ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১
অনামিকা আহমেদ
” বসার ঘরে দাঁড়িয়ে বে*শ্যার মত পরপুরুষকে শরীর দেখানো শেষ হলে এক্ষুনি আমার রুমে আয়। ”
কথাটা বলেই ইশতিহার এর এক মুহুর্ত দাঁড়ায় না। পকেটে হাত গুঁজে সিঁড়ি বেয়ে উপরে যায়। কিন্তু কয়েক ধাপ এগোতেই আবারো পেছনে তাকিয়ে নির্লিপ্ত কন্ঠে বলে,
” আর এই লাল শাড়িটা খুলে তারপর আমার ঘরে আসবি। নয়তো শাড়ি সহ তোকে আ*গুনে পুড়িয়ে ফেলতে আমি দুবার ভাববো না।”
কথাগুলো বলে ইশতিহার আবারও নিজের রুমের উদ্দেশ্যে হাটা দেয়। রূপ এতক্ষণ মাথা নিচু করে কেঁদে যাচ্ছিল। ইশতিহার এর বলা শেষ কথাটা যেনো তার মেরুদণ্ড বেয়ে এক শীতল শিহরন বইয়ে দেয়। রূপের শাড়ির আঁচলটা আলগোছে মেঝের ওপর পড়া, একটু আগেই যেটা দিয়ে রূপের মাথায় বড় করে ঘোমটা দেওয়া ছিল।
আজ পাত্রপক্ষ রূপ কে দেখতে এসেছিল। ইশতিহার কে না জানিয়েই সবকিছু সাজানো হয়েছিল কারণ তার মা সুলেখা খানম জানতেন ইশতিহার জানলে এই বিয়ে সে কিছুতেই হতে দিবে না। কিন্তু তার ভয়ই সত্যি হলো, খবর পেয়ে কোথা থেকে জানি ইশতিহার উদয় হলো, অথচ এখন তার হাসপাতালে থাকার কথা।
রূপ কে সুলেখা নিজের হাতে শাড়ি পড়িয়েছিলেন, তাও নিজের সবচেয়ে পছন্দের গোপালি শাড়িটা। মেয়েটা এতিম, বাড়ির সকলে বিশেষ করে ইশতিহার উঠতে বসতে রূপের সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করে। পান থেকে চুন খসলেই গায়ে হাত তুলতে ছাড়ে না। তাই সুলেখা চেয়েছিলেন মেয়েটাকে এই দুর্গ*তি থেকে রক্ষা করে, নয়তো মাত্র আঠারোতেই রূপ কে কাছ ছাড়া করার কোনো ইচ্ছাই তার ছিল না।
পাত্রপক্ষ প্রথম দেখাতেই রূপ কে পছন্দ করে নেয়। আর না করবেই না কেনো? রূপ বেশ সুন্দরী ঠিক যেনো তার মায়ের আদলে চেহারা গড়া। শুভ্র ত্বক, টানা টানা কাজল কালো চোখ, খাড়া নাক আর গোলাপি ঠোঁটের অপূর্ব সংমিশ্রণ। তার উপর তার বংশ ভালো। পাত্রপক্ষের আপত্তি করার কোনো জো পেলো না। তাদের ইচ্ছা ছিল আজই মেয়ে আংটি পরিয়ে দেওয়ার, রূপ সুলেখার মুখের দিকে চেয়ে আপত্তি করলো না। কিন্তু আংটি পড়ানোর আগ মুহূর্তে মির্জা ম্যানশন এ পা রাখে ইশতিহার।
চোখে সানগ্লাস, হাতে রোলেক্স ঘড়ি আর গলায় ঝুলানো স্টেথোস্কোপ তার আভিজাত্য প্রকাশ করছে। মুখের গড়ন খারাপ নয়, তবে অনুভূতিহীন, চোয়াল শক্ত তার চেয়েও শক্ত তার শরীরের বান। প্রতিদিন জিম করলে যেমন হয় আরকি। চুল গুলো বেশ যত্নে বেকব্রাশ করা, তবুও দু একটা চোখের সামনে ঝুলে রয়েছে। পরনে ব্ল্যাক শার্ট প্যান্ট, শার্টের ওপর সাদা এপ্রোন বেশ মানিয়েছে তাকে, হাতা দুটো উপরে গোটানো। ইশতিহার এর এক ঝলক দেখলে কারো পক্ষে তার দৃষ্টি ফেরানো কঠিন। হয়তো তার এই গাম্ভীর্য আর সুপুরুষতা কারণে অনেক আগেই রূপ তার মন প্রাণ সবকিছু ইশতিহার কে দিয়ে দিয়েছে, কিন্তু মুখে প্রকাশের সাহস তার মধ্যে নেই।
ইশতিহার এর বেশ জোরালো ধমক শুনে দ্বিতীয় বার তার বিরোধিতা করার সাহস রূপের হয় না। হাতের উপরের পিঠ দিয়ে চোখের অবশিষ্ট পানি মুছে সে নিজের রুমে চলে যায়। তবে যাওয়ার আগে একবার সুলেখার দিকে চায়, তিনিও অ*পরাধীর দৃষ্টিতে রূপের দিকে চেয়ে ছিল। তারপর রূপ আর দাঁড়ায় না, ইশতিহার এর আদেশ পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
ট্রের ওপর ব্ল্যাক কফির কাপ টা নিয়ে রূপ দাঁড়িয়ে আছে ইশতিহার এর রুমের বাইরে। থরথর করে কাপছে তার হাত, সেই তালে দুলে উঠছে ট্রে। রূপ বুকে একটু ফুঁ দিয়ে দরজায় ধাক্কা দেয়, দরজা চাপানোই ছিল তাই হাত রাখতেই হাট করে খুলে যায়।
রূপ মাথা নিচু করে রুমে ঢুকে পড়ে। তার দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ থাকলেও সে আড়চোখে দেখতে পারছে ইশতিহার খালি গায়ে বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় পড়ে আছে। এক হাত ভাঁজ করে তার ওপর মাথাটা রেখে শুয়ে বাজের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আরোপ করছে রূপের ওপর। রূপ কাপা হাতে বেডসাইড টেবিলের ওপর কাপটা রেখে পেছনে ঘুরে পা বাড়াতেই ইশতিহার রূপের এক হাত চেপে ধরে। রূপ ভয়ে ভয়ে চোখ তুলে তাকাতেই দেখতে পায় ইশতিহার সিনা টান টান করে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। বার বার নিজের অবাধ্য চোখটা ইশতিহার এর লোমশ বুকের দিকে ছুটছে। ইশতিহার একটু বাকা হাসি হেসে রূপের চিবুক ধরে তার মুখখানা উঁচিয়ে ধরে বলে,
” আমার দিক থেকে চোখ সরে আবার ঠিকই মায়ের কথায় পরপুরুষের সামনে পাত্রী সেজে বসে পড়ছিস। তোর তো দেখি চরিত্রে সমস্যা।”
ইশতিহার এর এমন কথায় রূপের অভিমান হয়। দু হাত দিয়ে ইশতিহার কে ঠেলে সে মুখ ঘুরিয়ে বলে,
” আমি আপনার দিকে চাইনি, আপনার হাতির মতো বুকটা আমার চোখের সামনে এলে কি এটা আমার দোষ? আর আমি যার সামনে ইচ্ছা হয় তার সামনে যাবো, আপনি বলার কে?”
” আমি বলার কে তাই না?”
এই বলে ইশতিহার টেবিলের গরম ধোঁয়া ওঠা কফির মগটা হাতে নিয়ে পুরো কফিটা ছুঁড়ে দেয় রূপের দিকে। সাথে সাথেই তীব্র জলাপোড়া শুরু হয়ে যায় রূপের মুখে আর হাতে। যে যে জায়গায় কফির ফোঁটা ছিটকে পড়েছে সেই সেই জায়গা লাল হয়ে উঠেছে। তীব্র ব্যথা*য় রূপের চিৎকার ইশতিহার এর সাউন্ড প্রুফ রুমের চার দেওয়ালের মাঝেই আটকা পড়ে যায়।
রূপ ব্য*থা সহ্য না করতে পেরে মেঝের ওপর পড়ে যায়। ইশতিহার এবার হাঁটু গেড়ে রূপের সামনে বসে তার চুলের মুঠি টেনে ধরে বলে,
” এটাই আমার কথার অবাধ্য হওয়ার শাস্তি। আজ প্রথম বার দেখে মাত্রা কম ছিল, পরেরবার থেকে নিয়ম আরও কঠোর হবে। তুই অন্য কোনো পুরুষের সামনে বেহায়াপনা কর কিংবা তাদের গায়ে ঢলে পড়ে যা। আমার তাতে যায় আসে না। কিন্তু আমার সন্তান তোর গর্ভে থাকাকালীন আমি ছাড়া আর কোনো পুরুষের সামনে তোর যাওয়া নিষিদ্ধ, আই রিপিট, আমি ছাড়া তুই অন্য কারো সামনে যেতে পারবি না। গেলে একদম ঠেঙ ভেঙে খোড়া করে রেখে দিবো।”
রূপের তখন নাজেহাল অবস্থা। ইশতিহার এর হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য তার আ*ত্মা পর্যন্ত ছটফট করতে থাকে। সে এবার ইশতিহার এর দিকে ঘৃ*ণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
” আপনি কি ভেবেছেন আমি আপনার এই অবৈধ সন্তান কে আমার গর্ভে বড় করবো? তাকে জন্ম দিবো? কখনোই না, এই মাংসপিন্ডের কোনো মূল্য নেই আমার কাছে, কারণ ও আপনার মতো অমানুষের সন্তান। আর কি পরিচয়ই বা হবে এই সন্তানের বলুন? শেষে গিয়ে আমার গায়ে ক*লঙ্ক লাগবে অথচ আমার কোনো দোষই ছিল না। আপনার কাছে যেটা এক রাতের ভুল আমার কাছে সেটা সারাজীবনের ইজ্জতের মামলা। তাই আমি কখনোই আপনার জা*রজ সন্তান কে জন্ম দিতে পারব না।”
