জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৮
তোনিমা খান
সাঁঝ নেমেছে। অবশ্য সময় কারো কারোর জীবনে বহু আগেই সাঁঝ নামিয়ে দিয়েছে। আমরা সময়ের কাছে অসহায় এক সত্তা ব্যতীত কিছুই না। তবুও আমরা কখনো সময়ের পরোয়া করি না। যখন সময় ভালো থাকে তখন ভীষণ দাম্ভিকতার সাথে অন্যের সাথে পাষণ্ডতা করে বসি। একবার ও চিন্তা করি না—সময় বদলায়। আমার ও খারাপ সময় আসতে পারে। কিন্তু তখন পেছনে ছুটে গিয়ে ভুলগুলো শুধরানোর আর কোনো উপায় থাকে না।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ হওয়া সত্ত্বেও মানুষটির কপাল চুঁইয়ে চুঁইয়ে শ্বেদ জল গড়াচ্ছে। তার কঠিন, স্থির চোখে ভাসছে দু’টো দুরন্ত ছেলের হাস্যোজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি, অজস্র স্মৃতিরা জ্বলন্ত আগুনের লেলিহান শিখায় একটু একটু করে ছাই হয়ে যাচ্ছে। কর্নকুহুরে বাজছে কারোর আর্তচিৎকার। বুকের ভেতরটা অসহায় এক নীড় হারা পথিকের ন্যায় যন্ত্রনায় ছটফট করছে। আপাতদৃষ্টিতে আজকের সবচেয়ে বাজেভাবে হেরে যাওয়া সত্তাটি তালহার মুজাহিদ।
কিন্তু দুঃখটা যে ওই একটা জায়গায়—সে তার সবচেয়ে কাছের মানুষের কাছে হেরে গিয়েছে। বাইরের কেউ এসে শতবার হারালেও হয়তো তাকে ভাঙা যেতো না। কিন্তু প্রিয়জনের একটা আঘাতেই তালহার মুজাহিদ হেরে গেল। কারণ তার আঘাতের অস্ত্রটি ছিল ভালোবাসা, বন্ধুত্ব। জগতে এর থেকে পবিত্র আর দৃঢ় বন্ধন আছে না-কি? তবে কেন এই শব্দদুটি কলুষিত হলো?
মেহমেদ পরাজিত মানুষটির থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। পুনরায় দৃষ্টি রাখে কম্পিউটারে। যেখানে দেশের প্রত্যেক সীমান্তবর্তী এলাকায় থাকা এজেন্টরা একের পর এক আপডেট দিয়ে যাচ্ছে। তবে দূর্ভাগ্যবশত কেউই এখন পর্যন্ত কোনো হেল্পফুল তথ্য দিতে পারেনি। ডান গালের সাথে লাগোয়া মাইক্রোফোনে আবারো কাউকে তাড়া দিল,
‘টিম নেপাল, টিম ভারত…আপনারা এখন পর্যন্ত কোনো আপডেট দেননি।’
মাইক্রোফোনের অপরপ্রান্ত থেকে মৃদু কোলহাল শোনাগেল। মেহমেদ এর মনোযোগ বাড়লো, কর্নকুহর সতর্ক হলো।
‘স্যার, টিম ভারত…যশোর বেনাপোল সীমান্ত থেকে লাইনম্যান সুজিত বলছি। বিকাল পাঁচটা নাগাদ এখানে অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছে। হেলিকপ্টারে করে একজনকে আনা হয়েছিল। এবং তার পুরো ডিটেইলস মিলে যাচ্ছে আপনাদের দেয়া তথ্যের সাথে। সে উণত্রিশ বছরের কাছাকাছি একজন নারী। পরনে জলপাই রঙের একটি শাড়ি ছিল। যতটুকু শুনেছি সে অচেতন অবস্থায় ছিল।’
মেহমেদ সহ সকলের দৃষ্টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মেহমেদ হন্তদন্ত হয়ে বলল,
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সুজিত উনিই। আমরা ওনাকেই খুঁজছি!’
এই প্রান্তের সবাই উত্তেজিত হয়ে পড়লেও ওপ্রান্তে ছমছমে নীরবতা। সুজিত এক লহমা দম নিয়ে বলল,
‘কিন্তু স্যার দুঃখের বিষয় এটা যে, তাকে যত দ্রুত আনা হয়েছে তত দ্রুতই পাচার করে দেয়া হয়েছে ওপারে। বিষয়টা উপরমহলের পরিপূর্ণ সহায়তায় অনেক নিখুঁতভাবে আর দ্রুততার সাথে করা হয়েছে।
মেহমেদের সকল উত্তেজনা মিইয়ে গেল। হতাশার সাথে বলল,
‘কী বলো? এই দিনের আলোয় এত দ্রুত কীভাবে সম্ভব হলো এটা?’
‘স্যার, যত নিখুঁতভাবে কাজটা করা হয়েছে তাতে মনে হচ্ছে ওপারের কোনো এসেট যুক্ত ছিল এই কাজে। এপারেও কোনো ক্ষমতাধর কেউ যুক্ত ছিল। আর আজ বিকালে মালবাহী ট্রাকের প্রচুর রাশ ছিল। খুব একটা কঠিন কাজ ও ছিল না।’
মেহমেদ স্থির দাঁড়িয়ে থাকা তালহারের দিকে ফিরে তাকালো। এক মুহুর্ত বাদে তালহার নিজের স্থবিরতা ভাঙল। বড্ডো ধীরস্থির ভাবে আদেশের সুরে বলল,
‘পেট্রোপোল সীমান্ত আর বনগাঁ জংশনে থাকা আমাদের এজেন্টদের সাথে যোগাযোগ করো।’
সকলে আদেশ মোতাবেক আবার কাজ শুরু করল। তালহার অলস কদমে হাঁটতে হাঁটতে কাঁচের দেয়ালের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। শহর ভরা উঁচু উঁচু দালান, শত শত ঘর। কিন্তু তার যাওয়ার মতো আজ আর কোনো ঘর নেই। নীড়হারা মানুষের থেকে অসহায় মানুষ বোধহয় আর কেউ নেই। যার নীড় রয়েছে, নীড়ে ফেরার তাগিদ রয়েছে—সে নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান।
ধরণী আস্তে আস্তে ঘুঁটঘুঁটে তমসায় ঢেকে গেল। কিন্তু শহুরে কৃত্রিম আলো আঁধারের সৌন্দর্য ফিকে করে দিচ্ছে। ঠিক যেমনটা দিনকে দিন মানুষ আর তার আধুনিক সৃষ্টি পৃথিবীর সৌন্দর্য আর সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
ঝলমলে আলোয় আলোকিত আলিশান বাড়িটিতে আজ শুধু দুশ্চিন্তা আর শূন্যতার আধিপত্য। নত মুখে বসে থাকা বিন্দুর বাবার দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি ফেলে তানভীর গর্জে উঠে বলল,
‘আপনার মেয়ে শুরু থেকেই আমার ভাইয়ের জীবনের জন্য অলুক্ষণে ছিল। এত বছরেও একটা সন্তানের মুখ দেখাতে পারেনি। আর আজ এত বছর পর যখন একটা সুস্থ সবল বাচ্চা ধারণ করতে পেরেছে তখন সে ছলচাতুরি করা শুরু করেছে। কত বড় খারাপ মেয়ে হলে ওই অবস্থায় সে স্বামীকে না জানিয়ে বাইরে যায়? তাও আবার ক্যামেরা বন্ধ করে? কী ধূর্ত মেয়ে দেখেছেন? আজ যদি ওর কিছু হয়ে যায় তবে আমার ভাইয়ের কোনো দোষ নেই তাতে। সে মেয়ে মানুষ হয়ে এত চোটপাট কেন করবে? স্বামীকে না জানিয়ে স্বামীর বন্ধুর সাথে কথা কেন বলবে? বেয়াদব মেয়ে একটা!’
তানিয়া অশ্রুসিক্ত নয়নে বড় ছেলের দিকে তাকালো। ধমকে উঠে বলল,
‘তানভীর বড়দের সাথে সম্মানের সাথে কথা বল। আওয়াজ নিচু কর।’
‘কিসের আওয়াজ নিচু করবে? তাদের মেয়ে আমার ভাইয়ের জীবনটা শেষ করে দিয়েছে।’
সে রাগে ফুঁসছে। বিন্দুর বাবা-মা একদম নীরব, নিশ্চুপ। তাদের কানে ওসব কিছু ঢুকছে না। তাদের ভেতরে শুধু একটাই আর্তনাদ…তাদের সন্তানটা তার বুকে সুস্থ সবল ভাবে ফিরে আসুক। যে যার সন্তান নিয়ে চিন্তিত। প্রত্যেকের কাছে প্রত্যেকের সন্তান গুরুত্বপূর্ণ। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এটাও তো বোঝা উচিত, সামনের মানুষটার কাছেও তার সন্তান মূল্যবান।
তানভীর অতশত বুঝতে নারাজ। সে পুনরায় রাগান্বিত স্বরে সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
‘ওই মেয়ে যদি বেঁচে ফিরে আর আল্লাহর রহমতে যদি বাচ্চাটা সুস্থ সবল থাকে তবে বাচ্চা হওয়ার সাথে সাথে ওকে ডিভোর্স দেবে তালহার। এই কথার যেন কোনো নড়চড় না হয় আম্মা। ওই মেয়ে কোনোদিন তালহারের জীবনে সুখ দিতে পারেনি আর পারবেও না। রানীর হালে থেকে তার এই দশা! দিনে দুপুরে চৌদ্দবার যদি স্বামীর মার খেতো তবে শিক্ষা হতো। পেয়েছে তো ভালো স্বামী তাই কদর করেনি।’
তালহারের বাবাও গম্ভীর গলায় বললেন,
‘তানভীর খুব একট ভুলকিছু বলেনি, তানিয়া। দেখেছো তো বিন্দু আমাদের পরিবারে আসার পর থেকে ঝামেলা লাগছে। তোমার ছোট ছেলে বাড়ি যাওয়া তো দূরের কথা আমাদের সাথে যোগাযোগ ও করে না।’
‘করব কী করে? এত নিচু মন-মানসিকতার মানুষের সাথে কথা বলার রুচি তো আমার হয় না।’
তাদের সকলের দিক দিশাহারা রাগ আর প্রশ্রয় পেল না। সদ্য গোসল করে আসা তালহার সতেজ বদনে বসার ঘরে দাঁড়ায়। পরনে কালো প্যান্ট, কালো টিশার্টের উপর ব্রাউন রঙা জ্যাকেট, মাথায় ক্যাপ। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে কোথাও যাওয়ার জন্য একদম প্রস্তুত।
তানভীর চোয়াল শক্ত করে বলল,
‘বাপ, ভাইয়ের সাথে কথা বলতে রুচির প্রয়োজন?’
দুই জোড়া প্রখর দৃষ্টি একে উপরের তড়াক নিবদ্ধ হয়। তালহার শান্ত স্বরে বলল,
‘কারোর বাপ, ভাই হওয়ার আগে মানুষ হতে হয়। যেটা আপনারা দু’জন পারেননি। পরেরবার আমার শ্বশুর শাশুড়ির সাথে উঁচু গলায় কথা বললে আমি আদব কায়দা ভুলে যাব। আমার ব্যক্তিগত সমস্যা আমি সামলে নেব। আপনাদের এত কনসার্ন দেখাতে হবে না। যেখানে সব সমস্যার মূল আপনারাই। আমি আজ পর্যন্ত বিন্দুকে তার শশুর বাড়িতে রাখার সাহস পাইনি শুধুমাত্র আপনার আর আপনার বাবার কারণে। উঠতে বসতে বন্ধ্যা বলে বলে তাকে মানসিকভাবে অত্যাচার করেছেন। আমার জীবনটা নষ্ট করার জন্য আসল দোষী তো আপনারা।’
তানভীর আর তার বাবার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো রাগে, অপমানে। সে কিছু বলার আগেই তালহার মায়ের দিকে তাকালো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘দয়াকরে তোমার ছেলেকে আর আমার বিষয়ে নাক গলাতে বলবে না। আর না আমার চারিধারে তাকে আমি দেখতে চাই।’
‘হ্যাঁ, তোর পয়সায় তো আমি চলি। কত বড় হয়ে গিয়েছে সে বড় ভাইকে এই কথা বলে। তোর এই ভোগের কারণ তুই নিজে। বউকে মাথায় উঠিয়ে রেখেছিস তাই এই দশা আজ। মেয়ে মানুষকে সবসময় তার সীমার মধ্যে রাখতে হয়। যেমনটা আমি তৃশাকে রেখেছি। দেখেছিস ওকে আজ পর্যন্ত আমার সাথে কোনো চোটপাট করতে?’
সে দম ফেলে। তৃশার মুখ রাগে লাল হয়ে ওঠে। সে খামচে ধরল ছেলের হাত। চোখ টলটল করছে তার। একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান না হলে হয়তো সেও স্বামী নামক এই মানুষটার মুখের উপর জুতা ছুঁড়ে সে বহু আগেই চলে যেতো। কিন্তু নিজের সুখের চিন্তা করে সে তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে দেয়ার মতো নিকৃষ্ট মা কখনোই হতে পারবে না। সে সোফা ছেড়ে উঠে চলে যায়।
তালহার তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
‘আই সোয়্যার! ভাবি যদি জীবনে কোনোদিন সুযোগ পেতো তবে সবার আগে আপনার মুখের উপর জুতা মারত।’
‘কার এত বড় দুঃসাহস সেটা আমিও দেখে নিতাম।’
বলেই তানভীর রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ে মাকে বলল,
‘আমি অসছি, আম্মা। আমার আর কোনো ভাই নেই, আপনি শুনেছেন? এরপর আর আমার সামনে এই ছেলের জন্য হাহাকার করবেন না।’
‘তৃশা? এখুনি বের হও আমরা বরিশাল যাব এখুনি।’
সে চেঁচালো। তালহারের বাবাও থমথমে মুখে বলল,
‘আমিও যাব।’
তানিয়া অসহায়ত্ব ভরা চাহনিতে সবাইকে দেখল। তালহার তাদের দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে ব্যাকপ্যাক কাঁধে তুলে নিল। বিন্দুর মা অশ্রুসিক্ত নয়নে তুলে তাকায় তার পানে। ক্রন্দনরত গলায় বলে,
‘বিন্দুর খোঁজ পেয়েছিস, আব্বু?’
তালহারের দৃষ্টি থমকায় আর্তনাদ ভরা ওই মুখপানে। সে একটা উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে শ্বশুর শাশুড়ির সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। শ্বশুরের হাতে হাত রেখে বলল,
‘আমি তোমাদের মেয়েকে নিয়েই ফিরব।’
বিন্দুর মা আর একটুও শঙ্কা প্রকাশ করলেন না। তিনি মাথা নেড়ে তালহারের মাথায় হাত রেখে বললেন,
‘আমি অপেক্ষায় থাকব।’
তালহার স্মিত হেসে মায়ের দিকে তাকালো। তানিয়া ছলছল নয়নে চেয়ে বললেন,
‘কোথায় যাচ্ছিস এই রাতে?’
‘ভারতে।’
তালহার সদ্য পায়ের কাছে এসে দাঁড়ানো ভাতিজার দিকে তাকালো। ছোট্ট ছেলেটা ভীষণ আদরের সাথে তার হাঁটু জড়িয়ে ধরেছে। সে হাঁটু গেড়ে বসে ছেলেটিকে বুকে জড়িয়ে নিলো। ছোট্ট গালে আলতো ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
‘চাচু, সবসময় তোমার মাথার উপর থাকব।’
বাচ্চাটি একগাল হেসে আওড়ালো,
‘চাচু ইজ অলওয়েজ ফর তিতিন।’
তালহার স্মিত হেসে তার সাথে সুর মেলালো,
‘ইয়েস, চাচু ইজ অলওয়েজ ফর তিতিন।’
বলেই সে ব্যাগপ্যাক নিয়ে উঠে বেরিয়ে যায় ঘর ছেড়ে। নীড়হারা মানুষটা তার নীড় খুঁজতে যাচ্ছে।ওটা তো আপাতদৃষ্টিতে একটি ইট, পাথরের তৈরি দালান ব্যতীত কিছুই ছিল না। ঘর তো সেথায়, যেথায় বিন্দু।
রৌদ্রোজ্জ্বল এক স্নিগ্ধ সকাল। বরফ-গলা সবুজ উপত্যকার ঘাসের ডগায় ঝুলতে থাকা শিশিরবিন্দুতে সোনালী সূর্যের আলো পড়তেই তা মুক্তোদানার মতো চিকচিক করে উঠল। উপত্যকার শীতল পাহাড়ি সমীরণে বুনো ফুলের মিষ্টি সুবাস আর দূরে কাঁচের মতো স্বচ্ছ হ্রদ—এটাই যেন কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন সবচেয়ে জাদুকরী রূপ।
মাটির দিকে তাকালে অজস্র বুনো ফুলের মেলা, আর ওপরের নীলচে-সোনালী অম্বর থেকে দৃষ্টি নেমে এলে চোখে পড়ে অজস্র আপেল বাগান। ডালে ডালে ঝুলতে থাকা কাঁচা সবুজ আপেলগুলো যখন মৃদু বাতাসে দুলতে থাকে, পাতার সেই দোলা খাওয়ার শব্দ অজান্তেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি এনে দেয়। মনে হয়, এই ধরণীতেই যেন নেমে এসেছে স্বর্গের এক টুকরো ভূমি।
ঠিক সেই আপেল বাগানের পাশেই, উপত্যকার এক বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী দোচালা কাঠের ঘর। দেবদারু আর পাইন কাঠ দিয়ে তৈরি এই ঘরগুলোর গাঢ় বাদামি রঙ প্রকৃতির সবুজের সাথে এক অপূর্ব বৈপরীত্য তৈরি করেছে। কাঠের ঘরের শির যেন সাদা তুলোর মতো মেঘ ছুঁয়ে যাচ্ছে। খাঁজকাটা দোচালা টিনের চালে পাহাড়ি রোদের ঝিলিক; চিমনি থেকে অলস গতিতে উঠে যাচ্ছে হালকা ধোঁয়ার কুণ্ডলী। বারান্দায় দাঁড়ালে নিচে দৃশ্যমান হয় পুরো উপত্যকা জুড়ে একেঁবেঁকে যাওয়া রূপালী নদী, ধাপে ধাপে নেমে যাওয়া সবুজ প্রান্তরে অলসভাবে চরেড়ানো ভেড়ার পাল আর মেঘেদের আনাগোনা। তবে এই নীরব-নিঝুম উপত্যকায় পাহাড়ি বাতাসের শনশন শব্দ, পাখির কলতান আর কাঁচা আপেলের গন্ধ মিলিয়ে কাশ্মীরের এই মায়াবী পরিবেশ সবার জন্য সবসময় সুখকর হয় না। কাঠের দরজায় ‘খট’ করে শব্দ হতেই বিন্দু জানালার বাইরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য থেকে চোখ ফিরিয়ে নিল। ঢিলেঢালা সালওয়ার-কামিজের সাথে মাথায় বড়সর কাপড় টানা এক বয়স্ক মহিলা অলস কদমে ঘরে ঢুকলেন। তাঁর পেছনেই খাবারের প্লেট হাতে প্রবেশ করল এক গৃহপরিচারিকা।
বিন্দুর ক্যানুলা লাগানো হাতটি অনতিবিলম্বে আঁকড়ে ধরল নিজের উদর। এক মুহূর্তেই তার চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ল চাপা আতঙ্ক। বয়স্ক মহিলা বিন্দুর ভয়ার্ত চাহনি উপেক্ষা করে তার ভারী, আরামপ্রিয় দেহটিকে বিছানার পাশে থাকা কাঠের বেঞ্চে রাখলেন। বেশ সংযত কণ্ঠে উর্দুতে বললেন,
‘খাবার খাচ্ছ না কেন?’
বিন্দু হিন্দি বোঝে; আর হিন্দি বুঝলে উর্দু বোঝাও সহজ। সে থমথমে মুখে উর্দুতেই জবাব দিল,
‘আপনারা খাবারে কিছু মিশিয়ে দেননি, তার নিশ্চয়তা কী?’
অন্য দিন হলে বয়স্ক মহিলা হয়তো রাগ দেখাতেন, কিন্তু আজ দেখালেন না। বরং হাঁক ছেড়ে ডাকলেন,
‘নার্গিস? নার্গিস! ইধার আও জারা!’
সাদা ও গোলাপি রঙের মিশ্রণের সালওয়ার-কামিজ পরিহিতা ত্রিশ-একত্রিশ বছরের এক নারী ছুটে আসল। ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
‘আম্মা!’
সাঈদা নামের সেই বয়স্ক মহিলা খাবারের দিকে ইশারা করে বললেন,
‘খাবারটা খেয়ে দেখাও তো এই মেয়েকে!’
নার্গিস একপলক বিন্দুকে দেখে নীরবে প্লেটের প্রতিটি পদ থেকে একটু একটু করে চেখে দেখল। তারপর বিন্দুর দিকে তাকিয়ে বলল,
‘এতে কিছু নেই। খেয়ে নাও।’
সাঈদা বিন্দুর দিকে তীক্ষ্ণ নজর ফেললেন। গনগনে স্বরে বললেন,
‘এবার চুপচাপ খেয়ে নেবে।’
প্লেটে গরুর মাংস, পরোটা, একটি ডিম, এক গ্লাস দুধ আর কিছু ফল দেখে বিন্দুর দৃষ্টি আরও সতর্ক হয়ে উঠল। বিগত এক সপ্তাহ তো শুধু রুটি আর ডাল দেওয়া হয়েছিল; আজ হঠাৎ এত আপ্যায়ন কেন? সে শঙ্কিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
‘এত যত্ন কেন?’
সাঈদা ভণিতা করতে জানেন না; কারণ তার ভণিতা করার প্রয়োজনই পড়ে না। বিগত বিশ বছর ধরে দাপটের সাথে দেহব্যবসার এই বিপজ্জনক জগত একা হাতে সামলে এসেছেন তিনি। ভয় তাঁর রন্ধ্রে রন্ধ্রে নেই। সাঈদা হাতের লাঠিটা শক্ত করে মেঝেতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
‘একটা সুখবর আছে। একজন খদ্দের পাওয়া গেছে, যে তোমাকে পছন্দ করেছে। আমি তো ভাবছিলাম তুমি আমার লস প্রজেক্ট। ওই সুপ্ত তো আপদ পাঠিয়ে গায়েব হয়ে গেল! বিক্রি করতে না পারলে নিজের পয়সায় খাইয়ে-পড়িয়ে রাখতে হতো। একে তো পেট বাঁধানো, তার ওপর রোগে শোকে ভরা দুর্বল দেহ—এমন খুঁতযুক্ত শরীর কেউ কিনতে রাজি হবে, তা আমি ভাবিনি। রবের দরবারে লাখো শুকরিয়া!’
বিন্দুর পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। ভদ্রমহিলা এমন নিকৃষ্ট সুরে কথা বলছে যেন সে কোনো অপ্রয়োজনীয় বস্তু। যাকে বিক্রি করতে পারাটা তার জন্য হাঁফ ছাড়ার মতো একটা কাজ। তার চোখে থাকা আতঙ্ক আর্তনাদে পরিণত হলো,
‘আপনি এমনটা করতে পারেন না। আমি একটা ভালো ঘরের মেয়ে। আমার স্বামী সংসার রয়েছে। আমার স্বামী, পরিবার আমায় খুঁজছে। আপনারা কী করে কারও প্রিয়জনকে সামান্য কিছু টাকার লোভে কেড়ে নিতে পারেন? আপনারা কি মানুষ নন? সামান্য বিবেকও কি কাজ করে না? ওই মেয়েগুলোর পরিবার হয়তো হাহাকার করছে, তারাও তো সুন্দরভাবে বাঁচতে চায়। শুধুমাত্র আপনাদের মতো কিছু নোংরা অর্থলোভীর বলি হয়ে তারা জীবন হারিয়ে ফেলে। আমার ওপর একটু করুণা করুন। এই সন্তানটি আমরা অনেক কষ্টের পর পেয়েছি… দয়া করে আমায় ছেড়ে দিন।’
বিন্দু অস্থির কণ্ঠে অনুনয় করে বলল। তার দেহের ভঙ্গিমা অস্থির, ছটফটে। একটু টোকা দিলেই হয়তো চোখ বেঁয়ে অঝোরে নোনাজল গড়াবে।
সাঈদা কঠিন চোখে তাকালো। গর্জে উঠে বলল,
‘এসব ন্যায় নীতি শুনিয়ে লাভ নেই। আমরাও এগুলো করেই বিগত বিশ বছর যাবৎ জীবনযাপন করেছি। তোমরাও করবে। এটাই এখন তোমার জীবন। এইসব ন্যাকা কান্না বন্ধ করে যত তাড়াতাড়ি হাসিখুশি ভাবে মেনে নিবা ততই তোমাদের জন্য ভালো হবে।’
‘আমি গর্ভবতী। এতটুকু তো করুনা করুন। আপনিও তো একজন মা।’
বিন্দু বিছানার চাদর খামচে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
সাঈদা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,
‘আমার পুরো খানদান এই ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এসব দুই টাকার অনুভূতি আমাদের মধ্যে থাকে না।’
‘মাতৃত্ব দুই টাকার অনুভূতি?’
বিন্দু স্তম্ভিত চিত্তে আওড়ালো।
সাঈদা তার বিস্ময় মাছি তাড়ানোর মতো করে উড়িয়ে দিলেন।
‘যা বলছি কান খুলে শুনে রাখো, পেট ভরে খাবার খাবে। দুপুরের মধ্যে তোমাকে আরও একটা স্যালাইন দেওয়া হবে। ডাক্তার বলেছে, ওটা দিলেই তোমার শরীর বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠবে। তারপর সুন্দর করে গোসল করে নিজেকে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখবে। বিকেলে খদ্দের আসবে; দেখে পছন্দ হলেই নিয়ে যাবে। খদ্দের যেন তোমাকে দেখে অখুশি না হয়। আর এই খদ্দের যদি তোমাকে না কেনে, তবে তোমার ওই বাচ্চার আজই শেষ দিন।’
কথাটি বলেই তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে ‘ঠক ঠক’ শব্দে কামরা থেকে বেরিয়ে গেলেন। বয়সের ছাপে নুব্জ্য দেহ! তবে দেহ এখনো তেজ হারয়নি।
বিন্দু ভয়ার্ত ও অস্থির চোখে সবার দিকে তাকাল—যদি কেউ একটু দয়া করে! সে নার্গিসের থমথমে মুখের দিকে চেয়ে অনুনয় করে বলল,
‘তুমিও তো একটা ছোট্ট পরীর মা। তুমি তো অন্তত বোঝো, বাচ্চা একটা মেয়ের কাছে কতটা মূল্যবান। আমি দীর্ঘ তিন বছর পর এই সন্তানটি পেয়েছি। আমার স্বামী আমাকে খুঁজছে… আমায় এখান থেকে বের হতে একটু সাহায্য করো, নার্গিস। আমি তোমার পায়ে পড়ছি…’
নার্গিসের কঠিন দৃষ্টি ক্ষণিকের জন্য নিস্তেজ হয়ে এল, কিন্তু কণ্ঠ থেকে পাষাণ ভাব দূর হলো না। সে অনাদরে বলল,
‘এটাই এখন তোমার জীবন। এখান থেকে বের হওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে সব মেনে নাও। খদ্দেরের মন জুগিয়ে চললে হয়তো ভালো কিছু পাবে।’
কথাটি বলেই সে মাথায় কাপড় টেনে বের হওয়ার জন্য পা বাড়াল। বিন্দু ঘৃণা ও অসহায়ত্বে চেঁচিয়ে উঠল,
‘তুমি একজন মুসলিম মেয়ে হয়ে এমনটা কী করে করতে পারো? মাথায় কাপড়ই বা কেন দাও? মাথায় কাপড় দিয়ে স্রষ্টার সৃষ্টিকে লাঞ্ছিত করা কি তোমার ধর্ম শেখায়?’
নার্গিস কঠোর দৃষ্টিতে ফিরে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘আমায় ধর্মের জ্ঞান দিতে এসো না।’
বিন্দু গুমড়ে কাঁদতে লাগল। অনুনয় করে বলল,
‘মাথায় যখন কাপড় দাও, তখন সেই স্রষ্টাকে ভয় করো। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মেয়ের পবিত্র নামে নিজের মেয়ের নাম রেখে কী করে এই অপবিত্র জীবন তাকে দিচ্ছো? একটু দয়া করো নার্গিস… আমায় ছেড়ে দাও। আমার একটা সুন্দর সংসার রয়েছে, সেটা আমি ছাড়া অচল। একজন নারী হিসেবে তো জানো, স্বামী, সংসার, সন্তান একটা মেয়ের কাছে কতটা যত্নের! কিছু শত্রুর ষড়যন্ত্রে আজ আমি এখানে। আমার সাজানো জীবনটা ধ্বংস করে দিও না।’
নার্গিসের কাঠিন্যে সামান্যও চির ধরল না। সে থমথমে মুখে বলল,
‘আমাদের জীবনে স্বামী, সন্তান, সংসার বলে কিছু নেই। যা আছে তা টাকার বিনময়ে। তাই এইসব কথা বলা বন্ধ করো।’
‘তবে তোমার মেয়েটাও কী শুধুমাত্র টাকার বিনিময়ে পাওয়া একট প্রাণ? তার প্রতি কোনো মায়া-মমতা নেই তোমার?
বিন্দু চোয়াল শক্ত করে বলল। নার্গিসের চোয়াল ও শক্ত হয়ে উঠল।
‘আমার মেয়ের কথা তুলবে না। ওর ব্যপার আমি বুঝে নেব।’
‘তুমি একটা নিকৃষ্ট মা। এতটাই নিকৃষ্ট যে নিজের মেয়েকেও এই পথে রাখতে তুমি দ্বিধা করবে না। এটা আমি ভালো করেই জানি। তোমার মাঝে নিজের সন্তানের জন্য ই দয়া নেই, আমার জন্য কী থাকবে? আমি-ই বোকা!’
নার্গিস রাগে গজগজ করতে করতে বলল,
‘শাহিন! খাবার দেওয়া হলে বেরিয়ে এসো। ও খেলে খাক, নয়তো মরে যাক!’
বলেই সে বেরিয়ে গেল, পেছনে পেছনে গেল শাহিনও। বিন্দু হাঁটু মুড়ে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। এই এক দুপুরের মধ্যে সে এখান থেকে পালাবে কীভাবে? বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর তার সাথে ঠিক কী ঘটবে? ভাবতেই চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল। ক্যানুলা লাগানো হাত থেকে রক্তের সরু স্রোত তখন কনুই ছুঁয়ে গেল। বিন্দু সেদিকে এক পলক চেয়ে একটানে ক্যানুলাটা খুলে ফেলে হাতটা শাড়ির আঁচল দিয়ে চেপে ধরল।
আর্তনাদভরা কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল,
‘তালহার… আপনি কোথায়?’
তার চোখের সাদা অংশ রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে কাঁদতে কাঁদতে। এক সপ্তাহ ধরে অনবরত অশ্রু বিসর্জন দিতে দিতে চোখের পানিও যেন আজ শুকিয়ে গেছে। অনুনয়-বিনয় করতে করতে সে ক্লান্ত, তবুও একটি মানুষের মনও গলল না। দুনিয়ার মানুষ কত নিষ্ঠুর! এক সপ্তাহ আগে যখন তার জ্ঞান ফিরেছিল, নিজেকে সে এই বন্দিশালাতেই পেয়েছিল। এর মাঝে কী ঘটেছে, সে কিছুই জানে না। শুধু জানে, এটি কাশ্মীর।
একদিনের ব্যবধানে তাকে ভিনদেশে পাচার করে দেওয়া হয়েছে—এ কথা শোনার পরই তার সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। তালহার কীভাবে তাকে এই বিশাল দেশে খুঁজে পাবে? বুঝবেই বা কীভাবে যে সে দেশের গণ্ডির ভেতরে নেই? সে আবারও অঝোরে কাঁদতে লাগল। একটি হাত তখনো পরম মমতায় পেটে বুলাতে ব্যস্ত। কিন্তু এই হাত কতক্ষণ সুরক্ষা দেবে তার সন্তানকে? শরীরের ওপর এত ধকলের পর সে আদৌ সুস্থ আছে তো?
ঠিক এই মুহূর্তে এসে সে উপলব্ধি করল—এই পৃথিবীতে তালহার ছাড়া সবাই স্বার্থপর, নিষ্ঠুর ও অমানবিক। পুরো পৃথিবীতে তালহার ই একমাত্র তার নিরাপদ জগত। নিজের ওপর রাগে-ক্ষোভে সে ভেঙে পড়ল। কিন্তু পেছনে গিয়ে ভুলগুলো শুধরানোর কোনো সুযোগ নেই। তালহার হয়তো জগতটাকে চেনে বলেই তাকে পুরো দুনিয়া থেকে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু উপলব্ধিটা এত বিলম্বে কেন হলো? এর প্রায়শ্চিত্ত তারা মা আর বাচ্চা কীভাবে করবে?
পুনরায় দরজার খিলে শব্দ হতেই সে ফোলা ফোলা লালচে মুখটি তুলল। এবার দৃষ্টিতে ঘৃণা নয়, স্নিগ্ধতা এসে ভর করল। সাদা ফ্রক, পায়ে সাদা ব্যালেরিনা শু, আর মাথায় সাদা বান্দানার মতো দেখতে স্কার্ফ দিয়ে কাশ্মীরি মেয়েদের মতো বাঁধা কোঁকড়ানো চুল। ধবধবে ফর্সা, সুন্দর পাঁচ বছরের ফুটফুটে একটি বাচ্চা মেয়ে চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে এল। তার ঠোঁট গুলো ঠিক চেরির ন্যায় লাল টুকটুকে।
ফাতিমা মৃদু হাসল বিন্দুর চোখে চোখ পড়তেই। বিন্দুও পরিবর্তে কান্নাভেজা চোখেমুখে স্মিত হাসল।
ফাতিমা এগিয়ে এসে কৌতুহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
‘Lily, Ammi ne bola ki tumhare pet mein ek gudiya hai. Kya yeh sach hai?’
(লিলি, আম্মি বলেছে তোমার পেটে নাকি একটা পুতুল রয়েছে। এটা কী সত্যি?)
বিন্দু মাথা দোলালো। ফাতিমা বিস্মিত হয়ে তাকালো তার পেটের দিকে। অবুঝ কণ্ঠে বলল,
‘Kahan hai? Mujhe dikhao!’
(কোথায় আছে, আমায় দেখাও!)
বিন্দু চোখের পানি মুছে উর্দুতে বলল,
‘সে এখন খুব ছোট। তাকে দেখা যায় না।’
ফাতিমা বেশ বুদ্ধিমতি আর শান্ত একটি মেয়ে। সে মাথা নাড়লো। এগিয়ে গিয়ে বেঞ্চে রাখা খাবারের প্লেটটি বেশ কষ্ট করে বিছানায় এনে রাখল। দুইবারে খাবারগুলো আনতে সক্ষম হলো সে। সে জুতা খুলে খাটে পা ঝুলিয়ে বসল। কৌতুহলী গলায় বলল,
‘Ammi ne bola ke tum khana nahi kha rahi ho. Kya tum gussa ho? Nani ne tumhe data?’
(আম্মি বলেছে, তুমি খাবার খাচ্ছো না। তুমি কী রেগে আছো? নানি কী তোমায় বকেছে?’)
বিন্দু তিরতির করে কেঁপে ওঠা ওষ্ঠাধর কামড়ে ধরল। কান্নাভেজা চোখে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো।ফাতিমা মৃদু হাসল। রুটি ছিঁড়ে গরুর মাংস নিয়ে তা বিন্দুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
‘Nani sabko aise daante hain. Gussa mat karo. Khana kha lo. Khane ke saath kaisi narazi?’
(‘নানি সবাইকেই এমন বকে। রাগ করো না। খাবার খেয়ে নাও। খাবারের সাথে কিসের নারাজি?’)
‘Khane ki iccha nahi hai, Fatima.’
(খাওয়ার ইচ্ছা নেই, ফাতিমা।’)
বিন্দু অস্থির কণ্ঠে বলল। সময় যে ফুরিয়ে যাচ্ছে। সে তার স্বামী-সন্তানকে হারিয়ে ফেলবে। তার চোখ বেয়ে আবারো অশ্রু গড়ায়। ফাতিমা মৃদু উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
‘Kyun? Khane ke saath gussa nahi karte. Tum jaanti ho? Main bhi gussa karti hoon, par khana khake. Kha lo, nahi to tumhare pet mein jo gudiya hai use dard hoga.’
(‘কেন? খাবারের সাথে রাগ দেখাতে নেই। তুমি জানো, আমিও রাগ করি কিন্তু খাবার খেয়ে। খেয়ে নাও, নয়তো তোমার পেটে যে পুতুল আছে তার কষ্ট হবে।’)
বিন্দু বিমুগ্ধ চিত্তে ছোট্ট মেয়েটির কথা শুনলো। আর দ্বিরুক্তি করতে পারল না। নিজের পেটে থাকা ছোট্ট পুতুলের কথা চিন্তা করে হলেও তাকে খেতে হবে। সে ফাতিমার হাতে থাকা ছোট্ট লোকমাটি মুখে পুরে নিলো। ফাতিমা প্রগাঢ় হেসে বলল,
‘Yeh hui na baat! Achhi ladkiyan kabhi khane ke saath gussa nahi karti.’
(এইত সাব্বাশ! ভালো মেয়েরা কখনো খাবারের সাথে রাগ দেখায় না।’)
বিন্দু মৃদু হেসে তার ছোট ছোট হাতে খেতে লাগল। ইচ্ছে হলো না ফাতিমাকে থামাতে। বরং মনে হলো এই ছোট্ট হাতে খাবার খাওয়ার মতো সুখকর মুহুর্ত আর কিছুই হতে পারে না। সে ফাতিমার হাস্যোজ্জ্বল নিষ্পাপ মুখটি দেখতে দেখতেই বলল,
‘তুমি যদি আমার মেয়ে হতে তবে কত সুন্দর হতো সবটা!’
সে উর্দুতেই বিড়বিড় করল। খাওয়া শেষ হতেই ফাতিমা তার হাত ধরে বলল,
‘Chalo bahar ghumne jate hain.’
(চলো বাইরে ঘুরতে যাই।’
বিন্দুর দৃষ্টি সচকিত হয়। বলল,
‘তোমার দাদি আর মা আমায় বাইরে যেতে দেবে না।’
ফাতিমা বলল,
‘Woh tum mujh pe chhod do.’
(‘ওটা তুমি আমার উপর ছেড়ে দাও।’)
বলেই সে বেরিয়ে গেল। বিন্দু স্পষ্ট শুনলো তার প্রতিবাদী তেজি কণ্ঠগুলো। সে চঞ্চল কণ্ঠে দাদি আর মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,
‘আমি কী লিলিকে নিয়ে একটু বাইরে যেতে পারি?’
সাঈদা তড়াক নাকচ করল।
‘কখনোই না।’
ফাতিমা রেগে গেল।
‘কেন? আমরা শুধু আপেল বাগানে হাঁটতে যাব। আমাদের যেতে দাও।’
নার্গিস কাজ করতে করতে বলল,
‘তুমি একা যাও কিন্তু লিলি যাবে না?’
ফাতিমা জোর গলায় দ্বিরুক্তি করল,
‘কেন লিলি যাবে না? বাইরে আমার একা যেতে ভালো লাগে না। মহল্লার কেউ আমার সাথে খেলা করে না, এমনকি কথাও বলে না। আমায় ঘৃণা করে সবাই। কেন সবাই আমায় ঘৃণা করে? আমি কী করেছি? আমার তো খেলতে ইচ্ছে করে সবার সাথে। ঘুরতে যেতে ইচ্ছে করে। তোমরা কেন সবসময় আমায় আঁটকে রাখো আর বকাবকি করো? লিলি আমার সাথে খেলা করে, আমায় ভালোবাসে—কখনো ঘৃণা করে না। আমি ওর সাথে খেলতে চাই। বাইরে হাঁটতে যেতে চাই। আমাদের যেতে দাও। তোমরা কেন সবসময় আমার সাথে এমন করো?’
সাঈদা আর নার্গিসের দৃষ্টি থমকে গেল পাঁচ বছরের মেয়েটির প্রতিবাদী তেজি কণ্ঠে। সে হয়তো ইতিমধ্যেই বুঝে গিয়েছে তার জীবন আর পাঁচটা স্বাভাবিক বাচ্চাদের মতো নয়। তাই সে সুযোগ বুঝে আবদার করে। কিন্তু কখনোই অনৈতিক আবদার করে না। নার্গিস শুকনো ঢোক গিলল। রাগান্বিত স্বরে বলল,
‘বড্ডো জেদি হয়েছ ফাতিমা। এটাই তোমার জীবন। সত্যটা মানতে শেখো। জেদ করো না। যাও ঘরে যাও।’
সাঈদা হাত জাগিয়ে তাকে থামিয়ে দিল। নাতনির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর সুরে বলল,
‘ফাতিমা, তুমি যেতে পারো তোমার লিলিকে নিয়ে।’
‘শুকরিয়া নানি।’
বলেই ফাতিমা তার থমথমে মুখ ঘুরিয়ে বিন্দুর ঘরে চলে গেল। নার্গিস মায়ের দিকে তাকালো।
‘এটা কী করলেন?’
সাঈদা নিরুদ্বেগ বলল,
‘শাহিন ওদের সাথে থাকবে চিন্তা করো না।’
নার্গিস উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে আবার কাজে মনোযোগ দিল। সাঈদা চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে অলস কণ্ঠে বলল,
‘মেয়েকে এই দশায় দেখতে পারছ না, তাই না নার্গিস?’
নার্গিস মৃদু চমকালো। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,
‘নাহ, এমনটা কেন মনে হলো আপনার?’
‘আমি তোমায় জন্ম দিয়েছি নার্গিস।’
‘এর মানে এই নয় যে আপনি আমার মন পড়তে পারবেন।’
‘মায়েরা সব পারে নার্গিস।’
সাঈদার ঠোঁটে বাঁকা হাসি। কিন্তু নার্গিসের মুখ ঠিক ততটাই কালো হয়ে যেতে লাগল। সাঈদা তার উতরে যাওয়া মুখটি দেখে তাচ্ছিল্য হাসল। মাথা থেকে পড়ে যাওয়া ওড়নাটা মাথায় টানতে টানতে বলল,
‘জেনেশুনে পাপ করলে পাপের ফল পাবেই। আমি বারণ করেছিলাম শোনোনি! তুমি ওই দূই টাকার অনুভূতির মোহে পড়ে গিয়েছিলে। এখন দেখো, তুমি নিজের চোখের দিকে তাকাতে পারছ না। মায়ের কথা শুনতে হয়। আমি এই পর্যন্ত এমনি এমনি আসিনি। তুমিও আমার ভুলের মাশুল। আর পঁচিশ বছর পর তুমিও সেই একই ভুল করেছ। এখন শাস্তি ভোগ করো। স্বামী, সন্তান, ভালোবাসা…আমাদের জন্য এইসব তুচ্ছ অনুভূতি সৃষ্টি হয়নি।’
সে বলতে বলতে পা বাড়ায় নিচের দিকে। যেতে যেতে বলল,
‘আমি হুরশালার দিকে যাচ্ছি। শাহিনকে বলবে এর মধ্যে দুপুরের খাবার তৈরি রাখতে।’
সে চলে গেল। কিন্তু নার্গিস তখনো সেখানে থমকে ছিল। তার কানে বারংবার বাজতে লাগল,
‘স্বামী, সন্তান, ভালোবাসা…আমাদের জন্য এইসব তুচ্ছ অনুভূতি সৃষ্টি হয়নি।’
তাদের জন্য ওইসব অনুভূতি সৃষ্টি নাহলে সে কী করে ওই অনুভূতি অনুভব করেছিল? তার চোয়াল শক্ত কিন্তু দৃষ্টিতে নিজের জন্য করুনা। সে মলিন হেসে চিরচেনা শায়েরিটি বিড়বিড় করল,
‘woh Jo dard se bane hain, dard unka kya hi bigaad sakta hai?’
(‘যে দুঃখ দিয়ে তৈরি হয়েছে, দুঃখ তার আর কী বা ক্ষতি করবে?’)
ফাতিমা বিন্দুর হাত ধরে বাইরে আসল। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
‘Chalo Lily, tumhe bahut saare seb ke ped dikhati hoon. Wahan bahut saari bheden bhi hain. Bahut khubsurat hain, tumhe achha lagega.’
(চলো লিলি, তোমায় অনেকগুলো আপেলের গাছ দেখাই। ওখানে অনেক ভেরাও আছে। অনেক সুন্দর! তোমার ভালো লাগবে।)
সে খুবই আনন্দিত ছিল। নার্গিস ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ফড়িং এর ন্যায় লাফাতে থাকা মেয়ের দিকে। বিন্দুর চোখে চোখ পড়তেই সে চোখ ফিরিয়ে নিল। গমগমে স্বরে বলল,
‘শাহিন, ফাতিমার সাথে নিচে যাও।’
শাহিন দ্রুত মাতায় কাপড় টেনে বেরিয়ে আসল।
ফাতিমা বিন্দুর হাত ধরে দোচালা কাঠের ঘর থেকে বেরিয়ে আসল। মুক্ত বাতাসের মাঝে বের হতেই বিন্দুর মনে হলো, স্বাধীনতা—সৃষ্টিকর্তার দেয়া সবচেয়ে বড় নেয়ামত। কিন্তু তার স্বাধীন জীবনের পাখা কেটে দিতে যাচ্ছে এই নিকৃষ্ট মানুষগুলো।
ফাতিমার সাথে যখন বিন্দুর পরিচয় হয় তখন সে হাসিমুখে বলেছিল,
‘তুমি খুব সুন্দর। ঠিক আমার বাগানে থাকা সাদা লিলি ফুলের মতো।’
এরপর থেকেই সে বিন্দুকে লিলি বলে ডাকে। অজস্র আপেল বাগানের মাঝে দাঁড়াতেই বিন্দুর বুকের ভেতরের অর্ধেক যন্ত্রনা ফিকে পড়ে। সে চোখ বন্ধ করে নেয়। পাহাড়ি শীতল হাওয়ার মাঝে লম্বা শ্বাস টেনে বুনো ফুল আর কাঁচা আপেলের মিষ্টি সুবাস টেনে নেয়। সে মলিন হেসে বলল,
‘জান্নাতে জাহান্নামীরা কী করে থাকে, ফাতিমা?’
বুনো ফুল তুলতে থাকা ফাতিমা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। অবুঝ কণ্ঠে আওড়ালো,
‘জান্নাত? জাহান্নুম?’
তার অবুঝ কণ্ঠে বিন্দু চোখ মেলে তাকায়। মলিন হেসে ফাতিমাদের বিশাল বাড়িটা দেখিয়ে বলল,
‘ওটা একটা জাহান্নাম। আর ওই জাহান্নামের ভেতরে তুমি একটা জান্নাতের প্রজাপতি। আর এই জায়গাটা একটা জান্নাত। আর ওই বাড়িটা জান্নাতে থাকা এক টুকরো জাহান্নাম।’
প্রজাপতি শুনে ফাতিমা মৃদু হাসল। বলল,
‘Haan, main ek titli hoon aur tum ek phool. Main titli banke tumhare upar baithungi aur shahad khaungi.’
(হ্যাঁ, আমি একটা প্রজাপতি আর তুমি একটা ফুল। আমি প্রজাপতি হয়ে তোমার উপর বসব আর মধু খাবো।)
বিন্দু মলিন হাসল। অশ্রুসিক্ত নয়নে বলল,
‘তোমার নানি আমায় আজ বিক্রি করে দিচ্ছে ফাতিমা। আমায় দূরে কোথাও পাঠিয়ে দেবে। আমায় সাহায্য করো।’
সে কান্নারত কণ্ঠে কিছু বলতেই শাহিন তীক্ষ্ণ নজর ফেলে কাছে এগিয়ে এলো। বিন্দু সতর্ক হলো। সে জানে, একটা বাচ্চা মেয়ে তার কিছুই করতে পারবে না। কিন্তু সে ততক্ষণ বাঁচার আশা রখবে যতক্ষণ না শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
ফাতিমার চোখেমুখে বন্ধু হারানোর ভয় আর উৎকণ্ঠা দেখা গেল। কেননা বিগত এক সপ্তাহ যাবৎ এই একটা মানুষের কাছেই সে তার সব সুখ খুঁজে পেয়েছে। যে কি-না তাকে ভালোবেসেছে, তার সাথে খেলা করেছে, তাকে ঘৃণা করেনিহ কখনো বকা দেয়নি।
সে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
‘নানি কী তোমায় দূরে কোথাও পাঠিয়ে দিচ্ছে?’
বিন্দু হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো। ফাতিমা হতভম্ব হলো। শাহিন তাচ্ছিল্য ভরা কণ্ঠে বলল,
‘বাজি, আপনি একটা পাঁচ বছরের বাচ্চাকে নিজের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করে এখান থেকে বের হতে চাইছেন? হাস্যকর!’
শাহিনের কথা আসলেই সত্যি। একটা পাঁচ বছরের বাচ্চার কোনো ক্ষমতা নেই তাকে এই জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়ানোর। ফাতিমা সাথে সাথে ছুটে গিয়েছিল নানির কাছে। অনেক রাগ, জেদ, কান্না করে অনুরোধ করেছে যেন তার বন্ধুকে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দেয়া না হয়। ফলস্বরূপ নিষ্পাপ শিশুটিকে মায়ের কঠোরতার স্বীকার হলো।
মায়ের হাতে এক দফা মার খেয়ে ফাতিমা বিন্দুর বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগল। সে এতটাই কষ্ট পাচ্ছে যে রীতিমতো হাত পা ছুড়ছে। মায়ের মার খেয়ে ফাতিমা বিন্দুর বুকে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কাঁদতে লাগল। শারীরিক কষ্টের চেয়ে বন্ধুকে হারানোর যন্ত্রণাই যেন তাকে বেশি পীড়া দিচ্ছিল। তাকে ভালোবাসার মানুষ যে একদম নেই। সে মা আর নানিকে পছন্দ করে না। সে ফুঁপাতে ফুঁপাতে বলল,
‘আমায় ছেড়ে যেওনা,লিলি। নানি আর মা সারাক্ষণ আমায় ঘরের ভেতরে আঁটকে রাখে। আমার একা একা থাকতে খুব কষ্ট হয়। মা আর নানি সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকে। আমায় শাহিন আঁটকে রাখে। মারধোর করে। তুমি তো আমায় ভালোবাসো, আদর করো, খেলা করো, ঘৃণা করো না। আর কেউ আমার সাথে এমন করে না।’
বিন্দু ছলছল চোখে চেয়ে ছোট্ট মেয়েটির আকুতি শুনলো। সে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে আরো দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরল। অসহায়ত্ব ভরা কণ্ঠে বলল,
‘আমার কাছে সুযোগ থাকলে আমি এই জাহান্নামের ভেতর থেকে তোমায় দূরে কোথাও নিয়ে যেতাম, ফাতিমা। কিন্তু আমি নিজেই তো অসহায়।’
বিন্দু আর ফাতিমার আর্তনাদে সমীরণে মিলিয়ে গেল। কেউ ভ্রুক্ষেপ করল না। সময় দ্রুত গড়ালো। দুপুর পার হয়ে বিকেল ঘনিয়ে এল। বিকেল তিনটার দিকে নার্গিস ও শাহিন বিন্দুকে একটি জমকালো জার্দোসি কাজের সালওয়ার স্যুট পরিয়ে দিল। মাথায় ঘোমটা টেনে সুন্দর করে সাজিয়ে দিল তাকে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে বিন্দুর মন ঘৃণায় বিষিয়ে উঠল। তাকে দেখতে অবিকল নিম্নশ্রেণীর এক নর্তকীর মতো লাগছে।
তন্মধ্যেই সাঈদা বেশ সতেজ বদনে কামরায় ঢুকলো। তার চোখেমুখে উপচে পড়া প্রসন্নতা। ঢুকতে ঢুকতে প্রসন্ন কণ্ঠে বললেন,
‘এই খদ্দের বেশ শিক্ষিত আর ভালো। মেয়ে দেখার আগেই পেমেন্ট করে দিয়েছে।’
সে হাতের স্যুটকেস দেখিয়ে বলল। পরপরই উৎসুক কণ্ঠে বলল,
‘নার্গিস ওকে ভালো করে তৈরি করো। খদ্দের যেন আশাহত নাহয়। সে আমার উপর অন্ধ বিশ্বাস করে টাকা দিয়ে দিয়েছে।’
নার্গিস থমথমে মুখে তার খোঁপায় একটা ফুল গুঁজে দিয়ে বলল,
‘ও তৈরি আম্মা।’
বিন্দুর চোখ বেয়ে অনবরত পানি গড়াচ্ছে। তা দেখতেই সাঈদা ধমকে উঠলেন,
‘মেকআপ নষ্ট হয় না যেন। খদ্দেরের সামনে যদি কান্নাকাটি করা হয় তবে জেনে রাখো তোমার আর তোমার বাচ্চার আমার হাত থেকে রেহাই নেই।’
বিন্দু ভয়ার্ত বদনে নিজের পেট আঁকড়ে ধরল। ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল। অনুনয় ভরা চাহনিতে তাকালো সাঈদা আর নার্গিসের দিকে।
নার্গিস দেখেও না দেখার ভান করল। সাঈদা বলল,
‘আমি যখন বলব তখন ওকে নিয়ে আসবে।’
দরজার কপাট আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ফাতিমা তাদের কথা শুনে ছুটে দোতালা থেকে নিচে নামলো।
ঠিক সদর দরজা সংলগ্ন বসার ঘরে গিয়ে তার গতিরোধ হলো। কাঠের জানালা দিয়ে বাইরের প্রকৃতি দেখতে মগ্ন এক সুঠামদেহী পুরুষ। সে ঝড়ের গতিতে চৌকাঠ পার হলো। রুষ্ট কণ্ঠে বলল,
‘Kya tum Lily ko lene aaye ho?’
(তুমি কী লিলিকে নিতে এসেছ?’)
কারোর ক্রুব্ধ কণ্ঠে আপাদমস্তক কালো পোশাকে আবৃত লোকটি ফিরে তাকালো। তার দৃষ্টি সোজা নয় বরং দরজার একদম নিচে তিন ফুটের একটি বাচ্চার উপর নিবদ্ধ হয়।
তার পরনে এখন একটি কালো ফ্রক, কালো ব্যালেরিনা শু, আর মাথায় লাল একটি বান্দানা বাঁধা। যেই বান্দানা ভেদ করে কপালের দুইপাশে কোঁকড়া চুলগুলো উড়ছে। পিঠ ছড়িয়ে আছে এক ঝাঁক কোঁকড়া চুল। কালো পোশাকে ধবধবে ফর্সা মেয়েটির স্বর্গীয় সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলছে। লোকটির চোখে এক দফা মুগ্ধতা নেমে আসল।
দিনের শেষ বেলায় সূর্যের তেজহীন মিঠা কিরণ তীর্যকভাবে ঠিকরে ঢুকছে কাঠের জানালা ভেদ করে। যেটা সোজা বাচ্চা মেয়েটির চোখ বরাবর পড়ছে। লোকটির কপাল কুঁচকালো, দৃষ্টি সরু হলো ঠিক মেয়েটির চোখ বরাবর। ফর্সা মুখে দারুচিনি রঙা চোখদুটো কেমন অপার্থিব সৌন্দর্যের সাথে জ্বলজ্বল করছে। লোকটির দৃষ্টি কিঞ্চিৎ আরো কুঁচকে গেল। পল্লবদ্বয় ঈষৎ কাঁপল বোধহয়। ওই চোখে কারোর ছায়া ভেসে উঠতেই সে ছটফট করে উঠল।
ফাতিমার ক্রোধ নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গিয়েছে ততক্ষণে। সে পুনরায় একই কথা বলল,
‘kya tum lliy ko lene ayi ho?’
(তুমি কী লিলিকে নিতে এসেছ?’)
লোকটি খানিক ধাতস্থ হলো। এক পা দুই পা এগিয়ে এসে ধাতস্থ কণ্ঠে পাল্টা জিজ্ঞেস করল,
‘Aur woh kaun hai?’
(আর সে কে?’)
‘Tum nahi jaante use?’
(তুমি তাকে চেনো না?’)
‘Nehi.’
(নাহ।)
ফাতিমা কপাল কুঁচকালো। লোকটির দৃষ্টি আবারো সরু হলো ওই কপাল কুঁচকানো দেখে। তার অ্যাডামস অ্যাপলটি ক্ষীণ নড়ে উঠল। ফাতিমা থমথমে মুখে বলল,
‘Woh Lily hai, ek mehakta hua phool.’
(সে লিলি, একটি সুবাসিত ফুল)
‘ফুল?… লিলি?’
লোকটি নিজমনে আওড়ালো। পরপরই উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
‘Mehekta hui fool? keya ap iski batt Kar rahi hain?’
(সুবাসিত ফুল? আপনি কী ওনার কথা বলছেন?’)
লোকটি তার ফোনে একটি ছবি বের করে ফাতিমার চোখের সামনে রাখল। যেটা বিন্দুর ছবি। ফাতিমা ঘাড় দোলালো।
‘Haan wahi Lily hai. Kya tum bhi bure aadmi ho?’
(হ্যাঁ, এটাই লিলি। তুমিও কি খারাপ লোক?’)
লোকটি মৃদু হেসে আওড়ালো,
‘Hum bhi?’
(‘আমি–ও?’
বাচ্চাটি কী তবে জানে এখানে আসা লোকগুলো খারাপ হয়? লোকটি ধাতস্থ কণ্ঠে বলল,
‘Main bure logon ke liye bura hoon, aur achhe logon ke liye achha hoon.’
(আমি খারাপ মানুষের জন্য খারাপ আর ভালো মানুষের জন্য ভালো।)
ফাতিমা অকপটে জানালো,
‘Meri Lily achhi hai.’
(আমার লিলি ভালো।)
লোকটি মৃদু হাসল।
‘To main bhi achha hoon.’
(তাহলে আমিও ভালো।’)
‘To phir aap unko kyun le ja rahe ho? Mat le jaao na! Unke alawa mera koi dost nahi hai. Ammi aur nani mujhe har waqt qaid karke rakhti hain. Mohalle ke koi bhi bachhe mere saath nahi khelte, bade bhi mujhse naraz hain.’
‘তাহলে আপনি তাকে কেন নিয়ে যাচ্ছেন? নিয়ে যাবেন না প্লিজ। সে ছাড়া আমার আর কোনো বন্ধু নেই। আম্মু আর নানি আমাকে সব সময় বন্দি করে রাখেন। মহল্লার কোনো বাচ্চাই আমার সাথে খেলে না। বড়রাও আমার ওপর রেগে থাকেন।’
ফাতিমার কথায় লোকটির চোখে সহানুভূতি দেখা গেল।
‘Woh log aapke saath aisa kyun karte hain?’
(‘তারা আপনার সাথে এমনটা কেন করে?’)
‘Pata nahi. Main to good girl hoon, lekin phir bhi mujhe koi pasand nahi karta.’
(‘জানি না। আমি তো ভালো মেয়ে। কিন্তু তবুও আমায় কেউ পছন্দ করে না।’)
ফাতিমা মলিন মুখে বলল।
‘Woh log to na-insaafi karte hain aapke saath.’
(তারা আপনার সাথে অন্যায় করে।)
‘Haan, aap Lily ko mat le jaiye. Unke alawa koi mujhe pyar nahi karta.’
(হ্যাঁ, আপনি লিলিকে নিয়ে যাবেন না। সে ছাড়া আমায় কেউ ভালোবাসে না।)
‘Aap ek pari hain. Aap se sab pyar karte hain. Aap mere paas aaiye.’
(আপনি একটা পরী। আপনাকে সবাই ভালোবাসে। আপনি আমার কাছে আসুন।)
লোকটি দু’হাত বাড়িয়ে দিল। কিন্তু ফাতিমা গেল না। বরং থমথমে মুখে বলল,
‘Nahi, main kisi anjaan mard ke paas nahi jaati. Mujhe achha nahi lagta unka chhoona.’
(নাহ, আমি কোনো অচেনা পুরুষ মানুষের কাছে যাই না। আমার ভালো লাগে না তাদের স্পর্শ।’)
লোকটি আরো এট দফা মুগ্ধ হলো, বিস্মিত হলো। বাচ্চাটির কথা বলার ধরণ ঠিক ততটাই পরিপক্ক আর বুদ্ধিবৃত্তিক যতটা শানিত তার কথাগুলো। এই পরিবেশে থেকে এই মনোভাব সত্যিই বিরল। সে অভিভূত হলো। জিজ্ঞেস করল,
‘Aapke papa kahan hain?’
(আপনার বাবা কোথায়?)
‘Mere papa nahi hain. Meri sirf ammi aur nani hain.’
(আমার বাবা নেই। আমার শুধু আম্মি আর নানি আছে।)
লোকটি আর কৌতূহল দেখালো না বরং অদ্ভুত বিভ্রমে ডুবে গেল ফাতিমার দারুচিনি রঙা চোখদুটো দেখতে দেখতে। এই চোখ বিরল নয়। কিন্তু এই চাহনি বিরল। এই কপাল কুঁচকানো বিরল। লোকটি কেমন হাঁসফাঁস করে উঠল।
বিন্দু তখন নার্গিসের হাতে পায়ে ধরে অনুনয় করছিল। তন্মধ্যেই শাহিন তটস্থ ভঙ্গিতে কক্ষে ঢুকলো। তাড়া দিয়ে বলল,
‘বাজি, আম্মিজান ওনাকে নিচে ডাকছে।’
নার্গিস নিজেকে সরিয়ে নিলো ক্রন্দনরত বিন্দুর থেকে। পুনরায় জোরপূর্বক মুখের দশা একটু ঠিক করে দিয়ে বলল,
‘নিজের বাচ্চার কথা চিন্তা করে হলেও তোমায় যেতে হবে। কারণ এখানে আর একদিন থাকলে আম্মা তোমার বাচ্চাকে মেরে ফেলবে। তুমি জানো না সে ঠিক কতটা পাষাণ!’
বিন্দু থমকে গেল। নার্গিস সরে দাঁড়াল। শাহিন এগিয়ে এসে বলল,
‘বাজি, তাড়াতাড়ি চলুন। আর এইটা নিন। খদ্দের আপনার জন্য পাঠিয়েছেন এই ফুলগুলো। লোকটা অনেক ভালো বাজি। আপনি জিতেছেন। নয়তো আজ পর্যন্ত কোনো খদ্দের কোনো মেয়ের জন্য এমন ফুল আনেনি।’
সে লাজুক হেসে বলেই ফুলের তোড়াটি বিধ্বস্ত বিন্দুর কোলে রাখল। বিন্দুর বিধ্বস্ত স্থবির দেহ মৃদু চমকালো নাসারন্ধ্রে লিলি ফুলের মিষ্টি সুবাস ফুরফুরিয়ে ঢুকতেই। সে চকিতে নিজের কোলের দিকে তাকালো। একগুচ্ছ সাদা সতেজ লিলি দেখতেই বিন্দু আচমকা হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল। তার চোখ বেয়ে অঝোরে পানি গড়াচ্ছে অথচ ঠোঁটের কোনে মুক্তির হাসি। সে সব ভুলতে পারবে কিন্তু এই লিলি আর লিলি পাঠানো ওই এক মানুষকে সে কখনোই ভুলতে পারবে না। সে এক মুহুর্ত বিলম্ব করল না বরং ফুলের তোড়াটা নিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে।
নার্গিস আর শাহিন ভড়কে গেল। নার্গিস অবুঝ কণ্ঠে বলল,
‘এর হঠাৎ কী হলো?’
বিন্দু নিচে নামতেই সাঈদা আঁটকে দিয়ে বলল,
‘ওই ঘরে আছে, সাহেব। সুন্দর করে নিজেকে উপস্থাপন করবে। আমি যেন তাকে অসন্তুষ্ট রুম থেকে বের হতে না দেখি।’
বলে সে দরজা খুলে দিল। বিন্দু ছুটে রুমের ভেতরে ঢুকলো। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে দেখতেই সে আরো দ্বিগুণ বেগে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
‘তালহার!’
লোকটি পিছু ফিরল। সেই চিরচেনা গম্ভীর মুখ, হ্যাজেল ব্রাউন রঙা চোখের শান্ত দৃষ্টি আর কঠোর অবয়ব। বিন্দু ফুপাতে ফুপাতে পুনরায় ছুট লাগালো। এক ছুটে গিয়ে আঁছড়ে পড়ল সটান দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির বুকে। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
‘আমি জানতাম আপনি যেভাবেই হোক আমায় খুঁজে নেবেন।’
তালহারের অনড় হাতদুটো না চাইতেও আঁছড়ে পড়ি দেহটিকে জড়িয়ে নেয়। শক্ত করে, যতটা শক্ত বাঁধন হয়। ফিসফিসিয়ে বলল,
জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৭
‘আমরা কী কিছুক্ষণের জন্য মান-অভিমান দূরে সরিয়ে রাখতে পারি? আমি ভীষণ ক্লান্ত। আজ এক সপ্তাহ আমার ঘরে ফেরা হয় না।’
বিন্দু কাঁদতে কাঁদতে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো। দরজার কপাট ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ফাতিমার মুখ মলিন হয়ে গেল। লিলি যে ভীষণ খুশি ওই লোকটির সাথে যাওয়ার জন্য!
