…”
হিয়ার চোখ আধখোলা। ঠোঁট ফ্যাকাশে। শ্বাসপ্রশ্বাসও আগের তুলনায় অনেক ধীর।
জ্যাক তখন দানিয়েলের উদ্দেশ্য সতর্ক কন্ঠে বললো
— “তাড়াতাড়ি ওকে জাহাজে নিয়ে আসুন।”
দানিয়েল সাবধানে হিয়াকে কাধে করেই তুলে জাহাজে উঠে এল।
ডেকে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই জ্যাক নিজের মেডিক্যাল ব্যাগ খুলে ফেলল। তার মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই বদলে গেছে। এখন সে আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের একজন সদস্য নয়।
সে একজন চিকিৎসক।
একসময় আন্তর্জাতিক পর্যায়ের খ্যাতিমান সার্জন ছিল জ্যাক। কিন্তু বহু বছর আগে কোনো এক কারনে নিজের ইচ্ছায় সেই পরিচয় ছেড়ে দানিয়েলের দলে যোগ দিয়েছিল। এরপর থেকে প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে গ্যাংস্টার, আর টিমের কেউ আহ/ত হলে ব্যক্তিগত চিকিৎসক—দুই ভূমিকাই সমান দক্ষতায় পালন করে আসছে।
জ্যাক দ্রুত গ্লাভস পরে হিয়ার কপালে বাধা রুমালটা খুলে ক্ষতটা পরীক্ষা করল। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে সে বলল,

— “মাথায় আঘাতটা গভীর। অনেকটা রক্তক্ষরণ হয়েছে।”
সে সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে ক্ষত পরিষ্কার করতে শুরু করল। তারপর ইভানার দিকে না তাকিয়েই বলল,
— “স্টেরাইল স্যালাইন… গজ… আর সেলাইয়ের কিট। দ্রুত।”
— “ইয়েস!”
ইভানা দেরি না করে সবকিছু এগিয়ে দিল।
জ্যাক নিখুঁত হাতের কাজে ক্ষত পরিষ্কার করতে লাগল। হিয়া ব্যথায় সামান্য কেঁপে উঠলেও কোনো শব্দ করল না।জ্যাক নিচু স্বরে বলল,
— “গুড….এখনও ব্যথা অনুভব করছে।”
দানিয়েল পুরো সময়টা একদৃষ্টিতে হিয়ার দিকেই তাকিয়ে রইল।তার চোখে সেই ঠান্ডা কঠোরতা থাকলেও, টিমের সবাই বুঝতে পারছিল—
এই মুহূর্তে তার সবচেয়ে বড় যুদ্ধ কোনো শত্রুর সঙ্গে নয়। হিয়াকে সুস্থ রাখার সঙ্গে।

এদিকে…লন্ডনের পাঁচ তারকা বিলাসবহুল লাক্সারিজ হোটেলের একটি ব্যক্তিগত প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট।ৎভারী কাঠের টেবিলের ওপর রাখা ক্রিস্টালের গ্লাসটা প্রচণ্ড শক্তিতে ছুড়ে মারল আসাদ খান।
ঝনঝন একটা শব্দ করে মুহূর্তের মধ্যে কাচের টুকরো ছড়িয়ে পড়ল পুরো ঘরে। তার চোখ দুটো রাগে রক্তিম হয়ে উঠেছে।
সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে তার কয়েকজন বিশ্বস্ত লোক। একজন কাঁপা গলায় বলল,
— “ব… বস… ভাইপার আমাদের পুরো অপারেশন নষ্ট করে দিয়েছে।”
আরেকজন দ্রুত যোগ করল,
— “গুদামে থাকা সব লোকও মা/রা গেছে। যারা বোটে ছিল… তারাও কেউ বেঁচে নেই।”
কথাটা শেষ হতেই আসাদ খানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে টেবিলে মুঠি আঘাত করে গর্জে উঠল,
— “অসম্ভব!”
তার চোখে জ্বলছে দাউ দাউ আগুন।
— “একটা মেয়ে… আমার বছরের পর বছর গড়া সাম্রাজ্যে আঘাত করবে?”
সে দাঁত চেপে বলল,

— “ভাইপার…”
নামটা উচ্চারণ করতেই তার কণ্ঠে বিষ ঝরে পড়ল।
— “ওকে আমি বেঁচে থাকতে দেব না।”
কক্ষে নেমে এলো চাপা নীরবতা। ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আয়মান ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময়।
— “ভাইপার…?”
সে অবিশ্বাসের সুরে বলল,
— “না… এটা হতে পারে না।”
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে আবার বলল,
— “সে এটা কেন করবে?”
আয়মানের চোখে এবার শুধু বিস্ময় নয়, দ্বিধাও ফুটে উঠল।
“ব্লু স্টার ডায়মন্ডটা তো সে আমাদের হাতে তুলে দিতেও রাজি.. তাহলে হঠাৎ আমাদের পুরো অপারেশন ধ্বংস করল কেন?”

সে মনে মনে হিসাব মেলানোর চেষ্টা করল।
“নাকি এতদিন ধরে ভাইপার আমাদেরকে ধোঁকা দিয়েছে?”
তার ভেতরে প্রশ্নের পর প্রশ্ন জমতে লাগল।শেষ পর্যন্ত সে মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিল। না… অন্য কারও কথা শুনে সিদ্ধান্ত নেবে না। সে নিজেই ভাইপারের সঙ্গে দেখা করবে।
নিজের চোখে তাকিয়ে জানতে চাইবে—সে আসলে কোন খেলাটা খেলছে।
এদিকে আসাদ খান ঠান্ডা চোখে তার দিকে তাকাল।
— “তুই এখনও ওকে হালকাভাবে নিচ্ছিস, আয়মান।”
সে ধীরে ধীরে নিজের সিটে বসল।
— “আজ ও আমার সাম্রাজ্যে আঘাত করেছে।”
একটু থেমে তার ঠোঁটে নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল।
— “এবার আমি ওর জীবনে এমন আঘাত করব… যেটা থেকে ও কোনোদিন আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না।”
আসাদ খানের চোখে তখন শুধু প্রতিশোধের আগুন।
আর আয়মানের মনে তখন একটাই প্রশ্ন—”ভাইপার… তুমি আসলে কার পক্ষে?”

কয়েক ঘণ্টা পর…
টাউন হাউসের আন্ডারগ্রাউন্ড অপারেশন রুমে একে একে উপস্থিত হলো দানিয়েলের পুরো টিম।
মার্ক, জ্যাক, ইভানা—সবার শরীরেই লড়াইয়ের ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু কারও চোখে স্বস্তি নেই।
দানিয়েল কনফারেন্স টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার সামনে ছড়িয়ে রাখা সমুদ্রপথের ম্যাপ, বিভিন্ন বন্দর, শিপিং রুট আর নিরাপদ ট্রানজিট পয়েন্টের নকশা।
সে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “রিপোর্ট।”
মার্ক সামনে এগিয়ে এলো।
— “বোটটা নিরাপদে আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। অস্ত্র, নগদ অর্থ আর পুরো চালান অক্ষত আছে।”
ইভানা কথা যোগ করে বললো,

— “আসাদের লোকদের কোনো ট্র্যাকার বা বিস্ফোরকও পাইনি। আপাতত সবকিছু নিরাপদ।”
দানিয়েল কয়েক সেকেন্ড নীরবে ম্যাপের দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর শান্ত গলায় বলল,
— “এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—এই চালান দুবাইয়ের সারপেন্ট হাউসে পৌঁছাবে কীভাবে।”
মার্ক ম্যাপের ওপর একটি সমুদ্রপথ দেখিয়ে বলল,
— “আমরা যদি সরাসরি দুবাইয়ের দিকে যাই, আসাদের লোকজন সহজেই রুট ধরে ফেলবে।”
জ্যাক মাথা নাড়ল সম্মতি বোঝাতে।
— “শুধু আসাদ না। কোস্টগার্ড, কাস্টমস, এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বী সিন্ডিকেটও নজর রাখতে পারে।”
দানিয়েল ঠান্ডা গলায় বলল,
— “তাই সরাসরি কিছুই যাবে না।”
সে ম্যাপে আঙুল রেখে কয়েকটি আলাদা রুট দেখাল।

— “চালান ভাগ হবে।”
— “অস্ত্র এক রুটে।”
— “নগদ অর্থ অন্য রুটে।”
— “আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ…” সে নিজের পকেট থেকে পেনড্রাইভটা বের করল।
“…এটা আমার কাছেই থাকবে।”
মার্ক জিজ্ঞেস করল,
— “বস, তাহলে বাকি মাল?”
দানিয়েল শান্তভাবে উত্তর দিল,
— “তিনটি ভিন্ন পরিচয়ে, তিনটি আলাদা কার্গো হিসেবে পাঠানো হবে। কেউ বুঝতেই পারবে না এগুলো একই চালানের অংশ।”
ইভানা হালকা হেসে বললো।

— “যদি একটা ধরা পড়েও…”
দানিয়েল তার কথা শেষ কার আগেই বললো.
— “বাকি দুটো নিরাপদে পৌঁছে যাবে।”
কক্ষের সবাই সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।
ঠিক তখনই দানিয়েলের চোখ চলে গেল কাঁচের দেয়ালের ওপারে থাকা মেডিকেল রুমের দিকে।
সেখানে জ্যাকের চিকিৎসার পর হিয়া গভীর ঘুমে অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছে।দানিয়েল কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে নিচু গলায় বলল,
— “এই অপারেশনের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হবে… কিন্তু তার আগে হিয়াকে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে হবে।”
তার কণ্ঠে কোনো আবেগ ছিল না।তবু টিমের প্রত্যেকেই বুঝতে পারল—এই মিশনের চেয়েও বড় দায়িত্ব এখন দানিয়েলের কাছে একজন মানুষকে সুস্থ করে তোলা।

অন্যদিকে হায়াস ম্যানশনের দ্বিতীয় তলার নিজের প্রশস্ত কক্ষে বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় ছিল মায়া। হঠাৎ করেই তার পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হওয়ায় দ্রুত একজন ডাক্তারকে ডেকে আনা হয়।
কিছুক্ষণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তার আশ্বস্ত করে বললেন,
— “ভয়ের কিছু নেই। সম্ভবত খাবারের কারণেই পেটের সমস্যা হয়েছে। আমি কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি। নিয়মমতো খেলে ঠিক হয়ে যাবে।”
কথা শেষ করে ডাক্তার কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ডাক্তার চলে যেতেই চারপাশটা নীরবে হয়ে এলো।
মায়ার বিছানার পাশেই বসে ছিল লিওন। আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল অ্যামেলিয়া।
মায়া ধীরে ধীরে লিওনের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,

— “লিও ভাইয়া…”
— “হুম?”
মায়ার চোখ ভিজে উঠল।
— “আমি কি… এভাবেই সারাজীবন বিছানায় পড়ে থাকব?”
প্রশ্নটা শুনে লিওনের চোখ নরম হয়ে এলো। সে মায়ার হাতটা আলতো করে নিজের হাতে নিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— “কখনোই না।”
একটু থেমে আবার বলল,
— “লন্ডনের সেরা অর্থোপেডিক সার্জন দিয়ে তোর পায়ের সার্জারি করানো হবে। যা-ই লাগুক, আমি করাব। তুই আবার নিজের পায়ে হাঁটবি।”
মায়ার চোখে আশার ঝিলিক ফুটে উঠল।
লিওন হালকা হেসে বলল,

— “আর একটা খবর আছে।”
— “কি?”
— “কাল থেকেই তুই কলেজে যাবি। প্রিন্সিপালের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। সব ব্যবস্থা করা হয়ে গেছে।”
মায়া বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
লিওন আবার বলল,
— “কলেজটা যেহেতু হায়াস ম্যানশন থেকে খুব বেশি দূরে নয়, তাই প্রতিদিন আমি নিজেই তোকে কলেজে পৌঁছে দেব। আর ক্লাস শেষ হলে তোকে নিয়ে আসার জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দেব।”
মায়ার চোখ বেয়ে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
— “ধন্যবাদ… লিও ভাইয়া।”
লিওন স্নেহভরে তার মাথায় হাত রেখে বলল,
— “ধন্যবাদ বলার দরকার নেই। তুই শুধু বিশ্বাস রাখ এই বিছানায় তোর জীবন শেষ হয়ে যায়নি। সামনে তোর জন্য আরও অনেক সুন্দর দিন অপেক্ষা করছে।”

রাতের বেলায় লন্ডনের আকাশ তখন গভীর অন্ধকারে ঢেকে গেছে। শহরের অসংখ্য আলো দূর থেকে ঝলমল করছে। হায়াস ম্যানশনের বিশাল ডাইনিং হল ঝাড়বাতির সোনালি আলোয় আলোকিত। দিনের ব্যস্ততা শেষে পরিবারের সবাই রাতের খাবারের টেবিলে একত্র হয়েছে।
টেবিলের প্রধান আসনে বসে আছেন আর্থার হায়াস। তার ডান পাশে লিওন, পাশে রুদ্রনীল। অন্যদিকে বসে আছেন লিওনের মা, অ্যামেলিয়া, মায়া।
কিছুক্ষণ নীরবে খাবার চলার পর আর্থার হায়াস কাঁটা-চামচ নামিয়ে লিওনের দিকে তাকালেন।
— “লিওন, একটা কথা ছিল।”
— “জি, ড্যাড?”
আর্থার হায়াস শান্ত গলায় বললেন,
— “তোমার আর মায়ার বিয়ের বিষয়টা আর কতদিন পিছিয়ে রাখবে? আগেরবার যা হয়েছে সেটা দুঃখজনক, কিন্তু জীবন তো থেমে থাকে না। এবার অন্তত বিয়ের কথা ভেবে দেখো।”
পুরো টেবিল নিস্তব্ধ হয়ে গেল। লিওন ধীরে ধীরে গ্লাসটা নামিয়ে বাবার দিকে তাকাল।
— “ড্যাড… একবার বিয়ে করতে গিয়েই একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে। আমি আর সেই ভুল দ্বিতীয়বার করতে চাই না।”
তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে কঠোর হয়ে উঠল।

— “ভাইপারের কেস শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি বিয়ের কথা ভাবব না। প্লিজ… এখন এই বিষয়টা আর তুলবেন না।”
কথাটা বলে সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে মায়ার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।
— “আর একটা কথা… কাল থেকে মায়া কলেজে যাবে। প্রিন্সিপালের সঙ্গে সব কথা হয়ে গেছে। কলেজ যেহেতু খুব বেশি দূরে নয়, প্রতিদিন আমি নিজে ওকে পৌঁছে দেব। আর ছুটি হলে গাড়ি গিয়ে নিয়ে আসবে।”
লিওনের কথা শেষ হতেই তার মা আনন্দে হেসে উঠলেন।
— “এটাই তো চাইছিলাম। এতদিন পর মায়া আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে। ঘরে বসে বসে ওর মনটাই খারাপ হয়ে যাচ্ছিল।”
অ্যামেলিয়ার মুখেও উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল সে বললো— “অবশেষে একটা ভালো খবর শুনলাম। কলেজে গেলে ওর মনও ভালো থাকবে, নতুন মানুষদের সঙ্গে মিশতে পারবে। খুব ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছিস, লিওন।”
টেবিলের পরিবেশ মুহূর্তেই কিছুটা স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠল। কিন্তু সেই শান্ত পরিবেশের আড়ালে কেউই বুঝতে পারেনি অদূর ভবিষ্যতে তাদের জীবনে আরও ভয়ংকর এক ঝড় অপেক্ষা করছে।

পরেরদিন লন্ডনের নির্মল সকাল। সূর্যের কোমল আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে হায়াস ম্যানশনের বিশাল বাগানে। শিশিরভেজা ঘাসের ওপর আলো পড়তেই ছোট ছোট হীরের মতো ঝলমল করছে।
ড্রাইভওয়ের সামনে কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। ইঞ্জিন ইতোমধ্যেই চালু। আজ লিওন নিজেই মায়াকে কলেজে পৌঁছে দেবে।
কালো শার্ট, ডেনিম জ্যাকেট আর চোখে সানগ্লাস পরে লিওন গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কিছু মেসেজ চেক করছিল।
ঠিক তখনই ম্যানশনের প্রধান দরজা খুলে বেরিয়ে এল অ্যামেলিয়া। সে সাবধানে হুইলচেয়ার ঠেলে মায়াকে নিয়ে বাগানের দিকে এগিয়ে আসছে। মায়ার মুখে আজ অনেকদিন পর একটুখানি উচ্ছ্বাস। নতুন করে কলেজে যাওয়ার আনন্দ তার চোখেমুখে স্পষ্ট।
লিওন ফোনটা পকেটে রেখে তাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

— “রেডি?”
মায়া হেসে মাথা নাড়ল।
— “হ্যাঁ, লিও ভাইয়া।”
মায়াকে গাড়িতে বসিয়ে দেয়ার পর পরই, ঠিক সেই মুহূর্তেই বাতাস কেঁপে উঠল। উপরে কোথা থেকে যেন বজ্রগতিতে নিচে নেমে এলো ভাইপারের বিশাল সোনালি ঈগল “শ্যাডো”
কারও কিছু বোঝার আগেই ঈগলটি সরাসরি লিওনের ডান হাত লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ছররাক একটা শব্দ করে তার ধারালো নখ লিওনের হাত গভীরভাবে আঁচড়ে দিল।
— “আহ!”
রক্ত সঙ্গে সঙ্গে গড়িয়ে পড়তে লাগল। পরের মুহূর্তেই ঈগলটি ডানা মেলে আবার আকাশের অনেক ওপরে উঠে গেল।
লিওন কপাল কুঁচকে নিজের হাতের রক্তের দিকে একবার তাকাল। তারপর বিরক্ত হয়ে সানগ্লাস খুলে আকাশের দিকে চোখ তুলে দূরে উড়ে যাওয়া শ্যাডোকে দেখে দাঁত চেপে বলল,
— “Shit! ওই পাজি ঈগলটা এটা কী করল?”
সে আহত হাতটা চেপে ধরে বিরক্ত গলায় আবার বলে উঠল,— “ওকে আর একবার হাতের সামনে পাই… তারপর দেখাচ্ছি! অসভ্য জানোয়ার!”
দূরে আকাশে শ্যাডো একবার চক্কর দিয়ে আবার মেঘের আড়ালে মিলিয়ে গেল।

এদিকে, টাউন হাউস…
সকালের কোমল আলো ধীরে ধীরে টাউন হাউসের বিশাল বারান্দা ভরে তুলেছে। দূরের সমুদ্রের ঢেউগুলো শান্ত ছন্দে তীরে আছড়ে পড়ছে, আর নোনতা বাতাস পুরো পরিবেশকে আরও নিস্তব্ধ করে তুলেছে।
দানিয়েল নিজের রুম থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। এক হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ, অন্য হাতটা পকেটে। গভীর দৃষ্টিতে সে দূরের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে, পরবর্তী পরিকল্পনাগুলো মনে মনে সাজিয়ে নিচ্ছে।
ঠিক তখনই—
পরিচিত ডানার শব্দ ভেসে এলো।
মুহূর্তের মধ্যেই আকাশ চিরে নেমে এল সোনালি ঈগল শ্যাডো। কোনো দ্বিধা ছাড়াই সে এসে দানিয়েলের কাঁধে বসে পড়ল। আজ তার আচরণটাঅন্য দিনের চেয়ে আলাদা। সে নিজের মাথাটা আলতো করে দানিয়েলের গালের সঙ্গে ঘষে দিল। তারপর ঠোঁট দিয়ে খুব হালকাভাবে দানিয়েলের গাল ছুঁয়ে দিল, মনে হলো নিজের মতো করে স্নেহ প্রকাশ করছে।
দানিয়েল হালকা হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

— “কী হলো, শ্যাডো? আজ এত আদর কিসের?”
শ্যাডো একবার মৃদু শব্দ করল। তারপর ডানা মেলে আবার উড়ে গেল করিডোরের শেষ প্রান্তে থাকা আরেকটি কক্ষের দিকে।
হিয়ার রুমে।
রুমের ভেতর পর্দার ফাঁক দিয়ে সকালের আলো বিছানার ওপর পড়েছে। হিয়া ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
গতরাতে জ্যাক তাকে শক্তিশালী ঘুমের ওষুধ দিয়েছিল, যাতে শরীরটা সম্পূর্ণ বিশ্রাম পায়। দীর্ঘ সময় গভীর ঘুমে থাকার পর এখন তার জ্ঞান পুরোপুরি ফিরেছে।
চোখ খুলেই সে কিছুক্ষণ সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। শরীর এখনও দুর্বল, তবে আগের তুলনায় অনেকটা স্বস্তি অনুভব করছে।
ঠিক তখনই খোলা জানালা দিয়ে উড়ে এসে শ্যাডো বিছানার পাশে নরমভাবে বসে পড়ল।
হিয়া হাসল। আলতো করে হাত বাড়িয়ে ঈগলটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
— “কোথা থেকে এলি এই সময়ে?…”
শ্যাডো শান্তভাবে তার দিকে তাকিয়ে রইল, মনে হলো সে নিশ্চিত হতে চাইছে—তার সঙ্গিনী এখন সত্যিই নিরাপদ।

এদিকে সকালের আলো ফুটতে না ফুটতেই পুরো লন্ডন বিশৃঙ্খলায় ডুবে গেল। টেলিভিশনের প্রতিটি নিউজ চ্যানেলে একটাই ব্রেকিং নিউজ—
> “লন্ডনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মানবপাচার ও অস্ত্র চক্রের গোপন তথ্য ফাঁস!”
> “শতাধিক অপহৃত তরুণীর জবানবন্দি— মূল হোতা বাংলাদেশ বিজনেস ম্যান আসাদ খান!”
> “CID, MI5 এবং মেট্রোপলিটন পুলিশ যৌথ অভিযানে নামছে!”
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম—সর্বত্র শুধু একটাই নাম ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আসাদ খান।
দানিয়েল রাতভর যে পেনড্রাইভের ডেটা বিশ্লেষণ করেছিল, সেখানে থাকা প্রতিটি ভিডিও, ব্যাংক ট্রানজেকশন, পাচারের রুট, অস্ত্র চুক্তি, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের নাম এবং ভুক্তভোগীদের তথ্য সে একসঙ্গে নিরাপদ সার্ভারের মাধ্যমে অনলাইনে প্রকাশ করে দিয়েছে।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে।
যেসব মেয়েকে বছরের পর বছর অপহরণ করে আটকে রাখা হয়েছিল, তাদের অনেকেই পুলিশের নিরাপত্তায় এসে একের পর এক সাক্ষ্য দিতে শুরু করে।

কারও চোখে অশ্রু, কারও কণ্ঠে ভয়, কিন্তু সবার বক্তব্য একটাই—— “এই সবকিছুর পেছনে আসাদ খান।”
ফলাফল—পুরো লন্ডনজুড়ে রেড অ্যালার্ট জারি করা হলো।
মেট্রোপলিটন পুলিশ, CID, ইন্টেলিজেন্স ইউনিট— সবাই আসাদ খানকে গ্রেপ্তারের জন্য শহরের প্রতিটি সম্ভাব্য জায়গায় নজরদারি শুরু করল।
অপরদিকে, লন্ডনের সেই বিলাসবহুল হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটে বসে আছে আসাদ খান।
তার সামনে টেলিভিশনের স্ক্রিনে একের পর এক নিউজ ভেসে উঠছে। প্রতিটি সংবাদই তার সাম্রাজ্যের পতনের ঘোষণা। রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে।
হাতে ধরা ক্রিস্টালের গ্লাসটা মুহূর্তেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে মেঝেতে পড়ল।

— “ভাইপার…”
সে দাঁত চেপে ফিসফিস করল।— “তোকে আমি ছাড়বো না।”
এখন তার পক্ষে লন্ডন ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়াও অসম্ভব। এয়ারপোর্ট, সমুদ্রবন্দর, সীমান্ত— সর্বত্র তার ছবি পৌঁছে গেছে।
পুলিশের নজরদারি এড়িয়ে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। আর এই সবকিছুর জন্য সে একমাত্র একজনকেই দায়ী করছে—ভাইপার। তার চোখে তখন শুধু প্রতিশোধের আগুন।

লন্ডন CID সদর দপ্তর।
সকাল থেকেই পুরো ভবনটা অস্বাভাবিক ব্যস্ত।
বড় কনফারেন্স রুমের বিশাল স্ক্রিনে একের পর এক ছবি ভেসে উঠছে ধ্বংস হয়ে যাওয়া গুদামঘর, পুড়ে যাওয়া বোট, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লা/শ, আর নিউজ চ্যানেলের লাইভ সম্প্রচার।
টেবিল ঘিরে বসে আছে লন্ডন CID-এর সিনিয়র অফিসাররা। সবার মুখেই একই প্রশ্ন।
ভাইপার আসলে কী করছে?
একজন অফিসার ফাইল বন্ধ করে বলল,
— “মোট ৩৬টা লা/শ উদ্ধার হয়েছে।”
আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,
— “সবাই আসাদ খানের লোক।”

রুমে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এল। একজন সিনিয়র ইনভেস্টিগেটর ধীরে ধীরে বললেন,
— “যদি তথ্য ঠিক হয়… তাহলে আসাদ খান তো ভাইপারেরই লোক হওয়ার কথা।”
আরেকজন ভ্রু কুঁচকে বলল,— “লোক না… আত্মীয়। শুনেছি আসাদ খান ভাইপারের চাচা।”
কথাটা শুনে সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
পুরো ঘটনাটা কোনোভাবেই মিলছে না।
— “তাহলে ভাইপার নিজের লোকদেরই কেন শেষ করবে?”
— “নিজের চাচার সাম্রাজ্য নিজেই ধ্বংস করল কেন?”
— “নাকি আন্ডারওয়ার্ল্ডে ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়েছে?”
একটার পর একটা প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হলেও কারও কাছেই কোনো উত্তর নেই। ঠিক তখনই আরেকজন অফিসার দ্রুত ভিতরে ঢুকে একটি রিপোর্ট টেবিলে রাখল।

— “স্যার… ঘটনাস্থলের পুরো এলাকা আবার তল্লাশি করা হয়েছে।”
সবার দৃষ্টি তার দিকে ঘুরে গেল।
— “লা/শ পাওয়া গেছে… কিন্তু অস্ত্রের চালান নেই।”
সে আরেকটি ফাইল খুলে বলল,— “নগদ টাকাও নেই।”
— “এমনকি ব্ল্যাক মার্কেটের জন্য প্রস্তুত করা মূল্যবান মালামালেরও কোনো চিহ্ন নেই।”
রুমে আবারও নীরবতা ফিরে এলো তখনই একজন অফিসার ধীরে ধীরে বলল,
— “মানে… কেউ সব সরিয়ে নিয়েছে।”
সিনিয়র অফিসার চেয়ারে হেলান দিয়ে গভীর স্বরে বললেন,
— “সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যক্তি একজনই।”
তিনি স্ক্রিনে ভেসে থাকা একটি ছবির দিকে তাকালেন।
ভাইপার।

— “আসাদের লোকদের হ/ত্যা করেছে… আর অস্ত্র, টাকা ও পুরো চালান নিজের দখলে নিয়েছে।”
আরেকজন মাথা নাড়ল।— “এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে এখন লন্ডনের সবচেয়ে বিপজ্জনক অপরাধী শুধু আসাদ খান নয়…”
সে থেমে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,— “ভাইপারও।”
কনফারেন্স রুমে আবার চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল।
কারণ এখন CID-এর ধারণা—আসাদ খানের সাম্রাজ্যে আঘাত হেনে, তার সমস্ত সম্পদ দখল করে নিয়েছে ভাইপার।
কিন্তু কেউই জানে না…এই ঘটনার পেছনে আসলে লুকিয়ে আছে আরও বড় এক সত্য, যা এখনও তাদের অজানা।

ইম্পেরিয়াল কলেজ অব লন্ডন।
সকালের নরম রোদে পুরো ক্যাম্পাস মুখরিত। চারদিকে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত আনাগোনা, কেউ ক্লাসে যাচ্ছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে আছে।
ঠিক তখনই কলেজের সামনে এসে থামল একটি কালো বিলাসবহুল গাড়ি।
গাড়ি থেকে আগে নামল লিওন।
তারপর খুব সাবধানে দরজা খুলে মায়ার হুইলচেয়ার বের করল। এক হাতে হুইলচেয়ার ধরে, অন্য হাতে মায়াকে সামলে বসিয়ে দিল।
দৃশ্যটা দেখে আশপাশের অনেক শিক্ষার্থী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।কেউ ফিসফিস করে বলল,

— “ওই তো সিআইডি অফিসার লিওনার্দো হায়াস!”
— “নিজে মায়াকে কলেজে পৌঁছে দিতে এসেছে!”
লিওন এসবের দিকে একবারও তাকাল না। ধীরে ধীরে হুইলচেয়ার ঠেলে মায়াকে তার ক্লাসরুম পর্যন্ত নিয়ে গেল।
ক্লাসরুমে ঢুকতেই মায়ার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছুটে এল।
— “মায়া!”
— “তুই কেমন আছিস?”
তাদের চোখে স্পষ্ট উদ্বেগ।
লিওন শান্ত গলায় বলল,
— “মায়া এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। ওকে বেশি হাঁটতে দেওয়া যাবে না। তোমরা একটু খেয়াল রেখো। কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ফোন করবে।”
মেয়েগুলো একসঙ্গে মাথা নাড়ল।

— “আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা আছি।”
লিওন মায়ার মাথায় আলতো করে হাত রেখে বলল,
— “ক্লাস শেষ হলে ড্রাইভার এসে নিয়ে যাবে। কোনো জেদ করবি না।”
মায়া মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।— “ঠিক আছে, লিও ভাইয়া।”
এরপর লিওন সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।সে চলে যেতেই মায়ার বন্ধুরা তাকে ঘিরে ধরল।একজন চোখ ভিজে যাওয়া কণ্ঠে বলল,
— “তোর এমন অবস্থা হয়ে গেছে… ভাবতেই খারাপ লাগছে।”
আরেকজন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।— “আমরা যখন খবরটা শুনেছিলাম, বিশ্বাসই করতে পারিনি।”
মায়া শুধু হালকা হাসল।আরেকজন পরিবেশটা একটু হালকা করার চেষ্টা করে বলল,

— “তবে একটা দিক থেকে ভালোই হয়েছে।”
সবাই তখন তার দিকে তাকাল।সে দুষ্টু হেসে বলল,
— “এখন থেকে তোর লিও ভাইয়া তোকে আগের চেয়ে আরও বেশি আদর করবে।”
কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠল।মায়াও মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— “আর আদর!”
সে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— “ভাইয়ার যে প্রফেশন… তাতে বাড়ির মানুষের সঙ্গে ঠিকমতো বসে গল্প করারও সময় হয় না। সারাদিন কাজ, মিটিং আর কেস নিয়েই ব্যস্ত থাকে।”
ওই মুহূর্তে এক বান্ধবী বলল,— “তবুও দেখ না, এত ব্যস্ত মানুষটা আজ নিজে তোকে ক্লাসরুম পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেল।”
আরেকজন মুচকি হেসে যোগ করল,— “সবাই তো জানে অফিসার লিওন খুব কঠোর মানুষ। কিন্তু আজ দেখে মনে হলো, তোর ক্ষেত্রে সে একেবারে অন্য মানুষ।”
মায়া নিচের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— “আমার জন্য লিও ভাইয়া সবসময়ই এমন… শুধু কাজের চাপে সেটা প্রকাশ করার সুযোগ পায় না।”
কথাটা শুনে তার বন্ধুরা হাসিমুখে একে অপরের দিকে তাকাল। ক্লাস শুরু হওয়ার ঘণ্টা বাজতেই সবাই নিজ নিজ আসনে গিয়ে বসল।

লন্ডন সিআইডি হেডকোয়ার্টার।
কালো গাড়িটা এসে থামতেই লিওন দ্রুত নেমে পড়ল। সকাল থেকেই সদর দপ্তর ব্যস্ত। একের পর এক অফিসার ভেতরে ঢুকছে, কেউ আবার জরুরি ফাইল নিয়ে দৌড়াচ্ছে।
লিওন সোজা নিজের অফিসের দিকে এগিয়ে গেল।
তার ডান হাতটা পুরো সময় কোটের পকেটে রাখা। বাগানে শ্যাডোর খামচিতে যে গভীর ক্ষত হয়েছে, সেটা এখনো জ্বলছে। র/ক্তও পুরোপুরি থামেনি।
রুমে ঢুকেই সে দরজা ভেতর থেকে লক করল।
ডেস্কের ড্রয়ার খুলে ফার্স্ট এইড বক্স বের করল। তারপর ধীরে ধীরে হাতটা সামনে আনতেই ক্ষতটা স্পষ্ট দেখা গেল।গভীর নখের আঁচড়।চারপাশে জমাট বাঁধা রক্ত। লিওন বিরক্ত মুখে বিড়বিড় করল,

— “ওই অভিশপ্ত ঈগলটা… সামনে আর একবার পেলে ছাড়ব না।”
তুলায় অ্যান্টিসেপটিক লাগিয়ে ক্ষতটা পরিষ্কার করতেই তীব্র জ্বালায় তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
তবুও কোনো শব্দ করল না।পরিষ্কার করার পর দক্ষ হাতে ব্যান্ডেজ পেঁচিয়ে নিল। ব্যান্ডেজের ওপর আবার শার্টের হাতা নামিয়ে কোট পরে নিল, যেন বাইরে থেকে কিছুই বোঝা না যায়। সবকিছু গুছিয়ে ফার্স্ট এইড বক্সটা আবার ড্রয়ারে রেখে দিল।
এরপর গভীর শ্বাস নিয়ে ডেস্কের ওপর জমে থাকা ফাইলগুলোর দিকে তাকাল।আজকের দিনটা সহজ হবে না।
আসাদ খানের বিরুদ্ধে অভিযান, নতুন সাক্ষীদের জবানবন্দি, নিউজে ভাইরাল হওয়া তথ্য—সবকিছু নিয়েই পুরো সিআইডি ব্যস্ত।
লিওন চেয়ারে বসে প্রথম ফাইলটা খুলল। মুহূর্তের মধ্যেই ব্যক্তিগত সব অস্বস্তি ভুলে সে আবার দায়িত্বশীল সিআইডি অফিসারে পরিণত হলো।
এখন তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটাই কাজ—

আসাদ খানকে আইনের আওতায় আনা।
এদিকে… হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটে এখনো বসে আছেন আসাদ খান‌
টেলিভিশনের পর্দাজুড়ে আরেকটা নতুন খবর।
“আসাদ খানের অপরাধ সাম্রাজ্যের গোপন তথ্য ফাঁস! লন্ডন পুলিশ ও সিআইডির যৌথ অভিযান শুরু তাকে ধরার পথেই আছেন ইন্টারপোল।”
খবরটা শুনতেই আসাদ খানের মুখ বিকৃত হয়ে উঠল।
সে প্রচণ্ড রাগে রিমোটটা ছুড়ে মারল দেয়ালে।
রিমোটটা ভেঙে মেঝেতে পড়ে রইল।
আসাদ দাঁত চেপে বলল,— “ভাইপার…!”
— “আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল তোর সাথে ডায়মন্ড নিয়ে ডিল করা ।”
ঠিক তখনই তার এক বিশ্বস্ত লোক দ্রুত রুমে ঢুকে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

— “বস! সিআইডি এই হোটেলের আশেপাশেই তল্লাশি শুরু করেছে। বেশি সময় এখানে থাকা নিরাপদ নয়।”
আসাদ এক মুহূর্তও দেরি করল না। ঠান্ডা গলায় বলল,
— “সবাই প্রস্তুত হও। পাঁচ মিনিটের মধ্যে এই জায়গা ছাড়ছি।”
তার লোকজন দ্রুত প্রয়োজনীয় অস্ত্র, নথিপত্র আর নগদ টাকা গুছিয়ে নিতে লাগল।
কিছুক্ষণ পরই কালো রঙের কয়েকটি এসইউভি হোটেলের আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং থেকে নীরবে বেরিয়ে গেল।
মিনিট দশেক পর পুলিশ ও সিআইডি সেখানে পৌঁছালেও তারা শুধু খালি রুমই পেল।
আসাদ খান ইতোমধ্যেই আত্মগোপনে চলে গেছে।
গাড়ির পেছনের সিটে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল আসাদ।
তার চোখে তখন শুধু প্রতিশোধের আগুন।
মনে মনে সে হিসাব কষতে লাগল।
যেভাবেই হোক তাকে বাংলাদেশে পৌঁছাতে হবে।
সেখানে পৌঁছাতে পারলেই আবার নিজের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নতুন করে খেলা শুরু করতে পারবে।
কিন্তু…
নিজের মুঠি শক্ত করে সে নিচু স্বরে বলল,

— “বাংলাদেশে যাওয়ার আগে একটা কাজ শেষ করব।”
— “ভাইপারকে শাস্তি না দিয়ে আমি কোথাও যাচ্ছি না।”
তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে ভয়ংকর এক হাসি ফুটে উঠল।
— “আমার সাম্রাজ্যে আঘাত করার মূল্য… এবার ওকে জীবন দিয়ে দিতে হবে।”
গাড়ির বহরটা দ্রুত লন্ডনের ব্যস্ত সড়ক ছেড়ে অজানা এক নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে মিলিয়ে গেল।

লন্ডন হিথ্রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
দীর্ঘ ফ্লাইটের পর বিজনেস ক্লাসের যাত্রীরা একে একে নেমে আসছে।
ভিআইপি লাউঞ্জের স্বয়ংক্রিয় কাঁচের দরজা ধীরে ধীরে খুলতেই ভেতরে প্রবেশ করল এক রহস্যময়ী নারী।
তার বয়স আনুমানিক পঁয়ত্রিশ। তবে তাকে দেখলে যে কেউ সহজেই বিশ-বাইশ বছরের এক তরুণী বলে ভুল করবে।
তার পরনে নিখুঁতভাবে ফিট করা সাদা ব্লেজার স্যুট। পায়ে কালো রঙের দামি হাই হিল। কাঁধে ঝুলছে একটি বিলাসবহুল ডিজাইনার ব্যাগ, আর চোখে কালো সানগ্লাস, যা তার মুখের অর্ধেকটাই আড়াল করে রেখেছে।
ডান হাতে শুধু একটি ছোট প্রিমিয়াম ট্রাভেল লাগেজ।
তার আত্মবিশ্বাসী পদচারণায় আশপাশের অনেকেই একবার ঘুরে তাকাল। দেখেই বোঝা হচ্ছিল, তিনি কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, কিংবা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।
নারীটি শান্ত ভঙ্গিতে লাউঞ্জের বাইরে এসে থামল।
একজন কর্মচারী ভদ্রভাবে এগিয়ে এসে বলল,

— “ম্যাম, আপনার গাড়ি প্রস্তুত আছে।”
তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু হালকা মাথা নেড়ে বাইরে এগিয়ে গেলেন।
বিমানবন্দরের ভিআইপি এক্সিটের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল চকচকে কালো রঙের একটি বিলাসবহুল গাড়ি।
ড্রাইভার দ্রুত নেমে এসে সম্মানের সঙ্গে গাড়ির দরজা খুলে দিল। মহিলা ধীর পায়ে গাড়ির সামনে এসে এক মুহূর্তের জন্য লন্ডনের আকাশের দিকে তাকালেন।
তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল রহস্যময় এক হাসি।
তারপর কোনো কথা না বলে গাড়িতে উঠে বসলেন।
মুহূর্তের মধ্যেই গাড়িটি বিমানবন্দর ছেড়ে লন্ডনের ব্যস্ত সড়কের দিকে ছুটে চলল।
এখনও কেউ জানে না—এই রহস্যময়ী নারীর আগমনে লন্ডনের অন্ধকার জগতের ভাগ্যে ঠিক কী পরিবর্তন অপেক্ষা করছে।

অপরদিকে টাউন হাউসে বিকেলের নরম আলো বিশাল কাঁচের জানালা ভেদ করে পুরো ড্রয়িংরুমে ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রবেশদ্বারের সামনে গাড়িটি থামতেই নিরাপত্তারক্ষীরা দ্রুত গেট খুলে দিল।
সাদা ব্লেজার পরা রহস্যময়ী নারীটি ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। তার হাই হিলের ঠক.ঠক… শব্দে পুরো হলঘর মুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে গেল। ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল দানিয়েল।
নারীটিকে দেখেই সে থেমে গেল। অবাক না হলেও তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠল।
পরক্ষণেই ঠোঁটে হালকা বাঁকা হাসি এনে সামনে এগিয়ে গেল সে।
মহিলাও দুই হাত ছড়িয়ে এগিয়ে এলেন।
দু’জন করমর্দন করতেই মহিলা মুচকি হেসে বললেন,

— “My dear nephew.”
দানিয়েল হালকা রহস্যময় হাসল।
— “পিপি… তুমি এখানে? এই সময়? সেটাও আবার কিছু না বলেই?”
মহিলা ভান করে ভ্রু কুঁচকে বললেন,
— “ওহ্ মাই দানি! আমি যখন ইচ্ছা তখন আমার ভাতিজার কাছে আসতে পারব না নাকি? এটা আবার কেমন কথা?”
দানিয়েল মৃদু মাথা নাড়াল।
— “সেটা বলিনি। শুধু ভাবিনি তুমি হঠাৎ চলে আসবে।”
মহিলা সানগ্লাস খুলে পাশের টেবিলে রেখে সোফায় গিয়ে বসলেন। একজন স্টাফ সঙ্গে সঙ্গে তার সামনে কফি পরিবেশন করে চলে গেল।
কাপটা হাতে তুলে নিয়ে এক চুমুক দিয়ে তিনি আবার দানিয়েলের দিকে তাকালেন।
তার ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি।

— “By the way… আমি কিন্তু বেড়াতে আসিনি, দানি।”
দানিয়েলের চোখ সরু হয়ে এল।
— “তাহলে?”
মহিলা শান্ত স্বরে বললেন,
— “আমি এসেছি একটা বিশেষ কাজের জন্য। আর সেই কাজটা… শুধু তুমিই করতে পারবে।”
কথাটা বলেই তিনি সোফায় হেলান দিলেন।
আর দানিয়েল বুঝে গেল—তার পিপির এই আকস্মিক আগমনের পেছনে নিশ্চয়ই বড় কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে।
মহিলাটির নাম লেডি ভিক্টোরিয়া দানিয়েলের সৎ ফুপু হয় যাকে দানিয়েল পিপি বলেই ডাকে। রক্তের সম্পর্ক থাকলেও পারিবারিক জটিলতার কারণে ছোটবেলা থেকেই দুজনের খুব বেশি যোগাযোগ ছিল না। ব্রিটিশ অভিজাত পরিবারের সদস্য হওয়ায় তাঁর ব্যক্তিত্ব, প্রভাব ও পরিচিতি লন্ডনের উচ্চমহলে যথেষ্ট শক্তিশালী। শান্ত, মার্জিত এবং অত্যন্ত বুদ্ধিমান এই নারী খুব কমই নিজে কোথাও আসেন। তাই তাঁর হঠাৎ টাউন হাউসে উপস্থিত হওয়া স্পষ্ট করে যে, তিনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য নিয়েই এসেছেন।
ঠিক তখনই টাউন হাউসের ড্রয়িংরুমে একে একে আসলো মার্ক, ইভানা, জ্যাক এবং সবশেষে হিয়া।
ভিক্টোরিয়াকে দেখেই সবাই ভদ্রভাবে মাথা নত করে সম্মান জানাল।

— “গুড আফটারনুন, ম্যাম।”
ভিক্টোরিয়া উঠে দাড়ালো সোফা ছেড়ে তারপর হালকা মাথা নাড়লেন।
এদিকে হিয়া। সে নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।
ভিক্টোরিয়া ভ্রু তুলে দানিয়েলের দিকে তাকালেন।
— “দানি… এই মেয়েটা তো দেখছি আগের মতোই আছে। কাউকে সম্মান দিতে শেখেনি এখনও?”
একটু থেমে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে হিয়ার দিকে তাকিয়ে দানিয়েলের উদ্দেশ্য বললেন,
— “এখনও তোমার জীবনে আছে কীভাবে এই মেয়েটা?”
দানিয়েল শান্ত গলায় উত্তর দিল,
— “ও আমার টিমের একজন।”
কথা শেষ হওয়ার আগেই হিয়া দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে ধীর পায়ে এসে সোফায় বসল।
পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটে গুঁজে আগুন ধরাল। ধোঁয়া ছেড়ে নির্বিকার কণ্ঠে বলল,

— “টিমের একজন না…”
সে দানিয়েলের দিকে একবার তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকাল।
— “টিম লিডার।”
ভিক্টোরিয়ার ঠোঁটেও হালকা হাসি ফুটে উঠল।
তিনি ধীরে ধীরে হিয়ার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
— “তুমি টিম লিডার হতে পারো…”
তিনি নিজের বুকের দিকে আঙুল তুলে বললেন,
— “But I’m the Queen.”
হিয়া তখন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। দুজন এখন প্রায় মুখোমুখি। হিয়া ঠান্ডা চোখে ভিক্টোরিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আপনি নিজেকে কুইন ভাবতেই পারেন…”
তার ঠোঁটে ব্যঙ্গের হাসি ফুটল।
— “কিন্তু আসলে আপনি ‘Queen Bee’।”
ভিক্টোরিয়ার চোখ সরু হয়ে এল।হিয়া একটুও না থেমে বলল,
— “Queen Bee মানে জানেন তো?”
— “সেই রানি মৌমাছি… যে নিজের মৌচাকে শত শত পুরুষ মৌমাছির সাথে সঙ্গম করে একাই।”
মুহূর্তেই পুরো কক্ষের পরিবেশ বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল।ভিক্টোরিয়ার মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল।
— “You bloody bitch!”
রাগে হাত তুলে হিয়াকে চড় মারতে এগিয়ে গেলেন তিনি। কিন্তু তার হাত হিয়ার গালে পৌঁছানোর আগেই দানিয়েল শক্ত করে তার কবজি ধরে ফেলল।

— “পিপি!”
দানিয়েলের কণ্ঠ এবার আগের চেয়ে কঠিন।
— “আসতে না আসতেই এসব কী শুরু করলে?”
ড্রয়িংরুমের ভারী পরিবেশটা তখনও কাটেনি।
ভিক্টোরিয়া আর হিয়ার কথার লড়াইয়ের পর সবাই নীরব হয়ে বসে আছে। মার্ক, ইভানা, জ্যাক কেউই মুখ খুলছে না। দানিয়েলও বুঝতে পারছে, বিষয়টা আর অন্যদিকে নেওয়া দরকার।
সে ধীরে ধীরে সোফায় গিয়ে বসল। তারপর ভিক্টোরিয়ার দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
— “ঠিক আছে, পিপি। এবার বলো, কী কাজে এসেছ?”
ভিক্টোরিয়া কফির কাপটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন। একবার চারদিকে তাকালেন। তারপর নিচু স্বরে বললেন,
— “আমি তোমার সঙ্গে কিছু একান্ত কথা বলতে চাই, দানি।”
দানিয়েল কোনো দ্বিধা না করেই মাথা নাড়ল।
— “তার দরকার নেই।”
সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাইকে দেখিয়ে বলল,
— “They are my family. ওদের সামনেই বলতে পারো। আমার এমন কোনো সিক্রেট নেই, যেটা ওরা জানে না।”
ভিক্টোরিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর হালকা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,— “ঠিক আছে। তাহলে ওদের সামনেই বলছি।”
তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর দানিয়েলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— “তুমি জানো, তুমি শুধু আন্ডারওয়ার্ল্ডের একজন কিং নও। তুমি ব্রিটিশ রয়্যাল ফ্যামিলিরও একজন সদস্য…একজন রয়্যাল প্রিন্স।”
কক্ষে উপস্থিত সবাই মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছে।
ভিক্টোরিয়া আবার বললেন,
— “ব্রিটিশ রয়্যাল সার্কেলের আরেকটি প্রভাবশালী রয়্যাল পরিবারের একজন রয়্যাল প্রিন্সেসের সঙ্গে তোমার বিয়ের প্রস্তাব এসেছে।”
তিনি একটু থেমে আবার বললেন,
— “এটা শুধু একটা বিয়ে নয়। দুই রয়্যাল পরিবারের মধ্যে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক জোট। এই জোট হলে মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক… বিশেষ করে দুবাইয়ের বড় অংশ তোমার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।”
কথা শেষ হতেই দানিয়েল কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর হঠাৎই হেসে ফেলল। সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে ভিক্টোরিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

— “Are you serious?”
— “আমি বিয়ে করব?”
— “তুমি সত্যিই এটা ভেবেছ?”
ভিক্টোরিয়া ঠোঁটে হালকা হাসি এনে বললেন,
— “এত অবাক হওয়ার কিছু নেই। বিয়েটা শুধু কাগজে-কলমে হবে। তোমাদের ব্যক্তিগত জীবনে কেউ হস্তক্ষেপ করবে না। এর বদলে পুরো দুবাইয়ের ব্যবসায়িক ক্ষমতা তোমার হাতের মুঠোয় চলে আসবে।”
দানিয়েল এবার সোফার পেছনে হেলান দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— “পিপি…”
— “পুরো একটা রাষ্ট্রই আমার হাতের মুঠোয়। সেখানে দুবাই নিয়ে আমার লোভ দেখানোর দরকার নেই।”
ভিক্টোরিয়া বিরক্ত হয়ে কপালে হাত ঠেকালেন।
— “উফ, দানি! তুমি সবকিছু এত কঠিন করে দেখো কেন?”
ঠিক তখনই এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা হিয়া ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল। দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে ভিক্টোরিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

— “বসের বিয়ে নিয়ে আপনার এত চিন্তা কেন?”
ভিক্টোরিয়া এক মুহূর্তও দেরি না করে উত্তর দিলেন,
— “কারণ আমি ওর ফুপু।”
হিয়া ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলল,
— “Step aunt.”
ভিক্টোরিয়ার মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল।
তিনি আঙুল তুলে বললেন, — “এই মেয়ে, বড়দের কথার মাঝে কথা বলবে না।”
হিয়া নির্বিকার। সে ধীরে ধীরে সোফার হাতলে হেলান দিয়ে বলল,— “বস কেন এমন একজনকে বিয়ে করবে, যাকে সে চেনে না, জানে না… যার সঙ্গে তার কোনো ভালোবাসাই নেই?”
ভিক্টোরিয়া ব্যঙ্গের হাসি হাসলেন।

— “How funny!”
— “ভালোবাসা?”
— “এই আন্ডারওয়ার্ল্ডে ভালোবাসা শব্দটা একদমই মানায় না।”
তিনি চোখ সরু করে হিয়ার দিকে তাকালেন।
— “তুমি দেখছি এখনও সেই আগের হিয়াই আছো।”
হিয়া বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে উত্তর দিল,
— “মানুষের মনের সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্পর্কটা কোথায়?”
— “অপরাধী হলেই কি তার অনুভূতি থাকবে না? ভালোবাসতে পারবে না?”
কথাটা বলেই সে দানিয়েলের দিকে একবার তাকাল।
কক্ষের পরিবেশটা আবার ভারী হয়ে উঠল। দানিয়েল বুঝতে পারল, আর কয়েক সেকেন্ড এভাবে চললে নতুন করে বড় ঝামেলা শুরু হবে।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল।

— “Enough.”
তারপর ভিক্টোরিয়ার দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,— “পিপি, আমার সঙ্গে আসো।”
ভিক্টোরিয়া শেষবারের মতো হিয়ার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। হিয়াও সমান নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এরপর দানিয়েল ভিক্টোরিয়াকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরের ব্যক্তিগত স্টাডি রুমের দিকে চলে গেল। নিচে বসে থাকা বাকিরা বুঝতে পারল এই আলোচনার শেষ এখানেই নয়। সামনে আরও বড় কিছু অপেক্ষা করছে।

স্টাডি রুমের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করতেই চারদিকে নীরবতা নেমে এল। দানিয়েল ধীরে ধীরে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিচে বিস্তীর্ণ বাগানের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল,
— “পিপি… আমার ইতোমধ্যেই যথেষ্ট ক্ষমতা আছে। আরও ক্ষমতার জন্য আমাকে বিয়ে করতে হবে না। আর আমি এই বিয়ে করব না।”
ভিক্টোরিয়া ধীরে ধীরে সোফায় বসলেন। ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
— “তুমি কেন বিয়ে করবে না… সেটা বোধহয় আমি জানি।”
দানিয়েল ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল।
— “কী বলতে চাইছ?”
ভিক্টোরিয়া মৃদু হেসে বললেন,

— “তোমার ওই বাঘিনীর জন্য তাইনা? কিন্তু তুমি তাকে যে চোখে দেখো, তোমার বাঘিনীও কি তোমাকে একই চোখে দেখে?।”
কথাটা শুনেই দানিয়েলের চোখে ক্ষণিকের বিস্ময় ফুটে উঠল।
— “মানে… আমি হিয়াকে কোন চোখে দেখি?”
ভিক্টোরিয়া সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠলেন।
— “মজার ব্যাপার কি জানো?”
— “আমি কিন্তু হিয়ার নাম একবারও বলিনি। শুধু তোমার ‘বাঘিনী’ বলেছি। অথচ তুমিই সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেলে আমি কার কথা বলছি।”
তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে দানিয়েলের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
— “তাহলে বলো, চিরভয়ংকর সেই বাঘিনীটাই আসল কারন বিয়ে না করার ?”
দানিয়েল চোখ ফিরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল।
— “এসব অহেতুক কথা কোথা থেকে পাও, পিপি?”
ভিক্টোরিয়ার মুখের হাসিটা আরও গাঢ় হলো।
— “অহেতুক?”
তিনি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন,
— “তাহলে বলো তো… দুবাইয়ের সারপেন্ট পেন্টহাউসে এখনও সেই হুডিটা কেন এত যত্ন করে রেখে দিয়েছ?”

— “আট বছর হয়ে গেছে। র/ক্ত লেগে আছো তবুও ওটা ধুতে দাওনি। সার্ভেন্টরা যতবার ধুতে চেয়েছে, ততবারই তুমি নিষেধ করেছ। কেন?”
দানিয়েলের মুখের শান্ত ভাবটা মিলিয়ে গেল।
সে কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ রইল। তারপর ধীরস্বরে বলল,
— “কারণ…”
— “সেই হুডিটা আমাকে নতুন প্রাণ দিয়েছিল। নতুন জীবন দিয়েছিল সেদিন তাই।”
ভিক্টোরিয়া এবার আরেক ধাপ এগিয়ে এলেন।
— “তাহলে সেই ফোনটা?”
— “যেটা ওইদিন তোমার সঙ্গে ছিল?”
— “হাসপাতালের রিসেপশনে যে হিয়া ফোনটা জমা দিয়েছিল… সেই ফোনটাও তো আজ পর্যন্ত ব্যবহার করোনি সেটাও রেখে দিয়েছো কারন ওটাতে ওর স্পর্শ আছে।”
তিনি থামলেন না আরো বললেন
— “এমনকি সেই মেয়েটা হাসপাতালে যে অ্যাডমিশন ফর্মটা পূরণ করেছিল…”
— “সেটাও এখনও তোমার ব্যক্তিগত ফাইলে যত্ন করে রাখা আছে।”
— “সেগুলোও কি তোমাকে নতুন জীবন দিয়েছিল?”
দানিয়েলের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।সে ধীরে ধীরে ভিক্টোরিয়ার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তার কণ্ঠ এবার আগের চেয়ে অনেক ঠান্ডা।

— “তুমি… আমার ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দিয়েছ?”
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে নিচু স্বরে বলল,
— “আর প্লিজ…”
সে একবার দরজার দিকে তাকাল।
— “ভয়েসটা একটু লো রাখো।”
রুমের ভেতরের বাতাস মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল। দুজনই বুঝতে পারছিল এবার কথোপকথন এমন এক দিকে মোড় নিচ্ছে, যেখান থেকে আর সহজে ফিরে আসা যাবে না।
ভিক্টোরিয়া কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
— “যাই হোক, দানি। এই তর্কে আর যেতে চাই না।”
তিনি নিজের ব্লেজারের বোতাম ঠিক করে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
— “আমি তোমাকে নিতে এসেছি। কাল সকালে তুমি আমার সঙ্গে দুবাই যাবে।”
দানিয়েল ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “আমি কোথাও যাচ্ছি না।”
ভিক্টোরিয়া শান্ত স্বরেই বললেন,

— “তোমার যাওয়া লাগবে। বিয়ের বিষয়টা এক পাশে রাখো। আমি শুধু সেই জন্য আসিনি।”
— “দুবাইয়ে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। এমন কিছু, যেটা তোমার উপস্থিতি ছাড়া সম্ভব নয়।”
দানিয়েল কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে বলল,
— “কাজ থাকলে কাজের কথা বলো। কিন্তু বিয়ের ব্যাপারে আমার সিদ্ধান্ত বদলাবে না।”
ভিক্টোরিয়া হালকা হাসলেন। তিনি দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে গেলেন।
পেছন ফিরে দানিয়েলের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্বরে বললেন,— “আর একটা কথা মনে রেখো…”
— “তোমার ওই বাঘিনী…”
— “দিন শেষে ও-ই তোমার সঙ্গে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা করবে।”
— “ও তোমার হৃদয় ভেঙে দেবে, দানি। দেখে নিও।”
দানিয়েল কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। সে ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর রাখা ক্রিস্টালের গ্লাসটা হাতে তুলে নিল। কয়েক সেকেন্ড সেটার দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত কণ্ঠে বলল,
— “আমার মধ্যেতো হৃদয়ই নেই,।”
ভিক্টোরিয়া ভ্রু তুললেন।
দানিয়েল ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো রাগ নেই, কোনো কষ্ট নেই শুধু বরফের মতো শীতলতা।

— “সো! হৃদয় ভাঙার প্রশ্নই আসে না।”
সে এক পা এগিয়ে এসে বলল,
— “দানিয়েল কারও প্রতি দুর্বল নয়।”
— “আর যদি কোনোদিন দুর্বলও হই…”
সে হালকা থেমে ঠান্ডা হাসল।
— “তবুও দানিয়েল মরে গেলেও নিজের আবেগ প্রকাশ করবে না।”
— “আমার অনুভূতি… আমার সঙ্গেই কবর পর্যন্ত যাবে।”

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২১

ভিক্টোরিয়া কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন।
তারপর মৃদু হাসলেন।— “সেটাই তো ভয় পাচ্ছি, দানি। মানুষ নিজের অনুভূতি যত বেশি লুকায়… একদিন সেই অনুভূতিই তাকে সবচেয়ে বেশি হারিয়ে দেয়।”
দানিয়েল আর কোনো উত্তর দিল না।সে শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। তার নীরবতাই বলে দিচ্ছিল—এই পৃথিবীতে এমন কিছু নেই, যা তাকে নিজের মুখে দুর্বলতা স্বীকার করাতে পারবে।

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৩